সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

অনির্বাণ বসুর গল্পঃ শয়তান

মনটা বেশ ফুরফুরে লাগছে। স্বীকার করার মধ্যে যে এত আনন্দ আছে, জানতাম না। তদন্তকারী অফিসার তো পুরো ঘেঁটে ঘ। যখন বলছিলাম, মালটার মুখটা না, দেখার মতো হয়েছিল। লাইফে মনে হয় কোনও সিরিয়াল কিলার দেখেনি! বোগাস্!

এমনিতে দেখতে আমাকে ভিজে বেড়ালের মতো। হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে, যেন ভাজা মাছটা উলটে খেতে জানি না। আপনাদের চুপিচুপি বলে রাখি, ভাজা মাছের অন্য পিঠটাও ভেজে খেতে পারি। বন্ধুরা ডাকত হারামির হাতবাক্স বলে৷ দুঁদে অফিসারটির সঙ্গে একটু হারামিগিরি করতে ইচ্ছে হল। যেমনি ভাবা, তেমনি কাজ : গোটা বয়ানটার নিচে যখন সই করতে বলল, নিজেকে অশিক্ষিত প্রমাণ করে টিপসই দিলাম। ভারত সরকারের ভোটে ভোটদাতাকে যদি টিপসই দিতে হয়, তাহলে সব সরকারি কাজেই দেওয়া উচিত। আফটার অল, স্বাধীন ভারতের পরাধীন নাগরিক তো! 

প্রিয় পাঠক, আপনাদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ, আমার এই প্রলাপকথন বা আপনাদের ভাষায় ভাট-বকা, এটিকে আর যাই ভাবুন-না-কেন, আত্মজীবনী ভেবে বসবেন না। কেন-না, আমার মতো আহাম্মকের আত্মাই নেয়, তায় আত্মজীবনী! আর ঠিকঠাকভাবে আত্মজীবনী যারা লেখে, মানে সত্যিগুলো সাহস করে লেখে যারা, তাদের একা হয়ে যেতে হয়। আমি একা হতে চাই না। 

হ্যাঁ, একা হতে চাই না আমি। একা থাকাটাকে ঘেন্না করি, এমনটা নয়। কিন্তু...কিন্তু...আমি স্বার্থপর। নিজেকে আমি সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসি। বাবার থেকে, মায়ের থেকে, সোহাগের...উঁ-উঁ...সোহাগের থেকেও। সোহাগ─! বেফালতু আমায় লেঙ্গিটা মারল। রিলেশানটা দিব্যি কাটিয়ে দিয়ে, জাঁদরেল-ম্যানেজার গোছের একটা গোঁফওয়ালা ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করে নিল। শুনছিলাম...মেয়েও হয়েছে নাকি একটা! কে যেন বলছিল...কে যেন...মনে আয়...মনে আয়...ধুর্...মেমোরিটা একদম গেছে দেখছি। প্রয়োজনের সময় আজকাল আর কিছুই মনে করতে পারি না।

সোহাগ যখন আমায় কলা দেখিয়ে ভেগে গেল...নিজেকে না...নিজেকে খুব ফ্রাস্ট্রেটেড লাগছিল। সুইসাইড করতে ইচ্ছে হচ্ছিল...। ঘুমের ওষুধ...না-না, মরাটা ফিল্ করতে পারব না। ...বাথরুমে গিয়ে হাতের শিরায় হালকা করে ব্লেডের একটা টান...বহুত লাগবে...ক্যানসেল...ক্যানসেল! তাহলে ফ্যানের থেকে ঝুলে...তা-ও হবে না...ওতেও খুব লাগবে। নাহ্...নিজেকে মারতে পারব না। অথচ...অথচ সোহাগের সঙ্গে আমার প্রেমটা, যখন একেবারে, যাকে বলে জমে ক্ষীর, তখন ও যদি আমার কোনও কথা না-শুনত, কী অনায়াসেই না মরে যাওয়ার কথা বলতাম! ...কী পাগলামিটাই না করেছি তখন! ...মরা অত সোজা নাকি!... উঠল বাই তো মরতে যাই!... জানেন, সোহাগ বলত, যারা কথায়-কথায় মরব-মরব করে, তারা মরতে পারে না। মুখেন মারিতং জগৎ! আচ্ছা, ও কি বুঝতে পেরেছিল যে, সুইসাইড করা আমার মতো পেটরোগা লোকের কম্ম নয়! তাই কি ওভাবে ছেড়ে গেল?... যদি না-বুঝত, তাহলে কি...তাহলে কি ছেড়ে যেত না? আচ্ছা, সাহস করে একবার যদি সুইসাইড অ্যাটেম্প করতে পারতাম...তাহলে...তখনও কি ফিরত না?... কী আছে ওই বানচোতটার...আমি না-হয় বেকার...চাকরি করি না...ওর বাপের যা সোর্স...আমার বাপটার যদি থাকত না...পিছনে লাগা ঘুচিয়ে দিতাম।... চাকরি মারানো বের করে দিতাম। আর সোহাগকেও বলিহারি! তোরই বা কী আক্কেল! আমাদের দুটো ফ্যামিলির মধ্যে একটা ভালো রিলেশান ছিল, উলটে...তোর তো বোঝা উচিত ছিল...আর যদি এমনটাই করবি তো, সবার সামনে ওই ছেনালিগুলো করতিস কেন?... আদিখ্যেতা? কী ব্যাপার─না, ভাইফোঁটার আগে থেকে আমাদের বাড়িতে ফোন করে : 'মামা, তোমরা আসছ তো এবার?... বড়োমা-র পায়ে-ব্যথা। জ্যেঠু বলছিল, তোমরা এলে ভালো হয়।... তোমরা সবাই আসবে তো?... অনি─?'... আর তারপর, ফোন রেখেই বাবার গলায় সোহাগ-বন্দনা : 'মেয়েটা সত্যি-সত্যি খুব ভালো হয়েছে। বয়স তো আর বেশি নয়...অনির চেয়ে বছর দুয়েকের ছোটোই হবে, তবু কী ম্যাচিওরিটি!'

কালীপুজোর পরদিনই, সপরিবারে সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে, বাবা এসে হাজির হত পিসির বাড়িতে। আমার ওই একটাই পিসি। পিসিদের জয়েন্ট ফ্যামিলি। পিসির দুই দেওরও থাকত একসঙ্গে। ছোটো দেওরের মেয়ে সোহাগ। ওর বাবা-মা দু'জনেই চাকরি করে। হাত-মুখ ধুয়ে, সামান্য চা-জলখাবার খেয়ে, সব ঘরে প্রণাম সারতে যেতে হত। পিসির বড়ো দেওরের ছেলে আর আমি, আমরা ছিলাম পিঠোপিঠি। সবার সঙ্গে দেখা হলে পর, দোতলায় যাওয়ার সময়, পা-টা কেমন যেন আটকে আসত। এদিকে বাড়িতে ঢোকার পর থেকে ওই দোতলাটাই আমায় বেশি টানত। বেশ জানতাম, সোহাগ ওখানে বসে আছে। আমার জন্য ঘুম থেকে উঠেই অপেক্ষায় বসে গেছে। কিন্তু মনে পাপ থাকলে যা হয়! কিছুতেই আর সবার সামনে দিয়ে ওর কাছে যেতে পারতাম না। বড়োরা নিজেদের মধ্যে খোশগল্প জুড়লেই, সুযোগ বুঝে টুক করে, উঠে যেতাম দোতলায়। এমনটাই ছিল আমার অভিসার। সোহাগের মধ্যে এই ব্যাপারগুলো ছিল না একদমই। পিসির ঘরে আমরা সবাই মিলে আড্ডা মারছি, হঠাৎ করে ও এসে খাটে উঠে পড়ত, তারপর মিউজিক্যাল চেয়ার...। একটা সময় দেখা যেত, আমরা দু'জন পাশাপাশি।

ভাইফোঁটার সময় আমরা, সব ভাইরা, লাইন করে বসে পড়তাম। বড়ো থেকে ছোটো। বাড়ির সব বোনেরা, বড়ো থেকে ছোটো সিরিয়ালে, আমাদের ফোঁটা দিয়ে যেত। সোহাগ আর সবাইকেই ফোঁটা দিত; আমাকে ছাড়া। আর কী অদ্ভুত! বাড়ির কেউ এই নিয়ে টুঁ-শব্দ পর্যন্ত করত না। যাবতীয় অনুষ্ঠান মিটে গেলে মহিলারা গিয়ে ঢুকত রান্নাঘরে৷ লুচি বানানো চলত জোরকদমে৷ আর বাকিরা গিয়ে বসত যে-কোনও একটা ঘরে। হয় তাস-খেলা, নয় দেদার আড্ডা৷ ছোটো থেকেই সুযোগসন্ধানী ছিলাম। আস্তে-আস্তে, সবার নজর এড়িয়ে, উঠে আসতাম দোতলায়। সোহাগ ওখানে আগে থেকেই ক্যারম বোর্ড পেতে রাখত। বোর্ডের ওপর, অবিন্যস্ত, ছড়ানো থাকত গুটিগুলো। যাতে হঠাৎ করে কেউ উপরে উঠে এলে, বুঝত, আমরা এতক্ষণ ক্যারম খেলছিলাম! এই অবসরে চলত আমাদের সম্মিলিত সাহিত্যপাঠ। ওই বয়সেই আমরা পড়ে ফেলেছি 'চতুরঙ্গ', 'শেষের কবিতা', 'ন হন্যতে',...। প্রোমোটাররা পুকুর চুরি করে; আমরা দুপুর চুরি করতাম। ঘরে-ঘরে তখনও কেবল্ লাইন ঢোকেনি। সিনেমা দেখার মোটে তিনটে উপায় ছিল : সিনেমা-হলে যাও, দূরদর্শনে চোখ রাখো, নয়তো বাড়িতে ভিডিয়ো ভাড়া করে আনো─উইথ কালার টিভি। দাদাভাই আমার বাবার কাছে খুব আদরের ছিল। ওরা আমাদের বাড়িতে আসুক, বা আমরাই যাই─বাবাকে ধরে দাদাভাইয়ের সে কী ঝোলাঝুলি! সিনেমা দেখবে। অগত্যা─! বাড়িতে ভিডিয়ো আসত। রাতের খাবারপর্ব তাড়াতাড়ি শেষ করে সবাই মিলে বড়ো ঘরে এসে হাজির হতাম। কালার টিভিতে সিনেমা চলত সারারাত। একের-পর-এক। মা বা পিসির মতো কেউ-কেউ, ওখানেই ঘুমিয়ে পড়ত। অন্ধকার ঘর ঘুমের পক্ষে সহায়ক। একান্ত মিলনের পক্ষেও৷ রঙিন পর্দায় 'প্যাহলা প্যাহলা প্যায়ার হ্যায়'-এর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হচ্ছিল মাধুরী-সলমন; আর ঘরের আলো-আঁধারিতে বড়ো হয়ে উঠছিলাম আমরা।

যে-বছর উচ্চ-মাধ্যমিক দিলাম, সোহাগের সে-বছর মাধ্যমিক। মাধ্যমিকের তুলনায় আমার উচ্চ-মাধ্যমিক ভালো হল। সোহাগ অবশ্য, আমি মাধ্যমিকে যা পেয়েছিলাম, তার থেকে অনেক বেশি নম্বরই পেল৷ কিন্তু ওর রেজাল্ট নিয়ে মাতামাতিটা সেই পর্যায়ের হল না, যতটা আমার ক্ষেত্রে হয়েছিল। ছোটো থেকেই আমার ভাগ্যের আকাশে রবি নাকি খুব স্ট্রং পজিশনে৷ এক্ষেত্রে অন্তত আমার কুষ্ঠি ভুল কিছু বলেনি। আর এতেই খাপ্পা হয়ে উঠল সোহাগের বাবা : 'অনিকে নিয়ে এত নাচানাচি করল সবাই...আমার মেয়ে কি বানের জলে ভেসে এসেছে নাকি? কত পেয়েছিল সে-ব্যাটা?... হ্যাঁ?... টেনেটুনে তো সেভেন্টি এইট পারসেন্ট...মোটে দুটোয় লেটার! আর আমার মেয়ে...আমার মেয়ে সোহাগ...পুরো এইট্টি সিক্স পারসেন্ট...পাঁচটা লেটার!' ভদ্রলোক এমনই বহু কিছু আওড়ে চলেছিলেন নিজের মেয়ের সামনে। সোহাগ বুঝতে পারেনি, ওর বাবার সমস্যাটা কোথায়! অনির ওপর রাগ, নাকি মেয়ের রেজাল্ট নিয়ে মাতামাতি না-হওয়া! ভদ্রলোক এর ফলও পেয়েছেন হাতেনাতে। পেয়েছেন, কিন্তু বুঝতে পেরেছেন বলে তো মনে হয় না। আমিও কি ছাই বুঝতে পারতাম! ভাগ্য ভালো ছিল, তাই তো সোহাগের পার্সোনাল ডায়রিটা আমার হাতে পড়েছিল। আমি আর্টস্ নিয়ে হায়ার সেকেন্ডারিতে যা পেয়েছিলাম, সায়েন্স নিয়ে সোহাগ তার চেয়ে পঞ্চাশটা নম্বর কম পেয়েছিল।

আমরা একসঙ্গে অনেক বই পড়তাম। বঙ্কিমের কোন-একটা বইয়ে লেখা ছিল, অল্প বয়সের প্রেম নাকি টেকে না! কোন বইটা...আর মনে করতে পারি না। লাইনটা ছিল...লাইনটা...'বাল্যপ্রণয়ে বুঝি-বা অভিসম্পাত আছে'...মনে হয় এমনটাই লেখা ছিল বইটায়। যাই হোক, তদ্দিনে আমাদের পীরিতের কাঁঠাল-আঠার সবটা শুকিয়ে গেছে।.. উইদাউট এনি ডিসকাশন...আলোচনা ছাড়াই সিদ্ধান্ত...ভুল-বোঝাবুঝি সামান্য...ফাইনাল ডিসিশন...দি এন্ড!... সাইনবোর্ড লটকে গেল।

এর মধ্যে সোহাগ কলকাতায় চলে এসেছিল। ওর মামার বাড়িতে। পাক্কা একটা বছরের প্রস্তুতিতে মেডিক্যাল জয়েন্ট এন্ট্রান্সে বসেছিল ও৷ পরীক্ষা শেষের পর সব ক'টা প্রশ্নের ঠিকঠিক উত্তরও শুনিয়েছিল সবাইকে। রেজাল্ট বেরোনোর পর দেখা গেল, ওর নাম নেই। আসলে হলে গিয়ে ও শুধু সময়ই কাটিয়েছে, একটা প্রশ্নেরও উত্তর লেখেনি। আমি জেনারেল লাইন নিয়ে পড়ছি তখন; বাংলায় অনার্স। সোহাগও জেদ ধরেছিল, বাংলা নিয়ে পড়বে৷ ওর বাবা-মা মানেনি। শেষপর্যন্ত কেমিস্ট্রিতে অনার্স। আমার রেজাল্ট চড়চড় করে ওপরে উঠেছে, আর দিনের-পর-দিন, ওর পারফর্ম্যান্স গ্রাফ নিচের দিকে নেমেছে৷ আমি...দ্য গ্রেট অনি...ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট...। 

আপনারা নিশ্চয় ভাবছেন, নটেগাছটির মোড়ানোপর্ব সমাধা হয়ে গেছে। যদি ভাবেন, তাহলে ডুববেন। আমাদের রিলেশানটা কেটে গিয়েছিল।... সত্যিই কি কেটে গিয়েছিল?... কত সম্পর্কই তো ভেঙে যায়...আবার অনুকূল জল-হাওয়ায় তো জুড়েও যায়...যায় না? সব সম্পর্ক চুকেবুকে গেলেও, ভাইফোঁটায় আবারও যখন দেখা হল দু'জনের...ওর মনের অবস্থা কী হয়েছিল, বলতে পারব না...আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে-সরে যাচ্ছিল। পারতপক্ষে আসতে চাইতাম না ওর সামনে। খুব অহংকারী ছিল ও। হওয়াটাই স্বাভাবিক, ডাকসাইটে সুন্দরী বলে কথা। বেশি ঘ্যাম!... আমারই বা কম নাকি? আমি ওকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলাম। পিসির বাড়িতে তখন ম্যাক্সিমাম সময়টাই কাটাচ্ছি পিসির বড়ো দেওরের ছেলের সঙ্গে। সিগারেট খেতাম অনেকদিনই। ওই সময়ই মনে হয়...গাঁজাটা ধরেছিলাম...রেগুলারলি নয়, রেগুলারলি নয়...মাঝে-মধ্যে। আমরা দুই বীরপুঙ্গব, রেলস্টেশনের পাশের বস্তিতে গিয়েছিলাম। মনে হয়, পঁচিশ টাকার একটা খাম কিনেছিলাম৷ নিজের জন্য। নার্ভাস সিস্টেমটাকে একটু স্লো করতে হত।... বোতল গিলে তো আর...মানে, একমুখ মদের গন্ধ নিয়ে তো আর সবার সামনে যাওয়া যায় না! ফ্যামিলির কাছে রেপুটেশনটাও ঠিক রাখতে হবে! আবার ফ্রাস্ট্রেশনটাও কাটাতে হবে!

কলতলার পিছনে, বাগানটা যেখানে ছিল, তারও পিছনে একটা ছোটো ডোবা ছিল। ময়লা ফেলা হত ওখানে। ওখানে বসেই গাঁজাটা বানাব-বানাব করছিলাম, মশা কামড়াচ্ছিল খুব, এমন সময় বেজে উঠেছিল আমার মোবাইলটা। সোহাগ─! সাত-পাঁচ ভাবতে-ভাবতে ফোনটা ধরেছিলাম। সেদিন আর দোতলায় নয়, তিনতলার ছাদে যাওয়ার অনুরোধ। ওর বাবা-মা তখন পিসির ঘরে, গল্প করছে৷ ওর ভাইয়ের কোচিঙে বিজয়া সম্মিলনী ছিল, মনে হয়। মোদ্দা কথা, সোহাগ বাদে এমন কেউ তখন ছিল না, যে আমার ওপরে যাওয়ার সাক্ষী থাকবে। থাকলে আমি যেতাম না। কেন-না, ততদিনে সবাই এটা বুঝতে পেরে গিয়েছিল, আমাদের মধ্যে আগের সেই দুষ্টু-মিষ্টি সম্পর্কটা আর নেই। 

ছাদে উঠে এলাম। পাঁচিলের একটা পাশে মাদুর পাতা। পাঁচিলের গায়ে হেলান দিয়ে, ছাদের দরজার দিকে তাকিয়ে, উদাস দৃষ্টিতে দাঁড়িয়েছিল সোহাগ।... আমার সোহাগ। আমার চোখে চোখ পড়তেই ও ঘুরে গেল। পুরো একশো আশি ডিগ্রিতে। কচি কলাপাতা রঙের একটা শালোয়ার পরেছিল ও। পিছন থেকে খুব অ্যাট্রাকটিভ লাগছিল। সেদিন যে কী করে নিজেকে কন্ট্রোল করেছিলাম, জানি না। ওকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না-দিয়ে গিয়ে মাদুরে বসেছিলাম। তারপর একমনে গাঁজা বানাতে শুরু করি। গাঁজা-ভরা চারটে সিগারেট খাওয়ার পর, হয়তো আমাকে ওই অবস্থায় দেখে, সোহাগ এসে মাদুরে বসে। হালকা একটা ধুমকি এসেছিল। মাথা ঝুঁকে গিয়েছিল নিচের দিকে। ওর হাত বিলি কেটে দিচ্ছিল আমার চুলে। সাক্ষী ছিল না কেউ। কেউ না, কেউ...দ্বিতীয়ার চাঁদ সে-রাতে জেগেছিল আমাদের সঙ্গে। আর কেউ ছিল না। কোনও ফুলের গন্ধ, কোনও রাতচরা পাখির ডাক, রূপোলি রাতে হঠাৎ করে বেজে-ওঠা শব্দতরঙ্গ...কেউ না।

তারপর আবার সেই একঘেয়ে রুটিন। আমি ফোন করি, সোহাগ ফোন ধরে না। এসএমএস করলে উত্তর দেয় না। দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না হয়তো। এমএ পাশ করে কলেজে কোনওভাবে একটা চাকরির ধান্দা করছি তখন। তিন-চারবার নেট পরীক্ষায় বসা হয়ে গেছে। কিছুতেই সিলেক্ট হচ্ছি না। আমার থেকে কত পিছনে-থাকা ছেলে-মেয়েরা একের-পর-এক, কিছু-না-কিছু, বাগিয়ে নিচ্ছে। সবার আগে ছিলাম আমি। ইউনিভার্সিটির গেজেটে তার প্রমাণও আছে। কিন্তু...কিন্তু...ধীরে-ধীরে পিছিয়ে পড়ছি আমি।... ব্যাটারি ফুরিয়ে আসছে।... রিচার্জ করতেও পারছি না। ইঁদুরদৌড়ের লাস্ট ল্যাপটা আদৌ কমপ্লিট করতে পারব কিনা, বুঝতে পারছি না─এমন সময়ই পিসেমশাই মারা গেলেন৷ একেবারে বিনা নোটিশে।

আবারও পিসির বাড়ি। পিসি তখন সাদা শাড়ি। টানা থেকে গেলাম বেশ ক'টা দিন। শ্রাদ্ধ-নিয়মভঙ্গ সব কাজ শেষ হওয়ার পরই ফিরেছিলাম। দাদাভাই হবিষ্যি করায় ওই দিনগুলোতে আমাকে খেতে হয়েছিল সোহাগদের ঘরে। সোহাগের মায়ের ব্যবহারে মনে হয়েছিল, পুরোনো সব ঘটনাকে মন থেকে মুছে ফেলেছেন উনি। অন্তত বাইরের ব্যবহারে কোনও তিক্ততা, একবারের জন্যও, ছায়া ফেলেনি। সোহাগের ভাই এর মধ্যে বড়ো হয়েছে অনেকটাই। যে-বছর পিসেমশাই মারা যান, যতদূর মনে পড়ে, সোহাগের ভাই ক্লাস টুয়েলভ্ পাশ করে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সবেমাত্র ভর্তি হয়েছে। ওই সময়ই ওর ভাই আমায় জানিয়েছিল : 'জানিস অনি-দা,...দিদির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।... জ্যেঠু এই সময়ই মারা গেল...বিয়েটাও হয়তো পিছিয়ে যাবে।... জিজু খুব ভালো রে...ইঞ্জিনিয়ার...'─আমার আর শুনতে ভালো লাগছিল না। কানে ঢুকছিল না কিছুই। সোহাগের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে! আমি জানতাম না! ও আমাকে জানালও না!... আমি কি আপত্তি করতাম?... না বিয়েতে ভাঙচি দিতাম?... কেন আমাকে জানাল না?... এই শেষ...আর কখনও ওর সঙ্গে কথা বলব না।

পিসেমশাইয়ের নিয়মভঙ্গের দিন সোহাগের ভাই এসে জানাল, ওর দিদি আমায় অনুষ্ঠানবাড়ির ছাদে ডাকছে। আবার অনুরোধ!... দূর...বসে থাকুক ও...আমি যাচ্ছি না...কভি নেহি! ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়। আমিই কেবল বোকার মতো বারবার যেতাম। অনেক হয়েছে...আর নয়...এবার ওর বোঝা উচিত...প্রতিবার...প্রতিবার জুতো মেরে আ-তু-তু করে ডাকবে...আমি কি কুকুর নাকি...ডাক শুনেই লেজ নাড়তে-নাড়তে এসে হাজির হব? যাব না আমি...একদম যাব না।... আচ্ছা, আধ ঘণ্টা ওয়েট করিয়ে...তারপর গেলে? ও নিশ্চয় ততক্ষণে...কী করি...কী করি...যাই?... শেষবারের জন্য...উচিত মনে হয় যাওয়াটা...গিয়ে দেখিই না, কী বলে! সোহাগের সঙ্গে দেখা করব না ভাবতে-ভাবতেই, কীভাবে যেন ছাদে উঠে আসি। ছাদে একটা দোলনা ঝুলছে। দোলনাটার একটা পাশে বসে, দরজার দিকে তাকিয়েছিল সোহাগ। অবিকল সেই চাহনি। দৃষ্টিতে সেই এক উদাসীনতা। সেই এক মাদকতা। অনেকগুলো বছর আগে, ভাইফোঁটার রাতে, ওদের বাড়ির ছাদে যেমনটা দেখেছিলাম, তেমনই আছে। আমি গিয়ে ওর পাশে দাঁড়ালাম। পাঁচিলে হেলান দিয়ে, সোজাসুজি ওর দিকে তাকিয়ে৷ ও-ও নিষ্পলক তাকিয়ে আমার দিকে। কেমন যেন ঠান্ডা ওর চাউনিটা। পাঞ্জাবির ভিতরে-পরা স্যান্ডো গেঞ্জিটা ঘামে ভিজে যাচ্ছে। জিন্সের পকেটে-রাখা হাত দুটোয় নোনা জল জমছে টেনশনে। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করছি।... দেশলাই... জ্বালাচ্ছি।... একটা... দুটো... দুটো কাঠি নষ্ট হয়ে গেল...এবার...ধরেছে! ঘনঘন টান দিচ্ছি সিগারেটে। আগুন ধীরে-ধীরে ফিল্টারের কাছে উঠে আসছে। 'শুনেছিস হয়তো...আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।... বাবা-মায়ের ইচ্ছে...বিয়েটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলা...অনেকদিন ধরেই বলছিল...দুই বাড়িরই ইচ্ছে...।' আমি নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছি। আর-একটা সিগারেট ধরিয়েছি। 'অবশ্য এই কথাগুলো বলতে তোকে এখানে ডেকে আনিনি...তোর কাছে আমার একটা আবদার...আবদার না-বলে অধিকারবোধ বলাই ভালো...আর ক'টা মাস...তারপরই আমার বিয়ে...জ্যেঠু মারা গেল বলে...বিয়ের ডেটটাও এখন পিছোতে হবে। তবে মাস তিনেকের মধ্যে রেজিস্ট্রিটা করে নেব।... তারপর একদিন আমার সঙ্গে দু'-তিন দিনের জন্য শান্তিনিকেতন যেতে হবে।... আসলে কী বল তো...যার সঙ্গে এখনও কোনও মেন্টাল অ্যাটাচমেন্ট হল না, তার সঙ্গে...আর তুই আমার ফার্স্ট লভ্...সবদিক ভেবে মনে হল...আমার ওপর প্রথম দাবি তো তোরই...!' কখনও ভাবিনি, সোহাগ এ-কথা বলতে পারে। কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়েছিলাম। বোকার মতো দেখছিলাম ওকে। সিগারেটের আগুনটা আঙুলে এসে লেগেছে কখন, অজান্তেই, অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল, হয়তো-বা মনের ভিতরের বিরক্তিও : 'আহ্!' 

আমার সমস্ত জীবন ব্যথায় কাঁপছে। কিন্তু কে নেবে? নিঃশেষ করে, কে নেবে আমাকে? মনে হচ্ছে, আমি কিছু বলতে চাই। কিন্তু কী বলতে চাই? বুকের ভিতর কথার ভিড় বন্ধ ঘরে মৃগনাভির তীব্র ঘ্রাণের মতো নিবিড় হয়ে উঠছে। তবু বলতে পারছি না। হাসনুহানার না-ফোঁটা কুঁড়ির মতো টনটন করছে সমস্ত প্রাণ─কিন্তু বলতে পারছি না। মরতে চাই না, কিন্তু মরতে আর ভয়ও পাই না বোধহয়। আর...মরতে যাব কোন দুঃখে! আমি নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। নিজের জন্যই আমায় শয়তান হতে হবে। অনন্ত একটা তীর্থে পৌঁছানোর জন্য পথে নেমেছি। লক্ষ্যে তো পৌঁছতে হবেই। শয়তান আমাকে হতেই হবে। 

ইন্টারনেটের তলপেট ঘেঁটে দেখবেন, ইদানীং বেশ-কিছু ডেমনস্ সাইট উঁকি মারছে। ওরকমই কোন-একটা সাইটে দেখছিলাম, শয়তান হতে গেলে কী-কী রিচ্যুয়ালস্-ফর্ম্যালিটিজ মানতে হয়, তা লেখা ছিল। গুনে-গুনে ঠিক তেরোটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম-প্রেম খেলতে হবে...একটু-আধটু লটঘট...বা ফস্টিনস্টিও চলতে পারে, আর তারপর সৃষ্টি যখন টলমল করবে, তখন সেই রমণীটির ভবলীলা সাঙ্গ করে দিতে হবে। চ্যাপ্টার ক্লোজড্। কর্পূরের মতো উবে যাবে বেমালুম। দেখতে-দেখতে ন'খানাকে ওপরে পাঠিয়েও দিয়েছিলাম, আর এমন সময়ই কিনা পুলিশের জালে!

এখনও চারটেকে ওপরে পাঠানো বাকি, আর এই ক্রুশিয়াল মোমেন্টেই কিনা ঘাড়ধাক্কা খেয়ে লকআপে! কী করি এখন?... কিছুই করার নেই। বাবা জামিন করাবে কিনা, করাতে পারবে কিনা আদৌ, ভগবান জানে! আমি অবশ্য ভগবান মানি না। বাবা মানে। ভদ্রলোক ফিজিক্সের স্টুডেন্ট ছিল। কানের মাথা খেয়ে ফেলেছিল, ই ইজ ইক্যুয়াল টু এমসি স্ক্যোয়ার। বুঝতেই পারেনি, আমি ওটার মানে করেছি : ইমোশন ইজ ইক্যুয়াল টু মাইন্ড ইন্টু কন্সটিপেশন স্ক্যোয়ার!

শয়তান আমাকে হতেই হবে। জামিন হোক ছাই না-হোক। এত কাছে এসে পা পিছলে পপাত ধরণীতলে চিৎপটাং হব নাকি! ভগবান বলে তো কিছু এগজিস্ট করে না। আমি অন্তত তাই মানি। বাকিরা কী মানল, তাতে আমার বাল ছেঁড়া যায়। তবে শয়তান আছে। শয়তান হতে পারলে আমার নাম আর 'অনি' থাকবে না। এহো বাহ্য। মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট থিং ইজ, একবার শয়তান হয়ে গেলে আমি যা চাইব, তাই করতে পারব। আমি সোহাগকে চাইব তখন। এখনকার মতো আর দেওয়ালে মাথা ঠুকতে হবে না। আপ-সে-আপ আমার হয়ে যাবে। যদি তখন সেই পৃথুলা-মুভিং ক্যাসল্-জলহস্তিনীকে না-পোষায়, তবে সময়টাকে পিছিয়ে দেব...সেই সময়ে নিয়ে যাব, যখন ও গুনগুন করত : 'তখন তোমার একুশ বছর বোধহয়, আমি তখন অষ্টাদশীর ছোঁয়ায়─'!

ডাক এসেছে দেখছি৷ ওই ঘুষখোর দুঁদে অফিসারটা আবার ডেকেছে। আরে...বাবা-মা...দু'জনেই হাজির! নিশ্চয় গুরুতর কিছু করে ফেলেছি...আর মনে হয় পালাতে পারব না...আমার এই আলুসেদ্ধ-মার্কা চেহারাটা দু'দিন পর মর্গে চালান হয়ে যাবে...আমার আর শয়তান হওয়া হল না!

কনস্টেবলটার কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছি। পা দুটো সামান্য টলছে। ঘরের চার দেওয়ালের রং কেমন পালটে-পালটে যাচ্ছে। মাথা ঘুরছে...ঘুরছে কি...মাথা ঘুরছে...ম্যাজিক নাকি? ভোজবাজির মতো কনস্টেবলটার পুরো গেটআপটাই পালটে গেল। কলকাতা পুলিশের ব্যাজটা বেমালুম বদলে গিয়ে মেন্টাল ক্লিনিকের আই-কার্ড হয়ে গেল কী করে?... আরে...অফিসারটা ডাক্তারের চেয়ারে কী ছিঁড়ছে? ওকে ওখানে মানায় না। পিছনে বাটাম্ দিয়ে এক্ষুনি নামিয়ে দেওয়া উচিত।... কী যেন বলছে বাবাকে...কী বলছে...ভালোবাসি...আমি...একসঙ্গে ন'টা মেয়েকে...কিন্তু...কিন্তু ওদের তো আমি...আমি...ওপরে পাঠিয়ে দিয়েছি...ধরা পড়ে গেছি...ফাঁসি হবে...ফাঁসি...যাবজ্জীবন...সবাই সব হবে...সব হবে সবাই...আমি...আমি শয়তান হব না?

ডাক্তারটা যে বলছে, আমি কোনও খুন করিনি! মানে...আমাকে আবার কেঁচে গণ্ডূষ করতে হবে?... শূন্য থেকে শুরু করতে হবে?... মারতে পারিনি...একটাকেও না?... মারব...মন শক্ত কর অনি...এবার মারতেই হবে...শয়তান হতেই হবে...আর তারপর...তারপর...যা চাইব...সব...স-অ-অ-ব আমার!

1 টি মন্তব্য: