রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

অনির্বাণ বসু'র বসুর গল্প : বাঘ

...প্লেগ রোগের বীজাণু কখনও মরে না বা বিলুপ্ত হয় না। কয়েক দশক পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকতে পারে, আসবাবপত্রের ভিতরে, কাপড়-চাদরের ভিতরে, ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করে ঘরে, মাটির নীচের ঘরগুলিতে, তোরঙ্গে, বইয়ের তাকে—তারপর একদিন মানুষকে শিক্ষা দেবার জন্য, তার সর্বনাশ করবার জন্য—সে আবার ইঁদুরগুলিকে ঘুম থেকে জাগিয়ে এক সুখী শহরের রাস্তায় মরতে পাঠায়।
..................................................................................................................
আয়নার সামনে দাঁড়ালে আয়নায় বাঘ দেখে নিরো। আয়নার ভিতর বাঘ। বাইরে হয়তো চিরুনি হাতে নিরো। ঝুলে-আসা গোঁফের দু'দিক ঝুলে গিয়ে দাড়ির সঙ্গে জোড়ে যেখানে, সেখানটা পাকায়। মুচড়ে তোলে উপর দিকে। খোঁচা না-হলেও অনেকটা কাছাকাছি।
সাদা-কালো গোঁফ। চিরুনি বুলোতেই আবার যে-কে-সেই। বাঘটা তখন আয়না জুড়ে চিরুনি বুলোয়; গোঁফে। আয়নায় মুখের সঙ্গে-সঙ্গে বড়ো হয়ে ওঠে একটা দশাসই থাবা। নিরোর চোখ টানাটানা, কাজলহীন; বাঘটার চোখে গাঢ় কাজলছাপ। ভরা-পেটে ঢেঁকুর তুললে নিজের কানে কেমন-যেন বাঘের ডাক বলে মনে হয় তার। আয়নায় তাকিয়ে মুচকি হাসলে বাঘটার উপরের পাটির কষের লম্বা দাঁত দুটো ঝলকে ওঠে। হলদেটে ছোপ দাঁতের ঝিলিক দেখে হো-হো হাসে নিরো; নিজের কানে প্রতিধ্বনি শোনে : হালুম। 

বছর দুয়েক হবে নিরোদের মফস্বল শহর থেকে অ্যান্টেনা হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। ধাতব সরু পাতের বদলে কালো-কুঁদো তার টেনে আনছে বহির্বিশ্ব। সাদা-কালো টিভিগুলোয় চ্যানেল আসে না বেশি—ওগুলোও বদলে গিয়ে পর্দা পুরো ঝক্কাস। লোকাল কেবলে রোজ নতুন-নতুন সিনেমা। নিরোর বাবা দেখলে অবশ্য নিউজ চ্যানেলই দেখেন; খুব-একটা টিভির নেশা তাঁর নেই। নিরো দুপুরে বাড়ি থাকলেও সিনেমা দেখে না মোটে; যদিও বাবার বারণ নেই, যদিও কলেজের বন্ধুরা হরবখত নতুন-দেখা সিনেমা নিয়ে কথা বলে—তবু সে দেখে না। নিরোর ধরাবাঁধা চ্যানেল ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক; তাও সবসময় নয় : কখনও হয়তো দেখল বাঘ নিয়ে কোনও প্রোগ্রাম চলছে, ব্যস্, বসে পড়বে। বাঘ বলতে অবশ্য রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার শুধু। কখনও-সখনও চিতা কিংবা জাগুয়ার কিংবা লেপার্ড নিয়ে কিছু সম্প্রচারিত হলে দেখে ভ্রূ কুঁচকে—একপ্রকার বাধ্য হয়েই। তবে প্যান্থার তার একদমই পছন্দ নয়। তার সিধে বক্তব্য : বাঘের গায়ের রং হলুদ ছাড়া অন্য কিছু হতেই পারে না! 

মাস সাতেক আগে থেকে সরকারি অফিস-কাছারি, ব্যাংকগুলোয় কম্পিউটার ঢুকতে শুরু করেছে। কর্মী সংকোচনের আশঙ্কায় দু'-একটা বিক্ষিপ্ত মিছিলও হয়েছে এদিক-ওদিক। নিরোর বন্ধুরা কিন্তু কম্পিউটার নিয়ে উল্লসিত। ওদেরই মধ্যে একজন, অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলে, একদিন দুপুরে, বাড়ি ফাঁকা থাকার কারণেই হয়তো-বা, ডেকে নিল নিরো ও অন্য বন্ধুদের। চাঁদি-ফাটা রোদ্দুরে ঘেমে-যাওয়া সাইকেল আর বন্ধুর দল এসে জুটল সেই বন্ধুর বাড়ির দোতলায়। ডিজাইনার টেবিলের উপর সাদা রঙের চারচৌকো বাক্স বসানো; টিভির মতো অনেকটা, তবে তুলনায় ছোটো। বন্ধুটি সামনে নিয়ে গেছিল ওদের, কোনটা সিপিইউ, কোনটা ইউপিএস, কোনটাকে ফ্লপি বলে, কীভাবে সিডি ভরলে হবহু টিভির মতোই দেখা যায় সিনেমা—বুঝিয়ে দিচ্ছিল একে-একে। সেদিন অবাক হয়ে-যাওয়া নিরো এরপর দেখেছিল বন্ধুটি স্কুলব্যাগ থেকে বের করে আনছে একটা স্বচ্ছ প্ল্যাস্টিক। সেই প্ল্যাস্টিকের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে দু'টি চাকতি : একটায় সম্পূর্ণ উদোম গা দুই নারী-পুরুষ একে-অপরকে জড়িয়ে ধরে, অন্যটায় তিনখানা মুখ : বড়োচুলের একটি পুরুষ, একটি মহিলা আর তৃতীয়টি একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। চাকতির গায়ের লেখা থেকে সিনেমাটার নাম জেনেছিল নিরো : 'জুনুন'। 

তারপর থেকে বহুদিন সিনেমাটায় বুঁদ হয়ে ছিল নিরো। প্রত্যেক পূর্ণিমার রাতে রাতের খাওয়া সেরে নিজের হাতের চেটো চাটত সে, যেভাবে বাঘ নিজের থাবা চাটে। 

আজকাল পাগলের মতো সরকারি চাকরির পরীক্ষা দেয় নিরো। বাড়ি-বাড়ি গিয়ে টিউশন কয়েকটা। লজঝরে একটা সাইকেল। বাবা মারা যাওয়ার পর হঠাৎ একদিন, সে যখন কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে, তার মা বেমালুম গায়েব হয়ে যান। ওর বাবার অফিসেরই কোন-এক কলিগের সঙ্গে পগারপার—পাড়ার লোকেরা, ক্লাবের ছেলেরা বলেছিল। নিরো প্রতিবাদ করেনি, এমন-কি, কোনও উত্তরও দেয়নি কখনও। কী থেকে কী করে কী হল, সে জানবে কীভাবে! আর জেনেই-বা কী হবে! রাতে ঘুমোবার আগে দু'কামরার ঘরের ভিতর সাইকেলটা ঢুকিয়ে রাখে। এ-পাড়ায় চুরি বিশেষ-একটা হয় না, যদিও সাবধানের মার নেই। যে-রাতগুলোয় সচরাচর ঘুম আসতে চায় না, সেই-সেই রাতে সাইকেলটা ঠেলে, বগলের তলায় চাগিয়ে কোনওমতে আয়নার সামনে নিয়ে আসে সে। মেঝের নেটসিমেন্ট দেওয়ালের যেখানটায় এসে শেষ হয়, যেখান থেকে রঙের পোঁচ, তার হাত খানেক উপর থেকে প্রায় ছয় ফুটের আয়না। ড্রেসিংটেবিল ছিল না বলে বিয়ের পর-পরই এত বড়ো আয়নাটা এনে লাগিয়ে ছিলেন নিরোর বাবা; মেয়েমানুষ একটু-আধটু ভালোই বাসে সাজতে। তা বাদে শাড়ির কুচি ঠিক করতে গেলেও বড়ো আয়নার প্রয়োজন। দু' কামরার ঘুপচি বাড়িটার ভিতরের আর-সবকিছুর সঙ্গে এই মস্ত আয়নাখানাও আজ নিরোর। আয়না জুড়ে এখন শুধুই নিরো। কখনও-কখনও সাইকেল। আর রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। 

মাঝে-মাঝেই ঘুম-না-আসা রাতগুলোয় ওইভাবে টেনেটুনে সাইকেলখানা আয়নার সামনে নিয়ে এসে তাতে চড়ে বসে নিরো। এমনই এক রাতে যখন তার ডান পা সাইকেলের প্যাডেলে আর বাঁ পা লাল মেঝেয়, আয়নায় তাকিয়ে সে দেখেছিল বাঘটা রীতিমতো স্যুটেড্-বুটেড্ বসে আছে বড়ো ইঞ্জিনওয়ালা একটা মোটরবাইকে। প্রচণ্ড হাওয়ায় খোলা জানলাটা কয়েকবার আছাড়ি-পিছাড়ি। আয়নায় দেওয়াল-ক্যালেন্ডারের ছটফট। ওটা যে আসলে তারই ঘরের দেওয়ালে ঝুলছে, এতদিন নিরো তেমনটাই জেনে এসেছে; কিন্তু সে-রাতে আয়নায় ক্যালেন্ডারের আন্দোলন অচেনা ঠেকায় সামান্য ঝুঁকে, চোখ দুটো সরু করে পড়তে চেষ্টা করেছিল—যতটা পড়া যায়। অপরিচিত অক্ষরের ওঠা-নামার মাঝে মাত্র একবারই কালো অক্ষরগুলো টকটকে লাল রঙে ফুটে উঠলে, ইংরেজি হরফে তার সামনে বড়ো হয়ে উঠেছিল একটা তারিখ : সাতাশ ফেব্রুয়ারি উনিশশো তেত্রিশ; আর তখনই তার চোখে পড়েছিল বাঘের সামনের বাঁ পা জুড়ে, যা বাইকের ক্ল্যাচ্ ছুঁয়ে ছিল, বিশাল এক স্বস্তিক চিহ্ন। আয়না জুড়ে তখন শ্বাপদের চলা-ফেরা, রাস্তা জুড়ে উভলিঙ্গ ফুল—পরশুরামের কুঠার বিক্রি হল বিনামূল্যে; নিরো বাঘ দেখছে। দাউদাউ আগুন দেখছে : রাইখস্ট্যাগের শরীর ঘিরে তখন অনির্বাণ বহ্নিশিখা। এক বাঘ থেকে কাতারে-কাতারে জন্ম নিচ্ছে অজস্র-সহস্র বাঘ। তাদের গর্জনে আকাশ-বাতাস মুখরিত। জার্মান মাউজার হাতে স্বস্তিক চিহ্ন বাঘের দল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পুড়তে-থাকা রাইখস্ট্যাগের কোণায়-কোণায়। কেউ বাধা দিতে এলে দশাসই থাবার আঘাত : মাউজার প্রচণ্ড শব্দে উগরে দিচ্ছে বারুদ; মাটিতে পড়ে থাকছে কার্তুজের ফাঁকা খোল; আর মৃত মানুষের দল, যারা সেই মুহূর্তে বাঘেদের শিকার। আবহে তখন জন্মদিন উদযাপনের ইংরেজি গানের ধুন। প্রাসাদোপম ইমারতখানা আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে যেতে মোটরবাইকের উপর বসে-থাকা বাঘটি নেমে এসে আয়না গলে এপারে, যেদিকে সাইকেলের উপর বসে সবটা দেখছিল নিরো, চলে আসে আর তারপর ধীরে-ধীরে নিরোর শরীর ধারণ করতেই এতক্ষণ সাইকেলে বসে-থাকা দর্শক নিরো, সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীন, সাইকেল থেকে পড়ে যায়। 

এই ঘটনার পর থেকে আয়নার সামনে দাঁড়াতে একটু ভয়ই পেত নিরো। তবু অত বড়ো আয়নার কারণেই চোখ চলে যেত মাঝে-মধ্যে; যদিও সাইকেল নিয়ে নিজের মুখোমুখি হতে আর সাহসে কুলোয়নি। তখন রাতে ঘুম না-এলে বালিশটাকে কোলের কাছে আঁকড়ে ধরে ঠকঠক করে কাঁপত সে। ভয় পেত। দারুণ ভয়। মনে হত, এই বুঝি বাঘটা বেরিয়ে আসে আয়না থেকে। ক'রাত একটানা নির্ঘুম যাওয়ার পর মায়ের রেখে-যাওয়া কাপড়ের স্তূপ থেকে একটা ছাপা শাড়ি এনে আয়নাটাকে ঢেকে দিয়েছিল ও। প্রয়োজনের সময়টুকু কাপড়ের একটা দিক সরিয়ে নিত; ওতেই কাজ চলে যেত। 

মানুষ তার নেশার কাছে, আস্বাদের কাছে ফিরে-ফিরে আসে। আয়নায় বাঘ দেখার সাহস না-হলেও বাঘ নিরোকে ছেড়ে যায়নি। মাস গেলে, টিউশনের মাইনে হাতে এলে, নিরো সাইকেল ছুটিয়ে দিত রেলস্টেশনের দিকে। স্টেশনের কাছেই সাইকেল-বাইক-স্কুটার রাখার জায়গা। সাইকেলের জন্য দিন পিছু এক টাকা। সেখানে সাইকেল লক্ করে ট্রেন ধরে হাওড়া। ওখান থেকে বাসে আলিপুর। চিড়িয়াখানা। একটা টিকিট কেটে ভিতরে গলে-যাওয়া কোনওরকমে। ছোটো-পরিবার-সুখী-পরিবারের বিজ্ঞাপনের মানুষগুলোর মতো বাড়ি থেকে টিফিন-কৌটোয় করে-আনা জলখাবার না-থাকায় বাদামওয়ালার থেকে একটা বাদাম আর-একটা ডালমুটের প্যাকেট কিনে নিরো পায়ে-পায়ে এসে দাঁড়াত বাঘের খাঁচার সামনে। পিছনের দিকে সাদা বাঘের খাঁচা। সামনে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। বাঘ আর তার মাঝে লোহার জালের তফাতের সঙ্গে সরু নালার মতো এক পরিখা দূরত্ব। আগে নাকি এত কড়াকড়ি ছিল না; কিন্তু একবার মানসিক ভারসাম্যহীন একটি ছেলে বাঘকে মালা পরাবে বলে খাঁচার ভিতর পর্যন্ত ঢুকে যায় আর বেঘোরে মারা পড়ে। তারপর থেকেই এই নিরাপত্তার বলয়। বাঘের খাঁচার উপর দিকে তাকিয়ে নিরো দেখে, বাঘ আর আকাশের মাঝেও মোটা লোহার গরাদ। সে ভাবে, এই বাঘগুলোকে তবে মাংস দেওয়া হয় কীভাবে; বন্ধুর বাড়িতে কম্পিউটারে একবার একটা বিদেশি সিনেমা দেখেছিল ওরা : 'আন্ডারগ্রাউন্ড', সেখানে তো চিড়িয়াখানার কর্মী-লোকটা খাঁচার উপরের খোলা জায়গা দিয়ে কাঁচা মাংসের টুকরো ছুঁড়ে-ছুঁড়ে দিচ্ছিল আর বাঘটা গন্ধ শুঁকেও সেসবে মুখ দেয়নি মোটে। সেই দৃশ্যটা দেখে তার মনে বাঘ সম্পর্কে দু'টি ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায় : 

১| বাঘের খাঁচার উপরিভাগ উন্মুক্ত থাকবে। 

২| সিংহের মতো বাঘও, খিদে না-পেলে রক্তের গন্ধ পেয়েও মাংসের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেবে; আক্রমণও ফলত করবে না। 

খাঁচার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত নিরো। একমনে লক্ষ করত বাঘেদের প্রতিটি ভঙ্গি। খরচ কমাতে কেবল্ লাইন কেটে দেওয়া হয়েছিল যেহেতু, না-হলে সে জানতে পারত যে এখন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের সঙ্গে এসে জুটেছে অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট—সেখানেও বাঘের দেখা মেলে, স্বভাবতই বাঘ দেখার জন্য এই চিড়িয়াখানাই একমাত্র উপায় হয়ে গেছিল তার কাছে। 

তখন তার জীবন বলতে ঘর আর টিউশন আর চিড়িয়াখানা। এমনই একদিন চিড়িয়াখানা বন্ধের সময় হয়ে গেলে বাইরে বেরিয়ে তার তখনই বাড়ি ফিরতে মন চায়নি। বাঘটার সেদিন একটু বেশিবার গর্জনই তার কারণ ছিল কিনা, সে অতশত তলিয়ে ভাবতে যায়নি, বরং হাঁটতে শুরু করেছিল আপনমনে। হাতে তখনও-শেষ-না-হওয়া সল্টেড্ বাদামের কিছুটা। চিড়িয়াখানা থেকে বেরিয়ে অন্য দিনগুলোয় তার যেমনটা হয়, হাঁটায় একটা আলাদা ছন্দ এসে মেশে, প্রত্যেকটা পা ফেলার সঙ্গে আন্দোলন খেলে যায় শরীর জুড়ে, বাঘের মতোই খানিক, তেমনই দুলকি চালে হাঁটতে-হাঁটতে যখন সে এসে পৌঁছেছিল ধর্মতলার মোড়ে, পুরোপুরি সন্ধে নামেনি তখনও, কিন্তু নেমে পড়তেও বড়ো-একটা বাকি নেই; আর সে দেখেছিল একটা বক খাঁচায় বন্দি—পাশে তল্পিতল্পা গোটাচ্ছে এক জ্যোতিষ। মোটরগাড়ির পোঁ, ট্রামের ঢংঢং, বাইক-স্কুটারের পিঁইই, মানুষজনের কথাবার্তা, কন্ডাক্টরের 'হাওড়া-হাওড়া' কিংবা 'শিয়ালদা-বেলেঘাটা-ফুলবাগান-কাঁকুরগাছি-উল্টোডাঙা' বলে হাঁক—মুহূর্তে থেমে গিয়ে তার কানের পাশে বেজে উঠেছিলেন নিধুবাবু : 'একদা এক বাঘের গলায় হাড় ফুটিয়াছিল'—কীভাবে যেন সে জেনে যায়, বকের খাঁচাটার পাশে দ্রুত হাতে পসরা গোটাতে-থাকা জ্যোতিষীর নাম নস্ত্রাদামুস আর তখনই তার দিকে চেয়ে নস্ত্রাদামুস দাঁত ক্যালানো মাত্র সে দেখে, দাঁতে গুটখার কালচে-খয়েরি ছোপ; নস্ত্রাদামুস বস্তার মুখখানা তার সামনে খুলে ধরলে সে দেখে সুদৃশ্য একটি পাত্রে স্বচ্ছ জল, যার মধ্যে দেবনাগরী হরফে লেখা—ক্লাস সেভেন-এইটে সংস্কৃত পড়ার অতীত তাকে দিয়ে পড়িয়ে নেয়—খ্রিস্টবর্ষ দ্বিসহস্র দ্বিতীয় কাল, চতুর্থ পক্ষ, সপ্তবিংশতি দিবস, গুর্জর প্রদেশ। পরমুহূর্তে দিন-কাল সরে গিয়ে সেই স্বচ্ছতোয়া বদলে যায় সবরমতী নদীতে; দূর থেকে ভেসে আসে ট্রেনের ধাতব শব্দ। গোধরা স্টেশনে কোন-এক ভেলকিবাজিতে আগুন জ্বলে ওঠে ট্রেনের চারটি কামরায়। নিরোর নাকে এসে ধাক্কা মারে মানুষ-পোড়া-গন্ধ। সরে যেতে চেয়েও সরতে পারে না সে, কারণ যেহেতু সেই টলটল জলে প্রবল হয়ে বহু-বহু বাঘের শরীর; ফলত সে দেখে চলে আগামী ইতিহাসের পুঙ্খানুপুঙ্খ। আগুন-লাগা মহল্লার চারপাশ জুড়ে দাপিয়ে বেড়ায় বাঘের দল। এই বাঘেরা আগুনে ডরায় না। আচমকা পিচরাস্তায় পড়ে যায় একটি যুবতী, মাথায় হিজাব, সন্তানসম্ভবা; কিছুমাত্র দেরি না-করে একটি বাঘ এসে কামড় বসায় মেয়েটির তলপেটে। তীব্র গোঙানি, আর্তনাদ। বাঘের রক্তমাখা মুখে উঠে আসে অপক্ক ভ্রূণ। ধর্মতলার মোড়ে একটি ট্রামের তারে ঘষা লেগে বিদ্যুৎচমকের মতো আলো ছিটকে উঠলে, সেই আলোয় নিরো দেখে বাঘের কষের ধারালো দাঁতখানা, যা বিঁধে ছিল অজাত শিশুটির ভ্রূণশরীরে, আদতে ত্রিশূল। 

এই ঘটনার পর থেকে চিড়িয়াখানা যাওয়াটাও ছেড়ে দেয় নিরো। তখন সম্বল বলতে শুধুই আয়না। তার নিজের ভিতরের বাঘটাও কেমন যেন গুটিসুটি মেরে কাগুজে হয়ে উঠতে থাকে। রোজ চায়ের দোকানে বসে খবরের কাগজ পড়ে। দেবেগৌড়া-র পতন পড়ে। এক বাজার লোক হ্যা-হ্যা হাসে, বলে যে, দেবতার ঘোড়া পটল তুলেছে। ইন্দ্রকুমার গুজরাল-এর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খবর পড়ে। নতুন প্রধানমন্ত্রীকে 'চাঁদমামা'-য় পড়া দেবরাজ ইন্দ্রের মতো কল্পনা করে মনে-মনে। এক দুপুরে মারা-যাওয়া মাদার টেরেসার মৃত্যুর খবর পড়ে পরেরদিন সকালে। আয়না থেকে বাঘ বেরিয়ে এলে ক্লাবের জগদ্ধাত্রী পুজোয় প্রতিমার সামনে চেয়ারে একা বসে থাকে। 

এভাবেই শীত এসে গেল। হাইস্কুলের পিছন দিকের বড়ো মাঠটা, যেখানে ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস্ হত, সার্কাসের তাঁবুতে ঢাকা পড়ল। নিরো প্রথম-প্রথম পোস্টার দেখত। স্বল্পবাস তরুণী, ক্লাউন, হাতি, ঘোড়া, ভাল্লুক, জলহস্তী, কাকাতুয়া,...। ছোটোবেলাকার রঙিন বই—জীব-জন্তুর। ক্লাবঘরের সামনের দেওয়ালে, স্কুলের পাঁচিলে—পোস্টার। একদিন সকালে যখন চা খাচ্ছিল সে আর অন্যের হাতে-থাকা খবরের কাগজখানা উঁকি মেরে দেখছিল, ভদ্রলোক পাতা ওলটাতেই কাগজ সরে গিয়ে রাস্তার ওপারের ক্লাবঘরের দেওয়াল ভেসে উঠেছিল তার চোখে। সার্কাসের একটা পোস্টার যা আগে চোখে পড়েনি ওর। গোটা পোস্টারটা জুড়ে একটা বাঘের মুখ, হাঁ-করা। নীচে থ্রি-ডায়মেনশনে সার্কাস কোম্পানির নাম। পোস্টারটার দিকে চেয়ে থাকতে-থাকতেই যেহেতু জেগে উঠেছিল ভিতরের বাঘটা, সে-রাতে নিরো সার্কাস দেখতে গিয়েছিল; শুধু আবারও বাঘ দেখবে বলে। 

এমনি করে প্রায় প্রতিদিন। সাময়িক বদল এসেছিল টিউশনির রুটিনে। সন্ধের পড়ানোগুলো সব উলটে সকালে এসে গেল। সকালে বাড়ি-বাড়ি পড়ানো, অবিশ্রান্ত সাইকেল। সন্ধেয় সার্কাস। খেলা শুরু হওয়ার পর থেকে ধৈর্য ধরে বসে থাকত, বাঘের খেলা কখন আসবে। তারপর শুধু বাঘ আর রিংমাস্টার। এই প্রথম সে দেখল, বাঘকেও কেউ কথা শোনাতে পারে! এভাবেই রিংমাস্টার তার কাছে ভগবান হয়ে গেল। 

নিজেকে মনে-মনে রিংমাস্টার ভাবতে থাকে নিরো। বিকেলের দিকে হাঁটতে বেরিয়ে তাঁবুর কাছাকাছি এসে গেছিল একদিন, খানিক দূরে রিংমাস্টার আর ওই সুন্দরী জিমন্যাস্টকে, বাঘের খেলা শুরু থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত যে নাগাড়ে একটা বড়ো রিং নিয়ে কসরত করে চলে, পরস্পরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। জীবনে প্রথমবার কোনও নারীর প্রতি কামনা জেগে ছিল রিংমাস্টার নিরোর। চকিতে ভেসে উঠেছিল ক্লাস টুয়েলভের মেয়েটির মুখ, গলা, বুক, কোমর। সপ্তাহে দু'দিন করে পড়ানো। ক্লাস নাইন থেকে আজ চার বছর। চার বছরে কী তাড়াতাড়িই-না বড়ো হয়ে গেল মেয়েটা, মনে হয়েছিল নিরোর। তারপর সন্ধে হয়ে আসছে দেখে টিকিট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। 

ফেব্রুয়ারি মাস শেষ হয়ে আসছে। সার্কাস দেখতে যাওয়ার আগে টাকার হিসেব করে নিরো। ক্যালেন্ডার দেখে। আর-একদিন। তারপরই মার্চ পড়ে গেলে টিউশনির মাইনেগুলো পাওয়া শুরু হবে। অনর্থক দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে। গত কয়েক সন্ধের মতোই সার্কাস দেখতে যায়। 

টিকিট কেটে তখনও সার্কাস শুরু হতে কিছুটা দেরি আছে দেখে তাঁবুর আশেপাশে ঘোরে নিরো। এই ক'দিনেও সে জানতে পারেনি ওই সুন্দরী মেয়েটির তাঁবু কোনটা, আর রিংমাস্টারেরই বা কোনটা। 

আপনমনে হাঁটছিল নিরো। হঠাৎ কাছাকাছি এক তাঁবু থেকে একতরফা কিছু চিৎকার কানে আসে তার। কেউ-একজন কাউকে বেশ করে কড়কে দিচ্ছে। শোনবার চেষ্টা করে সে। কীসব কন্ট্র্যাক্টের কথা, শর্ত, অসুস্থতা, ছুটির আবেদন এবং খারিজ। এবং প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই তাঁবুটার ভিতর থেকে উত্তেজিত একটা লোক বেরিয়ে অন্য তাঁবুর দিকে চলে যায়। লোকটা এই সার্কাস কোম্পানির মালিক। প্রতিরাতে সার্কাস শেষ হওয়ার পর উনি এসে দর্শকদের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে ধন্যবাদ জানান। তার ঠিক পরে-পরেই বেরিয়ে আসে রিংমাস্টার। একটু তফাতে গিয়ে সে সিগারেট ধরালে নিরোর ডান হাতখানা সিগারেটহীন অবিকল ঠোঁটের কাছে উঠে আসে। 

সার্কাস চলছে। চারটে ক্লাউন নিজেদের মধ্যে হল্লা করছে। শিম্পাঞ্জি একচাকা সাইকেল চালাচ্ছে অবলীলায়। জলহস্তীর মুখের ভিতর মাথা ভরে দিয়ে আবার বের করে আনছে এক জিমন্যাস্ট। কামানের তোপের উপর বসে কাকাতুয়া ডানা ঝাপটাচ্ছে। রঙিন ফুটবল নিয়ে হাতি ড্রিবল করছে ফাঁকায়। এক প্রান্ত থেকে রিং হাতে সুন্দরী জিমন্যাস্ট ঢুকতেই অন্য প্রান্তে চোখ চলে যায় নিরোর। জিমন্যাস্টের দিকে পিছন ঘুরে হাতে চাবুক নাচিয়ে ঢুকে আসছে রিংমাস্টার। কয়েক হাত দূরত্বে পর্দা-ঢাকা খাঁচা একটা। রিংমাস্টার পর্দা সরাতেই গগনবিদারী গর্জন। ক্লাউনের দল ভয় পেয়ে ছুটোছুটি করতে গিয়ে এ-ওর গায়ের উপর। ত্রাহি ডাক তুলে কাকাতুয়া উড়ে সোজা দাঁড়ে। সামনে-রাখা খাঁচায় ভর দিয়ে এক লাফে ট্র্যাপিজের পাটাতনে শিম্পাঞ্জি। আবার সেই প্রবল গর্জন। রিংমাস্টার খাঁচার দরজা খুলে দ্রুত সরে দাঁড়ায়। হলুদের উপর ডোরাকাটা কালো দাগ। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। এবার বাঘের খেলা। ঠিক এখানে এসেই ইদানীং সবকিছু গুলিয়ে যায় নিরোর : কোনদিকে তাকাবে? জিমন্যাস্টকে দেখবে, না বাঘকে—বুঝে উঠতে পারে না। চোখের মণি একবার বাঁদিকে সরে, পরক্ষণেই ডানদিক। বাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। রিংমাস্টার মাঝে-মাঝে শূন্যে চাবুক মারছে। হাওয়া কেটে আওয়াজ তৈরি হচ্ছে : সপাং সপাং। আবার গর্জন। আবার। আবার। পরপর তিনবার। বাঘ সামনের ডান পা হাওয়ায় আছড়ায় শিকারের উপর থাবা বসানোর মতো। নিরো এসব ভঙ্গি বিলক্ষণ চেনে। বাঘ গুটিগুটি এগোচ্ছে, রিংমাস্টারের চাবুকের ভয়ে ফের পিছিয়ে যাচ্ছে। এক পা এগোতেই শূন্যে চাবুক। বাঘ দু' পা পিছনে। একবার ডানদিক, একবার বাঁদিক—রিংমাস্টার ঘুরছে বাঘের সামনে দিয়ে। বাঘ কয়েক পা পিছিয়ে যাচ্ছে। আচমকা একটা লাফ। রিং তুবড়ে বেঁকে গিয়ে জিমন্যাস্টের নিম্নাংশ বাঘের মুখে। চোয়ালের জোর বাড়াচ্ছে বাঘ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে স্বল্পবসনা সুন্দরী। চিল-চিৎকার। বাঘের পিঠে চাবুক পড়ছে একের-পর-এক। রিংমাস্টারের সঙ্গে আরও-কয়েকজন। প্রত্যেকেই ছাড়ানোর চেষ্টায়। জিমন্যাস্টকে একবারের জন্য ছেড়ে দিয়ে ঘাড় ঘোরায় বাঘ। হিংস্র গর্জন। নিরো বোঝে, কোমর ভেঙে গেছে মেয়েটির। বাঘ এবার থাবা বসায় শিকারের ঘাড়ে। মাথা ঝুলে বুকে ঠেকে যায়। হঠাৎ গুলির শব্দ। ঘুমপাড়ানি গুলি। ব্যথায় কাতরে উঠে গর্জন করে বাঘ নেতিয়ে পড়ে। লোহার জালে মুড়ে ফেলা হয় তাকে। মৃতদেহ সাক্ষী রেখে সেদিনের মতো সার্কাস শেষ হয়। 

পরদিন সকালে চায়ের দোকান জুড়ে গতরাতের কথা। ওয়েল ট্রেনড্ একটি বাঘ কেন হঠাৎ উন্মাদ হয়ে উঠল সেই নিয়ে কূটতর্ক। আলাপ-আলোচনায় ঢুকতে ভালো লাগে না নিরোর। খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে বসে। হেডলাইন দেখে পাতা উলটে যায়। গতরাতের দুর্ঘটনা কাগজে। খুঁটিয়ে পড়ে। তার সামনে গতকালের শেষবিকেল খেলা করে। খবরের কাগজ আর তাঁবুর মধ্যেকার ধমক অসুস্থতাকে পরিষ্কার করে : সুন্দরী জিমন্যাস্ট—রজঃস্বলা—। 

এই মৃত্যুর মাস আটেক পর কেন্দ্রীয় সরকার পেটা আইন লাগু করে, যার মাধ্যমে যাবতীয় প্রাণীসমূহকে ব্যাবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার বা পীড়নের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যদিও সেই সুন্দরী জিমন্যাস্টের মৃত্যু, বাঘের গতিবিধি সম্পর্কে পারদর্শী নিরো এবং আমাদের মতো সাধারণদেরও অবধারিত এই ইঙ্গিতই দিয়ে চলে যে, কখন-কোথায় রক্তের গন্ধ পেয়ে বাঘ আক্রমণ করবে, সে-সম্বন্ধে জানতে উপস্থিত এবং অনুপস্থিত দর্শকমণ্ডলীর এখনও দেরি আছে। 




----------------------------------------------------------------------------------------------------------
ঋণ : আলবেয়ার কাম্যু, মহেশ ভাট, ডেভিড বয়েল, নিধুবাবু, এমির কস্তুরিকা, নবারুণ ভট্টাচার্য, 
পরিচয় পত্রিকা। 

৩টি মন্তব্য:

  1. বহু জনের কাছে ঋণী হয়েও একটি চমৎকার আদ্যন্ত রাজনৈতিক গল্প। ব্যক্তিসত্তার রাজনৈতিক অবচেতনকে(পলিটিক্যাল সাবকনসাস) জাগিয়ে তোলার খেলায় এই আখ্যান যথার্থ অর্থেই পারঙ্গম। লেখককে অভিনন্দন।

    উত্তরমুছুন