রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

তৃপ্তি সান্ত্রা'র গল্প : মুখা নাচ

তো বি পি এল তালিকা তৈরির ডিউটি বুঝলি। ইলেকশন ডিউটি, ভোটের লিস্ট তৈরি, রান্নাবান্না করে বাচ্চাদের খাওয়ানো। এসবের পাশাপাশি বিপিএল তালিকাও তৈরি করবে মাস্টার, বিপিএল তালিকার নিয়ম হচ্ছে এলাকার সব বাড়িতে সরেজমিন যাচাই করে লিস্ট তৈরি করতে হবে। মানে, আমি দেখছি দালান, বিপিএল হবার চান্সই নেই তবু যেতে হবে সেখানে। ছকে যেমন যেমন প্রশ্ন, তা জিজ্ঞাসা করে পূরণ করতে হবে।

আর মজাটা সেখানেই। পাখার তলায় বসে আছি। প্রশ্ন, পাখা আছে—নাই। পাশের ঘরে টিভি আছে—চলছে, আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। নাই। দেখে শুনে আমি নিজে নিজে লিখে নেব তার উপায় নেই। সরল গ্রামবাসী রেজাউল মাস্টার, আমার স্কুলের হেডমাস্টার-ইন-চার্জের বাড়ি। সে এ টু জেট নিয়ম কানুন জানে। বাড়িতে বাইক আছে, নতুন বিল্ডিং-এ ঘর মেঝে টয়লেট সব মার্বেল—তবু সে বিপিএল। আমি বোঝাবার চেষ্টা করছি, এই যে ছেলেকেও বিপিএল দেখাচ্ছেন—ছেলের অল্প বয়স ব্যবসা বাণিজ্য করতে চাইবে নিশ্চয়ই—বিপিএল হলে কিন্তু বিপিএলের মতোই লোন পাবে, সেটা মাথায় রেখেন... 

হ্যাঁ হ্যাঁ আমার সব মাথায় আছে। ছেলেকে ওই বিপিএলেই রাখেন.... 

কী বুঝে যে এসব করা, তা আমার বোধের অগম্য। করব না বললে হবে না, করতেই হবে। না হলে শাসানি আছে—মাস্টারকে গাবিয়ে দেব। গাবিয়ে দেব-বুঝলি তো? সাফ করে দেব। তা চাকরি করতে এসে কে জান খোয়াবে ভাই? তাছাড়া দুনম্বরি কাজ করলে বিবেক দংশনও হয়। আমি এইচ এমকে বললাম, ছাড়ান দেন আমাকে। পার্ট টাইম কাজ করছে যে নজরুল, সে-ই করুক। নজরুল গাবিয়ে দেবার শাসানি খাওয়ার চান্স পায়নি 

কারণ সে নিজে কাজটা করেইনি। অন্য পার্টিকে কাজটা হ্যান্ডওভার করে দিল। মোজাইককে বিপিএল—এইরকম অনেক কালোকে সাদা করার জন্য এইসব পার্টি ভালই কামায়। ফিফটি ফিফটি বা সিক্সটি ফর্টি এইরকম ভাগাভাগিতে নজরুলের আয় নেহাত মন্দ হয়নি। বেচারা আমিই শুধু পারলাম না। গাবিয়ে দেবে এই ভয়ে— 

একটানা কথা বলে অপু থামে। চায়ের কাপ টেনে নেয়। অপুর বাচনভঙ্গি ভারী সুন্দর। চমৎকার গুছিয়েও বলতে পারে। স্থানীয় ভাষাও আয়ত্তে। রুস্তম, বিজন খুবই উপভোগ করে অপুর গল্প। অনেক দিন পর তিন বন্ধু হাসতে থাকে। রাতের মেঘটা কেটে যাবে এই ভেবেই রুস্তম গল্প শুনতে বসেছে। নইলে সকালে গল্প শোনা মোটেও কাজের কথা নয়। পাঁচ দশ মিনিট এদিক ওদিক হলেই পুরো ঘেঁটে যায় দিন। রান্নার দেরি, স্নানের দেরি, কাজে পৌঁছতে দেরি। 

পরীক্ষা শুরু পাঁচ মিনিট আগে হাঁফিয়ে হুপিয়ে কমনরুমে ঢুকে রুস্তম দেখল ১৭ নং ঘরে তার সঙ্গে লিপিকার ডিউটি। লিপিকা অ্যাবসেন্ট। আরও তিন জনও আসবে না জানালেন, তার মানে আজ একাই সামলাতে হবে সব। ইউনিট টেস্ট চলছে—আজই প্রথম দিন। ১৭নং ঘর দোতলায়। এই ঘরের তিনটে পাখার মধ্যে দুটো চলে, একটা চলে না। সেভেন, এইটের মেয়েরা পর পর রোল অনুযায়ী বসেছে কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় ক্লাশ ফাইভ সারা ক্লাশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাট হয়ে আছে। রোল নম্বর অনুযায়ী না বসলে খাতা তুলতে ভারী অসুবিধা হয়। প্রথম কাজ হল রোল ডেকে ফাইভকে ঠিকমতো সাজিয়ে বসানো। তারপর খাতা আর প্রশ্ন দিতে দিতে রুস্তম ঘেমে নেয়ে গেল। কারেন্ট নেই। পাখাও চলছে না। চেয়ারে বসে এতগুলো মেয়েকে সামলানো মুস্কিল, সে দরজায় দাঁড়ায়। ঢাকের আওয়াজ আসছে দূর থেকে। কাছে, এক নাগাড়ে ঢাক বাজলে কানে তালা লেগে যায়। গরমে এই দুরের ঢাকের শব্দটা কিন্তু বেশ লাগছে। কিছু যেন মনে পড়ছে রুস্তমের। কী যেন! 

অপু, সকালে আসায় তার আর বিজনের আকাশের দুর্যোগের ঘনঘটা অনেকটা কেটেছে। দুর্যোগের ঘনঘটা শব্দটি মনে পড়তেই রুস্তমের খুব হাসি পায়। তার সেই কৈশোরে—সে তখন খেলাধুলা আর লেখাপড়ার সঙ্গে খুব অভিনয় পটুও। আর তার পাড়ার দিদিরা—রূপেগুণে আবৃত্তি নাটক নাচে গানে দুর্দান্ত। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা কমিকস: আজ বাংলার আকাশে যে দুর্যোগের ঘনঘটা—কে তাকে আশা দেবে—কে তাকে ভরসা দবে—আমি—আমি—এই অভিনয়টা এমন নকল করে দেখাত রুস্তম অপুদি ঝুনুদি রুমিদিরা হেসে গড়িয়ে পড়ত সবাই। পুজোর কদিন চৌকি আর চেয়েচিন্তে ধুতি আর কাপড় দিয়ে স্টেজ বানিয়ে নাচ গান নাটক আবৃত্তি—স্বপ্নের মতো কটা দিন। রুস্তম বরাবরই একটু ডাকাবুকো। গাছে চড়া। সাইকেলে চড়কিবাজি। এমনকী পুজোর সময় ধুনুচি নাচের সঙ্গে ঢাকও বাজাত সে ঢাকির কাছ থেকে ঢাক কেড়ে নিয়ে। ধুনুচি নাচে বীণাপাণিদি প্রথম আর রুস্তম দ্বিতীয়—রেজাল্টটা মানতে পারেনি রুস্তম। অপুদি বলেছিল—চেপে যা না রুস্তম। বীণাদি বিয়ের পরও নাচছে তাই অ্যাডভান্টেজ বীণাদি। আমরা তো সবাই দেখলাম তুই কেমন নাচলি। সব সময় অত ফার্স্ট হওয়া কী। আনন্দটাই আসল কথা, না? 

তো সেই আনন্দ যথেষ্ট হয়েছে কৈশোরে যৌবনে। টুকরো টুকরো কত ছবি ভেসে আসে—চুল ফোলানোর জন্য গুছি করে বাঁধা অপুদির ঝাঁপানো চুল। শরতে আজ কোন অতিথি নাচতে গিয়ে মিনুর ময়ূরকণ্ঠী রঙের বেনারসি খুলে যাওয়া। স্মৃতি। স্মৃতি। স্মৃতি কালসর্প সম। আবার ক্যাথারসিস। বাঁচিয়েও দেয়। এই যেমন বিজনের সঙ্গে তার সব তিক্ততার রেশ, ফিকে হতে চাইছে দূর ঢাকের বাজনার শব্দে। মুহূর্তের জন্যে হলেও, হচ্ছে তো। 

বিজনটা কী হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। চেহারায় এজিং হয়নি কিন্তু মানসিকতায় একদম তার বাবার জেরক্স কপি। কাল রাতে খাবার টেবিল যুদ্ধক্ষেত্র। কী না মাছের ঝোলটা আলুনি। সকালের মতো নয়। নির্ঘাৎ জল মিশিয়েছে দীপালি। 

বিজন গজগজ করে—এত দামি মাছ। এই রকম ঝোল। সকালে তো ভালোই খেলাম। এ বেলায় কী জল মিশিয়েছে—কী করে কিছুই দেখ না? 

--ডালের একতলা দোতলা। পদ্মার জলের মতো ঝোল, মনে পড়ে বিজন? 

--না। ২০-২৫ বছরের পুরনো কিছু আমার মনে পড়ে না। তখন আর এখন কী একই অবস্থা! পুরোনো কষ্ট ভুলতে পার না? 

কী অদ্ভুত ! বিজন রেগে গেল। কষ্টের দিনগুলোই তো তাদের শ্রেষ্ঠ সংস্করণ—বোঝাপড়ার, সমর্পণের আর অঙ্গরাগের। বিজন সে সব বুঝতে না পেরে কষ্টের ইঙ্গিত করায় খেপে গেল রুস্তম। মাথা খারাপ হয়ে গেল তার। সে চ্যাঁচাল—এখন খুব সুখ তোমার না? ছেলে দুটো বাইরে কী খায় না খায়—নিজে রোজ দামি দামি মাছ খাচ্ছ। একটা দিন অন্যরকম খেতে পার না। পুরোনো কথায় আমার অত দুঃখ হয় না। বেশ ছিলাম তখন। ভাগাভাগি করে থাকার কত মজা। মাঝের ঝোল খারাপ হবার কারণ রুস্তম নিজেই। দীপালির আজ তাড়া ছিল। গরমে এক হাতে কাটা, বাছা, রান্না। একবাড়ি করে এসেছে আরও দু বাড়ি যাবে। হয়তো উঠতে দেরি হয়েছে। হয়তো বরের সঙ্গে বা ছেলের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে বাড়িতে। ওর শুকনো মুখ দেখে রুস্তম বলেছিল, যা পার কর—আমি বিকেলে দেখে নেব। তো মাছের ঝোলটা দীপালি এত কম করেছে, দুবেলা কুলোয় না। রাতে ঝোল বাড়াতে গিয়ে রুস্তম দেখল ফ্রিজে বাটা মশলা নেই এমনকী তার ভঁড়াবে গুঁড়ো মশলাও নেই। একটু টমেটোর রস আদা থেঁতো আর কঁচালঙ্কা দিয়ে জল গরম করে ঝোল বাড়িয়েছিল সে আর তাতেই যত বিপত্তি। 

ডাল, তরকারি সবই আছে—এমন না শুধু ঝোল দিয়েই ভাত খেতে হবে। কিন্তু বিজনের এখন জীবনের সব রস গিয়ে ভর করেছে রসনায়। ভাল খাবার ছাড়া সে কিছু বোঝে না। অফিসের চাপ বাড়ছে, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। হাসিখুশি ছেলেটা কেমন লোক হয়ে গেল কয়েক বছরে। টেম্পার লুজ-খিঁচখিঁচে লোক। 

একদিন একটা ঝোল পাতলা হলে কী হয়! পুরনো সাদাকালো অ্যালবাম দিনগুলোর কথা বিজনের কিছুই কী মনে পড়ে না। রুস্তমের কেন এত মনে পড়ে। তখন যে কোনও বাড়িতে এবেলায় কমপক্ষে দশ বারো জনের খাবার ব্যবস্থা ও বেলায়ও তাই—এতগুলো মানুষের রান্না। গ্যাস নেই, আলো নেই। আজ এতদিন পর চাকরি বাকরি করে দু-চারজনের সংসারের রান্না খাওয়া নিয়ে বিধ্বস্ত রুস্তমের মনে পড়ে উঠোন পেরিয়ে টালির রান্না ঘরে মায়ের দশহাতে সংসার সামলানোর মূর্তি। যেন মহাভারত রচনা করছেন মা। তারা আট ভাইবোন। কুরু নয়। পাণ্ডব নয়। ধর্ম নয় যুদ্ধ নয়। আট হেঁসেলে ছড়িয়ে পড়ার আগে তারা আট ভাইবোন, হাপুস হুপুস খাচ্ছে আইবুড়ো ভাত—এইরকম মনে হয় রুস্তমের। দুবেলায় মোট আঠারো-কুড়ি জন মানুষের আহার জোগাড় করা কী চাট্টিখানি কথা। তার উপর টানাটানির সংসার। বিজনদের বাড়িতেও নিশ্চয়ই ঠিক এমনই ছবি ছিল কিন্তু বিজন তখন হয়ত এমন বইয়ে মুখ গুজে, কোনও অ্যাটাচমেন্ট নেই, স্মৃতিও নেই। রুস্তম কিছু ভুলে যায় না। আবার কিছু ভোলেও। ভোলা না ভোলা নিয়ে কাটাকুটি দিন দীপালির হিমশিম মুখ খুব চেনা তার। মা, শাশুড়ি, বউদি, দিদির মতো। তার মতোও। ভুলে যায় না বলেই কষ্ট। ভুলে যায় না বলেই যা আনন্দ। দোকান কাছেই। গুঁড়ো মশলা কিনে এনে জুত করে ঝোল করা যেত, ইচ্ছে হয়নি। ছোটটার সঙ্গে সন্ধেবেলায় ফোনে কথা বলতে গিয়েই বোঝা গেল তার মেজাজ ঠিক নেই। মানে খিদে পেয়েছে। বললও সে কথা—মা, খিদে পেয়েছে। মেসের মাসি আসেনি। 

-বাইরে থেকে কিছু আন, মিষ্টি, চপ। মুড়ি দিয়ে ভালই লাগে তো। 

-না, ভাল লাগে না। 

—ম্যাগি 

—দূর! রান্না বান্না করে খেতে ভাল লাগে না...রুস্তম বলল বটে বাইরে থেকে মিষ্টি চপ কিনে এনে খাওয়ার কথা কিন্তু পুন্ডিবাড়ি ক্যাম্পাস থেকে দোকান পাট প্রচুর দূরে আর পয়সা দিয়েও ভাল খাবার পাওয়া যায় না। বড়টা কলকাতায়! তার খাওয়াদাওয়ার অসুবিধা নেই। অসুবিধা থাকলেও বলবে না। চাপা ছেলে। ছেলেরা কী খাচ্ছে, না খাচ্ছে। কষ্ট পাচ্ছে। আর নিজেদের জন্য রোজ জুত করে ভোগবাড়ির রান্না! মশলা কিনে বা বেটে খুব তরিবত করে বিজনের জন্য রান্নার ইচ্ছে হয়নি রুস্তমের তাই বিপত্তি। বিজনের মেজাজ খারাপ। কে যেন বলছিল সেদিন—বাঙালি মায়েরা নাকি আজ কী খেয়েছিস, এই প্রশ্ন ছাড়া ফোনে কোনও কথাই বলতে পারে না—এই নিয়ে খুব হাসাহাসি হল। অন্য জাতির মায়েরা বুঝি এমন বলে না? কে জানে, রুস্তমের কোনও ধারনা নেই। শঙ্খ কিন্তু কিছু জিজ্ঞাসা না করতেই বলেছিল—মা ক্ষিধে পেয়েছে। ছেলেমেয়েরা ক্ষিধে পেলে মাকেই বলে কারণ মা বেঁধেবেড়ে খাবারটা খেতে দেয়। চাকরি না করলেও করে, চাকরি করলেও করে। রুস্তমের আবার মনে পড়ে সেই হেঁসেল ঘর। সেই মহাকাব্য। জ্বালানি, সবজি, চালডাল নুন মশলা 

মাছের জোগান যারই হোক মহাকাব্যটি মারই তো লেখা। আর...। 

আর সেই ঢাকের বাজনায় কী যেন মনে পড়ছে। মন কেমন করছে। কিন্তু সেটা যে কী তা তো মনে পড়ছে না। পরীক্ষা হলে টহল দিতে দিতে রুস্তম জানলার পাশে আসে। কুট্টিপাড়ার মনসা বাড়ির সামনে একখণ্ড ত্রিপল টাঙানো হয়েছে। তার নীচে চলছে মুখা নাচের প্রস্তুতি। ঢাকের শব্দ এখন খুব জোরে। মুখাপরা মা কালী নরকরোটি হাতে চলেছে। মহানন্দার তৈলমুন্ডই ঘাটে। তাঁকে ঘিরে এক ঝাঁক ছেলেপুলে। ধুনো জ্বলছে ধুনুচিতে। কাঁসর বাজাচ্ছে একটা পুঁচকে ছেলে। খর রোদে খুব ভিড় নেই। ভিড় হবে কাল সন্ধ্যার পর থেকে। কাল বৈশাখের সংক্রান্তি। কাল সং আর শিবের কাছে গান দিয়ে গম্ভীরার শুরু। আজ ভোর থেকে শুরু হয়েছে চামুণ্ডা বাড়ি আর বিভিন্ন থানে থানে কালীপুজোর সঙ্গে সঙ্গে মুখা নাচের উৎসব। স্থানীয় পরব। 

পরীক্ষা শেষ হলে খাতা তুলে গুছিয়ে গুনে জমা দিয়ে রুস্তম বাড়ি না গিয়ে কুট্টিপাড়ায় আসে। পরীক্ষা শেষ করে মেয়েরাও ভিড় করেছে মুখা নাচ দেখতে। কে একজন একটা চেয়ার এনে দিল বসার জন্য। জোরালো ধুনো। ঠাঠা রোদ। ধর্মমাসে এই জনপদের আনাচে কানাচে আদিম ঢাক বাজে আর বিগ্রহহীন থান ঢেকে যায় ধুনোর ধোঁয়ায়। বানানো বুক বেঁধে, কালি মেখে এল চুলে লোল জিহ্বা কালী কালী মহাকালী চামুণ্ডার মুখা পরে তাথই নাচছে ভুলু মাছুয়া আর কালী সেজে নাচছে হারু ধোপা, নর সিংহের সাদা মুখা পড়ে নাচছে কালো বাবলু। বুলু মাছুয়া, হারু ধোপা, কালো বাবলু ব্যবসাপাতি বন্ধ রেখে কেউ একশো টাকা রোজ ইনকাম ছেড়ে, কেউ হাজারে চল্লিশ টাকা বিড়ি বাঁধার কামাই দিয়ে চামর বা খাঁড়া হাতে তাথই নাচছে। কালী চামুণ্ডা শিব নরসিংহ সব দেবতার নেগেটিভরা, একদিন নেচে নেচে ঘরে ঘুরে সগ্‌গো মত্তো পাতালের মহড়ায় নেবে পড়েছে ফিল্ডে। 

চামুণ্ডা মুখা জাগ্রত। তিনদিন ধরে সংযম আর উপোস সেরে পুজো দিয়ে ভুলু মুখা পরেছে। এখন সে সর্বক্ষমতাসম্পন্ন চামুণ্ডাকালী। এক এক জন, এক এক রকম মনোবাসনা নিয়ে এগিয়ে আসছে তাঁর কাছে—চামুণ্ডা মায়ের চামর ছুঁয়ে দিচ্ছে ভক্তের মাথা। হবে। হবে। হবে। নির্ধনের ধন। নিপুত্রের পুত্র। নিবিপিএলের বিপিএল। ধনহীনের ধন। পুত্রহীনের পুত্র। যে বিপিএল নয় তার বিপিএল কার্ড হবে। অপুর স্কুলের সেই মাস্টার যেমন। আহা বেচারি কী গরিব কী গরিব--ঘরভর্তি ধনদৌলত নিয়েও বিপিএল হবার জন্য গাবিয়ে দিতে পিছপা হয় না। আর এদের মোকাবিলায় গরিবের গরিব তস্য তস্য গরিব পেটচ্যাঁদড়া বুলু, হারু, বাবলু কেমন শরীর ভর্তি আগুন নিয়ে পেট ভর্তি আগুন নিয়ে সারমেয় শাস্ত্র আত্মস্থ করে ধেই ধেই নেচে যাচ্ছে অবিরাম। শুধু কুকুর নয়—তারাও মিশে গেছে গু খেয়ে গু হজম করতে, তা নইলে এই তাথই নাচ হয়? আর ভর? ভর বলে সত্যি কী কিছু হয়। পুরনো খিদের জারকে শরীর ডুবিয়ে, তীব্র গরমে দশ কেজি ভারী ওজনের মুখ পরে তাথই ঢাকের বাজনা আর ধূপধুনোর আবহে নাচলে ভর নামে শরীরে, অলৌকিক স্বর্গ নামে চোখের সামনে। সেখানে সীমী নদীর মতো বৈতরণি হয়। অবগাহনে জাগতিক বিস্মরণ হয়। অভাব অনটন দুঃখ তাপ আঘাত অপমানের সব বিষটা হজম হয়ে প্রত্নবাকলি হয়ে মিলিয়ে গেলে শরীরের স্বর্গ মর্ত্য পাতাল জুড়ে এক প্রাগৈতিহাসিক আমি তাথৈ নাচতে থাকে। তখন কে বুলু কে হারু কে বাবলু। স্বয়ম্ভু সব দেবতা। 

চামুণ্ডার চামরখানি দুলতে দুলতে এগিয়ে এসে ছুঁয়ে যায় রুস্তমের মাথা। কী চাইলে রুস্তম-বিজনের জন্য রোজ খাবার পাতে ঠিকঠাক ডাল ঝোল ব্যঞ্জনের বাটি? তা হলে তো মন্দ হয় না। খর রোদে দাঁড়িয়ে রুস্তম হাসতে থাকে মনে মনে প্রতিদিন ঠিকঠাক হেঁসেলের জোগান হলে তো দারুণ হয় গো মা, চামুণ্ডা। মা, ঠাকুমার মতো মহাকাব্য রচনার দক্ষতা তো নেই, তুমি যদি সে সব সামলে দিতে বেশ হত। চামর মাথায় বুলিয়ে চামুণ্ডা কালী থানের সামনে এগিয়ে যায়। ঢাকের তালে একবার নিচু হয়ে মাথা নিচু করে আর একবার মাথা সোজা করে চামুণ্ডা তুমুল তালে নাচতে শুরু করলে রুস্তমের মনে পড়ে এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় পাড়ার রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানের কথা। সে স্পষ্ট দেখতে পায় কোটালবেশী পুরুষালি ধাঁচের কিশোরী রুস্তমকে। কালো ফতুয়া সাদা ধুতি, মাথায় লাল ফেট্টি কপালে তিলক...লাফ দিয়ে, শূন্যে ঘুরে সারা মঞ্চ জুড়ে দাপিয়ে নাচছে রুস্তম-শ্যামার কোটাল। নৃত্যনাট্যে সখীর দলে ছিল রুস্তম। কোটাল সেজেছিল সোমা। তার ধূম জ্বর। ঝুনুদি রায় দিলেন—একটা সখী কম হলেও চলবে রুস্তম, তোকেই উদ্ধার করতে হবে আজ। সখীর রিনিঝিনি অলংকার, উজ্জ্বল রেশম বস্ত্র ফেলে রুস্তম আস্তে আস্তে হয়ে যায় গোঁফপাকানো শক্ত নিষ্ঠুর কোটাল। কো গো লাসে সানুমাই/লাংসালাং, সালাং মাইগন সালাং মাই... এই গানের অর্থ জানা নেই। তবে এই গানের ছন্দে, একই তালে তবলার সঙ্গে নাচের অসাধারণ কোরিওগ্রাফি করেছিল ঝুনুদি। মঙ্গোলিয়ান ছাঁদের একটু ছেলে ছেলে গড়নের রুস্তম রিহার্সালের সময় দেখে দেখেই তুলেছিল সেই নাচ। আর আপৎকালীন প্রয়োজনে দুর্ধর্ষ নেচে পেয়েছিল বেস্ট পারফর্মারের মেডেল। 

মনে না পড়া কথাটা মনে আসতেই শরীরের সব অস্বস্তি কেটে গেল রুস্তমের। এটা হয় ইদানীং। শঙ্খর ছোটবেলার বন্ধু-খুব তোতলাত মোটাসোটা দীপ। এত এঁটে থাকত তাদের বাড়িতে অথচ সেদিন দেখা হলে কিছুতেই নাম মনে পড়ল না। শঙ্খকে ফোন করে জেনে নেওয়া যেত, সেটা আবার ভাল লাগে না। সন্ধ্যেয় টিভি দেখতে দেখতে, কাপড় গোছাতে গোছাতে, কাগজ ওল্টাতে ওল্টাতে, স্মৃতির জট ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে দীপকে খুঁজে পেয়ে তবে শরীরের আনচান ঠাণ্ডা হয়। এইরকম অসংখ্য ঘটনা। আর আজ এই দুপুরে চামুণ্ডা নাচের তালে তালে অনেকদিন আগের কোটাল রুস্তমকে মনে পড়তেই কাল থেকে শরীরে সেঁটে থাকা বিজনপর্ব, যাপনপর্বের সব খিচখিচ দূর হয়ে যায় রুস্তমের। শুধু মুখা নাচ নয়। সে দেখে একুট দূরে গ্রীষ্মের শীর্ণ মহানন্দার পাশে মহানিম। দেখে নানা রঙের ভিজে কাপড়। কাঠের পিঁড়ি। কাপড় কাচার ছন্দ। দেখে চিকন চিকন চুল মেলে ডুব ডুব 

জলে টুপ ডুব। গেরস্তের বাসনের পাঁজা। দেখে নদীর পাশে অতসীদের বাড়িতে তারে। মেলা বেগুনি শাড়িটি। তাথৈ নৃত্য নয়, এক ঢিমে লয়ে মুখা নাচ। যেমন রুস্তমের অগোছালো গেরস্থালি অথবা পরীক্ষা হলে ক্লান্ত নজরদারি, পাহারা। আনমনে রুস্তম খেয়াল করে পথের এই নাচে মেয়েরা নেই। আর খেয়াল করে চামুণ্ডা আর কালী সেজে ভুলু, হারু চমৎকার নাচছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন