মঙ্গলবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৯

২০১৮ সালে লেখা সাদিয়া সুলতানার সেরা গল্প : মেনকি ফান্দার অপরাধ কিংবা পাপ

গল্পটি নিয়ে আলাপ--
---------------------------
গল্পপাঠ

গল্পটি কখন ও কোথায় লিখেছেন? 

সাদিয়া সুলতানা

রাজশাহীতে থাকাকালে। ২০১৭ সালে গল্পটি লিখেছি। 


গল্পপাঠ
 গল্পটি লেখার সময়ে কোথায় কাজ করছিলেন, কোথায় পড়াশুনা করছিলেন বা কোথায় লিখেছিলেন?
 

সাদিয়া সুলতানা

আমি তখন কর্মসূত্রে রাজশাহীতে অবস্থান করছিলাম। অফিস আর সংসারের ব্যস্ততার কারণে গল্প লেখার ফুরসৎ হয় রাতে। আর গৃহস্থালি কাজকর্ম সেরে রাতে বাচ্চারা ঘুমানোর পরে পড়াশুনার সময় বের করতে হয়। ঐসময়টাই আমার অবসর সময়। গল্পটি আমার পিসিতে লিখেছি। তবে সারাদিনে কাজের ফাঁকে ফাঁকে যখনই গল্প নিয়ে কোনো ভাবনা মনে উঁকি দিয়েছে তখনই সেটা ডায়েরিতে টুকে রেখেছি। আর হাতি বা এ ধরনের প্রাণি মারা গেলে সরকারি কোন কোন কর্তৃপক্ষ দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে প্রাণিটির সৎকার করে বা কীভাবে তদন্ত করে সেসব বিষয়ে পড়েছি, যেমন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, বন বিভাগের কোনো রেঞ্জের কর্মকর্তা, স্থানীয় ভেটেরিনারি সার্জন এদের কাজ কী সে সম্পর্কে জেনেছি। ইন্টারনেটও ঘেঁটেছি। 

গল্পপাঠ
গল্পটির বীজ কীভাবে পেয়েছিলেন? 

সাদিয়া সুলতানা

গল্পটির বীজ পেয়েছিলাম পত্রিকার একটি সংবাদ পড়ে। সম্ভবত ২০১৭ এর জুনের দিকে, পত্রিকাতে একটি সংবাদ পড়েছিলাম, নেত্রকোণার মেনকি ফান্দা নামক স্থানে একটি হাতি অজ্ঞাত কারণে মারা গেছে। সংবাদটিতে বিশালাকার একটি হাতির ছবিও ছিল। মৃত হাতির দাঁত কেটে নিয়েছিল মানুষ, পড়ে মন খুব খারাপ হয়েছিল আমার। কৌতূহলও হয়েছিল। জানার আগ্রহ হয়েছিল, হাতিটা কী করে মারা গেলো বা এরপর হাতির লাশটিকে নিয়ে ঠিক কী করা হবে। 

গল্পপাঠ
এই বীজ নিয়ে কাজ গল্প লিখতে আগ্রহী হলেন কেন। কেন মনে হলো এই বিষয় নিয়ে গল্পটি লিখবেন? 

সাদিয়া সুলতানা

মাঝেমাঝে পত্রিকার কোনো সংবাদ টুকে রাখি, ভাবি কাজে লাগবে। এটাকে থিম করে হয়তো কোনো একটা গল্প শুরু করা যাবে বা ঘটনাটা গল্পের ভেতরে নেয়া যাবে কোনো না কোনোভাবে। সেই ভাবনাতেই মেনকি ফান্দার হাতির সংবাদটি কেটে ডায়েরির ভেতরে গুঁজে রেখেছিলাম। 

হাতির মৃতদেহ নিয়ে মানুষের উৎসুক চোখ বারবার আমার চোখের সামনে ভাসছিল। মনে হচ্ছিল, মৃত্যুর নগ্ন রূপ দেখেও পাপ কিংবা অপরাধ করতেও মানুষের পিছু হটে না। আর মানুষই বোধহয় সেই প্রাণি যে একটি প্রাণির মৃতদেহ থেকে মূল্যবান কোনো অঙ্গ কেটে নিতে পারে। কিন্তু মানুষ কি প্রকৃতঅর্থে কোনো প্রাণির মৃত্যু বা নিজের মুত্যুচিন্তায় অনুতপ্ত হয়? এসব ভাবনা বিরক্ত করছিল ভীষণ। আবার হুট করে মাথায় প্রশ্ন এসেছে, ‘অপরাধ কী? পাপই বা কী? সব অপরাধ কি পাপ? সব পাপ কি অপরাধ?’ দেশের প্রচলিত আইনে কোনো কোনো কাজ করা অপরাধ, সেসবের আলাদা সংজ্ঞাও রয়েছে। আবার ধর্মীয় প্রথা বা রীতিনীতি অনুযায়ী হয়তো সেসব কাজ করাই পাপ। আবার এমনও হয় কোনো ধর্মে কোনো কাজকে পাপের সামিল বলা হচ্ছে অথচ দেশের আইনে সেই কাজটি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত নয়। কোনটা পাপ আর কোনটা অপরাধ সেই প্রশ্নগুলো এত জড়াজড়ি করে থাকে যে এদের উত্তর পাই না আমি। আর এই বিষয়টা খুব অদ্ভুত লাগে আমার কাছে। এসব নানান এলোমেলো ভাবনা থেকে একটি গল্প লেখার তাগিদ ছিল, মৃত হাতিটি সেই ভাবনাগুলো আরো উসকে দিয়েছিল। গল্পের বৃদ্ধ আব্দুল কুদ্দুসের দশ বছর বয়সী নাতি মেহেরের মুখ দিয়ে মূলত আমি আমার মনে জেগে থাকা প্রশ্নগুলো করার সুযোগ পেয়েছি। 

গল্পপাঠ
 গল্পটি কতদিন ধরে লিখেছেন? কতবার কাটাকুটি করেছেন? 

সাদিয়া সুলতানা

গতবছর জুনে গল্পভাবনাটি মাথায় এলেও পারিবারিক বা পেশাগত ব্যস্ততায় ঐ সময়ই গল্পটি লিখতে বসতে পারিনি। মাস দেড়েক পরে এক সন্ধ্যায় এক বসাতে প্রায় অর্ধেকটা লেখার পর আটকে গিয়েছিলাম। তারপর গল্পটি ফেলে রেখেছিলাম অন্য অনেক লেখার মতোই। এরপর মাঝেমাঝেই গল্পটি শেষ করার তাগিদ জাগতো। করতে পারিনি। পরে সম্ভবত অক্টোবরের শেষের দিকে গল্পটি লেখা শেষ করি। সমাপ্তিটা নিয়ে দোটানায় ছিলাম। তাই গল্পটি ফেলে রাখি। পরে ডিসেম্বরে গল্পটিতে চোখ বুলাতে গিয়ে দেখি বাক্য নির্মাণে কিছু অসঙ্গতি আছে। এরপর কয়েকদিন কাজের ফাঁকেফাঁকে গল্পটি ফাইনাল করেছি। আর লেখা কাটাকাটি করার অভ্যাস আমার বরাবরের। পত্রিকাতে গল্প পাঠিয়েও আমি কাটাকুটি করতে থাকি। এই গল্পটি আমি নিজে অনেকবার পড়েছি। যতোবার পড়েছি ততোবারই এক শব্দ এদিকে আরেক শব্দ সেদিকে বসিয়েছি। গল্পটি এই বছর মার্চে কালের কণ্ঠের সাহিত্যপাতায় প্রকাশিত হয়েছে। এটি প্রকাশের আগে গল্পটির সংলাপ আঞ্চলিক ভাষায় লিখতে ভিন্ন জেলায় কর্মরত আমার এক সহকর্মীর সাহায্য নিয়েছি। আমার মনে হচ্ছিল, মেনকি ফান্দার ভাষা ছাড়া গল্পটিতে প্রাণ আসবে না। 

গল্পপাঠ
লিখতে লিখতে কি মূল ভাবনা পালটে গেছে? 

সাদিয়া সুলতানা

না পাল্টায়নি। সমাপ্তি পাল্টেছে শুধু। 


গল্পপাঠ
 গল্পটি লেখার পরে প্রথম পাঠক কে ছিলেন? 

সাদিয়া সুলতানা

প্রথম পাঠক ছিলেন আমার হাজবেন্ড। তিনি আমার সব গল্পেরই প্রথম পাঠক। তবে গল্পটি কেমন হয়েছে সে সম্পর্কে জানার জন্য গল্পটি পড়তে দিয়েছিলাম মেহেরাব ইফতিকে, ও লেখালেখি করে। সেই হিসেবে ইফতিকে আমি এই গল্পের প্রথম পাঠক বলবো। 

গল্পপাঠ
 লেখার পরে কি মনে হয়েছে, যা লিখতে চেয়েছিলেন তা কি লিখতে পেরেছেন? 

সাদিয়া সুলতানা
সহজে তৃপ্তি আসে না আমার। কিন্তু এই গল্পটি লিখে আমার মনে হয়েছিল, আমি এটি এভাবেই লিখতে চেয়েছি।


সাদিয়া সুলতানার গল্প
মেনকি ফান্দার অপরাধ কিংবা পাপ


হাতিটার বিশালাকার পেটের ডান পাশে থালার মতো একটা গোলাকার ক্ষতচিহ্ন। মানুষের শরীরে দাদ হলে যেমন গোল দগদগে লালচে ক্ষত দেখা যায় চিহ্নটা ঠিক তেমন। মানব শরীরের সাথে হাতির শরীরের দাগের এই পার্থক্য শুধু দৈর্ঘ্য-প্রস্থে। যদিও সৃষ্টির সেরা জীবের সাথে শরীর ও মগজে হাতির পার্থক্য বিস্তর। মৃত হাতিটার ত্রিভুজাকৃতি কান, হালকা লোমশ ঝুলঝুলে চামড়ায় ঢাকা বিরাট মাংসল দেহ আর থাম আকৃতির পায়ের পাশে দাঁড়ানো একজন মানব সন্তানকে নিতান্ত ক্ষুদ্র লাগে। সেই বিশালত্ব উপভোগ করতেই উৎসুক জনসাধারণ হাতির চারপাশে মালার মতো গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই অঞ্চলের মানুষ মাঝে মাঝেই হাতির দর্শন পায়। সীমান্তের কাছাকাছি খাদ্যের খোঁজে দুএকটা দলছুট হাতি হঠাৎ লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসে। কিন্তু ভারতীয় সীমানার কাঁটাতারের পাশে এইভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা হাতির দশাসই মৃতদেহ দর্শনের অভিজ্ঞতা এই তল্লাটের লোকের কাছে নতুন।

হারুন হাতিটার শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। সে অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছে। হঠাৎ হাতিটার শরীরের ক্ষতে হারুন একটা পাটকাঠি গুঁজে দিতেই সেটা দেবে যায়। এখন বোঝা যায় বাইরে থেকে যতো নির্দোষ ধরনের দেখা যাচ্ছে ঠিক ততো নির্দোষ এই ক্ষত না। বেশ পুরানো ক্ষত। হারুন পাটকাঠি টেনে তোলার চেষ্টা করতেই কাঠির ডগা মট করে ভেঙে হাতির পেটে সেঁধিয়ে যায়। ভয় পেয়ে ও কয়েক পা পিছিয়ে আসে। নেতাগোছের মনোয়ার এসে হারুনের পিঠে চাটি মারে, 

-হালা! আকাম করস কেরে? পুলিশ আইলে ঠ্যালা বুঝবি। 

মনোয়ারের কথা শুনে ভয় পেয়ে হারুন হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির পথে হাঁটা ধরে। কিন্তু স্বস্তি না পেয়ে পিছু হেঁটে অদূরে পাকুড়ের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ঘটনাস্থলের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রাখে। শেষ পর্যন্ত কী হবে তা না দেখে তার পক্ষে বাড়ি ফেরা মুশকিল। এ এক অদ্ভুত টানাপোড়েন। নিজেদের পেশাগত ও গৃহস্থালি দায়দায়িত্ব ফেলে আশেপাশের দশ-বিশ বাড়ির কৌতূহলী লোকজন আজ এখানে হাতি দেখতে এসেছে। আপাত বৈচিত্র্যহীন গ্রামীণ জীবনের নিস্তরঙ্গ সকালে হাতির মৃতদেহটি বিস্তর কোলাহলের সুযোগ করে দিয়েছে। ইতোমধ্যে হাতিটি কীভাবে মারা গেল; কোথা থেকে এলো, কে এটির এত বড় অনিষ্ট সাধন করল, এর জন্য কত বড় কবর খোঁড়া লাগবে, নাকি একে পুড়িয়ে ফেলা হবে, কবর দেয়া বা দাহ করার আগে চামড়াটা ছিলে ফেলা হবে কিনা সেসব বিষয় নিয়ে মেনকি ফান্দার মানুষজনের মধ্যে বিপুল গবেষণা শুরু হয়েছে। 

বৃদ্ধ আব্দুল কুদ্দুস প্রতিবেশী হযরত মারফত খবর পেয়ে দশ বছর বয়সী নাতি মেহেরের হাত ধরে ছুটতে ছুটতে মরা হাতি দেখতে এসেছে। উত্তেজিত আব্দুল কুদ্দুস কাঁপা কাঁপা গলায় নাতিকে বলে, 

-বুঝছস দাদা, মরা আতি লাখ ট্যাহা। 

ভিড়ের মধ্যে কারো একটা সাবধানী গলা শোনা যায়, ‘কেলা মারচেরে ভুইত্যামারা আতি?’ মুরুব্বিগোছের কেউ একজন বলে, ‘অত বুড়া আতি, বয়স অইয়া মরছে। কত বড়! বাপরে বাপ! দত্যিদানোর মতো আতি! জীবনে পইলা অত কাছেত্তে দেখলাম। বাফরে, এইডারে লাড়াইব কিবা!’ এক যুবক হাতির শুঁড়ে হাত বুলাতে বুলাতে মোবাইল উঁচু করে মুখ হাসি হাসি করে সেলফি নেয় আর বলে, ‘এই চিন্তা তোমার কেরে চাচা? এই চিন্তাতো পুলিশের।’ 

প্রশাসনের লোক তখনো এসে পৌঁছায়নি। মেনকি ফান্দার এই অংশটা বেশ নিরিবিলি। জঙ্গলে পূর্ণ। ভারত বাংলাদেশ সীমানা পিলারের দিক হওয়ায় লোকজনের যাতায়াত কম। কোনো কোনো জায়গায় মানুষসমান ঝোপঝাড়। সেই ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে এদিকে আসতে হয়। বলা যায় প্রাণ খোয়াবার ভয়ে সীমান্তের আশেপাশে লোকজন কম আসে। এছাড়া নেশাখোররাও ঝোপের আড়ালে শিকারের আশায় ওৎ পেতে থাকে তাই পারতপক্ষে লোকজন এই দিকে আসে না। আজ অবশ্য এখানে কৌতূহলী লোকের ভিড়। প্রাথমিক উত্তেজনা থিতিয়ে আসার পর তারা এখন সরকারি লোকজনের আগমনের আশায় পথ চেয়ে আছে। 

ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে ইটের সোলিং রাস্তা থেমে গেছে। সেখানে গাড়ি রেখে পায়ে হেঁটে এদিকে আসতে হয়। মানুষের আনাগোনা নেই বলে কারো পায়ের চাপে জঙ্গল ভেদ করে তেমন কোনো হাঁটার রাস্তাও তৈরি হয়নি। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে দুটো গাড়ি এসেছে। গাড়িতে আসা সরকারি অফিসারদের এখন জঙ্গল মাড়িয়ে এখানে আসতে হবে। 

আজ নজরুল প্রথম হাতির মৃতদেহটি দেখতে পায়। ওর বাড়ি মেনকি ফান্দার এই শেষ প্রান্তে। যদিও বিজন এই এলাকায় নজরুলের যাতায়াত কম। মাঝে মাঝে তার পরিবারের সদস্যরা এদিকে লাকড়ি কুড়াতে আসে। আজ সকালে নজরুল তার বড় মেয়ে আট বছর বয়সী হেনাকে সাথে করে বউয়ের ফরমায়েশ অনুযায়ী লাকড়ি খুঁজতে বের হয়েছিল। হঠাৎ তরতাজা কিছু ট্যাকা পাতা চোখে পড়ায় সেগুলো তুলতে গিয়ে উঁচু টিলা দেখে এগিয়ে যেতেই হাতিটাকে পড়ে থাকতে দেখে ও মেয়ে রেখে দিগ্বিদিক ছুটে পালিয়েছিল। আসলে নজরুল পালায়নি, মেনকি ফান্দা গ্রামের অন্যতম মাথা জহির মেম্বারকে ডাকতে গিয়েছিল। নজরুল জহির মেম্বারের নিতান্ত অনুগামী। গেল বর্ষায় জহিরের তদবিরে চেয়ারম্যান সাহেবের কাছ থেকে ও অন্যদের চেয়ে পাঁচ কেজি চাল বেশি পেয়েছিল। 

জহির মেম্বার খবর পেয়ে হাতির কাছে আসার আগে বন বিভাগ আর থানায় লোক পাঠিয়েছিল। তারপর হন্তদন্ত হয়ে নিজে ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই যে অত বড় অনিষ্ট হয়ে গেছে সেই বিষয় তখনো জহিরের কানে পৌঁছায়নি। জানলে সে চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে পরামর্শ করে হাতির লাশের পাশে পাহারা বসাতো আর চোর ছ্যাচ্ছড় ধরতে গাঁয়ে লোক ছড়িয়ে দিতো। যখন বিষয়টা ওর কানে এসেছে ততক্ষণে খুব দেরি হয়ে গেছে। যদিও লোকজন প্রথমে এসব টের পায়নি। তারা মৃত হাতি দেখাতেই মগ্ন ছিল। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহবুব হোসেন প্রথম বিষয়টা খেয়াল করেছেন। একে একে বন বিভাগের দুর্গাপুর রেঞ্জের কর্মকর্তা হায়দার আলী, স্থানীয় ভেটেরিনারি সার্জন তৌফিক ইজাজ, দারোগা মিজান উপস্থিত হলে আমজনতা বিষয়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছে। 

এখন তো বন বিভাগের লোকজন হাতির দুরবস্থা দেখে হম্বিতম্বি শুরু করেছে। দারোগাও আসার পর থেকে একে বেঁধে নেন তো তাকে বেঁধে নেন। তাই দেখে মেহের মজা পেয়ে বড়দের লম্বা শরীরের আড়ালে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসছে। বৃদ্ধ আব্দুল কুদ্দুস নাতির হাত ধরে টানে, 

-অত হাসছ ক্যারে ছ্যাড়া, কত বড় হাপী দেখছচ? একটা মরা আতিরেও ছাড়ছে না! মানুষ লুটা মানুষ জন্তু-জানোয়ারও লুটে! কত বড় হাপরে হাপ! 


ছোট মেহেরের মাথায় ছোট বিষয়টা ঢোকে না। যুগপৎ বিস্ময়ের সাথে দাদাকে সে প্রশ্ন করে, 

-এইডা তো চুরি? হাপ কিবাই অয়? হাপ আর চুরি কি এক? 

নাতির কথা শুনে আব্দুল কুদ্দুস হেসে বলে, 

-সব চুরিই হাপরে দাদা। 

আব্দুল কুদ্দুসের কথায় মেহের আবার খিলখিলিয়ে হাসে, 

-তয় তুমি যে বেইন্যা সম রান্নাঘরতে দুধ চুরি কইরা খাইচছ হেইডাও হাপ। 

নাতির কথা শুনে আব্দুল কুদ্দুসের মুখ আমচুরের মতো শুকিয়ে যায়। সে আর কথা খুঁজে না পেয়ে নাতির পাশ থেকে সরে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকে। 

লোকজনের গুনগুন শুনে দারোগা মিজান ক্ষেপে ওঠে, 

-এমনিতে তো কারো গলায় রা নাই, পিছন ফিরলেই অত ফটফট করে কোন শালা! 

জনতার মাঝে নিবিড় নির্জনতা নেমে আসে। দারোগা মিজান হাতির মুখের দিকে এগিয়ে ক্ষতির পরিমাণ পরখ করেন। ভেটেরিনারি সার্জন তৌফিক ইজাজ মিজান দারোগার দিকে তাকিয়ে বলে, 

-পুরুষ হাতি। এই যে এর ওপরের দুটা কর্তন দাঁত শুঁড়ের দুপাশ দিয়ে লম্বা হয়ে বেরিয়ে ছিল। দুটা গজদন্তের কোনোটাই অক্ষত নেই। একটার তো পুরোটাই কেটে ফেলেছে। আরেকটা অর্ধেকটা আছে। দাঁত কাটতে গিয়ে শুঁড়ও কেটেছে। আর ওইপাশের কানের অংশও কাটা। 

-কীভাবে মারা গেছে? 

দারোগার প্রশ্ন শুনে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহবুব হোসেন এগিয়ে এসে জবাব দেন। 

-ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য হাতির দেহের অভ্যন্তরের বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। এরপর ময়নাতদন্ত করে এর মৃত্যুর কারণ বলা যাবে। আমরা বেশি দেরি না করে মনে হয় এখনই কাজ শুরু করতে পারি। 

সার্জন তৌফিক ইজাজ সাহেব বলেন, 

-ভিসেরা নিয়ে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক রোগ গবেষণা কেন্দ্রে রিপোর্টের জন্য পাঠাতে হবে। 

হাতির দাঁত, কান, শুঁড়ের কাটা অংশে তাকিয়ে দারোগা মিজান আবার তর্জনী উঁচু করে হুংকার করে ওঠেন, 

-কোন হারামির কাম রে! আজকা সব কয়টারে বাইন্দা নিয়া যামু। হাতির পাঁচ পা দেখছে শালারা। 

দারোগার গর্জন শুনে মেহের হাতির পা গোনে। তারপর বিস্ময়ের সাথে দাদাকে বলে, 

-আতির তো চাইরডা পাও দাদা, পাঁচডা কই পাইচছ? 

হৈ হৈ করে নাতিকে থামায়, 

-অত কথা কইস না ছ্যাড়া। দারোগা সাব রাগ অইছে। রাগ অওনেরি কথা, অবলা জন্তুটা নিজের পুরা শইলডা লইয়াও কব্বরে যাইতে পারল না। 

-ও দাদা, কব্বরে কি পুরা শইল লইয়া যাওয়া লাগে? 

-হ। 

-মনা কাক্কুর হাত যে গাড়ির তলে ফইরা কাইট্টা গেছে গা, হেইলা কব্বরে যাওনের আগে হাত হাইব কই? 

নাতির বেকায়দা প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আব্দুল কুদ্দুস দারোগার কর্মকাণ্ডের দিকে মনোযোগ দেয়। লোকজন জানে দারোগা মিজান ফাঁকা আওয়াজ দেয় না। এলাকায় রটনা আছে; সে মন্ত্রী, এমপি মানে না। এলাকার উঠতি বা বর্ষীয়ান সব ধরনের নেতারা তাকে সমীহ করে চলে। গেল সপ্তাহে খিজির চেয়ারম্যানকে কোমরে দড়ি বেঁধে নিতে এসেছিল। চেয়ারম্যান সাহেব হাতে পায়ে ধরে ছাড়া পেয়েছেন। আজ ঘটনাস্থলে চেয়ারম্যান নেই। সামনের সপ্তাহে মন্ত্রী মহোদয়ের সম্ভাব্য আগমন উপলক্ষে শহরে মিটিং করতে গেছেন। চেয়ারম্যানের কথা জহিরকে জিজ্ঞাসা করতে করতে দারোগা মিজান ওর দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকান। কেউ আজ তার সন্দেহের তালিকার বাইরে না। দারোগা মিজান খুব কর্মনিষ্ঠ ও কঠিন মানুষ। কোনো জায়গায় কোনো অঘটন ঘটলে তিনি দ্রুততার সাথে স্পটে হাজির হয়ে যান। যদিও আজ হাতি মরার খবর তিনি দেরি করে পেয়েছেন। আরও আগে খবর পেলে হয়তো এই অঘটন ঘটতো না। 

বন বিভাগের দুর্গাপুর রেঞ্জের কর্মকর্তা হায়দার আলী হাতিটার দাঁতে-শুঁড়ে হাত বুলাতে বুলাতে প্রায় কান্না গলায় বলে, 

-দারোগা সাহেব, আপনি বললে হাতিটারে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করি। 

এখানে আসার আগে হায়দার আলী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। দারোগা মিজান অবশ্য জিডির আগেই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে চলে এসেছেন। কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত জানাতে এখন তারা দুজনেই ফোনে কথা বলছেন। ফোনে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে দারোগা মিজান একে-ওকে জেরা করে ঘটনার কার্যকারণ বের করারও চেষ্টা করছেন। দারোগা মিজানের জেরার সামনে বিপর্যস্ত হারুন একটু তফাতে গিয়ে নজরুলের কানে কানে বলে, 

-আমার লাহান পটকা মাস্টার অত্ত ভুইত্যা মারা হাতি কিবা মারবোরে! ওর হায়ের তলাত চাহা খাইয়া কবে পেটের নাড়িভুঁড়ি বাইর অইয়া যাইত! 

নিজের কথায় নিজে মজা পেয়ে ফিকফিক করে হাসে হারুন। তা দেখে নজরুলের গা জ্বলে। 

-তোরে আতি মারার লাইগ্গা ধরতো আইছে কেলা? তোরে ধরতো আইছে আতির দাঁতের লাইগা। আতির দাঁতের দাম লাখ ট্যাহা। 

নজরুল অসহিষ্ণু গলায় জবাব দিয়ে হারুনের কাছ থেকে সরে দাঁড়ায় আর মনে মনে গাল দেয়, হাগলচোদা। হাতিটার দাঁত, কান, শুঁড়ের কাটা অংশে তাকিয়ে নজরুলের মনের মধ্যে কী একটা অশান্তির বুদবুদ পাঁক খেতে থাকে। এত কাছে থেকেও সে হাতিটার অস্তিত্ব টের পেলো না, যদি টের পেতো তাহলে তো আজ সে লাখ টাকার মালিক হতো। রাতের আঁধারে কাজটা করে ফেললে কেউ কিছু টের পেতো না। সেই না পাওয়াই অক্ষম ক্রোধে পরিণত হয়। ভিড়ের মাঝে হেনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নজরুল বিকট গলায় চিৎকার করে, 

এইহানে রঙ দেহস! যা বাড়িত যা। চেরি মানুষ হইয়া রাস্তঘাটে রঙ দ্যাহে! 

নজরুলের ধমক শুনে হেনার বদলে হারুন ঘটনাস্থল থেকে খানিক দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। মরা হাতি লাখ টাকা সকাল থেকে শুনে আসছে হারুন। এইবার কথাটার মানে বুঝতে পেরে সে ভড়কে যায়। এমনিতেই দারোগার কাছে তার পুরানো হিশেব আছে। কে জানে ব্যাটা তা মনে রেখেছে কিনা। দারোগা মিজান হারুনের দিকে এগিয়ে আসছে দেখে ওর দুই পা যেন মাটির ভেতর দেবে যেতে থাকে। 
-তুই হারুন না? 

-হ স্যার। 

-কই ছিলি কালকা রাতে? 

-খোদার কিরা স্যার বাড়িত আছিলাম। এশার নামাজ পইড়া বাড়িত গেয়া হুইত্যা পড়ছি। 

-কিরা কাটছ ক্যা? তোরে আমি চিনি নাই ভাবছোস? তোর আকাম-কুকামের লিস্ট আমার কাছে আছে। 

হারুন ঢোক গেলার চেষ্টা করে কিন্তু গলার ভেতরে আলজিহ্বা পর্যন্ত শুকনো লাগায় মুখ চোখ বিকৃত হয়ে ওঠে ওর। দারোগা সাব ঘটনা ভোলেন নাই। 

মাস তিনেক আগে মাগরিবের ওয়াক্তের সময়ের ঘটনা। সে সহ ছয়-সাত কামলা চেয়ারম্যান বাড়ির ধান মাড়াইয়ের কাজে নিয়োজিত ছিল। এর মধ্যে মহিলাও ছিল কয়েকজন। দিনে বার দুয়েক কাজের ফাঁকে কামলা ফজুর বউ হেলেনার সাথে চোখাচোখি হলে হেলেনা মুখের হাসি প্রসারিত করে জিজ্ঞাসা করতো, ‘দেওরা বালা আছনি?’ নতুবা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে চোখে চোখ রেখে বলতো, ‘বেয়া করবা কোনসম গো দেওরা?’ হেলেনার ইশারা দেখে দেখে হারুনের কী যে হলো, সবাই ভাত খেতে গেলে পিছন থেকে গিয়ে হেলেনাকে সে জড়িয়ে ধরেছিল। আর যায় কোথায়, ফজু দলেবলে এসে ওকে থানায় দিয়ে এসেছিল। দুই চারটা চড়-থাপ্পড়ের বদলে জেলের ভাত খেতে হয়নি সেবার। 

হারুনকে নিশ্চুপ দেখে মিজান দারোগা বলে, 

-মানুষের চোখের দিকে তাকাইলেই বুঝি কার ভিতরে কী আছে। আমার হাত থেইকা কেউ রেহাই পায় নাই। সেই দোষে সময় মতো আমার প্রমোশন হয় নাই। 

হারুন ভয়ে পিছু হটে। এবার সে সত্যি সত্যি বাড়ির পথ ধরে। 

দারোগা সাহেব আব্দুল কুদ্দুসের সামনে এসে দাঁড়াতেই মেহের দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে, 

-দাদায় হত্তি দিন বেইন্যাসময় ডহিত্যে দুধ চুরি কইরা খায়। মায়তো দাদারে দুধ খাইতে দেয় না। কয়, বুইড়া মানুষ দুধ খাইলে প্যাট নামব। তয় দাদার প্যাট নামে না। 

বিব্রত আব্দুল কুদ্দুস নাতির মুখ চেপে ধরে। দারোগা মিজানের ভাবগম্ভীরমুখে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। তিনি কিঞ্চিৎ রসিকতা করে বলেন, 

মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়তে থাক। নইলে ধর্মমতে ভগবান, যিশুর নাম নে। একটু পর আসল অপরাধীরে ঠিকই খুঁইজা বাইর করুম। 

মেহের দাদার হাত ধরে আবার একটা বেমক্কা প্রশ্ন করে, 

-আতির অইয়া তো কেউ বিচার চায় নাই দাদা, তাইলে পুলিশ মানুষরে ধরব ক্যারে? 

দারোগা মিজান নজরুলের দিকে এগিয়ে যায়। নজরুল ততক্ষণে আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করেছে। ওর মনে পড়ে ওর মা জয়ফল মারা যাবার দিনের কথা। নজরুলের বড় ভাই কামরুল তখন নেত্রকোনা শহরে থাকতো। ভাই আসার আগেই মায়ের হাতের চিকন চুড়ি আর কানপাশা জোড়া ও সরিয়ে ফেলেছিল। সে সব না পাওয়া যাওয়ায় দাফনের আগে কামরুল খানিকক্ষণ হম্বিতম্বি করলেও জয়ফল কারো কাছে বন্ধক রেখেছে ভেবে নিজেকে শান্ত করেছিল। পরে একদিন নিরিবিলি দিনক্ষণ দেখে নজরুল শহরে গিয়ে রঘু স্যাকরার দোকানে গহনাগুলো বেচে দিয়েছিল। 

নজরুল মুখ চুন করে নেয়ামতের দিকে তাকায়। সকল দৃষ্টি উপেক্ষা করে দারোগা মিজানের কাছে গিয়ে নেয়ামত খেকখেক করে হাসে। এই ভিড়ের মধ্যে কখন যে নেয়ামত এসে দাঁড়িয়েছে তা কারো চোখে পড়েনি। নেয়ামত হঠাৎ উদভ্রান্তের মতো হাতির চারপাশে দৌড়াতে থাকে। ওর পরনের লুঙ্গির ভেতরে বাতাস ঢুকে বেলুনের মতো ফুলে ওঠে। হাতির চারদিকে এক পাক ঘুরে এসে নেয়ামত চিৎকার করতে থাকে, 

-মরা আতি লাখ ট্যাহা। মরা মানুষ দশ হাজার ট্যাহা। মরা আতি লাখ ট্যাহা। মরা মানুষ দশ হাজার ট্যাহা। 

নেয়ামতের কথা শুনে মিজান দারোগা চমকে ওঠে। তর্জনী আর মধ্যমার মাঝখানে ধরে থাকা সিগারেট টানতে ভুলে যায়। পাঁচ মাস আগে এই গ্রামেরই একটা গাছের ডালে নেয়ামতের মেয়ে কলির লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। নেয়ামত অভিযুক্তদের সাথে আপোস করেছিল। শেষ পর্যন্ত তাকেও প্রভাবশালীদের চাপে ধর্ষণসহ হত্যা মামলায় আত্মহত্যা মর্মে তদন্ত রিপোর্ট দিতে হয়েছিল। মিজান দারোগা নেয়ামতকে ধমক দিতে গিয়েও থমকে যান। কলি হত্যা মামলায় তিনি যা করেছিলেন সেটা কী অপরাধ? না পাপ? 

নেয়ামতের চিৎকারে ঝিম ধরা জনতার একাংশ আড়মোড়া ভাঙে। নেতিয়ে পড়া ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ কেউ আবার গুঞ্জনে মুখর হয়ে ওঠে, মরা আতি লাখ ট্যাহা। এরপরের ঘটনা খুব দ্রুত ঘটতে থাকে। মেনকি ফান্দার আকাশও বদলে যায় হুট করে। মেঘহীন স্থির আকাশে এখন একটা থমথমে ভাব। খানিক আগেও আকাশটা সফেদ ছিল। এখন চারপাশে ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এসেছে। কী এক অশুভ ইঙ্গিতে বৃদ্ধ আব্দুল কুদ্দুসের বুক কেঁপে ওঠে। এ কীসের আলামত? অন্যান্য সবার মতো কিছুই বোধগম্য হয় না তার। 

ধীরে ধীরে আকাশের মতো কৌতূহলী জনতার মধ্যেও বিপুল পরিবর্তন ঘটে। দারোগা মিজান দৈবচয়ন পদ্ধতিতে অপরাধী সনাক্ত করে গ্রেপ্তার করার আগেই সেই আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটে যায়। কিন্তু বাইরে থেকে তা দেখা যায় না। ততক্ষণে হাতির বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নমুনা সংগ্রহ করতে ব্যতিব্যস্ত থাকা বনবিভাগ আর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের কর্মকর্তাগণও হাতের কাজ অসমাপ্ত রেখে উঠে দাঁড়িয়েছেন। যদিও তাদের অপরাধের ফিরিস্তি কেউ জানতে চায়নি। তবু বন বিভাগের দুর্গাপুর রেঞ্জের কর্মকর্তা হায়দার আলী থতমত খেয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকেন; মধুপুর বন বিভাগে চাকরি করা কালে যা যা হাপিস করেছেন তার বখরা তো ঠিকঠাক পৌঁছে গেছে সব জায়গায়, এতে আবার অপরাধ কী? পাপই বা কোথায়? উপরমহলের স্যাংশন থাকে যেসব কাজে সেসব তো এ দুটোর কোনোটাতেই ফেলা যায় না। 

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহবুব হোসেন কর্মজীবনের সততার ইতিহাস পুনঃপাঠ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেই তার নিশুর কথা মনে পড়ে। নিশু তার স্ত্রী। অনাকাক্সিক্ষত ভ্রুণটা ওয়াশ করার সিদ্ধান্তে তাদের দুজনেরই সম্মতি ছিল। এত বছর পর সে কথা মনে পড়ায় মাহবুব হোসেন অদ্ভুত এক আবেগে পাশে দাঁড়ানো মনোয়ারের হাত খামচে ধরেন। মনোয়ার তখন ওর ডান হাতের ক্ষতটা আড়াল করতে গুটিয়ে রাখা শার্টের হাত ছাড়তে ছাড়তে আড়চোখে এদিকসেদিক তাকায় আর মনে মনে ভাবে কোনোভাবেই অর্ধেক দাঁতের লোভে রাতে আবার আসা ঠিক হবে না। যা পেয়েছে তাই সাত বলদের দুধ। আর সে না নিলে সরকারি লোকজনই এসব হাপিস করতো। মনোয়ার আপনমনে বিড়বিড় করে, ‘এই যে অহন অত বড় বড় কথা কইছে তহন কি আর দাঁতসহ আতিরে কবর দিতো? এহ আবার হাপ আর অপরাধের হিসাব লয়!’ 

অপরাধ কী? পাপই বা কী? সব অপরাধ কি পাপ? সব পাপ কি অপরাধ? প্রশ্নগুলো এত জড়াজড়ি করে থাকে যে এদের উত্তর পাওয়া মুশকিল হয়। তাই প্রশ্নবিদ্ধ তাকিয়ে থাকলেও কেউ উত্তর খোঁজে আবার কেউ খোঁজে না। ঠিক এভাবেই বড় বড় গাছের কারুকার্যময় ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে সরকারি লোকজনের কাজকারবার দেখতে থাকা জহির মেম্বার, নফর, মানিক, জোলা কাশেম, ফরিদ, জিকির থেকে শুরু করে মেনকি ফান্দার প্রত্যেকটি মানুষ তাদের কৃত অপরাধ আর পাপের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। তারা আধবোজা চোখে নিজেদের দৃষ্টিসীমানায় দেখতে থাকে নিজেদের পাপ আর অপকর্মের ফিরিস্তি। নিজেকে সবচেয়ে বেশি পূণ্যবান মনে করা মহির শেখও নিজের অপকর্মের নিশানা দেখে বিস্ফোরিত চোখে ঊর্ধ্বাকাশে তাকিয়ে থাকে। 


আকাশের রুগ্ন রূপে এখন চারপাশ আরো ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। যেন পৃথিবী উপচানো অপরাধ কিংবা পাপ আকাশের ঠিকানায় পৌঁছেছে। ভিড়ের মধ্যে ওরা কেউ পরস্পরের চেহারা দেখতে পায় না। খানিক আগের ঔৎসুক্য মিলিয়ে গিয়ে অল্পবিস্তর দিশেহারা ভাব লেগে থাকে তাদের চোখেমুখে। অতঃপর পাপের ভারে কালো হয়ে থাকা আকাশে ধীরে ধীরে মেনকি ফান্দার মানুষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অপরাধ আর পাপের খতিয়ান বিন্দুর মতো মিলিয়ে যায়। 



লেখক পরিচিতি
সাদিয়া সুলতানা
জন্মস্থান-নারায়ণগঞ্জ
জন্মতারিখ-৫ জুন
পড়াশুনা-এলএল.বি. (অনার্স), এলএল.এম. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বর্তমানে কোথায় থাকেন-রংপুর

প্রকাশিত বইয়ের নাম-
চক্র (গল্পগ্রন্থ, বাংলাদেশ রাইটার্স গিল্ড প্রকাশনী),
ন আকারে না (গল্পগ্রন্থ, চৈতন্য প্রকাশনী)
আমি আঁধারে থাকি (উপন্যাস, চৈতন্য প্রকাশনী)
ঘুমঘরের সুখ-অসুখ (প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ, চৈতন্য প্রকাশনী) 

1 টি মন্তব্য: