রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

রিমি মুৎসুদ্দি'র গল্প : জমি-জিরাৎ

-আয় না বেটা আয় একটা উধিঁ খাবি আয়। 

শীতের পড়ন্ত বেলায় হাটের পথে যাওয়ার সময়ে এ ডাক শুনে থামতেই হত অনন্তকে। থামত, তবে এগোত না ও। সেখান থেকেই বলত, 

-ফিরার পথে আসব খুড়ি। এই সবে একথাল ভাত খেয়ে বেড়িয়েছি।

মণ্ডল খুড়ি কোন কথাই শুনত না। ফেরার সময়ে যদি ফাঁকি দিয়ে চলে যায় তাই একরকম জোর করেই ধরে এনে পিঁড়ি পেতে অনন্তকে বসাত। তারপর এনে দিত শালপাতায় মোড়া খানকতক উধিঁ পিঠে। ভরাপেটেও নেহাত বাধ্য হয়েই মুখে তুলতে হত একটুকরো পিঠে। স্বাদে চোখ বন্ধ হয়ে আসত। 

-ও খুড়ি হাটে নিয়ে চললাম। ফিরার পথে খেতে খেতে ফিরব। 

আর দাঁড়াত না ও। কাল টুসু ভাসানের পর লাল শাড়ি পড়বে নতুন কাকী। নতুন লাল শাড়ির সাথে চাই লাল ফিতে। হাট থেকে অনন্তকে ফরমায়েস দিয়েছে কিনে আনার। ও প্রায় দৌঁড় লাগাত হাটের পথে। 

শরীরটা ভাল যাচ্ছে না কতদিনধরেই। ন’পাড়ার বাবন আগে কানাই ডাক্তারের কম্পাউণ্ডার ছিল। তখন বাড়ি এসে প্রেশার মেপে দিয়ে যেত। যাওয়ার সময় শুধু টাকা নয়, একঝুড়ি আলু বা ক্ষেতের সর্ষেও নিয়ে যেতো। এখন তার নিজের ওষুধের দোকান। পার্টি করে ড্রাগ লাইসেন্স জোগাড় করেছে। এখন আর বাড়ি আসে না। প্রেশার মাপাতে কয়েকমাইল হেঁটে এই অসুস্থ শরীরে অনন্তকেই যেতে হল বাবনের দোকানে। ফেরার পথে হাঁপ ধরে যাচ্ছে। মণ্ডলদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আগাছায় ছেয়ে যাওয়া উঠোনটার দিকে চোখ পড়তেই খানিক দাঁড়ায় ও। মণ্ডল খুড়ির কোনো ছেলেপুলে ছিল না। কতবছর আগের কথা! তা প্রায় ৪০-৪৫ বছর হবে। এখনও কি মণ্ডল খুড়ির মত কেউ গাঁয়ের ছেলে-পুলেদের বাড়ীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে ডেকে এক-আধটা উধিঁ খাওয়ায়? টুসু-ভাসানের পরে মেয়ে-বউদের কি এখনও লাল শাড়ির সাথে লাল ফিতে চাই? পরবগুলো একই রয়ে গেছে। মানুষগুলো বদলে গেছে। মণ্ডল খুড়িও মরেছে আজ বেশকয়েকবছর হয়ে গেল। একভাই ছিল খুড়ির। কলকাতা থেকে মাঝেমাঝে আসত। ঘরদোর পরিষ্কার করাত। আগাছা আর শ্যাওলায় ভরা উঠোনের মাঝখানে একটা পরিত্যক্ত তুলসীবেদি। অনন্ত বুঝল সে ভাইও এখন আর আসে না। 

ফাঁকা ওই উঠোনটার দিকে তাকিয়ে অনন্তর কেরকম একটা অনুভূতি হল। হয়ত বিষাদ। কিন্তু এ বিষাদকে ও স্বীকার করে না। বিষাদের জ্বালাটুকু লেগে থাকে ওর সমস্ত অনুভূতিতে। মুখের ভেতরে একটা কষাটে ভাব অনুভব করে ও। সকালে খালিপেটেই বেড়িয়েছিল। কদিনধরে খাওয়ার ইচ্ছেটাও যেন মরে যাচ্ছে। তাই হয়ত শরীরটা খারাপ লাগছে। 

এইসব সময়ে একটা মুখ ওর খুব মনে পড়ে। লালচেলি, একহাত ঘোমটায় একটা নতুন বউ এসে দাঁড়িয়েছে ওদের উঠোনে। তুলসীতলার গা ঘেঁষে। শাঁখ, উলুর শব্দ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। তবুও বধূবরণের সময় হাসাহাসি আর টুকরো কথাবার্তা সব অনন্ত যেন হাঁ করে গিলছিল। আর ও তখন শুধু নতুন কাকীর মুখটা দেখতে চাইছিল। শুনেছিল খুব নাকি সুন্দর। নদীর দেশের মেয়ে নতুন কাকী। ওদের গন্ধেশ্বরীর মতো মজা নয়, সেসব ভরন্ত নদীর দেশে জলহাওয়া খুব ভাল। সেইসব ভালর ছাপ নিয়ে নতুন কাকী একটা নতুন দেশ থেকে এসেছে ওদের এই পুরনো গ্রামে, ওদের সংসারে আর ওদের জীবনেও। ডাক্তারি পড়তে গিয়ে কাকা নিজেই এ বিয়ের সম্বন্ধ করেছে। বাড়ির সবার বেশ আপত্তি সত্ত্বেও মেজমামা বলেছিল, দাদা একেবারে দুগগা প্রতিমার মতো ভাইয়ের বউ হবে আপনার। এ মেয়ে খুব লক্ষ্মীমন্তও। আর তাছাড়া, বিনু নিজে যখন পচ্ছন্দ করেছে, ও কথা দিয়েছে, তখন সে পিছু হটবে না। আপনি আর দ্বিমত করবেন না। 

এইসব আরও কতকথা শুনতে শুনতে অনন্তর কিশোরমনে কলকাতায় ডাক্তারি পড়া কাকার ভাবী বউ অর্থাৎ ওর নতুন কাকী সম্পর্কে বেশ একটা কৌতূহল হত। 

অনন্ত ভাবে তার নতুন কাকী এই এতবছরে আর নতুন নেই। তবু ডাকটা একই রয়ে গেছে। সে এখন অনন্তের কাছে কিছু কিনে আনার ফরমায়েস দূর কতবছর ভাল করে কথাই বলে না। টুসু ভাসানের আগের দিন রাত জেগে মা –জেঠীদের সাথে নতুনকাকীও মাটির সানকিতে চালগুঁড়ি দিয়ে পিঠে ভাপাত। “উঠে উঠে উঠে টুসু পৌষ-সংক্রান্তিতে/মুড়ি ভাজে চুড়ি ঝনঝন করে গো।” 

সারারাত ধরে চলত টুসু গান। বিহান বেলায় সূর্য ওঠার আগেই ইতুর খোলায় ভাসান যেত টুসুমণি। ভাসানের পরে স্নান সেরে নতুন কাকী প্রথম পিঠে দিত অনন্তকে। নতুন কাকীর হাতের ছোঁয়া সেদিন পেত ও। সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া অনন্তের এক অদ্ভুত ভাললাগার অনুভূতি হত সেসময়। প্রচণ্ড শীতেও ঠোটের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হত। না চাইলেও চোখের তারা বারবার নতুন কাকীর সদ্যস্নাত শরীরের দিকে চলে যেত। আজ এত বছর পরেও সে অনুভূতির কথা মনে পড়ে ওর শিহরণ জাগছে। মন চাইছে ভুলে যেতে সব বিবাদ। সামান্য জমি-জিরাৎ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নতুন কাকীর বিরুদ্ধে যে অভিমান ও পুষে রেখেছে তা শেষ করে দিতে মন চায়। 

পৌষ-সংক্রান্তির দিনে গাঁ-ঘরে উৎসব। গাঁ-এর লোকজন আগের মত কেউ কারো খোঁজ নেয় না। দায়সারা ডাকখোঁজে সারা দিতে মন চায় না সুবর্ণরেখার। তাই প্রতিবেশী সুভাষের বউ নমিতা নতুন ধানের পায়েস খেতে কতবার যেতে বললেও মন চায়না যেতে। নমিতা মেয়ে ভাল। কিন্তু প্রায়ই টাকাধার চায়। 

-খুড়ি এইবার তোমার ছেলে কলকাতা থেকে ফিরে এলেই টাকা’কটা দিয়ে দেব। 

প্রায়ই টাকা ফেরত দিতে দেরী করে। তবুও একটা প্রয়োজনে ডাকার মতো কেউ নমিতা ছাড়া আর কেউই নেই সুবর্ণরেখার। আপন বলতে এ গাঁয়ে তো শুধু তাঁর ভাসুরপো অনন্ত। সে তো তার কাকীর সাথে শত্রুতা করেই সময় পায় না। সামান্য কটা জমি তার জন্য এতদিনের সখ্যতা সব ভুলে গেল। না ভুলেই বা কী করবে? তাঁর নিজের ছেলেরাও তো মা’কে ভুলেছে। সেই সুদূর আমেরিকা থেকে মাঝে মাঝে ফোনে মায়ের খোঁজখবর নেয় বটে। তবে পারতপক্ষে গ্রামের পথ মাড়ায় না। তাঁর মৃত্যুর পর বিঘে দশেক জমির যে কি হাল হবে, তা ভেবে কুল পায় না সুবর্ণরেখা। 

-ঝন্টু এবার একটু সর্ষে দিও তো? সুবল কলকাতা গেলে পাঠাবো আমার ভাইয়ের বাড়ি। 

-হ্যাঁ হ্যাঁ সেসব হবে নিশ্চয়ই। একটা জরুরী কথা আছে মা। 

ঝন্টুর জরুরী কথায় সুবর্ণরেখা একটু ভয় পেয়েই যান। আজকাল বুঝতে পারেন না, সবার সবকথা। 

-কেউ জমি নিয়ে কোনো কথা বলতে এলে কথা বলবা না মা। আর কোথাও সই করবাও না। 

হাঁফ ছেড়ে বাঁচে সুবর্ণরেখা। এ তো তিনি জানেনই। ঝন্টু নতুন কিছু বলছে না তাহলে। কেন যে এত ভয় হয়? কেন যে কাউকেই আজকাল আর বিশ্বাস করতে পারেন না? অথচ বিশ্বাস করতে পারলে কত শান্তি পেতেন! 

ঝন্টুর চলে যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে তিনি ভাবেন, ঝন্টুকে দিয়ে চাষ না করিয়ে অনন্তকে জমিটা দিয়ে কিছু বন্দবস্ত করলেই বুঝি সব দুশ্চিন্তা, ঝঞ্জাট থেকে রেহাই পেতেন। ঝন্টু তো অনন্তর জমিও চাষ করে। কিন্তু তাঁর যে জমিটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই। বাঙাল বাড়ির মেয়ে ছিলেন। ঘটি বাড়িতে বউ হয়ে এসেছিলেন। সেই কবে দাঙ্গার আগেই মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে চলে এলেন পরিবারের সাথে। কতই বা বয়েস হবে তখন? চোদ্দ-পনেরো। সব স্মৃতি আবছা হয়ে গেলেও সুবর্ণরেখার মনে আছে কিছু টুকরো ছবি, মুহুর্ত। তাঁর ঠাকুমা দেশ থেকে একটা শিমুল আর লিচু গাছের চারা নিয়ে এসেছিল। আর সেই চারায় লেগেছিল অনেকটা মাটি। নতুন দেশের মাটিতে তা পুঁতে ফেলার সময়ে পরম মমতায় নতুন মাটির গায়ে ঠাকুমা রেখে দিয়েছিলেন পুরোন মাটি। সেই শুরু মাটির প্রতি তাঁর মমত্ব। একটুকরো মাটি যে কতটা কাছের, কত ক্ষতের প্রলেপ তা তিনি তখন থেকেই বুঝতে পারতেন। 

ঠাকুমা আঁচলে চোখ মুছতেন আর দেশ থেকে আনা গাছের চারায় লেগে থাকা মাটির গায়ে হাত বোলাতেন। যেন হারিয়ে যাওয়া সন্তানের স্মৃতি নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন। বেশীদিন অবশ্য ঠাকুমার সাথে এদেশে থাকতে পারেন নি। একবছরের মাথায় কাকার মেডিক্যাল কলেজের বন্ধু বেড়াতে এসে তাঁকে পচ্ছন্দ করে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। বাড়িতে মেনেও নেয় সবাই। খুব তাড়াতাড়ি সব আয়োজন করে বিয়েও হয়ে যায় তাঁর। 

এরপর স্বামীর হাত ধরে আবার বাড়ীবদল, দেশবদল। বহরমপুর থেকে বাঁকুড়ায় আসা তাঁর কাছে দেশ বদলই মনে হত। যেমন, ঢাকা বিক্রমপুরের বানিয়ারা গ্রাম থেকে মুর্শীদাবাদ আসাটা তাঁর পুরো পরিবারের কাছে দেশ বদল ছিল। দেশের সীমানা বলতে যে কাঁটাতারের বেড়া, সে বোধ তাঁর ছিল না। যেখানে মনের মধ্যেই তো অনেকগুলো কাঁটাতার বিছানো! তাই এই ছিল তাঁর দেশ বদল। 

সুর্বণরেখা একা মানুষ। সারাদিন বিশেষ কাজ নেই। ইচ্ছা নাহলে একেকদিন রান্নাও করেন না। মুড়ি টুড়ি খেয়েও কতদিন কেটে যায় তাঁর। আজ তো পরবের দিন। উৎসব আনন্দে কেমন যেন একটা নির্লিপ্তিভাব আসে তাঁর। পুরনো কথা মনে পড়ে যায় প্রায়ই। সেই প্রথম এই গ্রামে আসার সময় থেকেই অনেককিছু কখনও আবছা কখনও স্পষ্ট মনে হতে থাকে তাঁর। অসম এই বিয়েটাও কিছুটা তেঁতো স্বাদ এনে দিয়েছিল জীবনে। তাঁর থেকে বয়েসে বেশ কিছুটা বড় হলেও স্বামী অবশ্য কোনদিনই দুঃখ দেন নি। তিনি তো বাড়ীতেই থাকতেন না। শহরে ডাক্তারি পড়তেন। মাঝে মাঝে বাড়ী আসতেন। বাড়ীর বাকি সদস্যরা খুব ভাল মনে মেনে নিতে পারে নি এই বিয়েকে। তাদের বাড়ীর সবথেকে উপযুক্ত ছোটছেলে বাড়ীর অমতে বিয়ে করেছে ওদেশ থেকে আসা জমিহীন পরিবারের এক মেয়েকে। যদিও জাত, কুল- এসবের দিক থেকে কোন বাধাই ছিল না। তবু জমিহীন- এই বাধাই তো সবচেয়ে বড় এই বিয়ে নাকজের। কোন মতে ঢোক গিলে নেওয়ার মতই তাঁকে বাড়ীর সদস্যরা গ্রহণ করেছিল। কোনোদিন রিফিউজি ক্যাম্পে না থেকেও শ্বশুর-বাড়িতে সামান্য ভুল-ত্রুটি হলেই রিফিউজি গালাগাল শুনতে হত তাঁকে। স্বামী ছাড়া এবাড়ীর আর কেউ তাঁকে আপন করে নি। এযেন তিনি বুঝতে পারতেন বড় বেশি করে। 

একমাত্র ব্যতিক্রম বড়ভাসুরের ছেলে অনন্ত। অনন্তও তখন তেরো-চোদ্দ, বা আরো কিছু বেশী। সমবয়সী এই ভাইপোটা যেন নতুন কাকী বলতে অস্থির। স্বামী বাড়ীতে না থাকার দরুণ, যখনই কোন প্রয়োজন হয়েছে, অনন্তের কাছেই আবদার করেছেন। আর সে তো যেন নতুন কাকীর আবদার পূরণ করতে পারলে ধন্য হয়ে যায়। পরবে পড়বে বলে স্বামী না হয় একটা নতুন শাড়ী এনে দিয়েছে, কিন্তু শাড়ীর সাথে রঙ মিলিয়ে চুড়ি, ফিতে এগুলো কে আনবে? অতএব অনন্ত। বাড়ীর লোক অবশ্য খুব একটা ভাল চোখে দেখে নি এ সখ্যতা। একমাত্র স্বামীর প্রশ্রয় ছিল। 

স্বামী নেই আজ কুড়ি বছর হতে চলল। ছেলেরা থেকেও মায়ের কাছে আসে না। যে যার নিজেদের বৃত্তেই ব্যস্ত। শ্বশুরমশাইয়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তি ভাগবাটোয়ারা হয়ে তাঁর প্রাপ্তি ওই বিঘে দশেক জমিই যে এখন একান্ত নিজস্ব। আর জমি তো শুধুই মাটি নয়, এ তার অহঙ্কার। বৈশাখ-জৈষ্ঠে বা অগ্রাহয়ণে যখন ধান পাকে তখন তাঁর মন ভরে যায় সোনালি ধানের ক্ষেত দেখে। ছেলেদের কাছে না পাওয়ার যন্ত্রণা, স্বার্থসন্ধানী আত্মীয়দের ব্যবহার –এইসব ক্ষত ভুলে গিয়ে জেগে ওঠে আত্মতৃপ্তি। কিছুটা আত্মদম্ভও মিশে থাকে সেই তৃপ্তিতে। ওই জমিটুকু শুধু তাঁর সম্বল নয়, তাঁর সম্মান, আত্ম-অহংকার। অনন্তকে নিজের থেকেও বেশী বিশ্বাস করলেও কখনও তিনি রাজী হন নি কোন বন্দবস্তে যেতে। 

বছরে তিনবার ফল দেয় তাঁর জমি। দু’বার ধান আর শীতে কখনও আলু-পেঁয়াজ, কখনও বা সর্ষে উগায় ঝন্টু। তা সেই সোনার জমির দিকে কতজনার নজর! এই তো গেল বছরের আগের বার পার্টির ছেলেরা এসে বললে, 

-মাসিমা গাঁয়ে স্পঞ্জের কারখানা হবে। জমি দিয়ে দাও। টাকা পাবে। অনেকগুলান টাকা। কারখানা হলে গাঁয়ের ছেলেরা কাজ পাবে। 

-পার্টির ছেলেদের মধ্যে অনন্তের ছোটছেলেটাও ছিল না? ছি! ছি! শেষ পর্যন্ত নিজের খুড়-ঠাকুমার কাছে এইভাবে গুণ্ডা-মাস্তান নিয়ে আসে? 

পার্টির ছেলেদের সুবর্ণরেখা গুণ্ডা-মাস্তানই ভাবেন। বিশেষ করে নমিতার কাছে যখন শোনেন, জমি না দিলে নাকি গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে পারে। মাঝরাতে এসে উৎপাতও করতে পারে। একা থাকে বলে তাঁকে আক্রমণ করাও সহজ। মাঝে মাঝে মনে হয়, এটা অনন্তের যোগসাজশ নয় তো? জমি দিতে অবশ্য বনকাঠির সব চাষীরা ও জমির মালিকেরা আপত্তি করেছিল। রাতের বেলা অন্য পার্টির ছেলেরা এসে পাহাড়া দিত। বলত, 

-ভয়ের কিচ্ছু নেই। আমরা আছি। দেখি গ্রামের জমি কে জোর করে নেয়? 

সুবর্ণরেখা এসব পার্টি-টার্টির থেকে অনেক দূরে। তবু সেই সময়ে অন্য পার্টির ছেলেদের দেখে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। এখন পরিস্থিতি শান্ত। শুনেছেন কারখানা নাকি হয়েছে ২নং ব্লকের পাঞ্জা গ্রামে। 

পৌষসংক্রান্তির ভোরবেলায় অনন্তের বউ আর তার দুই ছেলের বউ মিলে গ্রামের আরো কয়েকজন মেয়ে-বউ-এর সাথে মাটির খোলায় গাঁদা ফুলের মালা আর নতুন ধানের চাল দিয়ে তৈরি পিঠে সাজিয়ে টুসুর ভাসান দেয়। মজা নদীর চরে টুসু ভাসান দেখতে লোকের ভীড় জমে যায়। আজকাল অনন্তের শরীরটাও বিশেষ ভাল যাচ্ছে না। নতুন ধানই বা পেল কোথায় এবার? সেই তো চেয়ে-চিন্তে লোকের কাছ থেকে আনা। 

-কী যে আকাল লেগেছে কপালে? বিঘে পাঁচেক জমির ধানই পাকে নি এবার। অথচ, কপাল দেখো নতুনকাকীর! তার ঘরে মানুষ নেই, অথচ সোনার ধানে ভরা তার জমি। 

হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল অনন্ত। তার ঘরভর্তি আজ আত্মীয়, কুটুম্ব, ছেলে ছেলের বউ, নাতি-নাতনি। নিজের জমির ধান এবার টুসু পরবে কাজেই লাগল না। আরো কিছুদিন পরে ওর জমিতে ধান কাটা হবে। 

গন্ধেশ্বরীর চরে ছ’ফুট ইঁটের গাঁথনি তুলেছিল গতবারের পঞ্চায়েত প্রধানের জামাই পশুপতি মণ্ডল। সেই নিয়ে কতই না কোর্ট-কাছাড়ি! এবারের ভোটে পশুপতির শ্বশুর হেরে গেছে। নতুন প্রধান। গাঁথনি এখনও অটুট। হেলা বটতলায় একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ক্ষণিক বসে অনন্ত। ইঁটের গাঁথনিতে এবার সিমেন্ট পড়বে। সেসব আয়োজনে চোখ চলে যায় ওর। আর অনেকগুলো ভাবনা আসে মনে। তার নাতি-নাতনিরা বুঝি আর গন্ধেশ্বরীকে দেখতে পাবে না। গল্পকথায় শুনবে এখন যেখানে মস্ত দালান রয়েছে সেখানে এক সময়ে একটা ছোট নদী বয়ে যেত। বর্ষায় তার রূপ দেখলে অবশ্য ছোট বলার জো নেই। ঝণ্টু মাঝি আসছে এদিকেই। গায়ে আবার নতুন জামা চাপিয়েছে। ঝণ্টুকে দেখেই রাগে মাথা চিড়বিড় করে উঠল অনন্তের। “ব্যাটা, নিশ্চয়ই কিছু গড়বড় করেছে। সার ভাল দেয় নি! না’হলে, নতুনকাকীর সব ধান পাকল, আর আমার বেলায় শুধুই অপেক্ষা?” 

ঝণ্টু এসে দাঁড়ায় পাশে, “পেন্নাম নিবেন কত্তা! এইবারটা বড় আকালের!” 

“কেন আকালের কি হল? তোর তো অন্যসব জমিতেই ধান উঠেছে। এক আমার ছাড়া!” 

কথা বলতে না ইচ্ছে করলেও সে কথা বলে। “না কত্তা! ফলন এবার কোথাও ভাল হয় নি! পাঞ্জায় কারখানা হওয়ার পর থেকেই ফলন ভাল হচ্ছে না। হবে না, জমি হল গিয়ে মা লক্ষী। সেই লক্ষীকে বেঁচে দিয়ে এখন সারাক্ষণ কালো ধোঁয়ার চাষ চলছে!” 

অনন্তের শরীরটাও ভাল নেই, মনমেজাজও ভাল নেই। কথা বাড়াতে আর ভাল লাগছে না, অথচ হুল ফোটাতেও ইচ্ছে করছে। “তা, তোর আর অসুবিধা কোথায়? তোর কত্তামা-র জমিতে মা-লক্ষ্মীর কৃপার অভাব হয় নি। গাঁয়ের বেশীরভাগের জমিতে যখন ফসল ফলে নি, তার জমি তো...”। 

কথাটা শেষ না করেই একটু ঢোক গিলল সে। একটু থেমে আবার বলে, “তুকতাক কিছু করে বোধহয় মাগী!” 

এতক্ষণ খেয়াল করে নি, ওদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল পশুপতি। সদ্য গন্ধেশ্বরীতে ডুব দিয়ে ওঠে সূর্‍্যপ্রণাম করছিল। ওদের কথা বোধহয় কানে গেছে। গলাখাঁকরি দিয়ে সে বলে, “কার কথা বলছ খুড়ো? কে তুকতাক জানে? আমাকেও একটু বল তার নাম, তার দোরে গিয়ে হত্যে দিই। মামলা মোকদ্দমায় একেবারে জেরবার হয়ে যাচ্ছি।” 

অনন্ত কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই ঝন্টু বলে ওঠে, “তা দাদা, আপনি না’হয় জিতবেন মামলায়। গন্ধেশ্বরী চর তখন হবে পশুপতি ভিলা। ছ’ফুট গাঁথনি তখন দোতলা বাড়ী হয়ে যাবে। আর আপনি না হয় মোটর হাঁকিয়ে দ্বারকেশ্বরেই যাবেন মকর স্নান সারতে, আর আমরা? গাঁয়ের গরীব মানুষেরা? জন্ম-ইস্তক এই গন্ধেশ্বরীতেই স্নান করে তাপ জুড়াই। আজ না হয় নদীর বুক শুকিয়ে এই এতটুকু হয়ে গেছে, তা বলে পুরো নদীটাই আমাদের জীবন থেকে গায়েব হয়ে যাবে? মামলায় জিতে শুকনো নদীর চরে মাটি ফেলে আপনি বাড়ী তুলবেন? এ কেমনধারা কথা হল?” 

পশুপতি শেয়ালের মত খুকখুক করে হেসে ওঠে। “এই জন্যেই বলে, ছোটলোকদের বেশী লাই দিতে নেই! তোদের মত মূর্খ চাষাদের লাই দিয়ে দিয়েই আজ পার্টির এই অবস্থা।” 

আড়চোখে বোঝার চেষ্টা করে অনন্তের প্রতিক্রিয়া। যেন অনন্তের সায় পেলেই পালটা জবাব দেবে। অনন্তের মুখ-চোখ এত নির্লিপ্ত যে পশুপতির মত ঘাঁঘু লোকও টের পায় না, ওর মনের ভেতর কী চলছে? হাওয়া না বুঝেই তীরটা নিক্ষেপ করে সে। “এই যে এত বাঁধা, তা’ও তো পাঞ্জায় কারখানা হল। আরে এখন হল গিয়ে উন্নয়নের সময়। এইসব গাঁইয়া কথাবার্তা বলেই তো তোদের মত মাথামোটাদের মাথাটা চিবচ্ছে। এখন গাঁ বলে আর কিছু থাকবে না। সবই শহর হয়ে যাবে রে! এই যে শুশনিয়া পাহাড় দেখতে ফি বচ্ছর কত লোক আসে। গাড়ী করে আসে আবার গাড়ী করেই চলে যায়। কেউ একরাত থাকতে চাইলে তার যো নেই। এখানে কোন ভাল হোটেল আছে থাকার? গাঁয়ের লোকের বাড়ীতে তো আর শহর থেকে ঘুরতে আসা বাবুরা থাকবে না! আর ওদিকে বিষ্ণুপুর দেখ! কত হোটেল, রিসর্ট! আমাদের এখানে কিচ্ছু নেই! শুধু ধু ধু করছে চারিদিক।” 

“হোটেলই করুন আর কারখানাই করুন এই চাষের জমিতে কেন? তাও আবার তিন-ফসলি জমি?” 

“আরে রাখ তো তোর তিনফসলি? ওরকম অনেক তিনফসলি দেখা আছে। আর তোর আবার জমি কোথায়? লোকের জমিতে চাষ করিস আর বড়বড় কথা বলিস? ছোটলোকদের লায় দিলে কি হয় এবার দেখুক নেতারা?” 

“খবরদার বলছি, গাল দেবেন না। আপনার মানও কিন্তু তাহলে রাখতে পারব না।” 

“কি এত বড় আস্পদ্দা তোর?” 

ঝন্টু চাষী হলেও বেশ বড় মাপের চাষী। তার নিজের জমি নেই, তবে বিঘা কুড়ি মত গাঁয়ের জমি মালিকের কাছ থেকে লিজ নিয়েছে অর্দ্ধেক ফসলের বিনিময়। চাষের সমস্ত খরচ, ঝক্কি সেই সামলায়। সেও দমবার পাত্র নয়। পশুপতির তো লক্ষই এখন জমি। শহর থেকে আমীন এসে জমি মেপে দিয়েছিল গত বছর। সরকার নাকি জমি কিনে বেঁচবে কারখানার মালিকদের। কারখানা হবে, গ্রামের ছেলেরা চাকরী পাবে। আর কাউকে চাকরীর জন্য গ্রাম থেকে শহরে যেতে হবে না। তখন থেকেই গ্রামের লোক দুভাগে ভাগ। একদল, যারা পঞ্চায়েতে ছিল, গ্রামের মাথা তারা পশুপতিদের সাথে। আরেক দল যারা কিছুতেই গ্রামের মানুষের জমিতে কারখানা হতে দেবে না। জমি নিয়ে গ্রামের ঘরে ঘরে ভাঙন। 

সামান্য কথাকাটাকাটি এক বড় বিবাদের রূপ নেয়। লোকজনের ভীড় জমে যায়। তার মাঝেই সুবল নস্কর হাঁপাতে হাঁপাতে এসে প্রায় চিৎকার করে বলে ওঠে, “ছাই, সব ছাই হয়ে গেল।” 

নস্কর কথা শেষ করতে পারে না। প্রচণ্ড হাঁপায়। তার পেছন পেছন পরাণ, হারু, বাবন, বাপ্পা – গ্রামের কয়েকটা ছেলে ছোকরাও এসে হাজির। ওদের মুখেই শুনল উপস্থিত সকলেই, কোথা থেকে রাক্ষুসে ছাই এসে মাঠের সব ধান নষ্ট করে দিয়েছে। যাদের ধান কাটা হয়ে গেছে তারা আপাতত নিশ্চিন্ত। 

অনন্তের মাথায় হাত! সকলের সাথে দৌড়ে ওর জমিতে যেতে পারে নি। শরীরটা এতটাই খারাপ লাগছে যে বটতলা থেকে উঠতে পর্যন্ত পারছে না। তাছাড়া, ঝন্টু গেছে দৌড়ে। চাষ তো ওই করে। এইবারের ফসল যে অনন্তের খুবই প্রয়োজন। বড় ছেলের ব্যবসায় মন্দা চলছে। মেজটা সদ্য বিয়ে করেছে। তারও শহরে নতুন দোকান। ছোটটা তো বি এ পাশ করে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছে আর পার্টি করে বেড়াচ্ছে। চাকরি বা ব্যবসার কোন লক্ষণই তার নেই। আবার নতুনকাকীর সাথে ওর নিজের তুলনা ওর মনে চলে আসে। তার দুই ছেলেই বিদেশে থাকে। একজন ডাক্তার আর একজন কলেজে পড়ায়। ভাগ্যলক্ষ্মী যেন নতুনকাকীর ঝোলায় সব ভালটুকু উজাড় করে দিয়েছে। অনন্তর বাবা আর কাকার মধ্যে ঠাকুরদার বিঘে কুড়ি জমি ভাগ হয়। বাবার ভাগের দশ বিঘা জমি আবার তাদের দুই ভাই-এর মধ্যে পাঁচ বিঘা করে ভাগ হয়ে যায়। নতুনকাকীর ছেলেরা কেউ জমির উপর নির্ভরশীল নয়, তাই সে একাই দশ বিঘা জমির মালিকানা পেয়েছে। এতে কি অনন্তের একটু ঈর্ষা জন্মেছে? না ঠিক তা নয়। কবে থেকে যে বৈরী ভাব এল নতুনকাকীর প্রতি তা ও নিজেও মনে করতে পারে না। এই তো সেদিন মনে হয়, রান্নাঘরের দাওয়ায় ও বসে আছে, আর নতুনকাকী ছেলে কোলে একগলা ঘোমটা দিয়ে রান্নাঘরের মেঝেতে বসে। মাঝে মাঝে উনুনে চাঁপানো কড়াইতে হাতা নাড়ছে। সে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে। “ আচ্ছা, নতুনকাকী তোমার নাম সুবর্ণরেখা কে রাখল? ও তো নদীর নাম? ও নদী তো তোমাদের দেশে নেই!” 

ঘোমটার ভেতর থেকেই নতুন কাকীর হাসি মুখ দেখতে পেত। “আমার নামখান শুনছি রাখছিল আমার এক মামা। তার বাড়ী আদ্রায়। তাদের দ্যাশেই হবে বা সে নদী বা অন্য কোন দ্যাশে। তা আমি আর কি জানি?” 

নতুনকাকী প্রাণপণ চেষ্টা করত এ বাড়ীর ভাষায় কথা বলার। তাও কথার মধ্যে একটু আধটু টান চলেই আসত। কি মিষ্টি যে লাগত অনন্তের ওপাড়ের ভাষা শুনতে! এই সব কত তুচ্ছ গল্পের স্মৃতি মনে পড়ে। অথচ, কবে যে তার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হল সে স্মৃতি কিছুতেই মনে পড়ে না। অনন্তের যখন বিয়ের কথা প্রায় পাকা, সেইসময়ে একদিকে যেমন বিয়ের জন্য একটু আনন্দ হচ্ছে, শিহরণ জাগছে, আবার আরেকদিকে নতুনকাকীর কথা ভাবলে একটু মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। নতুনকাকী যদিও শুধুমাত্র স্নেহসুলভ প্রশ্রয়ই দিয়ে এসেছে বরাবর, তবু কেন যেন তার মনে হয়েছিল তার বিয়ে হলে নতুনকাকীর খারাপ লাগবে। অথচ বিয়ের পর তার বউ কুসুমবালার সাথে নতুন কাকীর খুব বন্ধুত্ব হয়েছে দেখেও আবার একটু খারাপ লাগছিল। বিচিত্র মানুষের মনের গতি। অনন্তের বিয়েতে নতুন কাকী দুঃখ পাক- এই কি ও চেয়েছিল? 

বুকের ভেতরটা কেমন চাপ চাপ লাগছে অনন্তের। মাথার ভেতরটাও খুব হালকা হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে এক দৃশ্য- এক রাশ ছাই-এর স্তূপ জড়ো হয়েছে সারা মাঠ জুড়ে। আর তার পাশেই আরেক মাঠে পাকা সোনালি ধানের সারি। সে ধানের সারি যেন আনন্দে আর আত্মগর্বে ঝিরঝির করে মাথা দুলিয়েই চলেছে বাতাসের দোলায়। 

জ্ঞান আসার পর আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকায় অনন্ত। তিন ছেলেই হাসপাতালে এসেছে ওকে দেখতে। চোখে মুখে বাবার জন্য দুশ্চিন্তার ছাপ! যাক, দেখে আনন্দই হয়। ছেলেরা কাছে থাকার এই সুবিধে। অসুখবিসুখে ছেলেদের কাছে পাওয়া কি কম বড় কথা? সে সুযোগ তো হবে না সে মেয়েমানুষের! যতই দেমাক দেখাক, ছেলেরা প্রতিষ্ঠিত! ছেলেরা তো মায়ের খোঁজও নেয় না। কিছু হলে সেই তো অনন্ত আর তার ছেলেদেরই হ্যাপা পোহাতে হবে। ওর আশ্চর্য লাগে ভেবে, যাকে এত ঘৃণা করে তার কথাই ও ভেবে চলেছে জ্ঞান হওয়ার পর থেকে। অথচ, ছেলেরা দেখতে এসেছে, ঘরে স্ত্রী, পুত্রবধূ, নাতি-নাতনি সবাই বোধহয় উদ্বেগে অস্থির হয়ে উঠেছে ওর জন্য। টুসু পরবের আনন্দও এবার সবার মাটি হল। পাঞ্জা গ্রামের স্পঞ্জ-আয়রন কারখানা থেকে ছাই এসে সব ধান নষ্ট করে দিয়েছে শুনেই তো শরীরটা খারাপ লাগতে শুরু করেছিল। বুকে চাপ চাপ অসহ্য যন্ত্রণা! তারপর আর মনে নেই। 

ছোটছেলের ডাকে আরেকবার চোখ মেলে তাকায় অনন্ত। “বাবা, এখন কেমন বোধ করছেন?” 

ঘাড় নেড়ে জবাব দেয়। “ডাক্তার বলেছেন, আর ভয়ের কিছু নেই। তবে সাবধানে রাখতে হবে। আর দুদিন থাকুন, তারপর বাড়ী নিয়ে যাব।” 

অনন্তের যেন এখুনি বাড়ী যেতে ইচ্ছে করছে। তাও কিছু বলে না ছেলেদের। ছেলেরা যা ভাল বোঝে তাই করুক। এই একটা জায়গায় ও জিতে গেছে নতুন কাকীর কাছে। ওর সাথে ওর ছেলেরা আছে। নাই বা হল অত প্রতিষ্ঠিত। তাও কাছে তো আছে। এক ডাক দিলে তিনজনেই ছুটে আসবে। আবার ভাবছে সেই তার কথাই। না! আর ও তার কথা ভাববে না। নিজের কথা, ছেলেদের কথা, পরিবারের কথাই ভাববে শুধু। পরিবারের কথাই অবশ্য শুধু ভাবত। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই সংসারের জোয়াল টানতে টানতে শুধু পরিবারের কথাই ভেবে এসেছে। 

কাকা মারা যেতেই নতুন কাকীর কাছে প্রস্তাব করেছিল, “তুমি আমার কাছে চলে এসো। তোমার জমিও আমি দেখব। তোমার ছেলে দুটোও আমার প্রভাস, সুবলের সাথে মানুষ হবে। কাকা নেই তো কি হয়েছে আমি তো আছি তোমাদের মাথার উপর!” 

সত্যিই অনন্ত ভেবেছিল, নতুন কাকীর এই বিপদে ও বুক দিয়ে তার পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু তা সইবে কেন ঐ জেদী মেয়ে মানুষের? সে তো অনন্তকে একপ্রকার না-ই করে দিল। “তুমি পাশে আছো বলেই তো ভরসা! এই ছোট দুটো ছেলেকে মানুষ করতে পারব। তবে, ভগবানের দয়ায় তোমার কাকা যে ব্যবস্থা করে গেছেন তাতেই আমার চলে যাবে। জমি নিয়ে তুমি ভেব না। তুমি তো পাশে রইলেই!” 

কান দুটো যেন লাল হয়ে উঠেছিল অনন্তের। এ প্রত্যাখ্যান তো একরকমের কানমলা। যেন আমার ভাবনা নিয়ে তোমাকে পাকামো করতে কে বলেছে? না কি নতুন কাকী ভেবেছিল অনন্ত তার জমি দখল করে নেবে? এত নীচ ভাবনা সে ভাবতে পেরেছিল ভেবেই বিতৃষ্ণায় তার মুখ বেঁকে ওঠে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে এইসব ভাবনাই মনে আসছিল। এর মধ্যে সুবল, প্রভাস আর তমাল- ওর তিন ছেলে এসেছে বাবাকে দেখতে। “আর দুদিন থাক। পরশু নিয়ে যাব বাড়ী।” 

কিছুক্ষণ থেমে সুবল বলে, “বাবা পশুপতিদা এসেছিল। একবার যখন কাছাকাছি স্পঞ্জ কারখানা হয়েছে, তখন এ ছাই আসতেই থাকবে। ও জমিতে ফসল ফলান যাবে না। তার চেয়ে এই বেলা জমি দিয়ে দিলে কিছু টাকা আসবে হাতে। আমাদের ব্যবসায়ে যে মূলধন দরকার।” 

তমাল বলে ওঠে, “পশুপতিদা বলেছে রিসর্ট হলে আমি সেখানে ম্যানেজারের চাকরি পাব।” 

অনন্ত বলতে চাইল, “ম্যানেজারের চাকরি দেওয়ার কি কোন লেখাপড়া হয়েছে?” ছেলেরা হ্যাঁ শোনার জন্য অধীর আগ্রহে মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ও আস্তে আস্তে বলে আমার বিঘে পাঁচ জমি হলেই কি তাদের হোটেল তৈরী হবে?” 

রিসর্ট ঠিক বোঝে না। হোটেলই বলে। “না তা কেন? শুধু হোটেল নয়, হাসপাতাল হবে, পার্ক হবে আরও কত কি? বনকাঠি আর গ্রাম থাকবে না।” 

তমালের চোখে মুখে উজ্জ্বল আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রাম থেকে শহর গড়ে তোলার আনন্দ। “আশেপাশের জমিও নেওয়া হবে। ও নিয়ে তুমি চিন্তা করো না। তুমি শুধু আমাদেরটুকু দিয়ে দাও। তার বদলে ভাল দাম পাবে।” 

ছেলেরা চলে গেলে, অনন্তের বুকটা বড় ফাঁকা লাগে। জমি দেওয়ার কথা ভাবলেই কেমন যেন নিজেকে অনাথ মনে হতে লাগে। অথচ নিজে তো ও চাষবাসও করে না। ফলনও এবার সব নষ্ট হল। ফলনের কথা ভাবতেই মনে হল, জমি যদি ও দিয়ে দেয় তাহলে জমির দালালরা কি নতুনকাকীর জমি ছেড়ে দেবে? যে করেই হোক সব জমি ওরা নেবেই। নতুনকাকীর দর্প চূর্ণ হবে ভেবে মনটা এবার একটু ভাল লাগছে। চোখ বন্ধ করে সেই মেয়েমানুষের দর্প চূর্ণ হওয়ার কথা ভাবতে থাকে। 

ঘুমিয়েই পড়েছিল বুঝি। মাথায় যেন কার হাতের ছোঁয়া। খুব চেনা সে স্পর্শ। চোখ খুলে অনন্ত আবার চোখ বন্ধ করে দেয়। ভয় হয়, এ স্পর্শ যদি ও হারিয়ে ফেলে! এ ছোঁয়ায় আর কিশোর বয়েসের মত শিহরণ নেই, তবে অদ্ভুত এক প্রশান্তি আছে। যেন এই ছোঁয়ার জন্যই এতদিন ধরে ও অপেক্ষা করছিল। চোখ বেয়ে জলের ধারা নামতে থাকে। 

অনন্ত এখন অনেক সুস্থ। ঝন্টু মাঝির সাথে ও নিজে এখন চাষবাসের তদারকি করে। হাসপাতালের বেডে সেদিন নতুনকাকীর হাতের ছোঁয়াটুকু পেয়েই ওর সব অভিমান দূর হয়ে গিয়েছে। কোন লোভ, হুমকি আর টলাতে পারে নি। হোক না বিঘে পাঁচ, তবু তো জমি! নতুন কাকী বলে, “জমি হইল গিয়া সম্মান। সম্মান হারাইলে বাইচ্চা থাকুম কি নিয়া? একবার জমিহারা হয়েছি, আর নয়।” 

অনন্ত এখন শুধু নিজের জমিই নয়, আরো বিঘে দশেক জমিরও দেখাশোনা করে।

৩টি মন্তব্য: