রবিবার, ২৮ অক্টোবর, ২০১৮

মৌসুমী কাদের'র গল্প ৎ

ৎ 
মধ্যদুপুর। বাইরে কড়া রোদ, দগদগে সূর্য। হাজারীবাগ ট্যানারীর মোড়ে ১১ নং কেভি সুইচিং স্টেশন দোকানটার ঠিক পাশের গলির শেষ মাথায় শ্যাওলা পড়া পুরন আড়াইতলা বাড়িটা রোদে পুড়ছে। দীর্ঘদিন সংস্কার হয়নি। পাখিরা ঘুরে ঘুরে এসে দেয়ালের লতাপাতায় বসে পোকামাকড় খাচ্ছে। নান্না বাবুর্চি মাঝে মাঝে লতাগুলো কঞ্চি দিয়ে ছেঁটে দিলেও এমনভাবে সেগুলো দেয়ালজুড়ে জেঁকে বসেছে যে ওদের তাড়াতে হলে ইট খুলে গোড়া থেকে শেকড় সাফ করতে হবে। সেসব করার মত লোক এ বাড়িতে নেই । বাড়িওয়ালার টাকা পয়সার অভাব আছে বলে মনে হয় না। তবু কেন তিনি বাড়িটার এমন করুণ দশা করে রেখেছেন সেটি দেখে লোকে আশ্চর্য্য হয় বৈকি। তাছাড়া মালিক নাকি অনেক বড় শিক্ষিত প্রফেসর। পাড়ার নূরানী চেহারার নেতা মৃধা তাকে ডাকেন ‘পরফেসর’ বলে, যা শুনলে লোকে ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হাসে। এই মৃধা নিজেকে পুরন ঢাকার আতশখানার খান মোহাম্মাদ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা খান মোহাম্মাদ মৃধার বংশধর বলে দাবী করে। প্রফেসর সাহেব পুরন ঢাকার এই নোংরা গলিতে বাড়ি কিনে দীর্ঘদিন কেন বসবাস করছেন সে নিয়ে মৃধার মত পাড়ার লোকের মনেও অনেক প্রশ্ন আছে। প্রফেসর অবশ্য এসব কথার তোয়াক্কা করেন না। তিনি নিচতলার কলাপসিবল গেইট বন্ধ রেখেই দিনের পর দিন বাড়ির ভেতরে বসে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি তার বাড়িতে সিড়িঘর পেরিয়ে দোতলায় কেউ উঠতে পেরেছে এমনটাও কেউ কখনও শোনেনি বা দেখেনি। তবে কালে ভদ্রে দু একটা ছেলেপুলে যে একেবারে আসে না তাও কিন্তু নয়। ওরা ভুউস করে ভেতরে ঢোকে আবার ভুউস করে বেরিয়ে যায়। আমিই একমাত্র ব্যক্তি যার কিছুক্ষণ এ বাড়িতে থাকার অধিকার আছে। কেন? সে প্রশ্ন করলে হয়ত বিব্রত বোধ করতে পারি আমি। তবে যতটুকু না বললেই নয়, সেটুকু নিশ্চয়ই বলবো। 

এ বাড়িতে দুজন মানুষ আর পাঁচটা বিড়াল আছে। একটা মা বিড়াল আর তার চার বাচ্চা। বিড়ালগুলোর সার্বক্ষণিক দেখাশুনা করে নান্না বাবুর্চি। ‘বিড়াল বাড়ি’ বললে গলির মুখের যে কোন রিকশাওয়ালা পর্যন্ত বলে দিতে পারে কোন বাড়িতে যেতে হবে। আজ কড়া রোদ উঠেছে বলে নান্না বাবুর্চি ভ্যাপসা তোষকগুলো ছাদে মেলে দিচ্ছিলো। প্রফেসর তখন বসার ঘরে কম্পিউটারে বসে লিখছিলেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ করলেন বিড়ালগুলো ছাদের দিকে মুখ করে গলাটান করে হেড়ে গলায় নিষাদে গলা তুলে কাঁদছে। ওয়াও......ওয়াও...যেন মধ্যদুপুরের চক্করে পড়ে মাথা ঘুরছে ওদের। একটা থামেতো আরেকটা শুরু করে। এই সমস্বর কান্না শুনে প্রফেসর বিরক্ত হন। নান্না বাবুর্চিকে ডেকে ধমকের সুরে বলেন; ‘লিখছি দেখতে পাচ্ছো না? যাও ওদের খেতে দাও’। সামান্য শ্বেতী রোগী নান্না বাবুর্চী চোখের সাদা পাপড়িগুলো পিটপিট করে অবাক চোখে বিড়ালগুলোর দিকে তাকায়। একটু আগেইতো মাছের কাঁটা আর ভাত খেয়েছে। যা দেয়া যায় তাই খায়। সর্বভুক যাকে বলে আর কি। আর তাছাড়া ওদের মধ্যে ঝগড়াঝাটিও কিছু হয়নি। একটা আরেকটাকে আঁচড় বা কামড়ও দেয়নি। তাহলে এই অসময়ে এমন অসভ্যতা কেন? নান্না হুস্‌ হু্‌স করে ওদের ছাদের দিকে তাড়াবার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুতেই ওরা যেতে চায় না। গলার ভেতর থেকে ঘড় ঘড় শব্দ তুলে নান্নার পায়ের কাছে ঘুরঘুর করতে থাকে। নান্না তখন ছাদ থেকে তুলে আনা লতানো পুঁই দিয়ে ঘন ডাল রান্না করছিল। কাজের সময়ে এসব যন্ত্রণা ভাল লাগে? রান্নাঘরে গিয়ে পাতিলটা নামিয়ে রাখে সে। ফিরে এসে বিড়ালগুলোর দিকে ভাল করে তাকায়। এক, দুই, তিন,... চার। মোট চারটা বিড়াল। আরেকটা গেল কই? বড় মা বিড়ালটা নেই। একারণেই হয়তো ওদের এমন অস্বস্তি হচ্ছিল। ছাদের একদিকে কোনাচে করে ছায়া পড়েছে। সেদিকে তাকিয়েই নান্না শুনতে পায় নিচের গলি থেকে ভেসে আসা হালকা কোলাহলের শব্দ। রিকশার টুং টাং আর ফেরীওয়ালাদের হাঁক ছাড়িয়ে কোলাহলটা ক্রমশ বাড়তে থাকে। এর কিছুক্ষণ পরই জমির মৃধার প্রচন্ড হুংকার শোনা যায়...... 

বাড়ির কলাপসিবল গেটের সামনে এ বাড়ির সবচেয়ে বড় বিড়ালটি ৎ’র ভঙিতে মরে পড়ে আছে। শরীরের কোথাও কোন রক্তের ছিঁটেফোটা নেই। সাদা ধবধবে মোটাতাজা বিড়ালটা। শুধু মাথার মাঝখানে চিলি’র ম্যাপের মতন ভরাট লম্বা কালো দাগ। রোদে চকচক করছে সেটা। মাথাটা মাটির দিকে একটু থেতলে গেছে। পাড়ার সমিতির চেয়ারম্যান আর গলির মুখের রিকশা গ্যারেজের মালিক জমির মৃধা তখন ঐ পথ দিয়েই হেঁটে যাচ্ছিলেন। রাস্তার ডানদিকে স্তুপিকৃত ময়লায় পা রাখতে গিয়েই তার ঘেন্না হলো। পা টা সামান্য উচিয়েই বায়ের দিকে মোচড় নিলেন তিনি। আর তক্ষুনি মরা বিড়ালটা চোখে পড়ল। পাড়ার সমিতির উদ্যোগে একজন মেথর রাখা হয়েছে। প্রতিদিন সকালে গলির দুপাশের ড্রেনগুলো পরিষ্কার করার দায়িত্ব তার। কিন্তু আজ সে অনুপস্থিত। মরা বিড়াল দেখে মৃধার মেজাজটা খিঁচে গেল। দিন দিন এলাকার পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠছে। গলির মুখে চায়ের দোকানের আশেপাশে সারাক্ষণই রিকশাওয়ালাদের ভীড় লেগে থাকছে। ‘রাহুল ইলেট্রিক’ দোকানের সামনেও চলছে অনবরত আড্ডা। প্লাস্টিকের বাক্স, খালি সিগারেট, ম্যাচ বাক্স, কলার ছোকলা সবই এই ড্রেন দিয়েই যাতায়াত করে। আবার বাচ্চা কাচ্চারা সুযোগ পেলেই ন্যাংটা হয়ে ড্রেনেই হাগতে বসে যায়। রাস্তার দুপাশে মাঝে মাঝেই খুঁজে পাওয়া যায় দলা দলা গু। আর রিকশাওয়ালাদেরও দেখা যায় লুঙি তুলে দ্রুত প্রস্রাব সেড়ে ফেলতে। ভদ্রগোছের কেউ হেঁটে যাবার সময় ড্রেনের দূর্গন্ধে ‘থু...হ’... বলে নিজের অজান্তেই থুথু ফেলতে ফেলতে হেঁটে যায়। এই হলো হাজারীবাগের এই গলির প্রতিদিনের দৃশ্য। আজও সেসব দেখতে দেখতেই জমির মৃধা প্রফেসর আজিজের বাড়ির সামনে এসে থেমে পড়েছিল। তারপর মরা বিড়াল দেখে চিৎকার করে ডাকতে লাগলো.. 

‘পরফেসর, তোমার বিলাইতো মইরা গ্যেছে...ঐ মিয়া পরফেসর...ঘরের ভিত্‌রে হান্দায় আছো ক্যালা? দ্যেখবার পারতাছোনা? হা...লা সিক্ষিত বাঙাল...পুরান ঢাকায় ক্যালা যে হান্দাইছে...! ঐ মিয়া পরফেসর...এম্বুলেঞ্ছ ডাকন লাগবো নাকি...কই গেলা পরফেসর...?

জমির মৃধার চিৎকার শুনে ততক্ষণে লোকজন জড় হয়ে গেছে। সবাই মাটিতে লুটিয়ে থাকা মৃত ৎ বিড়ালটাকে ঘিরে ফেলেছে। না হলেও আট- দশ ইঞ্চি লম্বা লোমশ স্বাস্থ্যবান বিড়াল। এমনি এমনি ছাদ থেকে পড়ে গেল? নাকি কেউ ফেলে দিল? নাকি সে নিজেই আত্মহত্যা করলো? লোকজন বিড়ালটাকে ঘিরে সেসব বলাবলি করছিল। একজনতো রীতিমত আঙ্গুল ডুবিয়ে টিপে টিপে দেখছে, সত্যিই মরেছে কিনা। মুখে চুক চুক শব্দ করে কেউ বলছে, আহা বেচারা পরফেসরের ...বিলাই মরছেনাতো, যেন হ্যার জান মরছ্যে... 

জমির মৃধা মানুষ চরিয়ে খাওয়া লোক। সে ভীড়ের লোকদের চিৎকার করে বলে...

‘খানকির পোলারা, ভীড় করছস ক্যালা? হউর বাড়ি পাইছস? বিলাইইতো মরছ্যে। মানুসতো মরে নাই... ভাগ...কইতাছি...’

লোকজন তারপরও একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেটের ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে তামাসা দেখে। কেউ ঠাট্টা করে বলে; রাস্তাঘাটে কত কুত্তা বিলাই মরে পড়ে থাকে, কেউ দেখেনা। আর এই বিড়ালেরতো সোনার কপাল। ‘মানুষের চেয়েও কত বেশী আদর যত্ন পেয়ে তারপর মরেছে, এর জন্য জানাজা পড়া দরকার’.....বলে ভীড়ের মধ্যে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে থাকে এক লোক... আরেক অল্পবয়েসী চোরও সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তার বহুদিন ইচ্ছে ছিল একটা বাচ্চা বিড়াল চুরি করে। কিন্তু এই মা বিড়ালটার ভয়ে আর সাহস করে নি। একজন তাকে চিনতে পেরে ঘার ধরে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলো। বেচারা ছিচকে চোর! মরা বিড়ালটা পর্যন্ত দেখতে পেলো না। 

প্রফেসর আজিজ তখন লেখা বন্ধ করে কম্পিউটার থেকে উঠে সবে লুঙি কোমড়ে পেচিয়ে ডাইনিং রুমে উঠবস করবেন ভাবছিলেন। এটা তার প্রতিদিনের হালকা শরীর চর্চার অভ্যাস। সাতচল্লিশবার উঠ-বস করে তারপর যোগাসনে বসেন। ঠিক তক্ষুণি নান্না বাবুর্চি দৌড়ে এসে বললো ‘মামা, জলদি নিচে যান’...জমির মৃধা আসচে... 

আজিজ সাহেব লুঙি আর গেঞ্জি পড়া অবস্থাতেই হন্তদন্ত করে দোতলা থেকে নিচে নেমে এলেন। কোলাপসিবল গেইটটা চব্বিশ ঘন্টা তালা বন্ধ থাকে। চাবি দিয়ে সেটি তাড়াহুড়ো করে খুলেই দেখলেন মা বেড়ালটা রাস্তায় মরে পড়ে আছে। কুঁজো হয়ে দুহাতে খপ করে বিড়ালটাকে বুকে তুলে নিলেন তিনি। তারপর ধপাস করে রাস্তাতেই বসে পড়লেন। বিড়ালের পায়ের নিচের নরম মাংসপিণ্ডগুলো ডান হাতের আঙুল দিয়ে ঘসতে ঘসতে করুণ স্বরে ডাকতে লাগলেন, ...ওরে আমার বল্টুরে...বল্টু...

প্রচন্ড কষা চোখে রোদে পুড়ছিলেন প্রফেসর। জমির মৃধা তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন...‘আরে বিলাই মরসেতো কি হইছে? মহল্যার মাইনসের দুনিয়ার সমস্যা। কারো বিমার লাগছে, বিয়া লাগছে, পুলাপাইন হইছে, কয়ডা সমস্যা সামাল দিবেন মিয়া; এলা বিলাই বুলাই ছাইড়া দেন, ভাইসাব...

লোকজন মুখ টিপে হাসতে হাসতে ভীড় ছেড়ে সরে যেতে থাকে । কেউ কেউ ভাবে মৃধাকে কপচায় ধরে এমন বুকের পাটা এ গলিতে কার আছে? কারো নেই...



আমি অন্তু। প্রফেসর আজিজ সম্পর্কে আমার পাড়াত মামা। নরসিংদীর পলাশে আমাদের বাড়ি। প্রফেসরের বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি। তিনি রানীর দেশে পিএইচডি করতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে আবার আমেরিকাতেও গিয়েছিলেন। পড়াশুনা করতে করতেই উনার যৌবন চলে গেল। চিরকুমার থেকে গেলেন তিনি। একসময় অধ্যাপনা করতেন। দেশে ফেরার পর ভাল চাকরীর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কি কারণে যে এই পুরনো ঢাকাতেই গা ঢাকা দিলেন, কেউ জানেনা। গ্রামের সাথে তার কোন যোগাযোগ নেই। পুরন ঢাকার এই গলির লোকজন ছাড়া কেউই আজকাল আর চেনেনা তাকে। তবে এলাকার মানুষ ভুরু কুঁচকে তাকায়। বোঝার চেষ্টা করে। হয়ত ভাবে; এমন একটা মানুষেরতো এমন পরিবেশে থাকার কথা নয়! আর পাড়ার সর্দার জমির মৃধা তাকে গলি থেকে তাড়াবার জন্য জনে জনে বলে বেড়ায় ‘হা...লা ঘুঘু মাল, আম্‌রিকার দালাল’। 

আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। এই বুড়ো ছাড়া এ শহরে পরিচিত কেউ নেই আমার। হলে থাকি। মাঝে মধ্যেই টাকা পয়সার টান পড়ে। রুমমেটদের কাছে আর কত হাত পাতা যায়। আমার জন্মের পর পরই কঠিন অসুখে পড়ে বাবা মারা যান। তখন এই দূর সম্পর্কের আত্মীয় লোকটা মাকে টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। বিনিময়ে মা’কে কতটা ছাড় দিতে হয়েছিল সেটা ঠিক বুঝতে পারিনি তখন। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যা ঘটনার পর ইনি আমাদের বাড়িতে বেশ কিছুদিন লুকিয়ে ছিলেন। তখন একটা বড় টেলিভিশনও কিনে দিয়েছিলেন আমাদের। লাটিম আর মার্বেল ছাড়া আমারতো খেলার কিছু ছিল না। তাই এই টেলিভিশনটা নতুন একটা জগত দেখিয়েছিল। ‘ম্যাকগাইভার’ আর ‘টার্মিনেটর টু’ নিয়মিত দেখতাম। একবার মা আর আমি উনার সঙ্গে শিশুপার্ক বেড়াতে গিয়েছিলাম। উনারা দুজনে মিলে সেদিন সবুজ আইসক্রিম খেয়েছিলেন চেটে চেটে। এমনকি মায়ের বিছানাতেও উনাকে শুয়ে থাকতে দেখেছি। সেই দৃশ্য এখনও আমার চোখে লেগে আছে। মা তখন কত হাসিখুশী ছিলেন। ধীরে ধীরে সেই মুখটা কেমন করে যেন নিস্প্রভ হয়ে গেল। আর এই লোকটাও আমাদের বাড়িতে যাতায়াত বন্ধ করে দিলেন। 

আমি যখন পুরন ঢাকার ঐ বাড়িতে যাই নান্না বাবুর্চি তখন রাজ্যের খবর নিয়ে হাজির হয়। কথা বলার জন্য ছটফট করতে থাকে। মামার সাথে তেমন একটা সখ্যতা নেই তার। শেষবার যখন আমি মামার বাড়িতে আসি,‌ তখনও জমির মৃধার সাথে মামার তুমুল দ্বন্দ চলছিল। বিষয় একটাই। গতবছর কে বা কারা মধ্যরাতে মামার শোবার ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দাটায় তিন ড্রাম ড্রেনের মলমূত্র ফেলে দিয়ে গিয়েছিল; সেই থেকে দুজনের মধ্যে শত্রুতা। মামা’র ধারণা, একাজ মৃধাই কাউকে দিয়ে করিয়েছে। পাড়ার লোকজন ‘শিক্ষিত ভদ্রলোক’ বিবেচনায় তার কাছে দুচারটা পরামর্শ নিতে আসতো। আর সেটিই পছন্দ ছিলনা না মৃধার। ঘটনার দিন বিকট গন্ধে সারা বাড়ি যখন তোলপাড় তখন শত অস্বস্তি সত্ত্বেও সেই ময়লা নিজের হাতে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করেছিলেন মামা। এমনকি নান্না বাবুর্চিকেও হাত লাগাতে দেননি। বালতির পর বালতি পানি ঢেলেছিলেন তিনি। সেকি দূর্গন্ধ! নাড়িভূড়ি উঠে আসার জোগাড়! চার বাড়ি পর্যন্ত সেই দূর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। পাশের বাড়ির মহিলারা রান্না ঘরের পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেই দৃশ্যটি দেখেছে আর সারা পাড়া রটিয়েছে। থানা থেকে পুলিশ এসে যখন তদন্ত করছিল, তখন মিসেস শওকত আমাকে তাঁর বাড়ির সামনে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি এ বাড়ির কে হই। উনি চা-বিস্কুট খাবার জন্যে তার ঘরেও আমন্ত্রণ করেছিলেন। কিন্তু আমি যাইনি। যদিও গলির মুখের চায়ের দোকানে মামার নামে বাকি রেখে চা খেয়ে ফেলেছি অনেক। একথা এখনও কেউ জানে না। 

ময়লা ফেলার এই ঘটনার পর সেই প্রথম মৃধাকে পিটিয়ে মেরে ফেলার ইচ্ছা হয়েছিল প্রফেসরের। লাইসেন্স করা একটা পিস্তলও আছে তাঁর বাড়িতে। কিন্তু সেটা দিয়েতো আর মৃধাকে প্রকাশ্যে মেরে ফেলা যাবে না। তাছাড়া প্রমাণ কই, যে কাজটা মৃধাই করেছে? তবে ঘটনার রেশ এখনও কাটেনি। মৃধাকে চোখের সামনে দেখলেই রক্ত মাথায় উঠে যায় প্রফেসরের। প্রবল প্রতিশোধের ইচ্ছা জাগে। 

ওদিকে গলির মুখে মৃধার রিকশা গ্যারেজ আর তার পেছনের মেস নিয়ে লোকজন প্রায়ই আপত্তি তুলতো। গাঞ্জাখোর লোকজনের আনাগোনা, তাসের আড্ডা এসব বন্ধ করতে প্রফেসরের কাছে গিয়ে তারা অভিযোগও করেছে অনেকবার। প্রফেসর মৃধাকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও সে কোন কথাই আমলে তোলেনি। বরং উল্টো দুই সাগরেদ কুস্তিগীর শামু আর গামুকে প্রফেসরের বাড়িতে পাঠিয়ে শাসিয়েছে। শামুকে প্রফেসর দরজার ভেতরে ঢুকতে দেয়নি বলে সে রেগেমেগে গলির মানুষকে শুনিয়ে শুনিয়ে চিৎকার করে বলেছে; ‘ঐ মিয়া পরফেসর, বে......সী বাড়াবাড়ি করলে কিন্তু তর নল্যি কাইট্যা...নেহারী বানায়া কুত্তারে দিয়া খাওয়ামু, বুঝছস?

গুন্ডাবাহিনী লেলিয়ে মৃধার দেয়া হুমকি হজম করা মামার পক্ষে কঠিন ছিল। তারপরও মামা নীরবই ছিলেন অনেকদিন। কিন্তু বিড়ালের মৃত্যুর পর ঘটনা চূড়ান্ত শত্রুতার দিকে মোড় নেয়। তিনি প্রায় শতভাগ ধরেই নেন যে এটা মৃধারই কাজ। আজ একটা বিড়াল মেরেছে কাল আরেকটা মারবে। পরশু তাকে শুদ্ধ তুলে নিয়ে যাবে। প্রফেসরের ধারণা, এলাকায় এতদিন থাকার পরও মৃধা তাকে ঠিক মেনে নিতে পারছে না!! তাঁর প্রতিটা কথা কানে ভো ভো করে বাজে। ...’এল্যা বিলাই বুলাই ছাইড়া দেন বাইসাব...। মাইয়া লাগলে কন বিসরায়া দিতাছি...।’


মৃত বিড়ালটির নাম ছিল বল্টু। একবার নিচের গলিতে রাস্তা পেরুতে গিয়ে গাড়ির নিচে চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে গিয়েছিল সে। তখন পশু হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর ভর্তি ফর্ম পূরণের জন্য ওরা একটা নাম চাইলো। প্রফেসর আজিজ তখন জাতির পিতাকে স্বরণ করে ওর পুরো নাম রেখে দিলেন শেখ বল্টু রহমান। মামা বলতেন, এই নাম ভুলে যাবে এমন তাগদ নাকি কোন বাঙালীর নেই। ডাক্তার তখন প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এতো মেয়ে বিড়াল। এর এমন পুরুষ নাম হয় কি করে?’ মামা তখন রেগে গিয়ে বলেছিলেন, ‘নামের আবার নারী পুরুষ কি? যা বলছি, তাই লিখুন’। বিড়ালের প্রতি এত ভালোবাসা দেখে ডাক্তার আর কথা বাড়াননি।

সেইদিনই আমি প্রথম লক্ষ করেছিলাম বল্টুর চোখের মণি দুটো অনেকটাই মানুষের চোখের মতন। ধূসর বর্ণচ্ছটায় গভীর সেই তাকানো। ডাক্তারের হাতে ধরা টর্চ লাইটের কৌণিক আলোকরশ্মি পড়ে চিকচিক করছিল দৃষ্টিটা। মামা সেদিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন, যেন তীব্র একটা ব্যথা অনুভব করছিলেন। দুজনার মধ্যে কি এক অজানা ভাষায় কথা হচ্ছিল, সেটা টের পাওয়া যাচ্ছিল। আমার এই বেশী বেশী টের পাওয়াটা মামার অসহ্য লাগত। এমনকি ঐ বাড়িতে আমার ঘন ঘন যাতায়াতও তার অপছন্দ ছিল। যদিও ছেলেবেলায় তিনি আমাকে যথেষ্ট আদর করতেন। তখন অবশ্য মায়ের সাথে তার সখ্যতাটাও অন্যরকম ছিল। এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। তাই বিড়ালের এই অদ্ভূত নামকরণ নিয়ে কিছু বলার সাহস করিনি। তবে মনের মধ্যে একটা সন্দেহ রয়েই গিয়েছিল। সত্যিই কি উনি বঙ্গবন্ধুকে ‘নারী-পুরুষ’, ‘জাত-ফাত’ সবকিছুর উর্ধ্বে ভালোবাসেন? নাকি সব কিছুই ভন্ডামী! 

সে সময়ে বল্টু অনেক ভয়ংকর ছিল। যখন তখন ইচ্ছে হলেই খামচে, কামড়ে রক্ত বের করে দিত। ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করতো। সময় মত খাবার পেটে না পড়লে ছাদে বসে আকাশ দেখতে দেখতে হঠাৎই নিরীহ চড়ুইগুলোকে শিকার করতে শুরু করত। বিশেষ করে চার বাচ্চা হবার পর তার মেজাজ মর্জি একেবারেই বিগড়ে গেল। তবে মামা গায়ে হাত বোলালে আহ্লাদে সে ঘরঘর আওয়াজ তুলতো। একবার জিন্নাহ নামের এক উর্দুভাষী চল্লিশোর্ধ লোক সালেহা হাই স্কুলের পঞ্চম শ্রেনীর একটা বাচ্চা মেয়েকে ক্যান্টিন ঘরের পেছনে নিয়ে গিয়ে তার পুরুষাঙ্গ দেখিয়েছিল। এই নিয়ে সারা পাড়া হৈ চৈ। শেষে মৃধার সহযোগিতায় পাড়ায় সভা ডাকা হলো। সেই সভায় মামা বল্টুকে নিয়ে হাজির হলেন। তাতে পুরান ঢাকার নামাজী লোকজন বেশ নাখোশ হলো। কুত্তা-বিলাই নাপাক জিনিষ, এসব নিয়ে কেউ জনসভায় যায়? প্রফেসরের কোলের মধ্যে বসে বিশাল সাইজের বল্টু শান্তভাবেই সভা দেখছিল। কিন্তু মৃধা যখন কটমট করে ওর দিকে তাকাতে শুরু করল ঝামেলাটা সেখান থেকেই শুরু হলো। বল্টু ঘর ঘর শব্দ তুলতে তুলতে এক পর্যায়ে জিন্নাহকে কাছে পেয়ে খামচে রক্তাক্ত করে দিল। এরপর থেকে গলির লোকজন মোটামুটি ধরেই নিয়েছে যে সুযোগ পেলেই বল্টুকে পিটিয়ে মেরে ফেলবে মৃধা। 

এঘটনার পর থেকে বল্টু হয়ে গেল এই গলির বিড়াল সর্দার। যেই তাকে দেখে সেই ভয় পায়। এমনকি ছোট বাচ্চারা পর্যন্ত বল্টুর ধারে কাছে ঘেষে না। প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময়ে প্রফেসরের বাড়ির ছাদে বিড়ালদের নিয়মিত সভা বসে। আশেপাশের বাড়িগুলো থেকে, এমনকি মিসেস শওকতের বাড়ির বিড়ালটা পর্যন্ত সময়মত ছাদে উপস্থিত হয়। মামা প্রায়ই বিড়ালসভার জন্য মাছ-মাংসের ব্যবস্থা রাখেন। এই দৃশ্য দেখলে আমার ইচ্ছে হয় ছালার বস্তায় ভরে বিড়ালগুলোকে চাংখারপুলে ফেলে দিয়ে আসি। আমি শালা ঢাকা শহরে থেকে এক বেলা ঠিকমত খেতে পাই না আর বুড়োটা কিনা মাছ মাংস খাইয়ে বিড়াল পোষে! 



পশ্চিম দিকে রোদটা ঢলে পড়েছে। গলির উঁচু বাড়ির ছাদগুলো ফিকে হলুদ রঙে ডুবে গেছে। প্রফেসর আজিজ গায়ে চাদর জড়িয়ে রোদচশমায় চোখ ঢেকে ছালার ব্যাগ হাতে হনহন হেঁটে চলেছেন গলির মুখের দিকে। নান্না পেছন থেকে স্পষ্ট দেখতে পেল প্রফেসরের হাতের ব্যাগটা কলবল করছে। মামা বোধহয় বিড়াগুলোকে ফেলতে যাচ্ছিলেন। বিড়াল ফেলাতো আর মুখের কথা না। ওরা ঠিক ঠিক বাড়ি চিনে ফিরে আসবে। কিন্তু না, লোকজন যেন দেখে না ফেলে সেজন্য মামা নিজেকে আড়াল করছিলেন। রিকশা স্ট্যান্ডে ঢুকেই তিনি উঠোনের এক দিকে থরে থরে সাজানো রিকশাগুলোর পেছনে গিয়ে ছালার ব্যাগটা খুলে দিলেন। ছাড়া পেয়ে বিড়ালগুলো ভো দৌড়ে মৃধার বাড়ির মূল ফটক দিয়ে ঢুকে পড়ল। চারদিকের কোলাহল, রিকশার টুং টাং শব্দ আর চায়ের কাপের খটখট আওয়াজের ভেতর ঘটনাটি কেউ লক্ষ করল না। ব্যাগটা সেখানেই ফেলে রেখে প্রফেসর একটু দূরে চায়ের দোকানের দিকে হাঁটতে লাগলেন। মৃধা তখন চোখে সুরমা দিয়ে আর গায়ে আঁতর মেখে খোশমেজাজে টঙে বসে রিকশাওয়ালাদের কাছ থেকে জমার টাকা তুলছিল। প্রফেসরকে দেখে সেতো অবাক!! মেহদী লাগানো ছাগলা দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে এগিয়ে এসে বললো; ‘আরে মিয়া পরফেসর যে! কি সৌভাগ্য আমার! বলে হাত ধরে প্রায় টানতে টানতে প্রফেসরকে নিয়ে গেল তার বসার ঘরে।

দোতলা বাড়ি। সাদা আর কলাপাতা রঙের দেয়াল। বারান্দার সাথে লাগোয়া বসার ঘর। সেখানে ভারী ভারী সেগুন কাঠের সোফা আর বড় বড় ফুলপ্রিন্টের সোফা কভার। ঘিয়া রঙের পাঞ্জাবী, চেক লুঙি আর টুপি পড়ে আছে মৃধা। প্রফেসরকে দেখে তার একটু বিভ্রান্ত লাগছিল। মনে মনে হিসাব মেলাবার চেষ্টা করছিল সে, যে ব্যাটা ঘর থেকেই বেরোয় না সে কিনা আজ তার বসার ঘরে? মতলব কি বোঝার চেষ্টা করে সে। কিন্তু কোনই কূল কিনারা পায় না। প্রফেসর সোফায় বসতে না বসতেই হঠাৎ আলোটা নিভে যায়। প্রতিদিন এমন লোডশেডিং এ গলিতে এখন নিত্য দিনের ব্যাপার। মৃধা বিদুৎ-সঞ্চিত টিউবলাইটটা জ্বালিয়ে দেয়। তারপর চারদিক তাকিয়ে দেখে সব ঠিকঠাক আছে কিনা। মৃধার চোখে প্রফেসরের লম্বাটে মুখটা কেমন ধোঁয়াটে আর রহস্যময় দেখায়। গরমের মধ্যে প্রফেসর এমন চাদর গায়ে জড়িয়ে আছে কেন? অন্ধকারে অস্পষ্ট কিছু খচখচ আওয়াজ শুনতে পায় সে। গোঁফের মতন যেন কয়েকটা সুতো উড়ে বেড়াচ্ছে বাতাসে। অন্ধকারে গোঁফগুলো নড়ছে। ঠিক তক্ষুনি ভরাট কন্ঠে ক্ষুধার্ত বিড়ালের ম্যাও ম্যাও আর্তনাদ। যেন সে ভুল শুনছে। শব্দটা পাশের বাড়ি থেকে আসছে কি? আবার মনে হয়, নাহ, ছাদ থেকে হয়ত আসছে। এ বাড়িতেতো কোন বিড়াল নেই। তাহলে? মৃধা এবং তার স্ত্রী দুজনই দুবার হজ্ব পালন করেছে। কুকুর, বিড়াল, এমনকি যে কোন প্রাণীই এবাড়িতে আনা নিষিদ্ধ। এমন কড়া পরিবেশে বিড়ালের কান্নার শব্দ আসবে কোথা থেকে? মৃধা পাঞ্জাবীর গলার ফাঁক দিয়ে বুকের ভেতরে লম্বা একটা ফুঁ দিয়ে ভয় দূর করার চেষ্টা করে। ধার্মিক মানুষ। হয়ত জ্বীন ভূতে বিশ্বাস করে। ভয়ে ভয়ে প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করে;

‘বিড়ালের কান্না হুনবার পারতাছেন পরফেসর’?

‘নাহ! কিসের বিড়াল’?

‘আরে ম্যাও ম্যাও করতাছে! হুনবার পারতাছেন না? আবে বাইসাব.. আপনে কি কালা ন্যাহি?

প্রফেসর তখন কানে তুলা মেরে বসে ছিলেন। সবুজ রঙের দেয়ালে পানের পিকের দাগটা গভীর মনযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন। মাথার উপর কারুকার্যখচিত পাখাটায় ঝুলে থাকা ধূলোর প্রলেপগুলো কালচিটে হয়ে আছে। খাঁটের কোনায় সাদা-কালো চারটা বিড়াল যে চকচকে চোখে মৃধার দিকে ঝাপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সেদিকে কড়া নজর ছিল প্রফেসরের। সবই যেন ছিল প্রত্যাশিত। মুহুর্তের মধ্যেই বিড়ালগুলো ঝাপিয়ে পড়ে মৃধার উপর আর সমানে নখ দিয়ে ওর চোখ মুখ, গলা, বুক চিড়তে থাকে... 

মৃধা যখন আ... আহ... শব্দ করে ব্যাথায় চিৎকার করছিল ঠিক তখনি বাইরে থেকে দরজায় খট খট কড়া নাড়ার শব্দ শোনা গেল... 

দরজাটা খু্লেই প্রফেসর দেখতে পান গোলগাল নাদুস নুদুস পাচ ফুট দুই ইঞ্চির নান্না বাবুর্চি চোখের সামনে ক্লান্ত ভঙিতে দাঁড়িয়ে হাপাচ্ছে... 



গলির মোড়ে চায়ের দোকানে ছোটখাট একটা জটলা বেঁধেছে। নান্নাও উপস্থিত সেখানে। সবার মনে একই প্রশ্ন। মৃধাকে এমনভাবে বিড়ালগুলো কামড়ালো কেন? 

কথাবার্তার এক পর্যায়ে দোকানদার নান্নাকে প্রশ্ন করলো; ‘ঐ বাড়িতে পৌছানোর পর তুমি কি দেখলা’? 

‘দেখলাম মামার চোখ দিয়ে তখনও আগুনের হলকা বেরুচ্ছে। বিড়ালগুলোর দিকে তিনি কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। যেন নির্দেশ দিচ্ছিলেন কিছু। বিড়ালগুলোকে একদম বাঘের মতন লাগছিল! গায়ের লোমগুলো ফুলিয়ে রাখাতে ওদের দ্বিগুণ বড় দেখাচ্ছিল। নিজেদের মধ্যে ওরা গড়গড় করে কথা বলছিল। মামা বোধহয় সেটা বুঝতে পারছিলেন। আরো দেখলাম মৃধা মাটিতে শুয়ে ব্যাথায় কাঁতরাচ্ছে আর ওর ঘিয়া পাঞ্জাবীটা রক্তে ভিজে চুপচুপ হয়ে গেছে। জ্ঞান যায় যায় অবস্থা। ঐ অবস্থাতেই মৃধা পেছনের দরজাটা সামান্য ফাঁক করে কোনমতে শরীরটাকে টেনে নিয়ে পালিয়ে গেল। আর প্রফেসর আমার চোখের দিকে সূঁচ দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রচন্ড রেগে গিয়ে ধ্মক দিয়ে বললেন, ‘তুই এখানে কি করিস? যা এখান থেকে!’ ধমক খেয়ে আমি দৌড়ে পালিয়ে এলাম। 

‘কস কি? দোকানদার বিস্ময়ে নান্নার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আহা বেচারা মৃধা। তাকে নাকি হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। চোখ মুখ খামচে একাকার করে দিয়েছে বিড়ালগুলো। শুনলাম সুস্থ হয়েই মৃধা প্রফেসরের নামে মামলা করবে। কথা কি সত্যি?’

রাহুল ইলেক্ট্রিকের মিস্ত্রী কালাম উত্তেজিত হয়ে বললো, ‘সেইডাই কি করা উচিত না? এই পরফেসর হালার পো’র আমগো পাড়া থিক্যা বিদায় হওন দরকার। মাগার একটা বিসয় কইলাম আমার কাছে অহনও কিলিয়ার না।

‘কোন বিষয়?’ নান্না প্রশ্ন করলো

‘বড় মা বিড়ালডরে মারছে ক্যাডা? তুমার কি মনে হয় ঐডা মৃধা মারছে?’ কালাম প্রশ্ন করলো।

‘আমি ক্যামনে বলবো? আমারে জিগাও ক্যান?’ নান্না উত্তর দিল।

কালাম খুব সন্দেহের চোখে ভুরু কুঁচকে ফিসফিস কন্ঠে সবাইকে বলে; ‘আমার কাছে কইলাম আরেকখান খবর আছে’। বলে একটু দম নেয় সে। তারপর বলে, ‘আমার বিবির কাছে মিসেস শওকত কইছে, ঢেউ খেলানো চুলের সুন্দর চেহারার একটা পোলারে সে পরফেছরের বাড়ির ছাদ থিক্যা বিলাই ফালাইতে দ্যাখছে...’

নান্না ভুরুজোড়া কপালে তুলে চোখ বড় বড় করে হা করে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ,...তারপর বলে,‘অন্তু...... ! কিছুতেই যেন বিশ্বাস হয়না তার। আবার পুরোটা ঠিক অবিশ্বাসও করতে পারেনা।



এই ঘটনার ছ’মাস পর প্রফেসরের বাড়িতে রঙ করা শুরু হয়েছে। শিকড়-বাকড় উপরে ফেলাতে লাল ইটগুলো ঝকঝক করছে। কোলাপসিবল গেইটটা ইদানিং প্রায়ই খোলা থাকছে। যদিও এখনও ওবাড়িতে তেমন কেউ একটা যাতায়াত করে না। অন্তু ছাদের উপর বাগান করতে শুরু করেছে। ছাদের এক কোনায় মাচা করে এলিয়ে দিয়েছে লাউ-শিম আর ঝিঙ্গের ডগা। বেগুন গাছের পাতাগুলোকে ঠোঁট দিয়ে সেলাই করে টুনটুনি পাখি বাসা বেঁধেছে। টুনটুনির দুটো ছানা হয়েছে। এখনও ওরা চোখ মেলতে শেখেনি। শুধু হাঁ করে চীঁ চীঁ শব্দ করতে শিখেছে।

প্রফেসরের বিড়ালগুলো দূর থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে টুনটুনির ছানাগুলোকে। 

২টি মন্তব্য:

  1. দারুণ একটা গল্প। গল্পের ভিতরে গল্প। এক গল্প যেন গড়িয়ে যায় আরেক গল্পে। কিন্তু ক্লান্তি আসে না, উত্তেজনায় অনায়াসে শেষে পৌঁছে খুঁজতে থাকি কে করল, কি ঘটল এইসব। উত্তর লেখা নেই দেখে যে খারাপ লাগছে তাও নয়।
    কি অদ্ভুত বর্ণনা - গলি, গলির পাশের ড্রেন - এমন জীবন্ত বর্ণনা যেন সেই ঘিনঘিনে ড্রেনটা দেখতে পাচ্ছি। গল্পের সেটিং - পুরনো ঢাকার বর্ণনাটায় লেখকের মুন্সিয়ানা আছে। কিন্তু বর্ণনাভঙ্গীর চমককে ছাড়িয়ে গেছে বেড়াল, প্রফেসর, মৃধা, নান্না মিয়া - রহস্যজনক চরিত্রের বর্ণনায়।
    যেমন গল্প - তেমন সব চরিত্র। টানটান রহস্য আছে - কিন্তু কি একটা পরিমিতিবোধ আছে এখানে যে 'রহস্য' গল্পের ফরম্যাটে আটকে যায়নি এ গল্প। বরং অন্যরকম অচেনা এক যাদু আছে। এককথায় অসাধারণ!

    উত্তরমুছুন
  2. বিড়ালটা ৎ ভঙ্গিতে মরে পড়ে আছে তখন থেকে নতুন কৌতূহলে পড়ে গেছি...তারপর কোথা থেকে কীভাবে গল্পের ডালপালা মেললো! পুরনো ঢাকা, বেড়াল, বেড়ালের মৃত্যু, অন্তুর প্রফেসর বিষয়ক মনস্তত্ত্ব চমৎকার। আর শেষটা, যেখানে ভাবনার কোনো শেষ নেই। অবাক হই, কতভাবেই না গল্প বলা যায়!

    উত্তরমুছুন