সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

সাদিক হোসেন'এর গল্প : লিয়াকত আলির ঘুমের ভেতর

সেই কোন আমলের এক বিকেলবেলা, শরাফত মিঞার পুকুরের পার থেকে পিছলে পড়ে গেলে, লিয়াকত আলির উরুতে ভাঙা ঝিনুকের কোণা ঢুকে যায় আর লিয়াকত আলি পাঁক নাকি শাপলার ডাঁটা নাকি পোনা মাছের ডিমের ভেতর আছাড়পিছাড় খেতে খেতে কখনো ডুবে কখনো ভেসে কখনো পানি খেয়ে আধডোবা হয়ে আবার ভুস করে উপরে উঠে এলে নিজের কালোকিষ্টি গতরের ওপর পানির নকশা আঁকা দেখে । এমনও হতে পারে সে এই নকশার ভেতর বোয়ালের ঘাই মারার আওয়াজ আর গেঁড়ি গুগুলির বেআব্রু নাচন আর পাঁকের ওপর কল্লা উঁচিয়ে ঢ্যামনা সাপের চলে যাবার পর পাঁকের চমকে ওঠা - এইসব কিছুই - যা এতদিন তার এখতিয়ারের বাইরে ছিল - সে তার ঝিনুকে কেটে যাওয়া উরুর ক্ষতের ওপর খালাস করে দেয়!

এই সময় খোশ গল্প থামিয়ে তার দিকে যদি তাকাতে পার, দেখবে - সে অর্থাৎ লিয়াকত আলি অর্থাৎ সেই আমলে পুকুরে পা পিছলে পড়ে যাওয়া ছাবালটি এই এতদিন পরেও তন্দ্রা জমে এলে পর ঠিক বাম পায়ের উরু অব্দি লুঙ্গিটা তুলে কোঁচকানো চামড়ায় প্রায় এতিম হয়ে যাওয়া দাগটার ওপর কত মায়ায় হাত বুলিয়ে নিচ্ছে। তার শরীরে তুমি কি ভ্যাপসানো গন্ধ পাচ্ছ? তার শরীরে তুমি কি কতদিন ধরে থমকে থাকা পানিতে তিরতির করে মাছেদের চলে যাবার পর আচমকা আলোড়ন টের পাচ্ছ? না, লিয়াকত আলি অত সহজে আলোড়িত হবার লোক নয়। তবে তার ঘুমের ভেতর ঠিক ঘুমের মতো নরম হয়ে যদি একবার ঢুকে যেতে পার - লিয়াকত আলি দাঁত বার করে জানাবে, তা সে কী আর আজকের কথা গো। সেই সব দিনের কথা সব কি আর যখন তখন মনে পড়ে । তবু শুনবে বলে যখন এতদূর এইচো, না শুইনে কী আর পারা যায়! 

তখন জুলুবাবু সবে এসেছেন এই গ্রামে। তিনি শহরের মানুষ। তো এই অজ পাড়াগাঁয়ে করবেনই বা কী! সকাল থেকেই আরাম কেদারায় বসে বই পড়তে শুরু করেন। আর বেলা পড়ে গেলে বড় শালা আমজাজুদ্দিন মোল্লার ইটভাটায় গিয়ে কাজের তদারকি করেন। হিসেবপত্তর মিলিয়ে দেখেন। কিন্তু একমাস কাটতে না কাটতেই তিনি বুঝতে পারেন সঙ্গে করে আনা সবকটা বই-ই তাঁর পড়ে ফেলা হয়ে গেছে। বড় সমস্যায় পড়লেন জুলুবাবু। সময় আর তাঁর কাটতেই চায় না। এদিকে গ্রামে তখন পঞ্চায়েতের ভোট এগিয়ে এসেছে। চারদিকে বেশ গরম গরম আবহাওয়া। সন্ধে হলেই দু'একটা পেটোর আওয়াজ শোনা যায়। রাস্তাঘাট ফেস্টুনে মুড়ে গেছে । এইসব দেখে জুলুবাবু যেন কীসের সন্ধান পেলেন । তার বড় শালা আমজাদুদ্দিন গ্রামের মধ্যে বড় লোক। তিনি সদরে থাকলেও, তার বোনাই হবার সুবাদে জুলুবাবুকে এমনিতে সকলে সমীহ করে। সেই সুযোগে, জুলুবাবু একদিন বিরোধী পক্ষের লোকজনকে তাঁর বৈঠকখানায় ডেকে পাঠালেন। জুলুবাবু প্রথমে সকলের কথাবার্তা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা বলেন তো, মানুষেরা পঞ্চায়েতের কাছ থেকে কী চায়? 

কেউ বলে খাবার পানি চায়, কেউ বলে ঘর চায় আবার কেউ কেউ বলে রুজি-রোজগার। কিন্তু জুলুবাবু দুদিকে মাথা নেড়ে বলেন, তা না । আসলে মানুষেরা পঞ্চায়েতের কাছ থেকে অবাক হতে চায় । মানে এমন একটা কাজ আপনারা করুন যাতে সেই কাজ দেখে মানুষেরা বুঝতে না পারে আপনারা কী করতে চলেছেন । 

এরপর জুলুবাবু ফিসফিস করে মানুষগুলোকে কী করতে হবে তা বুঝিয়ে বলেন। 

কয়দিন পরেই দেখা যায় ছেলেবুড়ো সমেত অনেকেই পার্টি'র চিহ্ন আঁকা আর প্রার্থীর নাম লেখা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে আকাশে । আকাশ যেন পার্টির চিহ্নে পোয়াতি হয়ে গেলো । অন্যদিকে শাসকপার্টি এতে বেশ ধন্দে পড়ল । তারা যতই পথসভা করে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটের কথা বলে আসে - মানুষের মন যেন এসবে গলে না। অবশেষে তারাও একদিন জুলুবাবুর ঠোঁটের কাছে কান পাতলো । জুলুবাবুর কথা মন দিয়ে শুনে তারা আবার নতুন পন্থা অবলম্বন করলো । 

এতসবে জুলুবাবুর নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে । দেখা যায়, ভোটের পরে, সাধারণ মানুষদের সমস্যার কথা শুনে, তিনি সব অদ্ভুত অদ্ভুত সমাধান বাতলে দিচ্ছেন। সকলেই একবাক্যে স্বীকার করে, তিনি আর যে সে মানুষ নন; তিনি একজন জানলেঅলা মানুষ বটে । 

এই গ্রামে আসার আগে জুলুবাবু সওদাগরি ব্যবসা করতেন । সেই ব্যবসার সুবাদেই তাঁর বিভিন্ন অঞ্চল ঘোরা। বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ঘুরে তিনি সব আজব আজব ওষুধ সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁর শো-কেসে তাই লাল-নীল-হলুদ-সবুজ আরও কত কিসিমের বেটে-লম্বা-মোটা-ছোট বোতল রাখা আছে। এইসব বোতলে এক একটা রোগের জন্য এক এক রকমের ওষুধ। তিনি এইসব ওষুধ দিয়ে গ্রামের লোকদের রোগ সারিয়ে তোলেন। 

একদিন রাতে, চোরের মত ছুপিয়ে ছাত্তার এসে হাজির। কী হয়েছে? না, কয়দিন আগে পুলিসের সঙ্গে হুজ্জুতি করায় পুলিস লাঠি দিয়ে ছাত্তারের দাঁতে মেরেছে। এখন মাড়ি ফুলে ঢোল হয়ে গেছে, রক্ত বেরুচ্ছে - ছাত্তার কিছু খেতে পারছে না । 

সব শুনে জুলুবাবু ছাত্তারকে চেয়ারে বসিয়ে বলেন, এখন শুধু মনে মনে উলিস ফুলিস অন্ধ পুলিস - এইটা বিড়বিড় কর। 

ছাত্তার সেটাই বিড়বিড় করতে থাকে । 

জুলুবাবু সবুজ রঙের বোতলটা থেকে কিছুটা তেল বার করে তা ছাত্তারের গালের চারদিকে মাখিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর ছাত্তারের যন্ত্রণা কিছুটা কমে, সে বুঝতে পারে তার গালসমেত চোয়াল অবশ হয়ে যাচ্ছে। 

জুলুবাবু জিজ্ঞেস করেন, কোন দাঁতটা? 

- ডান দিকেরটা 

তিনি ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে দাঁতটা তুলে দেন। 

ছাত্তার দুদিকে মাথা নাড়ে । 

- যন্ত্রণা কমে নি? 

- না। 

জুলুবাবু পাশের দাঁতটাও তুলে নেন। এবার ছাত্তার জিভ ঠেকিয়ে বোঝে, তার 

আঘাত পাওয়া দাঁতটা সেভাবেই নড়চড় করছে । সে কোনোরকমে বলতে পারে, মোর ডানদিক মানে তো আপনার বামদিক, নাকি! 

- আগে বলবি তো। জুলুবাবু রাগ দেখিয়ে বামদিকের পাশাপাশি দুটো দাঁত তুলে দেন। 

যন্ত্রণায় কাহিল হয়ে ছাত্তার ঘুমিয়ে পড়ে ৷ তারপর ভোরবেলা সে পালিয়ে যায়। 


তো, সেদিন সন্ধে নামার আগে আকাশ কালো হয়ে এলো । বাতাস খানিক্ষণ থম্ মেরে দাঁড়িয়ে থেকে যখন নিঃশ্বাস ছাড়লো, সেই নিপ্শ্বাসের তোড়ে প্রথমেই ছলিমদের সুপুরি গাছটা টাল খেয়ে রমজানের টালির চালে হুমড়ি খেল আর রমজানের বিবি কুয়ো থেকে পানি আনতে গিয়ে দেখলো, এই মাত্র ভেঙে পড়া টালির ফাক দিয়ে একটা কাঠবিড়ালি তাদের ঘরে ঢুকে পড়েছে । এইসময় জুলুবাবু ইটভাটার ছোট্ট ঘরে বসে হিসেব কষছিলেন। কিছুতেই তার হিসেব মিলছে না। তিনি বিহ্বল হয়ে পড়েন। বাইরে বেরিয়ে দেখেন বাতাসের সঙ্গে ইটের ধুলো মিশে চারদিক কালচে লাল হয়ে গেছে। তাঁর হঠাৎ গলা শুকিয়ে আসে। মাল খাবার সখ হয়। তিনি একাই বেরিয়ে যান। 

সামনেই নদীর ঘাট । ঘাটের পাশে কলুদের একচালা ঘর । এখানে কলু ধেনো মাল বিক্রি করে। সেই ধেনো মালের আশায় দু-কদম বাড়াতেই আসমান চীরে নেমে আসা বৃষ্টির পানিতে তিনি একেবারে ভিজে একশা হয়ে যান। তা ভিজে গেলেও জুলুবাবুর কিন্তু সখ দমে না। তিনি ঠিক কলুদের ঘরের সামনে এসে ডাক পাড়েন। 

কলুর বউ দরজা খুলে অবাক, আপনি মাল খাবেন? 

- হুঁ। জুলুবাবু গম্ভীর হয়ে আসেন। 

- কিন্তু উনি তো সদরে গেছে। 

- তা, তোর কাছে কিছু নাই? 

কলুর বউ ফিক করে হেসে বলে, উনি না ফিরলি মুই দি কী উপায়ে? 

- দ্যাখ্না, যদি কিছু থাকে। 

কলুর বউ সেই রকম হাসতে হাসতে দরজা বন্ধ করে দেয় । জুলুবাবু সেইভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন খানিকক্ষণ। ঘর থেকে আর কোনো সাড়া শব্দ আসে না। এদিকে ঝড়-বৃষ্টি বেড়েই চলেছে। মাঝে মাঝে চকাত করে বাজ পড়ছে কাছে দূরে। কী মনে হতে জুলুবাবু আবার হাঁটা লাগান। এবার তিনি নদীর ঘাটে এসে বসেন। নদীতে তখন জোয়ার। কাছেই একটা নৌকা বাধা। নৌকার ভেতর বুঝি লম্ফ জ্বলছে। হাওয়ায় সেই আলো নিভে নিভে যায়। তবু এই নিভু নিভু আলোতেই জুলুবাবু যেন এক যুবতীর বদন দেখতে পান। এই অন্ধকারে, এই ঝড়-জলে কোথাকার নৌকা এসে ভিড়েছে তাদের ঘাটে? 

- কে? কে? জুলুবাবু হাক পাড়েন। 

কিন্তু তাঁর গলা ঝড়ের সঙ্গে তালগোল পাকিয়ে হারিয়ে যায়। নৌকাটা তেমনভাবে দুলতে থাকে। এই দোলন জুলুবাবুর সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তোলে। তিনি পার ধরে নদীতে নেমে নৌকাতে দু'বার ঠেলা দেন। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসে না। বাইরে শোঁ শোঁ করে বাতাস বইছে। জুলুবাবু চারদিকে তাকান। অন্ধকারে ঝড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে থেকে তাঁর চারদিক বড় অচেনা ঠেকে। এবার তিনি পাটাতনে উঠলে দেখেন, একটা মেয়েমানুষ দু'পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। 

- কোন গায়ের মেয়ে গো তুমি? 

জুলুবাবু এগিয়ে আসেন, অন্ধকারে তিনি মেয়েটিকে দেখতে পান না । তবে লম্ফের আলোটা কেঁপে উঠে মেয়েটার পায়ে পড়লে, তিনি দেখতে পান মেয়েটির দু'পা আলতায় লাল হয়ে আছে। মেয়েটি লম্ফের আলো ফু দিয়ে নিভিয়ে বলে, সবাই মোকে ফেলে পাইলে গেছে। 

- পাইলে গেছে? 

- হু। 

- এখন তুমি যাবে কোথায়? মেয়েটি কাঁদলে জুলুবাবু সাহস পেয়ে আবার বলেন, তা'লে আমার সাথে চলো। 

তিনি মেয়েটির হাত ধরতে যান। তখনি বিদ্যুৎ চমকের আলোয় মেয়েটির মুখ প্রকাশিত হয়ে পড়ে । 

মেয়েটি বলে, চিনতে পার নি? বলেই খিলখিল করে হেসে ওঠে । 

জুলুবাবু পেছনে সরে আসেন । 

মেয়েটি বলে, আমি ভেলুয়া, আমি তোমার ভেলুয়া গো । 

- ভেলুয়া! 

- হু। বলেন তো মুই কী করে এলুম! 

- কী করে এলি? 

- সেইসব জানতি গেলি মোদের ছোটলোকদের কাহিনীর ভেতর আপনাকে ঢুকতি হবে। তা, তুমি মোদের কাহিনীর ভেতর ঢুকবে কেন? এখন শুধু এইটুকু জানাতি এলুম, তোমার বড় বিপদ। 

- বিপদ? 

- হুঁ। 

- কেমন বিপদ? 

- ইটখোলায় অনেক কিসিমের মানুষজন আসা-যাওয়া করতেছে। তাদের সাথে মোদের গাঁয়েরও কেউ কেউ জুটেচে। ওদের উপর নজর দিও। 

- কী করতেচায় ওরা । 

- এর বেশী কিছু বলা যাবে না। ভেলুয়া উঠে পড়ে । 

জুলুবাবু বলেন, এখন আর যাবি কোথায় । আয় না, মোরা দু'জনে এই নৌকাতেই থাকি। 

- মনে নেই মোর কী শত্ত ছ্যালো? 

- কী? 

ভেলুয়া সুর করে বলে - 

ধীরে ধীরে বলে কৈন্যা - শুন সদাইগর। 

আমার কাছে না আসিবা ছ'মাসের ভেতর ॥ 

এহার অন্যথা হৈলে বিষ করি পান। 

নিরচয় নিরচয় আমি তেজিব পরাণ॥ 

জুলুবাবু চুপ থাকেন খানিক। তারপর যেন মোক্ষম উত্তরটি পেয়ে গেছেন, এমনভাবে বলেন, কিন্ত আমি তো আর সওদাগরি কারবার করি না। 

ভেলুয়া গম্ভীর হয়ে আসে । বলে, যাও, তোমার বড় বিপদ । 

এই পর্যন্ত বলে লিয়াকত আলি থেমে যায়। তখনি তার ঘুমের ভেতর ঘুমন্ত ছাতিম গাছটা আচমকা জেগে উঠলে, সেই গাছে বসে থাকা সাদা সাদা বকেরা খানিক উড়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে যে-যার জায়গায় বসে। উড়ন্ত বকেদের সেই পাখনা ঝাপটানোর আওয়াজ কিন্তু তুমি শুনতে পাও না। অথচ লিয়াকত আলি সেই দিকেই ইশারা করে বলে, ঝড়ের রাতে যে-কাঠবিড়ালিটা রমজানের ঘরে ঢুকেছ্যালো তার সাথে রমজানের বেশ দোস্তি বনে যায়। সে তার জোব্বার ভেতর কাঠবিড়ালিটাকে এমনভাবে লুকিয়ে রাখে যাতে বাইরের কেউ তা দেখতে না পায়। কাঠবিড়ালিটির সাথে তার যেন গোপনে পীরিত চলে । 

সেদিন রাতে ঝকাস্‌ চাদ উঠেছে। ভাঙা টালির ফাক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে বিছানায় । রমজান কিন্তু জোব্বাটা পরে পাশ ফিরে শুয়ে আছে । তার বউ আসমা যত তাকে কাছে ডাকে তত সে সরে সরে যায়। একসময় আসমা জোর করে জোব্বার ভেতর হাত দিতে গেলে কাঠবিড়ালিটা কুটুস করে তার আঙুল কামড়ে দেয়। সে রাগে কাঠবিড়ালিটাকে ধরতে গেলে সেটি চিঁচিঁ করে চেঁচিয়ে লাফ দিয়ে খাটের তলায় চলে যায়। রমজান বউকে সরিয়ে খাটের নিচে উঁকি দিলে আসমা রাগে গরগর করতে থাকে, যদি মোকে কিচু না করতি চাও তো বে করেছ্যালে কেন? 

রমজান উত্তর করেনা । 

আসমা আরো ঝাল মিশিয়ে বলে, তবে তোমার গতরে জোর নাই। সেইটাই বল না কেন? 

বউ-এর ঝাল খেয়ে সে জ্বলেপুড়ে যায় । কাঠবিড়ালিটাকে আবার জোব্বার ভেতর পুরে বলে, তুমি মোর মায়ের পিঠের মত। 

- একী বললে! আসমার মাথায় বাজ পড়ে । রমজান তার কাছে এলে সে গুটিয়ে যায়। 

- মোকে ছুঁও না, মোকে ছুঁও না, এতে গোনা আছে। 

বড় পেরেশানে পড়ে রমজান, দ্যাখো, রাগের মাথায় কী বলে ফেললুম। না, এতে গোনা নেই। এই তো মুই কান মুলতিচি । 

আসমা বলে, যদিও তুমি মোকে তালাক দাও নি। তবু তুমি যে-কথা বললে তারপরে কি মোদের দুজনের ভেতর আর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আছে? তুমি বরং জুলুবাবুর কাছে যাও । উনি অনেক জানলেঅলা মানুষ। উনি কী বলেন তা শুনে এসো। 

- কিন্ত ওনার কাছে এইসব বলতি যে মোর শরম লাগবে। 

অবশেষে আসমা নিজেই একদিন জুলুবাবুর কাছে চলে যায় । জুলুবাবু তখন আরাম কেদারায় বসে ডিটেকটিভ বই পড়ছিলেন। 

আসমা বলে, বাবু মোর বালবাচ্চাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাও। 

জুলুবাবু সব শুনে বলেন, এখন তুই তোর স্বামীর কাছে হারাম হয়ে গিছিস। 

- হায় আল্লা! 

- অত কাঁদিস কেন? তোর তো বালবাচ্চা এখনো হয়নি । 

- আপনি কত জানলেঅলা মানুষ। একটা মাসলা বাতলে দিন। 

জুলুবাবু কতক্ষণ চুপ থেকে বলেন, তালে শোন, তোর বরকে একটা গোলাম বা বাঁদি আযাদ করতে হবে। 

- মোদের তো গোলামই নেই । আযাদ করব কাকে? 

- তবে তোর বরকে টানা ৬০দিন রোজা রাখতে বল। 

- একবেলা না খেলিই তো উনি কেলিয়ে পড়েন । ৬০দিন রোজা রাখবে কী করে। 

- তালে ৬০ জন মিসকিনকে একবেলা খাওয়াতে বল। 

- উনি তো পরের দলিজে কাম কাটে। মোদেরই দুবেলা খাবার জোটে কোনোরকমে। ৬০ জনকে খাওয়াবো কী উপায়ে? 

- অবশ্য আর একটা মাসলা আছে। তা কি তুই করতে পারবি? 

আসমা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলে, পারব । সব পারব । 

জুলুবাবু শো-কেসটা দেখিয়ে বলে, ওখানে একটা লাল রঙের তেলের শিশি রয়েছে। ওটা নিয়ে আয়। 

তেলের শিশিটা আনলে জুলুবাবু বলেন, এইটা নিউমার্কেট থেকে কিনে এনেছিলুম। অনেক দিন ব্যবহার করি নি। শুঁকে দ্যাখ কী সুন্দর বাস। 

আসমা তেল নিয়ে জুলুবাবুর মাথায় তা মাখতে যায়। অমনি জুলুবাবু ধড়মড়িযে ওঠেন, কী করিস, কী করিস । এটা মাথায় দেবার তেল না । 

- তবে? 

- তবে যেন তুমি কিছু বোঝোনা! 

জুলুবাবু আসমাকে ইশারা করেন । আসমা জুলুবাবুকে তেল মাখিয়ে দিলে জুলুবাবু তাকে গুনে গুনে ৬০ খানা খেজুর দিয়ে বলেন, কাল সকালবেলা এইগুলো ৬০ জন মিসকিনকে দিয়ে দিবি। এবার যা । 

আসমা কিন্তু সেখান থেকে নড়েনা। 

- আবার কী হলো। যা। 

আসমা শরমের মাথা খেয়ে বলে, এই শিশিটা থেকে মোকে একটু খানি তেল দেবে? 

জুলুবাবু আসমার দিকে ছুঁচলো মুখে চেয়ে থাকেন । 


এখন জুলুবাবুকে নকল করেই বুঝি লিয়াকত আলি ঘুমের ভেতর মুখ কোঁচকায়। তুমি লিয়াকত আলিকে সজাগ করে বলো, এদিকে জুলুবাবুর তো বিপদ! 

লিয়াকত আলি বলে, এখানেই তো মজা । এখন মোর ঘুমের ভেতর যেরমভাবে জিনিসগুলো 

আসতেছে, মুই সেইভাবে বলে চলতিচি। কোনটা আগের, কোনটা পরের তা তোমরা বিচার করো গে। 

- মানে আগে-পরের ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র থাকবে না! 

লিয়াকত আলি খানিকক্ষণ চুপ থাকে। তোমার প্রশ্নের ফয়সালা করে না। বলে, একটু আগে ঘুমন্ত ছাতিম গাছটার আচমকা জেগে ওঠার দরুণ বকগুলোর উড়ে যাবার কথা যে বলেছিলুম, তা একটা ঢপ। 

- মানে, বকগুলো ওড়েনি? তাই তো বলি, আমরা বকগুলোর পাখনা ঝাপটানোর আওয়াজ কেন শুনতে পেলাম না । 

- না,ঠিক তা না। 

- তবে? 

- বকগুলো উড়েছ্যালো ঠিক । কিন্ত এর পিছনে অন্য কারণ আছে। 

– মানে, অন্য গল্প? 


লিয়াকত আলি বলে, জুলুবাবু যে ঘরটায় থাকতেন, তার পশ্চিমমুখো জানলাটা খুললেই দেখা যায়, একটা জলাভূমি পা ছেতড়ে শুয়ে আছে। বর্ষাকালে এই জলাতে এক হাঁটু পানি জমে । তখন শীত সবে শুরু হয়েছে। মিহি কুয়াশার দানা জলাটির ওপরে যেন কফিনের মত সফেদ ভয় ঢেলে দিয়েছে। জুলুবাবু জানলাটা খুললে, এই ভয়টুকু দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন । আরও লক্ষ করলে তিনি দেখতে পান কয়েক'শ সাদা বক পাখনায় আর বুকের পশমে আর রোগা পায়ের ডগায় কুয়াশা মেখে বসে রয়েছে । জুলুবাবু আর দেরি করলেন না। তাঁর খাটের পাশে একখানা গাদা বন্দুক রাখা ছিল। তিনি বন্দুকটা নিয়ে, হাঁটু অব্দি উঁচু জুতো পরে বক শিকারে বেরিয়ে পড়লেন। জলায় নেমে অতি ধীর পায়ে তিনি বকের সারির দিকে এগোতে থাকেন। একটা বককে লক্ষ্যে রেখে বন্দুক তাগ করলেন। বকটাও বুঝি কিছু বুঝতে পেরেছিল। সেটিও ঘাড় বেঁকিয়ে জুলুবাবুর দিকে তাকায়। অমনি জুলুবাবু গুলি ছোড়েন। গুলির আওয়াজে চমকে উঠে ঝোপঝাড় থেকে চার-পাচজন মেয়েমানুষ হাঁটু অব্দি শাড়ি তুলে উঠে দাঁড়ায়। জুলুবাবু ভ্যাবাচাকা খেয়ে যান। তার হাত থেকে বন্দুকটা আপনা-আপনি নিচে নেমে আসে। অন্য মেয়েগুলো আবার ঝপ করে বসে পড়লেও একটা মেয়ে সেইভাবে দাঁড়িয়েই থাকে। সে ভেলুয়া। জুলুবাবু এবার ভেলুয়ার দিকে বন্দুকটা নিশানা করে বলেন, এখানে কী করছিস? 

