সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

হামিরউদ্দিন মিদ্যার গল্পঃ মনোয়ারা বিবির দিনকাল

মনোয়ারা বিবির শাড়ির আঁচলের ভেতর পাইশে রঙা মাদী হাঁসটা প্যাঁক করে ডেকে উঠতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল খানিক।এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল,কেউ দেখে ফেলল না তো!না কারও নজরে পড়েনি।মক্তবখানা যাওয়ার সোজা রাস্তাটায় না গিয়ে,ছাত্তার সেখের এজমালি পুকুরের পাড় ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে ঝোপঝাড় কণ্টকময় পথ দিয়ে বাঁশতলা,জামতলা,মানকচুর বনের ভেতর হেঁটে হেঁটে পৌঁছাল সেখ পাড়া।আর তেমন ভয় নেই।
লাইলি যখন সাঁজের বেলা দেখবে হাঁসটা দরমায় ফেরেনি,তখন বানিয়ে বললেই হল,যে কয়েকদিন ধরেই খটাশটা খুব ঘুরঘুর করছে,হয়ত ওরই কাজ।তখন লাইলি হিঁসুরে হিঁসুরে কেঁদে বাখুলে একটু খোঁজাখুঁজি করবে বড়জোর।

হাঁসটাকে শেষবারের মতো দেখল মনোয়ারা।পুঁতির দানার মতো চোখদুটিতে পৃথিবীর যত মায়া সব ঝরে পড়ছে।আহা বেচারি! কালই মানুষের পেটে চলে যাবে।সে যাক।মানুষটা তার কাছে ফিরলে এ আর এমন কি!কতদিন খবর নাই গো!আগে দু'মাস,তিনমাস পর মিনষেটা যেখানেই থাক ঠিক হাজির হত।এবারে একবছর পেরিয়ে গেল এখনো আসেনি!মরে গেল না বেঁচে রইলো আল্লা পাকই জানে।হে আল্লা তুমি দীনদুনিয়ার মালিক,রহম করো।__হায় তুলল মনোয়ারা বিবি।

মক্তবখানাটা মসজিদ থেকে কিছুটা তফাতে।চারিধার শিরীষ,ইউক্যালিপটাস এর বন।পাশেই পুকুর,নাম দুমড়াগোড়ে।ত্যাবড়ানো হাঁড়ির মতো দেখতে বলেই বোধহয় এমন নাম।দুমড়াগোড়েতে হাঁস চরছে প্যাঁক প্যাঁক,প্যাঁক প্যাঁক।মনোয়ারার হাতে ধরা হাঁসটা গা মোচড়ে উঠল।যা!আর একটু হলে হাত পিঁচকে ছাড়া যেত।হাঁসটাও ডেকে উঠল,প্যাঁক প্যাঁক,প্যাঁক প্যাঁক।

মক্তবখানার দরজাটা ঠেসান আছে,বার ধারের জানালাটা খোলা।সেই খোলা জানালা দিয়েই মনোয়ারা চেয়ে দেখল ইমাম সাহেব বালিশে মাথা দিয়ে একখানা কিতাব পড়ছে।

মনোয়ারা ডাকল,জি,ও জি।

কে?

আমি মল্লিক পাড়ার লাইলির মা।

কিতাবটা বালিশের ওপর উপুড় করে নামিয়ে,ঠেসানো দরজাটা খুলে ইমাম সাহেব বাইরে বেরল।দেখল লাইলির মায়ের হাতে হাঁসটা ছটফট করছে।

আরে হাঁস এনিছো ভাবী,কোনো মানত ছিল নাকি?

না না, তেমন কিছু লয়।কাল জিকিরের মজলিসের জন্যি দিলাম।—বলে মনোয়ারা বিবি আর একমুহূর্তও দাঁড়াল না।

ইমাম সাহেব হাঁসটা মক্তবখানার পেছনে যে তারের জালি দেওয়া খাঁচা,সেটার ভেতর ছেড়ে দিল।আরও একটা হাঁস,আর দুটো মুরগি পড়েছে।আজকালের ভেতর আরও পড়বে।ইমাম সাহেব মুচকি হাসল,লাইলির মা কী জন্যে হাঁস দিয়ে গেল,তা আর জানতে বাকী নেই।কাল মাগরিবের নামাজ বাদ জিকির শুরু হবে।প্রতিমাসেই নিয়মিত হয়।জিকিরের মাধ্যমে দিলের ভেতর জমে থাকা ময়লাগুলো ঝেড়ে ফেলে মুসুল্লিরা।জিকির শেষে গোশ-ভাতের ভোজনপর্ব।

লাইলির মা ফেরার পথে ড্যাংডেঙিয়ে হেঁটে যায়।তার তো আর মাথায় ঘোমটা দিয়ে বসে থাকলে চলে না।গাঁয়ের বুজুর্গ মানুষরা এটা নিয়ে গুজুর-ফুসুর করে।বুলুনের বউটার নাকি কোনো হেফাজত নেই,পরদা-পাকে থাকে না।এরকম নানা কথা কানে আসে মনোয়ারার।

সামসুরা চাচি উঠোনে তালাই পেতে বসে রোদ পোহাচ্ছে।শীতের নরম রোদ গায়ে নিতে খুব আরাম লাগছে বুড়ির।

হ্যাঁ লা বুলুনের বউ,কাল তুকে যে চালগুলো নুনিয়ে দিতে বললাম,এলি কই লা?

আমার কী কুনু অবসর আছে গা চাচি।ইয়ার তার দুয়োরে কাজ করে বেড়ায়।একলা হাতে কত আর করব!কই টপ-টপ বার কর দিনি।

ঘরে-ঘরে মুড়ি ভাজার,চাল পাছুড়ার ডাক পায় মনোয়ারা।ঘরে ছুঁই দেয়,দেওয়ালে নীলবড়ি আর খড়িমাটির চাঁদ সিতারা নকশা আঁকে।হাতের কাজের খুব প্রশংসা পায়।আচলে করে নিয়ে যায়,চাল,কলাই,বোতলে তেল।মুড়ি ভাজলে টাকাও পায়,মুড়িও পায়।মুড়ি কিনতে হয় না মনোয়ারাকে।

চালগুলো নুন মাখিয়ে,কড়াইয়ে গরম করে রোদে মেলে দিল মনোয়ারা।খটখটে হয়ে গেলে সামসুরা চাচি কুড়িয়ে রাখবে।কাল আর একবার কড়াইয়ে গরম করে ভেজে দিবে।

ফেরার পথে মনোয়ারা দেখল হারানের পুকুরপাড়ে তালতলায় একটা শুকনো বেগরো পড়ে আছে।সেটা টানতে টানতেই ঘরে ফেরে।তালপাতার সড়ক দেওয়া চুলোশালের ভেতরে বেগরোটাকে মোচাড়ে ভেঙে ভরে রাখল।বর্ষাকালে ঝিট ঢুকে পড়ে।থাকার ঘরটাও খুব ভাল নয়।ঝিটে বেড়া খড়ের ছাউনি দেওয়া একখানা ঘর।এখন তিনটে প্রাণী কোনরকম মাথা গুঁজে থাকে।

বুলুর বড়ভাই ইলুর অবস্থা এখন বিশাল!ওর ছেলেটা কেরলে রাজমিস্ত্রির কাজ করে।মাস গেলে থোক থোক টাকা পাঠায়।এবছর ইন্দিরা-আবাসের ঘর পেল।তার সঙ্গে কিছু টাকা যোগ করে একতলা দালানবাড়ি তুলেছে।দেওর নিয়ামুলের অবস্থাও খারাপ নয়।নিজের পিক-আপ ভ্যান আছে,ভাড়া খাটায়।যত পোড়াকপাল মনোয়ারা বিবির।বুলু যদি না খেপে যেত,তাহলে এতদিনে কখন আয় উন্নতি হয়ে যেত।আগে তো ভালোয় ছিল মানুষটা।নামাজ-রোজা রাখত,কাজ-টাজ করত।সংসারে মন ছিল।মাসে মাসে বাঁকুড়ার হাসপাতালে দেখিয়ে ওষুধ আনলেই হত।শেষের দিকে কী যে হয়ে গেল...।

(দুই)

লাইলির হাঁসটার জন্য শোক কেটে গেছে এখন।মেয়েটার খুব নেশা ওসবের।দরদি মন।তা বলে হাঁস-মুরগি কী খাঁচার টিয়াপাখি?কুটুমজন এলে জবাই করতে দেয় না।বেচে দিলে কাঁদে।

মনোয়ারাকে গালে হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখে লাইলি বলল,আব্বা মুনে হয় একেবারেই খ্যাপা হয়ি গেছে,লয় মা?

মনোয়ারা মেয়ের কথায় লজ্জা পেয়ে গেল।এতটুকু মেয়ে নয় পাকা-পাকা কথা।বুঝতে পেরে গেছে মা কার কথা ভাবছে।প্রসঙ্গ পালটানোর জন্য মনোয়ারা বলল,মিনষেটার কথা বাদ দে দিনি।যেখানে আছে থাকুক গো,পচে মরুক গো!এলেই কি,আর না এলেই কি।আমাদের কচুটা!

লাইলিকে স্কুলে ভরতি করেছে মনোয়ারা।ছেলে লালচাঁদের মতো যেন না হয়।লালচাঁদ যদি পড়াশোনা করত,তাহলে কী আজ এই অবস্থা হত!কথায় বলে না,মাথার উপর ছাতা নাই/পানির কোনো বাধা নাই।সেই হয়েছে অবস্থা।সেদিনে মল্লিক পাড়ার ছমিরের ব্যাটা বলল,মনোয়ারার চালাঘরটার নাকি লুকিয়ে ছবি তুলেছে নিয়ামুল।ছবিগুলো দরখাস্তের সঙ্গে ব্লকে জমা দিয়েছে।এবার নিয়ামুলের ঘর কে আটকায়!

মনোয়ারা বলেছিল,আমরা কী ঘর-দুয়োর পাব নাই বাপ?তুরা গ্রামে আছিস পাঁচজন,মানুষের ভালমন্দ দেখবি নাই?

ছমিরের ব্যাটা পান চিবতে চিবতে পিরিচ করে থুতু ফেলে বলেছিল,সব লটের পর লট আসছে তো।দেখি,সামনের ভোটটা পেরক,তারপর দেখছি।

মনোয়ারাই ঘরের জন্যে একে তাকে বলে বেড়ায়,সবাই দেখছি দেখছি বলেই পার করে দিল।ঘর আর পেল না।লালচাঁদের ওসবের হেলদোল নেই।আসলে বয়সটা তো কম।বাপটার এমন অবস্থার জন্য অল্প বয়সেই কাঁধে জোয়াল চাপল ছেলেটার।নাহলে ওর কী এখন খাটার সময়!এখন গা-গ্রামে রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে যায় লালচাঁদ।চাষের সময় মাঠেঘাটে মুনিষ খাটে।অনেকেই কেরলায় কাজে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।মনোয়ারা পাঠায়নি।একটাই ছেলে,কোন বিদেশ-বিভূঁই জায়গা,সেখানে কাজে পাঠিয়ে মায়ের চোখে ঘুম থাকে!একটা কিছু হয়ে গেলে মনোয়ারা বিবি অকুল দরিয়ায় ভেসে যাবে।তখন লাইলিকে নিয়ে কী করে বাঁচবে?একটা পুরুষ মানুষ না থাকলে ঘর সংসার অচল।

লাইলির দাদো যখন বেঁচেছিল,তখন পাঁচ কাঠা জমিটা খ্যাপা ছেলের নামে লিখে দিয়ে যায়।সেই থেকেই বুলুর বড়ভাই ইলু নাকমুখ ঘুরিয়ে থাকে।ওদের ঘরের কারও সঙ্গে মিল নেই।নিয়ামুল তাহলেও মাঝেমধ্যে সাড়া দেয়।সেদিন নিয়ামুলদের কলতলায় মুখ ধুতে গিয়ে রক্তের মতো এক ধ্যাবড়া তামুক ফেলেছিল মনোয়ারা।তা দেখে নিয়ামুলের কী নাক ছিটকানি!ঘাড়ের রগগুলো টানটান করে খিঁচে বলেছিল,তুকে কতবার বারণ করব বলদিনি ভাবি?দেখে গা ঘিনঘিন করে!

নিয়ামুল চলে যেতে নিয়ামুলের বউ হামিদা বলেছিল,কিছু মনে কর না ভাবি।উ ওরকমই লোক।মুখের কথাবার্তার ছিরি নাই।

হামিদাই একটু সবার থেকে অন্যরকম। মনোয়ারাকে খুব ভাল বাসে।ভাল তরকারি হলে লুকিয়ে ছাপিয়ে দিয়ে যায়।সময় পেলে মাথার উকুন বেছে দেয়।

(তিন)

মন্ডল পাড়ার বড় পুকুরের পাড়ে ঢেঙা তেঁতুল গাছটার তলায় একদিন একটা লোক এসে বসল।পরনে ময়লা তেলচিটে একটা জামা,আর ঝলং-পটং সুট প্যান্ট।মাথায় বড়-বড় চুল,গোঁফদাড়ি ভরতি মুখ।লোকটা জোরে জোরে প্রলাপোক্তি করে চলেছে।

নিয়ামুলের বউ হামিদা পুকুরের ধারে-ধারে শুশনি শাক তুলছিল।পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়েছিল ছোট মেয়ে আবেদা।লোকটার বিভৎস ভঙ্গি দেখে আবেদা ভয়ে প্যাঁ করে কেঁদে ফেলল।হামিদা মাথা তুলে দেখল লোকটাকে—হায় লো,খ্যাপাটা আবার আইচে!সবার চোখের ঘুম কেড়ে লিবেক লো।বলে পাঁচ বছরের আবেদাকে কোলে তুলে নেয় হামিদা।আবেদা ভয়ে সিঁটিয়ে মায়ের কোলে মুখ লুকায়।হামিদা আদর করে বলে,না মা কাঁদে না,কাঁদে না...তোর বড় কাকা।কিছুই করবেকনি।

লোকটা আপন মনেই বকতে বকতে পাশ দিয়ে যাবার সময় আবেদার দিকে কট-মট করে চেয়ে দাঁতগুলো ফেড়ে হি হি করে হাসল।

মন্ডল পাড়ার বাঁকটায় তেমাথায় ইয়াসিন খুড়োর মুদীর দোকানের সামনে দাঁড়াল লোকটা।ইয়াসিন চোখ তুলে দেখল লোকটাকে।ছেঁড়াখোঁড়া জামার প্যাকেটে গুঁজে রেখেছে কাগজ,পলিথিন,পোয়াল।দোকানের সামনেই ঝোলানো আছে বাচ্চাদের নানারকম খাবার।কাঠের তাকে বয়েনে বিস্কুট -চানাচুর। সেগুলোর দিকে লালসার দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে লোকটা।তারপর হঠাৎ দাঁত ফেড়ে হি হি করে হেসে বলল,কই দে,বিস্কুট দে।

কতকগুলো ন্যাংটো -প্যাংটা ছেলে মারবেল খেলছিল তেমাথার পাশে অশোক গাছের তলায়।সেখানে গিয়ে দাঁড়াল লোকটা।মচমচ করে বিস্কুট খেতে লাগল।ছেলেগুলো খেলা থামিয়ে ওর দিকে তাকাল।দলের একজন বলে উঠল,হা দেক বুলু খ্যাপা আইচে।

ছেলেটার কথা শুনেই দলের যারা ছোট,তারা ভয় পেয়ে কিছুটা সরে দাঁড়াল।

স্কুল থেকে এসে লাইলি উঠোনে খাটিয়ায় বসে বিকালের নরম রোদটা গায়ে মাখছিল।পাশেই বালিশে মাথা দিয়ে শুয়েছিল মনোয়ারা।এমন সময় শিরীষ গাছটার তলায় দাঁড়াল বুলু খ্যাপা।লাইলি চেয়ে দেখল ফ্যাল ফ্যাল করে।আব্বা!কতদিন দেখেনি আব্বাকে....কতদিন!

মুখটা দাড়িগোঁফে বুজে গেছে,মাথার চুলে জট ধরেছে—কতদিন গোসল করেনি কে জানে!লাইলি মাকে ঠেলা মারল,এই মা,মা,মাগো।

সারাদিন খাটা-খাটনির পর চোখে ঘুম এসেছিছিল মনোয়ারার।লাইলির ঠেলা খেয়ে চোখ খুলে ঘুমের ঘোরেই বলল,কী হয়িছে?

লাইলি আঙুল বাড়িয়ে দেখাল,ওই দেক মা,আব্বা আইচে।

ধড়মড় করে উঠে বসল মনোয়ারা।দেখল শিরীষ গাছের তলায় বসে পড়েছে মানুষটা।বুলু খ্যাপা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছে ওদের।যে মানুষটাকে নিয়ে জীবনের এতগুলো বছর কাটাল মনোয়ারা তার এমন দুর্দশা দেখে বুকের ভেতরটা আনচান করে উঠল।মানুষটাকে চেনায় যাচ্ছে না আর।চুল-দাড়িতে ভরতি,কোটরস্থ চোখ।না খেয়ে খেয়ে শরীরটা ক্যাংলাস হয়ে গেছে।

এর মধ্যেই অনেকে খবর পেয়ে গেছে বুলু খ্যাপা ঘরে ফিরেছে।ছাদের উপর দাঁড়িয়ে মনোয়ারার বড় জা জয়গন বিবি কাপড় কুড়তে কুড়তে খানিক দাঁড়িয়ে চেয়ে চেয়ে দেখল।মনোয়ারার চোখাচোখি হতেই সট করে সরে পড়ল।রহমতের মা উঠোনের পাশ দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল,সেও খানিক থমকে দাঁড়াল।বুলু খ্যাপার কাছে যেয়ে বুড়িটা বলল,কুথায় ছিলিস বাপ এতদিন?

বুলু কোনো জবাব দিল না।একটা কাঠি দিয়ে মাটিতে চিক টানতে থাকে আপন মনে।রহমতের মা এবার ঘরের পানে মুখ ঘুরিয়ে মনোয়ারাকে বলল,কই লা বুলুনের বউ,কিছু খেতি দিলি?

মনোয়ারা বলল,ধুপোটার জন্যি রেঁধে রেখে দিইচি নাকি?

সে কি লা হতচ্ছারি!কুথায় খেইচে না খেইচে,দুটি ভাত বেড়ে সামনে দে।যতই হোক তুর...

তুমি যুথা যাচ্চ যাও দিনি চাচি।খামখা কানের গোড়ায় বকবক কর নাকো।

ঢং দেখ-অ মুখপুড়ির! —বলে হাত নেড়ে নেড়ে বিড়বিড় করতে করতে রহমতের মা চলে গেল।

মনোয়ারা লাইলিকে হাঁক পাড়ল,কই গো মা,তুর আব্বাকে খেতি দে।

লাইলি মায়ের কথা শুনে দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকল।থালাতে ভাত-তরকারি বেড়ে আব্বার সামনে নামাল।এক গেলাস পানিও দিল।বুলু খ্যাপা হাত না ধুয়েই থালাটা কাছে টেনে গব-গব করে খেতে লেগে গেল।যেন কতদিন খাইনি।থালা সমেত খেয়ে নিবে।লাইলি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আব্বার খাওয়া দেখছে।নেড়ি কুকুরটা দৌড়ে এসে সামনের পাগুলো মুড়ে বসে খ্যাঁ-খ্যাঁ শব্দ করে নিশ্বাস নিচ্ছে,আর জিভ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে।

(চার)

শীতকালের ছোট দিন।ঝুপ করে সন্ধে নেমে এল।মাগরিবের আজান দিয়ে দিয়েছে মোয়াজ্জিন।লাইলি হাঁস-মুরগিগুলোকে খেতে দিয়ে দরমায় গুনে গুনে ভরছে।লালচাঁদ কাজের থেকে ফিরল।সাইকেলটা চুলোশালের দেওয়ালে ঠেসিয়ে রেখে হাঁক পাড়ল,তেল-সাবানটা দে তো লাইলি।

মনোয়ারা বিবি বলল,জাড়ে গা ধুতে হয় নাকো বাপ।যা তুর কাকাদের কলে হাত-পাগুলো ধুয়ে লিগা।

লাইলি তেল-সাবান এনে দিল।ফিসফিস করে বলল,আব্বা এইচে দেখলে?

কই না তো।কুথায়?


কে জানে কুথায় ঘুরি বেড়াচ্ছে।খ্যাপার মন বৃন্দাবন!

মনোয়ারা বলল,শুন বাপ প্রতিদিন সাঁঝেরবেলা ঘর ঢুকচিস,এত দূরে কাজে যেতি হয় না।গাঁয়ে ঘরে কাজ দেখ কুথাও।

হারু মিস্ত্রির কাছে কাজ ছেড়ি দিব এবার।ঘরটা হয়িই এইচে।এবার লখার সাথে কাজ করব।

হ বাপ,তাই করবি।বেলাবেলি ঘর আসতে পাবি তাইলে।

লালচাঁদ মায়ের কথা শোনে না।পুকুর থেকে গোসল করে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরল।মনোয়ারা চুলোশালের ভেতর থেকে হাঁক পাড়ল,এখানে আয় বাপ।আগুনে হাত-পাগুলো একটু সেঁকে লে।

চুলোশালের ভেতরে লাইলিও বসে আছে।ঘুটের আঁচে ভাত ফুটছে টগবগ করে।লালচাঁদ চুলোর কাছ ঘেঁষে বসল।

লাইলি বলল,আব্বাকে খুঁজে দেখব মা?

না, আর যেতি হয় নাকো।খাবার সুময় ভেবিয়ে চলি আসবেক।তুই পড়তে বসগা যা।

লালচাঁদ বলল,চলি আসবেক,না দেখ গা চলি গেল।

দাদার কথা শুনে ফিক করে হাসল লাইলি।হাসতে হাসতে বলল,জানো, আব্বা এবার সুট প্যান্ট পরে আইচে।

আর বারে তো একটা লুঙি পরে এইল।রেতের বেলায় আমার চাদরটা বিছিয়ে শুতে দিইলি,সকালে উঠে দেখি পাখি ফুড়ুৎ!— একটু ঢোক গিলে লালচাঁদ বলে,আজ কুথায় শুতে দিবি আব্বাকে?

মনোয়ারা বলল,আজ চুলোশালেই শুবেক।কাল নাপিত ডেকে চুল-দাড়ি সাঁটা করাব।গা ধুইয়ে দিব।...

ঘরের ভেতর বি.পি.এল তালিকায় পাওয়া ইলেকট্রিক মিটার বসেছে।তারই একখানা বালব জ্বলছে মিটমিট করে।সেই আলোতে ভাত খেতে বসেছে তিনজন।ঘরের ভেতর থেকে কিছুটা আলো ঠিকরে বেরিয়ে উঠোনে পড়েছে।উঠোনের জমাট অন্ধকারটাকে ওই দূরের মাঠের পানে তাড়িয়ে দিয়েছে।হঠাৎ লাইলি দেখল উঠোনের আবছা আলো-আঁধারে কে যেন দাঁড়াল।ছায়াটা কাছে এগিয়ে আসতেই মনোয়ারা বলল,চুলোশালে বসো,ভাত দিচ্ছি।

লালচাঁদ মুখে ভাত পুরেই চেয়ে চেয়ে দেখল আব্বাকে।

বুলু খ্যাপাকে খেতে দিয়ে,চুলোশালের ভেতর একটা চট বিছিয়ে শুতে দিল মনোয়ারা।ঘরের ভেতর ঢুকে নিজেদের বিছানা করল।

লাইলি বলল,আব্বাকে একটা কাঁথা দিবিনি মা?

লালচাঁদ বলল,আজ আর ময়লা করতে দিন্না দিনি।খ্যাপা মানুষের আবার জাড় লাগে নাকি!

মনোয়ারা বলল,আজ আর দিবনি।ওই শুয়ে থাকুক।

লালচাঁদ শুয়ে শুয়ে বলল,আব্বাকে আর একবার বাঁকুড়ায় দেখিয়ে আনলে হয় না মা?

শুধু দেখিয়ে আনলেই হবেক?চিকিচ্ছে করার পয়সা কুথায় আমাদের!ঠিকঠাক সুময়ে ওষুধগুলো না পেয়েই তো মানুষটা...।

মাঝরাতের দিকে ঘুমটা ভেঙে গেল মনোয়ারার।কী যে হয়েছে কে জানে!এই কয়েকমাস একদম চোখে ঘুম নেই।আগে এক ঘুমে সকাল করে দিত,এখন আর তা হয় না।সারারাত বিছানায় এপাশ ওপাশ করে।

বিছানায় উঠে বসল মনোয়ারা।ছেলে-মেয়ে দুটো বেঘোরে ঘুমচ্ছে।লালচাঁদের গা থেকে নেমে যাওয়া কাঁথাটা টেনে চাপিয়ে দিল।লাইলি যে করোটে শোয় সকালে সেই করোটেই ওঠে।লালচাঁদের শোওয়া খারাপ।বালিশে মাথা থাকে না।গড়িয়ে গড়িয়ে বিছানার বাইরে চলে যায়।কোনদিন লাইলির গায়ের ওপর ঠ্যাং-ম্যাং চাপিয়ে দেয়।মনোয়ারা উঠলে দু'জনকে ঠিক করে দেয়।আর লালচাঁদকে গাল পাড়ে,ধুমসো মোষটার স্বভাব দেখ দিনি।ঘুমে দিশে হুশ নাই।

দরজার হুড়কোটা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে মনোয়ারা।ছেঁচাকোলে নামিয়ে রাখা পানির বালতিটা থেকে বদনায় পানি নিল।শিরীষ গাছের মাথার উপর ডাগরপারা চাঁদ উঠেছে।বাইরে প্রচণ্ড শীত!কুয়াশায় ঝাপছা চারিদিক।শিশির পড়ছে পিটপিট করে।শিরীষ গাছের পাশেই নর্দমা।সেখানে বসে পেচ্ছাপ করল মনোয়ারা।একবার মাঠের পানে তাকাল।বেলতলার মাঠ থেকে আলো-আঁধারের বুক চিরে একদল শিয়াল ডেকে উঠল তারস্বরে।এখন কত রাত কে জানে!

শুতে যাবার আগে চুলোশালের বাঁশের দরজাটা খুলে উঁকি মেরে দেখল মনোয়ারা।মানুষটা শীতে থরথর করে কাঁপছে।জড়ো হয়ে শুয়ে আছে।যে চটটা বিছিয়ে শুতে দিয়েছিল,ওটাই টেনে ঢাকা নিয়েছে পাগুলো। খুব মায়া হল মনোয়ারার।আহা গো!একটা কাঁথা দিলে কী এমন হত!

মনোয়ারা চুপিসারে শোবার ঘরে ঢুকল।একবার ছেলে-মেয়ের ঘুমন্ত মুখগুলির দিকে চেয়ে দেখে নিল।একটা কাঁথা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল দরজাটা ঠেসিয়ে দিয়ে।

চুলোশালের দরজাটা খুলে মনোয়ারা ঢুকে পড়ল।মানুষটার মুখটা কত অসহায়!কাথাটা সযত্নে বুলুর গায়ে ঢাকা দিয়ে পাশে বসল মনোয়ারা।কপালে হাত বুলতে লাগল।এবারে এসে মানুষটা কত চুপচাপ! আগে পাড়ার লোকের ঘুম কেড়ে নিত।সারারাত জুড়ে সে কি চিল্লাচিল্লি! খ্যাপায় হোক আর ধুপোয় হোক ,মানুষটা বেঁচে আছে বলেই তো মনোয়ারা ছাপা শাড়ি,হাতে চুড়ি পড়তে পায়।কতদিন মানুষটার স্পর্শ পায়নি মনোয়ারার হিসাব নেই।

শীতের রাতে হঠাৎ উষ্ণতার স্পর্শ পেয়ে বুলু জেগে উঠল।চোখগুলো হিংস্র পশুর মতো জ্বল জ্বল করছে।বেশিক্ষণ চাইতে পারল না মনোয়ারা।যেন পুঁড়ে খাঁক হয়ে যাবে।খ্যাপার মন এখুনি যদি চিৎকার চেঁচামেচি আরম্ভ করে দেয়?ভয় পেয়ে উঠতে গেল,ওমনি বুলু খপ করে মনোয়ারার হাতটা ধরে ফেলল।বুকটা ঢিপ করে উঠল মনোয়ারার।সারা শরীরে শিহরন!

চাঁদের আলো তালপাতার সড়কের ফাঁক দিয়ে চুরি করে ঢুকে পড়েছে ভেতরে।এক অদ্ভুত আলোছায়ার পরিবেশ গড়ে ওঠেছে।বুলুর এইভাবে হাত ধরার ইঙ্গিত মনোয়ারা বুঝে।মনের ভেতর জিইয়ে রাখা গোপন ইচ্ছাটাকে নিজেও প্রকাশ করে ফেলল।ভেতর থেকে বাঁশের দরজাটা বন্ধ করে দিল মনোয়ারা।চাঁদের আলো-আঁধারিতে প্রকৃতি আর শরীরের এক অসীম অনন্ত লীলা রহস্যের খেলায় মেতে উঠল দুটি প্রাণী। শিরীষ গাছের মাথার ওপর থেকে ডাগরপারা চাঁদটা লজ্জা পেয়ে অনেকটা দূরে সরে পড়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন