সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

চণ্ডী মণ্ডলের গল্প : জীবনজন্ম

একটি লোক মারা গেছে।কোলকাতার রাস্তায় লোকটির শরীর—শব পড়ে আছে। 

পৃথিবীর মহান জীবনরসিক অভিজ্ঞ চিন্তাবিদ্গণ স্বীকার করেন একটি লোক যতই ব্যক্তিগত, স্বতন্ত্র হোক, শরীর আশ্রয় করা ছাড়া তার কোনো উপায় থাকে না। শরীরের মধ্যে দিয়েই একটি লোকের পরিচয়, বেঁচে থাকাকালীন জীবন, মন, ভাবনা, চিন্তা, কল্পনা, দায়দ্বায়িত্ব-যাবতীয় লোকিক-অলৌকিকতার –জীবনজন্মের সমস্ত প্রকাশ ঘটে। সুতরাং শরীরটাই একমাত্র আলোচ্য।

তাই যুবকটির মৃত্যু হয়েছে, তার এই শরীরটাকে ঘিরে কলকাতার জনতা উৎসাহিত হল। 

রাস্তায় শরীর পড়ে আছে, ইতিমধ্যে বিকেল এবং রাত্রি শেষ হয়েছে কিন্তু কেউ তার খবর নিল না। কেউ বলল না লোকটি তার পরিচিত ছিল। তাই প্রমাণিত হয়, তাকে চিনতে এমন কেউ ছিল না। অথবা, থাকলেও লোকটি যখন মারা গেছে অর্থাৎ তার শরীর নষ্ট হয়ে শবে পরিণত, এখন তার প্রতি মমতার কোনো প্রয়োজন নেই। তার সঙ্গে একদিন পরিচয় ছিল বা কোনোদিন পরিচয় ছিল না – সেই বিশ্বাসেই কেউ তার সম্পর্কে প্রথমে উৎসাহিত হয়নি, এও সম্ভব। কিন্তু জীবিতকালে, যখন কেউ বেঁচে আছে তখন তাকে দেখার, জানার, বোঝার বা অনুভব করার কি প্রয়োজন! কোনো প্রয়োজন নেই। কেননা সে সকল জীবিতদের মতই বেঁচে। হাজার লক্ষ কত লোক হাঁটছে, পাশাপাশি পথ চলতে চলতে কেউ ভাবে না তার পাশের লোকটি বেঁচে আছে। কিন্তু যখন সে মারা গেল সে তখন এমন একটা উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম যে সকলেই ভাবতে বাধ্য এই লোকটি বেঁচে ছিল ... এই লোকটি ছিল জীবিত; আর তখন প্রত্যেকেই নিজের সম্পর্কে সচেতন হয়, ভাবে সে নিজে এখনও বেঁচে আছে। ... কিন্তু হায়! একটি একটি মৃত লোক – মড়ার জন্যে কে কী করতে পারে! কেউ কিছু করতে পারে না। কিন্তু লোকটির মৃত্যুর কারণ কী, জনগণ অবশ্যই তা ভাববে, কেননা প্রত্যেক জীবিতই জানে সেও একদিন মারা যাবে কোনো না কোনো কারণে। জনগণ লোকটির মৃত্যুর কারণ অনুমান করার চেষ্টা করল। 

জীবতকালে লোকটি খুবই রোগা ছিল, মড়া একটা কঙ্কালের মতো দেখাচ্ছে। নিশ্চয় কোনো চাকরি ছিল না; অন্নবস্ত্র আর আস্তানার নিশ্চিত সংস্থান থাকলে শরীরের এই অবস্থা কিছুতেই হত না। মাথার রুক্ষ জটের মতো লম্বা চুল যদিও মুখের অর্ধেক পরিচয়ই ঢেকে রেখেছে এবং মুখের বাকি অর্ধেকের প্রায় সবটাই আড়াল করে আছে দাড়ি-গোঁফ তবু একশো ভাগই নিশ্চিত হয়ে মন্তব্য করা যায়, লোকটির মুখ ব্যর্থতার, হতাশার, যন্ত্রণার দীনতার প্রতিমূর্তি। আর কোনো সচেতন লোক লোকটির পোশাক সম্পর্কে কোনোরকম মন্তব্যই করতে পারে না , কেননা তাহলে প্রমাণিত হবে তার পোশাকের দিকে কেউ উৎসাহিত হয়েছিল। কিন্তু মৃত লোকটি যে বেঁচেছিল একবিংশ শতাব্দীর এত কাছের এই সময়ের পৃথিবীতে সে এই পোশাকে পরিচিত ছিল। যে কোনো জীবিত লোকের মনে মানুষের সেই পোশাক এমনই লজ্জার, এমন কদর্য নোংরা আর শতছিন্ন তার জামাকাপড়, ভাবলে সভ্যতার অগ্রগতি বিষয়ে ভেবে বিবেকের চাপে কেউ আর বেঁচে থাকতে চাইবে না। 

কিন্তু জনগণ লোকটির মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধে কোনো নির্ভরযোগ্য মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত করতে পারল না। সুতরাং দায়িত্ব সরকারের। সরকার জীবিত মৃত সকলকে পালন করে। পৃথিবীতে মানুষের ঈশ্বর যখন সরকার। 

যখন লোকটি জীবিত ছিল তখন সে কেমন করে বেঁচে ছিল অর্থাৎ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে কেমন করে সে তার শরীর মন পালন করে চলেছিল সে সমস্ত জানার দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের। কিন্তু সরকারকে দেশের সমস্ত লোকের কথা ভাবতে হয় তাই একটি বিশেষ লোক সরকারের দৃষ্টিতে ধরা না পড়াই স্বাভাবিক। তাছাড়া, সরকারের সহানুভূতিময় পর্যালোচনার দৃষ্টিতে দেশের জনগণ মানে এক একটি বিচ্ছিন্ন লোক নয় —জনগণ অর্থাৎ একটা সংখ্যাই শুধু সরকারের কৃপাময় দৃষ্টি পেতে পারে। কিন্তু মৃত্যু এমন উল্লেখযোগ্য ব্যাপার যে তখন একটি লোক বিশেষভাবে স্বতন্ত্র, তার দাবি অনেক জোরালো, বেঁচে থাকার চেয়ে তার ভূমিকা অনেক বলিষ্ঠ। এখন সরকারকে ভাবতে হবে লোকটির জীবন, তার জীবিতকাল, সম্ভব হলে তৎকালীন প্রতিটি মুহূর্ত —অর্থাৎ লোকটির মৃত্যুর কারণ কী ... সরকারকে জানতে হবে। এবং দেশের প্রত্যেক মানুষকে জানাতে হবে। 

সরকারি শববাহী গাড়ি ততক্ষণে পৌঁছে গেছে। গভীর তৎপরতার সঙ্গে সরকারি মর্গে লোকটার শব পৌঁছে গেল। 

মর্গের অন্ধকার ঘরে শব ফেলে রেখে একদিন একরাত্রি অপেক্ষার পর যখন নিশ্চিত হওয়া গেল, জীবিতকালে লোকটির কোনো আত্মীয় ছিল না; থাক বা না থাক, এখন আর তা ভাবার দরকার নেই – সরকার পরবর্তী দায়িত্বে নেমে পড়তে পারে। সকালে দুজন সশস্ত্র পুলিশ পাহারায় শব মর্গ নিকটবর্তী লাশকাটা ঘরে নির্বিঘ্নে পৌঁছে গেল। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হবে পোস্টমর্টেম। লাশকাটা ঘরের বাইরে সেই সকালে উদ্বিগ্ন আকাশ। এবং আবহাওয়ায় নানান দুশ্চিন্তা, 

জটিলতা; নিঃশব্দতায় মানুষের জীবন মৃত্যু রহস্যে, ভয়ে আব্বত উদ্বেগময় বৈরাগ্য লক্ষণ 

সৃষ্টি করেছে। 

শুরুতেই সমস্যা দেখা দিল। লোকটির নাম,ঠিকান--কোনো পরিচয় জানা নেই। জানার উপায় নেই। কিন্তু সরকারের দায়িত্বাধীন কিছুই পূর্ববর্তী ভুলচক বা ফাঁকির জন্যে পরবর্তী অধ্যায় অসম্পূর্ণ পড়ে থাকে না। পোস্টমর্টেম তালিকা-খাতায় নির্দিষ্ট একটি সংখ্যায় লোকটিকে চিহ্নিত করা হল। 

শব পোস্টমর্টেম টেবিল তোলা হল। সমস্ত আলো জ্বলে উঠল। টেবিল ঘিরে নবীন উৎসাহী শিক্ষানবীশ ছাত্রছাত্রীরা গভীর আগ্রহে শবে দৃষ্টি, মন, অনুভূতি নিঃশেষে নিয়োগ করলেন। পাশে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ। কিছুক্ষণ বাহ্য পর্যবেক্ষণ চলল। শরীরের কোথা কোনো ক্ষতি বা আঘাতের চিহ্ন নেই। কিন্তু শরীর পচে গেছে। তাই বিশেষ ডোমকে দিয়েই শরীরের বিশেষ বিশেষ অংশ, অঙ্গ কাটা হবে। তার আগে দুর্গন্ধ দূরকারী ওষুধ সর্বাঙ্গে মাখিয়ে দেওয়া হল। প্রথমে পেট। পেটের শীতল চামড়ার ওপর সাদা খুরটা জোরে চালিয়ে দেওয়ার পরই কালো-সাদা অদ্ভুত তরল কিছু রক্ত বেরিয়ে পড়ল। মড়াকাটা ওস্তাদ পেটের সেই কাটা ক্ষতের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ভেতর থেকে পাকস্থলী টেনে বার করে নির্দিষ্ট পাত্রে সেটা রাখল। বিশেষজ্ঞ এগিয়ে এলেন, শিক্ষানবিশগণ সাবধানে ঝুঁকে পড়লেন। পচা পাকস্থলী ঘেঁটে ঘেঁটে শেষপর্যন্ত দেখা গেল সেখানে এমন কোন খাদ্য নেই বা এমন কোনো চিহ্ন নেই যাতে প্রাথমিকভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যায় লোকটি বিষ বা বিষ-জাতীয় কিছু খেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। 

তখন পেটের মধ্যে আরো কয়েক মিনিটব্যাপী হাতড়ানো চলল। পেটের মধ্যে তীব্র আলো ফেলা হল। একেবারে এই দশকের আবিষ্কার গভীর অনুভূতিময় একটা যন্ত্র পেটের মধ্যে বসানো হল। কিন্তু টিউমার, কোনো জটিল ক্ষত বা অন্য কোনো রোগের চিহ্ন,লক্ষণ কিছুই ধরা পড়ল না। 

বুক। ওপরের চামড়া কেটে হাড়ের পাঁজরটা সাবধানে ফাঁক করে বুকের ভেতর থেকে বাসি রক্তমাখা দুটো ফুসফুস আর কালো হৃৎপিন্ডটা বের করা হল। ফুসফুস আর হৃৎপিন্ডের 

আলাদা দুটি পাত্র হাতে নিয়ে পরপর ম্যাগনিফাইং গ্লাসের মধ্যে দিয়ে দৃষ্টি চালিয়ে তারপর তীক্ষ্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন অনুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করেও ফুসফুসে বা হৃৎপিন্ডে কোনো ক্ষত, কোন রোগজীবাণুর সন্ধান মিলল না। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কপালে ঘাম জমে উঠল। ছাত্রছাত্রীরা উদ্বিগ্ন হয়ে চাপা গলায় পরস্পর আলোচনা শুরু করল। ডোমটি চিন্তিত মুখে ডাক্তারের মুখের দিকে তাকাল। 

ক্ষুর দিয়ে ঘাড়ের চামড়ায় একটা সূক্ষ্ম আঁচড় টানা হল। তারপর বিশেষ কৌশলে পিছনের চামড়াটা খুলে গেল একটা শব্দ করে। ফুটফুটে সাদা খুলিটা ফুটে উঠল। তখন বিশেষ হাতুড়ি মেরে খুলিটা নিপুণভাবে ফাটানো হল। জটিল ভেতরটা স্পষ্ট হল। তার মধ্যে থেকে ব্রেনটা বাইরে আনা হল। তারপর খুলি জুড়ে দিয়ে চামড়া টেনে দেওয়া হল। প্রাথমিক 

পরীক্ষায় ব্রেনে কোনো আঘাতের চিহ্ন ধরা পড়ল না, থ্রম্বোসিস হতে পারে এমন কোন বিপর্যয়ের চিহ্নও ব্রেনে আবিষ্কার করা গেল না। 

তরুণ শিক্ষানবিশগণ অদ্ভুত কৌতুহলে ডাক্তারের মুখের দিকে তাকালেন। ডাক্তার উদ্বিগ্ন হয়ে ডোমের দিকে পরবর্তী নির্দেশের সংকেত দিলেন। 

হাতের এবং পায়ের চামড়া কেটে কেটে সাবধানে মাংস খুঁড়ে খুঁড়ে কয়েকটা শিরা ও ধমনি শরীর থেকে ছিড়ে বাইরে আনা হল। শিরা ও ধমনির ছেড়া মুখগুলো দিয়ে অদ্ভুত রক্ত টপ টপ করে পড়ছে, সেই রক্ত একটা কাচের স্লাইডে সংগ্রহ করা হল। রক্ত এখন বর্তমানে যে অবস্থায় পৌঁছেছে সেই অবস্থা অনুসরণ করে পিছনে, আরো পিছনে আরো লোকটির শেষ জীবিত মুহূর্ত পর্যন্ত পৌঁছে দেখা গেল রক্ত শেষপর্যন্ত স্বাভাবিক ছিল, দুষিত হয়নি; যদিও রক্তের পরিমাণ খুব বেশি ছিল না কিন্তু লোকটিকে বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে তা যথেষ্টই ছিল। এমনকী রক্তে শ্বেতকণিকা সংখ্যা এবং শক্তিতে এমন উপযুক্ত ছিল যে মৃত্যুর কারণ এমন সমস্ত রোগজীবাণুদের যুদ্ধে পরাস্ত করার ক্ষমতা ছিল রক্তের। এরপর শরীরের বিশেষ বিশেষ অংশের মাংস কেটে কেটে কয়েকটা হাড়ের টুকরো বাইরে আনা হল। বিশেষ করে বুকের, পিঠের এবং কোমরের হাড়গুলোর প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়া হল। প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেল হাড়গুলো নীরোগ এবং মজবুত আছে — শরীরকে অটুট জীবন্ত রাখতে যা যথেষ্ট। 

প্রাথমিকভাবে সমস্ত পরীক্ষাই প্রায় শেষ। শরীরটাকে মোটামুটি সাজিয়ে বাইরেটা আর একবার দেখে নেওয়া হল। শেষপর্যন্ত মৃত্যুর কোনো কারণ পাওয়া গেল না। সুতরাং শব কিছুতেই এখন শ্মশানে পাঠানো সম্ভব নয়! 

সরকারকে অবশ্যই এই দায়িত্ব পালন করতে হবে, জানতে হবে এবং জনগণকে জানাতে হবে লোকটির মৃত্যুর কারণ কী, না হলে একটি লোকের জীবন অস্বীকার করা হয়। তাই মৃত্যুর সঠিক কারণ না জানা গেলে ভয়ঙ্কর সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। অবশ্য এ বিষয়ে নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ শরীরতত্ত্ববিদগণ সাধ্যাতীত সাহায্য করবেন সরকারকে। মৃত লোকটির ফুসফুসদ্বয়, পাকস্থলী, হৃৎপিণ্ড, ব্রেন, ছেঁড়া শিরা-উপশিরা, কয়েক কুচি হাড়, কয়েক টুকরো মাংস এবং এক চামচ রক্ত বিশেষ-পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। 

মৃত লোকটি লাশকাটা ঘরের পুরোনো টেবিলে কালো কাপড়ে ঢাকা অবস্থায় দশজন সশস্ত্র পুলিশের পাহারায় পড়ে রইল। 

জীবন-মৃত্যু বিভাগীয় সরকারি পদস্থ কর্মকর্তাগণ গভীর উদ্বেগময় ছ-ঘণ্টা কাটানোর পর খবর পেলেন পরীক্ষাগারে প্রায় ছ-ঘণ্টা ধরে সবচেয়ে জোরালো অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এবং অন্যান্য অনেক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে গভীর শ্রমশীল পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান শরীরের কোনো অঙ্গে কোথাও কোনো আঘাত, কোনো রোগ-জীবাণুর সন্ধান পাওয়া যায়নি। সকলে গম্ভীর হয়ে গেলেন। 

শব বায়ুশূন্য ঘরে সাজিয়ে রাখা হল। সেই ঘরেই কাচের আলমারির মধ্যে পর পর পৃথক পথক পাত্র সাজিয়ে রাখা হল – একটা হৃদপিণ্ডের, একটা মাংসের, একটা রক্তের, একটা 

হাড়ের —। 

ইতিমধ্যে সরকারি যোগাযোগ দপ্তর কলকাতার অফিস থেকে রেডিও টেলিফোনে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে খবরটা পৌঁছে দিলেন। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশেষ বিমানে কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন; সেই খবর তৎক্ষণাৎ কলকাতায় পৌঁছে গেল! সেই দিনই সন্ধেয় কলকাতার সমস্ত শ্রেষ্ঠ দৈনিক সংবাদপত্র দপ্তর থেকে বিশেষ টেলিগ্রাম বের করা হল। রেডিও বাংলা ইংরেজি হিন্দি খবরে লোকটির মৃত্যু, সরকারি তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞগণের কলকাতা যাত্রা বিষয়ক সমস্ত খবর পরিবেশন করল। শহরে সন্ধে থেকেই বিশেষ চাঞ্চল্য জেগে উঠল। 

একটি লোকের মৃত্যুর কোনো কারণ জানা যাচ্ছে না। দেশীয় বিশেষজ্ঞরা ব্যর্থ হয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞগণের বিশেষ বিমান ভোরেই কলকাতায় এসে পৌঁছবে। সকালে প্রত্যেক খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় হেডলাইনে বিশাল হরফে সেই খবর পি.টি.আই. সময় মতো সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সংবাদপত্র দপ্তরগুলোতেও খবর পৌঁছে দিয়েছিল। 

যথারীতি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা এসে পৌঁছেছেন। নির্দিষ্ট কক্ষে তাদের পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাইরে জনতা, সাংবাদিক, সরকারি পদস্থ প্রতিনিধিগণ সবাই উদ্বিগ্ন। 

বিদেশি বিশেষজ্ঞগণ আমেরিকার সাম্প্রতিকতম পরীক্ষামূলক যন্ত্রপাতি দিয়ে সুদীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা ব্যাপী পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গবেষণার পরও শরীরের কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ক্ষত বা রোগের চিহ্ন খুঁজে পেলেন না। সবাই বিস্মিত,হতাশ, উদ্বিগ্ন এবং আতঙ্কিত হয়ে পরীক্ষাগার থেকে বেরিয়ে এলেন। সেই খবরও আধুনিক উপায়ে কয়েক মিনিটেই গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। 

লোকটির মৃত্যু শেষপর্যন্ত একটা আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হল। শুধুমাত্র দেশীয় সরকার বা জনগণ নয়, পৃথিবীর সমস্ত দেশ, পৃথিবীর সমস্ত বুদ্ধিজীবী মানুষ রেডিও, টেলিভিশন, টেলিগ্রাম, টেলিফোন ও খবরের কাগজের মাধ্যমে দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও ভয় প্রকাশ করল। একটি মানুষের মৃত্যুর কারণ জানা যাচ্ছে না! মৃত্যুর কারণ জানা না গেলে মৃত্যুর হাত থেকে মানুষকে বাঁচানোর প্রয়োজনীয় ওষুধ আবিষ্কার করা যাবে না। পৃথিবীর অনেক লোক যদি এমনি অজ্ঞাত কারণে মারা যেতে থাকে, পৃথিবীতে যদি এই অদ্ভুত মৃত্যুরোগের মড়ক লেগে যায়! সেই মড়কে যদি পৃথিবী থেকে মানুষ নামে জীব লোপ পায়! পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষের জীবন ভয়ঙ্করভাবে বিপন্ন হয়ে পড়ল! 

এই মৃত লোকটি এখন অবশ্যই এই শতকের সবচেয়ে জরুরি সমস্যা সকলের আগে যার সমাধান অবশ্যই প্রয়োজন। না হলে পৃথিবীর জনজীবন মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হবে। একটা দারুণ ভয়াবহ মরণশঙ্কা এবং উদ্বেগ বিংশ শতাব্দীর এই শেষ অঙ্কের পৃথিবীর 

প্রখর সভ্যতাকে ম্লান, শূন্য করে দেবে। জীবনের জন্যে লক্ষ কোটি বছর ধরে ভোগ সুখের 

সামগ্রী, এই বিলাস নগর, স্কাইস্ক্র্যাপার, সংস্কৃতি, শিল্প, গবেষণা, পুরস্কার, উত্তেজনা, মদ, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, বার্ষিক শান্তি-বৈঠক ভোটযুদ্ধ, কৃত্রিম গ্রহ, মানুষের আত্মহত্যা, আত্মরতি, জীবনের যত জটিল আয়োজন মুহর্তে, দ্বিতীয়বার নিশ্বাসের আগেই সমস্ত ভেঙে চুরে গুড়িয়ে ধুলোয় মিশে যাবে। যাবেই! সেই পতন অনিবার্য ...। 

লোকটির শব অবহেলা করে কোনোমতে ভুলে যাওয়ার পথও নেই। এই সমস্যা এমনই তার সমাধান না হলে কিছুতেই নিস্তার নেই। 

অবশেষে শ্রেষ্ঠ দার্শনিক এবং চিন্তাবিদগণ এগিয়ে এলেন। টেবিলের ওপর লোকটির শব সাজিয়ে দেওয়া হল। তার হৃৎপিণ্ড ফুসফুস ব্রেন দার্শনিকেরা অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে লোকটিকে অনুভব করতে লাগলেন! বৈজ্ঞানিকগণ তাঁদের সাহায্য করছেন। সকলের যৌথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অনুভব অনুমানের ফলে একটি বিশেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সম্ভাবনা দেখা গেল। 

শেষপর্যন্ত মানসিক জটিলতার এমন একটা স্তরে লোকটি পৌঁছেছিল সেই জটিলতা স্নায়ুগুলোর সাহায্যে সমস্ত শরীর প্রক্রিয়ায় এমন প্রভাব বিস্তার করেছিল ... লোকটি একসময় অন্য সকলের মতোই আশাবাদী ছিল, স্বপ্ন দেখত, বিশ্বাস করত, কিন্তু ক্রমশ বাস্তব নানান স্তর পেরিয়ে এমন অভিজ্ঞতায় সে একসময় পৌঁছে গেল, সে ভাবতে বাধ্য হল, এই পৃথিবী, সংসার যা সে আশ্রয় করে আছে, যাকে সে ভালবেসে এসেছে – সেই সংসার, পৃথিবীর, পৃথিবীর কারো তার প্রতি কোনো, কোনও সহানুভূতি নেই। প্রত্যেকেই এখানে আত্মসীমায় বদ্ধ। কারো কোনো কিছুরই জন্যে পৃথিবীর কারো কিছুই এসে যায় না। এমনকি যে রমণী যা রমণীয় অনুভূতি বা বিশ্বাস বা আদর্শ যাকে সে তার একমাত্র আশ্রয়, অবলম্বন, পরম নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেছিল, বিশেষ বিশেষ অভিজ্ঞতায় সে বুঝল তার মৃত্যুতেও সেই প্রিয়তম পরম আত্মীয় তাকে ভাববে না, কারণ – সে তো মরেই গেল!...ক্রমশ আশাহীনতা, ব্যর্থতা আর ব্যর্থতাজনিত নানান উদ্বেগ আর অশান্তি, অতৃপ্তিতে সে সারাক্ষণ জীর্ণ থেকে জীর্ণতর হত – সময়ের প্রতিটি পদক্ষেপে সে হয়ে পড়ত আরো বেশি ভারাক্রান্ত আরো বেশি জটিল। সমস্ত কিছুকে সে সন্দেহ করত - এবং একপ্রকার অদ্ভুত উদাসীনতায় সে ক্রমশ শূন্যতায় ডুবে যেতে যেতে স্বাভাবিক সক্রিয়তা, উত্তেজনা বা জেগে ওঠার প্রতি ক্রমশ আরো অনীহায় সে আচ্ছন্ন হয়ে যেতে থাকে। তারপর সে যেন নিজেকে দেখল ভীষণ কুয়াশাময়। সমস্ত জগৎসংসার কুয়াশাময়। সে একা, নিঃসঙ্গ, সম্পর্কহীন। তখন থেকে তার অভ্যন্তরে একটা অদ্ভুত ইচ্ছার জন্ম হতে থাকে। কিন্তু তার বাহ্যিক শরীরে সেই ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন পড়েনি। একটা অদ্ভুত মানসিক ইচ্ছা তার সমস্ত শরীরে – ভিতরে ব্যাপ্ত হচ্ছিল ... আত্মহত্যা বা অন্য কী পথ আছে, জীবনযন্ত্রণা থেকে এই বেঁচে থাকার অহরহ অসহ্য যন্ত্রণা থেকে আত্মরক্ষার ... তখন থেকে তার প্রিয় পৃথিবীর প্রতি সে ছিল লাঞ্ছিত বিতৃষ্ণ এক প্রেমিক যেন। বাইরের কোনো চরম উত্তেজক শব্দ, ধ্বনিও তার কাছে পৌঁছত না। শুধু সারাক্ষণ সেই মৃত্যুর চিন্তা – মৃত্যুর ইচ্ছা। সেই ইচ্ছায় অনুপ্রাণিত তার মন তাকে যেন এক ভীষণ ঝড়ে অনেক দূরে টেনে নিয়ে গেল। তারপর জনতার। 

মধ্যেও অদ্ভুত নির্জনে সেই ইচ্ছা তার মস্তিষ্কের চারপাশের স্নায়ুমণ্ডলে ভয়ঙ্কর জটিলতার সষ্টি করল। তারপর সেই জটিলতা যার মধ্যে ছিল লোকটির আত্মহত্যা বা যে কোনো উপায়ে মৃত্যুর ইচ্ছা, সেই জটিলতা বিভিন্ন স্নায়ুর মধ্যে দিয়ে প্রাণকেন্দ্রে, হৃৎপিণ্ডে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে, সমস্ত কোষে রক্তের ভিতরে আলোড়ন তুলল। ফলে সমস্ত সময় গোটা আভ্যন্তরীণ শরীর ভীষণ আন্দোলিত হতে শুরু করল। চরম ক্ষমতা সম্পন্ন তাণুবীক্ষণ যন্ত্রেও তার কিছুই ধরা পড়তে পারে না ...। অবশ্য এর জন্যে যে বাস্তবিকই মৃত্যু হতে পারে তা সঠিকভাবে কিছু বলা যায় না। তবে একই সঙ্গে সমগ্র শরীর, হৃদপিণ্ড ফুসফুস মস্তিষ্ক রক্ত মাংস হাড় সকলেই যদি সেই অদ্ভুত ইচ্ছায় প্রচণ্ডভাবে উদ্দীপিত হতে থাকে তখন এক সময় হঠাৎ একটা গভীর ঘোরের ঘূর্ণিতে ডুবে সম্পূর্ণ আত্মবিস্মৃত হওয়া অসম্ভব নয়, অন্তত লোকটির ক্ষেত্রে তাই-ই হয়েছিল ... এবং শেষপর্যন্ত প্রতিপন্ন হয়েছিল লোকটি মৃত। কিন্তু লোকটির মৃত্যুর সঠিক কোনো কারণ জানা গেল না। আবিষ্কার করা গেল না। জীবিতকালীন তার অস্তিত্বকে, লোকটির জীবনকে তাই একরকম অস্কীকার করা হল। 

দার্শনিকগণ বিশ্বাস করলেন জীবনের এই অমর্যাদার জন্যে বর্তমান পৃথিবীর গঠন, মানুষের বেঁচে থাকর ভঙ্গিই হয়তো দায়ী। অথবা এ বিষয়ে কিছুই বলার নেই ... মৃত্যু একদিন না 

একদিন হয়, লোকটির ক্ষেত্রেও তাই-ই হয়েছে। তার বেশি হয়ত আর কিছু নয়। এটা বিশ্বাস করা ছাড়া আর কী-ই বা করার আছে মানুষের! 

তখন সংসার থেকে ফিরিয়ে নিয়ে লোকটির শব শ্মশানে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে সরকারি সৎকার সমিতির অতি পুরাতন জীর্ণ একটি গাড়ি সেই শীতের কুয়াশাময় শেষ বিকেলে, গাড়িটি যেন পৃথিবী, যেন জননী – তাকে তুলে নিল যন্ত্রণা জঠরে। 

সেখান থেকে শ্মশান এক জন্মের পথ। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন