রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

হাবিব আনিসুর রহমান'এর গল্প ; ভাঙন

শরতের শান্ত একটা সকাল। চারদিকে ঝিরঝিরে হাওয়া। নিথর আকাশটার গভীরে নীল রং। সেই নীলের নিচেই ভাসছিলো সাদা মেঘের খ-। 

রেল স্টেশনে আসা লোকাল ট্রেনটা ছেড়ে গেলো এইমাত্র। স্টেশনের বাইরে যেখানটায় ডাস্টবিনে নোংরা উপচে পড়েছে- কাকগুলো কা কা করে উড়ছে আর বসছে- দুটো লোমহীন নেড়ি কুকুর পচাগলা দুর্গন্ধময় বস্তুগুলোকে পাহারা দিচ্ছে- তার পাশেই ইট বিছানো রাস্তার ওপর আট-দশজন দুস্থ মানুষের একটা দল এসে থেমে গেলো।
সারা রাতের রেল ভ্রমণের ঝক্কি ঝামেলার বয়ান দিচ্ছিলো তারা। দলের মধ্যে সবচেয় বয়স্ক যে ব্যক্তি তার হাতে একটা বাঁশের বাখারি, চুলদাড়ি পেকে কাশফুলের মতো সাদা। একজন বুড়িও রয়েছে দলে, সে অসুস্থ। হাড্ডিসার একটা দেহ। তার চোখজোড়া বিবর্ণ, সে হাঁপাচ্ছিলো, হাঁটতে পারছিলো না। তার অসুস্থতার জন্যেই এই থেমে যাওয়া। দলের শিশু-কিশোর-প্রৌঢ় সবার হাতেই কিছু না কিছু জিনিস। যা একটা ভাসমান পরিবারের জন্যে জরুরি। ময়লা ছেঁড়া কাঁথা-কম্বল দড়ি দিয়ে বাঁধা। তল্পিতল্পার সাথে পুরনো আমলের রঙচটা লকঝকে একটা টিনের বাক্স, তার সাথে বালতি-বদনা-হাড়ি এসব টুকিটাকি। এই অঞ্চলের মানুষের সাথে ওদের কথার মিল নেই। পথচলতি লোকের কাছে ওরা দূরদেশ থেকে উঠে আসা ভাসমান মানুষ। দলটির পরিচালকের বয়স বছর চল্লিশেক হবে। নাম তার সদু মিয়া। বাখারি হাতে চুলদাড়ি পাকা বুড়োটা সদুর বাবা, নাম বদরুল ওরফে বদু, বদুবুড়ো। অসুস্থ বুড়ি সদুর মা। আরও আছে সদুর বউ, ওদের চারজন ছেলেমেয়ে আর সদুর বোন রুকি, স্বামী যাকে তালাক দিয়েছে। 

সদুর পরনে বহুদিনের প্রাচীন একটা মোটা কাপড়ের ফুলপ্যান্ট। প্যান্টের ডান পা’টা হাঁটুর নিচ থেকে কাটা। খালি পা। শরীরে জামা-কাপড় কিছু নেই। সদুর কালো উদোম শরীরের হাড়গুলো কটমট করে তাকিয়ে আছে। পেটটা যাদুঘরে রাখা প্রাচীন মমির চামড়ার মতো লেপ্টে আছে শরীরে। ওর মধ্যে খাবার পড়েনি পুরো দেড় দিন। কাটা ফুলপ্যান্টের নিচে বেরিয়ে আসা পা’টাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন নিষ্প্রাণ কালো একটা লোহার শাবল। সদুর মাথার ওপরে উস্কোখুস্কো কাঁচাপাকা চুল, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। 

ট্রেন থেকে নেমে আসার পর রাস্তার ওপর অসুস্থ মাকে রেখে রিকশা ভ্যানের অপেক্ষা করছে সদু। সে সময় সদুর বুড়ো বাবা ব’লে উঠলো, ‘সদু যা কোরবু ত্বরায় করি কর, তোর মার শরীলটা ব্যাজায় খারাপ।’ সদু তার ক্ষুধার্ত ছেলেমেয়েগুলোর দিকে একবার তাকালো। তারপর বললো, ‘যাওছে বাবা।’ ইট বিছানো রাস্তাটা ধরে সে চলে গেলো রিকশা ভ্যান ডাকতে। একটু বাদেই সে বিষাদে ভরা মন নিয়ে ফিরে এসে বেশ জোরেসোরেই বলে চললো, ‘এ্যালা কি করিম বাবা, ভ্যানঅলার ঘর জনে জনে চার টাকা করি চায়, বাহারালী তো কয়াই দিছে তিন টাকার বেশি দিমু না।’ বুড়ো বললো, ‘হামরা নয়া মানুষ ট্যার পাছে তাই এদুন দর হাঁকাইছে, হাঁটি গেলিই পারনো হয়। তোর মাওতো অসুকঅলা মানুষ, অই হাঁটপি কেমন করি।’ সদুর অসুস্থ মা একটু একটু কাঁপছিলো, কাঁপা গলায় সে ছেলেকে বলে উঠলো, ‘সদু বাবা, মোর তিয়াস পাইছে, এ্যাকনা পানি খাওয়াবু?’ মায়ের আকুতিমাখা অনুরোধে সদু ব্যস্ত হয়ে পড়লো। প্যান্টের পকেটে রাখা পলিথিনের ব্যাগ থেকে দু’টো টাকা বের করে তার ছেলেকে দিয়ে বললো, ‘আব্বা এক দৌড়ি এস্টেশোনত যেয়া একটা উটি নিয়্যেই মুই পানি আনোঙছে।’ বদনা হাতে সে দ্রুত ছুটলো পানি আনতে। রুটি আর পানি এসে পৌঁছুলে সদুর বাবা তার স্ত্রীর মুখে রুটি ছিঁড়ে দিতে লাগলো। বদনার নলটা মুখে ধরতেই তৃঞ্চার্ত বুড়ি চো চো করে পানি খেতে লাগলো। বুড়ো বললো, ‘খেয়া নে, খাইলে শরীলত বল হইবে।’ সারারাত রেল ভ্রমণের ঝক্কিতে বুড়ি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অদ্ভুত এক করুণ আর্তি নিয়ে বুড়ি তাকাচ্ছিলো স্বামীর মুখের দিকে। স্বামীর অনুরোধে সে রুটি খেতে চেষ্টা করলো। দলের ছোট্ট ল্যাঙটা শিশুটা বুড়ির মুখের রুটির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো। বুড়ো শিশুটাকে কাছে ডেকে বললো, ‘তুই উটি খাবু? নে তুইও একনা খায়া নে।’ শিশুটার হাতে এক টুকরো রুটি দিলো বুড়ো। বুড়ি হিক্কা তুলতে লাগলো। ওখানেই রাস্তার একপাশে শুয়ে পড়লো সে। দেখে বোঝা যাচ্ছে তার অবস্থা বেশ খারাপ। এর মধ্যে সদু দু’টো ভ্যান এনে হাজির। চানগাঁও যেতে জনপ্রতি সাড়ে তিন টাকা করে নেবে। ভ্যান আসতেই সদুর ছেলেমেয়েগুলো তাড়াহুড়া করে যে যার ইচ্ছা মতো ওপরে উঠে বসলো। সদু ওর মাকে পাঁজাকোলা করে উঠাতে যাচ্ছিলো ভ্যানের ওপর। বুড়ি হাত নেড়ে ইশারায় নিষেধ করলো। সদু আদর মাখানো কণ্ঠে ওর মাকে বললো, ‘মা ভ্যানোত্ চুপচাপ শুতি থাকপু, এ্যাকনা পরেই আমরা চানগাঁও চলি যামো।’ বুড়ি অতি কষ্টে হাত নেড়ে আবার নিষেধ করলো ছেলেকে। মৃত মাছের মতো বিবর্ণ চোখ দুটো খুলে তার স্বামীর হাত ধরতে চাইলো। বদু বুড়ো স্ত্রীর হাত দুটো জড়িয়ে ধরলো। গভীর মমতায় বললো, ‘তোর কী খুব কষ্ট হছে সদুর মাও?’ বুড়ো ভয়ার্ত কণ্ঠে ছেলেকে ব’লে উঠলো, ‘ভ্যান ফিরিদে সদু, তোর মাও ব্যাজায় ছটপটাইছে।’ ওদেরকে গালিগালাজ করে ভ্যান দু’টো চলে গেলো। বুড়ি খুব কষ্টে স্বামীর মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কিছু যেন বলতে চাচ্ছিলো ধীরে ধীরে তার চোখ দু’টো বন্ধ হয়ে এলো। পাশে বসে থাকা বুড়ির মেয়ে রুকি বললো, ‘বাবা, মা বুঝি মরি গেইল? ‘কইস কি’- চিৎকার করে উঠলো বুড়ো- ‘রুকি, নাকের কাছোত হাত দিয়া দ্যাখতো নিকাশ ন্যায় কিনা।’ বুড়োর চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছিলো। রুকি ওর মায়ের নাকের কাছে হাত ঠেকালো, বুকের ওপর কান লাগিয়ে দেখলো কোথাও জীবনের স্পন্দন আছে কিনা। না! নিথর দেহ, কোথাও কোন শব্দ নেই। মা বলে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো রুকি আর সদু। 

স্টেশনে মানুষ যাচ্ছে আসছে। 

এইসব ভাসমান গরিব মানুযগুলোর দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না কখনো। আজকাল এ ধরনের মানুষ স্টেশনে, এখানে ওখানে অহরহ পড়ে থাকে। কিন্তু এখন ওদের কান্না শুনে পথচলতি লোকগুলো দাঁড়িয়ে গেলো কৌতূহলে। বুড়ো বদু মিয়াকে একজন জিজ্ঞাসা করলো, 

‘তুমার বাড়ি কোতি?’ 

‘হামার বাড়ি! হামার বাড়ি কোনঠে? হামার তো বাড়িঘর নাই বাবা।’ 

‘বাড়িঘর নাইতো আইলে কোন্থে?’ 

এইমাত্র মৃত স্ত্রীর লাশ সামনে রেখে বুড়ো বলে বললো, 

‘বাবা, বাড়ি হামার ফুলছড়ি-গাইবান্ধা, বাড়িঘর সউগ শ্যাস- যমুনার প্যাটোত, হামারা এ্যালা আস্তার ফকির, হামার ঘরও নাই, বাড়িও নাই। বাতাসে বাতাসে ভাসি বেড়াই। চানগাঁওত মোর ভাতিজা বাহারালী আসি নয়া বাড়ি কোচ্চে, হামরা অর ওটে যামো।’ 

সদু তখন বিলাপ করে কাঁদছিলো, ‘মা তুই আস্তাত মল্লু, কাপন পামো কোটে, তোর গোরেইবা দেই কোটে, মাবুদরে এ্যালা কি কোরঙ! ল্যাঙটা ছেলেটাকে কোলে নিয়ে সদুর বউ বিলাপরত স্বামীর মাথায় হাত রেখে স্নেহ কণ্ঠে সান্ত¦না দিলো, ‘কান্দি আর কি হইবে, হামার অদিষ্টোত যা আছলো তাই হইছে, তোমরা ভ্যান নিয়াইসো চানগাঁও যেয়াই মার গোর দেমো।’ 

ক্লান্ত সদু চোখ মুছে ভ্যান আনতে চলে গেলো। ভ্যান এসে দাঁড়াতেই সদু ছেলেদের সাথে ধরাধরি করে মায়ের লাশ ভুললো পিছনের ভ্যানটাতে, সাথে তার বাবা। সামনের ভ্যানটাতে বসার জন্যে সদুর দশ-বারো বছরের ছেলেদু’টো কথা কাটাকাটি করছিল। ওরা দু’জনেই ভ্যানের সামনে একই জায়গায় বসতে চায়। ছোট ছেলেটা কিছুতেই বড়টাকে তার পাশে বসতে নেবে না। এই নিয়ে ধাক্কাধাক্কি। মায়ের মৃত্যুতে সদুর মনটা শোকাহত, ছেলে দুটোর কা- দেখে ওর মাথায় রক্ত উঠে যায়। ভ্যান থেকে নেমে গিয়ে আচমকা দু’জনের গালে ঠাস ঠাস কষে দুটো চড় বসালো-‘ইবলিছের ব্যাটা, এই সময় কুয়ারা করেনছে, মরা দাদির নাশটাও কি দেখিস না।’ বড় ছেলেটা আচমকা মারের ঠ্যালায় থতমত খেয়ে যায়। সে বলে, ‘ঝড়–তো অর পাশে মোক ন্যায় না।’ সদুর চোখজোড়া লাল রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো। সে ছোট ছেলের কান ধরে বললো, ‘তুই অক ক্যানে ন্যাইসনা?’ গোঁয়ার ঝড়– বেশ রেগেই জবাব দিলো, ‘অই খালি বাই ছাড়ে, খালি বাই ছাড়ে।’ ঝড়–র জবাব শুনে সদু মিয়া নির্বাক হয়ে যায়। অসুস্থ মা কি ওদের কাছে বোঝা হয়ে ছিলো? মায়ের মৃত্যুতে ওদের মধ্যে শোকের ছায়া কোথায়? নাকি সারারাত কিছু খেতে না পেয়ে ছেলেগুলোর মেজাজ বিগড়ে গেছে। কিছুই বুঝতে পারে না সদু। রাগে শোকে আর ছোট ছেলের অদ্ভুত অভিযোগে স্রেফ বোকা বনে যায় সদু। 

সকালের রূপটা তখন ওদের কাছে বিষণ্ন দুঃখ আর বেদনায় ভরা। কিন্তু সূর্য উঠেছে, নিয়মের কোন হেরফের হয়নি চারপাশে। কচি রোদ এসে পড়েছে গাছের সবুজ পাতাগুলোর ওপর। ভেড়ামারা শহরের পাশ দিয়ে এগিয়ে চললো ভ্যান দুটো। ওপরে ক’জন ক্ষুধার্ত পীড়িত অর্ধ উলঙ্গ ভাসমান মানুষ আর একটা লাশ। ক্রমশ শহর ছেড়ে সেচ প্রকল্পের খালের ধার দিয়ে ওরা চানগাঁওয়ের দিকে ছুটে চললো। 

খালের দু’পাড়ে সাদা কাশফুল আহ্লাদে গড়াগড়ি যাচ্ছিলো একটার ওপর আর একটা। পাশের বাবলা গাছে একটা ঘুঘু একাকী ডেকে চলেছে। ওরা চানগাঁও বস্তিতে পৌঁছে গেলো। সেখানে পৌঁছেই সদু খুঁজে বের করলো বাহারালীকে। বাহারালী ওর চাচাতো ভাই। বয়সে ছোট কিছুদিন আগে সে তার বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে এখানে খালের ধারের সরকারি জমিতে ঘর বেঁধেছে। সে ঘরামির কাজ করে। সে-ই সদুকে এখানে আসার পরামর্শ দিয়েছিল। বাহারালী ভীষণ করিৎকর্মা লোক। বস্তির মানুষগুলোকে ডেকে বললো, ‘মোলবীক ডাকি আনো, হামার বড়মা’র গাউ ধোয়ের নাগবে, জানাজা পড়েন নাগবে।’ বস্তির যুবকগুলোকে পাঠালো কাফনের কাপড়ের টাকা যোগাড় করতে। কবর খোঁড়া হলো। জানাজা হলো। দুপুরের আগেই সদুর মা’র দাফন সম্পন্ন হলো। 

বাহারালী কাজের লোক। খালের পাড়ে সরকারি জমিতে যে বস্তিটা গড়ে উঠেছে তার অধিকাংশ লোকই সুদূর ফুলছড়ি থেকে এসেছে। ওদের ওপর বাহারালীর প্রভাব আছে বেশ। সদু ওর বাবাকে একটা বাঁশের মাচার ওপর বসিয়ে রেখে বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে কাজে নেমে গেলো। আজ রাতের মধ্যে যে করেই হোক একটা ছাপরা ঘর দাঁড় করাতেই হবে। তা না হলে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সদুর পরিবারকে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হবে। সদুর বাবা বদু বুড়ো পাশেই বাঁশের মাচার ওপর বসেছিলো চুপচাপ। ঝোঁপঝাড় আর গাছপালার ওপর দিয়ে তার দৃষ্টি প্রসারিত হলো দূরে, সম্মুখে ভেসে উঠলো আবছা দিগন্ত। রাশি রাশি সবুজ ধানের চারা, বিস্তৃত শষ্যক্ষেত। ঠকঠক শব্দ ভেসে এলো তার কানে। বাঁশ কাটার শব্দ। তার ছেলে আর নাতিরা বাঁশ কাটছে দ্রুত হাত চলছে ওদের। দুপুর গড়িয়ে গেলেও ক্ষুধার্ত শরীরে ওরা কেউ কিছু খায়নি। বিকেলের দিকে বাহারালীর বউ ওদের সকলকে শাক-ভাত খাওয়ালো। তৃপ্তির সাথে খেয়ে ওরা আবার কাজে লেগে গেলো। 

সদু পরিবারের সবাই যখন ঘর তৈরির কাজে ব্যস্ত বদু বুড়ো তখন শুয়ে শুয়ে উথালপাতাল ভাবছিলো। সন্ধ্যায় নীল আকাশের চাঁদের আলো পাশের খালের পানিতে গিয়ে আছাড় খেলো। বুড়ো হঠাৎ উঠে বসলো মাচার ওপর। ওর অন্তরটা তখন বিশাল শূন্য আকাশের মতো ফাঁকা। শুধু সে-ই অনুভব করছে সদুর মার অনুপস্থিতি। একটা শোকাহত হৃদয় নিয়ে সে একাকী ভাবছিলো আজ দুপুরে কবরে মাটি চাপা দিয়ে আসা ফুলির কথা। ফুলি ওর স্ত্রীর নাম। জীবন থেকে বহুকাল আগে যেসব ঘটনা ঝরে পড়েছে দুর্বল স্মৃতিতে তাদের নতুন করে ফিরিয়ে আনতে লাগলো সে। বড্ড ধূসর হয়ে এসেছে সেসব ঘটনা। তবুও সবার অলক্ষ্যে বুড়ো স্মৃতি খুঁড়ছিলো। একাকী। ফুলি... অপরূপা সুন্দরী- মায়াবী দু’টো চোখের ওপর কালো ভুরু- যৌবনে ভরপুর শরীর- মনটা যমুনার ঢেউয়ের মতো চঞ্চলা। টুকটুকে লাল শাড়ি পরা ছোট্ট বউ। নাকের ডগায় একটা নোলক ঝুলতো সবসময়। বাসররাতে একটা আনাড়ি যুবকের মতোই নারী দেহের আশ্চর্য রহস্যটা উন্মোচন করেছিলো বদু। বিবাহিত জীবনে দুর্বার এক প্রেমের আকর্ষণে তাকে জড়িয়ে ফেলেছিলো ছোট্ট ফুলি। একটা রাতের কথা এখনো মনে পড়ে যায়, ভুলতে পারে না বদু। গভীর রাত। সে রাতটাও এমনি সাদা চাঁদের আলোয় ভরা ছিলো। একটু দূরেই যমুনার বিশাল তরঙ্গ ছুটছিলো শাঁ শাঁ শব্দে। বদু ঘুমন্ত স্ত্রীর ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছিলো পরম ভালবাসায়। ফুল ফোটার মতোই ঘুম ভেঙে চোখ মেলেছিলো ফুলি। অবাক চোখে ব’লে উঠেছিলো, ‘ফির আসনেন! এ্যালাইনা কননেন? পাল দ্যায়া ষাঁড়?’ পরম আহ্লাদে ফুলির বুকে মিশে গিয়েছিলো বদু। এখন অজস্র মৌমাছির মতো স্মৃতিরা ছুটছে ওর দিকে। যমুনা পাড়ের ফুলছড়ি। যুবক বদু সারাদিন লাঙল চালায়। মাছ ধরে। সবুজ ধানের ক্ষেতে বাতাসের সাথে খেলা করে। বড় পাল তোলা নৌকা ভাসে যমুনার বুকের ওপর। ভোঁ ভোঁ শব্দ করে স্টিমার ছাড়ে। নদীর পাড়ে শিমুল গাছে টুকটুকে লাল ফুল ফোটে। ফুলি পোয়াতি হয়। সংসারে নতুন মুখ আসে। ছেলে হয়েছে তার। আনন্দে নাচতে থাকে তার মন। হাটে-বাজারে মানুষে শুধায়- বাড়ি কোনঠে বাহে? বদু বুড়ো বাঁশের মাচার ওপর শুয়ে বিড়বিড় করে বলে বলে যায়- বাড়ি ফুলছড়ি, এলগাড়ি হুস হুস করি আইসে, ইস্টিমার ঘাটোত্ কত মানুষ আইসে চলি যায়, লাল সাট পরা কুলিরঘর মাল তোলে, মাল নামায়, ঘাট ভাঙ্গে, নয়া ঘাট বানায়, হামরা যখন বানোত ভাসি তখন কতো নেতা আইসে হামার ওটে, নেতারা হামাগ ইলিপ দ্যায়, চাউল দ্যায়, ভোটোত্ খাড়াইয়া কয় বাঁত (বাঁধ) করি দিবে হামার আর কুনুদিন বাড়ি ভাংগির নাগবে না...। বদু বুড়ো স্পষ্ট দেখতে পায় ওর জন্মভূমি, রক্তের সাথে মিশে আছে যে নাম ফুলছড়ি- ফুলছড়ি ভাঙে, যমুনার গর্ভে হারায়-ওর দোচালা টিনের ঘর, জমিজমা গিলে ফেলে রাক্ষুসী যমুনা-একাকী মাচার ওপর শুয়ে থাকা বুড়োর শরীরটা একটু কেঁপে ওঠে- বুকের গভীরে ব্যথা অনুভূত হয়। মনে হয় সে ঝপ্ করে তলিয়ে যাবে বিশাল যমুনার অথৈ পানিতে! 

বদুবুড়োর চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেছে, সে উঠে বসে, ক্ষীণ দৃষ্টি নিয়ে সে দূরে তাকায়, এখনও সদু তার বউ আর ছেলেদের নিয়ে কাজ করে চলেছে, গাছের ডালপালা আর বাঁশ কাটার শব্দ ভেসে আসে তার কানে, হাতের বাখারিটা শক্ত করে ধরে কাঁপতে কাঁপতে সেদিকে হেঁটে যায় বদুবুড়ো! 




লেখক পরিচিতি

হাবিব আনিসুর রহমান- এর জন্ম ১৯৫৪ সালের ৬ জানুয়ারি মেহেরপুরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে দশ বছর অধ্যাপনার মাধ্যমে শিক্ষকতা জীবনের শুরু হয় পরে কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর নেন। প্রথম গ্রন্থ গুলেনবারি সিনড্রোম ও অন্যান্য গল্প, পাঠক সমাবেশ থেকে প্রকাশিত। গল্প উপন্যাস মিলিয়ে এ পর্যন্ত তার ষোলটি গ্রন্থ প্রকাশিত। হাবিব আনিসুর রহমান তার গল্পে অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষের কথা তুলে আনেন পরম মমতায়। তিনি প্রধানত মানুষের জীবনের কিছু মুহূর্তকে-- যেগুলো অন্যান্য গুরুত্বহীন, ঘটনাহীন, উত্তেজনাহীন মুহূর্ত থেকে আলাদাভাবে অভিজ্ঞাত এবং অনুভূত হয় তা স্বরণীয় করে রাখেন।

1 টি মন্তব্য:

  1. সেই নীলের নিচেই ভাসছিলো সাদা মেঘের খন্ড- তৃতীয় লাইনটি এমন হবে।

    উত্তরমুছুন