মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

২০১৮ সালে লেখা কণিষ্ক ভট্টাচার্যের সেরা গল্প : বাংলার ত্রস্ত নীলিমায়

এই গল্পটি নিয়ে গল্পকারের সঙ্গে আলাপ--
----------------------------------------------
গল্পপাঠ: 
গল্পটি কখন কোথায় লিখেছেন?

কণিষ্ক ভট্টাচার্য  :  
 ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমায়’ গল্পটি লেখা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের জুন মাসের শুরু দিকে। লেখা শেষ হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকে। গল্পটি কলকাতায় লেখা।

গল্পপাঠ:  
গল্পটি লেখার সময় কী কাজ করছিলেন। কী পড়াশোনা করছিলেন বা কী লিখছিলেন?

কণিষ্ক ভট্টাচার্য  :   
একমেরু বিশ্বায়ন যত নিজের অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে তত সাধারণ মানুষের মধ্যে মেরুকরণ বাড়ানো হচ্ছে। শাসকেরা কোথাও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, কোথাও ভুয়ো জাতীয়তা কিংবা ফাঁপা দেশপ্রেম আর কোথাও মিথ্যে গণতন্ত্রের বুলি আওড়াচ্ছেন। এই সময় সাধারণ মানুষকে নিজেদের সার্বিক প্রতিবেশ - ভাষা, সংস্কৃতি, জীবিকাসহ সবকিছু পুনরায় দাবি (reclaim) করতে হচ্ছে। এই প্রেক্ষিত থেকেই বাংলার নিজস্ব আখ্যানগুলি আবার পড়ছি। 

গল্পপাঠ: 
গল্পটির বীজ কীভাবে পেয়েছিলেন?

কণিষ্ক ভট্টাচার্য  :  
চার বছর ধরে এক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ছাত্র, যার নিজের ভাবনা প্রকাশের অসুবিধা আছে, প্রাথমিক ভাবে তাকে দেখেই গল্পটির বীজ পাওয়া।

গল্পপাঠ:  
সেই বীজ নিয়ে গল্প লিখতে আগ্রহী হলেন কেন? কেন মনে হল এই বিষয় নিয়ে গল্পটি লিখবেন?

কণিষ্ক ভট্টাচার্য  :  
সাধারণ মানুষের নিজের ভাবনা প্রকাশের প্রতিবন্ধকতার এক সর্বজনীন রূপ সারা পৃথিবীর গণতান্ত্রিক পরিসরে দেখা যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়েছে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ছাত্রটির মতো তাঁরা বিশেষ মনোযোগ দাবি করেন। 

গল্পপাঠ:  
গল্পটি কতদিন ধরে লিখেছেন? কতবার কাটাকুটি করেছেন?

কণিষ্ক ভট্টাচার্য  :   
প্রায় তিন মাস ধরে লেখা হয়েছে গল্পটি। অন্তত চারবার গোটাটাই বাতিল হওয়া ছাড়া অসংখ্যবার কাটাকুটি হয়েছে।

গল্পপাঠ:  
লিখতে লিখতে কি মূল ভাবনা পালটে গেছে?

কণিষ্ক ভট্টাচার্য  :   
মূল ভাবনা না পালটালেও তাঁর সঙ্গে যোগ বিয়োগ ঘটেছে। উপস্থাপন বদলেছে। বারবার।

গল্পপাঠ:  গল্পটি লেখার পরে প্রথম পাঠক কী ছিলেন?

কণিষ্ক ভট্টাচার্য  :   
নিকট বন্ধু।

গল্পপাঠ:  লেখার পরে কি মনে হয়েছে, যা লিখতে চেয়েছিলেন তা লিখতে পেরেছেন?

কণিষ্ক ভট্টাচার্য  :  
 ঠিক যা লিখতে চেয়েছিলাম তা লিখতে পারাটা বোধহয় উইটোপিক ধারণা।

 কণিষ্ক ভট্টাচার্যের সেরা গল্প
বাংলার ত্রস্ত নীলিমায়

১ 
আসুন প্রথমে একটা আকাশ টাঙানো যাক। 

কলকাতার দ্রাঘিমারেখা ধরে উদ্বাস্তু কলোনিগুলোকে জুড়ে জুড়ে রেলপথ চলে গেছে উত্তরে কর্কটক্রান্তিরেখার দিকে। সেই লাইনে লোকাল ট্রেন রোজকার মতো লেট করলেও ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে সেই আকাশের দেখা পাওয়া যায়। তখন ক্যালেন্ডারে মে মাস আর ঘড়িতে সময় দুপুর পৌনে বারোটা রাখলে, যে আকাশটা বয়ে এনেছেন, যে আকাশটা টাঙাতে আপনি সাহায্য করলেন তার দিকে আর তাকানো যায় না। মিড-ডে মিলের রোজকার হলুদগোলা জোলোডালের মতো আকাশে মঙ্গলবারের ডিমের ফ্যাকাসে কুসুমের মতো সূর্য। একটু দূরে নদীর কাছের ইটভাঁটির চিমনিগুলোর ছবি গরম হাওয়ায় কাঁপে। মাটি থেকে ভাপ ওঠে। সে ভাপ ছেঁকামোতির পেটে-বওয়া বাচ্চার নাম-না-জানা বাপের জন্যে শাপশাপান্তের মতো। পিচ রাস্তায় ছেঁকামোতির অতীতের মরীচিকা-জল ছড়ানো। 

ঢালাই থেকে ইটের রাস্তায় ঢুকতে মণ্ডলদের বাড়ির সীমানার সুপুরিগাছগুলোতে সুতলি দিয়ে বাঁধা সবুজ-লাল আর ‘নিদ্দল’ পার্টির সারসার কাগজের চেন ফ্ল্যাগ নিজেদের মধ্যে গুজগুজ করে। খড়ের গাদায় গোঁজা কাপড়ের ঝাণ্ডাগুলো বড়ো নেতাদের মতো নিজের গাম্ভারি ভাব দেখিয়ে ওদের থেকে আলাদা থাকে। মণ্ডলবাড়ির সীমানার ভেতর নিকনো উঠোনে শুকোতে দেওয়া ধান দেখার জন্যে হাবাকে কে যেন বসিয়ে দিয়ে গেছিল। হাবা কিছু বলছে না দেখে দুটো চড়াই ওর পায়ের কাছে ধান খুঁটছিল নিরুদ্বিগ্ন হয়ে। সাধ্যমত ধান খুঁটে চড়াই দুটো উড়ে যেতে হাবা গলার বিজবিজে ঘামাচি চুলকাতে চুলকাতে উঠে আসে। ওর পায়ের পাতা পাটামতো, নিচের দিকে সমান তাই মোটা লোকের মতো একটু থপথপ করে হাঁটে হাবা। ইটরাস্তা পেরিয়ে ইস্কুলের দিকে যায়। 

শিবালয় এফ পি ইস্কুলের হাতায় রঙ জ্বলে যাওয়া জাতীয় পতাকার চেন সেই তেইশে জানুয়ারি থেকে ঝুলছে। কাগজের গেরুয়া আর সবুজ রঙ ফ্যাকাসে হতে হতে সাদা হয়ে আসছে আর সাদা রঙ নোংরা হতে হতে ছাইরঙের দিকে যাচ্ছে। ফলে নীল চাকার অক্ষের মতো রঙগুলো কখনওই মেলে না। সুড়কি ফেলা পথটা দিয়ে ইস্কুলের দিকে ঢুকতে তিনটে গোল চাঙাড়ির বেড়ার গায়ে দুটো বোর্ডে লেখা ‘গাছ লাগান’ আর ‘প্রাণ বাঁচান’। বেড়ার ভিতরে সরকারি ফর্মে সংখ্যা-ভরার গাছ শুকিয়ে কালো আংরা হয়ে গেছে। ভোটের জন্যে ইস্কুল এখন কদিন ছুটি। 

ইস্কুলের বারান্দায় এসে হাবা হাসিহাসি মুখ করে বসে। হাবার এই হাসিহাসি মুখটার মধ্যে ভয় আর প্রশ্ন লেপটে থাকে। ওই হাসিটা দিয়ে ও বুঝে নিতে চায় সামনের লোকটা ওকে কী ভাবছে। একাধিক লোক থাকলে ও সবার দিকে মনোযোগ দিতে পারে না। বেছে নেয় এমন কাউকে যে লোকটা ওর সঙ্গে কথা বলে। এমনিতে কারও চোখের দিকে হাবা সোজা তাকাতে পারে না। হাসিহাসি মুখ অথচ চোরা চোখে বুঝে নিতে চায় ওর এখানে দাঁড়ানোর ফল কী হতে পারে। ইস্কুলের বারান্দায় যে ছেলেটা বসে দরদর করে ঘামছে আর হাবার দিকে না থাকিয়ে একদৃষ্টে দুটো ডেঁয়ো পিঁপড়ের একটাই লম্বা ঘাসের ডগায় নেতাদের মতো ওঠার চেষ্টা দেখে যাচ্ছে -- পাড়ার লোকে ওকে গবা বলে চিনলেও এই ইস্কুলে যে ভোটের বুথ তার সেক্টরস্যার ওকে গোবিন্দ বলেই ডাকে আর ওয়াটার ক্যারিয়ার বলে যে কাগজ দিয়েছে তাতে পুরো নাম গোবিন্দ মণ্ডল লেখা আছে। 

এখানে ইলেকট্রিকের লাইন এলেও রোজ সন্ধেবেলা নিয়ম করে কারেন্ট চলে যায়। তবু পাকা ছাদ আর টালি বা টিনের চালে চাকতি-অ্যান্টেনা আর ব্যাটারি তখন টিভিতে রূপকথা শোনায় এখানকার ঘরে ঘরে। যে রূপকথায় গ্রামের সরল মেয়ে বউ হয়ে শহরের বড়োলোক বাড়িতে যায় আর যাকে কথায় কথায় অপমান করে হাতকাটা জামা পরে সিগারেট টানা শহুরে সতীন। শাঁখাসিঁদুরের জোরে সেই পতিব্রতা যখন শ্বশুরবাড়ির মন জেতার চেষ্টা করে, তখন সেই নিত্যদিনের ইতর ও অনিঃশেষ লড়াইয়ের মধ্যে রাত্তির নামে এখানকার সবুজপার সাদা-শাড়ির ইস্কুলের মেয়েদের জীবনবিজ্ঞান বইয়ের বংশগতির অধ্যায়ে। সেই রাতে নদীপারে কালীতলার চক্কোত্তি পুরোহিত বাবার প্রসাদে দুটান দিয়ে লাল চোখে ফিরে যায় শিকল তোলা দরমার ঘরে আর মন্দিরের সিমেন্টের চাতালে সেই ছাই-না-ফেলা সিগারেট পাক খায় বেকার ছেলেদের হতাশ হাতে হাতে। নেশা যখন মজে আসে তখন শহর থেকে কাজ করে ফেরা লোকেদের স্টেশনে নামিয়ে হুইসিল দিয়ে কর্কটক্রান্তির দিকে এগিয়ে যায় রাতের লোকাল। 

এই অবধি আপনি যেমন জানেন আমিও তেমনই জানি। 

গোবিন্দর পাশে যে এসে বসল, সেই হাবার জানার মধ্যে আপনার চেনাজানা টিভির পর্দায় মাংস ছিঁড়ে খাওয়া সিংহের মুখের ছবি কিংবা নেতানেত্রীর হাসিমুখের ছবি, খুচরো নেতার তোলাবাজির ছবি আর নাড়ীভুঁড়ি বেরিয়ে আসা মেয়েদের ছবি যেমন আছে তেমনই আছে আপনার অজানা ছবিগুলো। যে ছবিতে ওর সোজা সিঁথি করে চুল আঁচড়াতে না পারা, জামার বোতাম ঠিক ঘরে লাগাতে না পারা, ভাতের দলা করতে না পারা, জিনিসের ওপরে জিনিস সাজিয়ে চুড়ো বানানো, ওর ঘুমের মধ্যে সিংহের থেকে প্রাণ বাঁচাতে হরিণের দৌড় আর প্যান্টের মধ্যে কী যেন হয়ে যাওয়া আছে। ওর ছড়ানো ভাতের দলার মতই এই ছবিগুলো কোনটা যে পড়ে যায়, কোনটা যে ওর মুখের চারপাশে লেগে থাকে আর কোনটা যে ভিতরে যায় আপনি বা আমি জানি না। 

“অ্যাক নাপিত আসিল। হ্যার অ্যাক শুয়ার আসিল। শুয়ারের বাচ্চা মাস্টারেরে গুঁতা মারসিল। মাস্টারের হাত ভাইঙ্গা গেসিল।” এই চারটে কথা ও বারবার বলে যাচ্ছিল। বলছিল আর বলতে বলতে হাসছিল। হাসছিল আর মাঝে মাঝে চোখ তুলে দেখে নিচ্ছিল যে গোবিন্দ ওকে দেখছে কিনা। দেখছে না দেখে ও আরও জোরে জোরে বলছিল। একে এই গরমে ফালতু বসে থাকা, তার মধ্যে কানের কাছে এই ভ্যাগ-ভ্যাগ শুনে বিরক্ত গোবিন্দ চিৎকার করে ওঠে, “অ্যাই হাবা থামবি!” হাবা থেমে যায় কিন্তু ওর হাসিটা থামে না। মাথা নিচু করে ও ফুলে ফুলে হাসে। গোবিন্দর চিৎকারে হাবা কথাগুলো আর জোরে জোরে বলছিল না। ও হাসছিল আর ওর ঠোঁট নড়ছিল বিড়বিড় করে। 

হাবা যেন গড়ানে বলের মতো, চট করে থামতে পারে না। ওর নাম ধরে না ডাকলে সাড়াও দেয় না। ওর মাথার মধ্যে শব্দ ঠোকাঠুকি করে। কোনও একটা শব্দ, একটা দুটো কথা ওর মাথার মধ্যে ঢুকে গেলে সেগুলো ওর মাথার ভেতরে রবারের বলের মতো এ-দেয়াল ও-দেয়াল করতে থাকে। হাবা ওগুলো থামাতে পারে না। ধরতে পারে না। নিজের মাথার ভেতরের গোল চত্বরে হাবা যখন দৌড়োতে থাকে তখন বলগুলো দেয়ালে লেগে অন্যদিকে গড়িয়ে যায়। ঘরে বাদুড় ঢুকলে যেমন অন্ধের মতো বোঁবোঁ পাক খায়, বেরতে পারে না, ওর মাথার মধ্যে কথাগুলো সেরকম ঘোরে। মাথার ভেতরে সেই কথাগুলোকে বয়ে-বয়েই এতদিন আছে হাবা। এই বহনের থেকে ওর ওর মুক্তি নেই। 

হাবার ভালো নাম ভরত মণ্ডল। এই ইস্কুলেই ও লিখতে পড়তে শিখেছিল। কিন্তু বুঝিয়ে বলতে পারত না ঠিক করে। সেই থেকে ওর নাম হয়ে গেল হাবা আর গোবিন্দর নাম হাবার ভাই গবা। গোবিন্দর কাকা মারা যাবার পর কাকি একদিন ওর মাকে ‘অরে দিদি একটু দেখিস’ বলে ঘরে ঢুকে গায়ে আগুন দিল। সেই থেকে হাবা জ্যাঠার ঘরেই আছে। হাবার নাকি জন্ম থেকেই মাথার অসুখ। আগে তেমন বোঝা যায়নি। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েও কিছু হয়নি। এখানে ওসব হয় না। কলকাতায় নিয়ে যেতে হবে। হাবা একটু কেমন যেন। আগে থামতে বললে হাবা থামত না। ঠাস ঠাস করে দুঘা দিলে তবে থামত কিন্তু রাগে ফোঁসফোঁস করত। ওকে কোনও কিছু নিয়ে জোর করলে হাবা রেগে যায়। খুব রাগ হাবার। হাওয়ায় হাত পা ছোঁড়ে। নেহাত মারামারি করতে পারে না বলে, নয়তো ওর হাত যদি একবার এসে লাগে তবে চেপে ধরে বসে যেতে হবে। আগে গোবিন্দ মারলে হাবাও হাত চালাত। তখন গোবিন্দ আরও মারতো ওকে। 

আজ রোদও দিয়েছে তেমন। হাবাকে গোবিন্দ বলে “চ হাবা ইস্কুলের ভিতরে গিয়া বসি।” দুবার বলতে তবে ও উঠল। গোবিন্দ ঘরে বসে একটা বিড়ি ধরিয়ে দেখে, হাবা একটা চক দিয়ে ঘরের এ-মাথা থেকে ও-মাথা দেয়ালে দাগ টানে। দাগের ওপর একটা দরজা আঁকে। দরজা থেকে একটা সিঁড়ি নামায় নিচের মেঝে অবধি। ঘরের কোনায় জমা করা বই এনে ওর সিঁড়ির নিচে একটা ধাপি করে গোবিন্দর পাশে এসে হাসিহাসি মুখে বসে। একটা হাসি হাবার মুখে মাঝে মাঝে ফোটে, যে হাসিটায় ওর নিজেরই বিশ্বাস নেই। আসলে সামনের লোকটা রেগে যাব কিনা ও বুঝতে পারে না। হাসলে যদি কিছু না বলে তাই এমন একটা হাসি মাঝে মাঝেই হাসে। গোবিন্দ জিজ্ঞেস করল “ওটা কী করসস হাবা?” হাবা বলল “হেইয়া ইস্কুলের দোতালা করসি।” হাবার মুখে ইস্কুলের দোতলার কথা শুনে ভয় পায় গোবিন্দ। হাবাকে ঘরে ঢোকানোটা ভুল হয়েছে। ইস্কুলের দোতলার টাকা যে মেম্বার মেরে দিয়েছে সেটা গ্রামের লোকে চন্দ্রসূর্যের মতো সত্যি জানে কিন্তু কেউ বলে না। যেমন জানে নদীর বালির খবর। হাবার কানে সব যায় কিন্তু কোনটা কখন বেরিয়ে আসবে আর কীভাবে বেরিয়ে আসবে এই এক বিপদ। গোবিন্দ তাড়াতাড়ি উঠে মুছতে যায় দেয়াল। 

গোবিন্দ হাবাকে বাড়িতে রেখে আসবে বলে ইস্কুল থেকে যখন বেরোয় তখনই গাড়িগুলো এসেছিল। সেক্টর স্যারের সাদা অ্যাম্বাস্যাডার গাড়িটা এই কদিনে গোবিন্দ চিনে গেছে। পিছনে একটা ‘ছোটা হাতি’তে কতগুলো বিরক্তি উপচানো, হাক্লান্ত মুখের লোক। তার মধ্যে একটা রোগা ভাবলেশহীন পুলিশ আর চারটে ভোটের লোক। তাদের সঙ্গে ভোটের বাক্স, জিনিসপত্র তার ওপর লোকগুলোর ব্যাগ। মোটাসোটা একটা তো লোক নিজেই নামতে পারে না গাড়ি থেকে। এমন গাড়িতে চড়তে হয় না শহরের বাবুদের। গোবিন্দ তাড়াতাড়ি এগিয়ে ওদের সঙ্গে জিনিসগুলো ধরছিল। হাবা গাড়ির নামানো ডালার কাছে এসে বলল, “আমি, আমি নিমু। আমারে দ্যাও।” হাবাকে কালকেও সেক্টর অফিসার গোবিন্দর সঙ্গে ঘুরতে দেখেছে। ভোটের সবুজ ব্যালট বাক্সটা, যেটাকে সরকারি লোকেরা বলে গোদরেজ টাইপ, হাবার হাতে দিয়ে সেক্টর অফিসার বলে, “এটা সবচেয়ে দরকারি জিনিস। তুমি এটা নিয়ে যাও। ভালো করে বইবে। পড়ে না যায়।” হাবা ফাঁকা ব্যালট বাক্সটা বয়ে থপথপ করে ইস্কুলের দিকে চলে যায়। 

২ 
মানুষ যখন কাউকে হারায় তখন সে কাঁদে না, যখন কাউকে হারাতে চায় না তখনই কাঁদে। হাবা বোধহয় হারানো কি বোঝে না। হাবা মা কমলা যখন ওর জা লক্ষ্মীকে ‘অরে দেখিস’ বলে ঘরে ঢুকেছিল তখন কি আর লক্ষ্মী বুঝতে পেরেছিল কী হতে যাচ্ছে! তবু মেয়ে মানুষের জান তো বেড়ালের জান, সহজে যায় না। ওর বাবা তো দুপুর রোদে একবার বুক ধড়ফড় করে মাঠেই মরে গেল। কমলা ওই পোড়া শরীরটা নিয়ে তিন-তিনটে দিন ছিল হাসপাতালে। হাবাকে নিয়ে গেছিল গোবিন্দর বাপে। হাবা কাঁদেনি। আসলে কিছুই করেনি, চুপ করে একদৃষ্টে চেয়ে থাকা ছাড়া। শ্মশানে গিয়েও হাবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। কাজকম্ম সব গোবিন্দই করেছে। সেদিনই লক্ষ্মী ভেবেছিল পেটের ছেলের থেকে কখনও আলাদা করবে না ওকে, অমন হাবা ছেলেকে কাছছাড়া করলে যে মরে যাবে! কতবার ভেবেছে বকবে না, মারবে না। তবু মার কি খায়নি হাবা, অনেক খেয়েছে। একে এই অভাবের সংসারে এদিক ঢাকতে ওদিক উদলা হয়। তার মধ্যে জোয়ান ছেলেটা চোখের সামনে ঘুরে বেড়াবে, তাকে হাতের কাছের একটা-দুটো কাজ কি মানুষে বলে না! একটু শুকোতে দেওয়া ধান দেখতে বসিয়ে রাখলেও ও ওই ভাবেই বসে থাকে, এদিকে পাখিতে মুখ দেয় ধানে। লক্ষ্মী ওকে বকে আর হাবা কেমন একটা চোখ করে তাকিয়ে থাকে যেন কিছুই ওর কানে গেল না। সেই চোখ ঠিক অবজ্ঞার নয় আবার সেই চোখে যেন কোনও বিকার নেই। হাবা কখনও কাঁদে না। বড়োমা মারলেও না। ওইরকম উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে। রান্না করার সময় পিছনে বসে বসে কৌটোর ওপর কৌটো সাজায় অথচ খেতে দিলে খায় আর না দিলে চুপ করে বসে থাকে। পেট কুঁকড়ে গেলেও হাবা খেতে চায় না। ওর ভেতরে যে কী চলে কিছু বোঝে না লক্ষ্মী। 

হাবা কোথায় কী বলে বসে ঠিক নেই। গোবিন্দর সেদিন অনেক কাজ। সকালে ও একবার ইস্কুলে গিয়ে রুটি আর আলুভাজা দিয়ে এসেছে। মোটা লোকটাই ওদের প্রিসাইডিং, ওকে সবাই স্যার স্যার করছিল। ওই টাকাপয়সা দেবে খাবারের। সকালে একবার জল দিতে ঢুকে গোবিন্দ দেখেছে ওখানে চেঁচামিচি হচ্ছিল। মেম্বার রঞ্জিতদা ধমকাচ্ছিল লোকটাকে। লোকটাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়, বারবার বলে ‘আপনি আগে জায়গায় গিয়ে বসুন, সব শুনব তারপর।’ এই গোলমালের মধ্যে হাবাকে সঙ্গে নিয়ে নিয়ে ঘুরতেও পারবে না গোবিন্দ। এদিকে গোবিন্দকে বেরতে দেখলে ওর পিছু ছাড়ে না হাবা। সকালে যাওয়ার সময় ওর পিছনপিছন গিয়ে সেই সবুজ বাক্স নিয়ে টানাটানি করছিল, তাই গোবিন্দই হাবাকে কালীতলার চাতালে বসিয়ে দিয়ে এসেছিল দুপুরবেলা। ওখানে আজ কেউ নেই। পাড়ার ছেলেরা সব ইস্কুলের আসেপাশে আছে এখন। না থাকলে পরে কাজ পাবে না কোনও। হাবা এমনিতেও গরমকালে মাঝে মাঝে গিয়ে চাতালে শুয়ে থাকে। নদীটা নামে না কখনও। বোধহয় জলে ওর ভয়। 

মন্দিরের গাছের ছায়ায় হাড়িকাঠ পোঁতা ঠাণ্ডা চাতালে হাবা একা একা শুয়ে চারপাশ দেখে। চাতালে তাজা ফুলপাতার গন্ধের সঙ্গে পচা ফুলপাতার গন্ধ মেশে। নদীর মেটে মেটে একটা আঁশটে গন্ধ ভেসে আসে। হাড়িকাঠের গন্ধ চেনে হাবা। ঠাকুরেরও একটা গন্ধ আছে, হাবা কাছে গিয়ে শুঁকে দেখেছে। কেমন একটা ধুপধুপ গন্ধ। অন্যদিন চাতালে শুয়ে শুয়ে হাবা দেখে নদীর দিকে বালির লরি আসে, ভরে চলে যায়। আজ কোনও লরি নেই। হাবা শুয়ে শুয়েই চোখ ঘুরিয়ে দেখে, ঘাসের ফাঁক দিয়ে দিয়ে গিয়ে চাতালের ঝোপের পাশে আস্তে আস্তে খোলস ছাড়ে সাপ। বোধহয় ভয় পেতে জানে না বলেই ওর ভয় লাগে না। চাতালে শুয়ে শুয়ে পিঠ ঘসে এমাথা ওমাথা করে হাবা। 

শিবের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা কালীমূর্তি দেখে হাবা মনে মনে ভাবে, হ্যারে মা কয়! জিভটা ল্যা ল্যা করে ঝুলতাসে। লাল টকটকা জিভ। যেন্‌ রক্ত মাখাইয়া আনসে অ্যাহন। গলায় মালাডার কাটা মুন্ডুগুলা এবুক অবুক দুলতে আসে। মুন্ডুগুলা হ্যার বুকদুটায় ঘাই মারে যেন্‌ পুরাতন পুকুরের বুড়া মাছের মত। হেই কাটা গলার লদলদে মাটির থিকা লাল রক্তরঙ লাগতে আসে বুকগুলায়। বুকের বোঁটাদুটো শক্ত হয়া উপর দিকে মুখ করা আসে। পেট বায়া হেই রক্ত নামতাসে কমরের কশি অব্দি। ঠোঁটের কষ বায়া রক্তের ধারা নাম্যা শুক্যা গেসে। হাতের খাঁড়াডার গায়ে রক্ত। হেই খাঁড়া দিয়া কী মানষের মাথা কাটন যায়! ল্যাতপ্যাত করতে আসে টিনের খাঁড়াখান। মানষের মাতা তো নয় অসুরগুলার মাতা। হের আরেক হাতে কাটা মাথা ঝলে তার থিকাও টপটপ করা রক্ত চুতাইতাসে। মনে লয় হ্যায় যেন্‌ শিবঠাকুর নয়, হাবার শরিলের উপর দিয়াই হাঁটে, তবু যেন্‌ হ্যার শরিলের কুনো ভার নাই, হাওয়ায় ভাইস্যা চলসে। পায়ের তলা টকটকা লাল। তপ্‌তপা মাটির আঙ্গুল হাবার প্যাটের উপরে। হাবার বুকের উপরের বাতাসে যেন্‌ সেই পায়ের পাতা পড়তাসে। কালো পায়ের গোছ, কালো দাবনা যেন্‌ কলাগাছডার তেল চুকচুক গায়ের পারা লাগে। দেখে যেন হাবার পুরুষ বুকের বোঁটাদুটাও যেন শক্ত হয়ে আসে। দাবনার উপর থেকে আর দেখতে পায় না হাবা। একটা করে কুনুই থেকে কাটা হাত আর একটা করে মুন্ডু কোমর থেকে কশি দিয়ে ঝোলানো। তার ভিতর দিকটা ওদের ঘর ছাড়িয়ে ঝুপসি মানের পাতায় ঢাকা নালার কালো জলের মত অন্ধকার। ওর যেন ভিতরে কী একটা হয়। সবাই এরে মা বলে, হাবার মায়ের মতো লাগে না। হাবার মা এমন নয়। 

সাপের খোলসের গন্ধ ফাটা ডিমের খোলার মতো। হাবার মনে পড়ে মাঝে মাঝে, এমনই একটা গন্ধ ছিল হাসপাতালে মায়ের পোড়া গায়ের ফাটা চামড়ার ভেতরে গোলাপি জায়গাটায়। হাবাকে হাসপাতালে মায়ের সামনে বসিয়ে ওরা বলেছিল জল দিতে মুখে। হাসপাতালের একটা স্টিলের গেলাস ওর হাতে দিয়েছিল। বড়োমা কাঁদছিল। গেলাস হাতে হাবা বসে দেখছিল মায়ের গায়ের চামড়া পুড়ে কুঁচকে গেছে, ফেটে গেছে। তার ওপরে সাদা ক্রিম লাগানো আর ক্রিমের ভেতর দিয়ে সেই গোলাপি জায়গায় ডিমের খোলার গন্ধ। মা মরে গেলে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিল ওরা। ওখানেও ধোঁয়ার মধ্যে ওই ডিমের খোলার গন্ধ পেয়েছিল হাবা। তারপর ওর মাথা নেড়া করে দিয়েছিল। 

“আমার একটা মা আছিল। আমার একটা মা আছিল না!” হাবার কথা জলের ফোঁটার মতো পড়ে চাতালে। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে জলের ফোঁটা। হাবা এক কথা বারবার বলে যায়। জোর করে না থামালে থামতে পারে না। “আমার একটা মা আছিল। আমার একটা মা আছিল না!” জলের ফোঁটার মধ্যে আরও জল জমা হয়। হাবা বলে যেতে থাকে আর জমা জল পূর্ণ বহমান হয়ে গড়াতে গড়াতে চাতাল ছেড়ে ঘাসে নামে, ঘাস থেকে গড়িয়ে যায় নদীর দিকে। 

নদীর পার থেকে উঁচু পেট নিয়ে উঠে আসে ছেঁকামোতি। পাগলি ছেঁকামোতিকে চটালে মুখখিস্তি করে, শাড়ি তুলে দেখায়। গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে অভিশাপ দেয় যেন ওর মুখের কথা খসলেই সেটা ফলে যাবে। শিবালয় গ্রামের লোকে বলে ছেঁকামোতির কথা নাকি সত্যি হয়, ‘ওর লগে তো দুনিয়ার যোগ থাকে নাই তাই আন দুনিয়ার খবর ওর কাছেই আগে আসে’। ছেলেপুলে সে কথা বিশ্বাস করে না। শিবালয়ে ওর বাড়ি নয়, গ্রাম ছাড়িয়ে পির মাজারের হাটে কালীপুজোর রাতে যে যাত্রা হত সেই দেখতে কোত্থেকে এসে জুটেছিল ছেঁকামোতি। যাত্রার গানের সময় ছেঁকামোতি ঘুরে ঘুরে গান করছিল। ওকে নাকি ওর বর ছেঁকা দিয়েছিল তার থেকে মোতি পাগল হয়ে গেছে। তাই মোতির ভোট নেই। ভোট দিতে কার্ড লাগে, কাগজে নাম লাগে, মেয়ে মানুষ হলে বরের কি বাপের নাম লাগে, ঠিকানা লাগে। ছেঁকামোতির বাপের নাম কেউ জানে না, ওকে বর ওকে তাড়িয়ে নাকি আবার বিয়ে করেছে। ছেঁকামোতির কোনও ভোট নেই, কার্ড নেই, নম্বর নেই। ওসবের দরকারও নেই ওর, ওর নিজের বলতে আছে একটা তোবড়ানো থালা। তাই নিয়ে ও সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। রাতে এর-তার দাওয়ায় নয়তো পির মাজারের হাটের বেদিতে শুয়ে থাকে। হাটের পিছনে চোলাইয়ের ঠেকের লোকেরা ছোঁকছোঁক করে ওর উথালপাথাল পোশাকের চারপাশে। পেটে পানি পড়লে ওদের বাপের ঠিক থাকে না তো মেয়েমানুষ। আন দুনিয়ার খবর ছেঁকামোতির কাছে আসুক না আসুক একটা রক্তের ডেলা এই দুনিয়া থেকেই ওর পেটে এসেছে। কী হচ্ছে দেখতে ভোটের দিন সকাল সকাল বার দুয়েক ইস্কুলে গেছিল ছেঁকামোতি। কে যেন ধাতানি দিয়ে খেদিয়ে দিয়েছে ওকে। তাড়া খেয়ে ছেঁকামোতি নদীপারে এসে বসেছে। 

“আমার একটা মা আছিল...” বলে যায় হাবা। ছেঁকামোতি নদীর পার থেকে উঠে এসে হাবার সামনে দাঁড়ায়। হাবা আবার বলে, “আছিল না, আমার একটা মা?” ছেঁকামোতি ওর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে। নদীর দিক থেকে বিকেলে যে হাওয়াটা ছাড়ে সেটা ছাড়ছে আস্তে আস্তে। তবু বিকেলের রোদ তখনও ছেঁকাবদির মনের স্থায়ী উত্তেজনার মতো জ্যান্ত। বাতাসে ছেঁকামোতির বুকের কাপড় ওড়ে। ওর বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে হাবা। ছেঁকামোতি হাবার মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে বলে “আছিল তো, আমারও একটা মা আছিল। বর আছিল।” 

হাবা হঠাৎ চুপ করে যায়। ওর বুকে মাথা রেখেই বলে, “বর আছিল তোমার?” 

“আছিল তো। আমায় ছেঁকা দিল, আগুনের ছেঁকা। আগুনে আমার ভয় করে জানে, তবু দিল।” 

“ক্যান, আগুনে ভয় করে ক্যান?” 

“জ্বলে তো! জ্বলে না?” 

“কী জ্বলে?” 

“ওই সুজ্জি জ্বলে, উনান জ্বলে, মানুষ জ্বলে।” 

“হ, মানুষ জ্বলে। আমার মায়েও জ্বইল্যা গেছিল।” খানিক চুপ করে থাকে হাবা। আবার বলে, “আমার একটা মা আছিল। আছিল না, আমার একটা মা!” 

ছেঁকাবদি হাবাকে বলে “গল্প শুনবি?” 

হাবা চুপ করে বসে থাকে। হাবাকে বুকে নিয়ে ছেঁকামোতি সুর করে দুলে দুলে বলে যায়, 

“তবে জন্মেজয় কহে শুন তপোধন। তার পরে কি হইল শুনত এখন।। মুনি বলে শুন পরীক্ষিতের নন্দন। তার পর যা হইল কহি বিবরণ।। ব্যাস বলে শুন এবে ধর্মের নন্দন। চিত্ত শান্ত করি শুন ত্যজ শোক-মন।। উত্তানপাদ রাজা সেই পূর্বেতে আছিল। ধ্রুবে রাজ্য দিয়া রাজা তপস্যায় গেল...” 

রাস্তার ধারে বাইকের আওয়াজ শুনে হাবাকে সরিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসে ছেঁকামোতি। এই আওয়াজ ওর চেনা। দুটো ছেলে বাইক দাঁড় করিয়ে নেমে আসে। পিছনের ছেলেটার হাতে একটা বড়ো নাইলনের থলে। মন্দিরের চাতাল পেরিয়ে ঘাসজমি যেখানে শেষ হয়েছে ওইখানে নিচু হয়ে বসে বসে কী যেন ভরে ওদের থলেতে। ফেরার সময় হাবা আর ছেঁকামোতিকে দেখে ওদের একজন বলে “কীরে আশনাই চলতাসে?” অন্যজন উত্তর দেয় “ছাড়, ওগুলা এহানে থাকে মাঝে মাঝে।” তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে বলে, “অ্যাই, ওদিকে যাবি না তরা।” বলে বাইক নিয়ে ফিরে যায়। 

‘যাবি না’ শুনে মোতি ওর গল্পটা আবার বিড়বিড় করতে করতে চাতাল থেকে উঠে নদীর ঢালের দিকে নেমে যায়। হাবা আবার চিত হয়ে শুয়ে পড়ে চাতালে। বিকেল তখন নেমে গিয়েছে নদীর জলে। সূর্য অস্তের বাকি নেই বেশি। রক্তের মতো লাল মেঘ ধীরে ধীরে নীল আকাশের সীমার দখল নিচ্ছে তখন। মোতিও ওই ছেলেগুলোর মতো ওখানে বসে গর্তের মধ্যে রাখা ডালডার বালতি থেকে একটা সুতুলির গোলা তুলে ওর তোবড়ানো থালায় রাখে। সুতুলির গোলাটা ওর থালার চ্যাপ্টা কানার দিকে গড়াতে থাকে। ছেঁকামোতি বিড়বিড় করে বলে যায়, 

“হেনকালে মৃগী এল জল খাইবারে। আচম্বিতে সিংহনাদ হৈল তথাকারে।। গর্ভবতী হরিণীর হৈল গর্ভপাত। প্রসব করিয়া মৃগী হইল নিপাত।।” 

৩ 
শিবালয় অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘প্রাণ বাঁচান’ বোর্ডের সামনে যখন প্রথম বোমাটা পড়ে তার অনেক আগেই গোবিন্দ বেরিয়ে এসেছিল ইস্কুল থেকে। রাস্তা পার হয়ে বাড়িতে ঢুকে গেছিল। অনেকক্ষণ থেকেই মোটা লোকটার সঙ্গে মেম্বারের ঝামেলা হচ্ছিল। ইস্কুল ঘিরে রেখেছিল মেম্বারের লোকজনেরা। লোকটার কাছ থেকে সব কাগজপত্র নিয়ে নিয়েছিল। এর মধ্যে লোকটা বাইরে এসে কাকে যেন ফোন করছিল। তার মধ্যে ‘ফোর্স’ শব্দটা একবার শুনেছে গোবিন্দ। গোবিন্দকে দেখে ওর মা বলে “আগে তুই হাবারে লইয়া আয়।” গোবিন্দ যখন হাবাকে আনতে বেরিয়েছে বাড়ি থেকে তখন দেখে মোটা লোকটাকে মারতে মারতে রেল লাইনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে মেম্বার আর কিছু লোক। এদের দেখে গোবিন্দ ভাবে এরা কারা, এদের তো গ্রামে কখনও দেখেনি ও। তাড়াতাড়ি পা চালায় গোবিন্দ। প্রথম বোমের আওয়াজটা যখন শুনতে পায় তখনও গোবিন্দ পাড়া ছাড়িয়ে যায়নি। লোকজনের দৌড়োদৌড়ি শুরু হয়ে গেছে। আবার আরেকটা আওয়াজ হয় নদীর দিকে। তখন যে যেদিকে পারছে ছুটছে। গোবিন্দ তাড়াতাড়ি পাড়ার এক বাড়ির পিছনে লুকিয়ে পড়ে। 

হাবা শুয়ে ছিল চাতালে। বোমের আওয়াজ শুনে হাবা তাড়াতাড়ি উঠতে গেলে আরও জোরে একই রকম আরেকটা আওয়াজ হয় ওর খুব কাছে নদীর দিকে। বোমের আওয়াজে ছেঁকামোতির থালা থেকে সুতুলির গোলাটা পড়ে আরও জোরে একটা আওয়াজ হয়েছে। কানে যেন তালা লেগে যায় হাবার, দেখে আকাশের মেঘের মতো একটা লাল মেঘ মোতির পায়ের কাছে যেন পাক খায়। ভয়ে দৌড়োতে থাকে ও। রাস্তা দিয়ে থপথপ করে দৌড়ে হাবা যখন ইস্কুলের দিকে পৌঁছয় তখন ইস্কুল চত্বর শুনশান। দূর থেকে একটা পুলিশের গাড়ি আসছে। রাস্তায় লোক নেই কোনও। দুটো বাক্স পড়ে আছে। তার একটায় আগুন জ্বলছে। একটু দূরে খোলা বাক্সের চারপাশে গোলাপি, সাদা আর হলুদ রঙের কাগজ ছড়িয়ে আছে। কয়েকটা কাগজ জ্বলছে তখনও। পাশে সবুজ বাক্সটা পড়ে আছে খালি। এই বাক্সটাকে হাবা জ্বলতে দেবে না। তাড়াতাড়ি ওটাকে জাপটে ধরে হাবা। ছেঁকামোতি যেমন ওকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়েছিল তেমনই বাক্সটাকে বুকে আঁকড়ে ধরে হাবা আবার দৌড়োয় নদীর দিকে। এই বাক্সটা ওর। ওকেই বয়ে নিয়ে যেতে বলেছিল তো। এটাকে ও জ্বালাতে দেবে না। ওর তো, ওর না! বাক্সটা! 

বাক্সটা বুকে চেপে হাবা দৌড়োতে থাকে। ইস্কুলের রাস্তা পেরিয়ে বাঁশবনের পাশ দিয়ে। গোবিন্দ দূর থেকে দেখতে পায় হাবাকে। হাবা দৌড়চ্ছে। গোবিন্দ ওকে ডাকতে গিয়েও থেমে যায়। লুকিয়ে বেরিয়ে এসে দৌড়োতে থাকে। গোবিন্দকে দেখে মেম্বারের লোকেরা তাড়া করে ওকে। পুলিশের অফিসার নির্দেশ দেয় ভায়োলেন্ট মবকে ক্লিয়ার আউট করতে। গাড়ি থেকে নেমে পুলিস দৌড়োয় সবার পিছনে। হাবা আরও জোরে দৌড়োতে থাকে। এই বাক্সটা হাবা কাউকে দেবে না। হাবাকেই এটা বয়ে নিয়ে যেতে হবে। হাবা নদীর দিকে দৌড়োয় যেখানে জল আর মাটির মাঝে ছেঁকামোতি শুয়ে শুয়ে বাকি গল্পটা বলে যাচ্ছে বিড়বিড় করে, 

“পৃথিবীই বহে পদ পদ হবে জানু। জানু বহে ঊরুদেশ ঊরু বহে তনু।। তনু বহে বক্ষস্থল বক্ষ বহে গ্রীবা। গ্রীবাই মস্তক বহে কারে বহে কেবা...” 

ছেঁকামোতির শরীর থেকে রক্তের ডেলাটা বেরিয়ে গেছে। পাদুটো উড়ে গিয়ে গেছে হাঁটুর নিচ থেকে। ছেঁকামোতির শরীরটা ছিটকে গিয়ে পড়েছে জলের দিকে। লাল মেঘের ছায়া পড়েছে লাল জলে। হাবা দৌড়চ্ছে ওই মেঘের দিকে। 

আসুন, আপনার বয়ে আনা, ওই টাঙানো আকাশটা এবার গুটিয়ে ফেলা যাক। 

ওটা গুটিয়ে না ফেললে হাবা থামবে না। হাবা তো এখনও জানে না যে থপথপ করে এই নদীর সামনে এসে ওর আর জলের ভয় থাকবে না, অথচ এই নদী পেরলে হাবা পৌঁছে যাবে আরেক মেম্বারের অঞ্চলে। সেই অঞ্চল পেরিয়ে কাঁটাতারের সামনে হয়তো থমকে দাঁড়াতে পারে হাবা, যেই কাঁটাতার দিয়ে বেড়াল পার করার মতো লাখে লাখে মানুষের দায় ঝেড়ে ফেলতে চায় রাষ্ট্র আর বার বার মানুষ প্রাণ বাঁচাতে কাঁটাতার পেরোতে গিয়ে তাতেই ঝুলে থাকে আগুনে ঝলসানো পাখির মতো। তবু সেই কাঁটাতার যদি পেরিয়ে যায় হাবা, তাহলেও তো আবার একটা ব্যবস্থা, একটা দেশ। এখন কোনও কাঁটাতারের কোনও দিকেই ওই বাক্সটা আর নিরাপদ নয়। 


-------------------------------------------------
ঋণ – কাশীরাম দাস ও জীবনানন্দ দাশ। 

============================================================================================= 



নাম – কণিষ্ক ভট্টাচার্য। 

জন্ম তারিখ ও স্থান – ১৪ জানুয়ারি ১৯৭৬। কলকাতা। 

পড়াশোনা – হেয়ার স্কুল। কলকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা। 

বর্তমানে কোথায় থাকেন – কলকাতা। 

প্রকাশিত বইয়ের নাম – 

১. ছোট্টো রাজকুমার। অনুবাদ। 

২. কৃষ্ণগহ্বরের স্মৃতিফলকেরা । গল্প সংকলন । 

প্রকাশকের নাম ও ঠিকানা – 

১. হযবরল – সৃষ্টিসুখ প্রকাশন। হাল্যান, বাগনান। হাওড়া ৭১১৩১২। সিটি অফিস – ৩০ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট। কলকাতা - ৭০০০০৯ 

২. সৃষ্টিসুখ প্রকাশন। হাল্যান, বাগনান। হাওড়া ৭১১৩১২। সিটি অফিস – ৩০ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট। কলকাতা – ৭০০০০৯ 

============================================================================================= 

গল্পের বিষয়ে গল্পপাঠ পত্রিকা সূত্রে যা জানতে চাওয়া হয়েছে। 



১. গল্পটি কখন কোথায় লিখেছেন? 

উত্তর – ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমায়’ গল্পটি লেখা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের জুন মাসের শুরু দিকে। লেখা শেষ হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসের শুরুর দিকে। গল্পটি কলকাতায় লেখা। 

২. গল্পটি লেখার সময় কী কাজ করছিলেন। কী পড়াশোনা করছিলেন বা কী লিখছিলেন? 

উত্তর – একমেরু বিশ্বায়ন যত নিজের অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে তত সাধারণ মানুষের মধ্যে মেরুকরণ বাড়ানো হচ্ছে। শাসকেরা কোথাও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা, কোথাও ভুয়ো জাতীয়তা কিংবা ফাঁপা দেশপ্রেম আর কোথাও মিথ্যে গণতন্ত্রের বুলি আওড়াচ্ছেন। এই সময় সাধারণ মানুষকে নিজেদের সার্বিক প্রতিবেশ - ভাষা, সংস্কৃতি, জীবিকাসহ সবকিছু পুনরায় দাবি (reclaim) করতে হচ্ছে। এই প্রেক্ষিত থেকেই বাংলার নিজস্ব আখ্যানগুলি আবার পড়ছি। 

৩. গল্পটির বীজ কীভাবে পেয়েছিলেন? 

উত্তর – চার বছর ধরে এক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ছাত্র, যার নিজের ভাবনা প্রকাশের অসুবিধা আছে, প্রাথমিক ভাবে তাকে দেখেই গল্পটির বীজ পাওয়া। 

৪. সেই বীজ নিয়ে গল্প লিখতে আগ্রহী হলেন কেন? কেন মনে হল এই বিষয় নিয়ে গল্পটি লিখবেন? 

উত্তর – সাধারণ মানুষের নিজের ভাবনা প্রকাশের প্রতিবন্ধকতার এক সর্বজনীন রূপ সারা পৃথিবীর গণতান্ত্রিক পরিসরে দেখা যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়েছে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ছাত্রটির মতো তাঁরা বিশেষ মনোযোগ দাবি করেন। 

৫. গল্পটি কতদিন ধরে লিখেছেন? কতবার কাটাকুটি করেছেন? 

উত্তর – প্রায় তিন মাস ধরে লেখা হয়েছে গল্পটি। অন্তত চারবার গোটাটাই বাতিল হওয়া ছাড়া অসংখ্যবার কাটাকুটি হয়েছে। 

৬. লিখতে লিখতে কি মূল ভাবনা পালটে গেছে? 

উত্তর – মূল ভাবনা না পালটালেও তাঁর সঙ্গে যোগ বিয়োগ ঘটেছে। উপস্থাপন বদলেছে। বারবার। 

৭. গল্পটি লেখার পরে প্রথম পাঠক কী ছিলেন? 

উত্তর – নিকট বন্ধু। 

৮. লেখার পরে কি মনে হয়েছে, যা লিখতে চেয়েছিলেন তা লিখতে পেরেছেন? 

উত্তর – ঠিক যা লিখতে চেয়েছিলাম তা লিখতে পারাটা বোধহয় উইটোপিক ধারণা। 


(বাংলার ত্রস্ত নীলিমায় গল্পটি আবহমান বিশেষ গল্প সংখ্যা ১০১৮ প্রকাশিত)


১২টি মন্তব্য:

  1. কী অনবদ্য একটা গল্প পড়লাম...একটা মনে রাখার মতন গল্প অনেকদিন পরে !!

    উত্তরমুছুন
  2. অবেহেলিত প্রান্তরে প্রান্তিক মানুষের স্বরে কথা বলেছেন লেখক।

    উত্তরমুছুন
  3. আমার খুব ভালো লেগেছে।তোমার গদ্যভাষা ও লেখন-ভঙ্গি চমৎকার।গভীর সৃজনে থাকো।

    উত্তরমুছুন
  4. খুব ভালো লাগলো।তোমার গদ্যভাষা ও লেখন-ভঙ্গি চমৎকার
    গভীর সৃজনে থাকো।

    উত্তরমুছুন
  5. গল্পটা পড়ে হতবাক হয়ে বসে আছি। যেমন গদ্যের চলন, তেমন উপাদান। আরও লেখা পড়তে চাই।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. অবেক ধন্যবাদ।
      কিছু লেখা গল্পপাঠেও আছে। নাম দিয়ে সার্চ করলে পাবেন।

      মুছুন
  6. এই গল্পটা স্তব্ধ করে দিলো!!! হাঁ যাকে বলে....সাপের খোলসের গন্ধ অনেকটা ফাটা ডিমের খোলার মতো!!! উফফফ... বহু বহু বহু বহু দিন বাদে এমন কোনো গল্প পড়লাম...

    উত্তরমুছুন
  7. অনেক ধন্যবাদ। ফিডব্যাকটুকই লেখার প্রাপ্তি। ভালো থাকুন।

    উত্তরমুছুন