মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

সাধন দাস'এর গল্প : মৃত মানুষের পাঠ

মহারাষ্ট্রে বিদর্ভ নগরে রোজ কমপক্ষে আট ঘন্টা লোডশেডিং চলে। ইলেকট্রিসিটি থাকে শুধু মর্গে। কারণ প্রতি মুহূর্তে সেখানে চলে আসছে আত্মঘাতি কৃষকের লাশ। ময়না তদন্ত করে তুলে দিতে হচ্ছে পরিবারের হাতে। নইলে মৃত চাষী পরিবারের হাহাকারে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে শহর। 
বিদর্ভের গাঁয়ে গাঁয়ে মরা চাষীদের চিতা জ্বলতেই থাকে। চিতার আগুন থেকে চিতা জ্বালানো হচ্ছে। খেতে খামারে খানা খন্দ খাদে ভূতেরা লক লক করে বাড়ছে। অন্ধকারে কঙ্কালের থাবা কখন কার গলা টিপে ধরবে কেউ বুঝতে পারছে না। বিদর্ভ ছাড়িয়ে আত্মহত্যার ভয় গোটাদেশে এমন চাগিয়ে উঠেছে চাষবাস ছেড়ে বেকার হয়ে গেলাম। ঝাঁট দেওয়ার কাজও পেতে পারি গাঁয়ে এমন রাস্তা নেই। ভূতের হাতে মরার চেয়ে দেশে প্রতি মাসে বেড়ে যাওয়া দশ লক্ষ বেকারের মিছিলে আল ভেঙে হাঁটতে হাঁটতে আমিও শহরে ঢুকে পড়লাম।

হতভাগ্য! সেই ৩৬৬ পিয়ন পদে আবেদন করা ২৩ লক্ষ বেকার যাদের ২৫৫ জন পি এইচ ডি আর ২ লক্ষ ইঞ্জিনিয়ার। সুইসাইড করতে গিয়ে হাতে হাতে লটারি মিলে গেলো। পেলাম তো পেলাম, ডোম বিদুর সাহেবের বাড়ি, এক সাথে দু’ দুটো চাকরি। তিনি মর্গে লাশকাটার ঠিকে কাজ করেন। তাঁর এ্যাসিস্ট্যান্ট। তাঁর বাবাও লাশ কাটতেন। তাঁর ঠাকুরদা করতেন চাষবাস। এ দেশে প্রথম শব ব্যবচ্ছেদকারী ডাক্তার মধুসূদন গুপ্তের আদর্শে মাঝে মধ্যে মরা কাটতেন। বলতেন, কাজের শেষে মা গঙ্গায় চান সেরে ঘরে ফিরি। সব শুদ্ধ হয়ে যায়। গঙ্গা দিয়ে মরা যায়, গঙ্গা কখনও অপবিত্র হয়! গঙ্গা দেশের মা। 

বিদুর স্যরের বাবা বলতেন, মর্গ কবে হিমঘর হবে জানিনে। তুই মানুষপচা গন্ধকে আপন করতে শেখ খোকা, সুবাস ভাবতে শেখ, নইলে কাজকে ভালোবাসতে পারবিনে। 

আমিও তাঁর বাপ ঠাকুদ্দার আশির্বাদ নিয়ে মরাকাটা ঘরে ঢুকে পড়লাম। 

মধুসূদন গুপ্তের উত্তরসূরি ফরেন্সিক ডাক্তার মুখার্জি খাতা হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন মর্গের বাইরে, অনেক দূরে। যেখানে মরা মানুষের পচা গন্ধ পৌঁছায় না। ফলে স্যর বিদুরের কাজকে ভালোবাসা সহজ হয়েছে। 

তিনি বলেন- শিশুদের ভালোবাসতে হয় সবচেয়ে বেশি। কারণ শিশু মৃত্যুর হারে আমাদের দেশ পৃথিবীতে প্রথম। বছরে প্রায় সাড়েসাত লক্ষ। 

মৃতশিশু এলেই তিনি মর্গে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। কোলে তুলে নেন নরম কুঁড়ির মতো দেহ। আদর করেন। চুমায় চুমায় ভরে দেন। তিনি শিশুদের খুব ভালোবাসেন। কখনও চোখবেয়ে দু’এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে নামে। পাত্তা দেন না। 

- এইভাবে ধরতে হয়। 

বলে ওস্তাদ ডোম বিদুরসাহেব শিশুকে বুকে চেপে, ছুরিখানা আদর করে ঢুকিয়ে দেন পেটে। বলেন- যে কষ্ট পেয়ে মরেছে যেনো আর পেতে না হয়। 

শিশুর রক্তে নিজেই ভেসে যান। 

আরো বলেন- এ দেশে জন্মালে এটাই পরিনতি। 

বাপ ঠাকুদ্দারা কাজে ফাঁকি দেয়নি। তিনিও পারেন না। তাঁর কাছে, আঘাত না করে... ছুরি চালানো; সেলাই না দেখা যায়, এমন নিঁখুত সূঁচ ফোঁড়ানো, শিখি। 

বাবুদের সুন্দরী রমনীরা মর্গে এলে বিদুরস্যরের ভালোবাসা উথলে ওঠে। ভালোবাসার জোয়ারে একদিন যৌনসুখ উঠে এসেছিলো। স্যরের কাছে সেই লজ্জার আত্মকথন শুনেছি। 

আজকাল চাষিদের মৃতদেহ আসে। ভারতবর্ষ জুড়ে প্রতিদিন সারবেঁধে আসছে। তাঁদের চিনতে পারি। আমার জাতভাই। তাঁরা আমার আত্মহত্যার ভয় নিয়ে আসে। রোদ্দুরে তাঁদের পোড়া কালো চামড়া, দুশ্চিন্তার বলিতে তিন নর্দমা আঁকা কপাল। আহ্‌, বুঝে ফেলেছেন! নিজের চেহারার বর্ণনা দিচ্ছি! বিশ্বাস করুন, লজ্জা আর করে না। আমার দুঃস্বপ্নে, বুকের কাঁপুনিতে, প্রতি ঘন্টায় একজন চাষী আত্মহত্যা করে। 

সেদিন এক চাষির পেট চিরে রক্তমাখা বিষ বের করছি, হঠাৎ কঙ্কালসার হাতখানা দড়াম করে দাবড়ে পড়লো মুখের উপরে। লাঙ্গল টানা জামড়ো ধরা তালু, বিড়িতে পোড়া তর্জণী; নখে হলুদ ছোপ। হাড়সর্বস্ব আঙুলগুলো আমার নাকমুখ সটান চেপে ধরলো। চেনা ঘামের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। বিদুর স্যর সঙ্গে সঙ্গে হাতখানা টেনে নামিয়ে দিলেন। মৃত হাতের কব্জি, কনুই কটকট করে উঠলো। ভয়ে মরেই যেতাম। বিদুর স্যর বললেন- ভয় পেতে নেই। অতৃপ্তির মৃত্যু। মাঝে মাঝে ওরা বেঁচে উঠতে চায়। আপন ভেবে জড়িয়ে ধরতে চায়। তবে পারে না। 

কাজে বেরুবার আগে স্যর বিদুর যখন খেতে বসেন, শুরু হয় আমার প্রথম কাজ, খবরের কাগজ পড়ে বেছে বেছে অস্বাভাবিক মৃতদের গল্প শোনানো। মৃত্যুকে সহজ করে নিতে সাহায্য করা। সুন্দর করে গুছিয়ে বলতাম, উনি পিঠ চাপড়ে দিতেন। 

বলতেন- পৃথিবীতে যতো মানুষ বেঁচে আছে মৃতদের সংখ্যা তাঁদের চেয়ে বহুগুণ বেশি। মাষ্টার, এ দুনিয়া মৃতদের দখলে। যদি বাঁচতে চাও, মৃতদের ভালোবাসতে শেখো। 

তিনি আমাকে ‘মাষ্টার’ ডাকতেন কারন আমার দ্বিতীয় চাকরি ছিলো, তাঁর মেয়েকে প্রাইভেট পড়ানো। বাবা ডোম। মা কুলটা। মেয়ে হয়ে জন্মানোর অপরাধে সে স্কুলে পড়তে পারেনি। ভর্তি হয়েছিলো। ক্লাসে, পথে, পাড়ায় অপমানিত হতে হতে কুঁকড়ে কেন্নোর মতো পিছুতে পিছুতে ঘরে ঢুকে পড়েছে। 

সন্ধ্যেবেলা একটা ঝালর দেওয়া ধবধবে সাদা ফ্রকে মুড়ে একটু ঝুঁকে পড়তে বসে। মুখখানা নিচু। উন্মুক্ত পা দুটো শরীরের আড়ালে রাখে। জগত সংসার থেকে নিজেকে যতোখানি লুকিয়ে রাখা যায়। সরল নিষ্পাপ কিশোরী। অপূর্ব সুন্দর। শ্বেতপাথরে কোঁদা মূর্তি যেনো, স্তব্ধ। গোলাপ পাপড়ি ঠোঁট, আড়ষ্ট। কথা বলে না। মুখ খুলতেই চায় না। হাঁ এর শূন্যপথে যদি কেউ দেখে ফেলে অপমানিত অন্তরাত্মার লজ্জা। বোবা নয়, বুঝতে অনেক কৌশল করতে হয়েছে আমাকে। টানা চোখ, টিকালো নাক, পানপাতা মুখ, সারাজীবন অপমান সহ্য করে বেঁচে থাকতে হবে, এই ভয়ে রক্ত শূন্য, ফর্সা। শান্ত, সন্ধ্যের ম্লান কাচের মতো আবছা হতাশ মুখমণ্ডল। যন্ত্রণার গহ্বর ভেদ করে বুকের গভীর পর্যন্ত দেখা যায়। হীনমন্যতা, অসহায়তা, ব্যথা জমাট বেঁধে আছে। বই খুলে যতক্ষণ সামনে বসে থাকে শ্বেতপাথরের এক নিঁখুত মর্মর মূর্তি। ওর দিকে তাকিয়ে ভুলে যাই, সুন্দর আসলে মৃত না জীবিত! 

ওর মা ডাকসাঁইটে সুন্দরী। স্বাধীনচেতা। ছিলেন বনেদি বাড়ির বৌ। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তুখোড় যৌবনেই আত্মহত্যা করেছিলেন। ডেডবডি কাটার আগে মৃত সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে যুবক বিদুরের ভালোবাসা উথলে উঠেছিলো। শরীর শাসন মানেনি। যখন গোপন সুখে মৃত রমনীকে কাঁপিয়ে তাঁকে বাঁচিয়ে তুলছিলেন, বাড়ির লোকের হাতে ধরা পড়ে যান। বেধড়ক মার খেয়েও প্রাণে বেঁচে গেছেন। মরাকাটা অন্য ডোম পাওয়া যায়নি তাই চাকরিটা টিকে আছে। আর ডাক্তারের ভুল সার্টিফিকেটে মৃত কুলটা সেই নারী বেঁচে উঠলেও শ্বশুরবাড়ি, বাপেরবাড়ি, সমাজ কেউ তাঁকে ফিরিয়ে নেয়নি। আদরে, প্রেমে, শুশ্রুষায় সুস্থ করে বিদুরসাহেব তাঁকে তুলে এনেছিলেন ঘরে। বিয়ে করেছেন। 

তিনি আমার প্রাণদাত্রী, আশ্রয়দাত্রী। জীবিত পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় বলেন- মাষ্টার, মেয়েটিকে তুমি মৃত মানুষের পাঠ দিও। 

আমি বিদ্যাসাগর, শরৎচন্দ্র, মাদাম কুরি, মার্ক্স, এঙ্গেলস, স্ট্যালিন এইসব মানুষদের গল্প শোনায়। আমিও শুনি। আর শ্বেতপাথরের মূর্তি একটু একটু করে নড়ে ওঠে। সেই প্রাণ প্রতিষ্ঠার আনন্দে আত্মহত্যার চিন্তা ভুলে যাই। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন