সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১৮

শামীমা জামানের গল্প : চিত্রাবলি

গেলো বছর চিত্রাদের বাড়ির পিছনের বাঁশবাগান পার হয়ে যে ছোট পুকুরে ডুবে আসাদ স্বর্গবাসী হলো, জয়গুণ দাঁত খিচোলে সে এখানটাতে এসে বসে থাকে। ঘন্টার পর ঘণ্টা। বাড়িতে ঢি ঢি পড়ে যায় তাকে খুঁজতে। সে চুপচাপ গুম হওয়া মানুষের মতো ঝিম ধরে বসে থাকে। এ পুকুরে কদাচিৎ কেউ আসে না। কেবল মাছ ধরতে শখ হলে পাড়ায় ঘোরা বুনো পোলাপান কখনো-সখনো এখানে এসে কাদা ঘোলায়, দু একটা কচি শিং মাগুরের ক্যাতা খেয়ে মারে বাবারে চিৎকার জোড়ে।
তেমনি হয়ত এসেছিলো আসাদ। একা। পুরো একটা দিন একটা রাত সারা গ্রাম ঘুরে তাকে খুজে পাওয়া যায় না। গোপীনাথপুর গ্রাম কিছু ছোট নয়। তবু প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় লোক পাঠিয়ে খুঁজতে তাকে বাদ রাখেনি জয়গুণ। ছেলের ওপর রাগ তার কম নয়। সে কেবল 

ঐ মালাউনের মেয়ে সুচিত্রাকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছে বলে নয়। কাজেকর্মেও তার কোনো আগ্রহ-উৎসাহ নাই। বাজারে তাকে দোকান করে দিয়েছে জয়গুণ।সে দোকান মুখো হয় না বলে ছোট ভাই নুরু মিয়াকেই বসতে হলো দো্কানে। চিত্রা একদৃষ্টে পুকুরের সবুজ টলটলে পানির দিকে চেয়ে থাকে। তার মনে হয় আসাদ বুঝি এখনি ওখান থেকে ভেসে উঠবে। সেদিন যেমন উঠেছিল। মিয়া বাড়ির আশ্রিতা পুঁটি দেখে চিৎকার দিয়ে পুরো গাঁ এক করেছিল। জঙ্গলে খড়ি কুড়োতে কুড়োতে সে পুকুরের ধারে এসেছিল। পুকুরের জলের মধ্যে আসাদের ছাপা ছাপা চেনা শার্ট দেখে ভূত দেখার মতো চমকে সবাইকে ডেকেছিলো। জয়গুণ প্রলাপ-বিলা্পে ছয়লাব করেছিল। ছেলে তার সাঁতার জানে পানিতে ডুবে যায় ক্যামনে। সব ঐ মালাউনের মেয়ের দোষ। ওর ঘাড়ে পিচেশ-জিন আছে। সেই এসব করছে। 

গ্রামের নব্য শিক্ষিত কেউ কেউ মৃদু¯স্বরে বলে ওঠে, ‘ওর না মৃগীর ব্যামো ছিল।' 

জয়গুণ সেদিকে কান না দিয়ে চিত্রার চুলের মুঠি চেপে ধরে। চাড়ালনীরে কইছি কলেমা যখন পড়ছিস, নামাজটা পড়া দে। নামাজ না পড়লি কোন উপায় নেই। কে শোনে কার কথা। 

খানিক সময় পার হলে আবোল-তাবোল চিন্তার বৃত্তে ঘুরপাক খেয়ে সান্ত্বনা খুঁজে নেয় চিত্রা। শুধু তো একটু মুখচোপাই চালায় জয়গুণ। ভালো মাছটা, মুরগির রানটা সে তাকেই তো তুলে দেয়। বিধবা হয়ে মাছ মাংস সব খেতে পায়, লম্বা মেঘের মতো চুলগুলো তার কেউ ছেটে হিমানী বুড়ির মতো কুৎসিত করে দেয়নি এই বা কম ভাগ্যের কথা! আঁচল দিয়ে চোখ দুটো ডলতে ডলতে সে বাড়ির দিকে যাওয়ার জন্য ওঠে। ঐ এক রত্তি মেয়েটা তার কতক্ষণ না খেয়ে আছে কে জানে। সে তো তার মা-বাবার মতো পাষাণ নয় যে বছরের পর বছর মেয়ের খোঁজ-খবর না নিয়ে কাটাতে পারে। এই তো একটা গ্রাম পরেই তার বাবার বাড়ি। 

ধীর পায়ে বাঁশ-বাগানের শুকনো পাতা মাড়িয়ে বাড়ি ঢুকতেই একটা কলরব শুনতে পায় চিত্রা। বুড়ি হিমানী খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চিত্রার কাছে আসে। মুখে হাত ছুঁয়ে চুম্বন করে। 

জয়নাল দাঁত বের করে হেসে জানায়, তুমি তো মাস্টারনী হই গেছ ভাবিছাপ। তোমার চাকরি পাকা। এই দেখ চিঠি আসছে।' 

জয়গুণ পান চিবুতে চিবুতে আঁচলের কোনায় গিট দিয়ে রাখা টাকার পুঁটুলি থেকে পাঁচ টাকার দুটি নোট বের করে জয়নালের দিকে এগিয়ে দেয়। ধর জয়নাল, বাজার থেকে জিলাপি কিনে নিয়ে আয়। মিষ্টি ছাড়া সুখবর শুনতে কি মিঠা লাগে। 

হিমানী বুড়ি চিত্রাকে আদর করে বুকে ধরে রাখে। সেদিকে চেয়ে জয়গুণেরও ইচ্ছে করে বউটাকে একটু আদর করে। দুপুরে মেলা খানিক বকাঝকা করেছে সে তাকে। কিন্তু বউয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কটাও এমন সহজ-সরল নয় যে হিমানী বুড়ির মতো যখন তখন জড়িয়ে ধরে দোয়া দেয়। ছেলেটার কথা আজ তার বুক ফেটে ফেটে মনে পড়ছে। নিজে পড়ালেখা করলো না ঠিকমতো কিন্তু বউয়ের পড়াশোনায় তার উৎ্সাহের কমতি ছিলো না। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে চোখের কোনা মোছে জয়গুণ। তবু আল্লাহ পাকের হাজার শোকর তার সংসারে একটি বাড়তি রোজগারের ব্যবস্থা হলো। স্বামী মারা গেছে তার আজ কত বছর হয়ে গেলো। সে কিন্তু ভেঙে না পড়ে শক্ত হাতে সংসার জমিজমা সব সামলেছে। যদিও ঐ সময় মেসের মোল্লা অনেক সাহায্য করেছে তাকে। স্কুল পার হয়ে মাঠের পাশে এই নতুন বাড়ি দখল করতে সেই তাকে সাহায্য করে। ছোট ভাই নুরু মিয়া আর ছেলে আসাদ ছাড়াও তার সংসারে জায়গা করে নেয় গণ্ডগোলের বছর ইজ্জত হারানো হিমানী দি। তার সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম সেই করে দিত। জয়গুণ অফুরন্ত অবসরে গালে পান গুজে পাড়া বেড়াতে বেরতো। হিমানীকে গত বছর প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিজে হাতে কিছু সাহায্য করে যায়। সেই থেকে বুড়ির পাছা এমন মোটা হইছে যে কাউকে ডরায় না সে। আজকাল তাকেও কেমন চটাং চটাং কথা শোনায় বউটাকে একটু বকাঝকা করলে। 

জয়গুণের মনে পড়ে বউটা দুপুরে ভাত না খেয়ে বেরিয়ে গেছে। পাকের ঘরের সিকে থেকে লাউ আর শোল মাছের ঝোলের গামলাটা নামিয়ে সে বউয়ের থালায় মাছের মুড়োটা ওঠায়। নিজে গিয়ে সাধে না বউকে। আসাদের ফুটফুটে মেয়ে চৈতিকে ডেকে বলে, “ও চৈতি, তোর মাকে আইসে খাতি বল দেকিনি।‘’ 

ঘরের বেড়ায় ঝোলানো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চিত্রা চুল আঁচড়ে একটা বেণী করে নেয়। টেবিলে রাখা পাউডার কেস থেকে একটু পাউডারও বুলায় মুখে । কাজল ছাড়া চোখ দুটো কেমন মরা মাছের চোখের মতো ফ্যাকাশে লাগে। একটু চিকন করে কাজল একে নেয় সে। লিপস্টিকটা এনে ঠোটের কাছে ধরেও আবার তুলে রাখে ঝুড়িতে। এটা একটু বেশি হয়ে যাবে । সে তো আর দশটি বউ ঝির মতো স্বামী সোহাগী নয়। বিধবা ,স্বামী খাওয়া মেয়েমানুষ বই তো আর কিছু নয়। কপালটা তার উঠোনের মতো বিস্তৃত। ওখানে একটা টিপ না হলে চলে না। তবু মেসের মোল্লা, জালাল মিয়াদের মতো সমাজপতিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সে কপোলে টিপ ওঠানোর সাহস করে না। চাপা সাদা রংয়ের ছাপার এই শাড়িটা তাকে আসাদ কিনে দিয়েছিল গোপালগঞ্জ সদর থেকে। সেদিন তারা দুজন মিলে সিনেমাও দেখেছিল। ছবিটার নাম ছিল ‘ভেজা চোখ'। নায়ক ছিল ইলিয়াস কাঞ্চন। তার ক্যান্সার হয়। হল থেকে চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে তারা চৌরঙ্গীর খান স্ন্যাক্সে বসে কাচ্চি বিরিয়ানী খেয়েছিল লাল সালু দিয়ে আড়াল করা চেয়ার টেবিলে। নদীর ওপারে ঘোষের চরের মাঠে সে সময় কালি পুজোর মেলা ছিল। আসাদ সেখানে নিয়ে তাকে কত কি কিনে দেয়। এমন একটা মানুষকে ছেড়ে তার সারাটা জীবন কাটাতে হবে। সে কি করে পারে। এখনো তার থেকে থেকে কেবল তার কথাই ভাবতে মন চায়। কাজে কর্মে মন থাকলেও কেমন করে যেন সে বেখেয়াল হয়ে যায়। ভাত বসিয়ে উঠোনে আসলে ভাতের পোড়া না লাগা অবধি তার স্মরণে আসে না সে ভাত বসিয়ে এসেছিলো। তরকারিটা রাধলো ত নুনটা চাখতে ভুলে গেল। এমনকি চৈতিকে গোসল করাতে হবে-সে কথাটিও তার বেলা না গড়ালে, জয়গুণের এক পশলা ধমক না শোনা অবধি মনে আসে না। । মৃদু রোমাঞ্চ, ভয় আর শঙ্কা নিয়ে সে ভীরু পায়ে স্কুলের মাঠ পেরোয়। এই স্কুলেই আসাদ পড়তো। আসাদের পায়ের ছাপ এই মাঠে আছে। নমিতা দি আর রনজু স্যারের উষ্ণ অভ্যর্থনায় চিত্রার সমস্ত ভয়ডর কেটে গেলো কিছু সময়ের মধ্যেই। রনজু নামের লোকটিকে ঠিক স্যার লাগে না। ছেলেছোকড়া একটা । বাড়ি উত্তরপাড়ায়। খুব মজার মানুষ সে। বকে একটু বেশি। কি নাম বললেন যেন আপনার? 

‘সুচিত্রা। সবাই চিত্রা ডাকে। নিচু গলায় উত্তর দেয় সে। 

‘তোমার কথা শুনেছি সব। তুমি বলে ফেললাম, কিছু মনে করো না। সব আল্লাহ পাকের ইচ্ছা। মনকে শক্ত করবা। মানুষের হাতে কিছু নাই। তুমি আউট বই পড়? আমি তোমাকে দেব। পড়ে আবার ফেরত দিও। মন ভাল হবে। অনেক কিছু জানতে পারবা তুমি। গান শোনো? বাড়িতে ক্যাসেট প্লেয়ার আছে? আমার সংগ্রহে অনেক ফিতা আছে। আমি ব্যান্ডের গানও শুনি। ঐ গানটা শুনছো না-“নাতি খাতি বেলা গেল শুতি পারলাম না আহারে ছদরউদ্দির মা...?” তারপরে—“কলি কালের ভণ্ড বাবা”। সেদিন একটা নতুন ফিতা আসছে খুব সুন্দর গানগুলো “...শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে অঝরে নামবে বুঝি শ্রাবণী ঝরিয়ে...” গুনগুনিয়ে সে গাইতে শুরু করে দিলো। 

চিত্রা বললো, “আপনি গানও গান নাকি? 

‘একটু একটু শুনে শুনে শিখি।' 

টিফিন টাইমে রনজু বাজার থেকে গরম গরম সিঙাড়া আনালো। 

নমিতা দি সিঙাড়ায় কামড় বসিয়ে টিপ্পনি মারতে ছাড়লো না তাকে। আজ রনজু র পকেট যে বড় গরম মনে হয়। 

দিনগুলো চিত্রার মন্দ যায় না স্কুলে সবার সঙ্গে। কিছু দিনের মাঝেই তারা ক’জন একটা বন্ধুতার শেকলে একে অপরের সহায় হয়। 

সেদিন ছুটির সময় নমিতা দি তার বাড়িতে রস খেতে যেতে নিমন্ত্রণ করে সকলকে। সবার সময় এক সঙ্গে মেলে না। তবে রনজু কথা দেয় সে চিত্রাকে নিয়ে ঠিক যাবে রস খেতে। কি চিত্রা যাবে তো আমার সঙ্গে? 

নমিতা দির বাড়ি গাঁয়ের একেবারে শেষ মাথায়। পথ কিছু কম নয়। তবু গাঁয়ের লোকে হেঁটেই ও পথ মাড়ায়। স্কুল পেরিয়ে বড় মাঠ ঘেঁষে যে মেইন রাস্তা সদর থেকে এসেছে তার ওপরে জুলমতের দোকানের সামনে কিছু ভ্যানগাড়ি থাকে দাঁড়িয়ে। তবে ওরা ওদিকে গোয়ালা, চন্দ্রদিঘলিয়া আর এদিকে রামদিয়া রাতল ঘোনাপাড়া এসব দিকেই খেপ নেয়। গাঁয়ের মধ্যে সরু রাস্তা দিয়ে খুব দায়ে না ঠেকলে কেউ মাড়ায় না। হয়ত পয়সা বেশি পেলে দু একটা ভ্যানগাড়ি কদাচিৎ চোখে পড়ে ,গাছ-গাছালি পেরিয়ে পূবপাড়া মুখো হতে। শুক্রবার স্কুলে মিটিং আছে—এ মিথ্যে কথাটি জয়গুণকে শুনিয়ে এলেও সে তা বিশ্বাস করেছে কিনা তা নিয়ে চিত্রার মন খচখচ করেই যায়। চৈতিকে খাইয়ে-দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে এসেছে। 

কিছুদূর মাটির রাস্তায় হেঁটে এগোবার পর কিছুটা নিচু দিকে নেমে গেছে সরু হয়ে রাস্তাটা। নমিতা দি রস খাওয়ানোর দাওয়াত দিলেও ক’টি চিকন চালের ভাত সিদ্ধ আর পোষা কুঁড়ো ধরে জবেহ না করে কি ছাড়বে নাকি। এসব ভেবে রনজু বাজার থেকে এক ঠোঙা দানাদার আর কিছু গজা কিনে নেয়। 

‘হাঁটতে পারবে তো চিত্রা? রনজু শুধোয়। 

‘পারব বৈ কি। গাঁয়ের মেয়ে হয়েছি আর হাঁটতে পারবো না। আমি কি শহরের মেম?” 

রাস্তার দু'ধার দিয়ে ঘন কচি ,সতেজ সরিষা টগবগিয়ে বেড়ে উঠেছে। যেন গাঁয়ের এধারে জন্ডিস লেগেছে। সরিষা ক্ষেতের গা ঘেঁষে কারা যেন কলাই বুনেছে। খানিক বাদে বাদে চিকন চাকন দেহে চুল এলিয়ে দাঁড়িয়ে কিছু খেজুর গাছ। সবগুলো গাছে এখন মাটির ঠিলে ঝুলছে। বাঁদর আর দুষ্টু ছেলেরা ওখানে মুখ দিয়েই পান করে যায়। 

রনজু বলে, রস খাবে চিত্রা? 

‘তাই তো খেতে যাচ্ছি। 

‘না, ঐ গাছ থেকে পেড়ে। 

‘চুরি হয়ে যাবে গো। 

‘এসব ছোট চুরি। ও সবাই করে। ওতে কিছু হয় না। 

‘না। চুরি চুরিই। সে ছোট হোক আর বড় হোক।' চিত্রা তর্ক জুড়ে দেয়। 

রনজু মিটিমিটি হাসিতে ওর মুখে তাকিয়ে বলে, “এই তো, এমন স্বাভাবিক হাসিখুশি থাকবে। কথা বলবে। জীবনটাকে উপভাগে করবে। তা না কেমন মেঘকালো করে থাকো মুখটা।' 

এ কথা শোনার পর চিত্রা মুখ কালো করে ফেললো। যেন ভুলে গিয়েছিলো সে তার লালন করা কষ্টগুলোকে। 

তালবন পেরিয়ে এদিকটায় ঢেলামাটির ওপর দিয়ে যেতে হয়। একজন মানুষ পায়ে হেঁটে যেতে পারে, মানুষের চলাচলে এতটা সরু একটা রাস্তামত হয়েছে। তবু সেখানেও হাঁটতে গেলে উঁচু-নিচু মাটির ঢেলায় পা ছলকে যায়। 

রনজু তার হাতটা বাড়িয়ে দেয়। তুমি পড়ে যাবে। হাতটা ধরো চিত্রা। 

চিত্রা একবার ইতস্তত করে রনজুর বাড়িয়ে দেয়া হাতটা ধরে। 

একটা উঁচু ঢিবিমতো জায়গায় এসে রনজু বলে, ‘একটু জিরিয়ে নেবে? এখানে ঘাসের ওপর বসো একটু। ক্ষিদে পেয়েছে? গজা খাবে? 

“ছি ছি, এগুলো না নমিতাদির জন্য? 

‘শোন, নমিতাদিকে বলব আমরা তোমার জন্য ম্যালা কিছু এনেছিলাম কিন্তু এত দূরে তোমার বাড়ি যে রাস্তায় আমরা সব সাবাড় করে ফেলেছি। হাঃ হাঃ হাঃ।' 

এদিকটা একেবারে নিরিবিলি। লোকজন খুব একটা চোখে পড়ে না। পিছনে আকন্দ পাতার ঝোপের মাঝে কিছু একটা নড়ে উঠল। 

‘ও মাগো, ওখানে কে গো? চিত্রা ভয় পাওয়ার ভঙ্গি করলো। যেমনটা গাঁয়ের লোকে মিছেমিছি ভয় পাওয়ার আনন্দে রোমাঞ্চিত হয়। 



চিত্রাকে আরো খানিকটা ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য রনজু বলে, “আরে এই জায়গাটা তো খুব একটা খারাপ জায়গা। এইখানে এক চাষী মাটি খুঁড়ে কি পেয়েছিল জানো? 

‘কি?' 

‘একটা আস্ত মানুষের বাচ্চা। মরা। 

‘যাহ। একদম গুল মারা হচ্ছে। 

‘সত্যি বলছি। এই ঘটনা সত্যি তবে জায়গাটা ঠিক এখানে নাও হতে পারে। এদিককারই ঘটনা। আমি ছোট বেলায় মুরুব্বিদের মুখে শুনেছি।' 

আকন্দ পাতার ঝোপের মাঝে আবার কি যেন একটা নড়েচড়ে উঠল। চিত্রা এবার সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে রনজুর হাত চেপে ধরে।। 

রনজুর আর ইচ্ছে হয় না উঠে ঝোপের মাঝে যেয়ে দেখে ব্যাপার কি। তার এভাবেই অনন্তকাল বসে থাকতে ইচ্ছে করে। 

নমিতাদির বাড়ির নেমন্তন্ন খেয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে বেলা ডোবার সময় হয়ে যায়। বেকি বেড়ার বাইরে থেকেই সে জয়গুণের ফাটা গলার চিৎকার শুনতে পায়। ‘মাগীর মাইয়ে আসুক আজ। তার একদিন কি আমার একদিন। এইটুকুন বাচ্চা মেয়ে সারাটা দিন কান্তি কান্তি পার করলো। দুটো টাকা সংসারে দেয় বইলে আমার মাথা কিনে নিছে নিকি মালাউনের বাচ্চা...।' 

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়লেও দুই এক ওয়াক্ত পড়ার চেষ্টা করে চিত্রা। নুরু মামার কাছে ছিপারাও পড়া শুরু করেছে। হাত তুলে কঠিন বিপদে, কি সামান্য মন খারাপে সে আল্লাহকেই ডাকে। ভগবানকে সে বনবাসে দিয়েছে অনেক আগেই। তবু এই গালিটা তার প্রায় প্রতিদিনই শুনতে হয়। নীরবে মাথা নিচু করে বাড়ি ঢোকে চিত্রা। 

জয়গুণ আজ যত কথাই বলুক সে কোন কথা বলবে না। মুখ বুজে সয়ে যাবে। সত্যিই তো আজ তার ভারী অন্যায় হয়েছে। বাচ্চটা সারাদিন কেঁদেছে। আর সে ঢিং ঢিং করে মুক্তজীবনের স্বাদ ঘ্রানে বিভোর হয়ে ডানা মেলে উড়ে বেড়িয়েছে। এ জীবন তার নয়। অন্ধকার নোনাজলে স্মৃতি হাতড়ে হাহাকারে কেঁপে কেঁপে মনের শোকে দেহের তাপে পুড়ে যাওয়া এক কয়লা সে। দু’মুঠো গেলা ছাড়া আর কোনো আনন্দ তার পেতে নেই। জুলমতের চায়ের দোকান প্রায় সারাদিনই কোনো না কোনো আসরে ভরপুর থাকে। কখনো ছেলে ছোকরা রা কখনোবা গাঁয়ের হত্তাকত্তা মুরুব্বিরা। শীতের সকালে গায়ে চাঁদর, কানে মাফলার পেঁচিয়ে আয়েশ করে বেঞ্চিতে বসে গাঁয়ের লোকেদের নিন্দা-কিচ্ছায় মুখে থু থু ওঠায় অকর্মণ্য বুড়োগুলো। এদের দু’ একজন গাঁয়ের মাথা। চামচা পরিবেষ্টিত হয়ে তারা ধোঁয়া ওড়া চা রসিয়ে রসিয়ে সময় নিয়ে পান করে। বুঝলে জালাল মিয়া, এই রাস্তাটা যদি পাকা হইয়ে যাইতো দেইখতে গাঁয়ের কত উন্নতি হইত।' পিরিচে চা ঢেলে চুমুক দিতে দিতে বলে পালের গোদা মেসের মোল্লা। 

‘ইট আইনে থুয়ে দেসে সেই কোন কালে । এরশাদ থাকতি এই রাস্তা হবে না।‘ মিনমিনে গলায় বলে ছিরু মুনশী। 

কওছার আলী কথা কেড়ে নিয়ে বলে, ‘এখন এরশাদরে গদি থিকা নামানোর সময় হয়ে গেছে। শুনছি শেখের বেটি নাকি খালেদা জিয়ার সঙ্গে এক হইয়া আন্দোলনে নামতিছে। রজব আলী বিদেশ থিকা টিবি আনছে একটা। উঠোনে ধরায় দেয়। সক্কলে দেখে। খবরে খালি এরশাদ আর তার ঐ জামদানী বিবির চেহারা ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। 

জালাল মিয়া বলে, ‘ভাবো একবার মিয়ারা, যে দেশটারে স্বাধীন করলো, যার জন্য এই দেশ পাইলো মাইনসে তারে একঝলক টিবিতি দেখায় না। দেখাইব ক্যান, দেখালি ত ওগো বিপদ। ৭ই মার্চের ভাষণ শুনলে মাইনসের লোম খাড়া হইয়া যাইব না। এর পরে তারা আর ভোট দিব এরশাদরে। তয় বঙ্গবন্ধুরও ভুল আছিলো .....' 

আলাপ বেলা গড়াতে গড়াতে রাজনীতি থেকে বাজার দরে ঘুরে ধান, কলাই, রাখী মালের গুদাম হয়ে চাঁদর গায়ে রনজু মাস্টারের সঙ্গে মাঠ মাড়িয়ে স্কুলের দিকে হেঁটে যাওয়া চিত্রার দিকে ফেরে। 

‘মেয়েছেলেটা আসাদের বিধবা বউটি না?' মেসের মোল্লা সরু চোখে মাঠের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছোড়ে বাকিদের কাছে। 

পুঁটি কাল রাতে এর কথাই বলছিলো তাকে। পুঁটি সারা গাঁ ঘুরে বেড়ায়। তার কাছ থেকে যত গোপন কিচ্ছা সব জানা যায়। 

মেসের মোল্লা তার চাতালের ওপর একটা ঘর উঠিয়েছে। মাঝে মাঝে রাতেও সে এখানটায় থেকে যায়। কালও ছিল। পুঁটি আহ্লাদী গলায় তাকে বলে, ‘জান গো মোল্লা, এই গাঁয়ে যে কি কি হইতিছে সে খপর ত তুমি রাখ না। রাখে এই পুঁটি। সেদিন ছাগলটারে পাতা খাওয়াইতি যাইয়ে কি দেকলাম জানোনা, জয়গুণের বিধবা বউটি আর ঐ স্কুলের রনজু মাস্টার ঢেলা বনে হাত ধরাধরি কইরে হাঁটতিছে। আমি তো ব্যাপার দেইখে আকন্দ পাতার ঝোপে পলাইছি। ঝোঁপের আড়াল থিকা উঁকি মাইরে দেখি দুইজনে সে কি ঢলাঢলিগো। একটু আল্লাহর ভয় নাইগো মাইয়ার। আর বছর কেমন আসাদ ডুবে মললো, আমার চোখে এখনো ভাসে আর এই বদমাইশ মেয়েমানুষ এখনি ফষ্টিনষ্টি শুরু কইরে দেছে।‘ বলতে বলতে পুঁটি তার খুলে রাখা বারো হাত কাপড়টি মাটি থেকে তুলে সায়ার মধ্যে গুজতে ব্যস্ত হয়। ক’টি টাকা হবে মোল্লা? হাত একিবারে খালি হয়ে আছে।' 

মেসের মোল্লা ক্রূর দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে মাঠের চোরকাটা ডিঙিয়ে হেঁটে যাওয়া চিত্রার দিকে। মনে মনে সে কিছু হিসাব কষে নেয়। জয়গুণ হারামজাদী তাকে কম হয়রান করে নাই এক সময়। তার সঙ্গে চালাকি খাটাতে গেছিলো। 

এই গাঁয়ে সে বীর্যপাত করলেও লোকে মূত্রপাত ভেবে চুপ থাকবে—সে এমনই মান-ইজ্জতওয়ালা মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। এলাকার দালানওয়ালা মসজিদ নির্মাণ, দান-খয়রাতে মুক্তহস্ত মানুষটি কবে কোন সময়ে অপরের জমি দখলে সিদ্ধহস্ত ছিল; মানুষ তা আর মনে রাখেনি। 

দুপুরে চারটে ভাত গিলে নিজের অজান্তে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল হিমানী বুড়ি বারান্দার চৌকিটাতে। ভীষণ একচোট দুঃস্বপ্নে তার ঘুম ভেঙে যায় কাঁপতে কাঁপতে। এই নিয়ে সে কতবার এই একই ধরনের স্বপ্ন দেখলো। আট ন মাসের একটি ফুটফুটে নবজাতক হাসে। হিমানী বুড়ি তাকে কোলে নিতেই সে কাঁদতে শুরু করে বিকট চিৎকারে। কাঁদতে কাঁদতে সে সাপ হয়ে হিমানীর সারা গায়ে পেঁচিয়ে ধরে। হিমানী শত চেষ্টা করেও নিজেকে ছাড়াতে পারে না। চিৎকার করে ডাকে, নুরু মিয়া, ও নুরু মিয়া, আমারে বাঁচাও। 

নুরু মিয়া এগিয়ে আসে না। সে কোদাল হাতে করে ঢেলাবন দিয়ে দৌড়াতে থাকে। 

হিমানী একা পড়ে থাকে রাত দুপুরে জঙ্গলের মাঝে। কাছারি ঘরের সামনে কোলাহল শুনে হিমানী চোখ ডলে উঠে বসে। কান পাতে। কিছুক্ষণ শোনার পর যা বোঝে তা হলো মেসের মোল্লা তার বাড়িতে মজলিশ ডেকেছে। বিচার বসাবে সে চিত্রার। চিত্রা নাকি কার সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করেছে। এই গাঁয়ে সে কোন অন্যায় কাজ হতে দেবে না। 

কেউ একজন বললো, “চিত্রাকে মেসের মোল্লা কি দণ্ড দেবে জানো? সে নাকি চিত্রার মুখে কালি মাখিয়ে তাকে গাঁ ছাড়া করবে।' 

আর একজন বলল, ‘না বেতের ঘা মারবে একশোটা জিনা করলি ঐ শাস্তিই দেয়।‘ 

আরেকজন বলল, ‘আমি শুনলাম চিত্রাকে কাপড় খুলে সারা গাঁয়ে ন্যাংটা করে ঘোরানো হবে, যাতে ন্যাংটা হবার সাধ জন্মের মতো মিটে যায়। উঠোনে নামতে যেয়ে পেটের ডান পাশের ব্যথাটা জেগে ওঠে হিমানীর। খানিক জিরিয়ে নেয় সে। 

ততক্ষনে চিত্রাকে মারতে মারতে বেহুশ বানিয়ে ফেলেছে জয়গুণ। 

‘ওলো জয়গুণ, ইবার ছাড়ান দে। মাইরে ফেলবি নাকি মাইয়েডারে। হিমানীর মৃদু প্রশ্রয়ে তার কোলে দৌড়ে এসে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে থাকে চিত্রা। 

হিমানী চিত্রাকে ঘরের ভিতরে নিয়ে তেল মালিশ করে দেয়। সত্যি করে বল তো আমারে মুখপুড়ী কি করিছিস তুই? 

চিত্রা কাঁদতে কাঁদতে বলে, রনজুর সঙ্গে তার পরিচয়ের পর থেকে এই পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সাধারণ স্বাভাবিক ঘটনাগুলো। যার মধ্যে কোনো নোংরা ব্যাপার নেই। তবে সে যে নমিতাদির বাড়িতে দাওয়াত খেতে না বলে গেছে সে অন্যায় সে করেছে। কিন্তু বাকি সব কথা মিথ্যে। 

‘পোলাডা কি তরে ভালো পায়? হিমানী কৌতূহলী হয়ে শুধায়। 



‘না, ছি ছি। এমন কথা সে কোনোদিন বলেনি। তবে সে তাকে সব বিষয়ে সাহায্য করে বন্ধুর মতো। 

‘বুঝছি।' হিমানী চোখমুখ শক্ত করে নিজের মনে প্যাচাল পাড়তে থাকে। ‘ঝাঁজর কয় সুচরে তোর পাছায় এটটা ফুটো। ওরে জয়গুণরে মাইয়েটারে মাইরে একি হাল করিছিস। তুই এত বুজর্গ হলি কবের থিকে। তোর কিচ্ছে মাইনসে জানে না বইলে বাচিছিস। এই আমি তোর পাপ ঢাকছি। এই হাত দুইটা দিয়ে নিজের হাতে জলজ্যান্ত বাচ্চাডারে লবণ খাওয়াইয়ে ঘোর অন্ধকারে জঙ্গলের মদ্দে নিয়া পুঁতে রাখছি। নুরু মিয়া কোদাল হাতে গেছিলো আমার সঙ্গে। তুই তো তখন বিধবা আছিলি। তয় তুই তোর কুড়কুড়ি সামলাইতে পারছিলি না ক্যান সেদিন, নাকি মেসের মোল্লার বউ হবার সাধ জাগিছিল তোর। করলো তরে মেসের বউ! সাত আট মাসের পোয়াতি হওয়ার পরও মানুষজনরে বুঝতে দেই নাই। আগলে রাখছি। মানুষ আসলি কইছি বইসে পড় নয় শুইয়ে পড় কেউ টের পাইব না। সবাই ভাবছে কি জানি ব্যামো হইছে। তারপরও কি দুই একজন জানে না। ঠিকই জানে। 

চিত্রা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে হিমানীর মুখে। প্রথমটায় সে শোক তাপে ঘাবড়ে গিয়ে কাঁপছিল থর থর করে। এক ফোটা শক্তিও তার ছিল না শরীরে। মানুষের মানই যদি না থাকে তবে বেঁচে থেকে কি লাভ। সেও যাবে কলসী নিয়ে পুকুরে আসাদের কাছে। তার কুসুম কোমল চোয়াল ক্রমশই শক্ত হয়ে ওঠে আত্মপ্রতিজ্ঞায়। দক্ষিণ দিককার সরু জানালা দিয়ে হুহু অসভ্য বাতাস আঁচল বেয়ে যেন প্রাণের সঞ্চার করে বলহীন অগোছালো দেহে। কি একটা জীবন তাকে দিয়ে গেল আসাদ।সারা জীবন পুড়ে যাবে।সয়ে যাবে।তবু জীবনকে সে ছুতে পারবেনা কেবল অছ্যুত হওয়ার ভয়ে ! মেয়েটাও ডাঙ্গর হতে চলে যাবে। যাকে পরম যত্নে দেবতা করে রেখেছে মনে ,পার্থিব খেয়ালে শত চিৎকার আর আর্তনাদেও সে ফিরবেনা কোনদিন। দূর থেকে তাকে দেখবে কেবল। কে জানে এসব হয়ত লোকেদের মন গড়া কথা। 

খুব ভোরে। জয়গুণের আযান দেয়া মোরগের ও ঘুম ভাঙ্গবার আগে।চটিজোড়া হাতে নিয়ে সে হেটে চলে সি এন্ড বি রোড ধরে ,উত্তর পাড়া মুখো। রনজু স্যারের বাড়ির লোকেরা তখনো ঘুমে।

1 টি মন্তব্য:

  1. এই দেশে এই গল্পের ভাষায় কথিত মালাউনের বাচ্চা কেউ কেউ প্রেমে পড়ে ধর্ম ত্যাগ করে (কদাচ ব্যতিক্রম ব্যতিত) । আর তার খেসারতও তাকে দিতে হয় যদি সেই মুসলিম পরিবারটি হয় যাচ্ছেতাই । বাংলাদেশে
    ৯৯% মুসলিম পরিবার ঠিক ”মুসলিম” ( সংগা অনুযায়ী শ্রষ্টার কাছে ১০০% আত্মসমর্পণকারী) হিসেবে গড়ে উঠেনাই । অধিকাংশ পরিবার নিয়ম মাফিক গঠিত হয়নাই, সন্তান সন্ততি যে পদ্ধতিতে মানুষ করে গড়ে তুলতে হয় তা এই জনপদের অধিকাংশ পরিবারগুলোতে হয়নাই । সেরকম প্রেক্ষাপটে জয়গুনের বিধবা পুতের বৌ এর প্রতি রঞ্জুর নেক নজর হোক বা মেসের মোল্লার লালায়িত নজর হোক, পড়তে বাধ্য । গল্পটা পুরণ ধাঁচে আধুনিকতার মোড়কে, ভাল লাগল ।

    উত্তরমুছুন