রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের গল্প : মধুরিমা

মধুরিমা প্রায়ই আসে সুভাষ-অনুপমার কাছে । একবার চোখের দেখা দেখে, একটু গল্পগাছা করে চলে যায় । অনুপমা মেয়েটার মুখের মত কিছু বানিয়ে রাখে মেয়েটার জন্যে ।
সুভাষ কখনো বলে ঘুমের ওষুধটা এনে দিতে কিম্বা বলে গ্যাস বুক করে দিতে । অনুপমা বলে তাদের ডবল বিছানার চাদর বদলে দিতে অথবা ঠাকুরঘরের জন্য দুমিটার হালকা রঙয়ের পর্দার কাপড় এনে দিতে । টাকা দিতে গেলে মধুরিমা বলে পরের দিন ল্যাব থেকে ফেরার পথে আগে দিয়ে যাবে তারপর টাকা নেবে । বুড়োবুড়ির জন্য কখনো মানিকতলার মোড় থেকে ডিমের ডেভিল অথবা দ্বারিকের প্রাণহরা সন্দেশ নিয়ে আসে । ফেলোশিপের টাকায় সুভাষের জন্যে পুজোয় আনে আর্দির ফতুয়া অথবা অনুপমার জন্যে বাটিকের হাউসকোট... এতটাই অন্তরঙ্গতা ওদের সাথে মধুরিমার । 

অনুপমা জোর করে কোনো কোনো দিন রাতের খাবার খাইয়েই ছাড়ে মেয়েটাকে । নিজে হাতে বানিয়ে রাখে মাংসের কিমা ঘুগনি । বড্ড ভালোবাসে মেয়েটা । মধুরিমার তাড়াতাড়ি ল্যাবের ছুটি মানেই সন্ধ্যেবেলায় ওঁদের সাথে একছুট্টে দেখা করা । রাজাবাজার থেকে ট্রামে চেপে শ্যামবাজার । সেখানেই বাড়ি করেছে সুভাষ। 

বাড়ির নাম "অনুপমা" । মধুরিমা ঠাট্টা করে সুভাষকে বলে "মেশোমশাই, আপনি মাসীমাকে যা ভালোবাসেন!" বলিরেখার আধিক্যে লাজেরাঙা অনুপমার মুখখানি লুকিয়ে দেখে নেয় সুভাষ চট করে । আনন্দে আপ্লুত হয়ে মধুরিমার হাতে একশোটা টাকা গুঁজে দিয়ে বলে "কাল তোর মনের মত কিছু খাবার নিয়ে আসিস, একসাথে চায়ের সাথে খাবো আমরা" ....এভাবেই আত্মীয়তায় জড়িয়ে আছে মধুরিমা ওদের নিঃসঙ্গ জীবনের সাথে । 

অনুপমা-সুভাষের একমাত্র ছেলে অরিত্র অন্যরাজ্যে চাকরী করে । বৌ-ছেলেমেয়ে নিয়ে কম্পিউটার প্রোফেশানালের সুখের সংসার । রূপে লক্ষ্মী বৌ, গুণে সরস্বতী না হলেও আজকালকার বাজারে বেশ দামী । ছেলেমেয়ে দুজনেই কনভেন্টে পড়ে । বছরে একবার আসে কোলকাতার বাড়িতে । শ্যামবাজার ভালো লাগেনা ওদের । অনুপমার নাতী-নাতনী গতবছর এসেই বলে গেছে ঠাম্মিকে "বড্ড ক্লস্ট্রোফোবিক এ শহর" 

অরিত্র শ্যামবাজারের মোড়ে একটা ব্যাঙ্কে গিয়ে কাজ সেরে ঘুরে বাড়ি এসেই বলেই দিয়েছিল " বাপ্‌‌রে! কি পলিউশান এখানে ! এখানে দিনের পর দিন থাকলে তো হাঁপানি হয়ে যাবে !" সেই কথা শুনে অনুপমা তো বলেই ফেলেছিল" অরু, মনে রাখিস, এই শ্যামবাজারে থেকেই তোর সবকিছু । হেদোয় সাঁতার শেখা থেকে, আঁকার ক্লাস আর রোজ সকালে ডনবসকোর বাসে চেপে সেই পার্কসার্কাস। তারপর ক্লাসটেন পাশের পর অনুপমাই তাকে নিয়ে জয়েন্ট এন্ট্রান্সের কোচিংয়ে যেত আর বসে থাকত ঘন্টার পর ঘন্টা । শ্যামবাজার ফিরতে রাত হয়ে যেত । মা কৌটো করে নিয়ে যেত ছেলের মুখ বদলে বদলে মুখরুচির খাবার.. কোনদিন শুকনোফলের কুচি ছড়ানো হালুয়া, কোন দিন এককৌটো চাউমিন । ছেলে পড়তে যাবার আগে খেয়ে নিয়ে টুক করে ঢুকে পড়ত কোচিং ঘরে। আর মা সেই কৌটো বয়ে হাতীবাগান-কলেজস্ট্রীটের বাজার দোকানে অথবা রাণীমাসির বাড়িতে চা খেয়ে হপ্তায় ঐ তিনটে সন্ধ্যে কাটাত । 

ওদের একটিমাত্র ছেলের বৌ রিয়া অবিশ্যি ব্লাউজের টেলার, হাতিবাগান টহল দিয়ে এসে বলে " ভীড় বটে! বাট স্টিল ইটস ওয়ারথ গোয়িং! ক্যালকাটা ইজ চিপ এন্ড বেস্ট ফর শপিং !" 

পাটনার প্রবাসী বাঙালী রিয়ারা । তাই কোলকাতায় এসে খুব সুখ হয় ওর । তবে বেশিদিন শ্যামবাজারে থাকলেই তার মন উশখুশ করে বেঙ্গালুরুর উইকএন্ডগুলোর জন্যে, ক্লাব, পার্টি, জয়রাইডে বন্ধুবান্ধবের আড্ডাগুলোর জন্যে । সুভাষ-অনুপমা আগে আগে গিয়ে থেকেছে সে শহরে, ছেলের ফ্ল্যাটে কিন্তু ওদের বয়স বেড়ে যাবার পর শ্যামবাজারের বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতে মন করেনা । দুজনে থাকে একলাটি অথবা কাছের আশ্রমে পাঠচক্রে যায় নিয়মিত। আর আছে ব‌ইপত্র কিম্বা নিকট আত্মীয়ের নিমন্ত্রণরক্ষা । কোলকাতায় চাকরীর সুযোগ এলেও একমাত্র ছেলে অরিত্র এখানে আর আসবেনা ..বুঝে গেছে ওরা। আর এখন তো ছেলেমেয়ের স্কুলে ক্রমশঃ ক্লাস বাড়ছে তাই রিয়া ওদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটাতে চায়না । 

কোলকাতায় ওরা আসে একগুচ্ছ কাজ নিয়ে । পুরোণো বন্ধুবান্ধবদের সাথে হৈ হৈ করে একাডেমীতে থিয়েটার দেখে আর্সেলানের বিরিয়ানি কিম্বা আইনক্সে সিনেমা দেখে মেনল্যান্ড চায়নার ব্যুফেতে কব্জি ডুবিয়ে খাওয়াদাওয়া । 

অনুপমা একদিন বলেছিল, বারমাস তো হোটেল-রেস্তোরাঁতে খাচ্ছিস তোরা, এ ক'টাদিন নাহয় আমার হাতেই খেয়ে যা 

রিয়া সপ্রতিভ প্রগলভতায় উগরে দিয়েছিল, এযুগে বন্ধুদের সাথে সোশ্যালাইট না করলে আপনাদের মত এই জেরিয়াট্রিক শহরে পচে মরতে হবে ! আমার ছেলেমেয়েরাও ত শিখবে এভাবে মানুষের সাথে মিশতে, 

অনুপমা আর কথা বাড়ায়নি । 

সুভাষ বলেছিল, ওদের ব্যাপারে কেন নাক গলাও তুমি অনু? চুপচাপ থাকো। এখন আমাদের শুধু দেখার সময়, বলার নয় 

ওরা বন্ধুবান্ধবদের সাথে গাড়ীর একরাশ ধূলো উড়িয়ে চলে গেছে চোখের সামনে দিয়ে । দিনের পর দিন অধরা থেকে গেছে সুভাষের দাঁত বাঁধাতে দেওয়া, অনুপমার ছানি কাটানো আরো কিছু সাংসারিক টুকিটাকি । সারাবছর বসে থাকে দুজনে এইদিনগুলোর জন্যে । "অরুকে বলব" এইভেবে । 

মৌরলামাছ ভাজা দিয়ে কাঁচা আমের অম্বল ভালোবাসে অরিত্র । আগে থেকে বলে রেখে বড় বড় মৌরলা এনেছিল সুভাষ । অনুপমা রিয়াকে বলেছিল পেটটা আলতো করে চাপ দিয়ে পিত্তি বের করে মাছ গুলো বেছে দিতে । রিয়া বলেছিল " কি হবে এসব মাছ খেয়ে? আজকালকার দিনে রান্নাঘরে এইসব ঝামেলা কেউ বাড়ায়? আমার হাতে আঁশটে গন্ধ হয়ে যাবে " 

অনুপমা ভেবেছিল পনেরো বছরের পুরোণো ছেলের বৌকে বলাই যায় এমন কাজ আর শেখাওতো দরকার তার । অরুর চোখে হাই পাওয়ার ছোটবেলা থেকে । ডাক্তার বলেছিল চুনোচানা মাছ খেতে । সেই থেকে অভ্যেস তাঁর । এখন চোখের জন্য নিজে বাছতে পারে না । আর এই সংসারটা তো রিয়ার । তারও তো শিখে নেওয়া উচিত এসব । 

ঋতু পরিবর্তনের সময় ভোরে উঠে খালিপেটে কাঁচা হলুদ, নিয়ম করে দু-তিনটে নিমপাতা আর অরুর বড় পরীক্ষাগুলোর সময় প্রথম পাতে গরম ভাতে ঘিয়ের সাথে ব্রাহ্মীশাক ভাজা.. এসব এখনো অনুপমার সংসারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ । ভেবেছিল রিয়া সব শিখেটিখে নিজের সংসারেও কাজে লাগাবে । নাতি-নাতনিগুলোর জন্যে চিন্তা হয় । এখন এত চাপ বাচ্চাদুটোর আর তাতে মানুষের রোগভোগের তো অন্ত নেই । চিন্তা নিজের একমাত্র ছেলেটার জন্যে । বৌ'টার সব ভালো শুধু যদি একটু কথা শুনত তার! 

অরুটা ফোন করলেই অনুপমা খবর নেয় তার প্রেসার বেড়েছে কিনা, লিপিড প্রোফাইলটা চেক করিয়েছে কিনা.. "নিয়মিত হাঁটিস অরু, আর প্রচুর ফল খাস কিন্তু" 

"আচ্ছা মা তুমি কি ভাবো বলত? রিয়া এতদিন সংসার করছে, দুটো ছেলেমেয়ে মানুষ করছে , ও কি আমার দেখভাল করেনা?" 

অনুপমা ফোন নামিয়ে রেখে ভাবে " সত্যি তো দুজনেই অনেক পরিণত এখন, আর কোনোদিন বলবনা এসব কথা ওকে" কিন্তু মায়ের মন পরক্ষণেই ভুলে যায় সব । 

সুভাষ শান্ত মানুষ । অবসর গ্রহণের পর যেন আরো চুপচাপ । শুধু নাতি নাতনি এলে একটু প্রাণের স্পন্দন পায় । ছেলে-বৌমা যা খেতে ভালোবাসে তড়িঘড়ি দুনিয়া ঘুরে নিয়ে এসে অনুপমাকে বলে বানানোর জন্য। ভোর থেকে লাইন দিয়ে কচি খাসির রান, মানিকতলার বাজার থেকে গলদা চিংড়ি আরো কত কি! ওরা টিকিট কেটে কোলকাতায় আসার কথা জানালেই বুড়োবুড়ির সংসারে সাজো সাজো রব পড়ে যায় । এসির মিস্ত্রিকে খবর দিয়ে সার্ভিস করিয়ে নেয় এসি । পাড়ার একটা ছেলেকে ডেকে পাখা-আলোগুলোকে ঝাড়িয়ে পুঁছিয়ে নেয় । অনুপমা রান্নার মেয়েটাকে দিয়ে তাকগুলো ঝকঝকে করে নেয় । নতুন চায়ের কাপ-ডিশ বের করে রাখে । ওরা আসার দিন ডাইনিং টেবিলে নতুন টেবিল ক্লথ, জলের জাগ এখনো বদলে বদলে রাখে । 

ওদের আসার কথা শুনলেই মনটা যেন অজানা এক আনন্দে চিকচিকিয়ে ওঠে । ঠিক অপ্রত্যাশিত বৃষ্টির ফোঁটায় শীতকালের গাছের পাতাগুলো যেমন প্রাণ ফিরে পায় । তখন আর ব‌ইয়ের উপন্যাসগুলো বোরিং লাগে পড়তে । টিভির খবরেও মন ওঠেনা । পাঠচক্রের বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলে" কি ছেলে আসছে বলে মাঞ্জা দিয়েছ মনে হচ্ছে!" 

মোবাইলের পয়সা পুড়তে থাকে সকালসাঁঝে । অনুপমার দিদি, বৌদি সকলকে ফোন হয় । আগ বাড়িয়ে সুভাষও শালী-শালাজের সাথে ঠাট্টা ইয়ারকি করতে শুরু করে দেন । শুধু ওরা আসবে বলেই হয়ত কিছুটা ভালোলাগা আর ওদের জন্য দিন গোনা । অনুপমার পুরোণো হবিগুলোয় যেন একটু করে রং তুলির ছোঁয়া লাগে । ড্র‌ইংরুমের সংলগ্ন বারান্দা থেকে ড্রেসিনা-ক্রোটনগুলো একটু বেশী সবুজ হয়ে ওঠে ।পেতলের টব উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বহুদিন পরের মাজাঘষায় । একেই বুঝি বলে সন্তানস্নেহ ! এই বয়সে জীবনের আনাচকানাচ ভরিয়ে তুলতে পারে একমাত্র এরাই । 

কিন্তু ওরা একবার এসে পড়লেই আবার সব যেন ওলটপালট । অরুর বৌটিকে পছন্দ করে এনেছিল ওরা । কিন্তু কাছে থাকেনা বলে যেন একটু আড়ষ্ট সে । সুভাষ-অনুপমার কোনো কার্পণ্য নেই স্নেহের তবুও যেন একটু তাল কেটে যায় কোথাও। সম্পর্কে আত্তিসো ভাব না থাকলে যা হয় আর কি ! যাদের জন্যে সব তিলতিল করে রেখে দিয়েছে সুভাষ তাকে কেউ পাত্তাই দেয়না! নিভৃতে চোখের কোণাটা মুছে নেয় অনুপমা আঁচলের খুঁট দিয়ে । একরত্তি ফুটফুটে ছেলেমেয়েদুটোও যেন কেমন নিষ্প্রাণ ! 

সুভাষ ভাবত তার মায়ের কথাগুলো । নাতিনাতনী অন্ত প্রাণ ছিল তার মা । বুকের ওপর পিঠের ওপর উঠে খেলত অরুটা। 

অনুপমার ম্যালেরিয়া হয়েছিল সেবার । ঘুমপাড়ানোর সময় ঠাম্মার বুকে মুখ দিয়ে ঘুমিয়েছিল অরু । ভেবেছিল মায়ের বুকে দুধ টানছে । সুভাষের দিদির মেয়েটাও তেমনি ন্যাওটা ছিল তার দিদার । গরমের ছুটিতে পিঠোপিঠি অরু আর তার পিসির মেয়ে পারুতে ঠাম্মাকে নাটাঝামটা খাইয়ে দিত । আর অরুর এই ফুটফুটে ছেলেমেয়ে দুটো কেমন যেন কৃত্রিম । আন্তরিকতার একটু অভাব ওদের হাবেভাবে। তবুও ওরা তো কত আদরের্! নিজের রক্ত তাদের শরীরে । একমাত্র ছেলে-বৌয়ের সন্তান ওরা । সুভাষের পরপারের কাজ করবে ওরা । ওদের জল পেলে তৃপ্ত হবে সুভাষের মরণোত্তর আত্মা । 

কোলকাতায় এসে, অরু মা'কে বলে " ওদের একটু বাংলাটা শেখাতে পারো তো! " 

অনুপমা বলে " কি যে বলিস্! বছরে দিন পনেরো ছুটিতে এসে বাংলা শিখবে ওরা! সারা বছর বাংলার সাথে ওদের কোনো সম্পর্ক নেই! এত সোজা না কি ! আর ঐটুকুনি বাংলা শিখে কি হবে? বাংলা গল্পের ব‌ই গুলো কিনে দিলে তো ওরা কেবল আমাকেই বলে পড়ে শোনাতে! তারপর ফিরে গিয়ে যে কে সেই! আর সে ব‌ই খোলাও হয়না তোদের ! " 

বাপ্‌-মায়ের একমাত্র আদুরে মেয়ে রিয়া । ধৈর্য্য সহ্য সবকিছুর‌ই ঘাটতি তার মধ্যে । নিজেও বাংলা পড়েনি সে । যেটুকুনি শিখেছে মায়ের কাছে । তাই ছেলেমেয়েকে বাংলা শেখানোর ব্যাপারে তার বড় একটা গা ও নেই ! তাই বাংলা শেখার সহজপাঠ শিকেয় তোলা! বরং তার বরের বাংলাপ্রীতি দেখে থাকতে না পেরে সে ইতিমধ্যে একবার বলেও ফেলেছে "আচ্ছা বলতো, ওরা ক'টাদিন ছুটিতে এসেছে দাদুর বাড়ি তার মধ্যে বাংলা না পড়লেই নয় ! আর বাংলা পড়ে কি হবে বুঝিনা !"

অরু বলেছিল " তুমি আর বুঝবে কি করে! বিহারে থেকেছো, মানুষ হয়েছ... উপেন্দ্রকিশোর, শরদিন্দু, নারায়ণ সান্যাল যে পড়েনি সে আর কি করে এর মর্ম বুঝবে !" 


রিয়া ফুঁত ফুঁত করছিল " যে ঐ সব বাংলা ব‌ই পড়েছে তাকেই তো আনলে পারতে! " 

অরিত্রর মনের মধ্যে চাপা একটা আর্তনাদ আছাড়ি পিছাড়ি খেতে থাকে । ভুলেও ভুলতে পারেনি সে মধুরিমাকে । প্রথম যৌবনের আধফোটা কুঁড়ি যেন মধুরিমা । প্রথম মেয়ে দেখতে যাওয়া মধুরিমাকে । কাগুজে সম্বন্ধ । মধুরিমা আর রিয়া এই দুটোই উঠেছিল ফাইনালিষ্টে । দুটোই দেখতে শুনতে বেশ চটকদার , সুশ্রী আর প্রেসেন্টেবল , অনুপমা দেখে এসে বলেছিল তাঁর দিদিকে । দুটোই মা-বাপের একমাত্র মেয়ে । শুধু মধুরিমার একটু উচ্চাশা । ডক্টরেট করতে চায় সে বিয়ের পর । আর রিয়া হল অর্ডিনারি গ্র্যাজুয়েট । অরিত্র ঝুঁকেছিল মধুরিমার ওপরেই কিন্তু শেষমেশ কি যে হল! 

অনুপমার দিদি ব্রেন ওয়াশ করছিল " অনু , আফটার অল আমাদের ছেলেটাকে যে দেখবে, তেমন বৌটীই তো আমাদের ঘরে আনা দরকার । যে মেয়ের এত এমবিশান সে তোর সংসার থোড়ি দেখবে! " 

সুভাষ কিন্তু সায় দেননি শালীর কথায় । বলেছিল "যোগ্য ছেলের যোগ্য পাত্রী খুঁজলে তাকেও তো কেরিয়ার গড়ার সুযোগ দিতে হবে ! এখন কি আর সে যুগ আছে? পড়াশুনো শিখে কি সে মেয়ে বাড়ি বসে গুরুজনের সেবা করবে ? " 

অনুপমার দিদি বলেছিল " নিজের স্বার্থটা দেখো একটু! আমার বোন্‌টার ওপর দিয়ে সারাটা জীবন কত ধকল গেল বলো! তোমার আইবুড়ো পিসিমা, বিধবা জ্যাঠাইমা তারপর তোমার বাবা, মা সকলকে নিয়ে কিভাবে সংসার করে গেল বলো! এবার ওকে একটু রিলিফ দেবেনা তোমরা!"

সুভাষ মনে মনে বলেছিল, যেন মায়ের চেয়ে মাসীর দরদ বেশী ! 

জল গড়াতে গড়াতে রিয়া আর মধুরিমা দুজনের বাড়ির উঠোনেই পৌঁছলো । মধুরিমাকে চোখের দেখা দেখেই অরিত্র পাড়ি দিল বিদেশে এমএস করতে । মনে মনে মধুরিমার স্বপ্নেরা উঁকি দিতে লাগল শ্যামবাজারে অরিত্রদের ব্যালকনির খোলা জানলায় । ওদের বাড়ি উত্তর কোলকাতার পাইকপাড়ায় । শ্যামবাজারের সব গলিঘুঁজি ঐ মেয়ের নখদর্পণে । আর মনে মনে ডক্টরেট করার সুপ্ত বাসনা ফলপ্রসু হবে সেই আশার আলো...সব মিলিয়ে একটা ফিলগুড ফ্যাক্টর তার ।

অরিত্রর বিয়ের খবরটা মধুরিমারা পেয়েছিল অনেকদিন পর । একটা চিঠি এসেছিল সেই পড়ন্ত বিকেলে । সন্ধ্যেবেলায় ল্যাব থেকে ফিরে আলো-আঁধারিতে লেটারবক্স হাতড়ে মধুরিমাই চিঠিখানি বাবার হাতে তুলে দিয়েছিল । তারপর ঘরে ঢুকেছিল চেঞ্জ করতে । ফিরে আসতে বাবা মেয়েটার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন "তুই আমার বড় ছেলে, তোকে আমি কোথাও যেতে দেবনা" 

বুদ্ধিমতী মধুরিমা বুঝে নিয়েছিল বাবার কথা । সদ্য একবার হার্ট এটাক হয়ে গেছে সে বাবার । বলেছিল "বাপী, আমি গেলে তো তুমি আমাকে পাঠাবে! "

সুদূর আমেরিকা থেকে কয়েকটা চিঠিও লিখেছিল অরিত্র প্রথমদিকে । কোলকাতার রিসার্চ ছেড়ে আমেরিকার ইউনিভার্সিটিতে মধুরিমার জন্য সব ব্যাবস্থা করে দেবে অরিত্র । মধুরিমা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি যা । তারপর তাল কেটে গেছিল হঠাত বাবার ফার্স্ট এট্যাকে । 

হৃদ্‌যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া বাবাকে দেখেই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কোথাও যাবেনা সে । এদেশে বসেই সে গবেষণা করবে । এখনো ভারতবর্ষের মাটি থেকে বিজ্ঞানচর্চা যথেষ্ট হয় । বিদেশে না গিয়েওতো উঁচু পড়াশুনোকে জিইয়ে রেখেছে অনেক ছাত্রছাত্রী । 

কিন্তু কি হবে সেই স্বপ্নে দেখা রাজপুত্রের? সাত-সাগর আর তেরোনদীর পারের সেই অরিত্রর গলায় যে অন্য কেউ মালা পরিয়ে দেবে। যে তাকে দেখে বিদেশে চলে যাবার পড়ন্তবেলায় বলেছিল চিঠি লিখতে । লজ্জায় রাঙা হয়ে গেছিল সিরিয়াস ছাত্রী মধুরিমা । অরিত্রর প্লেন আকাশে উড়ে গেছিল সেই চৈত্রে । মুকুলিত আমগাছের দিকে তাকিয়ে মধুরিমা বলেছিল চৈত্রমাসে তার এ কি সর্বনাশ ঘটিয়ে গেল সে রাজপুত্র ! 

অরিত্রর মা যেন মধুরিমার জন্যই পথ চেয়ে বসেছিলেন । ওনার দাদা মস্ত জ্যোতিষি । কোনো একসময় বলেছিলেন, অরুর কেমন বৌ হয় দেখে নিও । যেমন ঘর দেখবে তেমন দেখবে বর.. মিলিয়ে নিও আমার কথা । মনে মনে দাদার কথা মেলাতে বসেছিলেন অনুপমা । বড্ড মায়াবী মেয়েটার মুখখানা। সত্যি মধুরিমা নাম সার্থক এ মেয়ের । একেই বুঝি বলে প্লিজিং পার্সোনালিটি ! খুব সুন্দর নয় কিন্তু স্বভাবটা কাছে টেনে রাখার মত । 

অরিত্রর বিয়ে হয়েছিল প্রবাসী রিয়ার সাথে । মনে হয় ওরা খু‌উব সুখী হয়েছে । অরিত্র এখন ভারতবর্ষে ফিরেও এসেছে । ওদের পুত্রকণ্যা নিয়ে ভরা সংসার । মধুরিমা অরিত্রকে ভুলে যায়নি বলেই সুভাষ-অনুপমা ওর জীবনকে ঘিরে অনেকটা জুড়ে এখন । নিজের বিয়ে হয়েছে সরকারী ব্যাঙ্কের অফিসারের সাথে । সন্তান হয়নি । মধুরিমার দিনযাপনের মায়া ঐ দু'জন প্রবীণকে ঘিরে । বাপী-মায়ের কাছেই ফ্ল্যাট তার । কিন্তু বাপী আর নেই তার জীবনে । আর বাপী থাকলেও জানতেও পারতনা মেয়েটার মনের যন্ত্রণা । অনেক পেয়েছে মধুরিমা । ডিগ্রী, চাকরী, স্বামী, শ্বশুরবাড়ি সবকিছু । 

কিন্তু মাসীমা যখন জন্মদিনে কেক নিয়ে আসতে বলে তখন যেন মনকেমনের এস্রাজের সুর রিনরিন করে ওঠে কারো জন্যে । নিজের শাশুড়িমা তার বিয়ের আগেই মারা গেছে। বাড়ি ফিরে স্বামী উত্পলকে কাছে ডেকে গলা জড়িয়ে বলে ওঠে "জানো? মাসীমা এই বয়সেও আমার বার্থডে মনে রেখেছে" 

বিয়ের এতদিন বাদেও সন্তান ধারণ করতে পারেনি মধুরিমা । মাসীমা ওকে আশ্বাস দেন "ঠিক হবে দেখিস" বলে । কত টোটকা শিখিয়ে দেন নিজের মেয়ের মত করে । তবুও মধুরিমা মাতৃত্বের স্বাদ পায়না । রিসার্চ ল্যাবে কিছু কিছু টক্সিক কেমিক্যালের গন্ধ ইনহেল করলে নাকি ঊর্বরা মেয়েও বন্ধ্যা হয়ে যায়, ল্যাবে মধুরিমা একথা শুনেছে । তাই আর আশার আলো দেখতে পায়না সে । মাসীমা কিন্তু এখনো হাল ছাড়েনা। নারায়ণের পায়ে তুলসী দেয় অনুপমা.. মধুরিমার নামে । অমন মিষ্টি লালিত্য যে মেয়ের, অত সুন্দর স্বভাব যার সে মা ডাক শুনবেনা ! 

সুভাষকে বলে "আচ্ছা ঈশ্বর কি এত নিষ্ঠুর! সে মেয়ে তো কারো ক্ষতি করেনি!" 

সত্যি হয়ত কারো ক্ষতি করেনি সে কিন্তু একটা চিঠি লিখেছিল অরিত্রকে । হয়ত অরিত্র খুব ব্যথা পেয়েছিল সেই চিঠি পেয়ে । আর তাই বুঝি অরিত্রর সব নিঃশ্বাসটুকু তাকে মা ডাক শোনালোনা আর ...মনে মনে ভাবে মধুরিমা । 

অনুপমা দোল-দুর্গোত্সবে স্পেশ্যাল তুলসী চড়ায় । বিয়ের বারো বছর পরেও তো অনেক মেয়েই মা হয়েছে, এ নজির আছে । রোজ ভাবে হঠাত মধুরিমার ফোন আসবে কোন্‌দিন আর মেয়েটা তাকে শোনাবে সুসংবাদ। কিন্তু মেয়েটা প্রতি সপ্তায় আসে, গল্প করে, খায় দায়, চলে যায় । অরিত্রদের আসার কথা শুনলেই গুটিয়ে নেয় নিজেকে। সে বাড়ির ধার দিয়েও যায়না তখন । 


সেবার চৈত্রমাসের শেষ । তারি মধ্যে গুমট গরম । অনুপমা ফোনে ধরেছিল মধুরিমাকে । বছরের প্রথম মরশুমি তরমুজের সরবত বানিয়ে মন কেমন করে উঠেছিল মেয়েটার জন্যে । কলেজ থেকে ফেরার পথে যেন একটিবার এসে সে খেয়ে যায় সরবত টুকুনি । অরিত্রর বড্ড প্রিয় । কিন্তু তাকে কাছে পেতে ইচ্ছে করলেও পাবেনা অনুপমা । এখন মেয়েটাকে খাওয়ালেও শান্তি তার । 

হঠাত অকালবৈশাখিতে ওলটপালট শহরের আনাচকানাচ । ঘন আঁধারে কিছুই দেখা যায় না পরিষ্কার । ফাগুনের ঝরাপাতা উড়ছে প্রবল বেগে। সেইসাথে ধূলো । আজ ডাক্তারের চেম্বারে যাবার কথা । রিপোর্ট আনবে । দুজনে যাবে ভেবেও একসাথে যাওয়া হলনা । সেই অকালবর্ষণের টুপটাপে সব প্ল্যান গেল ভেস্তে । কলেজ থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে ট্রাম ধরতে গিয়েও নাকাল মধুরিমা । ট্রামলাইনে তার ছিঁড়ে বিপত্তি! কিছু পরে অবিশ্যি একটা ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছেছে মাসীমার তরমুজের সদগতি করতে । সেদিন মাসিমা আটকায়নি তাকে । মাসীমাও সেদিন ঝড়বৃষ্টির দাপটে তেতলার বারান্দা থেকে "বাই" করতে যায়নি আর। নিঃশব্দে সুভাষের বাড়ির একতলায় সিঁড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরুতে যাবে হঠাত আচমকা কলিংবেল । মধুরিমাও দরজা খুলেছে আর অরিত্র ঢুকেছে । একেবারেই হঠাত্! অফিসের কাজে কোলকাতায় এসেছে একদিনের জন্য । দুজনেই মুখোমুখি! স্তম্ভিত কিছু মূহুর্তরা ! অকালবৈশাখিতে এক আধফোঁটা বৃষ্টি চোখের পাতায় পড়লে যেমন হয় আর কি ! অপলক দুজনেই । তারপর হালকা হাসি আদানপ্রদান। 

-ভালো আছো তো মধুরিমা! 

-তুমি ভালো তো অরিত্র! হঠাত্‌ এখানে! 

-আমিও তো সেইকথা ভাবছি, তুমিও তো .. 

-তোমার তরমুজের সরবত কিন্তু আমার পেটে, দ্যাখো মাসীমার ফ্রিজে একটু তলানি পড়ে থাকবে হয়ত.. 

মধুরিমা তড়িঘড়ি বেরিয়ে এসেছে । অরিত্র সেই কবেকার বিদিশার নেশার দিকে তাকিয়ে তখনো একদৃষ্টে । মধুরিমাকে যেদিন দেখেছিল সেদিন মেয়েটার পিঠের সেই বিরুণীটা ভুলতে পারেনি অরিত্র । উজ্জ্বল শ্যামবর্ণার একজোড়া চোখ আর ছেয়ালো গড়নের পিঠের ওপর দোলানো একটা লম্বা বিরুণি অরিত্রর চোখে যে এখনো ভাসছে ! 

সেদিন রাতটা বেশ ঠান্ডা । আধোঘুমে আধো জাগরণে পাতলা চাদরের ওমে জ্বর অনুভূত হল মধুরিমার । কুঁকড়ে শুয়ে কাছের মানুষটিকে বলল "দেখো তো আমার কি জ্বর এসেছে" 

তার স্বামী বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে তার গালদুটো ধরে বলল "তোমার রিপোর্ট বলছে, এ অন্য জ্বর! সে আসছে, এবার কিছুদিন ছুটিতে থাকতে বলেছে ডাক্তারবাবু, এখন কয়েকটা মাস খুব সাবধানে, নো ল্যাব যাওয়া, নো এক্সপেরিমেন্ট, নো মাসীমার বাড়ি কিন্তু " 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন