মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

২০১৮ সালে লেখা জয়ন্ত দে'র সেরা গল্প : কয়েকটি পাতা

গল্পটি নিয়ে আলাপ--
গল্পপাঠ :
গল্পটি কখন ও কোথায় লিখেছেন?
জয়ন্ত দেঃ
গল্পটি শারদীয়া ‘কথা সাহিত্য’ পত্রিকায় লিখেছি। 

গল্পপাঠ : 
গল্পটি লেখার সময়ে কই কাজ করছিলেন, কই পড়াশুনা করছিলেন বা কই লিখছিলেন। 
জয়ন্ত দেঃ
যে লেখককে নিয়ে লেখা তার লেখালিখি নিয়ে আত্মজীবনী মূলক বেশ কটা লেখা পড়েছিলাম।

গল্পপাঠ :
গল্পটির বীজ কীভাবে পেয়েছিলেন। 
জয়ন্ত দেঃ
লেখককে নিয়ে পুরনো মানুষজনের কথা থেকে। 

গল্পপাঠ :
এই বীজ নিয়ে কাজ গল্প লিখতে আগ্রহী হলেন কেন। কেন মনে হলো এই বিষয় নিয়ে গল্পটি লিখবেন? 
জয়ন্ত দেঃ
আসলে কিছু মানুষের কিছু বাজে কৌতূহল থাকে। বিষয়টি সেখান থেকেই দেখা। 

গল্পপাঠ :
গল্পটি কতদিন ধরে লিখেছেন? কতবার কাটাকুটি করেছেন? 
জয়ন্ত দেঃ
বেশ সংবেদনশীল বিষয়, তাই বার বার কাটাকুটি করতে হয়েছিল। 

গল্পপাঠ :
লিখতে লিখতে কি মূল ভাবনা পালটে গেছে? 
জয়ন্ত দেঃ
মূল ভাবনা থেকে সরে গেছি। প্রথমে ভেবেছিলাম কৌতূহলের জায়গায় আঘাত করব। কিন্তু পরে শেষ করেছি অন্যভাবে। গল্পের বাইরে এসে। 

গল্পপাঠ :
গল্পটি লেখার পরে প্রথম পাঠক কে ছিলেন? 
জয়ন্ত দেঃ
প্রথম পাঠক কেউ ছিল না। 

গল্পপাঠ :
লেখার পরে কি মনে হয়েছে, যা লিখতে চেয়েছিলেন তা কি লিখতে পেরেছেন।
জয়ন্ত দেঃ
 না। পারিনি। অনেক কথাই চাপা রেখেছি। পাঠকের জন্য। সবটা দেখানোর চেষ্টা করিনি। গল্পটি হঠাৎ থেমে গেছে। লেখকের ডায়েরির তিনটি অংশ উদ্ধৃতি দিয়ে।

জয়ন্ত দে'র গল্প : 
কয়েকটি পাতা

ঘড়িতে এখন দুপুর তিনটে। 
আমি জানি দু পাঁচ মিনিটের মধ্যে বেল বাজবে। নিচে রাধাবাবু তৈরি হয়েই আছেন। উনি জানেন আজ লোক আসবে। খবরের কাগজের লোক। সাধারণত এঁরা দুজন করে আসেন। কখনও একজনও আসেন। রাধাবাবু সব জানেন। এঁদের প্রথমে এক গ্লাস জল দিয়ে আপ্যায়ন করতে হবে। তারপর, মানে আলাপ আলোচনার শেষ দিকে একটা করে বড় তালশাঁস সন্দেশ। তারপর লিকার চা। মিষ্টি আনানো আছে। চা ফ্লাক্সে। পুরনো অ্যালবাম বের করে রাখতে হবে। কোনও ছবি নিয়ে যাওয়ার পারমিশান নেই। তবে ছবি কপি করতে পারে। অনুমতি আছে। 

ইন্দ্রনাথের বসার চেয়ার, লেখার টেবিলে সাদা কাপড় পেতে রাখা হয়েছে। ইন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের বই টেবিলের একদিকে সাজানো। ওপর দিকে বড় দুটো আলোর ব্যবস্থা করা আছে। জ্বেলে দিলে ছবি ভালো হবে। ওই টেবিলেই অ্যালবাম রেখে ছবির কপি করলে ভালো হয়। তারপর ফোটোগ্রাফারের কেরামতি। 

আমি পাজামা পাঞ্জাবি পরে রেডি। অঞ্জনা পাশ ফিরে শুলো। বলল, ‘যতই বোঝাক ডায়েরি বের করবে না। পাপ! পাপ!’ 

না, আমি ডায়েরি বের করব না। জানি। বড্ড অশান্তির বস্তু ওটা। বাবার যে কেন ওসব ডায়েরি লিখতে গেল। এত লেখার কী আছে। উঃ! সবার নজর ওটার দিকে। আগে কাউকে কাউকে দেখতে দিতাম। এখন দিই না। এখন কতরকম ক্যামেরা বেরিয়েছে। ব্যাগে থাকে, পকেটে থাকে, পেনের মাথায় ক্যামেরা, মাইক্রো ক্যামেরা। মুহূর্তে পাতার পর পাতার ছবি তুলে নিতে পারে। দেখাব যে, কাকে বিশ্বাস করব! ডায়েরি থাক আলমারি বন্দি। আমরা মরলে কখনও যদি মাল্যবান মনে করে যে সে তার ঠাকুর্দার ডায়েরি প্রকাশ্যে আনবে। সেটা তার ব্যাপার। ও টেক্সাসে আছে। ওদের প্রাশ্চত্য মানসিকতা। স্ক্যান্ডালকে থোড়াই কেয়ার করে। তখন আমরা থাকব না, আমাদের আপত্তিও থাকবে না। 

মাল্যবান একবার বলছিল, বিদেশে এসব জিনিস কোটি কোটি টাকা দিয়ে কেনে? কিনে প্রকাশ করে। এখানে সব বিনামূল্যে! 

না, আমি পারব না, আমরা টাকার দরকার নেই। 

মাল্যবান বলছিল, ইংরেজি লেখকদের এমন অনেক কিছু থাকে। 

ওদের থাকা। আমার কাছে উনি আমার বাবা। 

ওই তো দরজার বেল বাজল। 

তিনটে পাঁচ। যিনি এসেছেন তিনি নিশ্চয়ই মোড়ের মাথায় আমার বাবার নামাঙ্কিত ‘সাহিত্যিক ইন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় রোড’ ফলকটিতে একটা ক্লিক মেরে এসেছেন। রাস্তার নামকরণ অনেকদিন আগেই হয়েছিল। ফলকটি বছর পাঁচেক হল বসেছে। আমি দেখেছি সাধারণভাবে সব ফোটোগ্রাফার ওই ফলক থেকে ছবি তুলতে শুরু করেন। হয়তো দরজায় বেল দেওয়ার আগেই রোয়াক সুদ্ধ বাড়ির ছবি তুলে নিয়েছেন কয়েকটা। তাতেই পাঁচ মিনিট লেট। কেন না আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়ার সময় বলে দিই, সময়টি মনে রাখবেন। দেরি হলে আমরা সাহায্য করতে পারব না। 

আজ পর্যন্ত কেউ দেরি করেন নি। ওঁদের সবাইকে ধন্যবাদ। 

আজ যাঁরা এলেন, তাঁরা দুজনেই বেশ কম বয়েসি। একটা ছেলে, একটা মেয়ে। মেয়েটি সাংবাদিক। ছেলেটি ফোটোগ্রাফার। 

ওরা বসতে রাধাবাবু ওঁদের জল দিলেন। ছেলেটি পুরো গেলাস খেলেন। মেয়েটি হাফ। তাই হয়, মেয়েরা পথেঘাটে কম জল খায়। 

অঞ্জনা পাশ-না-ফিরে বলল, ‘ক-জন?’ 

‘দু-জন।’ 

‘অ। চলে গেলে রাধাবাবুকে বলবে দুটো মিষ্টি নিয়ে এসে ফ্রিজে রেখে যেতে। কাল পূর্বা প্রকাশনীর গুহবাবুরা আসবেন। ওই মিষ্টি দিয়েই হয়ে যাবে।’ 

আমি বললাম, ‘যে দুটো এসেছে, বড্ড ছোটো, ওরা ইন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় কি পড়েছে? কাদের যে পাঠায় সব!’ 

‘সাহিত্য তো বইয়ে আছে, ওরা থোড়ি তোমার বাপের সাহিত্য নিয়ে লিখতে এসেছে?’ অঞ্জনা থামে, মাথার বালিশ ঠিক করে বলে, ‘তোমার বাপ তো কেচ্চার শিরোমণি! ওরা সব কেচ্ছা খোঁচাতে আসে। দেখবেখন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মধুরিমা রায় আর বাসবীদেবী করবে।’ 

‘যত্তসব!’ আমি এটা অঞ্জনাকেই বললাম। ইদানীং ওর মুখের ভাষা এমনই হয়েছে। ওদের থেকেও আমার অঞ্জনাকে বেশি বিরক্তকর লাগল এই মুহূর্তে। যাই, নীচে যাই। দোতলা থেকে নীচে এলাম। আমাকে দেখেই ওরা উঠে দাঁড়াল। 

রাধাবাবু বললেন, ‘উনি সাহিত্যিক স্বর্গত ইন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের একমাত্র সন্তান শ্রীদেবমাল্য গঙ্গোপাধ্যায়।’ 

অঞ্জনা রাধাবাবুকে ঠিক এই কথাগুলো শিখিয়ে দিয়েছে। কমও না, বেশিও না। রাধাবাবু মুখস্ত কথাগুলো বলে ঘরের এককোণে গিয়ে বসবেন। ঘুমিয়েও পড়তে পারেন। মাঝে পথে উঠে তালশাঁস সন্দেশ দেবেন। চা দেবেন। অন্যদিন উনি দেড়টা থেকে চারটে পর্যন্ত ঘুমান। আজ জেগে, ঘুম তো আসবেই। 

মেয়েটি বলল, ‘আমার নাম সীমন্তিনী। আপনার কাছে আমি ইন্দ্রনাথবাবু পারিবারিক জীবনের গল্প শুনব। এতদিন যা বোলেননি এমন গল্প, মানে এক্সক্লুসিভ—এমন কিছু বলুন। আমরা সানডে পেজ-এ ফাটিয়ে করব।’ 

ফাটিয়ে করবে! কী ভাষা! ‘আপনি ইন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কিছু লেখাপত্তর পড়েছেন?’ 

‘হ্যাঁ, আমি একটা হোমওয়ার্ক মোটামুটি করে নিয়ে এসেছি।’ 

‘সাহিত্য নিয়েই কথা শুরু করা যাক?’ 

‘না, না, সাহিত্য টাহিত্য নয়। আমি আপনাদের পারিবারিক কথাই শুনতে চাই, সেটাই আমার অ্যাসাইনমেন্ট।’ 

‘অ। কী বলি বলুন তো?’ 

‘আপনার কথা দিয়ে শুরু করুন। ইন্দ্রনাথবাবু আপনার বাবা। বাবাকে আপনি কেমন দেখেছেন—?’ 



দুই 

আজকাল লেখার কষ্ট এঁরা করেন না। মোবাইলের রেকর্ডার অন করে দেয়। আমি আমার আর বাবার কথা বললাম। এবার মায়ের কথা বলছি। 

‘আমার মা ছিলেন আমার বাবার প্রেরণা। উনি সংসার সামলাতেন। সেসময় আমাদের সংসার ছিল খুব বড়। পরিবারের সদস্য ছিল সতেরোজন। আর ঠাকুর চাকর দারোয়ান মালি ছিল সাতজন। মানে চব্বিশ। সেই সঙ্গে আরও তিন চারজনকে ধরতে পারেন। তাঁরা আমার বাবার পাঠক, গুণমুদ্ধ, প্রকাশক, বন্ধু বা উঠতি লেখক হতে পারেন। তাঁরা দুপুরবেলা এসে পড়তেন। মোট প্রায় তিরিশজনের পাত পড়ত আমাদের বাড়িতে। আমার মা একা হাতে সব সামলাতেন। বাবাকে টের পেতে দিতেন না। বাবা শুধু তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়েই থাকতেন।’ 

‘হ্যাঁ পড়েছি, আপনার মা খুব ধীর স্থির শান্ত লেডি ছিলেন। প্রচুর স্যাক্রিফাইস করেছেন। আচ্ছা, তবু আপনি কোনওদিন আপনার বাবা মায়ের মধ্যে ঝগড়া বা মনোমালিন্য হতে দেখেছেন?’ 

কী অবান্তর প্রশ্ন! 

আমি বলি, ‘দেখুন, সে সময়টা অন্যরকম ছিল। তখন স্বামী স্ত্রীতে এত গোলমাল হত না। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটাই ছিল আলাদা। তারপর স্বামীটি কে দেখুন— সে সময়কার প্রখ্যাত সাহিত্যিক ইন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়!’ 

‘তাহলে বলতে চাইছেন আপনার বাবা ডিক্টেটর ছিলেন? তা নিশ্চয়ই নয়।’ 

‘একদমই নয়, আমার বাবা ছিলেন যেমন সুপুরুষ তেমনই মধুরভাষী, তেমনই উদার মনের মানুষ। মা কেন কারও সঙ্গেই কোনওদিন বাবাকে ঝগড়া করতে দেখিনি। কিন্তু সাহিত্য নিয়ে প্রবল তর্ক করতে দেখেছি। সাহিত্যের পাশাপাশি সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখা, সিনেমা পরিচালনা করা। বাবা সাংসারিক কিছুর মধ্যে ঢুকতেনই না।’ 

মেয়েটা এবার একটু নড়ে বসলেন। আমি বুঝলাম উনি এবার কমন কোয়েশ্চেন পেয়েছেন। এর পরের প্রশ্ন নিশ্চয়ই সিনেমা নিয়ে। 

সীমন্তিনী বললেন, ‘আপনার বাবা খুব সুপুরুষ ছিলেন, ছবি দেখলেই বোঝা যায়। খুব ম্যানলি.. ..। 

আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। আমি জানি এবার ও কী বলবে। সিনেমা...মধুরিমা রায়? মধুরিমা রায়? মধুরিমা রায়কে নিয়েই এখন ওর প্রশ্ন থাকবে নির্ঘাত! 

সীমন্তিনী বললেন, ‘মধুরিমা রায়কে নিয়ে উনি বেশ কিছু সিনেমা করেছেন।’ 

এই তো লাইনে এসো বাবা! বললাম, ‘হ্যাঁ, চারটে।’ 

‘চারটেই সুপারহিট হয়েছিল।’ 

‘আসলে কাহিনীটা খুব ভালো ছিল।’ 

‘উনি মোট ছটা সিনেমা করেছিলেন, তারমধ্যে চারটের নায়িকা মধুরিমা রায়।’ 

হ্যাঁ তাতে কী হয়েছে, তোর বাপের কী? আমার বাপের সঙ্গে মধুরিমা রায়ের প্রেম ছিল। সবাই জানে। তুই এত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ন্যাকামি করছিস কেন? অঞ্জনা ঠিক বলে, এগুলো মেয়ে নয় ছেনাল! 

হেসে বললাম, ‘উনি সেসময় সেরা নায়িকা। সবাই চাইবে সেরা নায়িকা নিয়েই কাজ করতে।’ 

সীমন্তিনী একটু থামলেন। মাথা নীচু করলেন, বললেন, ‘শুনেছি ওঁনার সঙ্গে ওঁনার একটা স্পেশাল সম্পর্ক ছিল?’ 

আরে মেয়েটার যে এখনও জিবের আড় ভাঙেনি। ওঁনার সঙ্গে ওঁনার মানে? স্পষ্ট করে নাম বল? 

আমি হালকা কেশে বলি, ‘থাকতেই পারে।’ আমি এক কথায় উড়িয়ে দিলাম। 

‘তার মানে আমি বলছেন, সাহিত্যিক ইন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে মধুরিমা রায়ের একটা স্পেশাল সম্পর্ক ছিল।’ 

মেয়েটা এবার তড়বড় করে উঠল। 

‘দাঁড়ান, দাঁড়ান, আমি কিছুই বলছি না। দয়া করে আমার মুখে এ ধরনের কথা বসাবেন না। আপনি বলেছেন, তাতে আমি বলেছি, থাকতেই পারে। ব্যাস। আর স্পেশাল মানে আপনি ঠিক কী বলতে চাইছেন? প্রেমের সম্পর্ক, না কি...?’ 

থাক, এইটুকু মেয়ে এর সামনে আর কী করে বলি, শারীরিক সম্পর্ক টম্পর্ক— 

মেয়েটা একটু হকচকিয়ে গেল। বলল, ‘ওঁদের দুজনের সম্পর্ক নিয়ে আপনার মায়ের সঙ্গে কোনওদিন কোনও অশান্তি হয়নি।’ 

‘আমি জানি না। মধুরিমা রায়ের সঙ্গে বাবার অশান্তি হওয়ার মতো সম্পর্ক ছিল কি না?’ 

সীমন্তিনী হাসল। ‘সবাই জানে। ওঁনার ডায়েরিতেও স্পষ্ট করে লেখা আছে। ডায়েরিটা একটু দেখা যাবে? এক্সক্লুসিভ করতাম। আগে তো কোনওদিন প্রকাশ পাইনি।’ 

আমার বাবা যদি ইংরেজি লেখক হতেন, তাহলে আমি দর কষাকষি করতে বসতাম নিশ্চয়ই। বাংলা লেখক! 

আমি রাধাবাবুকে হালকা গলায় ডাকলাম। রাধাবাবু তালশাঁস সন্দেশের প্লেট নিয়ে এলেন। জল দিলেন। আমি বললাম, ‘খান।’ 

সীমন্তিনী বললেন, ‘ওরে বাবা এত বড় মিষ্টি—আমি খাব না।’ 

ফোটোগ্রাফার ছেলেটা ফিক করে হাসল। বলল, দিদি তোমায় তো নির্মাল্যদা তালশাঁস সন্দেশের কথা বলেছিল—।’ 

‘আরে নির্মাল্যদা আট বছর আগে এসে খেয়েছিল, এখনও তালশাঁস! বদলাবে না।’ 

‘ইচ্ছে করলে আপনি ভেঙেও খেতে পারেন।’ আমি বললাম। 

‘দিদি পুরো না খেলে তুমি অদ্দেক নিয়ে আদ্দেক আমাকে সাপ্লাই করো। ভালো জিনিস!’ 

আমি হাসলাম। তাই হল, মেয়েটা অধের্ক খেল, ছেলেটা দেড়া। 

সীমন্তিনী বলল, ‘আপনার বাবার সঙ্গে গায়িকা বাসবীদেবীর একটা অন্যরকম সম্পর্ক ছিল—।’ 

‘সবই অন্যরকম বলছেন! কী রকম?’ 

‘অন্যরকম! সবাই বলে—।’ 

‘ভালো সম্পর্ক। গুণী মানুষের সঙ্গে গুণীমানুষেরই সম্পর্ক হয়।’ 

সীমন্তিনী একটু সোজা হল। মানে এবার বোল্ড প্রশ্ন করবে। ওরে বাবা এত বছর ধরে আমি সাংবাদিক সামলাচ্ছি। বোল্ড প্রশ্ন করবে তো, করো, করো? 

‘সবাই জানে আপনার বাবার সঙ্গে অভিনেত্রী মধুরিমা রায় ও পরবর্তী সময়ে বাসবীদেবীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। নানা মুখোরোচক গল্প আছে এনিয়ে। আপনার বাবা লিখিতভাবে সে কথা স্বীকারও করে গেছেন। আমাকে একটু বলবেন, তৎকালীন সময়ে নিশ্চয়ই আপনার মায়ের কানেও এ খবর এসে পৌঁছেছিল, সেক্ষেত্রে আপনার মা ব্যাপারটা কীভাবে হ্যান্ডেল করেছিলেন? বা, কখনও এইসব রিলেশন নিয়ে মায়ের কাছ থেকে কিছু শুনেছিলেন?’ 

‘আপনি কি বিবাহিত?’ 

সীমন্তিনী একটু থমকে আমার দিকে তাকায়। কিন্তু সে বোল্ড মেয়ে। বলল, ‘হ্যাঁ, আমার বিয়ে হয়েছিল। ডিভোর্সডও হয়ে গেছে। এটা আমার খুবই ব্যক্তিগত ব্যাপার। সরি!’ 

‘বড়দের ব্যক্তিগত ব্যাপারে ছোটরা কি ঢুকতে পারে? পারে না।’ 

‘দেখুন, শোনা কথা ভারতীদেবীর একমাত্র ছেলে—সবাই বলে তিনি আপনার বাবার...।’ 

অঞ্জনা এই কারণেই রাধাবাবুকে মুখস্ত করিয়েছে, সাহিত্যিক স্বর্গত ইন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের একমাত্র সন্তান শ্রীদেবমাল্য গঙ্গোপাধ্যায়...। ওনারা সেই শুনেই আমার সঙ্গে কথা বলতে ঢুকেছেন। এখন ‘একমাত্র’ কথাটা ওরা হাওয়া উড়িয়ে দিলে কী করে হবে! 

‘না, এমন কথা আমরা জানি না। শোনা কথা শুনে লাভ আছে? ছোটবেলা থেকে দেখছি মধুরিমামাসি, বাসবীপিসি আমাদের পরিবারের একজন। তাঁরা বাবার গুণমুদ্ধ! বাবা তাঁদের গুণমুগ্ধ! ওঁরা সব একসঙ্গে হলে ফুলের সৌরভ বইত। কিছু মানুষ অহেতুক সেগুলোর মন্দ মানে করত। কোনওদিন মাকে এসব নিয়ে কোনও কথা বলতে শুনিনি। ওনারাও কোনওদিন আমাদের পারিবারিক জীবনে প্রবেশ করেনি। পারস্পরিক সম্মানবোধ ছিল। মধুরিমামাসি মাকে সঙ্গে করে নিয়ে তাঁর নতুন বই মানে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। বাসবীপিসি গান শেষ করে স্টেজ থেকে নেমে আগেই মাকে জড়িয়ে ধরতেন। এগুলো আমার চোখে দেখা। আমার মা ওঁদের কী ভালোই না বাসতেন। কত কত রেঁধে মধুরিমামাসির জন্য কখনও স্টুডিওর ফ্লোরে পাঠাতেন। কখনও বাসবীপিসির জন্য গানের রিহার্সালে পাঠাতেন। তখন দিনকাল অন্যরকম ছিলেন জানেন।’ 

সীমন্তিনী বলল, ‘একটু ডায়েরিটা দেখা যাবে?’ 

‘ডায়েরি! দেখুন সেটা খুবই ব্যক্তিগত ব্যাপার।’ 

‘এমন একজন লেখকের ডায়েরি ব্যক্তিগত থাকবে কেন? ওই ডায়েরি থেকে অনেককিছু আমরা জানতে পারব।’ 

‘সাহিত্য বিষয়ে খুব কম কথা ওতে লেখা আছে। যা আছে তা ব্যক্তিগত কিছু কথা, কিছু অনুভূতি!’ 

সীমন্তিনী সোজা হয়ে বসল, বলল, ‘শুনেছি ওনার আরও এক সন্তানের কথা আছে ডায়েরিতে.. .! কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের দেওয়া টাকা পয়সার কথাও আছে।’ 

আমি রাধাবাবুর দিকে তাকালাম। উনি চা নিয়ে এলেন। লিকার। চা মানে ওদের বিদায় ঘন্টা বাজিয়ে দিলাম। জল দিয়ে শুরু চা দিয়ে শেষ। ছিঃ ছিঃ এরা শুধু এগুলো দেখল, মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা করল না। 

সীমন্তিনী বলল, ‘স্যার ডায়েরি যদি একবার চোখের দেখা দেখাতেন খুব ভালো হত?’ 

‘অনুমতি নেই!’ 

‘অনুমতি তো আপনিই দেবেন। আপনি ছাড়া আর কে আছেন?’ 

‘কেন আমার স্ত্রী, আমার ছেলে, আর আপনি যাঁদের কথা বলছিলেন, ওই মধুরিমা রায়, বাসবীদেবী ওঁদের পরিবারের লোকজনও তো আছেন। তাছাড়া আপনি বললেন না, আর এক সন্তানের কথা, তাঁরও অনুমতির ব্যাপার থাকে।’ 

মেয়েটা দু’হাতের তালুতে মুখ মুছল। বুঝলাম বেচারীর সব ঘেঁটে গেছে। সে গলা ভারী করে ফোটোগ্রাফার ছেলেটিকে বলল, ‘তুমি বাড়িটা আর বাইরের রোয়াকের কটা শট নাও।’ 

ছেলেটি উঠে যেতেই অসহায় গলায় মেয়েটি বলল, ‘স্যার আমি যদি ইন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ডায়েরিটা ব্রেক করতে পারি, আমার কেরিয়ারের খুব ভালো হয়। বুঝতেই তো পারছেন চাকরির ব্যাপার। এতদিন কেউ পারেনি। আপনি যদি একটু হেল্প করেন। কয়েকটা পাতা। কিছু ব্যক্তিগত কথা! ব্যাস। প্লিজ স্যার! আমি জানি আপনি আমাকে হেল্প করবেন।’ 

আমি হাসলাম, বললাম, কী দেখবেন, একটা শহর, একটা পাহাড়তলি গ্রাম আর একটা এজমালি বাড়ির কথা লেখা আছে। আপনি কি বুঝবেন? সে কথা আমি আপনাকে মুখে মুখে বলে দিতে পারি—’ 

‘মুখের কথায় কী হবে স্যার? ডায়েরির কটা পাতার ছবি, কিছু বিতর্কিত কথা বা কিছু একান্ত ব্যক্তিগত কথা, পাবলিক এই চায় স্যার।’ 

আমি হাসলাম, উঠে দাঁড়ালাম, ‘অনুমতি নেই!’ 

মেয়েটা ব্যর্থতার জ্বালায় ছটফট করল, বলল, ‘মধুরিমা রায়, বাসবীদেবী, এমন কি আপনার মা সুরমা দেবীর কিছু একটা চাই স্যার, নইলে অ্যাসাইমেন্টেটা পুরো ঝাড়, ফ্লপ করে যাবে। কিছু দিন স্যার।’ 

‘আপনাকে দেওয়ার মতো কিছু নেই আমার। আপনি যা খুঁজছেন তা আমার স্ত্রী অঞ্জনার হেফাজতে থাকলেও থাকতে পারে। আমার কাছে ওই ডায়েরির লালচে পাতার ধুলো আছে, মাখবেন না কি?’ 

মেয়েটা আবার বলল, ‘জাস্ট দু একটা পাতার ছবি! আর কয়েক পাতা চোখ বুলিয়ে নেব—! 

আমি বিড়বিড় করলাম—শুধু মুখোরোচক! 

মেয়েটা বলল, ‘পাবলিসিটি—বই বিক্রি বেড়ে যাবে আশা করি—।’ 

আমি ফিসফিস করলাম— শুধু গরমাগরম! 

মেয়েটা বলল, ‘এ প্রজন্মের কাছে, ওনাকে আবার বেশ হাইলাইটস করা যাবে—।’ 

আমি হাসলাম— শুধু রগরগে! 

মেয়েটির চোখে মুখে হতাশার চিহ্ন! 

আমি ওকে বললাম, আমার কাছে সাহিত্যিক ইন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ডায়েরির লালচে পাতার ধুলো আছে, মাখবেন না কি? আসুন না মাখি ভালোবেসে। আমি জানি, আপনি পারবেন না। তবু, আমি ধুলো মাখি দু’হাতে। যদি প্রেম পাই তবে ধুলো খাই। 
… 

মধুরিমা সেন। 

আমার কাছে একটা দুর্দান্ত শহর। ছুটে চলা গাড়িতে চড়ে সেই শহরের পথে যেতে যেতে বড় লোভ হয়, এমন শহরে যদি আমার একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট থাকত, তাহলে বন্ধু বান্ধব, পানীয় আর আলোর রোশনাইয়ে জীবনটা বেশ হইচই করে কাটিয়ে দেওয়া যেত। বড্ড লোভ হয় জীবনটাকে উৎসবের মতো করে সাজাতে। ভরে যেত জীবনের পানপাত্র! আনন্দ! উল্লাস! আনন্দ! উল্লাস! 

পারলাম না। 
… 

বাসবী। 

ও যেন ছোট্ট শান্ত এক পাহাড়তলি। কবে দুদিনের অবসর কাটাতে গিয়ে আবেশে ডুবেছি। ইচ্ছে ছিল কয়েক বিঘে জমি কিনে, বাড়ি বানিয়ে, খেতি করে, উঠোন বাগানে ফুল ফুটিয়ে প্রশান্ত এক জীবন কাটাব। সাধু নই। সন্ন্যাসীও নই। জীবনসুধায় মাখামাখি হবে এজীবন! কীটে আর মাটিতে। ফুলে আর সৌরভে। 

হল না। কোনওটাই সাধ্য নেই আমার। আমি এতটাই সাধারণ। 
… 

সুরমা। 

পারিবারিক সূত্রে একটা ঘর পেয়েছি। সে ঘরের মেঝেতে মার্বেল নেই, দেওয়ালও হয়তো তেমন মসৃণ নয়, রঙেরও জেল্লা বড় কম। তবু আমি সে ঘর কখনওই ভাঙতে পারব না। ওখানে অনেক শেঁওলা, অনেক শিকড় জড়িয়ে আছে। ওই দেওয়ালে কত কত আমাদের সবার ছবি আটকানো, আমি দেখতে পাই। এঘর আমার কপালে হাত রাখে জ্বর হলে। 

… 
শহরের আকর্ষণে বা পাহাড়তলি নীরব টানে আমি যদি ও-ঘর ভাঙতে যাই তবে আমি নিজেই টুকরো টুকরো হয়ে যাব। আমি সেই সাধারণ মানুষ, যে ঘর ভাঙতে পারে না যেমন ঠিক কথা, তেমন সে শহরের পথে মদের বোতল ছুঁড়ে কাচ ছড়িয়ে তুমুল এক হইচই বাধাতেও পারে না। রক্তারক্তি করতে পারি না। 

আবার পাহাড়তলিতে উঠোন বাগানে গজিয়ে ওঠা লতানে গোলাপচারাকেও ছিঁড়ে দিয়ে আসে না কখনও। টবের ভেতর তাকে শুকিয়ে মারার চেষ্টাও করিনি। খুব সাধারণ মানুষ আমি ভালোবাসতে পারি! 
… 

আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম। আপনি ভালোবাসা জানেন সীমন্তিনী! ওই ডায়েরির পাতায় পাতায় আছে ভালোবাসার ধুলো। যদি প্রেম পাই তবে ধুলো খাই! 

লেখক পরিচিতি
 ‌জয়ন্ত দে
জন্মস্থান: পশ্চিমবঙ্গ। ভারত। ১৯৬৪
ঠিকানা: ১৬৩ নস্কর পাড়া রোড। কিরণ রেসিডেন্সি। কলকাতা ৭০০০৪১

প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বই:
মিত্র ও ঘোষ পাবলির্শাস—নতজানু, ভয় ভয়, পূর্ণকুম্ভে কল্পবাস, আমরা ও আরও কয়েকজন।
দে’জ পাবলির্শাস—সেরা ৫০টি গল্প, আত্মজন, পরির দেখানো আলো, জাগে রাত্রি, দু‘রাত তিনদিন, ম্যাজিশিয়ান ও এক নারী, মায়া কাজল।
পত্রভারতী—মৃত না জীবিত, অ্যান্টি হিরো, একটা খুনি চাই, পেতনি আমার বউ।
সোপান—ভালোবাসার গল্প
ইত্যাদি।

……………..

৪টি মন্তব্য: