মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তীর গল্প : ক্ষত

কাল সারা রাত একটুও ঘুমাতে পারিনি। এখানে সবই মোটামুটি চলনসই, তবে রাতে বড় শব্দের উৎপাত। সমস্ত রাত ধরে বড় বড় লরি শরীরে মাল বোঝাই করে ঘড় ঘড় ধ্বনি তুলে আসা যাওয়া করে। চারতলার উপরে বলে, রাতে প্রায়ই বারান্দার দরজা বন্ধ করি না। আমার শোবার ঘরের সামনের একফালি বারান্দা দিয়ে একটুকরো আকাশ দেখা যায়। একা শুয়ে শুয়ে রোজ অনেকক্ষণ ধরে আমি আকাশ দেখি।
কাল আকাশে মেঘ ছিল না। আকাশ তাই তার জরোয়ার কাজ করা কালো আাঁচল মেলে দিয়েছিল বহু বিস্তৃত পরিসর জুড়ে। গুচ্ছ গুচ্ছ কদম পাতার ফাঁক দিয়ে আমি সেদিকে নির্নিমেষে চেয়েছিলাম। 

এ বাড়িতে ওই কদম গাছটা ছাড়া আর কোনও জীবিত সঙ্গী নেই আমার। মাঝে মাঝে অপরিচিত কয়েকজনের মুখ দেখি। আমি ওদের কাউকে চিনি না। ওরা কারা কে জানে? আমাকে ওষুধ খাওয়াতে আসে সাদা পোশাকের কয়েকটা মেয়ে। আমি ওদের কারুর মুখ মনে রাখতে পারি না। রোজ রোজ ওদের মুখ বদলে যায়। আমার সঙ্গে কথা বলার এখানে কেউ নেই। বাবা আর মায়ের একটা বাধানো ফটো আছে এই ঘরে। আমি ওদের সঙ্গে গল্প করি। কিন্তু কথার জবাবে ওরা কদম গাছটার মতো আনন্দিত বা ব্যথিত হয় না। ওদের চির শান্তির দেশে বোধহয় আমার কথা গিয়ে পৌঁছায় না। কেবল আশ্চর্যভাবে আমার সব কথার জবাব দেয় কদম গাছটা।

এই ফ্ল্যাটটা আমাকে কিনে দিয়েছে আমার বর। ডঃ উন্মেষ বসু। গঙ্গার কাছে থাকবো ঠিক করেছিলাম, অনেকদিন ধরে। যাতে, মাঝে মাঝে নদীর কাছে এসে জুড়াতে পারি। জায়গাটা কোথায় আমি ঠিক জানি না। বোধহয় গঙ্গার খুব কাছেই হবে। আমি নদীর শব্দও পাই। সবদিন না, যে দিনগুলোতে খুব হাওয়া বইতে থাকে, সেইদিন এখান থেকে উত্তাল গঙ্গার ঢেউয়ের শব্দ শুনতে পাই আমি। জায়গাটা আমার শ্বশুরবাড়ি থেকেও অনেক দূরে। ওরাও নিরাপদ, আমিও। আমার কথা মতো গঙ্গার গলিঘুঁজির মধ্যে, ঠিক একটা ফ্ল্যাট খুঁজে পেতে আমাকে ঠিক করে দিয়েছে উন্মেষ। এই আবাসনটার নাম শান্তনীড়। তবে শান্তনীড়ে বড় শব্দের অশান্তি। কাছেই এই অঞ্চলের বিখ্যাত জুটমিল। সেই সূত্রে ধারে কাছে দু একটা শ্রমিক বস্তি গজিয়েছে। রোজ সকালে তারা যখন ডিউটিতে যায়, আমি শুয়ে শুয়ে তাদের বিচিত্র কলরব শুনতে পাই। কী ছাই ওষুধ দেয় ওরা! সেই ওষুধ খেয়ে আমার সারাদিন খুব ঘুম পায়। এত ঘুমাতে ভালোলাগে না। তবে রাতে কিন্তু, মাঝে মাঝেই আমি জেগে থাকি। আমাকে দেখাশুনো করে যারা, সেই মেয়েগুলো বলে, 

ঘুম তো ভালোই। যত বেশি ঘুমাবেন তত তাড়াতাড়ি আপনি ভালো হয়ে যাবেন। 

আমার কী হয়েছে? জানতে চাইলেও ওরা পরিস্কার করে কিছু বলে না। আমি কী পাগল? মানসিক রুগী? এই জায়গাটা কী? আমার একার ফ্ল্যাট, না কোনও মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্র? আমাকে এটা জানতে হবে, এবং সেটা খুব তাড়াতাড়ি।




এই ফ্ল্যাটে ঘর মোটে একটা। বেশি তো দরকারও নেই! আমিও তো একা! দুপুরগুলোতে একটানা ঘুমাই এখন। এখন আমার কাজ অনেক কমে গেছে। আমার সানুর জন্যই কতো কাজ ছিল দিনরাত্তির। সানুকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, ওর জন্য টিফিন তৈরি, ওকে দুপুরে স্কুল থেকে আনা----- আমি এখন বেকার। সেই স্কুলবেলার শাস্তি পাওয়ার মতো, কেউ যেন মুখে আঙুল দিয়ে চুপ করিয়ে বসিয়ে রেখেছে আমাকে। আমি তার অবাধ্য হতে চাই। তাই সারাদিন অফুরন্ত কথা বলে চলি, একা একা। 

কয়েকদিন ধরে সানুর কাছে যাওয়ার জন্য বুকের ভেতর খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি নিজেকে বোঝাই, শান্ত করার চেষ্টা করি। ওরা সবাই আমাকে পাগল বলে। অনেক প্ল্যান করে, রীতিমতো আইনের সাহায্য নিয়ে, ওরা আমার সন্তানকে আমার বুক থেকে কেড়ে নিয়েছে। ওদের কাছে টাকা আছে। আছে ক্ষমতা। সেই তুলনায় আমি নেহাতই একজন তুচ্ছ আর দুর্বল মানুষ। তার উপর আমার বর মাস গেলে আমার খোরপোশ বাবদ অনেকগুলো টাকা পাঠায়। সেই টাকাতেই নাকি আমার ওষুধ কেনা হয়, আমার পড়ার জন্য বই আসে। ওদের বলেছি, বই ছাড়া আমি থাকতে পারি না। বর যদি টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেয়, আমি করবো টা কী? কেস করবো? আমার লোকবল কই? একদম একা হয়ে গেছি আমি। আমার স্বামীর দয়ার শরীর। ঠিক সময়ে ব্যাঙ্কে টাকা পাঠিয়ে দেয়। ভাবছি, এইবার একটা চাকরি নেব। ছোটখাটো যেমনই হোক। উন্মেষের টাকাটা না নিতে পারলে খুব ভালো লাগতো। তবে এখন আমার নিজের ক্ষমতার উপর কেমন যেন সন্দেহ জন্মে গেছে। শরীরটাও নিজের দোষে বড় নড়বড়ে হয়ে গেছে।

দুপুরবেলা ঘুমিয়ে আজ সানুকে দেখলাম। সানুর এখন সাত চলছে। আমি দেখলাম, সানু যেন সেই আগের মতো অনেক ছোট। সেই তিন বছরের ছোট্ট সানু। আমি বাড়ি ছিলাম না। ও জলের সিমেন্ট বাধানো ট্যাঙ্কের উপর আছাড় খেয়ে পড়েছে। কপালের একজায়গায় রক্ত জমাট বেধে নীল হয়ে আছে ফর্সা মুখে, চোখে জল। আমি ফিরে এসে বলছি,

কপালে কী করে লাগলো সানু?

সানু বলতে পারছে না। শুধু হাত দিয়ে বলছে ব্যথা। ওর চোখ দুটো ভেজা ভেজা। ব্যথা বলতে গিয়ে প্রত্যেকবার ওর ঠোঁট ফুলে উঠছে।

আমি ওকে বুকে চেপে ধরি। হু হু করে কাঁদি। আজও চাকরির খোঁজে সারা দুপুর টো-টো করেছি। বললাম,

আমি খুব পচা সানু। খুব খারাপ মা আমি! সানু বললো,

না, ভালো মা। ভালো মা বলে, আর মাথা ঝাঁকায়। ভালো কথাটাতে অনাবশ্যক জোর দেয়। আমি সানুকে অনেকক্ষণ বুকে চেপে রাখি। ওর নরম গায়ে বেবি পাউডারের গন্ধ। আমার ঘুম ভেঙে যায়। সারা ঘরে অলৌকিক ভাবে সেই বেবি পাউডারের গন্ধটা পাই আমি। উঠে বসলাম। নিস্তব্ধ অন্ধকার ঘর। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দূরে কোথায় শাঁখ বাজছে। বিছানাতেই বসে থাকি দীর্ঘ সময় ধরে। আমাকে কেউ ফোন করে না এখানে। বই আমার এখানকার অখণ্ড অবসরের একমাত্র সঙ্গী। আমার বিছানার উপর মাথার ধারে রাশি রাশি বই। তার মধ্যে অদ্রীশ বর্ধন সম্পাদিত 'বিশ্বসেরা সায়ন্স ফিকশান' আর 'কালিদাস সমগ্র' পাশাপাশি পড়ে আছে। আজ সকালে ও দুটোই পড়ছিলাম। সাধে কী আর আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমাকে পাগল বলে! আমি আপন মনে হাসি হা হা করে।



আমি খুব অগোছালো হয়ে গেছি। রেডি হওয়ার সময় কিচ্ছু হাতের কাছে খুঁজে পাই না। খেয়াল করেছি, আমার চশমাটা সবার আগে হারায়! আজ এখনও পর্যন্ত কিছু খাওয়া হয়নি। ইচ্ছে করছে না! কদম গাছটা আমাকে কড়া গলায় বকে দিল। সকালের রোদ্দুরে ওর সবুজ পাতাগুলো অসম্ভব ঝকমক করছে। ও ওর পেট ভরে নিচ্ছে। গাছেদের বেশ সুবিধা! রোদ উঠলেই ভরপুর খাওয়া দাওয়া। অথচ মানুষকে পেটের জন্য কত অসম্মানিত হতে হয়। যারা আমার বেঁচে থাকাকে প্রতি মুহূর্তে বিষাক্ত করে তুলেছে, তাদের কাছেই এখনও আমি প্রার্থী। কদম গাছটা বললো, 

একদম ভালো করে খাওয়া দাওয়া করছো না। কে দেখবে তোমাকে, বিছানায় পড়লে? বলো তো? আমি কিন্তু এরকম করলে আর কথাই বলবো না। ওকে বললাম,

আজ ও বাড়ি যাচ্ছি। ওখানেই খেয়ে নেব। দুপুরবেলা ও বাড়ি গেলে, একবারও কি খেতে বলবে না? ওরা একবার খেতে বললেই আমি ওখানে আজ ভাত খেয়ে নেব।

ছাই বলবে!

না না ঠিক খেতে বলবে ওরা আজ। তারপর সানুকে নিয়ে ঘুমাবো। সানুকে ওরা আমার কাছে দেয় না। জানোই তো! তবুও এতদিন পরে এটুকুও কি দেবে না আমায়? সানু তো আমার ছেলে! ওরা সবাই আমাকে পাগল বলে। তাও জানো, সানু না আমাকে দেখলেই ছুটে আসে। ও আমাকে বরাবর খুব ভালোবাসে। ওর বাবার আবার তা নিয়ে খুব হিংসা ছিল।

সিঁড়ি দিয়ে নামতেই ডঃ গুপ্ত'র সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। মনে হয় এই আবাসনের বাসিন্দা হবেন। প্রায়ই ওকে এখানে দেখি। আমি কোনও ব্যাপারে অত খোঁজ রাখি না। উনি আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,

তাহলে বাড়ি যাচ্ছেন? আমি গম্ভীর স্বরে উত্তর দিলাম,

হুম। 

বেশ আসুন। বাইরে গাড়ি অপেক্ষা করছে। আপনি গাড়িতে বসুন। ওই গাড়িটা আপনাকে ডঃ উন্মেষ বসুর বাড়িতে পৌঁছে দেবে।

আমার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা কে করলো?

কেন আমরা! আমরা সবাই আপনাকে ভালোবাসি। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। এরা আমার ও বাড়ি যাওয়ার খবর কোথা থেকে জানলো? আমি তো যতদূর মনে পড়ছে, কাউকে কিছু বলিনি! এদের কারুর মুখও আমার ভালো মনে থাকে না। আমার সব কেমন গুলিয়ে যেতে থাকে। যাইহোক কথা না বাড়িয়ে, গাড়িতে উঠে বসলাম।



ওই তো দেখা যাচ্ছে আমার বাড়ি। কতদিন পরে যেন মনে হচ্ছে বাড়ি ফিরছি। একটা কাগজের উপরে সই----- সব কিছু কি মিটিয়ে দিতে পারে? পুরনো সব কিছুর জন্য আমি বড় কাঙাল। কিছুই আমি ফেলি না। ভুলতেও পারি না। ডাক্তার বলেছিলেন,

-আপনাকে ভুলতে হবে। পুরনো স্মৃতি জমা করে রাখবেন না। আপনার মস্তিষ্কটা তাহলে ওয়েস্ট বিনের মতো হয়ে যাবে। পুরনো স্মৃতিগুলো, যা আপনাকে কষ্ট দেয়, সেগুলোকে গার্বেজ ডিসপোজিং এর মতো ডিসপোজ অফ করতে হবে। মনে করে ওষুধগুলো খাবেন। আপনি এই নিয়ে কতবার যেন সুইসাইড অ্যাটেম্পট্ নিলেন মিসেস বসু? দু বার তাই তো? কেন করেন এমন? নিজের শরীরের কত ক্ষতি করেছেন জানেন? যখন নিজেকে একা মনে হবে, লিখে ফেলবেন আপনার মনের কথা। আমাকেও ফোন করতে পারেন। আপনার একটা ছোট ছেলে আছে, তার কথা একবারও ভাবেন না?

উন্মেষ! উন্মেষ! একসময় কত প্রেম জড়িয়ে ছিল শুধু তোমার নামটা ঘিরে। প্রথমদিন তুমি যখন আমাকে পড়াতে এলে, কী ভীষণ এক ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়েছিল আমার চেতনা। তোমারও কী তাই হয়েছিল উন্মেষ? আমি জানি তা নয়। কী করে হবে? তুমি তখন ডাক্তারী পড়ছো। দ্বিতীয়বর্ষ। আমি সবে ক্লাশ নাইনের পুঁচকে মেয়ে একটা। তুমি আমাকে সায়ন্স গ্রুপ পড়াতে। পড়িয়ে চলে যাওয়ার পরেও তোমার স্বর আমার কানে বাজতো আর তোমার রাগী রাগী ফর্সা গম্ভীর মুখটা প্রায়ই আমি স্বপ্নে দেখতাম। আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতাম তোমার লম্বাটে আঙুলগুলো আমার হাতের মুঠোতে ধরা। আমি অনেকটা পথ তোমার সঙ্গে হেঁটে চলেছি। আমাকে পড়ানোর পরে রোজ তুমি দিদির সঙ্গে অনেকটা সময় গল্প করতে। আসলে তুমি তো একসময় দিদির কোচিং এর বন্ধু ছিলে। দিদি প্রেসিডেন্সীতে ফিজিওলজিতে অনার্স করছিল তখন। তুমি নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র তখন। তোমাদের গল্পের সময় ওখানে আমার প্রবেশ নিষেধ ছিল। ঠিক নিষেধ নয়, আমি গিয়ে দাঁড়ালেই, তুমি আমাকে পড়তে বসতে বলতে। তোমরা বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে কী সব আলোচনা করতে বসে বসে। কখনও আবার খুব জোরে হেসে উঠতে দুজনেই। 

তখন আমার খুব হিংসা হতো উন্মেষ। বুকের ভেতরটা পুড়ে যেত। নিজেকে বার বার আয়নায় দেখতাম। ভাবতাম, আমি কি খুব খারাপ দেখতে? তখন থেকেই আমি দিদিকে নকল করতে শুরু করেছিলাম। দিদির মতো করে আমিও চুল কেটে ফেললাম। দিদি যেমন কথা বলতে বলতে, হাত দিয়ে আলতো করে চুল সরায়, আমিও তখন তেমন করতাম। তোমার চোখে কিছু একটা হতে চাইতাম আমি। আমার মনে হতো, তুমি একমাত্র সেই অনন্য পুরুষ, যার ভালোবাসা পূজার মতো পবিত্র। তাতে এতটুকু শরীরী গ্লানি নেই। এমনটা কী হয় উন্মেষ? আমি কিন্তু কল্পনায় এমনটাই ভাবতাম। আসলে আমার তো তখন বয়সটা খুব কম ছিল আর তুমিই ছিলে আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ ক্রাশ। মনে হতো তুমিই একমাত্র সেই পুরুষ, যে তার ভালোবাসার নারীকে দেখে বুদ্ধদেব বসুর অনুদিত ফরাসী কবি বোদলেয়রের সেই যুগান্তকারী কবিতার মতো উচ্চারণ করবে,

প্রিয়তমা সুন্দরীতমারে,
যে আমার উজ্জ্বল উদ্ধার--
অমৃতের দিব্য প্রতিমারে 
অমৃতেরে করি নমস্কার।

বাতাসের সত্তার লবণে
বাঁচায় সে জীবন আমার,
তৃপ্তিহীন আত্মার গহনে
গন্ধ ঢালে চিরন্তনতার।

শাশ্বত সৌরভ মাখে হাওয়া
কৌটো থেকে কোনো প্রিয় ঘরে
সংগোপনে, কোনো ভুলে-যাওয়া
ধূপদানি জ্বলে রাত্রি ভরে।

কেমনে অম্লেয় প্রেম ধরি
ভাষায় তোমাকে অবিকার,
এক কণা অদৃশ্য কস্তুরী
অসীমের গহ্বরে আমার।

সে উত্তমা সুন্দরীতমারে
স্বাস্থ্য আর আনন্দ আমার—
অমৃতের দিব্য প্রতিমারে
অমৃতেরে করি নমস্কার।

তোমার চোখে প্রিয় হয়ে উঠতে আমি দিনরাত এক করে তখন পড়তাম। মাধ্যমিকে আমি রেকর্ড নম্বর পেলাম। ভালো নম্বর পাওয়ায়, তুমি আমাকে একদিন হোটেলে খাওয়াবে বললে। যাওয়ার আগের দিন, আনন্দে আমি সারারাত ঘুমাতে পারলাম না। তোমার সঙ্গে কিছুটা মুহূর্ত কাটাতে পারবো ভাবতেই আমার অসম্ভব আনন্দ হতে লাগলো। পরেরদিন হোটেলে এসে দেখলাম, দিদি আর তুমি অনেক আগেই ওখানে চলে এসেছ। আমরা একটা কেবিনে খেতে বসলাম। তুমি আর দিদি টেবিলের একদিকে আর তোমাদের উল্টোদিকে আমি বসেছিলাম। বার বার তোমার দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল আমার। আমি লজ্জায় ভালো করে খেতে পারছিলাম না। তুমি বলছিলে,

মিমি ভালো করে খাও। তুমি চাউমিন পছন্দ করো না? আমি লজ্জায় অস্পষ্ট ভাবে ঘাড় নাড়লাম। 

একটু পরে দিদি আমাকে 'বিল কেন দিচ্ছে না' বলে, যখন ক্যাশে গিয়ে একবার দেখতে বললো, আমি স্পষ্ট দেখলাম দিদি আর তুমি চোখে চোখে কী এক গোপন সঙ্কেত করলে। আমি সেদিন বুঝেও বুঝতে চাইনি। এক ছুটে ক্যাশে বিল পাঠাতে বলে, কেবিনের দরজার সামনে এসে দেখলাম, তুমি দু হাতে দিদিকে বুকের ভেতর চেপে ধরে আছ। তোমার ঠোঁট দিদির ঠোঁটে মিশে গেছে। তোমার অসম্ভব সুন্দর লম্বাটে সেই আঙুলগুলো দিদির শরীরের নিষিদ্ধ স্থানে বাধাহীন ভাবে ঘুরছে। এক লহমায় আমার যেন কী হয়ে গেল। আমার স্বপ্নের পুরুষকে খুব সস্তা আর কামুক মনে হলো আমার। মনে হলো খুব সাধারণ। আমার আর দিদিকে হিংসা হলো না। কিন্তু বুকের ভেতর ভীষণ একরকম কষ্ট হলো। সেই দম বন্ধ কষ্ট যে কী ভীষণ তুমি জানো না উন্মেষ। তুমি বোধহয় কখনও জীবনে কাউকে এমন করে ভালোইবাসোনি। তুমি তাই বুঝতে পারবে না। আমি তখন মাত্র সতেরো বছরের কিশোরী উন্মেষ! নিজেকে শাস্তি দিতে চাইলাম। ওখান থেকে একাই বাড়ি ফিরে এসে প্রথমবার নিজের তুচ্ছ জীবনটাকে শেষ করে ফেলার চেষ্টা করলাম। হাতের শিরা কেটে ফেলে রক্তের স্রোত দেখে মন শান্ত হলো আমার। তবে মরা আমার ভাগ্যে ছিল না। মা জানতে পেরে গেলেন। তারপর খুব হইচই। ডাক্তার, হাসপাতাল। কেউ কিছু বুঝতে না পারলেও, আমি জানি দিদি সব বুঝেছিল। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমরা আর কোনো দিন কোনো কথা বলিনি। 


৫ 
বেরনোর সময় শান্তনীড়ের সিঁড়ির ল্যান্ডিং এ আজ একটা বিড়াল দেখেছিলাম। বিড়ালটা দেখে আজ অনেকদিন আগেকার একটা কথা মনে পড়ে গেল। গাড়িতে বসে, সেই কথাই ভাবছিলাম সারাটা পথটুকু। তখন সবে সানু পেটে এসেছে। উন্মেষের সঙ্গে আমার আপোষের সংসার চলছে। একটা রোগা বিড়াল আমাদের বাড়ির আসেপাশে ঘুরে বেড়াতো তখন। বিড়ালটা দেখতে মোটেই সুন্দর ছিল না। খাবারের অভাব ওর সমস্ত সৌন্দর্য হরণ করেছিল। পেটটা বেশ উঁচু আর বড় ছিল। আমার শাশুড়ি বললেন,

ওর বাচ্চা হবে। আশ্রয় খুঁজছে। 

কথাটা আমাকে বেশ নাড়া দিল। ভাবলাম, আমার মতো ও-ও মা হবে। আমার যা হোক একটা নড়বড়ে আশ্রয় আছে। ওর সেটাও নেই। যখনই দেখতে পেতাম, ওটাকে পাতের ভাত খেতে দিতাম। আমার প্রশ্রয়ে শীতের শুরুতে আমাদের ছাদের ল্যান্ডিং এ বিড়ালটা তিনটে বাচ্চা দিল। কী অপূর্ব দেখতে বাচ্চাগুলো। ঠিক যেন তুলোর বল! সকালবেলা আমার কাজের মেয়েটা এসে শাশুড়িকে খবরটা দিল। খবরটা আমার শাশুড়ি উন্মেষকে দিয়ে দিল। আমি স্নান করতে ঢুকেছিলাম। শুনতে পেলাম খুব কচি গলার কিঁউ কিঁউ আওয়াজ। বেরিয়ে দেখি, উন্মেষ বাচ্চাগুলোকে একটা প্লাস্টিক প্যাকেটে ভরে, আমাদের বাড়ির পাঁচিলের বাইরে ফেলে দিচ্ছে। সদ্য হওয়া বিড়াল বাচ্চা শুনেছি ধরতে নেই। আমি প্রতিবাদ করতে গেলাম। ওরা কেউ আমার কথা শুনলো না। বাচ্চাগুলো ওদিকে পড়ে যেতে বিড়ালটা অদ্ভুত স্বরে আর্তনাদ করে উঠেছিল। আমার স্নায়ুতন্ত্র সেই শব্দে অনুরণিত হয়েছিল অনেকক্ষণ ধরে। বহুদিন কানে বাজতো সেই স্বর। অনেকদিন ঘুমাতে কষ্ট হতো।

আমি এসে গেছি আমার বাড়িতে। লোভির মতো দেখতে থাকি চারপাশটা। আমার লাগানো নিম গাছটা এরা এখনও কাটেনি। পুব দক্ষিণে নিমের বাতাস ভালো বলে, এই গাছটা লাগিয়েছিলাম। রাস্তার কোণে আগাছার মধ্যে হয়েছিল নিম চারাটা। আমি দেখতে পেয়ে তুলে এনেছিলাম। ভয় ছিল ওরা রাখবে না, তুলে ফেলে দেবে। তাই বোধহয়, একটু বড় হতে গাছটার গায়ে, সাদা ফেভিক্রিল রঙ দিয়ে লিখেছিলাম ''অ্যাজাডিরেক্টা ইন্ডিকা, এ ভেরী বেনিফিশিয়াল, মাল্টিইউটিলিটি ট্রি"' 

গ্রীল গেট খুলে আমি বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। বাড়ির ভেতর ঢুকতে কেন জানি না কেমন দ্বিধা হচ্ছে। সানু কই আমার সানু? সানুর কথা মনে হতেই আমার সমস্ত মাতৃ সত্ত্বা হঠাৎ সোচ্চার হয়ে উঠলো সানুর খোঁজে। সানুকে নিজের কাছে নিয়ে যাবার কোনও উপায় নেই আমার। ওরা আমার সুইসাইড অ্যাটেম্পট থেকে কোর্টে প্রমাণ করে দিয়েছে, আমি পাগল। সন্তান প্রতিপালনে অক্ষম। 

দরজা খোলা আছে। আমি দরজায় মৃদু শব্দ করলাম। আমার শাশুড়ি আমাকে দেখে চমকে উঠলেন। এমনটা যেন আশা করেননি। আমার পাওনা গণ্ডা মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে, আমি আবার কেন? ওঁর চোখে মুখে এমন একটা অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো। বসতেও বললেন না। ওঁর দৃঢ় চোয়াল দেখে আমার কেমন শীত করে উঠলো। আমার প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে, বলেই কি এত শীত করছে? বুঝতে পারি না। আমি ওঁকে অগ্রাহ্য করার চেষ্টা করি। গলা তুলে ডাকি, সানু! সানু!

সানু নিচের ঘর থেকে ছুটে এসে দরজার কাছে দাঁড়ালো। তারপর পিছিয়ে গিয়ে আবার ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল। আজ শনিবার। শনিবার সানুর স্কুল ছুটি থাকে আর উন্মেষ বাড়ি থাকে না। উন্মেষ এখন উইক এন্ডে দিদির ফ্ল্যাটেই থাকে। জামাইবাবুর সঙ্গে দিদির ছাড়াছাড়ির পর থেকে এমনই চলছে।



দিদি আর আমি। একসঙ্গে বড় হওয়া, একসঙ্গে চাঁদের পাহাড় পড়া, ছাদে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে বৃষ্টি ভেজা আর ছুটির দুপুরে আাঁচার খাওয়া। সেই দিদি। আমার সহোদরা। কীসের প্রয়োজন ছিল তোদের? কেন এভাবে হিসেব বহির্ভূত সুখ দাবী করিস তোরা? আমি তোকে আজও ভালোবাসি রে! আর ভালোবাসি বলেই সেদিন অমন করে ভেঙে দুমড়ে গেছিলাম। 

ছোট থেকে আমাকে সবাই কেমন অবলীলায় থেতলে পিষে চলে যায়। আমি ভেতরে কষ্ট পাই আর পৃথিবী ছেড়ে বার বার পালাতে চাই। পারি না পালাতে। আনাড়ির মতো ধরা পড়ে যাই। যেদিন জানতে পারলাম উন্মেষ আর তোর সম্পর্কের কথা, সেদিন আমার সারা শরীরে সেকী অসহ্য জ্বালা পোড়া। মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে যাব। আমাকে কে শান্ত করবে সেদিন? মা বেঁচে থাকলে, কিছু না বলে, কোলে মুখ রেখে কাঁদতে পারতাম। মা হৃদয় দিয়ে শোক শুষে নিতে পারতো।

আমি আমার ঘুমের ওষুধগুলোকে বিছানার উপর সাজালাম। চির শান্তিদায়িনী মৃত্যু এসো। এসো সুশীতল মৃত্যু। আমার তাপিত দেহটা নিয়ে অমৃতলোকে রেখে এসো। এখানে আমি আর পারছি না। ভাবলাম না সানুর কথা। একবারও কেন ভাবলাম না সানুর কথা? সমস্ত ট্যাবলেটগুলো জল দিয়ে গিলে নিলাম। মাঝরাতে প্রচণ্ড বমি সে বার আমার প্রাণ বাঁচিয়ে দিল। পঙ্কিলতার মধ্যে থেকে গেলাম আবারও।

সানুকে আবার ডাকলাম, আয় সোনা আয়! আমার কাছে আয়! সানু আমার কাছে আসে না।

রান্নাঘর থেকে বিজয়িনীর মতো আমার শাশুড়ি বেরিয়ে এলেন। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, একী! শাশুড়ি নয়, আমার দিদি। দিদি দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। দিদি কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা বিকৃত গলায় বললো,

কেন আসিস এখানে এখনও? বুঝিস না, এটা আমার সংসার! উন্মেষ আমার স্বামী। তোর সঙ্গে উন্মেষের কোনওদিন বিয়ে হয়নি। কোনও সম্পর্ক নেই তোদের! তুই সিজোফ্রেনিক। তোর বর পরিমলও তোকে তাই ডিভোর্স দিয়েছে। তুই সব ভুল দেখিস, ভুল ভাবিস। আর কবে তোর চেতনা ফিরে আসবে? সানু তোকে ভয় পায়। শুনতে পাচ্ছিস আমি কী বলছি? তোর নিজের ছেলেও তোকে ভয় পায়। সানু যখন তোর পেটে আসে, তখন থেকেই তোর তীব্র অস্বাভাবিক আচরণের শুরু। পরিমলের সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর, তোকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসি। এখানে এসে সবসময় কী এক ঘোরের মধ্যে থাকতি তুই। আমার আর উন্মেষের সম্পর্ক সহ্য করতে পারতি না। তোর ভয়ে আমরা গোপনে মিলিত হতাম! ভাবতে পারিস! উন্মেষ চিরকাল শুধু আমার, তবুও----। তারপর সানু যখন বছর তিনেকের, তখন একদিন আবার তুই আত্মহত্যার চেষ্টা করলি। উন্মেষ তোর জন্য এখনও খুব চেষ্টা করে যাচ্ছে। তোর খোরপোশটা কেস করে জোগাড় করেছে। তোকে একটা ভালো বেসরকারি মেন্টাল হসপিটালে রেখেছে। তবুও তোর বিভ্রম এতটুকু বদলায়নি। এখনও তুই উন্মেষকেই-----। কী আশ্চর্য! কেন উন্মেষকেই -----! আমি জানি না। আমি সত্যিই আর পারছি না। উন্মেষ এখনও বলে, যে ওর ভালোবাসা পেলে, তুই নাকি সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যেতে পারিস। ও তোর জন্য এখনও বিষণ্ন হয়। আমি কিন্তু জানি তা নয়। আমার সুখের ঘরে তুই হলি মূর্তিমান অশান্তি। আসল হলো তোর হিংসা। আমার প্রতি তোর তীব্র হিংসা, তোকে পাগল করে দিয়েছে। আমাকে....... আমাদের একটু বাঁচতে দে এবার। কথা শেষ করে দিদি হাঁপাতে থাকে। ওর চোখেমুখে আমার প্রতি কী তীব্র ঘৃণা! 

আমার কানে সব কথা ঢোকে না। হিংসা? আমি তো কাউকে হিংসা করি না! আমি তো কেবল সারা জীবন জুড়ে ভীষণ ভীষণ ভালোবাসতে চেয়েছি। ছুটে গিয়ে সানুকে আঁকড়ে ধরি। সানু লম্বায় অনেক বড় হয়ে গেছে টের পাই। ওর মাথাটা প্রায় আমার বুকের কাছে চলে এসেছে? কবে এত বড় হয়ে গেল সানু? এতগুলো বছর তবে কী পার হয়ে গেছে? আমি..... আমি কী করে কিছুই টের পাইনি? সানু আমার হাত ছাড়িয়ে নেয়। তারপর শুকনো গলায় বলে ওঠে,

তুমি এখানে আর আসবে না। আমার একদম ভালো লাগে না।



ফিরে আসছিলাম। নিম গাছটার মুখটা দেখলাম বেজায় ভার। অনেক বছর আগে ওকে পুঁতেছিলাম। এখন ও বেশ একজন স্বাবলম্বী যুবক। সানুকে বুকে নিতে পারিনি। ওকেই বুকের ভেতর নিলাম। ওর এবড়ো খেবড়ো কাণ্ডটা মানুষের বুকের মতো কেমন বেশ উষ্ণ মনে হলো। আমার বুকের ক্ষতগুলোকে আমি সেই তাপে সেঁকে নিতে লাগলাম।

৫টি মন্তব্য:

  1. গল্পটি ভালো। কাহিনির টান আছে। লিখেছেন চমৎকার। কিন্তু শেষ অবধি কাহিনিই তো। আপনি কাহিনির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসুন।

    উত্তরমুছুন
  2. কাহিনিটা বেশ ভাল, তবে আরও ভালো লেখার অপেক্ষায় রইলাম দিদি

    উত্তরমুছুন