ভেলুয়া শাড়িটা নামাতে ভুলে গেছে । সে ফিকফিক করে হাসতেই থাকে। 

জুলুবাবু হাক ছাড়েন, এত সকালে তোরা এখানে কী করছিস? 

- এ্যাতো সকালে মানুষ কী আর করে । মোরা যে হাগতে এইছিলুম। 

- এটা কি হাগার জায়গা? 

ভেলুয়া তবু হাসি থামায় না। ঝোপের ভেতর লুকিয়ে থাকা মেয়েগুলোও এবার খুকখুক করে হাসে । সেই হাসি শুনে জুলুবাবুর রাগ চড়ে যায়। 

- এ্যাতো জন একসাথে হাগতে বসেছিস? তোদের শরম লাগে না? 

জুলুবাবু বন্দুকটি উচু করে ট্রিগারে চাপ দেয় । কিন্তু তার হাত কেঁপে যাওয়ায় আর আচমকা দমকা হাওয়া আসায় গুলিটি ভেলুয়ার উড়ন্ত চুল ছুঁয়ে বকের সারির দিকে বেরিয়ে যায় । তাতে বকের গায়ে গুলি না লাগলেও একটা বক অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে । 

খানিক পর ভেলুয়া বকটার পালক ছাড়িয়ে, পিস পিস করে কেটে জুলুবাবুর বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসে। 
জুলুবাবু নাক সিটকান। বলেন, কাটবার আগে হাত ধুইছিলিস? 

এবার ভেলুয়া যেন অভিমানী হয়ে পড়ে। মোরা গরীব মানুষ বলে কি বড়লোকদের কাছ থেকে ছুঁচোনোটাও শিখতে হবে! বলেই সে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে । কিন্তু তার বেরিয়ে আসার ভঙ্গিমাতে বুঝি কীসের যেন ইশারা পেয়ে যান জুলুবাবু। এরপর তিনি কয়দিন উঠে উঠে জলায় গিয়ে বন্দুক ফাটান। গুলির শব্দেও কোন মেয়ে আর ঝোঁপ থেকে উঠে আসে না। খালি হাসির শব্দ পাওয়া যায়। জুলুবাবু ভেলুয়ার ভাবনায় আরও কাহিল হয়ে পড়েন। 

একদিন দুপুর বেলায় জুলুবাবু এমনি এমনি ঘুরছিলেন। তিনি শরাফত মিষ্ণার পুকুরের কাছে গিয়ে দেখেন একজন মেয়েমানুষ কাঁখের কলসীটা পুকুরের পারে রেখে পানিতে নামছে । তিনি কাছে গেলে বুঝতে পারেন মেয়েটি ভেলুয়া। 

জুলুবাবু বলেন, তোর জন্যে আমি রোজ জলায় গিয়ে বন্দুক ফাটাই। তা তুই জানিস? 

ভেলুয়া চুপ থাকে। তার চোখ দিয়ে পানি নাবে। 

– কাঁদিস কেন?
ভেলুয়া চোখ মুছে বলে, চারদিন আগে মোর ভাতারকে গুলি করে এই পুকুরেই ভাসিয়ে দিছিল। সেই খবর আপনি রাখেন না? 

– বাদল তোর ভাতার ছিল? 

ভেলুয়া আবার কাঁদতে থাকে । 

জুলুবাবু কাছে গেলে, সে সুর করে বলে-_ 

কাঁদিয়া কহিল কৈন্যা শুন সমাচার । 
কলিজা মোর চারিদিনে হৈয়াছে অঙ্গার ॥ 
নিন্দ্রা নাই ছিল আমার চোগের পাতায়। 
মাথার বিষেতে আমার পরাণ যায় যায় ॥ 

ভেলুয়া মুহুর্তে পানিতে নেমে ডুব দিয়ে তলিয়ে যায় । সেই দিকে তাকিয়ে জুলুবাবু ভাবেন, ভেলুয়া এখন এই সবুজ পানির তলায় তার মরা স্বামীর সাথে বুঝি কত না-বলা কথা বলে নিচ্ছে। তখনি পানিতে শব্দ তুলে ভেলুয়া ডাঙায় উঠে আসে । 

জুলুবাবু বলেন, আজ সন্ধেবেলা তোর ঘরে যাব । 

ভেলুয়া চোখ নাচিয়ে দু'দিকে মাথা নাড়ে- -

ধীরে ধীরে বলে কৈন্যা - শুন সদাইগর। 
আমার কাছে না আসিবা ছ'মাসের ভিতর ॥ 
ইহার অন্যথা হৈলে বিষ করি পান। 
নিরচয় নিরচয় আমি তেজিব পরাণ ॥ 

ভেলুয়া জুলুবাবুকে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। জুলুবাবু দেখেন পুকুরের পারে ভেলুয়ার পায়ের দাগ ফুটে আছে। তিনি জুতো খুলে সেই দাগের উপর নিজের পা বসান। এতে বেশ আনন্দ হয় তাঁর। তিনি এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। তার মধ্যে কোনো নড়নচড়ন দেখা যায় না। এই সময় একটা দাঁড়কাক জুলুবাবুকে বাজেপড়া ন্যাড়া গাছ মনে করে, উড়ে এসে, তাঁর মাথায় গিয়ে বসে। জুলুবাবু তবু পাখিটাকে উড়িয়ে দেন না। লিয়াকত আলি খানিকটা খোলাসা করে জানায়, আর জুলুবাবু জানবেই বা কী উপায়ে? আসলি কথা হলো, দাঁড়কাকটা মোর খেয়ালের ভেতর থেকে উড়ে গিয়ে ওনার মাথায় বসেছিল । এরম অনেক কিছু আছে, যা জুলুবাবু জানেন না। 

- যেমন? 

- যেমন ধর, সেই ঝড়জলের রাতে জুলুবাবু যখন কলুর ঘরে মাল টানতে গিছিল, কলুর বউ বলেছিল তার বর সদরে গেছে। কথাটা কিন্তু পুরোপুরি মিচে কথা । সেই সময় কলু দলবল নিয়ে জুলুবাবুর ঘর থেকে গাদা বন্দুকটি চুরি করতে গিছিল। 

- আর জুলুবাবু? 

একদিন অন্ধকারে, কলু তার দলবল নিয়ে জুলুবাবুর পথ আগলে বলে, বাবু আপনার খেল খতম । : 

- আমি তো খেলাই শুরু করিনি। 

- কী খেলা খেলতি চাও? 

- কী করেছি আমি? 

- সেইসব মানুষের বিচারে ঠিক হবে। 

- তোমাদের সকলকে পুলিসে দেবো। পালাতে পারবে না । 

- মোরা ইয়ে, মানে পানির মধ্যে মাছেরা যেরম লুইকে থাকে, তেমনি মানুষের মধ্যে লুইকে থাকি। 

কলুর ইশারায় তার দলবলের লোকজন জুলুবাবুর মুখে গামছা বেঁধে কোলে করে নিয়ে চলে যায়। 

পরের দিন সকালবেলা। 

আমজাদুদ্দিন মোল্লার ইটভাটাটা থমথম করছে। কাজকাম সব বন্ধ। একটা গাছের সঙ্গে জুলুবাবুকে বেঁধে রাখা হয়েছে। খানিক পর তার বিচার শুরু হবে । সেই বিচার দেখবে বলে কয়েকজন শ্রমিক হাটু গেড়ে বসে রয়েছে । বেশীরভাগ শ্রমিকই ভয়ে এদিকে আসে নি। 

কলু ভাষণ শুরু করলো । ভাষণ শেষ হলে জুলুবাবুর সামনের ভাঙা চেয়ারটায় ছাত্তার গিয়ে বসে। একটুখানি বসে সে আবার উঠে গিয়ে জুলুবাবুর কাছে ফিসফিসিয়ে বলে, উলিস ফুলিস অন্ধ পুলিস । 

জুলুবাবু রাগে ও ভয়ে ছাত্তারের দিকে তাকান । ছাত্তারের চোখটা চিকচিক করে ওঠে। ঠোঁট ফাঁক করলে দেখা যায় তার সামনের চারটি দাঁত নেই । 

সে জুলুবাবুর কানে কানে বলে, তুমি মোর পলিটিকসের লাইফটা পুরো খতম করে দিলে ৷ এখন দেখো, দাঁত নেই বলে কথা কইলেই কেমন ফকফক করে হাওয়া বেরয়। কেউ মোর কথাটা ঠিকঠাক ধরতি পারে না । সবাই খালি ফুচফুচ করে হাসে । এখন মোর কথা শুনলি মানুষেরা যদি হাসে, তা তারা মোর কথার মান্যতা দেবে ক্যানো। তাইতো কলুকে নেতা বানাতি হলো। ওর পড়াশুনা নাই, জ্ঞানগম্যিও কম, তবে ছেলেটার মধ্যি একটা কাট-কাট ব্যাপার আছে। 

ছাত্তার আবার চেয়ারে গিয়ে বসে। কলু আর একটা ভাষণ ছাড়ে । তারপর বন্দুকটা দেখিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলে, ভাইসকল, তোমরা তো জানো, শত্তুরের অস্ত্রই মোদের অস্ত্রের জোগান দেয়। এই বন্দুকটা একদিন এই শত্তুরটার কাছে ছ্যালো। এখন এইটা মোদের অস্ত্র হইছে। 

ছাত্তার হাততালি দিতেই কলুর দলের বাকিরাও হাততালি দেয় । 

কলু আবার বলে, এনার বড় শালা মোদের রক্ত চুষে চুষে শহরে গে ঘরবাড়ি করেচে। এবার ইনি এসে মোদের রক্ত চুষতেছে। এনারা বড়লোক থেকি আরও বড়লোক হবেন, আর মোরা খালি এনাদের পা চাটব - এটাই এনারা চান । কিন্তু এবার মোরা জেগে উঠিচি। এখন মোদের কথাতেই এনাদের চলতি হবে । 

ছাত্তার হাতের ইশারায় তাড়াতাড়ি বিচারপর্ব শেষ করতে নির্দেশ দেয় । 

কলু বলে, ইনি মোদের পঞ্চায়েতের ভোটকে প্রহসনে পরিণত করেছ্যালেন। ভোট তো নয়, যেন খেলা চলতেছে। কেউ ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, কেউ বেলুন ফাটাচ্ছে। আর গাঁড় মারা যাচ্ছে মোদের। এরম বালের ভোট মোরা কোনদিন দেখিনি। মোদের দাবিদাওয়া এনার খেলার নিয়মে পুরো ভুস হয়ে গেল। তারউপর এনার গুলিতে মোদের কমরেড বাদল শহীদ হয়েছে । খুনের বদলা খুন। তাই এই বিচারসভা ওনা... 

কথাটা শেষ করতে পারে না কলু । তার আগেই দলের ছেলেরা "শহীদ বাদল অমর রহে" বলে স্লোগান ছাড়ে। তখন চেয়ারে বসে ছাত্তারকে খালি উলিস ফুলিস অন্ধ পুলিস বিড়বিড় করতে দেখা যায় । 

কলু আর উত্তেজনা চেপে রাখতে পারে না। সে কাঁধ থেকে বন্দুকটা নামিয়ে জুলুবাবুকে নিশানা করে ট্রিগারে চাপ দেয় । 

জুলুবাবু চেঁচিয়ে ওঠেন । গুলি বের হয় না। 

ছাত্তার বলে, কী হলো? 

কলু বলে, যাঃ। 

সে আবার ট্রিগারে চাপ দেয়। তবুও গুলি বের হয় না। এবার ভ্যাবাচাকা খেয়ে বলে, মনে হয়, ভেতরে টোটা নেই। 

ছাত্তার উঠে এসে কলুকে চড় কষায়, বন্দুকটা চুরি করার সময় খেয়াল ছ্যালো না? তোদের দ্বারা কিস্যু হবে না। 

ইতিমধ্যে জুলুবাবু প্যান্টে হাগামোতা করে ফেলেছেন। 

ছাত্তার গামছায় নাক মুছে বলে যা, ছেনি-হাতুড়ি নিয়ে আয়। 

ঠিক তখনি লিয়াকত আলির ঘুমের ভেতর একটা আস্ত বোয়াল ঘাই মারলে সেই ঘাই মারার শব্দে পাঁকের উপর শুয়ে থাকা ঢ্যামনা সাপটা ঝোপের ভেতর চলে যায়। রমজান বা আসমা কেউই এসব টের পায় না। আসমা তেলের শিশি থেকে তেল নিয়ে রমজানকে মালিস করে দেয়। কিছুপর রমজান বলে, দ্যাখ্‌, মুই কেমন সাপের মতো দেঁইড়ে আছি। সে আসমাকে পেঁচিয়ে ধরে গলায় আর কোমরে আর চোখের নিচে ছোবল মারতে থাকে । আসমা খাটে উঠতে যায় । রমজান তার পা টেনে মেঝেতে ফেলে দেয়। আসমার পা লেগে দেয়ালে ঝোলানো আয়নাটা ঝনাৎ করে ভেঙে পড়ে। রমজান সেই ভাঙা কাচের টুকরোতে শুয়েই বউকে ছোবল দেয়। আসমা বিষে নীল হয়ে যায়। হাঁপাতে হাঁপাতে জানালা খুললে দেখে, শরাফত মিঞার পুকুর পারে জুলুবাবু বাদলের দিকে বন্দুক তাগ করে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। বাদলও নড়েনা, জুলুবাবুও নড়ে না। যেন বাদল আর জুলুবাবু একটা ফটোর ফ্রেমে বাঁধা। কত যুগ যুগ ধরে তারা এইভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কত যুগ যুগ ধরে জুলুবাবুর হাতে বন্দুক আর বাদল সেই বন্দুকের নলের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আসমা আর রমজান আবার পরস্পরের দিকে তাকায়। আসমার মুখ ঘামে জবজব করছে । রমজানও জোরে জোরে গরম শ্বাস ফেলছে । 

আসমা বলে, কী? 

রমজান বলে, সাপ। 

আবার সে আসমাকে উপুড় করে পিঠে দাঁত বসিয়ে দেয় ৷ আসমা শীৎকার দিয়ে ওঠে। আসমার শীৎকারে ঘুমন্ত ছাতিম গাছটার মাথায় বসা সাদা সাদা বকেরা পাখনা ঝাপটে উড়ে চলে । 

অমনি লিয়াকত আলি ঘুমের ভেতর কোথা থেকে কাঠবিড়ালিটি ধরে তোমাদের গায়ে ছেড়ে দেয়। সেটি তোমাদের গায়ে তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে কখনো খাটের তলায়, কখনো ঘর থেকে পালিয়ে শরাফত মিঞার পুকুরের পারে, আবার কখনো জলা পেরিয়ে, ইটখোলা পেরিয়ে, ঝকাস চাঁদের আলোয় একটুও না চমকিয়ে নদীর ঘাটে বাধা নৌকার ভেতর ঢুকে চিঁ চিঁ করে ডেকেই চলে। এতে লিয়াকত আলি একটুও অবাক হয়না ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন