মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য'র গল্প নীললোহিত

নীললোহিত 
মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য 

পাহাড় ঘেরা এই গ্রামে টুরিস্টের মাথা গোঁজার ঠাই সাকুল্যে একটাই। লপসাং লামার আস্তানা। কাঠের নড়বড়ে বসতবাড়িতে অতিথির জন্য বরাদ্দ দুটো মাত্র ঘুপচি ঘুপচি ঘর। বেশির ভাগ সময় অবশ্য ঘরদুটো ফাকাই পড়ে থাকে। কে আসবে এই দুর্গম জায়গায় ! অফিস কাছারি নেই, স্কুল-কলেজ নেই, গাড়ি-ঘোড়াও অপ্রতুল। সৌখিন ট্যুরিস্ট এদিক মাড়ায়।
তবে যারা জানার তারা জানে এই পাহাড়ে এখনও ফোটে দুষ্প্রাপ্য ব্লু বেরি ফুল। রংবাহারি অর্কিড আর বিরল প্রজাপতিও এই পাহাড়ের অন্যতম আকর্ষণ। সেই টানে কেউ কেউ আসে এদিকে। তবে একবার যারা আসে তারা আজীবনের সঞ্চয় সঙ্গে নিয়ে ফেরে। 

আজ দুপুরে একটা শেয়ারের জিপে এই দুর্গম গ্রামে এসে পৌছেছি। এখন পড়ন্ত বিকেলে লপসাংয়ের ঘরের একচিলতে বারান্দায় বসে বসে দেখছি পাহাড়ের রং কীভাবে বদলাচ্ছে, কেমন করে গোধুলির আকাশ জুড়ে বিস্তার লাভ করছে ঘন নীল সন্ধ্যা। সামনে দিয়ে চলে গেছে একটা পায়ে চলা পথ। সেই পথ ধরে জলকাদা ভেঙে গলায় বাঁধা ঘন্টির শব্দ তুলে সারিবদ্ধভাবে গ্রামে ফিরে আসছে গরু আর খচ্চরের দল। পথের বাঁকে জটলা করছে স্থানীয় লোকজন। দমকা হাওয়ায় কানে ভেসে আসছে তাদের হাসাহাসির শব্দ। 

দুপুরে যখন এসেছিলাম তখন আকাশে ছিল শুধুই আলোছায়ার খেলা। বিকেলে সেই রং বদলাতে থাকল। বেলাশেষে পশ্চিম আকাশে এখন শুধুই নীল জলরং। ময়ূরের গ্রীবার মতো, উজ্জ্বল, কিছুটা ভারী সেই বর্ণ। এদিকে বর্ষার মেঘেরা ভিড় জমাতে শুরু করেছে পশ্চিম আকাশে। ডুবন্ত সূর্যের আলো তাকে ধার দিয়েছে রক্তিম বিভা। সেই আভা ঠিকরে পড়ছে দূর পাহাড়ের চূড়োয়। পাহাড়ের নিচের অংশে ছায়া ঘনাচ্ছে ধীরে ধীরে। 

একটা কাঠের চেয়ারে দেশি মদের গেলাস হাতে বসে আছে লপসাং। থকথকে সাদা তরল। এর নাম আরা। লপসাংয়ের চোখে গোল ফ্রেমের চশমা। এতক্ষণ খবরের কাগজটা চশমার একেবারে কাছে এনে পড়ছিল। আলো কমে আসায় পেপারটা ভাঁজ করে রেখে দিয়েছে পাশে। কাসা আর তামা মেশানো গায়ের রং। শুয়োপোকার মতো মোটা ভুরু। পাহাড়ি মানুষদের এমন মোটা ভুরু সচরাচর দেখা যায় না। গেলাসে একটা চুমুক দিয়ে লপসা ভাড়া হিন্দিতে বলল, বর্ষাকাল হলে কী হবে, এ সময়েও যথেষ্ট ঠান্ডা থাকে এই পাহাড়ে। সন্ধের পর ঝপ করে তাপমাত্রা নেমে যায়। আর এক রাউন্ড চা খাবেন ? পালদেনকে বলি ? 

লপসাং গলা তুলে চা বানাবার নির্দেশ দিল পালদেনকে। মুখ থেকে হুকুম খসা মাত্র চায়ের জল চাপাতে ছুটল পালদেন। 

বিপত্নীক লপসাং একাই থাকে এই বাড়িতে। বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো পালদেনকে লপসাং আশ্রয় দিয়েছে। লপসাংয়ের গরু আছে। সেগুলো চরায় পালদেন। তাছাড়াও সে লপসাংয়ের ঘরগেরস্থালি সামলায়, হোম-স্টেতে অতিথি এলে তার খিদমত খাটে। রান্নাও করে চমৎকার। আর একটা গুণ আছে। চমৎকার মালিশ করার হাত পালদেনের। লম্বা পথ সফর করে আজ দুপুরে ক্লান্ত হয়ে এসে পৌছেছিলাম এই গ্রামে। বিকেলে মালিশ করিয়েছি পালদেনকে দিয়ে। শরীরের সমস্ত শ্রান্তি যেন উবে গেছে। মানতেই হবে জাদু আছে ছেলেটার হাতে। 

পালদেন চা করে নিয়ে এসেছে। ধোয়া উঠছে চায়ের গ্লাস থেকে। বড় একটা এনামেলের গ্লাস এগিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল, আগে আপনি কি কখনও এসেছেন এই গ্রামে ? চেনা চেনা লাগছে আপনাকে। 

- না। এই প্রথম এলাম। 

- ও আচ্ছা। পালদেন হেসে বলল, তাহলে আমারই ভুল। 

অন্যান্য শৈলশহরের মতো আনন্দের বাহ্যিক উপকরণের অভাব এই গ্রামে। এখানে মোবাইলের টাওয়ার আসে না। টিভি বা রেডিও নেই। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গেই ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়তে থাকে এই ছোট্ট গ্রাম। লপসাংয়ের সঙ্গে গল্প করছিলাম সময় কাটানর জন্য। লপসাং বলল, আপনার নামটা যেন কী ? 

নামটা একবার বলেছিলাম দুপুরে, ঘরভাড়ার টাকা অ্যাডভান্স দেবার সময়। লপসাং বেমালুম ভুলে গেছে নেশার ঘোরে। ফলে আবার বলতে হল, অভিজিৎ সেন। 

লপসাং বিব্রত হয়ে হাসল, বড় একটা অসুখ হয়েছিল। সেটার পর অনেক কিছুই মনে করতে পারি না। কখনও কখনও তো পালদেনের নাম পর্যন্ত খেয়াল থাকে না। 

- কী অসুখ হয়েছিল ? 

- স্ট্রোক। সময়মতো হাসপাতালে না নিলে বাচতাম না। তবে স্ট্রোকের আর দোষ কী। প্রেশার বেশি ছিল। নিয়ম করে ওষুধ খেতাম না। একদিন ঝট করে .. আসলে ড্রোলমা চোখ বোজার পর থেকেই আমার শরীরটা ভাঙতে শুরু করেছে। কিছুদিন পর বউ মারা গেল। এখন একেবারে একা হয়ে গেছি। কিছুই ভাল লাগে না। বাঁচতেও ইচ্ছে করে না। 

- ড্রোলমা কে ? 

- আমার মেয়ে। একেবারে পরির মতো দেখতে ছিল। লোকের সঙ্গে সহজেই মিশতে পারত। এই পাহাড়ের সবাই ড্রোলমাকে একডাকে চিনত। 

- কী হয়েছিল ? 

- অ্যাক্সিডেন্ট। মোটে কুড়ি-একুশ বছর বয়স .. চরম শোক সহ্য করতে পারিনি বলেই আমার শরীরটা বিগড়োল। কিছুদিন ধরেই মাথাটা টাল খাচ্ছিল। পাত্তা দিইনি। সেদিন ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গিয়েছিলাম। হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেল সব। জ্ঞান ফিরল শহরের হাসপাতালে। পাক্কা তিন সপ্তাহ বাদে বাড়ি ফিরলাম। ডান পা অসাড় হয়ে গিয়েছিল। বাথরুমে যেতেও সঙ্গে লোক লাগত। জিভ ভারী হয়ে গিয়েছিল। কথা বলতাম জড়িয়ে জড়িয়ে। সেটা কেটেছে। 

পালদেন আমার পাশে বসে আছে। খাটো গলায় আমাকে বলল, আপনি অনুমান করতে পারবেন না আগে কেমন গোয়ার ছিল লপসাং। সারা মহল্লা কাঁপত ওর হাঁকডাকে। উগ্র মেজাজ ছিল। সেই ডাকাত স্বভাবের লোক মেয়ে মারা যাবার পর একদম অন্য মানুষ হয়ে গেছে। সারাক্ষণ গুম মেরে থাকে। আগে যে লোক মদ স্পর্শ করত না সে এখন পাঁড় মাতাল। 

আমি লপসাংকে বললাম, স্ট্রোক খুব খারাপ জিনিস। একবার ধকল সামলেছেন। দ্বিতীয়বার হলে কী হবে কেউ জানে না। সাবধানে চলবেন। ওষুধ খাবেন নিয়ম করে। 

- কী হবে ওষুধ খেয়ে ! কার জন্য বাঁচব ? আমার আর বেঁচে থাকার মোহ নেই। লপসাং লম্বা চুমুক দিয়ে গেলাস খালি করে দিয়ে বলল, আপনার বাড়ি তো কলকাতায় তাই না ? 

- হাওড়া। 

- ওই একই হল। আমি কলকাতা গিয়েছিলাম একবার। বিরাট বড় শহর। সারি সারি বাড়ি। ট্রাম। পাতালরেল। দোকানপাট। গিজগিজ করছে মানুষ। আমার তো দু’দিনেই দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। আপনি কী করেন? 

- চাকরি করতাম। রিটায়ার করে এখন ঝাড়া হাত-পা। সুযোগ পেলেই ঘুরে বেড়াই। আগে স্ত্রী ছিল ভ্রমণসঙ্গী। ইদানিং গাউটের ব্যথায় সে কাবু হয়ে পড়েছে। বাড়ি ছেড়ে বেরোতে পারে না। আমি একাই ঘুরি। তবে সমুদ্র বা জঙ্গল নয় পাহাড় আমাকে বেশি টানে। তবে এই পাহাড়ে প্রথমবার এলাম। 

- ইদানিং দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে পপি। তবে এই পাহাড়ে এখনও সেই ফুল ফোটে। বর্ষার মধ্যে এত কষ্ট করে যখন এসেছেন তার মানে আপনার আসার আসল উদ্দেশ্য হল ব্লু পপি দেখা। কী তাই তো ? 

- বলতে পারেন, জায়গাটা কত দূর এখান থেকে? 

- দু’-আড়াই ঘন্টার পথ। কিন্তু অসুখের পর আমি একরকম পঙ্গু। এখন আর অতটা চড়াই উঠতে পারব না। অসুবিধে কিছু নেই, পালদেনও চেনে জায়গাটা। আপনি পারবেন তো অতটা হাঁটতে ? 

আমি মজা করে বললাম, পপি দেখার জন্য সারা রাত হাঁটতেও আমি রাজি। 

লপসাং বলল, যান ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিন। রাত আটটায় পালদেন ডিনার দিয়ে দেবে। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ুন। কাল সকাল সকাল উঠে তৈরি হয়ে থাকবেন। 

শুভরাত্রি জানিয়ে টলতে টলতে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল লপসাং। 

কুয়াশা উঠে আসছে অন্ধকার ফুড়ে। বর্ষাকালে পাহাড় ছুঁয়ে আসা হাওয়ায় জব্বর ধার। পালদেন খাবার নিয়ে এল পাক্কা আটটার সময়। ধোঁয়া ওঠা মোটা চালের ভাতের সঙ্গে মুসুর ডাল, ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া করে কাটা আলুভাজা আর ঝাল ঝাল মুরগির মাংস। খিদে পেয়ে গিয়েছিল জোর। হাপুস হুপুস করে সাবাড় করে দিলাম পুরোটা ভাত। খাবার পর উঠে গিয়ে হিমশীতল জলে হাত আঁচাতেই শীতবোধ এক লাফে অনেকটা বেড়ে গেল। 

পালদেন উৎসুক গলায় বলল, রান্না ঠিক ছিল ? 

- ভালই রেঁধেছ। তবে মাংসে ঝাল বড্ড বেশি ছিল। 

পালদেন বিনীত ভঙ্গিতে বলল, কাল থেকে লংকা কম দেব রান্নায়। 

অনেকক্ষণ থেকেই কৌতূহল হচ্ছিল। কথাটা পালদেনকে বলেই ফেললাম, ড্রোলমার দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল শুনলাম। কীভাবে হয়েছিল সেই অ্যাক্সিডেন্ট ? 

পালদেন আমার থেকে চোখ সরিয়ে একটু কাশল। ইতস্তত করে বলল, সে লম্বা গল্প। শুনতে গেলে আপনার শুতে শুতে দেরি হয়ে যাবে। কাল আবার সকাল সকাল ওঠা আছে। 

আমি অধৈর্য স্বরে বললাম, এত শিগগিরি শোবার অভ্যেস নেই আমার। তুমি গল্পটা বলো শুনি। 

পালদেন চুপ করে থাকল খানিক। নিজেকে একটু গুছিয়ে নিল। তারপর যা বলল তার সারাংশ এরকম - 

ড্রোলমা ছিল পরমাসুন্দরী। রাজার ঘরে বিয়ে হতে পারত ড্রোলমার। কিন্তু মদনদেব অন্যরকম ভেবেছিলেন। দু'বছর আগে এক বর্ষার মরশুমে চারজনের একটা দল এসে ঘাঁটি গেড়েছিল লপসাংয়ের ডেরাতে। এই পাহাড়ের প্রজাপতি আর পপির ওপর তারা ডকু-ফিল্ম বানাচ্ছিল। হাতে ক্যামেরা আর কাঁধে লেন্স নিয়ে চারজন ঘুরে বেড়াত পাহাড়ে পাহাড়ে। দলের মধ্যে বিভিন্ন বয়সের শ্বেতাঙ্গ ছিল তিনজন, একজন ভারতীয়। ছিপছিপে বড় বড় চোখের ভারতীয় যুবকটির নাম আয়ান। এক ছাদের তলায় থাকলে যা হয়, সুন্দরী ড্রোলমা প্রেমে পড়ল সুদর্শন আয়ানের। প্রেম গাঢ় হতে সময় লাগল না। দুজনে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করত সবার চোখের আড়ালে। একদিন দুজনকে পপির উপত্যকায় মিলিত হতে দেখে ফেলল স্থানীয় লোকজন। লপসাং খবর পেয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে ছুটে এল। লপসাং এমনিতেই গোয়ার মানুষ। রাগের মাথায় বহু ঘটনা ঘটিয়েছে আগে। সেদিন সীমাহীন ক্রোধে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল লপসাং। যে মেয়েকে প্রাণের থেকে বেশি ভালবাসত তার গলার নলি কেটে দিয়েছিল নিজের হাতে। 

আমি শ্বাস ফেলতে ভুলে গিয়ে বললাম, তারপর ? 

পালদেন বলল, পরিস্থিতি মারাত্মক উত্তপ্ত ছিল। উত্তেজিত জনতা টুকরো টুকরো করে ফেলত চারজনকেই৷ বিশেষ করে আয়ানের তো বেঁচে ফেরার কথাই ছিল না। কিন্তু মেয়েকে চোখের সামনে স্থির হয়ে যেতে দেখার পর লপসাং কেমন যেন হয়ে গেল। কাদায় হাঁটু গেড়ে বসে মাথা চাপড়াচ্ছিল বারবার, কাঁদছিল পাগলের মতো। সেদিন লপসাং একবার ইশারা করলেই চারজনকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিত গ্রামের লোকেরা। কেউ টের পেত না কিছু। কিন্তু লপসাং সেসব কিছুই করল না । নির্বিঘ্নে চলে যেতে দিল ওদের। সেদিন বিকেলেই এই পাহাড় ছেড়ে চলে গেল চারজন। 

অনার কিলিং নিয়ে কত ঘটনার কথাই তো খবরের কাগজে পড়ি। কিন্তু সেসব কাহিনি আর কতটা দাগ কাটে আমাদের কাছে? আবেগের একটা ক্ষণস্থায়ী বুদবুদ তৈরি করে মনের মধ্যে। তারপর পাতা উল্টে অন্য খবরে চলে গেলেই সব ভুলে যাই। কিন্তু এই বিজন পাহাড়ের ছায়ান্ধকার ঘরে বসে পালদেনের গল্প শুনতে শুনতে ঘটনাটা চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পেলাম। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। 

রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। পড়ন্ত বিকেলে হাঁটছি একটা মাঠের ওপর দিয়ে। ঠিক পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটা খরস্রোতা নদী। সে নদীর জলের রং নীল। কোত্থেকে একটা অদ্ভুত নীল ডানার পাখি নেমে এল মাঠের ওপর। তাকিয়ে দেখি মাঠে একটা পালক পড়ে আছে। নীল রঙের পালক। পাখিটা পালকটা মুখে তুলে একটু নাড়াচাড়া করল। তারপর সেটা ফেলে দিয়ে নদীটার দিকে উড়ে গেল। আমি পালকটা কুড়িয়ে নিলাম। তাকিয়ে দেখি পাখিটা পাক খাচ্ছে নদীর ওপর। হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাখিটা ধী করে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল নদীর জলে। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই দেখলাম নদীর জলে মিশে গেল পাখিটার ছোট্ট নীল শরীরটা। জলের স্রোত যেদিকে গেছে সেদিকে ছুটে গেলাম আমি। জলস্রোত যেখানে ফিতেনদী হয়েছে সেখানে দেখি দু-একটা নীল পালক ভেসে ভেসে যাচ্ছে। আমি আমার হাতে ধরা নীল পালকটার দিকে তাকালাম। তখনই ঘুমটা ভেঙে গেল। 

পালদেন চড়াই বেয়ে উঠতে উঠতে বলল, সাবধানে আসুন। কোনও ভয় নেই। 

পালদেনের পিছন পিছন হাঁটতে হাঁটতে এদিক ওদিক দেখছি। ক্যামেরা দিয়ে পথের দু'ধারের ছবি তুলে নিচ্ছি সঙ্গে সঙ্গে। এই বনপথ বড় বড় গাছে ঢাকা। মাঝে মাঝে পাখির ডাক ছাড়া আর কোনও আওয়াজ কানে আসে না। এই নিস্তব্ধতায় দাড়িয়ে নিজের হৃদস্পন্দন অচেনা বলে মনে হয়। জলকাদা আছে কিছু কিছু জায়গায়। সেসব দেখে সাবধানে পা ফেলতে ফেলতে পালদেন বলল, এই যে এত পরিশ্রম করছেন তা সার্থক হয়ে যাবে যখন ব্ল পপির উপত্যকায় পৌছবেন। 

একগাল হেসে বললাম, সে জিনিস দেখব বলেই তো এত কষ্ট করা। 

ছায়াশীতল ভেজা পথ শ্যাওলায় পিছল হয়ে আছে। উঁচু উঁচু গাছেদের খাঁজে বর্ণময় শ্যাওলা ও রঙিন অর্কিডের ঠাসবুনোট নকশা। তারই মাঝে, পথে বিছানো পাথরের খাঁজে খাঁজে লাল রডোডেনড্রনের উকিঝুঁকি। পথচলতি পাহাড়ি ঝর্ণা এখানে সেখানে এসে কাটাকুটি খেলছে সঙ্কীর্ণ রাস্তার সঙ্গে। পথের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে একটি ছটফটে ঝর্ণা । মৃদুমন্দ ভেজা ভেজা হাওয়া দিচ্ছে। হাওয়াটা জোরালো হচ্ছে থেকে থেকে। 

পালদেন চলতে চলতে দাঁড়িয়ে পড়ল এক জায়গায়। বলল, পপির নতুন একটা জাত এই পাহাড়ে ফুটেছে এবছর। স্থানীয় কিছু লোক ছাড়া সেটা খুব বেশি কেউ জানে না এখনও। সেটা দেখাব আপনাকে। 

পাহাড়ি পথের চড়াই উতরাই ভেঙে কিছুটা এগোতেই এল একটা লোহার সেতু। তলা দিয়ে বয়ে চলেছে উজ্জ্বল নদী। তীব্র স্রোত। জলের রেণু উঠে আসছে সেতুর পাটাতন অবধি। ভিজিয়ে দিচ্ছে মুখচোখ। হাতের চেটো দিয়ে ভেজা মুখ মুছতে মুছতে বললাম, আর কত দূর? 

পালদেন আশ্বাস দিয়ে বলল, আর একটু। 

আলো আর অন্ধকার মেশানো অসমান পথ। কর্দমাক্ত। সাবধানে পা না ফেললে ছোটখাট দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। জলধারার কিনারায় খুচরো পয়সার মতো নাম না জানা ফুল ফুটে আছে। তাদের শোভা পথশ্রম ভুলিয়ে দেয়। পাহাড়ের মাথা ছুঁয়ে আছে মেঘ। আমার হাঁফ ধরেছে বেশ। হাঁফাতে হাঁফাতে প্রশ্ন করলাম, তোমার কষ্ট হচ্ছে না হাঁটতে ? 

পালদেন স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে নিতে বলল, একটুও না। জলে যেভাবে মাছ সাঁতার কাটে পাহাড়ে মানুষে চড়াই পথে তেমনি করে হাঁটে।। 

সেতু পার হয়ে রাস্তা উঠল পাহাড়ের অন্যদিকের গা বেয়ে। বড় বড় গাছের নিচে তখন আলো-আঁধারির খেলা। কোনও ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীর তুলির ছোপ পড়েছে যেন। নিসর্গ এখানে কথা বলে। সবুজের যে এমন বিভিন্নতা থাকতে পারে সেটা না দেখলে জানা হত না। কিছু কিছু জায়গায় সবুজ এমন প্রাণবন্ত যে মনে হয় হাত দিয়ে ছুঁলে হাতে উঠে আসবে সেই সবুজ রং। 

আকাশে এখন অনেক মেঘের আনাগোনা। নীলাভ স্বপ্নের মতো মেঘেরা খেলা করছে মাথার ওপর। ছায়া ফেলছে দূর। পাহাড়ের গায়ে। সাবধানী পায়ে ধীরে পার হয়ে চলছি হিমশীতল চত্বর। আর একটু ওঠার পর পালদেন বলল, ওই যে। ওদিকে দেখুন। 

মুখ ফিরিয়ে দেখি অবাক করা দৃশ্য ! নিচের উপত্যকা জুড়ে নীল সফেন সমুদ্র। অজস্র নীল পপি ফুটে আছে চরাচর জুড়ে। এই অবর্ণনীয় দৃশ্য মন প্রাণ ভরে দেখার। শুধু দেখার। তাকে কোনও শব্দে গাঁথা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। এই নীল পপির উপত্যকায় প্রকৃতি দরাজ হাতে উন্মুক্ত করে দিয়েছে তার সমস্ত ঐশ্বর্য। এমন দৃশ্য দেখে শরীর আর মনের সমস্ত ক্লান্তি উধাও হয়ে যায়। 

আমি একটার পর একটা ছবি তুলছিলাম। পালদেন আঙুল উঁচিয়ে পাহাড়ের অন্য পাশটা দেখিয়ে বলল, এদিকটা দেখুন। দূর থেকে যা আপনি নীল ভাবছেন তা আসলে নীল নয়। কাছে গেলে বুঝতে পারবেন। আমি তখন আপনাকে পপির এই নতুন জাতটার কথাই বলছিলাম। চলুন, কাছে চলুন। 

আমরা হাঁচোড় পাচোড় করে নেমে আসছি নিচের দিকে। পাহাড়ের মধ্যে ছোট মতো একটা জায়গা। সেই সোঁদা জায়গায় থরে থরে ব্লু পপি ফুটে রয়েছে। ফুলগুলোর ওপর উড়ে বেড়াচ্ছে প্রজাপতি। উড়ে উড়ে ফুলগুলোর ওপর বসছে। আবার চলে যাচ্ছে। আমি বিহ্বল হয়ে প্রজাপতিগুলোকে দেখছিলাম। রাজকীয় আভিজাত্যে ঝলমল করছে পাখনাগুলো। কমলা, সাদা, লাল রংয়ের ফুটকি। এক-একটা ডানা প্রায় ছ'ইঞ্চি। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলাম, এই যে প্রজাপতিগুলো দেখছ এদের নাম মনার্ক। প্রজাপতিদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে বড় প্রজাতি হল এরা। 

আমার উচ্ছ্বাস স্পর্শ করতে পারেনি পালদেনকে। পালদেন কেমন একটা গলায় বলল, ফুলগুলো ভাল করে দেখুন। কিছু দেখতে পাচ্ছেন ? 

দূর থেকে মনে হচ্ছিল অবর্ণনীয় নীল রংয়ের সমাহার। এখন কাছে আসায় বুঝতে পারছি ফুলগুলো পুরোপুরি নীল নয়। প্রত্যেকটা পাপড়ির মধ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কিন্তু মোরগের ঝুঁটির মতো তীব্র লালের বুটি। দেখে চোখ ধাধিয়ে যায়। নীলাভ ফুলগুলোর ওপর বিন্দু বিন্দু লাল রং ছিটিয়ে হোলি খেলেছে কেউ। আমি বিহ্বল গলায় বললাম, অদ্ভুত তো ! 

পালদেন ফিসফিস করে বলল, এটাই সেই জায়গা। 

- কোন জায়গা ? 

পালদেন গলাটা খাদে নিয়ে গিয়ে বলল, ঠিক এখানে দাড়িয়েই লপসাং নিজে হাতে গলার নলি কেটে দিয়েছিল মেয়ের। এখানেই শেষ শ্বাস ফেলেছে ড্রোলমা। এখানেই মাটি খুঁড়েই মেয়েকে কবর দিয়েছে লপসাং। 

গায়ের সমস্ত রোম দাড়িয়ে গেল আমার। শরীরটা অস্থির করতে লাগল। লোকে বলে নীল হল বিষাদের প্রতীক, লাল আমাদের আবেগের রং। মানুষের প্রতিবাদের রংও লাল। কিন্তু প্রকৃতির এ কী লীলা ! যে মর্মান্তিক ঘটনাটা ঘটে গিয়েছিল এখানে প্রকৃতি কি সে কথা ভোলেনি এখনও? সে কারণেই কি নিজেকে সে সাজিয়েছে এভাবে ? 

পালদেন কাঁদছিল শব্দ না করে। হাঁটু গেড়ে বসে থাকা পালদেনের পিঠে হাত রাখলাম। নরম গলায় বললাম, তুমি ড্রোলমাকে ভালবাসতে। তাই না ? 

- এখনও ভালবাসি। পালদেন মুখ তুলে আমাকে দেখল। নিজেকে সামলে নিয়ে ভেজা গলায় বলল, কিন্তু ড্রোলমা সে কথা জানল না কখনও। 

আকাশে ভেসে বেড়ানো টুকরো টুকরো মেঘ কখন যেন ঘনিয়ে উঠতে শুরু করেছে। বাতাস ভারী হয়ে আসছে ভেজা গন্ধে। দূরে, প্রান্তরের শেষে গিরিশিখর উঁকি মারছে মেঘের জগৎ থেকে। আলো ক্রমে কমে আসছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল হঠাৎ করে। দাঁড়ানোর জায়গা নেই কোথাও। ঠান্ডাও বাড়তে শুরু করল ক্রমশ। দেখলাম ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘে ঢেকে যাচ্ছে দু'পাশের পাহাড়ের শিখরদেশ। 

একটুক্ষণ কাঁদতে দিলাম পালদেনকে। ওর পিঠে হাত রেখে মৃদু স্বরে বললাম, সেদিন ওদের দুজনকে এখানে একান্তে মিলিত হতে দেখে তোমার ঈর্ষা হয়েছিল। সোরগোল করে স্থানীয় লোক জড়ো করেছিলে তুমি। লপসাংকেও ডেকে এনেছিলে তুমি। তাই না ? 

পালদেন যেন তড়িদাহত হয়েছে। বিস্ফারিত চোখে আমাকে দেখছে। 

আমি বিষন্ন হেসে বললাম, কাল রাত্তিরে তুমি যে গল্পটা শুনিয়েছিলে সেটা মিথ্যে নয়। কিন্তু সেই গল্পটার অন্য একটা দিক আছে। সেটা তুমি আমাকে বলোনি। আমি নিজেই অনুমান করে নিয়েছি। 

পালদেন হতচকিত স্বরে বলল, মানে ? 

- তুমি ড্রোলমাকে ভালবাসতে। কিন্তু সেটা ছিল একতরফা ভালবাসা। ড্রোলমা তোমাকে সে-নজরে দেখেনি কখনও। তুমি ভাল করেই জানতে, বদরাগী লপসাং যদি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারে যে তুমি তার মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছ তাহলে সে তোমাকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে বাড়ি থেকে। এদিকে ঘটনাচক্রে লপসাংয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিল চারজন। তাদের একজনের প্রেমে পড়ে গেল ড্রোলমা। সেটা তোমার নজর এড়ায়নি। তুমি সুযোগ খুঁজছিলে। একদিন ওদের দুজনকে এই ফুলের উপত্যকায় ঘনিষ্ঠ অবস্থায় তুমি দেখে ফেললে। তোমার ভেতরে ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠল। তুমি সোরগোল করে লোক জড়ো করে ফেললে। লপসাংকেও ডেকে নিয়ে এলে। তবে লপসাং যে রাগের মাথায় এমন মারাত্মক কান্ড করে বসবে সেটা তুমি কল্পনাও করতে পারোনি। 

পালদেন ধ্বস্ত গলায় বলল, সত্যিই তাই। আমি ভাবতে পারিনি লপসাং নিজের মেয়েকে গলা কেটে খুন করে ফেলবে। 

মাটির সোঁদা গন্ধের সঙ্গে মিশে গেছে জংলা গাছপালার গন্ধ। আদিগন্ত বিস্তৃত উপত্যকা জুড়ে শ্রাবণ খেলে বেড়াচ্ছে অদৃশ্য কোনও জলতরঙ্গের ছন্দে। বাতাস আরও ভারী হয়ে আসছে। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে ক্রমশ। বড় বড় ফোঁটায় আকাশ ছুঁড়ে নেমে আসছে হিমশীতল জলধারা। 

বৃষ্টিতে ভিজছি দুজনে। পালদেন হাঁটু গেড়ে বসে আছে মাটির মধ্যে। ক্লান্ত চোখে আমাকে দেখতে দেখতে বলল, কে আপনি ? আপনাকে কি আয়ান পাঠিয়েছে এখানে? 

আমি স্মিতমুখে বললাম, আয়ান নয়, ওর নাম অয়ন। ওর বিদেশি বন্ধুরা অবশ্য একে ‘আয়ান’ বলেই ডাকত। না অয়ন আমাকে পাঠায়নি এখানে। 

পালদেন নিস্পলক চোখে তাকানো আমার দিকে। দুর্বল গলায় বলল, এবার বুঝতে পারছি কেন আপনাকে কেন চেনা চেনা মনে হয়েছিল। আয়ানের সঙ্গে আপনার চেহারায় অনেক মিল। 

আমি স্বগতোক্তি করার মতো করে বললাম, অয়ন আমাদের একমাত্র সন্তান। ও ছাত্র ভাল ছিল। বোটানি নিয়ে মাস্টার্স করেছিল। ও ছিল লেপিডপটুরিস্ট। প্রজাপতি নিয়ে চর্চা করত। একটা টিভি চ্যানেলের সঙ্গে যুক্ত ছিল অয়ন। ব্লু পপি, রঙিন প্রজাপতি আর অর্কিড নিয়ে কাজ করার সূত্রেই এই গ্রামে এসেছিল ওরা। এখানে এসেই ওর দেখা হয় একটি মিস্টি প্রজাপতির সঙ্গে। 

পালদেন আমাকে দেখছে অবাক চোখে। আমি বললাম, অয়ন ছেলেবেলা থেকেই নরম মনের মানুষ। একটা পিপড়ে অবধি মারেনি কখনও। সেদিন চোখের সামনে ওরকম একটা ভয়ংকর দৃশ্য দেখার শক এর নার্ভ নিতে পারেনি। বাড়ি ফিরে আসার পর বেচারি লম্বা ছুটি নিয়ে বসে ছিল। জীবনটাই বদলে গিয়েছিল হাসিখুশি ছেলেটার। কারও সঙ্গে কথা বলত না, চুপ করে বসে থাকত সারাদিন। ওর সহকর্মীরা ওকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তারের কথামতো ও ওষুধ খাচ্ছিল। তাতে সাড়াও পাওয়া গিয়েছিল। কাজে জয়েন করেছিল অয়ন। ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে আসছিল ওর আচরণ। ঠিক তখনই একদিন ঘটনাটা ঘটে। 

- কী ঘটনা ? 

- রাতের খাবার খেয়ে শুতে গিয়েছিল। সকালে আর ওঠেনি। দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখি রক্তের নদীর মধ্যে শুয়ে আছে। অয়ন। বাঁ-হাতের কবজির শিরা কেটে ফেলেছে ব্লেড দিয়ে। 

বৃষ্টি হতে হতে থামল একসময়। নীল ফুলের গায়ে বৃষ্টির ফোটাগুলি লেগে আছে পরম মমতায়। পাথরের খাঁজে ছোট্ট এক একটা পপি ফুলের পাপড়িতে বৃষ্টির এক ফোটা জল লেগে আছে। অসীম অনন্ত প্রকৃতির বুকে অনুচ্চারিত, অব্যক্ত অনুভূতির এক নীরব প্রকাশ যেন। কিছুটা দূরে বেশ খানিকটা দূরে ফুটে আছে নাম না-জানা ফুল। একদিকে ফার্নজাতীয় গাছে ছেয়ে আছে উপত্যকার একটা অংশ। 

আমি আর পালদেন ফিরে আসছিলাম কাদামাখা পথ দিয়ে। ওঠার সময় যতটা কষ্ট হয়েছিল নামার সময় তেমন হচ্ছে না। পালদেন দাঁড়িয়ে পড়ল এক জায়গায় এসে। কৌতুহলী স্বরে বলল, একটা কথা বলবেন ? আপনি এই পাহাড়ে এসেছিলেন কী জন্য ? 

একটা বড় শ্বাস গোপন করে বললাম, সব পাখিই একটা পালক ফেলে যায় পরবাসে। সে পালকের কাছে হয়তো পথ চিনে ফিরেও আসে। অয়ন এই পাহাড়ে ফেলে গিয়েছিল একটা নীল রঙের পালক। আমি কৌতুহল নিয়ে এই দুর্গম গ্রামে এসেছিলাম এটা দেখতে যে অয়ন ওর নীল পালকটাকে খুঁজে পেয়েছে কিনা। 

- কী দেখলেন ? 

- প্রকৃতিই দেখাল চোখে আঙুল দিয়ে। বুঝিয়ে দিল অয়ন পথ চিনে পৌছে গেছে ওর প্রেয়সীর কাছে। তারপর ওরা দুজনে নীল বিষাদনদীর বুকে ভাসিয়ে দিয়েছে জ্বলন্ত প্রদীপ। অসংখ্য প্রদীপের রক্তবর্ণ অনির্বাণ শিখাই ওদের প্রেমের চিহ্ন। ওরা একে অন্যকে তীব্রভাবে ভালবেসেছিল বলেই ওদের ভালবাসা ফুটেছে ফুল হয়ে। প্রেমের গাঢ় লাল রং বিন্দু বিন্দু হয়ে ফুটেছে নীল পপিগুলোর বুকে। 

অনেকে বলেন ফোটোতে মুহূর্ত ধরা থাকে। আমার তা মনে হয় না। সেই মুহূর্তের আমি, আমার অস্তিত্ব, আমার রূপ-রসগন্ধ-বর্ণ-স্পর্শ-চেতনা শুধু সেই ক্ষণটুকুরই জন্য। ছবি বা লেখায় তাকে ধরা যায় না। সেগুলি মুহূর্তটির নেগেটিভ মাত্র। তাতে অবয়বের আদলের অংশবিশেষ ধরা পড়তে পারে। কিন্তু প্রকৃত রং হারিয়ে যায়। যেই চিত্রকর সবার দৃষ্টির আড়ালে থেকে ছবি এঁকে চলে সে অধরাই থেকে যায়। তবু তার অনিন্দ্য সৃষ্টিকে দেখে আপ্লুত হয়ে সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়ার আকুলতা যেন শেষ হয় না মানুষের। তাকে ভাষায় প্রকাশ করতে গেলে ভাষা ফোটে না কলমে। শব্দ হারিয়ে যায়। ছবি আঁকতে গেলে তুলি খসে পড়ে হাত থেকে। 

ফিরে আসতে আসতে একবার পিছন ফিরে তাকালাম। গোটা ফুলের উপত্যকাটাকে মনে হল অবন ঠাকুরের আঁকা ক্যানভাস। সেই বিখ্যাত মিস্টিক আলোয় গোটা উপত্যকা যেন ভেসে যাচ্ছে। 

২টি মন্তব্য:

  1. ন্দীর স্রোতের মত ত্রত্রে

    উত্তরমুছুন
  2. নিসর্গ এবং প্রকৃতির বর্ণনা অনবদ্য। শব্দ দিয়ে ছবি এঁকেছেন। গল্পের শেষের টুইষ্টটিও অসাধারণ। বাবা দেখতে এসেছেন, ছেলের ফেলে যাওয়া পালক।
    একটি জিজ্ঞাসা ব্লু বেরীর ফুলকেই কি ব্লুপপি বলে?
    (কয়েকটি জায়গায় চন্দ্রবিন্দু দেওয়া হয় নি, একটু দেখবেন)

    উত্তরমুছুন