রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

মোহিত কামাল'এর গল্প : মোড়া

এক \ হগলে এক লগে আয় 

বড় রাস্তার পাশে ধানের বস্তা নিয়ে বিক্রির আশায় বসে আছে ধান বিক্রেতা দরিদ্র কৃষক জমির আলি। তার পাশে লম্বা লাইনে আছে একই গাঁয়ের আরও অনেকে। এ সময় গাড়ি থেকে নেমে হাতে মিনারেল ওয়াটারের বোতল নিয়ে রোদ-চশমার ভেতর থেকে গরম চোখে তাকিয়ে মহাজন রহিমুদ্দিন এক পা এগিয়ে জমির আলির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, ‘কেজিপ্রতি ১২ টাকা পাবে। হিসাব করে যা আছে সব মেপে দাও।’

মহাজনের কথা শুনে জ্যৈষ্ঠের খররোদে পোড়া দেহ থেকে ঘামঝরা বন্ধ হয়ে গেল। ধানের দরপতনের আলামত দেখে জমির আলির বোধের মধ্যে আকস্মিক শুরু হয়ে গেল কালবৈশাখীর তাণ্ডব। ঘূর্ণি উঠল মস্তিষ্কে। চিন্তনধুলোয় আচ্ছন্ন হয়ে গেল চোখের দৃষ্টি। রহিমুদ্দিনের চোখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝল সেখানে আর মানবচোখ বসে নেই, সেই চক্ষুকোটরে আসন নিয়েছে শকুনচোখ। কিছুক্ষণ বোধশূন্য তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বুঝল প্রকৃতির বৈরিতার চেয়েও মানুষের অমানবিক বাছ-বিচার আরও বেশি ভয়াবহ, আরও বেশি নির্মম অবস্থা তৈরি করে। ধানের দরের এ প্রতিকূল ছোবলে গরমে পোড়া তামাটে ত্বকের স্তর ভেদ করে দেহে ঢুকে গেল বিষ। বিষদহনে তৃষ্ণা জেগে উঠল। পানি পানের ইচ্ছা হল প্রকট। তীক্ষ্ণ যাতনা নিয়ে এবার তাকাল রহিমুদ্দিনের হাতে ধরা বোতলের দিকে। কী আশ্চর্য! পানির দিকে তাকিয়েও পানি খাওয়ার ইচ্ছা জাগল না! এক বোতল পানির দাম কত? এমন প্রশ্নই ঝটিত উদয় হলো মনে। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল, ‘২৫ টাকা!’ এক লিটার পানির দাম মাত্র ২৫ টাকা অর্থাৎ ২ কেজি ধান বেচে এক লিটার পানিও কেনা যাবে না। প্রবল বেগে উষ্ণ নিঃশ্বাস বেরিয়ে গেল বুক ফেটে। ভেতরের তীব্র ক্রন্দনধ্বনি বাতাসের বর্জ্য হিসেবে ছড়িয়ে গেল রহিমুদ্দিনের সামনে। সেই বাতাসও স্পর্শ করল না মহাজনকে। আরও কঠোর অবস্থানে দাঁড়িয়ে বলল, ‘১২ টাকা দরে একমণ ধানের মূল্য দাঁড়ায় ৪৮০ টাকা। মনপ্রতি ত্রিশ টাকা ব্যয় হবে পরিবহনের বাড়তি খরচ আর সড়কের সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের চাঁদা মেটানোর জন্য। সর্বসাকুল্যে পাবে মনপ্রতি ৪৫০ টাকা।’ 

মহাজনের নতুন শব্দবাণে আঘাত খেয়ে এবার কোমর ভেঙে গেল জমির আলির। সোজা অবস্থায় দাঁড়ানো থেকে আচমকা হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল মাটিতে। নিজের হাতের দিকে চোখ গেল তার। হাতের তালুতে বসে থাকা গাছের ছাল উঠে যাওয়া দাগের মতো শ্রমের স্থায়ী চিহ্নের দিকে তাকিয়ে অনুভব করল প্রতিটি ধানের পেছনে মেখে আছে রক্তধোয়া মমতা। পানির চেয়েও কম মূল্যে ধানক্রেতার প্রস্তাব-ভঙিটাকে মনে হল রক্তচোষা আক্রমণ। এ আক্রমণ প্রতিহত করে উঠে দাঁড়াতে হবে, বুঝেও উঠে দাঁড়ানোর শক্তি পেল না সে। হাড়ভাঙা শ্রমে সোনা ফলানো ফসলের বোঝা জগদ্দল পাথরের মতো চেপে ধরল তাকে। বোরো ধান চাষে মণপ্রতি উৎপাদনব্যয় প্রায় ৭০০-৭৫০ টাকা। আবার কোনো এলাকায় খরচ ৮৫০ টাকারও বেশি। অথচ তারা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে ৪৫০-৪৮০ টাকায়। কী অবিচার! কী অবিচার! বিক্ষোভে ফেটে পড়ল কৃষক জমির আলির অন্তর্জগৎ। কেজিপ্রতি ২২ টাকা দরে ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। আশায় বুক বেঁধেছিল নিজে, অন্যান্য প্রান্তিক কৃষকরাও চাষে উৎসাহ পেয়েছিল। অথচ সরকারি ঘোষণার কোনো জোরালো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এই ফাঁকে রহিমুদ্দিনের মতো মধ্যস্বত্বভোগী জোতদাররা ফুলেফেঁপে উঠছে আর মুনাফার দড়িতে কৃষকের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে ফাঁস! দরের ফাঁস ঝুলন্ত গলায় চেপে ধরার আগেই আকস্মিক ফুঁসে উঠল নিরীহ কৃষক জমির আলি। চিৎকার করে ডাকল একটু দূরে ধানের বস্তা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুসাকে। ডাক শুনে কাছে দৌড়ে এসে মুসা প্রশ্ন করল, ‘কী হইছে, জমির?’ 

‘ধান বেচুম না।। রাস্তায় ছড়াইয়া দিমু সব ধান। তোরা আ’, হগলে একলগে আয়’!’ 

‘ক্যান, কী হইছে?’ 

‘মহাজন কী কয় হুনছ নাই? হে কয়...?’ 

জমিরকে কথা শেষ করতে দিল না মুসা। সে বলল, ‘হুনলাম সব কথা। হের কাছে ধান বেচুম না। বেবাকরে খবর দিয়ুম। দরকার হইলে নদীতে ভাসায়ে দিমু ধানের বস্তা!’ জমির আলির ভেতরে আগুনঝরা ক্ষোভ ঘৃণায় বদলে গেল, বসা অবস্থা থেকে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে ঘৃণা আর ক্ষোভের উদ্গীরণ ঘটাল একসঙ্গে- মাটিতে থুতু ছিটিয়ে চিৎকার করে আশেপাশে অন্যান্য কৃষকদের উদ্দেশে বলতে লাগল, ‘রাস্তায় ধান ছিটায়ে দে হগলে, গাড়ি আটকা। রাস্তা বন্ধ কইরা দে।’ 

হাড়ভাঙা পরিশ্রমী জমির আলিকে অনেক আগে থেকেই চেনে মহাজন রহিমুদ্দিন। নিরীহ, নতজানু, আলাভোলা ধরনের এ কৃষকের ভেতর থেকে ক্ষোভ আর ঘৃণার উদ্গীরণ হতে দেখে হতবাক হয়ে গেল সে। আরও হতবাক হলো অন্যান্য চাষীদের আকস্মিক গড়ে ওঠা সংঘবদ্ধতা দেখে। চৌকাতলি গেরামের কৃষকদের কোনো নেতা ছিল না। নিরীহ কৃষকরা নানা নির্যাতন নিপীড়ন মুখ বুঁজে সয়ে গেছে দিনের পর দিন। ভেতরের হতাশা ধীরে ধীরে জমতে জমতে পাহাড়সম হয়েছে। এতদিন অটল পাহাড় সব ঝড়ঝাপটা বুক পেতে হজম করে এলেও, এ মুহূর্তে নিজের আচরণের কারণে টলে গেছে কঠিন পাহাড়তল, বুঝতে পেরে একছুটে পালাতে চেষ্টা করল রহিমুদ্দিন। 

মুসা ছুটে গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে একদলা থুতু ছিটিয়ে দিল রহিমুদ্দিনের পায়ের দিকে। সেও কখনও কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছে বলে কেউ বলতে পারবে না। বরং সব সময় ভয়ে কাবু থাকত রহিমুদ্দিনের মতো অন্যান্য জোতদারদের সামনে। আচমকা কী ঘটল নিজেও টের পেল না। নিজের ভেতর কী পরিমাণ শক্তি লুকিয়ে ছিল বুঝতে পারেনি এতদিন। এই শক্তি আর শ্রম ঢেলে তাদের মতো কৃষকরা নিমগ্ন হয়ে চাষ করে কেবল, সেই শ্রমে সোনা ফলে, মাঠে মাঠে দোলা ওঠে সোনালি শস্যের, উঠোনগুলো পাহাড়সম ধানের স্তূপে ভরে ওঠে, কৃষাণীর মুখে হাসি ফোটে- এই ধারার বাইরের জীবনচিত্র জানা ছিল না তাদের। 

হঠাৎ নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে মুসা দাঁড়াল জমির আলির পাশে। বড় বড় শ্বাস-প্রশ্বাস এখনও থামেনি। ক্রোধের কারণে দেহের উত্তাপ রোদের উত্তাপকেও ছাপিয়ে গেছে। সেই উত্তাপ নিয়ে জমিরের উদ্দেশে মুসা বলল, ‘অহন কী করুম, ক’।’ 

এরই মধ্যে অন্যান্য কৃষকরাও ওদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সবাই বলল, ‘হ’ জমির ক’। অহন কী করুম ক’।’ সমস্বরে সবাই জমিরের নির্দেশ পালনের জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। 

‘হগলে একলগে আয়’, কাঁধে কাঁধ লাগাইয়া খাড়া, আমাগো ঘামের দাম না-লইয়া ধান বেচুম না, আ’।’ 

চৌকাতলি গ্রামের কৃষকরা কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল সড়কের পাশে। 

পলায়নরত জোতদার রহিমুদ্দিন একবার পেছনে তাকিয়ে আবার ছুটতে লাগল সামনে। মাটির ঢেলার সঙ্গে হোচট খেয়ে উল্টে পড়ল মাটিতে। তার পরনে সাদা পাঞ্জাবিতে মেখে গেল ধুলোমাটি। নিজেকে সামলে আবার দাঁড়াল সে। ছুটতে লাগল মেঠো পথে। পেছনে তাকানোর সাহস হারিয়ে ফেলল সে। 



দুই \ মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আগমন 


দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকায় বক্স করে খবর ছাপা হয়েছে- ‘তবুও হাসি নেই কৃষকের মুখে।’ একই সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে জমির আলির প্রতিবাদের খবর। কৃষকরা উৎপাদন খরচও তুলতে পারছে না ধান বিক্রি করে, সরকারি মূল্যে ধান সংগ্রহের সুবিধাও পাওয়া যাচ্ছে না, গ্রামে গ্রামে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ধানের চাতালসমূহ- খবরে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে জমির আলিদের থানা প্রশাসনে। 

মাছ ধরার জাল নিয়ে খাল পাড়ের দিকে যাচ্ছিল জমির। এমন সময় দেখল বাড়ির দিকে ছুটে আসছে মুসা। তার পেছনে আইল বেয়ে হেঁটে আসছেন একদল মানুষ। পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে তাদের গ্রামের মানুষ মনে হল না। কিছুটা চিন্তিত হয়ে জাল মাটিতে রেখে সে তাকিয়ে রইল ছুটে আসতে থাকা মুসার দিকে। 

কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে মুসা বলল, ‘টিএনও স্যার’!, ‘টিনও স্যার’! আর ওসিও আইবার লাগছে। তোর লগে কথা কইবার চায়!’ 

‘কী কথা? আঁ’র লগে কী কথা, মুসা?’ ভয় আর বিস্ময়মাখা প্রশ্ন বেরিয়ে এল জমিরের কণ্ঠ থেকে। 

‘আমরা তো কুনু দোষ করি নাই, ন্যায্য দর চাইছি, ঠিক দাম চাওয়া তো কুনু দোষ না। কী কয় হেরা দেহি।’ 

বাড়ির পুকুরপাড়ে ঝাকড়া বাদাম গাছের পশ্চিম পাশে ছায়ায় দাঁড়িয়ে রইল জমির আর মুসা। পূব দিগন্তে সূর্যের নরম রোদ আটকে যাচ্ছে বাদাম গাছের ছড়ানো পাতায়। রোদছায়ার আদুরে ছোঁয়াও কমাতে পারল না তাদের উদ্বেগ। বিস্ময় নিয়ে দুজনে দেখল টিএনওকে। ওসির দলবহর দেখে আশপাশের বাড়ি থেকে বালকবয়সী থেকে শুরু করে বয়স্করাও বেরিয়ে আসছে বাড়ির বাইরে। দেখতে দেখতে উৎসুক গ্রামবাসী ঘিরে ফেলেছে থানা প্রশাসন থেকে আগত ছোট দলটিকে। 

আচমকা চৈতন্যে জ্বলে-ওঠা শিখার দহনে পুড়ে গেল ভয়। জেগে ওঠা কৃষকদের বুকের চিতা আপন বুকে পুরে নিয়ে বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইল জমির আলি। নিরপরাধ, নিরীহ জীবনের শেকড় ছিঁড়ে ক্ষিপ্র সূর্যের তেজ চোখে ধারণ করে প্রশাসনের আগত কর্মকর্তাদের দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সাদর সম্ভাষণ জানাল জমির। 

টিএনও সাহেব এগিয়ে এসে স্বউদ্যোগী হয়ে জমিরের হাত টেনে নিয়ে হ্যান্ডশেক করলেন। এ ধরনের আদব-কায়দায় অনভ্যস্ত জমির প্রথমে কিছুটা নার্ভাস হয়ে গেলেও নির্বাহী কর্মকর্তার মধুর ব্যবহারে বিগলিত হয়ে সালাম জানিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার আমরা কি কুনু অপরাধ কইরা ফালাইছি?’ 

‘না। অপরাধ করবেন কেন? ন্যায্য দাবির কথা বলেছেন। আমাদের ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, আপনাকে আমরা অভিবাদন জানাতে এসেছি।’ 

বিরুদ্ধ হাওয়ার ঝাপটা খেল না গ্রামবাসী। অনুকূল বাতাসের জ্যোতির্ময় পরশ পেয়ে কী বলতে হবে, কী করতে হবে, না-বুঝে সবাই স্তব্ধ হয়ে রইল। কিছুটা সময় নিয়ে, একদমে মুসা ছুট দিল পুকুর পাড়ের ডাবগাছের দিকে। তর তর করে সে উঠে গেল গাছে। এক ঝাড়ে মোট ৬টি ডাবসহ কেটে দ্রুত দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দিল নিচে। একদল লেগে গেল ডাব কাটার কাজে। 

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হাতে ডাব তুলে দিয়ে নির্বাহী কর্মকর্তার পাশে দাঁড়িয়ে জমির আলি বিনীতভাবে এবার বলল, ‘আমরা গরিব চাষারা এনজিও আর মহাজন গো কাছ থে’ রিন লইয়ারে ধান চাষ করি। আশা মিটে না আমাগো। এক বিঘা জমিনে ধানের চারা লাগানো শুরুকরণের পর থে’ কাটা-মাড়াই আর জমিনের মালিক গো বর্গা দেওন পর্যন্ত খরচ হয় প্রায় ১৪ হাজার টেহা। আর আমাগো ঘামঝরা কাজের বদলায় বিঘাপ্রতি ধান ওডে ১৪-২০ মণ। আমরা বাঁচার পথ পামু যদি ধানের দর মণপ্রতি এক হাজার টাকা ধরা হয়। সরকার যেন হেই ব্যবস্থা লয়। তা নাওলে বউবাচ্চা লই বাঁচার পারমু না আমরা।’ 

টিএনও সাহেব জমির আলির কথা মন দিয়ে শুনে বললেন, ‘আমরা শাসক নই, আপনাদের সেবক। জমির আলি যা বললেন অবশ্যই মাঠ প্রশাসন থেকে সেই কথা আমরা খাদ্যমন্ত্রণালয়ে তুলে ধরব। আশা করি আপনারা নিরাশ হবেন না। তবে অনুরোধ থাকবে কথায় কথায় হতাশ হয়ে এ এলাকার মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া হাইওয়ে বন্ধ করে দেবেন না।’ 

মুসা এবার বুক উঁচিয়ে বলল, ‘কেবল উপরে উপরে কথা কইলে আমাগো পেটে ভাত জুটব না। সরকারের ঠিক করা দামে যেন ধান বেচতে পারি, হের দিকে নজর রাখতে হইব আপনাগো। সরকার দাম ঠিক কইরা দিলে হেই দর দিতে চায় না মহাজনরা।’ 

‘হ’। ঠিক কথা কইছে মুসা। বর্গাচাষীগো কষ্টের শ্রমে ধানের ফলন ভালা হইছে। ন্যায্য দর না পাইলে আগাম বছর ধান চাষে আমাগো তেজ থাকব না। তহন ক্ষতি হইব দেশের, সরকারের।’ বলল জমির আলি। 

এবার ওসি বাহবা দিলেন কৃষকদের। জমির আলির সঙ্গে হাত মেলালেন। তার ডান বাহুতে তিনবার চাপড় মেরে বললেন, জমির আলির মতো যোগ্য নেতা থাকতে আপনাদের ভয় নেই। সমস্যার কথা আমরা শুনেছি। নিশ্চয় তা লাঘব হবে।’ 

অল্প বয়সী এক ছোকরা, অশিক্ষিত সে, নিজের নামটিও দস্তখত দিতে জানে না, এক পা এগিয়ে এসে বলল, ‘আমাগো পেডে তিনবেলা ভাত জুটব তো?’ 

কঠিন প্রশ্ন। সহজ কথা আর সহজ রইল না। টিএনও সাহেব বাক্ হারিয়ে ফেললেন। ওসি সাহেব মিনমিনে গলায় বললেন, ‘জুটবে। তোমাদের শ্রমই তোমাদের ঘরে ভাত জোটাবে।’ 




তিন \ ওডেন, বহেন মোড়ায় 


জোহরা বেগমের দীনহীন ঘর আকস্মিক বদলে গেছে বাতিঘরে। সুবাতাস বইছে। স্বস্তি আর প্রশান্তির একটা ঢেউ আন্দোলিত করছে তার মন। জীর্ণ ঘরে নতুন আশার সূর্য জাগছে, আকাঙ্ক্ষার বীজ রোপিত হচ্ছে- নতুন শস্যদানায় ভরে উঠবে উঠোন, ধানমাড়ানি সংগীতে ভরে থাকবে জোছনারাত। অভাব দূর হবে, সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারবে- শিক্ষার আলোবঞ্চিত জোহরা বেগমের অন্তরধ্বনি থেকে এমনি ভাবনা ছড়িয়ে যাচ্ছে। দুদিন ধরে মগ্ন হয়ে সে বেত দিয়ে বানিয়ে চলেছে একটা মোড়া। বেতের শলার একেকটা প্যাচে জড়িয়ে ফেলছে সে জমির আলিকে। ভালবাসার মানুষটা কীভাবে যেন গ্রামের নেতা বনে গেছে। সবাই সম্মান করছে। সেও স্বামীকে তুলে রাখতে চায় চোখের মণিতে। গুন গুন করে গান গাইছে, গানের তালে হাতের বুননে হৃদয়ের উত্তাপ ঢেলে দিচ্ছে। কঠোর শ্রমের বিনিময়ে দুদিনের চেষ্টায় অবশেষে সে বানিয়ে ফেলেছে মোড়াটি। মহিমার বীজ নতুন করে রোপিত হয়ে গেছে হৃদয়ের খরাভূমে, নিজেও টের পেল না জোহরা। 

ঘরের উঠোনে নেমে আইলপথের দিগন্তসীমার দিকে তাকিয়ে জোহারা বুঝল জমির আলি আসছে। স্বপ্নপোড়া চোখ স্ফীত হয়ে উঠল আনন্দজোয়ারে, অনুভবের প্রশ্রয়ে একবার ছুটে গেল সামনে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে আবার ঢুকে গেল ঘরের ভেতর। নিজ হাতে বানানো নতুন মোড়াটি চকির তলে ঠেলে রেখে ফিরে এল আবার। দূরে দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে দেখল প্রিয় স্বামীর হাত শূন্য, হাতে কোনো পোটলা নেই। অথচ ফেরার পথে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে আসার কথা, ধান বিক্রি হওয়ার কথা। তবে কি কোনো কারণে বিক্রি করতে পারেনি আজ? না পারুক, কাল নিশ্চয় পারবে- এমনি তাজা চিন্তা বুকে পুরে সে সহজেই সামাল দিল বুকজুড়ে আঁকড়ে ধরা হতাশার চাপ। কাছে আসতেই জোহরা ছুটে গেল স্বামীর কাছে। 

ধুলোমাখা জমিরের বিবর্ণ মুখ দেখে কুড়োলের কোপ খেল চোখ। তবুও আগত সচ্ছলতার স্বপ্নছায়া হারিয়ে গেল না চোখ থেকে। কোনো প্রশ্ন না করে স্বামীর উদ্দেশে সে বলল, ‘হাতমুখ ধুইয়া আহেন। দুপুরের ভাত রাঁধি রাইখছি, আহেন। আঁই ভাত বারি দি থালায়।’ কোনো শব্দ করল না জমির আলি। নতুনভাবে জেগে ওঠা স্ত্রীর আদুরে আহ্বান ফেলতে পারল না সে। এগিয়ে গেল পুকুরের দিকে। 

হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে ঢুকে জমির আলি নতুনভাবে দেখল জোহরা বেগমকে। মলিন মুখের ত্বক ফুঁড়ে চকচক করে বেরোচ্ছে স্বপ্ন-আলো, ফলবতী স্ত্রীর শস্যভাণ্ডারের উপচে-পড়া শস্যকণার প্রতিও চোখ গেল তার। তবুও আনন্দিত হলো না জমির আলির চোখ। বিষাদের মলিন বিলাপ বেরোতে লাগল নেতৃত্বের গুণে অর্জিত সম্মানের নড়বড়ে খুঁটি থেকে। কথাবার্তায় তাই বেরোল না মমতার সংগীত। দ্রোহী শব্দের মতো কঠিন আওয়াজ বেরোল জমির আলির মুখ থেকে- ‘এত খুশি খুশি লাগছে কেন তোমারে?’ 

কথার ধরন জোহরার মনের নরম ভূমিতে আঘাত হানলেও সচেতন স্তর স্পর্শ করল না সেই শব্দের আড়ালের ক্ষোভ। উচ্ছ্বাস কিছুটা দমে গেলেও জোহরা আত্মমগ্ন অবস্থান থেকে কাজ করে গেল রোবটের মতো। চকির তল থেকে সদ্য বোনা শেষ করা বেতের মোড়াটি বের করে স্বামীর উদ্দেশে বলল, ‘বহেন। এহানে বহেন।’ 

মোড়া দেখে আকস্মিকই দ্রোহীমনের মধ্যে উড়ে এসে জুড়ে বসল জোছনা, নতুন আশার চুম্বন বসিয়ে দিল তা নিজের হৃৎপিণ্ডে। সমালোচনা না করে ধমক না দিয়ে শীতল গলায় জমির আলি বলল, ‘মোড়ায় বসতে হবে কেন?’ 

জোহরা বেগম একবার মাত্র চোখ তুলে তাকাল স্বামীর দিকে। এভাবে বিয়ের পর কখনও চোখের দিকে তাকিয়ে স্ত্রী কথা বলেছে বলে মনে পড়ল না। চোখের মধ্যে থেকে ছুটে এল নতুন আকাঙ্ক্ষার আলো। সেই বিভা কি ছুঁয়ে গেল জমির আলির চোখ? 

পোষমানা পাখির মতো অনেকটা উড়ে গিয়ে বসল সে মোড়ায়। 

চোখের পলকে জোহরা বেগম বসে পড়ল জমির আলির পায়ের কাছে। পায়ের ধুলো নিয়ে সে একবার তাকাল স্বামীর দিকে। 

‘কী, কী করছ জোহরা?’ 

‘কিচ্ছু না। আমাগো গ্রামের নেতারে একবার পা ছুঁইয়া সালাম করলাম আর কি!’ 

সঙ্গে সঙ্গে মোড়া থেকে নেমে গেল জমির। মাটিতে আসন গেড়ে বসে বলল, ‘না, বেবাক ভুয়া। আমি কুনু নেতা না। আমাগো ধোঁকা দিছে বড় বড় কর্তাবাবুরা। মহাজনরা আমাগো ন্যায্য দর দিবার চায় না। আইজও ফিইরা আইছি আমরা। হেগো যুক্তি হইল বিদেশ থুন চাইল আমদানির কারণে আমাগো দেশের চাইলের চাহিদা কইমা গ্যাছে। চাতাল মালিকদের গুদামভরা চাইল বেচন হয় না। চাতাল আর মিল মালিকরা নাহি ক্ষতির শিকার হইছে। আমাগো কথা কি আর ভাবব তারা? ভাবব যাগো মাথায় তেল আছে তাগো কথা। এহানে আইসা খালি খালি বুজ দিয়া গেছে আমাগো।’ 

স্বামীর হতাশা স্পর্শ করল না জোহরা বেগমকে। এবার এ জীবনে যা করেনি তাই করল সে। স্বামীরে ধমক দিয়ে বলল, ‘ওডেন, মোড়ায় বহেন। ভুখানাঙ্গা চাষাগোর নেতা হইছেন আফনি। হেই সম্মান তো আঁ’র মাথার মুকুট। এই মুকুটরে কি মাটিতে রাখবার পারি? ওডেন, বহেন মোড়ায়।’ 

স্ত্রীর মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রোবটের মতো মোড়ায় উঠে বসল নতুন নেতা। মনে মনে ভাবল চাষাগো ভুয়া নেতা হইলেও তো বউয়ের চোখে আসল নেতা হবার পারছি। শক্ত করে মোড়ায় বসে নতুন নেতা প্রশাসনের কর্তবাবুদের দুমুখী নীতির গিঁট খুলে দ্রোহ আর ঘৃণার আগুন নিভিয়ে বুকে মমতার নতুন শস্যবীজ রোপণ করে আশায় বুক বেঁধে বউয়ের জন্য অধিষ্ঠিত হলো সত্যিকার মনের নেতার আসনে, জীবনের নতুন মোড়ায়। 



চার \ মাথা ঠাণ্ডা রাইখেন 


মোরগের ডাক শুনে ঘুম থেকে উঠে বসল জমির আলি। এত ভোরে সাধারণত ঘুম ভাঙে না তার। ভোরে ওঠার অভ্যাস থাকলেও কখনও মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙেনি। ওই ডাকের মধ্যে কি অর্থ আছে? কী বলতে চায় মোরগ? দিনের আগমনবার্তা জানানো ছাড়া কি আরও কোনও অর্থ লুকিয়ে থাকে ওই ডাকে? মনোযোগ দিয়ে ডাক শুনতে শুনতে অনুভব করল পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রী ডুবে আছে গভীর ঘুমে। স্ত্রীর মনে শান্তি বয়ে যাচ্ছে। এত শান্তি এ দরিদ্র ঘরে কখনও দেখেনি জমির আলি। নাই আর নাই, টানাপোড়নের মধ্যে জোহরা বেগম একমাত্র পুত্রকে পড়ানোর চেষ্টায় দিন কাটায়। বাড়ির পাশে কোনও প্রাইমারি স্কুল নাই। অনেকদূরে পাশের গ্রামে যেতে হয় ছেলেটাকে। ছেলের পোশাকের দিকে থাকে তার নজর। চুল আচড়ানো, গোসল করানো থেকে শুরু করে সব নিজের হাতে যত্ন করে করে সে। তার স্বামী অশিক্ষিত, দস্তখত করার যোগ্যতা ছাড়া আর কোনো পড়াশোনা নেই স্বামীর, নিজেরও শিক্ষা নেই অথচ নিজ সন্তানকে শিক্ষিত করে তোলার প্রবল তাড়না কাজ করে জোহরা বেগমের মনে। এ সুন্দর সংসারটার জন্য নিজের সব মমতা উজাড় করে ঢেলে দেয় জমির আলিও। কঠোর শ্রমের বিনিময়ে চাষ করে, বারোমাসের চাল জমা করে উদ্বৃত্তটুকু বিক্রি করতে পারার মতো শান্তি আর নেই। চাহিদার সীমা ছোট। চাহিদা পূরণ হলে তৃপ্তির পরিমাণ বড় হয়ে দাঁড়ায়। আর তাই তাদের বাড়তি ধান বিক্রি করতে পারার মতো শান্তি আর নাই। ছোট চাহিদা পূরণ হলে তৃপ্তির পরিমাণ এমন বড় হয়ে দেখা দেয় যে তখন তাদের দরিদ্র ঘরে সুখের অভাব থাকে না। অথচ ইদানীং ধান বিক্রি করে বারো মাসের চাল তুলে রাখা দুরূহ হয়ে গেছে। অগ্রীম মংগার আশঙ্কায় কাবু হয়ে থাকে তারা। সংসারের কথা ভাবতে ভাবতে চৌকি থেকে নেমে পাশের ঘরে একবার উঁকি দিয়ে সে দেখল একমাত্র পুত্র জামশেদও গভীর ঘুমে মগ্ন। 

পুবাকাশে এখনও আলো ছড়িয়ে পড়েনি। ভোরের লালিমাও এখনও উঁকি দেয়নি আকাশে। তবে অন্যরকম একটা আলোছায়ার উদ্ভাস দেখতে পেল সে জামশেদের ঘুমন্ত মুখের ত্বকে। কোমল ঢেউ রূপে তা বয়ে যাচ্ছে ওই নিষ্পাপ মুখে। খোলা জানালার মধ্যদিয়ে বাইরের আলো-আঁধারের অন্য আলোয় জমির আলি স্পষ্ট ঠাহর করতে পারল মমতার অঝোর বর্ষণ। জীবনযাতাকলে পিষ্ট বুকের জমিনে বাড়তে থাকা শুকনো পোড়ামাটি আকস্মিক শুষে নিল স্নেহের সে-ধারা। গেল রাতে স্ত্রীর ভালবাসার তুমুল বৃষ্টিপাত আর এক্ষণের পিতৃস্নেহের চোরাস্রোত মুহূর্তেই ধুয়ে দিল বুকের ভেতর ফুঁসে উঠতে থাকা অভিমান, ক্ষোভ, অর্থহীন অভিঘাত, দহন। জ্যৈষ্ঠের খরতাপ যেন পরশ পেল উড়াল মেঘের। মেঘখণ্ডের বুক চিরে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। বুকের জমিনে ধুয়ে দিতে লাগল জলোধারা। আর তখনই জমির আলি শুনল মোরগের ডাক। কাকডাকার আগেই সে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। রোদ ওঠার আগেই পৌঁছাতে হবে হাইওয়েতে। সঠিক দরে ধান বেচতে না পারলে এ গ্রামে কৃষকদের ঘরে ঘরে যে দুর্দশা আর দুর্ভিক্ষ নেমে আসবে তার অগ্রীম শঙ্কায় শান্তির মাঝেও হানা দিল ঝড়ো উদ্বেগ। শঙ্কার নতুন ঢেউ কাঁপিয়ে দিল দেহের প্রতিটি কোষ। শরীরটাকে একবার মোচড় দিয়ে সে দরজা খুলে বেরিয়ে এল। ভোরের প্রথম আলো, অহনায় একবারে স্নান সেরে নিল সে। উঠানের কোণে রাখা ভরা কলসি থেকে জল ঢেলে হাত-মুখ ধুয়ে শুদ্ধ মনে আবার সে ঢুকল রসুইঘরে। পান্তাভাত আছে পাতিলে, জানে সে। একটা পেঁয়াজ কেটে নিল, কাঁচালঙ্কা আর পেয়াজ ছিলে মাটির থালায় ভাত বেড়ে নিয়ে পেট পুরে খেয়ে উঠে দাঁড়ানোর মুহূর্তে পেছনে এসে দাঁড়াল জোহরা বেগম। 

‘এই সহালেই যাবেন?’ 

‘হ’, জোহরা। যাওন লাগব। আজ ধান বেচন লাগবই।’ 

‘মাথা ঠান্ডা রাইখেন। হগলে একলগে থাইখেন।’ 

বউয়ের মুখের দিকে পরম মমতায় চোখ তুলে তাকাল জমির আলি। অনুরাগের ছোঁয়া পেয়ে তার চোখের তারায় খেলে গেল অনন্তকাল স্থায়ী হতে পারে তেমন ঢেউ। 

জমির আলি এবার বউয়ের বাঁ হাতটা নিজের ডান হাত দিয়ে চেপে ধরল। দ্বিধাহীন স্পর্শের সরল সংকেত সাঁই করে পৌঁছে গেল জোহরার মস্তিষ্কে। বুকের ভেতর উতলা হয়ে উঠল অচেনা ঢেউ আর তার দোলায় নাড়া খেয়ে সেও শক্ত করে ধরে রাখল স্বামীর হাত। 

জমির বলল, ‘হাত ছাড়ো, এবার আহি। যাওন লাগব তাড়াতড়ি।’ 

হাত ছেড়ে দিল জোহরা। 

কয়েক কদম এগিয়ে আবার ফিরে এল জমির। ছেলের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে নিল জামশেদের ঘুমন্ত মুখ। শান্তির চুম্বন খেল দু চোখ। এবার এগিয়ে যেতে লাগল সামনে, হাইওয়ের দিকে। গ্রামের চারপাশটা ঘুরে তাকিয়ে দেখে নিল সে। দেখল আশ-পাশের কৃষকরাও বোরোচ্ছে যার যার বাড়ি থেকে। মুসা হাত উঁচিয়ে ইশারা করল জমিরের উদ্দেশে। ইশারার জবাব হাত দিয়েই দিল জমির। সকলে বিভিন্ন দিক থেকে এগিয়ে যেতে লাগল সামনের দিকে। 




পাঁচ \ অহন কী হইব, জমির? 


ধানের দাম শুনে আজও হাহাকার করে উঠল জমির আলির বুক। বুঝল ওসি আর থানা প্রশাসনের কোনো আশ্বাসই কাজে আসছে না। মহাজন, চাতাল মালিক আর মিল মালিকেরা একজোট হয়ে গেছে। জোট বেঁধে ধানের দর কমিয়ে ফেলেছে। ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠতে লাগল সে। 

এ সময় অপরিচিত একজন জমিরের সামনে এসে বলল, ‘কী ভাইজান, আফনে নাহি চৌকাতলি গ্রামের নেতা বইন্যা গ্যাছেন?’ 

প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বুক চেতিয়ে মাথা উঁচিয়ে অচেনা লোকটার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে রইল জমির। 

লোকটা আবার বলতে লাগল, ‘আফনে নাহি আমাগো মানী নেতা রহিমুদ্দিন মহাজনের শইলে থু দিছেন! তারে নাহি দৌড়াইছেন! তারে ঢেলা মারছেন?’ 

‘না।’ শক্ত করে জবাব দিল জমির আলি। তার মাথা গরম হচ্ছে । গরম সময়েও মনে পড়ে গেল জোহরার কথা- ‘মাথা ঠান্ডা রাইখেন। হগলে একলগে থাইখেন।’ কথাটা মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশেপাশে তাকাল জমির। দেখল মুঠি শক্ত করে তার কাছে ঘেষে দাঁড়াচ্ছে মুসা। মাথা আর চোখের ইশারায় মুসাকেও সহজ থাকার সংকেত দিল সে। সংকেত টের পেয়েও দমে থাকল না মুসা। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে লোকটার উদ্দেশে বলল, ‘থু দিছি আমি। মহাজনের শইলে না, পা’র সামনে, মাডিতে। আর হে নিজেই দৌড় দিছে, নিজেই উসঠা খাইয়া পড়ছে, হের কাপড়চোপড়ে ধুলায় ভরাইছে নিজেই। এসব কথা জিগাইবার আফনে কে?’ 

‘ওঃ! নেতার লগে দেহি চেলাও আছে! হে চেলার তেজও তো দেহি কম না! চেলার মুখে চুন লাগাইয়া দিলে কী হয়, জানস?’ 

লোকটার ত্যাড়া কথার জবাবে প্রায় হাত উঠে গিয়েছিল মুসার। জমির আলি চট করে দাঁড়িয়ে গেল মুসা আর লোকটার মাঝখানে। লেজ গুটিয়ে চলে গেল অচেনা লোকটা। তার আচরণ আর দেহভঙিমায় জমির আলির মনে হলো এ নিশ্চয় গুন্ডা-ফান্ডা হবে। মহাজনরা অনেক লাঠিয়াল আর গুন্ডা পোষে। ও তাদেরই একজন হয়তবা। এদের খেপিয়ে ক্ষতিই বাড়বে ভেবে মুসাকে নিবৃত্ত করে বলল, ‘আমাগো কাজ হইল ন্যায্য মূল্যে ধান বিক্রি করা। ফ্যাসাদ বাঁধানো না। বুঝছস, মুসা?’ 

‘হে-ই তো ফ্যাসাদ বাঁধাইতে আইসে। হের কথার জবাব দিতে হইব না!’ 

‘ঠান্ডা মাথায়ও জবাব দেওন যায়, খেয়াল রাখিস।’ 

এ সময় এক চাতাল মালিক এসে বলল, ‘আমাগো গুদামভরা ধান বিক্রি হয় না। লসে আছি আমরা। তোমাগো ধান কেমনে নিই? মণপ্রতি ৪৩০-থেকে চল্লিশের মধ্যে হইলে পোষাবে। এ দর হইলে নিতে পারি। কী কও, মিয়া?’ 

জমির আলি জবাব দিল না। কঠিন চোখে তাকিয়ে রইল চাতাল মালিকের চোখের দিকে। 

আশপাশ এলাকার লোকজনও চারপাশে ঘুরঘুর করছে। চৌকাতলির চাষাদের ধরা দাম কেউ কানেই তুলছে না। এ সময় সামনে এল এক মিল মালিকের ম্যানেজার। কাপড় চোপড়ে ফিটফাট। শিক্ষিত। শুদ্ধ বাংলায় বলল, ‘জমির আলি সাহেব, আপনাদের ধরা দামে কেউ ধান কিনবে না। বরং ৪৪০ টাকা দরে ছেড়ে দিন। আপনাদের কষ্ট লাঘব হবে তাতে।’ 

ঘুরে দাঁড়াল জমির আলি । চৌকাতলি গ্রামের সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। তাদের সাহস আর তেজ বলে আর কিছু অবশিষ্ট রইল না। সবাই জিজ্ঞেস করছে ‘অহন কী করুম, ক’ জমির?’ 

‘হগলে এক লগে আ’, একলগে শুইয়া পড় রাস্তায়, গাড়ি চলাচল বন্ধ কইরা দে।’ বলতে বলতে সে শুয়ে গেল হাইওয়ের পিচঢালা রাস্তায়। উওপ্ত সড়কে পিঠ পুড়ে যাচ্ছিল। উঠে কোমরে মোড়ানো গামছা বিছিয়ে ধানের বস্তায় শরীর ঠেস দিয়ে বসে পড়ল সড়কে। তার দেখাদেখি চৌকাতলি গ্রামের চাষীরা আসন পেতে বসল সড়কে। আধা ঘন্টার মধ্যে সড়কে লম্বা লাইন পড়ে গেল। আর এই ফাঁকে চাতাল মালিক, মহাজন আর মিল মালিকরা উধাও হয়ে গেল। 

মুসা প্রশ্ন করল, ‘অহন কী হইব, জমির?’ 

‘চুপচাপ বইয়া থাক। গাড়ি আটকা থাকলে প্রশাসনের কর্তাবাবুরা আইতে বাধ্য। আমরা কেবল আমাগো ন্যায্য দামটা ঠিক করণের কথা কমু। আর কিছু না। আর কুনু দাবি নাই আমাগো।’ 

জমিরের কথা শেষ হওয়ার আগেই হইচই, চিৎকার শোনা গেল খানিকটা দূরে, যানযটের মধ্যে। থেমে থাকা গাড়িবহরের একাংশের যাত্রীরা নেমে যাচ্ছে গাড়ি থেকে, চিৎকার করছে। একদল লোক গাড়ি ভাঙচুর করছে। 

‘ওরা কারা?’ টের পেয়ে প্রশ্ন করল জমির। 

উত্তর পেল না চৌকাতলি গায়ের চাষারা। হঠাৎ দেখল পুলিশ ছুটে এসেছে। লাঠি পেটা শুরু করেছে জমিরদের দলের ওপর। রাস্তা ছেড়ে তারা নেমে গেল সড়কের পাশের ঢালে। পুলিশ সদস্যরা ধানের বস্তা টেনেটুনে সরিয়ে দিচ্ছে সড়ক থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মহাসড়কের গাড়ি চলতে শুরু করল। পুলিশের দল এসে ঘেরাও করে ফেলল চৌকাতলি গ্রামের কৃষকদের। 

এসআই বজ্র কণ্ঠে বললেন, ‘সবাইকে অ্যারেস্ট করা হবে?’ 

দৃঢ়তা নিয়ে বুক চেতিয়ে জমির প্রশ্ন করল, ‘আমাগো দুষ কি, ছার?’ 

‘গাড়ি ভাঙচুরের দায়ে তোমাদের আটক করা হল।’ 

‘আমরা তো ভাঙচুর করি নাই। শান্তিপূর্ণভাবে সড়কে বইসা ছিলাম।’ 

‘ভাংচুরের ছবি তুলে নিয়েছি আমরা। আদালতে প্রমাণ হাজির করা হবে। তাছাড়া সড়ক অবরোধ করেছ। সরকারি নির্দেশ ভঙ্গ করেছ তোমরা।’ 

মুসা তেড়ে উঠে বলল, ‘আফনে কইরা সম্বোধন করেন, ছার। আফনে অহন কথা কইছেন চৌকাতলি গেরামের নেতা জমির আলির লগে, বুঝছেন?’ 

পুলিশের লাঠি উঠে গেল মুসার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ঝাপ দিয়ে লাঠি আর মুসার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল জমির। লাঠির আঘাত পড়ল জমিরের মাথায়। মুহূর্তেই ফিনকি দিয়ে বেরোল তাজা রক্ত! 

মুসাসহ চৌকাতলি গেরামের সকল চাষারা মুহূর্তে হকচকিয়ে গেল। তারা কে কী করবে বুঝতে পারল না। সড়ক থেকে উঠে আসার সময় বিছানো গামছাটা তুলে এনেছিল জমির, সেটা দিয়ে সে বেঁধে ফেলল নিজের মাথা। মাথা ঝিমঝিম করছে। চক্কর দিচ্ছে। তবুও সাহস হারাল না সে। এবার এসআইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, ‘ক’জনের মাথা ফাডাইবেন। ক’জনের লাশ ফালাইবেন। পুরা চৌকাতলির মানুষ রাস্তায় শুইয়া থাকব।’ 

‘হ হগলে আইসা শুইয়া থাকব রাস্তায়।’ জমিরের কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবার সমস্বরে শোরগোল তুলল সবাই। 

পুলিশের এসআই সাহেব জমির আলির হাতে হাতকড়া লাগনোর নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথে মুসা স্লোগান তুলল, ‘আমাগো নেতা তোমাগো নেতা।’ 

সবাই সমস্বরে গর্জন তুলল, ‘জমির আলি, জমির আলি।’ 

স্লোগানে মুখর হয়ে উঠল সড়ক-প্রাঙ্গণ। আচমকা সংঘবদ্ধ স্লোগান আর প্রতিরোধের মুখে হকচকিয়ে গেল পুলিশদল। সেই স্লোগানের ঢেউ এ-বাড়ি সে-বাড়ি করে পৌঁছে গেল জমির আলির বাড়িতেও। জোহরা বেগমও স্লোগান তুলল, ‘আমাগো নেতা, তোমাগো নেতা, জমির আলি, জমির আলি।’ 

তার চোখে জল এসে গেল। সে দেখল আশেপাশের বাড়ি থেকে দলে দলে বেরিয়ে যাচ্ছে নারী-পুরুষ আর তাদের সন্তানেরা। সবাই ছুটছে বড় রাস্তার দিকে। সবাইর মুখে একই স্লোগান ধ্বনিত হতে লাগল। সে-ধ্বনিতে নিভে যেতে লাগল নিজের উনুনের দরিদ্রতার আগুন। একবার সে ছুটে গেল মমতার বেতে বানানো মোড়াটার দিকে। ঝাড়মোছ দিয়ে রোদে ধুয়ে মোড়ায় হাত বোলাল সে। তার পর মোড়ার উদ্দেশে বলতে লাগল, ‘আমাগো নেতা, তোমাগো নেতা, জমির আলি, জমির আলি।’ 

সবার মুখের উচ্চারিত কথায় তৃপ্ত হল না তার অতৃপ্ত মন। ভাঙাচোরা ঘরের দিকে তাকাল সে একবার। তারপর চোখের সীমানাকে প্রসারিত করে কল্পচোখে ধরে এনে জমিরকে বসাল মোড়ায়। মোড়ার সামনে নিজের ভেতর থেকে উৎসারিত হয়ে এল নিজের পুরো সত্তা। গর্জন তুলে এবার নিজের মতো করে সে স্লোগান তুলল ‘দেশের নেতা, মনের নেতা, জমির আলি, জমির আলি।’

৪টি মন্তব্য: