রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

সাদিক হোসেন'এর গল্প : হারুর মহাভারত

।১। 

এই বুড়ি বয়সে হারুর মা বড় বিপদে পড়িল। সংসার চলিতেছে না, চলিতেছে না করিয়াও একপ্রকার চলিতেছিল - এইবার বুঝি তাহাও স্তব্ধ হইয়া গেল। 

আঁচ থেকে ভাতের হাঁড়ি নামাতে গিয়ে হারুর মা ছেলেকে ডাকল। হারু জবাব দিল না। সে সেই সকাল থেকে শিরদাঁড়া খাড়া করে টেবিলের উপর হুমড়ি খেয়ে আছে। ডাকাডাকিতেও তার নড়নচড়ন নেই। 

খাতার উপর সস্তার কলম এখনো কোন আঁচড় কাটতে পারেনি। যদিও পেনের নিব এতটাই উদগ্রীব যে সেটি পরমুহুর্তেই কোন হরিৎবর্ণের কাব্য রচনায় অংশগ্রহণ করবে কিনা, সেই ব্যাপারে আশান্বিত হওয়া যাচ্ছে না। সুতরাং, শুধু সাদা কাগজ, সফেদ কাগজই সত্য, বাকি যা - এই হারু, হারুর শারীরিক ছাওয়া ও জং ধরা শার্সি ভেদ করে যে আলো এসে পড়েছে টেবিলে ও হেথায়সেথায়, এই যেমন খাটের কিয়দংশে বা আলনার অর্ধেকে - সম্পূর্ণতই যথাক্রমে ছাওয়া, শার্সি ও আলো ব্যতীত অন্য কিছু নয়। অতএব, তা সত্য নয়। 

তবে ধোঁয়া সত্য। ফোটানো চালের গন্ধ সত্য। আর কী আশ্চর্য, এই যে সে দু’হাত পেছনে দিয়ে দাঁড়িয়েছে, যেন রবীন্দ্রনাথ, সামান্য ঝুঁকে আছে, মুখে দাড়ি নেই, তাছাড়া চেহারাটি খাটো - দেখলে চেনা যায়, সে তো হারু বিনা অন্যকেউ নয়, পরপুরুষ নয়, তাই দাঁড়িয়েছে এমনি যেন টেবিলে বসে আছে এবং মায়ের ডাকে সাড়া দেয়নি, চোরমুখো, কেননা বেলা পড়ে এলেও এখনো একটি দানাও সে লিখতে পারেনি। এই হারুর পাগলের হাল হয়েছে। 

সে সাদা কাগজের উপর সাদা কালিতে লিখে চলেছে কাব্যতর কাব্য, আনন্দতর আনন্দ, হত্যার অধিক গুপ্তত্যা। সে হন্তারক, বিদুষী ও হিজড়া। সে ছায়াবত। তার লিখন যথার্থই ভঙ্গিমা মাত্র। সে রাস্তায় ও ঘাটে ছড়িয়ে দিল কাগজ, ফাঁকা ও ফাঁকা কাগজ। পাতার মত। এইখানে, 'পর্ণমোচী' শব্দটাকে সে কি ব্যবহার করিবে? অথচ সে তো দাঁড়িয়ে রয়েছে মায়ের সম্মুখে। সেইভাবে পেছনে হাত দিয়ে দেখে যাচ্ছে ফ্যাঁদার মত সাদা ফ্যান গড়িয়ে নাবছে গামলায়। চাল যথার্থই নরম হয়েছে। মা তাকে দেখেও দেখছেনা। যেন একটু আগে সে এমনিই ডেকেছিল ছেলেকে। ছেলে আছে কী নেই, এইটুকু তার জানার দরকার ছিল। বাকী যা - এই সুমহান চাল, নাদুসনুদুস গামলা, উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে ন্যাপলা - তা তো নিত্য, তথা দরকারি, ওদিকে হারু অহেতুক ও বেমানান। 

ন্যাপলা আসিল। পায়ে ঘংরু নেই; তবু নিক্কন পরিহিতা যেন সে। হাঁটিলে ছন্দ বাজে। 

ন্যাপলা বলল, মাসিমার আজকেও আলু সেদ্ধ বুঝি? 

হারু টেবিলে ফিরে গেল। 

হারুর মা আঁচে জল ঢেলে দিল। 

ন্যাপলা বলল, এই দেখুন কী এনেছি! 

সে আঁচলের ফাঁক থেকে এমনভাবে বস্তুটিকে বার করল, যেন চুরি করে আনা গুপ্তধন। তারপর সেটি মেলে ধরল হারুর মায়ের দিকে। নিছকই একটি পুস্তিকা। দোমড়ান মোচড়ান, ছেঁড়া ছেঁড়া পাতা, হয়ত কুড়িয়ে পেয়েছে সে কোথা থেকে। সেটি একটি রান্নার বই। 

হারুর মায়ের চোখ অযথা প্রবীণা হইল। এইক্ষনে বুঝি সে জবরদস্ত গিন্নী। আঁচলে পোষ মানা সংসারী চাবি রহিয়াছে। অতএব রাশভারী। বলল, আজকের বিষয় কী? 

প্রশ্নটিতে আকস্মিকতার বিভ্রম নেই, তাহা দৈনিক। 

ন্যাপলা বলল, ইলিশ মাছের কোর্মা। 

হারুর মা রুপোসদৃশ, আলোকিত, মাছটির ল্যাজ নাড়া দেখল। 

ন্যাপলা শুরু করল - 

উপকরণ : ইলিশ মাছ ৫০০ গ্রাম, টকদই ২ টেবিল চামচ, টমেটো কুচি ১টি, পেঁয়াজ বাটা ২টি, রসুন বাটা ৪ কোয়া, সরষে বাটা ১ চা চামচ, কাশ্মীরি লংকা গুঁড়ো ২ চা চামচ, সরষে তেল ১৫০ গ্রাম, নুন ও হলুদ স্বাদ মত। 

পদ্ধতি : মাছ অল্প ভেজে তুলে রাখুন। কড়াতে তেল দিয়ে পেঁয়াজ ও রসুন বাটা দিন। কিছুক্ষণ ভেজে চিনি ও টমেটো ছেড়ে কষুন। 

- দাঁড়া বাপু, দাঁড়া। হারুর মা ন্যাপলাকে থামিয়ে দিল। ঢিমে আঁচে মাছটিকে সামান্য ভেজে স্টীলের বাটিতে রেখে দিল। 

- পেয়াঁজ বাটাটা দে'। 

পেঁয়াজ আর রসুন বাটা কড়াইতে নাড়তে নাড়তে হারুর মা বলল, ইলিশের এক অদ্ভুত নিয়ম, বুঝলি। এই মাছ যত মোহনার দিকে আসে, তত তার স্বাদ বাড়ে। ঠিক মেয়েমানুষের মত। বলেই সে ন্যাপলার দিকে তাকাল। 

ন্যাপলার পেছনে কতক্ষণ হারু এসে দাঁড়িয়েছিল ন্যাপলা খেয়াল করেনি। এবার বুঝি সে মানুষটির আভাস পেল খানিক। তবু অবুঝের মত হারুর মায়ের দিকে চিনি ও টমেটো এগিয়ে দিল। 

হারুর মা বেখেয়ালি, বলতে থাকল, দামোদর নামটা শুনলেই কেমন ছ্যাঁক করে ওঠে না? যেন কী রাগী মানুষ, ব্যবসায়ী। সেই দামোদরের ইলিশের স্বাদ ছিল অপূর্ব। এই মাছ তুমি একলা লুকিয়ে খেতেই পারবে না। পাড়া-প্রতিবেশী জানবেই। আর এখন দ্যাখো, এত দামি মাছ কেউ গন্ধ পাচ্ছে? হ্যারে, কত করে কেজি নিল রে'? 

ন্যাপলা কী ভেবে নিয়ে বলল, সাড়ে আটশ! 

- বলিস কী! 

ন্যাপলা গর্বের হাসি হাসল, সপ্তাহে একদিন তো খাবে, অত চিন্তা কর কেন? 

- তা বটে। 

টমেটো নরম হয়ে গিয়েছে তখন। তাতে দই, সরষে গুঁড়ো, লংকা গুঁড়ো, নুন ও হলুদ দিল হারুর মা। খানিকক্ষণ পর কিছু জল দিয়ে একটু আগে অল্প করে ভেজে রাখা মাছের পিসগুলো ছেড়ে দিল। 

পুরনো সোয়েটারে যেমন রোঁয়া উঠে থাকে, উলের উপরিভাগ অতি ব্যাবহারে স্থির ও গুটুলি পাকিয়ে যায়, তেমনি মৃদু আঁচে মশলা ও ইলিশের গন্ধ এই তিন মানুষের দিকে অচঞ্চল সোহাগের আদর জ্ঞানে থমকে রয়েছে। 

আজ হারুর মাকে রুখবে কে? সে তো ইলিশের গাদার প্রতি রাক্ষসী। 

আজ ন্যাপলাকেই বা রুখবে কে? সে তো কড়াইয়ের অমন মাখো মাখো ঝোল ও কুমারী ল্যাজার প্রতি অতি উতসাহি ষোড়শী। 

বাকি রইল হারু। হারুর পাগলের হাল হইয়াছে। 

হারু বলল, আর কতক্ষণ মা? 

ন্যাপলা যেন এই মুহুর্তে, প্রথম, হারুর গলা শুনল। মাসিমাকে বলল, কতক্ষণ? 

- এই তো। হারুর মা কড়াই থেকে সামান্য ঝোল তুলে চেখে নিয়ে বলল, তুই খবারের জোগাড় কর। রান্না হয়ে এসেছে। 

টেবিলের মাঝখানে একটি ছোট্ট ফুলদানি। তাতে রজনীগন্ধার কটি স্টিক রয়েছে। তার পাশে ম্যাটের উপর রাখা নুন ও মরিচের কৌটো। যেন ভাইবোন। 

ন্যাপলা শুভ্র প্লেটের উপর ভাত বেড়ে দিল। বাটিতে ইলিশের কোর্মা। 

হারু বলল, তোমরা খাবে না? 

হারুর মা হাসল খানিক। 

ন্যাপলা কি চুপ থাকতে পারে? সে বলল, আমাদের জন্য তোলা আছে, তুমি খাও। 

হারু আর কথা বাড়াল না। টুকরোটি ভেঙে গালে দিতেই তার সারা গা আদরে অবশ হয়ে গেল। 

ইলিশ যে এত আদর করতে জানে, তা হারুর জানা ছিল না। 

সে চোখ বুঝল। সে দেখতে পেল, দামোদরের জল অসভ্যের মত তার সারা শরীরে উথালপাতাল ঢেউ তুলছে। 

এই সে ভাসিয়া যাইতেছে। এই সে ডুবিয়া মরিতেছে। যেন অতল। তথাপি আনন্দতর আনন্দ। গল্পতর গল্প। 

এইটিই সময়, হারু মনস্থির করিল, এইবার সে মহাভারত লিখিতে পারিবে! 


২। 

কিন্তু কার আদর বেশি তীব্র? রাগত স্বাদকোরকের উপর ইলিশের তুলতুল আচরণ, নাকি শীতের সন্ধ্যাকালীন দাউদাউ আগুন! 

শ্মশান ফেরত হারু যখন নিজস্ব গৃহ অভিমুখে, প্রবেশদ্বারে পথ আঁটকাইয়া দাঁড়াইয়া রহিয়াছে, আর কেউ নয়, সে নিছক ষোড়শী - নাম ন্যাপলা। 

ন্যাপলার হাতে চিনির ড্যালা, পাটকাঠি, সংগে রয়েছে নিমপাতা ও লৌহচূর্ন। 

সে প্রথমে পাটকাঠি জ্বালায়। সেই অগ্নি কবার ঘুরিয়ে নেয় হারুর সম্মুখে। তারপর বাকি থাকে যা করণীয়, সেইসব সমাধার পর হারু বাসগৃহে প্রবেশ করে। 

তুলে রাখা উনুন খাঁ খাঁ করছে। তরিতরকারিহীন হাঁড়ি, কড়াই, পেরেক থেকে ঝুলে থাকা খুন্তি খাঁ খাঁ করছে। আলনা, খাট ও তার লেখার টেবিল ফিসফিসিয়ে কথা বলছে। গোপণে কথা বলছে। গোপণীয়তা খাঁ খাঁ করছে। 

পাশেই ছিল ন্যাপলা, বলল, একী হারুদা, তুমি তো ঠান্ডায় কাঁপছো। এই নাও চাদর। 

সে চাদরটা সামলাতে পারল না। ন্যাপলাই তাকে পরিয়ে দিল। সে কোনরকমে টেবিলের কাছে এসে ঝুঁকে পড়ল। কেঁদে ওঠল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, আহ কী শান্তি! তারপর হঠাৎ-ই চুপ মেরে গেল। ফোঁপানির শব্দটুকুও নিশ্চুপ। খানিকপর আবার বলে বসল, আমি কি খুনি? 

- এসব কী কথা হারুদা? ন্যাপলা অভ্যস্ত গিন্নীর মত খাটের দিকে সরে গিয়ে, বালিশে দু-চারটে চাপর মেরে বুঝি কতদিনকার ধুলো ওড়াল, জমাট ও কাঁদুনি গলায় বলল, সেই সকাল থেকে কত পরিশ্রম গেল তোমার। এবার একটু শোও। আমি তোমার খাবার আনছি। 

অতবড় হারু, উপরন্তু কলমবাজ, এক্ষণে ন্যাপলার নিকট পরাস্ত হইল। যেন সে সুবোধ বালক, অথবা কর্মচারী, আদেশ পালনে খামতি দিলে তার চলে না, এমনি দেহভঙ্গি তার, মাপা পায়ে কিছুটা এগিয়ে আবার দাঁড়াল, দাঁড়িয়েই থাকল, তারপর কুঞ্চিত বেড-কভারে দেহ রাখলে ন্যাপলা তার গায়ে চাদরটা বিছিয়ে দিল। লাইট নেবাল। 

হারু চক্ষু মুদিল। চক্ষু মুদিলে তাহার জ্ঞান প্রাপ্তি ঘটিল। 

চারদিক কালো ও নিখুঁত কালো। মাথার কাছের জানলাটি বন্ধ। খাটের পাশে টেবিলটি রয়েছে নির্ঘাৎ। তবে এই অন্ধকারে সেটি অদৃশ্য। যেন নেই। কিছু নেই। দু-একটা যা ফিসফাস, তা তো আসবাবের। দু-একটা যা খুটখাট, তা তো ইঁদুর যুগলের দৌড় মাত্র। বাকি রয়েছে চঞ্চল পদশব্দ, তা ন্যাপলার। ন্যাপলা খাদ্য সংগ্রহে বাহির হইল। 

হারু দেখিল – মানুষটি ইতিমধ্যে গৃহে প্রবেশ করিয়াছে। এবার চেয়ারটি সরাইয়া বসিল। কনুই রাখিল টেবিলে। মানুষটি কালোতর কালো, অন্ধকার হইতেও অধিক অন্ধকার, তাই দৃশ্যমান। তাহার চক্ষু দু’টি কুসুমিত ও গভীর, তদুপরি কুচকুচে; হারুর দিকে নিক্ষিপ্ত হইল। 

হারু চমকাইয়া উঠিল, কে? 

লোকটি হাসিল। ইহাতে তাহার শীর্ণকায়া প্রকট হইল। 

- কে? 

লোকটি এবার স্থির, প্রস্তরখণ্ড যেন, বহুকাল যাবৎ এই ঘরে উপস্থিত রহিয়াছে, সুতরাং স্বাভাবিক কন্ঠে বলিল, ক্ষুধা লিখো। অন্ন লিখো। অভিশাপ দাও। 

- ক্ষুধা? অন্ন? হারুর মুখনিঃসৃত শব্দ দু’টি থমকাইয়া গেল। তাহার শব্দ এস্থলে অর্থ বহনে অক্ষম। 

মানুষটি এবার চেয়ার হইতে উঠিল। হারুর নিকটে আসিল। চক্ষুতে চক্ষু রাখিল। একটানে তাহার শরীর হইতে চাদরটি সরাইয়া দিল। কী অনায়াসে বিভৎস হাসি হাসিল। পরক্ষণেই গম্ভীর কন্ঠে বলিল, ক্ষুধা লিখো, নয়তো তুমি খুনি। অভিশাপ দাও, নয়তো তোমার হস্ত লোহিতবর্ণ ধারণ করিবে। 

ভয়ার্ত হারুর কম্পনে খাটটিও কেঁপে উঠল। সে কোনরকমে চাদরটি টেনে মুখ ঢাকল। চাদরটি সরিয়ে লোকটিকে দেখল। তারপর আবার চাদরের ভেতর লুকিয়ে যেতে থাকল। মাঝখানে একবার চোরের মত করে তাকালে দেখল ঘর আলোময়। 

টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে ন্যাপলা। ন্যাপলার হাতে খাদ্যদ্রব্যাদি। 

হারু আর দেরি করল না। প্রায় লাফিয়েই চেয়ারে বসে পড়ল। থার্মোকলের থালায় ভাত আনা হয়েছে। ভাতটি গরম নয়। বাটিতে আলুর ঝোল। তা থেকে ধোঁয়া উঠছে। হারু পুরো বাটিটাই উপুড় করে দিল। তার আঙুলের ফাঁকেফাঁকে, নখের কিনারায় মোটা মোটা ভাত, আলুর টুকরো, হলুদাভ ঝোল বড় মায়াময় খেলা শুরু করে দিয়েছে। অথচ সে অস্থির নয়। কত স্বাভাবিকতায়, যেন সে পরিণত হন্তারক, নিপুন হাতে ছুরিকার মত গ্রাস চালনা করছে মুখে। তার জিহ্বার উপর ভাসমান লালা তখন ভাত ও আলুর মসৃণতায় বিভোর হয়েছে। 

ওদিকে ন্যাপলা এলোকেশি, তায় বোকা। সে শুধু মা মরা ছেলেটার গতিময় চোয়াল লক্ষ্য করছে। সে বুঝতে পারছে না, একটু আগে যে ছিল – সে ছিল ও আছে, সে সর্বদা বিরাজমান, সে থাকবে ও আছে। তাই, এই যে হারুর টেবিলের উপর ঘাড় গুঁজে বসে থাকা, তা নিছকই ভঙ্গিমা, যেমন তার লিখন বস্তুত কেবলি ভঙ্গিমা ব্যাতীত অন্য কিছু নয়; শৈলী নয়। সে খাচ্ছে যেন লিখছে, সে লিখছে এমনি যেন সে খাচ্ছে, একবারও ন্যাপলার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে না, তার দুই মাড়ির চাপে এখুনি, এই মুহুর্তে, দু-চারটে মহাভারত এমনিই পিষ্ট হয়ে যেতে পারে। 


।৩। 

ক্ষুধা কি রূপ, না রস? ক্ষুধা কি শুধুমাত্র শারীরিক? সর্বদা বিদ্যমান? যা সর্বদা বিদ্যমান, সবখানে উপস্থিত, তাকে অক্ষরের বন্ধনে বাঁধবে কিভাবে হারু? 

শব্দের বিমূর্ততা বড় সীমিত যেন। দুঃখ লেখা যেতে পারে, রাগ, অনুরাগ ও আকাঙ্ক্ষা অক্ষরের গায়ে আঠালো প্রলেপের মত লেপে দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু শূন্য পাকস্থলিকে সে লিখবে কোন উপায়ে? 

ক্ষুধা তো ক্ষুধার অনুভূতি নয়, খাদ্যাভাবে মাথার ঝিমঝিমও নয়; ক্ষুধা এমন এক অবস্থা যা স্থির ও গতিময়, পতনশীল তথা উড্ডীয়মান; ক্ষুধা একই সঙ্গে কারণ ও তাহার ফলাফল – ক্ষুধার প্রেক্ষিতে বাংলাভাষার প্রতিটি অক্ষর নিছকই ফেরেব্বাজ! 

হারু ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আঙুর দেখিল। নিক্কন শুনিল। এবং দাউদাউ আগুনের ভেতর নিজের কলিজাকে পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে দেখিল। হারু দেখিল সে দু’হাত পেছনে দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, মাথাটা ঝোঁকানো, যেন রবীন্দ্রনাথ, তবু তাহার হস্ত এখনও লোহিত বর্ণ ধারণ করে নাই। 

হারু নিজেকেই অভিশাপ দিল। দেয়ালে টিকটিকিরা সংসার শুরু করেছে অথচ তার পকেটে ফুটো পয়সাও নেই। পঞ্চাশ টাকাও নেই। কিন্তু এধার ওধার দু-চার-দশটাকা না থাকলে একটা সংসার এতদিন ধরে চলছিল কিভাবে? সংসার কি চাকা? গাড়ি? দু-চাকা চার-চাকা? সংসার কি মাছের মত স্বাভাবিক সন্তরণ নয়! 

মাথা ন্যাড়া। ঢোলা পায়জামার উপর একখানা কবেকার সয়েটার পরে আছে সে। কালো চামড়া তেলের দুর্বলতায় সাদা ও খসখসে হয়ে আছে। তবু মুখের উপর ভাবটা এমন, যেন সে অক্ষর সন্ধানী, ওদিকে গুটিগুটি খাদ্যদানার মত তার চাউনি ভেঙে পড়ছে তোষকের তলায়, চিনির কৌটোয়, বাজারের থলিতে, সে আলনা থেকে শাড়ি নামিয়ে দেখছে ইস্ আঁচলে কোন গিঁট বাঁধা নেই কেন? 

সংসার কি মাছের মত স্বাভাবিক সন্তরণ শেখেনি? 

হায় ভাষা, হায় সুমহান রচনাবলী, এইক্ষণে হারুর কী হাল হইয়াছে দেখ! সে ডুবিয়া যাইতেছে। কানা কলসির মত ডুবিয়া যাইতেছে। ধীরে ধীরে, অতি ধীরে, যেন এই তার নিয়তি ছিল, তাই দুলিয়া উঠিতেছে; তার দুলুনি ছন্দপূর্ন ছিল। যেমত পর্ণোমচি মন্দ হাওয়ায় কাঁপে, দোলে, ঝরে পড়ে - হারু সেরকমই প্রকৃত অর্থে প্রাকৃতিক হইয়াছে। সে শীতকালীন হাওয়ায় কাঁপিতেছে। দাউদাউ আগুন দেখিতেছে। আগুনে পুড়ে পুড়ে হারুর মা যেন শেষ প্রতিশোধটুকু নিয়ে গেল। নিজেও পুড়িল, সঙ্গে দাহ করিল সংসারের যাবতীয় সঞ্চয়। 

ফলত হারু বাতিল এখন। মাছের মত স্বাভাবিক সন্তরণ হারু শেখে নাই। এইখানে যাহা প্রাকৃতিক, তাহা নিছকই মানব বিরোধী। 

হারু পুনরায় নিজের তালুর দিকে তাকাল। উহা ফ্যাকাসে হইয়াছে। লাল রঙ অনেক দূরের বস্তু। 

জানালা খোলা ছিল। সেইখান থেকে একটা বেড়াল এসেছে বোধহয়। তা না হলে, খুট করে শব্দ এল কেন? 

হারুর অভিরুচিও ছিল সেই রকম। সে চাইছিল সবকিছু, এমনকি মায়ের ব্যবহৃত সেমিজ ও ব্লাউজ, আঁচের পাশে রাখা ছিল যে ন্যাতা, তাও, এই আছিলায় লন্ডভন্ড হয়ে যাক। কিন্তু বেড়াল তো নিছকই বেড়াল। যেখানে দানাপানির অভাবে মানুষই কাহিল, সেইখানে ইতর জীব আর কীই বা করতে পারে। তার উপস্থিতি শুধুমাত্র এই 'খুট' শব্দে অভিব্যাক্ত। ইহাই সম্পূর্ণ। ইহার বাইরে আর কিছু নাই। হারু গৃহে প্রবেশ করলে বিছানায় তার পশম দেখল মাত্র। 

তখনও কুয়াশা চারদিকে। তবু সে চেকনাই রোদ কল্পনায় আনল। আর কী আশ্চর্য্য, এই প্রথম সে ক্ষুধাকে ব্যক্ত হতে দেখল। 

তার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। জিভ তেতো হয়ে এল। পকেট কানা। সে ফিসফিস শব্দ শুনল। 

নিশ্চয় সংসার সন্তরণ জানে। সে পুনরায় জাগ্রত হল। খাটের তলা থেকে টেনে বার করে আনল পুরনো ট্রাঙ্কটা। তারপর ধুলো সরিয়ে ঢাকনা খুলতেই পেয়ে গেল অবর্নণীয় শুধা। 

কবে যে তারা গুড়ো দুধ মিশিয়ে চা খেত তার খেয়াল কেই বা রাখে? অথচ সেই আমুলিয়ার কৌটোটা রাখা আছে ট্রাঙ্কে। যেন গুপ্তধন। নাড়ালে শুধু ঝনঝন শব্দই আসে না, বোঝা যায়, ভেতরে কাগজের টুকরো রয়েছে। 

সে দুই পায়ের চেটোয় কৌটোটা চেপে রেখে ঢাকনাটা খুলতে পারল। খুচরো বাদ দিলে তিন হাজার পাওয়া গেল। সর্বমোট তিন হাজার চারশ বত্রিশ। কুয়াশার ভেতর আর কিছু না থাক, হারু সুন্দর-কে দেখল। 

সন্ধ্যাকালীন দাউদাউ আগুনের ভেতর পুড়ে যেতে যেতে তবে এই ছেলেমানুষী করে গিয়েছে মা! 

পতপত করে পতাকার মত আগুন উড়ছে যেন। আগুন আবার যাতায়াত করতে জানে। তখন হারু ঘরের ভেতর বিভোর, আগুনের পদচালনাকে অগ্রাহ্য করতে পেরেছিল। কিংবা এই সে চেয়েছিল। সে শিল্পমন্ডিত আওয়াজ শুনতে চেয়েছিল। শিল্পে উত্তীর্ন দৃশ্য দেখতে চেয়েছিল। বস্তুত সে নিজে ফেরেব্বাজ হয়ে গিয়ে একবার চেখে দেখতে চেয়েছিল জোচ্চর শব্দসমূহকে। 

এখন তার হাতে সাকুল্যে তিন হাজার চারশ বত্রিশ। 

এখন তাহার হস্তে যুগোত্তীর্ন মহাভারত! 

সে অবলীলায় মায়ের শঠতা ধরে ফেলতে পারছে। সে অবলীলায় আগুনের ওম সহ্য করতে পারছে। শূণ্য পাকস্থলীকে কী অবহেলায় অক্ষর দিয়ে বিদীর্ন করতে পারছে। 

আজ যদি সে মহাভারত না লিখতে পারে, তবে মহাভারত লিখবে কে? 

হারু শৃগালের মত হেসে উঠল। আয়নায় নিজেকে দেখল। নিজের মুখের সঙ্গে মায়ের মুখের মিল পেল ঠিক। 

সে লম্বা মানুষের মত উঠে দাঁড়াল। পেছেনে হাত দিয়ে সামান্য ঝুঁকে হাঁটল খানিক। 

সে, হারু, একা ও অংশত খুনি, উপরন্তু কলমবাজ, যার হাতে সঞ্চয় উঠিয়াছে, ততোধিক ফ্যাকাসে তার দেহ, দেহখানি ঝুঁকে তীব্র প্রেমে ব্যাকুল হইয়াছে। সে বুঝিয়াছে, আর কেউ নয়, পুত্র নয়, মাতা নয় - একজন হন্তারকই মানবদেহকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়া থাকে। 


।৪। 

সভ্যতার আদি স্বরূপ হইল অপচয়। আহা, আজ হারুর অপচয়ের আধিকার প্রাপ্তি ঘটিল। কী এক আনন্দ, যেন তার অমরত্বকে সে নিজেই পরখ করছে, পরখ করছে আর অভিভূত হয়ে পড়ছে। 

– ন্যাপলা, নেপু! 

ন্যাপলা কাছেদূরে ছিল না। ন্যাপলা কোথাও ছিল না। তবু ন্যাপলা ছাড়া আর কাকেই বা সে সাক্ষী রাখবে? এই মুহুর্তে সে অন্য কোন জটিল কূটাভাসের মধ্যে ঢুকতে রাজি নয়। তার বাজি ন্যাপলা। হ্যাঁ, ন্যাপলার বিস্ময়বোধকেই সে শুধুমাত্র বিশ্বাস করতে পারে। তার ন্যাড়া মাথা, ভগ্ন শরীরে অপচয়ের জোয়ার এসেছে। কী তীব্র একমুখী এই স্রোত! এইখানে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে পারলেই মানবের ক্ষয় মুক্তি ঘটবে। 

তবু সংসারের সঙ্গে বাজারের থলির সম্পর্ক সর্বদাই সমানুপাতিক থেকে যায়। থলির এমন ছিন্ন অবস্থা দেখে হারু বাস্তবিকই মুষড়ে পড়ল। যেন থলির মধ্যেকার গর্তটির শীর্নতাই তাহার লেখক জীবনের ব্যাপ্তি না ঘটার প্রধান কারণ। 

সে দু-পায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই তার অর্জন। তার পিতার নাম দামোদর ছিল। 

হারু আর দেরি করল না। পকেটে সমস্ত সঞ্চয় সে তুলে নিয়েছে। চোখ তার চিকিমিকি। সে বাবুদের মত বাজারে বেরুল। 

হারু বাজারে চলিতেছে। অন্য দিনের তুলনায় আজ হয়ত সে একটু বেশিই ভাবপ্রবণ। তার প্রবণতা থলির দুলুনিতে ধরা পড়িতেছে। থলি তো নয়, নির্ঘাৎ কলসি। দুলিতেছে এমন যেন তার যাতায়াত মহাকাব্যিক হইয়াছে এখন। 

কিন্তু হারু জানে তার পারিপার্শ্বিক চিরকালীন নয়; ইহা ভঙ্গুর তথা পরিবর্তনশীল। এইতো সেদিন সে স্বপ্নে দেখল, ইলেক্ট্রিক চুল্লীর ভিতর পুড়তে পুড়তে তার মা হঠাৎই বসে পড়েছে। যেন জটিল তারের ভিতর, হিটারের ভিতর তার ঘুম ভাঙল। ঘুম ভেঙেছে, তবু মা তো অবাক হয়নি একটুও। সেই শাড়ি, ন্যাতানো আঁচল, আঁচল দিয়ে মুখ মুছে নিল একবার। একবারই নড়নচড়ন। তারপর তো সাদাটে চুলগুলো পুড়ে গেল কাপড়ের ফেঁসোর মত। চামড়া খসে পড়তে থাকল। অনুযোগ নেই, অভিমান নেই, শুধু একবার, তাও আড়চোখে সন্তানের দিকে তাকিয়েছিল। 

হায়! হারু চলিতে চলিতে শব্দ খুঁজিতেছে। আজ সে মানবীর 'চেয়ে থাকা' আঁকিবে। শব্দকে জুতোর মত ছুঁড়ে দিয়ে, শব্দের গায়ে চাবুক চালিয়ে সে সুমহান কাব্য রচনা করিতে চায়! 

– ন্যাপলা, নেপু। 

ন্যাপলা হয়ত হাজার কাজ সেরে ঘরে ফিরছিল, মাঝখানে দুজনার দেখা হয়ে গেল। 

হারু নাছোড়, চল, আমার সঙ্গে চল। 

– না হারুদা, কাকার ঘরে কাজ বাকি যে। 

– তোর আবার কাকা হল কে? 

– অসীমবাবুর ঘরে কাজ করি গো। মাসীমাকে তো বলেছিলাম। 

– আসীমবাবুর সঙ্গে আমি কথা বলে নেব'খন। এখন তুই আমার সঙ্গে চল। 

– তা কী করে হয় হারুদা। আমি যে কাকাকে আসব ব'লে এসেছি। 

– খুব যেন কথা রাখিস তুই। চল, আমার সঙ্গে চল। 

– কোথায় যাচ্ছ এখন? 

– বাজার করব। ঘরে যে দানাপানি নেই তা তো তুই জানিস। 

– তা কী কিনবে তুমি? ন্যাপলা এতক্ষণে নিজেকে সামলিয়ে নিয়েছে। তার কন্ঠে পুনরায় কোন চপলা ষোড়শী আসিয়া উঁকি দিতেছে। 

– সব কিনব। সব। আজ তুই আমাকে রেঁধে রেঁধে খাওয়াবি। 

– তা এই বিকেলে কী আর পাবে তুমি? এখন তো বাজার বন্ধ গো। 

– বন্ধ? হারু নিজেরি অনভিজ্ঞতায় চমকে উঠল। তবে? 

– তাহলে একটা কাজ করা যায়। ন্যাপলার চোখ থলির মধ্যে আটকে গিয়েছে। 

– বল। 

– আজ তো হাটবার। চল হাটে গিয়ে বাজার করি। তুমি কোনদিন হাটে গিয়েছ? 

যে কলমবাজের ভঙ্গিমা রপ্ত করতে পেরেছে এতদিনে, এখন পেছনে হাত টেনে পুরাতন লেখকের মত হাঁটাচলা করতে পারে সবে - সে কী হাটে গিয়ে তরিতরকারি কিনবে? না, হারু কোনদিন হাটে যায়নি। তবে সে তার অজ্ঞতাকে প্রকাশ করল না। বলল, চল তবে। ওখানেই যাই। 

– জানো হারুদা, হাটে না খুব ভাল জিলিপি বানায়। একদম গরমগরম। আবার শালপাতায় খেতে দেয়। কতদিন আগে খেয়েছি! বেশি মিষ্টি নয় কিন্তু। তুমিও খেতে পারবে। 

হারু হাসল খানিক। হাওয়ায় তাহার থলি বিবিদের কলসির মত দুলিতেছে। আহা, কেন যে সে ধুতি পরে নাই! 

প্রবেশ পথটি সরু। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরের মাঠে এত লোকের সমাবেশ ঘটে গেছে। ইস, মাঠ কোথায়, এ তো আদিম বিপণন কেন্দ্র। কী নেই এখানে? লোহার তৈরি হাতা, খুন্তি, বটী। জুতো, চপ্পল, সোনালি ব্লাউজ। ঝিকিমিকি শাড়ি, হাতুড়ী, একজন বুড়ি আবার করমচা নিয়ে বসে আছে। 

ন্যাপলার সব পথ মুখস্ত। সে বলল, হারুদা এদিকে এস। 

বেগুনের দাম ২৮টাকা, পিঁয়াজ ১৬। বকফুল, শাপলার লতি, পলতা শাকও রয়েছে। গোল গোল লাল লঙ্কা। এগুলোকে কুল-লঙ্কা বলে, হারু জানে। সেই কবে ছোটবেলায় সে একবার কামড় দিছিল। এখন তার জিভটা রিরি করে উঠল যেন। কতদিন এই লঙ্কা তার ঘরে ঢোকেনি। আহা, পরম আত্মীয়। হারু ১০টাকার লঙ্কা কিনল। 

মাছ চাই, মাছ? হ্যাঁ, চাই তো। ঐ দেখো বোয়াল, শাল, পাবদা। শঙ্কর মাছটা পেট উলটে শুয়ে আছে। এই মাছের লেজ দিয়ে কি চাবুক বানানো হয়? হারুর একটা চাবুক দরকার। পাশে রয়েছে হলুদ কই। গা-টা ঠিক বাঘের মত। জলের বাঘ। 

ন্যাপলা বলল, বেগুন দিয়ে রাঁধে। আমি তো খেয়েছি একদিন। 

ঝুমকো ফুলের স্বাদ তেঁতো। খাবার শুরুতে তেঁতো না হলে চলে? 

– আর চালতা কিনবে না? 

– কিনব না কেন? সব কিনব। 

– জানো, চালতা কাটা খুব কঠিন। পিছলিয়ে গিয়ে হাত কেটে যেতে পারে। আমি কিন্তু কাটতে জানি। সুতীর কাপড়ে চালতাটাকে চেপে নিয়ে কাটতে হয়। 

– তুই এতসব শিখলি কী করে? হারু অবাক। 

– আমি তো জানি। ন্যাপলার ছোট্ট উত্তর। 

এত দোকান যে হাটটা আসলে একটা দিঘীর পাশে বসেছে, তা সহজে বোঝা যায় না। সেইদিকে যেতে গিয়ে জিলিপির সন্ধান পাওয়া গেল। ন্যাপলা ঠিকই বলেছিল, হ্যাঁ, শালপাতাতেই জিলিপি দেওয়া হচ্ছে। 

– খাবি? 

ন্যাপলা হ্যাঁ-না কিছুই বলে না। 

হারু দোকানিকে জিলিপি দিতে বলল। 

– ক'টা খাব? ন্যাপলা তার সরলতা লোকাতে পারে না। 

– যত পারিস খা। হারু ঐখানে দাঁড়িয়ে থেকে মেয়েটির জিলিপি খাওয়া দেখে যেতে থাকল। 

দিঘীর পাশে সূর্য নেমে গিয়েছে। জলের উপরিতলে মন্দ বাতাস রো রো ক'রে ঘুরে বেড়ায়। মানুষের পায়ে পায়ে বেড়াল ছানাও তো ঘোরে। সেটি পদপিষ্ট হয়না কখনও। এত হল্লা, ছোলার দানায় পাতিলেবুর রস মিশে যাচ্ছে, গুড়ের পাটালি, চিটা গুড়, ছোটদের লবেঞ্চুষ, রাস্তায় গড়াচ্ছে ফাটা টমেটো, ঢ্যাঙা করলার ঝাঁকিতে নীল রঙের প্লাস্টিকের চুপড়ি, তাতে আবার দুই ফালি পাকুড় রাখা, কে রাখল কে, দোকানি চেঁচাচ্ছে, কেউ তাকে উত্তর করছে না, সব উত্তর জমা হচ্ছে দীঘির কালো জলে। সেইখানে ছোট ছোট ঢেউ উঠছে। রো রো... 

ন্যাপলার খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। টেপা-কল পেরিয়ে শিব মন্দিরে যাওয়া যায়। মন্দিরের চাতালে এরা কি দুদণ্ড বসবে না? 

ন্যাপলা বলল, পাখি দেখবে না? 

– পাখি? 

– পাখিই তো। কত পাখি বিক্রি হয় জানো? হাস-মুরগি থেকে কাকাতুয়া। 

কাকাতুয়া ছিল না। ছাতারে ছিল, বেনে বউ ছিল, ঐ যে হলদে-খয়েরি পাখিটা - ঐ টা কি কাজল পাখি? বাঁশপাতি, দুধরাজকে ন্যাপলা চিনতে পারল। গা-টা নীল নীল, বুকের কাছটা ফিকে খয়েরি, চোখটা কালো দিয়ে টানা - ও কি আবাবিল নয়? পায়রা আছে। ঝুঁটি বাঁধা পায়রাটাকে বড় পছন্দ হল হারুর। ন্যাপলা এগিয়ে গেছিল। সে একখানা রাজহাঁসের সামনে হ্যাংলার মত দাঁড়িয়ে রয়েছে। 


।৫। 

বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছিল। হারু অযথা সময় নষ্ট করেনি। সে হাট থেকেই রিক্সা নিয়ে নিয়েছিল। থলি তো ছোট, তাতে কতকিছুই আর ধরে! পাশে জড়সড় হয়ে বসেছিল ন্যাপলা। তার কোলের রাজহাঁসটি সারাক্ষণ প্যাঁক প্যাঁক করে যাচ্ছিল। 

যেন কতদিন ঘরে কেউ বসবাস করেনি। আজ তরিতরকারি এসে সংসারটিকে পুনরায় জীবিত করল। এত আলো কবে যে দেখেছিল হারু। ভাঙা উনুন বুঝি হাঁ করে আছে। সেটি কয়লা গিলে গিলে সংসারে উত্তাপ ছড়াতে চায়। কিন্তু ন্যাপলা আর যাই হোক আটপৌরে হতে শেখেনি এখনও। সে স্টোভ জ্বালিয়ে দিয়ে সমস্ত বাজার মেঝেতেই বিছিয়ে দিয়েছে। বটীতে পর্যাপ্ত ধার নেই। সসপ্যানের হ্যান্ডেলটি যারপরনাই নড়বড়ে। এই আগুনেই মাসীমা পুড়ে গিয়েছিল? ন্যাপলা খামোকা ছ্যাঁক করে উঠল। তার পেছনে দন্ডায়মান হারু। হারু হাত দুটিকে পেছনে নিয়ে নিয়েছে। ঘাড়টি সামান্য ঝুঁকিয়ে আছে। দেখলেই বোঝা যায় সে অক্ষরজ্ঞানী। ঢাকনার উপর যেকটি বোয়ালের পিস অবিন্যস্ত অবস্থায় রয়েছে, সেইদিকে তার খেয়াল নেই। 

ন্যাপলা অতিব্যাস্ত। এই শীতকালীন সন্ধ্যাতেও সে ঘামছে। হারুর দিকে তার তাকানোর সময় নেই। হারুর দিকে না তাকিয়েই সে হারুকে অমূল্য করে দিয়েছে। 

হারু ধীরে, অতি ধীরে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। বাইরে থেকে কিছু আলো আসিয়াছে, সেইটুকুই আলো, এই আলোয় সে সবকিছুকেই দেখিয়া লইল। এই যে চেয়ার রহিয়াছে, এই যে টেবিল, টেবিলের উপর কয়েকটি বই, ছেঁড়া পাতা, আহা ভঙ্গিমা, হারু যেন সচক্ষে দেখিল – হ্যাঁ, সে, সে-ই তো ঐখানে বসিয়া গোগ্রাসে লিখিয়া চলিতেছে। সে অক্ষরগুলোর পিঠে চাবুক কষাইতেছে। আজ সে নাছোড় হইয়াছে। দুটো তিনটে মহাভারত আজ তার কাছে নগণ্য জ্ঞানে পরাভূত। 

– হারুদা, ও হারুদা! 

ন্যাপলার ডাকে হারুর সম্বিত ফিরল বটে, তবে সে সহজে উঠল না। 

ন্যাপলা বলে চলেছে, এই যা হলুদগুড়ো কেনা হয়নি তো! এখন কী হবে? রসুনও নেই। হারুদা, ও হারুদা। 

হারুর টেবিলে তখন রাজহাঁসটি উঠে দাঁড়িয়েছে। তার দীর্ঘ গ্রীবা, মস্ত ডানা, সফেদ পালকের উপর ধুসর ছিট অস্পষ্ট আলোয় চমকিত করছে। 

– হারুদা, ও হারুদা! 

রাজহাঁসটি লাফিয়ে মেঝেতে নামল। হারুর দিকে তার চোখ নিবদ্ধ। সে গ্রীবা দোলাচ্ছে। ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে আবার হারুর দিকে তাকিয়ে নিচ্ছে। 

ক্ষুধা লিখো। অন্ন লিখো। নইলে তুমি খুনি! 

হে শীর্ণকায়া লেখক, হায় রচনাবলী, এইখানে হারুকে আশ্রয় দাও। সে শব্দকে জুতোর মত ছুঁড়ে ফেলতে রাজি হইয়াছে। তাহার আঙ্গুল নিশপিশ করিতেছে। তাহার মস্তিষ্কে উন্মাদনা জাগিছে। তাহার সঞ্চয় এখনও খরচ হয় নাই। পকেটে হাত দিলে কিছু রুপায়া এখনও মিলিতে পারে! 

ঘরের মধ্যে নিক্কন বাজিছে। ন্যাপলা কখন এসে লাইট জ্বালিয়ে দিছিল হারু খেয়াল করেনি। 

– কখন থেকে ডাকছি জানো? ন্যাপলা ঠোঁট উল্টিয়ে আছে, তুমি যেন একটা কী! কিছু মশলাপাতি কিনতে হবে গো হারুদা। যাও না একটু। 

– আবার? 

ন্যাপলা আর কথা বলল না। সে জানে হারু যাবে। হারুর অপচয়ের মধ্যেই তো ন্যাপলার অবস্থান। 

মা মরা ছেলে, মায়ের আত্মা এখনও গৃহত্যাগ করেনি, তবু ঘর থেকে এত আমিষ শব্দ আসছে কিসের? 

পড়শিরা কান পেতে ছিল। হারু থলি নেয়নি। রসুন আর মশলা কিনতে কি থলি লাগে? সে বুঝতে পারছিল কয়েকটি চোখ তাকে নিরীক্ষণ করতে ব্যস্ত। এদেরকে হারু চেনে। হারুর সহাবস্থান তো এদের সঙ্গেই। তবু হারু কারোর সঙ্গেই কথা বলল না। সে চাইছিল তাদের ঘরের সামনে যেন একটা কালো ঘোড়া দাঁড়িয়ে থাকুক। 

পাড়ার দোকানেই এইসব পাওয়া যায়। রসুন, মশলা, আচারের কৌটো। ন্যাপলা বলেনি, তবু সে জানে, বাসন মাজার জন্য সাবানও কিনতে হবে। এলাচ কী বাড়িতে আছে? থাকবার তো কথা নয়। ন্যাপলা তাকে জানাল না কেন? অহো, মৌরি ও মিছরিও কিনে নিল হারু। আর...আর...সে দোকানের দিকে নজর লাগাল। মুসুরির ডাল, ছোলার ডাল, জিরামরিচ, ছোট দানার চিনি। গরমশলা কেনা হয়ে গেছে। আর...আর? সে কাজু, কিসমিসও কিনে নিল। কখন যে দরকার লাগে বলা তো যায় না। হারু ন্যাপলাকে অবাক করিয়ে দিতে চায়। সে গোলাপের গন্ধওলা আগরবাতি কিনেছে। 

ফেরবার পথে হারু ভাবল, এই হয়েছে। এখন তার পকেট ঝনঝনে। আর বেশি কিছু কেনবার ক্ষমতা নেই তার। সে ফুঁৎকারে সঞ্চয় ওড়াতে পেরেছে। এখন সে অবলীলায় ধ্যানস্থ হতে পারবে। 

কিন্তু ঘরের দিকে দু-একজন উঁকি দিচ্ছে কেন? ঐখানে কি ন্যাপলা কোন দুষ্কর্ম করে ফেলেছে? 

সে লোকগুলোর দিকে চোখ ঘোরায়। কেউ কোন কথা বলছে না। একজনের ঠোঁটের কোণে সে তো অনায়াসে হাসি দেখতে পেল! 

ন্যাপলা। নেপু! ন্যাপলা কোথায়? 

ন্যাপলা কোথাও নেই। 

মেঝেতে যিনি পা ছড়িয়ে বসে রহিয়াছেন তাহার হস্তে হত্যার চিহ্ন স্পষ্ট। তখনও তালু থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। রাজহাঁসটিকে কাটতে গিয়ে ন্যাপলা ধুন্দুমার কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। 

তবু ন্যাপলার মুখে হাসি তো কমছে না। সফলতার আলোয় সে আলোকিত। 

ইতিমধ্যে মাংসের গন্ধে চারপাশ যেন আলোড়িত। রাজহাঁসটি পাখনা ছড়িয়ে শুয়ে আছে ষোড়শীর কোলে। 

– ন্যাপলা, নেপু। হারুর মুখ দিয়ে আর যেন স্বর বেরচ্ছে না। সে মুসুরির ডাল, ছোলার ডাল, জিরামরিচের ঠোঙা একে একে মেঝেতে রেখে দিতে থাকল। সে আড়চোখে ন্যাপলাকে দেখছে। ন্যাপলার হস্ত লোহিতবর্ণ ধারণ করিয়াছে। 

হায়, হারু তো বুঝিয়াছে, তাহার মহাভারত এইক্ষণে ষোড়শীর হস্তে উৎকীর্ণ। এই বর্ণকে নবযুগ কি লিপিবদ্ধ করিতে সক্ষম? 

হারু ধীরে, অতি ধীরে গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল।

1 টি মন্তব্য: