রবিবার, ১০ মার্চ, ২০১৯

সাঈদ আজাদের গল্পঃ ঝড়

ক.

কিগো ময়না, জামাইয়ের কোন খোঁজ পাইলা? বুড়ি ফজিলত আচঁল দিয়ে ঘাম মুছে। কপালের। ঘাড়ের, মুখের।

নাগো চাচী। যে ইচ্ছা কইরা হারায় তারে কি খুঁইজ্যা পাওয়া যায়!

না, মিছা কও নাই কথাটা! দেখলামত জনমভর। পুরুষগুলা সব একপদের। কী জামাই কী পোলা।...এই আমার পোলার কথাই ধর না। বাপ মরণের পরে কী কষ্ট কইরা পোলাটারে বড় করলাম! জামাই মরার পর শ্বশুরবাড়ি থাইক্যা এক কাপড়ে বিদায় কইরা দিল।
থাকার লাইগ্যা একফোঁটা জাগা দেয় নাই। বাধ্য হইয়্যা বাপের বাড়ি ফিরলাম। ততদিনে বাপ মা দুইজনেই কবরে। ভাইয়েরা মাথা গোঁজার জাগা দিলেও খাওন নিজেরই জোগাড় করা লাগছে। এখনত চাইলেই কাজ কাম কিছু না কিছু পাওয়া যায়। ...চল্লিশ বছর আগের কথা কইগো মা। তখন চারদিকেই অভাব আর অভাব! মাইনষের বাড়িত গতর খাটার কাজও মিলত না। কতদিন যে না খাইয়্যা থাকছি! ফ্যান আলুর ভাত এইসবও জুটত না। কী যে কষ্ট গেছে ময়না, তোমারে বুঝাইতে পারমু না। যাই কও, দুনিয়ায় খিদার কষ্টেরচে‘ বড় কষ্ট নাই গো!...তয়, নিজে খাইতে না পারলেও পোলারে খিদার কষ্ট বুঝতে দেই নাই কোন দিন। পোলা ডাঙ্গর হইয়্যা বিয়া কইরা মায়রে ভুলছে এখন। বউ লইয়্যা কই যে থাকে জানিও না। বুড়া বয়সে ইটের ভাটিতে কাজ কইরা খাইতে হয়। সবই নসীব!...আইজ রইদটা কেমন দেখছনি। শইল য্যান জ্বলতাছে।

কালো আঠালো মাটির স্ত্তপ সবার সামনে। বিশেষভাবে তৈরি এ মাটি। প্রথমে অন্য জায়গা থেকে মাটি ট্রাকে করে এনে গর্তে জমানো পানিতে ফেলা হয়। কয়েকদিনের থিতানো মাটি পানি থেকে তুলে, মাটি থেকে অন্যান্য বাজে জিনিস বেছে ফেলা দেওয়া হয়। তারপর ভিজা মাটি একটু শুকিয়ে এলে মথা হয় ভালমত। আগে শ্রমিকরা হাতে বা পায়ে মাড়িয়ে মাটি মথনের কাজ করত। আজকাল সে কাজ মেশিনে করা হয়। এই মাটি দিয়েই কাঁচা ইট বানানো হয়।

নারী পুরুষ সবাই মথিত মাটির স্ত্তপ থেকে দ্রুত হাতে খাবলা খাবলা নিয়ে কাঠের ছাঁচে ঠেসে ভরছে। পরে টিনের পাতলা একটা পাত দিয়ে অতিরিক্ত মাটি ছাঁচের উপরিভাগ থেকে সরিয়ে দ্রুতহাতে কাঁচা ইট বের করে আনছে। আরেকজন সেই কাঁচা ইট সারি সারি করে সাজিয়ে রাখছে। একসারি ইট উত্তর দক্ষিণ মুখি করে সাজানো হয়ে গেলে তার উপর আরেক সারি ইট পূর্ব পশ্চিম মুখি করে রাখা হয়। পরের সারি আবার উত্তর দক্ষিণ মুখি। পরের সারি পূর্ব পশ্চিম মুখি। এভাবে কাঁচা ইটগুলো সাজিয়ে রাখা হয়। কড়া রোদে ক‘দিন শুকিয়ে ইটগুলো শাদা হবে। পরে পোড়ানো হবে আগুনে। ভাটিতে কদিন ধরে জ্বলবে আগুন। চিমনির মুখ দিয়ে দমকে দমকে করে বের হবে ধোয়া। পুড়ে পুড়ে যখন লাল হবে মাটির ইটগুলো, ভাটির আগুন নিভানো হবে তখন। জেলায়, জেলার বাইরে ট্রাকে করে চলে যাবে ইটগুলো। যে ট্রাকে করে নরম মাটি আনা হয়েছিল ভাটিতে, হয়তো সে ট্রাকেই কঠিন ইট হয়ে ফিরে যাবে নরম সে মাটি।

সেই সকালে, যখন চারপাশ মাত্র ফরসা হতে শুরু করেছে তখন সবাই কাজ শুরু করেছে। চৈত্রের শেষ চলছে এখন। রোদের বড় তেজ । ময়না দরদর করে ঘামছে। তা হলেও হাত থেমে নেই ওর। অন্যরাও কাজ করছে মন লাগিয়েই। ইট বানানোর মওসুম শেষ হয়ে এসেছে প্রায়। এরপর বৃষ্টি-বাদলার দিন শুরু হলে ভাটিতে ইট বানানোর কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। ইট বানানো শেষ মানে ওদের বাঁধা রোজগারও শেষ। কাজ আবার শুরু হবে সেই শীতের শেষে। 

তা ভাটিতে ময়না কাজ করছে প্রায় দুবছর ধরে। আজকাল মাঝে মাঝে বড় মেয়েটাও হাত লাগায় ওর সাথে। ছিল আজও। খানিক আগে গেল। বোধহয় সড়কে খেলছে। আসলে রোদের তেজ দেখে ময়নাই মেয়েকে কাজ থেকে উঠিয়ে দিয়েছে। অমন কচি মেয়ে, পারে না কি দিনভর রোদে বসে থাকতে! তাছাড়া ছোটটার বয়স এখনও তিন হয়নি। সড়কের ওপাশে খাল। অল্পসল্প পানিতো থাকেই সবসময়। খেলতে খেলতে কখন আবার মেয়েটা পানিতে পড়ে। বড়টা কাছাকাছি থাকলে তাও দেখেশুনে রাখতে পারে।

ইট বানানোর কাজ বলতে গেলে সারাদিনই করতে হয়। দিন যখন শুরু, তখন ওদের কাজ শুরু। একটানা চলে দুপুরতক। তারপর ঘন্টাখানেক অবসর মেলে। রান্না গোসল খাওয়া দাওয়া এর মধ্যেই সারতে হয়। ফের কাজ শুরু হলে চলে দিনের আলো থাকা পর্যন্ত। আকাশে চাঁদ থাকলে কখনো কখনো অনেক রাত পর্যন্ত ও কাজ হয়। পুরুষরা রোজ চারশ টাকা করে পায়। মহিলারা পুরুষদের চেয়ে পঁঞ্চাশ টাকা কম- সাড়ে তিনশ টাকা পায়। অথচ হিসেব করলে মেয়েরা পুরুষের চেয়ে কম কাজ করে না। বরং বেশিই করে। পুরুষরা মাঝে মাঝে কাজ ফেলে উঠে গিয়ে বিড়ি টেনে আসে। খানিক বা গল্প করে আসে। মেয়েরা যতক্ষণ কাজ করে মন দিয়ে করে। তাও পঁঞ্চাশ টাকা কম পায় !

এ নিয়ে দু‘একবার মালিকের সাথে কথা বলেছে ওরা। ময়নাও ছিল সাথে। ওদের দাবী পুরুষদের সমান মজুরিই দিতে হবে ওদের। কাজতো সমানই করে সবাই।... মালিক তাদের সে দাবীর জবাবে বলেছে, নারীদের মজুরি পুরুষদের সমান হয় না। নাকি এটাই নিয়ম। না পোষালে চলে যাও।...সমান কাজ করেও সমান মজুরি পাওয়া যায় না! এমন নিয়ম কে করেছে কে জানে! 

তা রোজগার যা হয় তার অনেকটাই জমিয়ে রাখে ময়না। দু‘মেয়ে নিয়ে খেয়ে যতটা পারে আরকি।...বছর দু‘য়েক আগে রমজান বাধ্য হয়েই বউ আর মেয়ে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে এই ভাটিতে এসে কাজ নিয়েছিল। রমজান আর ময়না মিলে রোজগার খারাপ করত না।... মালিকের সাথে পরিচয় ছিল আগে থাকতেই। তাই ভাটির মাঠের এক কোণে সড়ক ঘেষে ঝুপড়ি তুলে থাকার সুযোগ পেয়েছিল। নৌকার ছইয়ের মত একটা ছাউনি। উপরে নাড়ার আচ্ছাদন। ...খরচ বলতে তিনজনে তিনবেলা ভাত খেতে যা লাগে। বলতে কী দুজনের জমত ভালই। ...ময়না ঝুপড়ির চালে লাউ বা কুমড়া বা শিমের গাছ তুলে দিত। পাশের একফালি জায়গায় কখনো কাঁচামরিচ কখনো বা পুঁইশাক কী পাটশাক কী ডাটাশাক ফলাত। তাতে তরি-তরকারির খরচ বাঁচত। একটা ছাগল কটা মুরগি চড়ত সব সময় ঝুপড়ির আশেপাশে।...চলছিল ভালই। ... সবার কপালে কি আর সুখ সয়! কেন কে জানে, একদিন দুপুরবেলা রমজান খুটায় বাঁধা খাসি ছাগলাটা নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল।...রমজান আর ফিরবে না। ফজিলতকে মিথ্যে বলেছে ময়না। রমজানের খোঁজ ময়না জানে। ফরিদপুরে ফের বিয়ে করে সংসার পেতেছে সে। অথচ, ময়নাকে পছন্দ করেইতো বিয়ে করেছিল রমজান। বিয়ের পর কী যে ভাল মানুষ মনে হয়েছিল রমজানকে। মেয়ে, বউ বলতে অজ্ঞান ছিল। অথচ সেই মানুষ ...

ও ময়না, কাজ বাদ দিয়া ভাব কী?

ফজিলতের কথায় হাত সচল হয় ময়নার। নাগো চাচী, কী আর ভাবমু। ...তুমি ঠিকই কইছ, বাঘের মতন রইদ উঠছে আইজ! শইল কেমন ঝিমঝিম করতাছে। 

তোমরা হইলা যোয়ান বয়সের মাইয়্যা। তোমগই যদি এমন লাগে আমার কী অবস্থা ভাব একবার।...তয় মনে অইতাছে ঝড়-বৃষ্টি একটা আইব। 

অমন কথা কইয়ো না চাচী! ঝড়-বৃষ্টি আইলে আমগ পেটে টান পড়ব। ভাটির কাম বন্ধ মানে আমগ রোজগার বন্ধ।

তা কি আর জানি না! তয় বৈশাখ মাসতো শেষ হইয়্যা আইল। ঝড়-বৃষ্টিরই সময় এখন। তোমার আমার কথায় কি আর ঝড়-বৃষ্টি বন্ধ থাকব।... তা কয়দিন ধইরা ভাবতাছি ময়না, একটা কথা কই তোমারে। আবার কী মনে কর।

কী কথা চাচী? কন না। আপনে মুরবিব মানুষ কী মনে করমু!

মুরুবিবই যখন মান, কথাটা কইয়্যাই ফালাই। কয়দিন ধইরা দেখি, মতি ছেরাডা তোমার কাছে ভিড়বার চায়। তুমি কি তারে লইয়্যা কিছু ভাবছ?

কী যে কন না চাচী! ঘরে আমার অতবড় মাইয়্যা। বেহুদা মাইনষেরে লইয়্যা কী ভাবমু!

এমন কইর‌্যা কইতাছ, য্যান মাইয়্যারা তোমার বিয়ার যোগ্য। বয়স আর কত হইব তোমার। বিশ বাইশ। 

চবিবশ বছর!

না হয় হইলই চব্বিশ। বাইশে আর চব্বিশে ফারাক কী! আজকাল এই বয়সের মাইয়্যাগ বিয়াই হয় না। তোমার না হয় নসীব মন্দ।...তা তুমি হইলা ঘরপোড়া গরু। তোমারে কী কমু। যা-ই কর, একটু ভাইব্যা চিন্তা কইরো। মতি যোয়ান বয়ইস্যা ছেরা। মাঝে মাঝে দেখি, ছেরাডা তোমার ঘরে যায়। কওনতো যায় না, কখন কী হয়। আর সব সময় মাইনষের ইচ্ছায় কি সব হয়! ... কথায় কয়, ঘি আর আগুন একলগে রাখতে নাই। কথাটা অন্যভাবে নিও না। তোমারে মাইয়্যার মত দেখি তাই কইলাম। আর ভাটিতে আকথা কুকথা কওনের মাইনষেরতো অভাব নাই। 

না গো চাচী, আমি ময়না হেই পদের মাইয়্যা না। মাইয়্যাগ মুখ চাইয়্যা জীবন কাইটাইয়্যা দিতে পারমু।

তাই বা করনের কাম কী। জীবন তো একটাই। সাধ আহ্লাদ কি নাই তোমার! মতি যে খারাপ ছেরা তাও কই না। জামাই যে আর ফিরব না, আমরা সবাই বুঝি। তয় কথা একটাই। যা কর ভাইববা চিন্তা, বুইঝ্যা শুইন্যা কইরো। মাইয়্যাগ লাইগ্যা ভাব, ভাল কথা। নিজের কথা ভাবা বাদ দিও না। দুনিয়াতে কেউ কারো নাগো মা। সময়ে পেটের সন্তানও পর হয়। আর শত হইলেও, তোমার দুইটাই মাইয়্যা। দেখতে দেখতে বিয়ার বয়স হইব। মাইয়্যারা জামাইর বাড়ি গেলে তোমারে দেখব কে? ... আমারে দেখ না। অল্প বয়সেই রাড়ি। বয়সকালে কতজন বিয়ার কথা কইত। পোলার মুখের দিকে চাইয়্যা সবাইরে ফিরাইছি। হেই পোলা এখন মা মরলে কবরে দুই মুঠ মাটি দিতেও আইব না। ... তাই কই, নিজের দিকটাও ভাইব্যো।

চাচী, সূর্যত মাথার উপরে আইস্যা পড়ল। তেজ আর সহ্য হয় না। শরীলটাও জুৎ লাগতাছে না। আমি যাই, চট কইরা কয়টা চাইল ফুটাইয়্যা আই। 

আইজত তোমার হাত চলল না। দুইশ বানানো হইছে ইট?

একশ আশিটার মত গণলাম। দেখি রইদ টা মরলে বাকী কয়টা বানামু।

পাঁচশ শেষ করতে পারবা? না হইলেত আবার মজুরি পুরা পাইবা না।

হ গো চাচী, পারমু। দরকার হইলে রাইত পর্যন্ত কাজ করমু। এই গনগনা রইদেরচে রাইত ভালা। আইজত আবার আসমানে চাঁদ থাকব।


খ.
কই গো ময়না পাখি, আছনি ঘরে?

আপনেরে না কইছি আমারে ময়না পাখি কইবেন না, শইল জ্বলে।

ঘরে আসলাম তোমার, বসতে কইবা না।

না কইলেই কী। বসবেনতো ঠিকই। আমারে জ্বালাইতে আইছেন। আর বসবেন মাডিতে, তা কওয়ার কী আছে।

তা বসে মতি। ময়নার কাছাকাছি বসে। মাটিতেই। ওর কাপড়ে গায়েও মাটি। ট্রাক চালায় মতি। ট্রাকে করে মাটি আনে ভাটিতে। খানিক আগেই ট্রাকভর্তি মাটি নিয়ে এল। খালি ট্রাক নিয়ে বিকেলের দিকে আবার বেরুবে। 

ময়না রান্নার তোড়জোর করছিল। মেয়ে দু‘টা যে কোন সময় ফিরবে। গোসলটা সেরে নিজেও ক‘টা মুখে দিতে হবে। ফের ইট বানানোর কাজে গেলে চলবে অনেক রাত পর্যন্ত। 

ফুলে ফুলে শাদা বরুন গাছের তলে ময়নার ঝুপড়িটা। নৌকার ছইয়ের মত দেখতে চালের উপরে চালকুমড়ার লতা। সবুজ পাতার ফাঁকে হলুদ হলুদ ফুল, ছোট ছোট দু‘তিনটা কুমড়া। ছাইগাদার পাশে ভেরেন্ডার ঝোপ। তার ছায়ায় দু‘মুখো একটা মাটির চুলা। পাশে রান্নার একটুখানি জায়গা। জায়গাটা তকতকে পরিষ্কার। সেখানে বসে রান্নার আয়োজন করে ময়না। আয়োজন সামান্যই। ঝুপড়ির পাশের ছোট খোলা জায়গাটায় পাটের বীজ ছিটিয়ে ছিল। মাঝে একবার বৃষ্টি পেয়ে পাট গাছ এখন একহাত মত লম্বা। তার কচি কচি পাতা ছিঁড়ে এনেছে। শাক রান্না হবে। চাল কুমড়ার ভাজি আর ভাত।

রান্নার আয়োজন নাকি?

দেখেন না।

সেতো দেখিই। এমনি জিগাই। তা রাধো কী?

পোলাও কোরমা!...পাট শাক ভাজি, চালকুমড়া ভাজি আর ভাত। 

মনে চাইতাছে তোমার হাতে পোলাও আর মুরগির মাংস খাই। রানবা?

মশকারা করেন ? তিনটা পেটে তিন বেলা ভাতই জোটে না।

হ, তুমিত আবার না খাইয়্যা টাকা জমাও।

জমাই কিয়ের লাইগ্যা জানেন না?

তা জানে মতি। অভাবে পড়ে বাড়ি বন্ধক দিয়েছিল ময়নার স্বামী। পঞ্চাশ হাজার টাকায়। অবশ্য বাড়ি বলতে শ্বশুরের অর্থাৎ ময়নার বাবার কাছ থেকে পাওয়া ভিটা। চার শতক, ময়নার নামে দলিল। টাকা শোধ করতে জামাই বউ মিলে ইটের ভাটিতে কাজ নিয়েছিল। তা প্রায় বছর দুয়েক আগে। তবে কাজ ময়না এখন একাই করছে। রমজান বউ আর দু‘মেয়ে রেখে চলে গেছে মাস ছয়েক আগে। এর পর থেকে আর খোঁজ খবর নেই। এখন ময়না একাই টাকা জমায়, দু‘মেয়েকে নিয়ে খেয়ে যতটা পারে। জমানো টাকায় বন্ধকী ভিটা ছাড়াবে ময়না। সবই জানে মতি। 

টাকা যে কিয়ের লাইগ্যা জমাও তুমি, তা জানমু না! কথার ফাঁকে, গল্পে গল্পে এইসব কতবার কইছ। তোমগ ভিটার বন্ধক ছাড়ার লাইগ্যা টাকা জমাও। তা জমছে কত?

দেখেন, কাজ করতে দেন আমারে। রান্ধন বাড়ন গোসল খাওয়া সাইরা এখনই আবার ইট বানাইতে যাইতে হইব। আপনের লগে গপ্প করার সময় নাই।

আমি আস্লে তুমি এমন কর কিয়ের লাইগ্যা! আমিত কইছিই, আমারে বিয়া করলে তোমার ভিটা ছাড়াইতে পারবা। আমিও একটা অটো কিনমু। টাকা যা পারি জমাইতেছে। একা মানুষ, কত আর খরচ হয়। বাজে কোন অভ্যাসও নাই। জমে পুরাটাই।...নিজে একটা অটো কিনার ইচ্ছা আমার বহুৎ দিনের। কইতে পার একটা স্বপ্ন! ...নিজের গাড়ি থাকলে কত সুবিধা। ইচ্ছা হইল চালাইলাম। ইচ্ছা হইল ভাড়া দিলাম। আবার মন চাইলে তোমারে আর মাইয়্যাগরে লইয়্যা ঘুইরা আইলাম।

দেখেন, উল্টাপাল্টা কথা কইয়া আমার সময় নষ্ট কইরেন না। দুই মাইয়া আর নিজের পেটের চিন্তায় বাঁচি না। 

তোমার মাইয়াগরে আমার নিজের মাইয়ার মতই দেখমু আমি। খালি তুমি রাজী হও। 

ক্যান দেশে আবিয়াতা মাইয়ার অভাব!

তা অভাব নাই সত্য, তয় তোমারে যে আমার পছন্দ. কী করমু কও।

ময়না চোখ তুলে তাকায় মতির দিকে। কোন কথা বলে না। মতির বয়স আটাশ কী ঊনত্রিশ। শক্তপোক্ত তাগড়া জোয়ান। সুঠাম শরীর। গায়ের রংটা মাজা মাজা। দেখতে খারাপ না। আগে আগে ভাটিতেই কথা বলত ময়নার সাথে। ক‘দিন ধরে ঘরে ঢুকে। গল্প করে, ময়নাকে লোভ দেখায়। নতুন সংসারের।...ময়নার একবার বিয়ে হয়েছে। মেয়ে আছে দু‘টা। চার বছরের, আড়াই বছরের। মেয়েদের রেখে স্বামী পালিয়েছে। ... এসব জেনেও মতি ওকে বিয়ে করতে চায়। বিশ্বাস হয় না। আবার যেন অবিশ্বাস করতেও মন চায় না। কথায় বার্তায় তেমন খারাপতো মনে হয় না। চাহনিটাও নির্দোষই মতির। তা হলেও, মতিকে নিয়ে কোন সিদ্ধান্তর কথা ভাবে না ময়না। ঠকে শিখেছে ময়না, চেহারা আর মিষ্টি কথায় মানুষ চেনা যায় না। কার মনে কী আছে কে জানে। মনতো আর দেখা যায় না।...মুখ নিচু করে পাটের শাক কুচি করে ময়না। বৈশাখ মাস শেষ হয়ে এল প্রায়। বাতাসটা কেমন থমথমে। ফজিলতের কথা বোধহয় ঠিকই। আকাশে একটু একটু করে মেঘ জমছে। হয়তো ঝড় বৃষ্টি হবে। বরুন ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়ে ময়নার ঝুপড়ির উপর। ভেরেন্ডার ঝোপের উপর। ভাটির কাছেই তিলের ক্ষেত, ফুলে ফুলে ছাওয়া। তাতে মৌমাছি উড়ছে। 

কী চুপ হইয়া গেলা যে! কও কিছু।

কী কমু। রাতদিন কাজ কইরা দম ফেলার সময় পাইনা, অন্যকিছু ভাবার সময় কই।...তয় আপনের সম্পর্কে অন্য কথা শুনি। গ্রামে বলে আপনের বউ আছে? 

কে কয় এইসব ফালতু কথা!

পুরুষ মাইনষের বিশ্বাস কী। সব পারে!

কথাটা শুইন্যা মনে বড় কষ্ট পাইলাম ময়না। আমারে এত খারাপ ভাবলা! গ্রামে বউ থাকলে তোমারে বিয়ার কথা কইতাম। আমি জানি তোমার জামাই তোমার লগে কী করছে। তাই বইল্যা সবাইরে তার মত ভাববা। যাক ভাবলে কী করা।... তোমার রান্না থোও। আমি মুরগি পোলাউর চাইল আর যা যা লাগে লইয়্যা আই। বলতে বলতে মতি উঠে দাঁড়ায়।

ময়নার পাট শাক কুচি করা শেষ। ঢেকে একপাশে রেখে দেয়। রাতে ভাজা যাবে। কুমড়া এখনো কাটা হয়নি। মতির ফিরতে সময় লাগবে। এই ফাঁকে ময়না ঝুপড়ির ভেতরটা আর রান্নার জায়গাটা ফের ঝাড়ু দিয়ে তকতকে করে রাখে। রোদটা হঠাৎ পড়ে গেছে। মেঘ থমথম করছে আকাশ জুরে। ঝড়টা যে কোন সময় আসবে। 

মতিকে যে বাজার করতে মানা করবে সেই সুযোগই পায়নি ময়না। বলতে কী মতির গলায় যে আন্তরিকতা ছিল, তাতে ইচ্ছেটাও যেন তেমন জোরালো হয়নি। আজই প্রথম তা নয়, আরও একদিন বাজার করেছিল মতি। রান্না শেষে খেয়ে দেয়ে সারা দুপুর ঘুমিয়ে তারপর গিয়েছে।...মতির সম্পর্কে কিছুই জানে না ময়না। বিয়ে করার কথা আন্দাজে বলেছে। একটু বাজিয়ে দেখা আরকি। বলাতো যায় না। গ্রামে বিয়ে করেও থাকতে পারে।...রহিমার বেলায় ঠিক তাই হয়েছে। ভ্যানচালক মোতালেবের সাথে বিয়ের তিন মাস না যেতেই গ্রাম থেকে মোতালেবের প্রথম পক্ষের বউ সাত মাস বয়সী মেয়ে কোলে হাজির।... অবশ্য মনে হয় না মতির তেমন কোন ঘটনা আছে। থাকলে গলায় অত জোর থাকার কথা না। 

মতি বাজার করেছে দু‘হাতে। মুরগি-পোলাওর চাউল-ডিম-আলু-পেয়াজ-টমেটু-শশা-তেল-মশলা, বাদ রাখেনি কিছু! তা রান্না করলও ময়না। মন দিয়েই করল। ঝরঝরে পোলাও। আলু দিয়ে মুরগির ঝাল মাংস ডিমের কোরমা। পেয়াজ শশা টমেটুর সালাদ। কত কত দিন পর মেয়েগুলো এত ভাল খাবার খেল! মেয়ে দু‘টা খেয়েই বের হয়ে গেছে। ছোটটাতো ডিমটা খেলই না। হাতে করে নিয়ে বের হয়ে গেল। পরে রসিয়ে রসিয়ে খাবে। 

পানও এনেছিল মতি। মেয়েরা বের হয়ে গেলে, নিজে এক খিলি মুখে পুরে ময়নাকে দিল এক খিলি। খয়ের আর জর্দা দিয়ে পান খেয়ে ময়নার মাথা কেমন ঝিমঝিম করছে।

মতি মাটিতে বিছানো কাঁথায় লম্বা হয়ে শুয়েছে। পায়ের উপর পা তুলে সিগারেট টানছে। ময়না ভেরেন্ডার ঝোপের কাছে বসে এঁটো বাসন কোসন মাজতে বসে।...বাতাসটা কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে আসছে। দেখতে দেখতে জোরে বইতে শুরু করল। সর্বনাশ! ময়না ভাটার দিকে দৌড় দেয়। কাঁচা ইটগুলো পলিথিনে ঢেকে দিতে হবে। পানি লাগলে ভিজে গলে যাবে। মালিকের ক্ষতি মানে ওদেরও ক্ষতি।

গ.
শোঁ শোঁ বাতাস বইছে। ধুলা আর পাতা উড়ছে বাতাসে। বড় বড় ফোঁটা পড়তে শুরু করল। সেই সাথে শীলা। গোল গোল মার্বেলের মত বরফের টুকরা চার পাশে পড়ছে। ততক্ষণে অবশ্য সবারই ইট ঢাকা শেষ। দৌড়ে গিয়ে অস্থায়ী ছাউনিটাতে আশ্রয় নিয়েছে সবাই । ...দেখতে দেখতে প্রচন্ড ঝড় শুরু হয়। সেই সাথে বজ্র। বজ্রের শব্দে কানের পর্দা ফাটার উপক্রম। বিদ্যুত চমকে সহসা সহসা আশপাশ আলোকিত হয়ে উঠছে। এর মধ্যে ছাউনির চাল চুঁইয়ে পানি পড়তে শুরু করেছে। যারা দাঁড়িয়ে ছিল, প্রায় সবাই ভিজে একশা। কী ঠান্ডা পানি! বৈশাখের দুপুরেও শীতে গা কাপছিল ময়নার! 

যেমন সহসা এল ঝড়, তেমন আচমকাই থেমে গেল। ইট ঢাকা পলিথিন উড়ে দূরে গিয়ে পড়েছে। ইটের সারির মাঝে মাঝে মাটিতে পানি জমে গেছে। পুরো ভাটি কাদা কাদা। হাঁটতে গেলে পা পিছলায়। তবে রোদ উঠেছে। হাসছে আকাশ। চারপাশ কেমন মোলায়েম। মেয়েদের কথা ভেবে উৎকণ্ঠিত হয় ময়না। কোথায় আশ্রয় নিল কে জানে! ভরসার কথা, ছোট হলেও এমন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অভ্যাস ওদের আছে।...মেয়েদের সাথে সাথে আরেকজনের কথাও মনে হয় ময়নার। সে মতি। ঝুপড়িতে থাকলে একক্ষণে ভিজে যাওয়ারই কথা মানুষটার।

সারি সারি সাজিয়ে রাখা ইট ভিজে ভেঙ্গে পড়েছে কোথাও কোথাও। কোন কোন ইট খানিকটা গলে গেছে। ওগুলোও বাতিল। ভেঙ্গে আবার বানাতে হবে।

ময়না ঝুপড়ির কাছে চলে আসে। চালের উপর বরুন গাছ প্রায় পুরোটা ভেঙ্গে পড়েছে। শুধু একটা ডাল এখনো মাথা উঁচু করে আছে। তাতে কিছু ফুল। কচি কচি দু চারটা ফল। ভেরেন্ডার ঝোপ মাটিতে শুয়ে পড়েছে। পায়ে কাদা, ঘাসে পা মুছে ঝুপড়ির ভেতরে ঢুকে ময়না।

মতি নেই! বোধহয় বৃষ্টি শুরুর আগেই চলে গেছে। কেন জানি একটু মন খারাপ হয় ময়নার। যাওয়ার আগে বলে গেল না! ময়না একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।... আপন মানুষই বলে যায় না। আর মতিতো পরই। দোষ দেওয়া যায় না মতিকে। যে ঝড় শুরু হয়েছিল, তাতে ঝুপড়িতে না থেকে বুদ্ধির কাজই করেছে। বরুন গাছটা যদি শিকড়শুদ্ধ উপড়ে পড়ত! মাটিতে বিছানো কাঁথা ভিজে সপসপে। বোধহয় চাল চুঁইয়ে পানি পড়েছে। বর্ষা আসার আগেই চালটা নতুন করে ছাইতে হবে। ...মেয়েরা এখনো ঘরে ফিরেনি। কোন বিপদ আপদ হয়নিতো? শঙ্কিত ময়না ঝুপড়ি থেকে বের হয়ে আসে। 

মাটিতে সিগারেটের গোড়া পড়ে আছে। বোধহয় মতিই ফেলে গেছে। মানুষ চলে গেলেও তার চিহ্ন থেকে যায়। মতি হয়তো কালকের আগে আর আসবে না। বেচারা! আসে ময়নার সাথে একটু মনের কথা বলতে। ময়না মতির সাথে ভাল করে দু‘টা কথাও বলনি কোনদিন। কাল কি আসবে মতি!

দেখতে দেখতে রোদের তেজ বাড়ে। বাড়ারই কথা। মাত্রতো দুপুর এখন। ঝুপড়ির চারপাশে ঝরা পাতা খড়কুটা লেপটে আছে মাটির সাথে। পরিষ্কার করতে হবে। তার আগে চালের উপর থেকে ডালগুলো সরানো দরকার।...চারপাশ পরিষ্কার করে চালের ডাল সরিয়ে ভেজা কাঁথা বালিশ বাইরে নিয়ে আসে ময়না। ঝুপড়ির পাশে বাতিল ইটের স্ত্তপ। বেশ উঁচু। তাতে কাঁথা আর বালিশ বিছিয়ে দেয়। রোদের যে তেজ, আশা করা যায় সন্ধ্যা নাগাদ শুকিয়ে যাবে।

ভেরেন্ডার ঝোপের নিচে থালা বাসন চাপা পড়ে আছে। সেগুলো বের করে খালের পানিতে ভালমত ঘষে মেজে ধোয় ময়না। এখন সময় আছে হাতে। ভাটির পানি না শুকানো পর্যন্ত ইট বানানোর কাজ বন্ধ থাকবে। তা পানি শুকিয়ে ভাটা কাজের উপযুক্ত হতে না হোক বাকী দিনটাতো লাগবেই। মাজা শেষ হলে থালা বাসন নিয়ে ঝুপড়ির ভেতরে ঢুকে ময়না। এতক্ষণ বাইরে থাকার দরুন ঝুপড়ির ভেতরটা কেমন আঁধার আঁধার লাগে। থালা বাসন রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই হঠাৎ ভয় গ্রাস করে ময়নাকে। ভালমত তাকায় ও। তাকাতেই শরীর কেঁপে উঠে। বিছানাটা যেখানে থাকে তার মাঝামাঝি মেঝের মাটি আলগা!

দু‘হাতে পাগলের মত মাটি খামচে গর্তটা উন্মোচন করে ময়না। নেই!... নেই! টিনের কৌটাটা নেই। বছর দুই ধরে কচি কচি মেয়ে দু‘টাকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে ছত্রিশ হাজার টাকা জমিয়ে ছিল ময়না। আগেতো কিছু শোধ করে ছিলই। আর হাজার দশেক টাকা হলেই ভিটাটা ছাড়িয়ে নিতে পারত। মাটি খুঁড়ে টিনের বাক্সসহ সেই টাকা মতি নিয়ে গেছে। জানল কী করে মতি! গল্পচ্ছলেওতো কোনদিন বলেনি ময়না।...ঝড়টা এমন অসময়ে এল! সহসা ঝড়টা না এলে কি আর ময়না মতিকে ঘরে একা রেখে বের হত।

মাটি লাগা দু‘হাত নিয়ে ময়না ঝুপড়ি থেকে বের হয়। বাইরে রোদ ঝাঁ ঝাঁ করছে। দৃষ্টি যেন ধাক্কা খায়। এমন রোদ! ভাটির চুলাতে নতুন করে কাঠ দেওয়া হয়েছে বোধহয়। চিমনির মুখ দিয়ে গলগল ধোয়া বের হচ্ছে। তিলের ক্ষেতে অনেক গাছই শুয়ে পড়েছে। তা হলেও ক্ষেতে মৌমাছি উড়ছে অনেক।...ময়না একবার মুখ তুলে বরুন গাছটার দিকে তাকায়। ঝড়ে সব ডাল ভেঙ্গে এখন একটা মাত্র ডাল গাছটার। ডালটা সটান আকাশের দিকে চলে গেছে। রোদ লেগে বৃষ্টি ধোয়া পাতা চকচক করছে।...ডালটার পাতা ফুল বেশির ভাগ ঝরে গেছে ঝড়ে। কচি কচি ক‘টা ফল ঝুলছে জীবনের সম্ভাবনা নিয়ে।

সড়ক থেকে মেয়ে দু‘টা মাকে দেখে দৌড়ে দৌড়ে আসছে। ওদের মুখে হাসি। বরুনের ডাল থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে মেয়েদের দিকে তাকায় ময়না। উজ্জ্বল রোদে দাঁড়িয়ে হৃতসর্বস্ব ময়নার স্বপ্নটা আবার যেন ফিরে আসে ! 





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন