সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

স্মৃতি ভদ্রের গল্প: ডিজ্যাবল লাইফ


সকাল থেকে বেশ কয়েকবার নিজের ফেসবুক একাউন্টে ঢুকতে চেষ্টা করলো তিয়াষা। বারবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো কয়েকটি শব্দ। মেজাজটা বেশ চটে গেলো তিয়াষার।


খুব ম্যাড়মেড়ে লাগছে দিনটা। কিচ্ছু করার থাকে না এমন দিনে। হয় পড়ে পড়ে ঘুমাও নয়তো অপেক্ষায় থাকো দরজার কলিং বেল বেজে ওঠার।

মাঝেমাঝে বন্ধ দরজাটা হাট করে খুলে রাখতে ইচ্ছা হয় তিয়াষার। বাইরের কৌতূহলী চোখগুলোর সব প্রশ্নের উত্তর হয়ে সামনে দাঁড়াতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু তিয়াষা পারে না। আর এই না পারাগুলোই বিপন্নতায় পৌছে দেয় ওকে।

সারাদিন এদিক ওদিক থাকলেও, তিয়াষার এরকম বিপন্ন সময়ে নীরু ঠিক ঠিক শব্দহীন পায়ে এসে দাঁড়ায় ওর পাশে। আজও তার অন্যথা হলো না।

নীরু কোন ফাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখের ভিতর সব মায়া নিয়ে তাকিয়ে আছে তিয়াষার দিকে।

কি হয়েছে বুঝতে চাইছে।

নীরুকে মনে মনে গাল দেয় তিয়াষা। আজ মন ভাল নেই, তবুও এখন ওর সাথে বকবক করতে হবে। এসেই যখন পড়েছে কী আর করা। সব বিরক্তি, মন খারাপ আড়াল রেখে নীরুকে বিছানায় ওর পাশে বসতে বলে।

কাল বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংএর একটি মন্তব্য ফেসবুকে শেয়ার করেছিল তিয়াষা।

মহাবিশ্বকে চালিয়ে নেওয়ার জন্য কোনো ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই-----স্টিফেন হকিং।

এটা লেখার পরে কাল সারাদিন তাকে অজস্র গালিগালাজসহ মন্তব্য সহ্য করতে হয়েছে তাকে। কেউ কেউ তাকে মৃত্যুর হুমকি দিয়েছে।

মৃত্যূর হুমকি এবারই প্রথম নয়। মৃত্যুর হুমকিটা সে প্রায়ই পায়।

আজ ভেবেছিল, হকিংএর দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন বই থেকে একটি উদ্ধৃতি শেয়ার করবে।

‘মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। মরার জন্য আমার কোনো তাড়াহুড়াও নেই। তার আগেই বহু কিছু করার আছে আমার। আমার কাছে মস্তিষ্ক হচ্ছে কম্পিউটারের মতো, যার সরঞ্জামগুলো নষ্ট হলেই সে আর কাজ করবে না। আর একটি নষ্ট কম্পিউটারের জন্য কোনো স্বর্গ বা নরক অপেক্ষায় থাকে না। অন্ধকারে ভয় পাওয়া মানুষের জন্য নির্মিত এক কাল্পনিক গল্প এটি।’

এটা পোস্ট করার আগেই কম্পিউটারের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে," ইউর একাউন্ট হ্যাজ বিন ডিজ্যাবল।"

এই নিয়ে বেশ ক'বার এমন হলো। প্রচলিত কোনো মতবাদকে যুক্তি দিয়ে অসার প্রমাণ করলেই বা তা নিয়ে কিছু ফেসবুক একাউন্ট থেকে পোস্ট করলেই যুক্তিহীন, অন্ধ মানুষগুলো তিয়াষার আইডি রিপোর্ট করা শুরু করে।

কয়েকদিনের জন্য ডিজ্যাবল হয়ে যায় তিয়াষার ফেসবুক একাউন্ট।

নিজের ডিজ্যাবল জীবন টানতেই ত্যক্ত সে। এরপর আবার নতুন করে কোনকিছুর ডিজ্যাবল হওয়া। জীবন নিয়ে আক্ষেপ না থাকলেও ব্যর্থতার সুক্ষ্ম একটা জ্বালা ছিল মনে। স্থবির এই জীবনে শুধু ভার্চুয়াল ওই জগতটাই ছিল চলমান। এখন তাও হারিয়ে গেলো।

শহরের একদম মাঝখানে এই বাড়িটা। চারপাশে প্রমাণ সমান দেয়াল। তার উপরে আরেকপ্রস্ত কাঁটাতারের বেড়া। বাড়িটাতে আব্রুর বাড়াবাড়ি একটু বেশীই। দেয়াল ঘেঁষা বড় বড় গাছগুলোও সেই একই কাজে নিয়োজিত। তবে এটাও সত্যি যে, আব্রু রক্ষার অতিরিক্ত এই আয়োজনই বাড়িটাকে সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু করে তোলে।

চলতি শীতের কিছু অতিথি পাখি যেমন অবাধ্য হয়ে সব আব্রু ছেড়েফুঁড়ে বাড়িটায় ঢুকে পড়ে, ঠিক তেমনই এখান দিয়ে যাওয়া আসা পথচারীগুলোও ঢুকে পড়তে চায় বাড়িটায় অবাধ্য হয়ে। তারা কারণে অকারণে নানা অজুহাতে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ায়, কান লাগিয়ে বাড়ির ভিতরের কথা শোনার চেষ্টা করে।

মানুষগুলো এ বাড়ির গোপনীয় কারণের কোনো সংকেত না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ে। অবশেষে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে একদলা কফ বা আয়েশ করে চিবানো পানের পিক দেয়ালের গায়ে ফেলে মনের ঝাল মেটায়।

বাড়িটাতে চারটা ঘর। তিয়াষা থাকে একদম শেষের ঘরটাতে। নীরু'র কোনো নির্দিষ্ট ঘর নেই। ও মাঝেমধ্যেই ঘর বদল করে। আজ এঘর তো কাল ওঘর। এই ঘর বদলে কোনো ক্লান্তি নেই ওর।

তবে তিয়াষা খুব কুড়ে স্বভাবের। ঘর ফাঁকা থাকলেই কি এঘর ওঘর করতে হবে?

এই দু'টি প্রাণী ছাড়াও আরোও একটি জীব আছে এই বাড়িতে। কল্লোল হাসান। তবে সে খুব নিয়মিত নয় এখানে। সপ্তাহে একবার আসে।

তবে সে আসা হয় খুব আয়োজন করে। দু'হাত ভর্তি একগাদা প্রয়োজনীয় আর অপ্রয়োজনীয় জিনিষ নিয়ে হৈ হৈ করে কল্লোল ঢোকে এই বাড়িতে। যে দু'দিন এখানে থাকে খুব হুল্লোর করে কাটায়। তিয়াষার রান্নায় হাত লাগানো হোক বা গ্রীলের বারান্দার পর্দা বদলানো সবকিছুতেই খুব উৎসাহী থাকে এ দু'দিন কল্লোল। তিয়াষাও মানিয়ে নেই সেই আড়ম্বরতার সাথে।

অনাড়ম্বর এই জীবনের ওইটুকুই তো আড়ম্বর।

তবে খুব অদ্ভুতভাবে নীরুর আচরণ অচেনা হয়ে ওঠে সেই দিনগুলোতে। কখনো কারণে অকারণে কল্লোলের সাথে গিয়ে গল্প জমায়। আবার কখনো গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। তবে নীরুর সেই গাল ফুলিয়ে থাকার একটা কারণ অবশ্য তিয়াষা খুব সম্প্রতি বুঝতে পেরেছে।

কল্লোলের পাশে তিয়াষাকে দেখলেই নীরু চুপসে যায়।

খুব রাগ হয় তিয়াষার। ওদেরকে পাশাপাশি দেখলেই এরকম কেন করে নীরু? অদ্ভুত সব দৃষ্টি আকর্ষণী কাজ শুরু করে। খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে ঘরে চুপচাপ পড়ে থাকে নীরু। তিয়াষার কাছে আসে না। কল্লোলকে এড়িয়ে চলে।

সেসব সময় তিয়াষার রাগকে নীরু পাত্তা না দিলেও আজ ওর বিরক্তিটুকু কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছে। তিয়াষার মন ও মর্জির স্পষ্ট ছবি বুঝি শুধু নীরুই ধরতে পারে। তাই আজ আর নতুন কোন বিরক্তির উদ্রেক করতে চায়না ও। মাথা নীচু করে একমনে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে। বকবক করার সাহস আজ নেই ওর।

তোরও মুড অফ নাকি? এত শান্ত হয়ে বসে আছিস? আসা অব্দি চুপচাপ মেঝের দিকেই তাকিয়ে আছিস----- তিয়াষার কথায় উদ্যম খুঁজে পেল নীরু। কিছু বলতেই যাবে যাবে তখনই কলিং বেলটা বেজে উঠলো। দরজার এপাশে কল্লোলের আবির্ভাব হতেই নীরু দ্রুত পায়ে অন্য ঘরে চলে গেলো।


কল্লোলকে দেখেই খিঁচড়ে যাওয়া মেজাজটাতে খুশির লেবাস পড়িয়ে নিলো তিয়াষা। গলায় আহ্লাদ এনে টেনে বললো,

--মনে পড়লো অবশেষে এ বাড়ির কথা?

নিজের ব্যাগটা তিয়াষার হাতে ধরিয়ে দিয়ে কল্লোল বললো,

-না পড়ে উপায় আছে?

তিয়াষা ব্যাগটা মেঝেতে ফেলে রেখে এগিয়ে গেলো কল্লোলের দিকে,

--ওদিকের খবর কী? মা-বাবার খবর পেলে? কাজটা কতদূর এগোলো?

ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম একটি হাসি ঝুলিয়ে কল্লোল বলে,

- ওদিকের খবর জেনে কী হবে? সবকিছু যে আগের মতো হবে না তুমি জানো। গতকাল তোমার পুরাতন বাড়িওয়ালাকে রাস্তায় ধরে অনেক জেরা করেছে ওরা। তোমার কথা জানতে চায়।

চোখমুখ যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে তিয়াষা প্রশ্ন করে,

কী জানতে চায় ওরা?

তিয়াষার ভয়টা পরিষ্কার ধরতে পারে কল্লোল। ওর পাশে এসে দাঁড়ায়। এরপর তিয়াষার কাঁধে হাত রেখে বলে,

--বলবো, বলবো। আছি তো দু'দিন। সব বলবো।

সত্যি বলতে তিয়াষার তেমনকিছু আসে যায় না কল্লোলের এই থাকা বা না থাকা নিয়ে। তবে, তাই বলে তোয়াজের কোনো কমতি থাকে না সে। আগুনের আঁচে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে কয়েক পদ রান্না করা হোক বা সব অস্বস্তি ঢেকে কল্লোলের সাথে মিথ্যে ভালবাসার গল্প ফাঁদা হোক, কোনো কিছুতেই তিয়াষা আন্তরিকতার অভাব রাখে না। সত্যি বলতে, তিয়াষা বাধ্য এটুকু করতে।

আর তিয়াষার এই অসহায়ত্বই কল্লোলের তুরুপের তাস। কিছু বলার বা করার সামর্থ্য নেই মেয়েটির। সর্বোচ্চ নিরাপত্তার এই ডেরা ছেড়ে যাবার সাহস বা দুঃসাহস কোনটাই নেই তার। 

কল্লোলের সাথে কথায় কথায় সন্ধ্যা গড়ায় তিয়াষার। এ গল্পে ও গল্পে ঠাওরাতে চায় ওকে নিয়ে কল্লোলের পরবর্তী পরিকল্পনা। জানতে চায় মা-বাবার বর্তমান অবস্থান আর অবস্থার কথা।

মা-বাবার কথা মনে আসলেই একটা অপরাধবোধে কুঁকড়ে যায় ও। এমন তো হবার কথা ছিল না।

স্বচ্ছলতার কিছু অভাব থাকলেও আটপৌরে সুখের অভাব ছিল না ওদের। তিন রাস্তার মাথায় নিজের মুদি দোকান টা বন্ধ করে বাবা 'কানু মিষ্টান্ন ভান্ডার' থেকে গুড়ের জিলাপি নিয়ে আসতো মাঝেমাঝে। আর তাতেই মায়ের চোখে আহ্লাদের হুটোপুটি দেখে তিয়াষা শিখেছিলো জীবনে সুখী হবার জন্য বড় কিছুর প্রয়োজন নেই।

যেমন প্রয়োজন নেই সত্য বলতে ভয় পাবার, অকপট হবার সাহসটুকু বিসর্জন দেবার।

এই অকপট সাহসটুকুই তিয়াষার অহংকারের জায়গা। নিজের কাছে যা সঠিক তা যুক্তি দিয়ে সকলের সামনে রাখতে এতটুকু দ্বিধা করে না তিয়াষা।

আর এই দ্বিধাহীনতাই ওকে বিপদে ফেলে দিলো। শুধু ওকে নয়, পুরো পরিবারের সামনেই এসে দাঁড়ালো এক অদ্ভুত সময়।

তখন তিয়াষা সবে ফেসবুকের দেয়ালে নিজের মনের কথা, নিজের বিশ্বাসের কথা লেখা শুরু করেছে। লিখে প্রতিবাদ করতে শুরু করেছে সমাজকে পিছিয়ে দেওয়া চিন্তাগুলোর বিরুদ্ধে।

তবে, সমাজ কে নিয়ে এই চিন্তাই যে তাকে সমাজ বহির্ভূত করে দেবে, সেদিন পর্যন্তও অজানা ছিলো তিয়াষার।

শ্রাবণের বিকেল ছিল সেদিন। সারাদিনের ঝিরিঝিরি বৃষ্টি দুপুরের পর ধরে এলেও, আকাশ কালো করা মেঘের ছায়া সময়টাকে কালো করেই রেখেছিলো।

কলেজ থেকে ফিরছিলো তিয়াষা। দক্ষিণ দিকের রাস্তাটা পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠতেই একটি কালো কাঁচের সাদা মাইক্রোবাস এসে থামলো ওর সামনে। স্লাইডিং ডোরটা সরে গিয়ে বেরিয়ে এলো একটি অচেনা মুখ।

আপনি তিয়াষা?

উত্তরের অপেক্ষা করেনি সে বা তারা।

হ্যাঁচকা টানে তিয়াষাকে গাড়ির ভিতর তুলে নেওয়া হলো। এরপর অনেকগুলো অচেনা মুখের ক্রুর দৃষ্টি আতঙ্ক হয়ে তিয়াষাকে জাপটে ধরার আগেই জ্ঞান হারালো ও।

তারপর থেকে তিনদিন কোথায়, কীভাবে ছিল তা খুব ভাসা ভাসা হলেও ভয়াবহ। বিভৎস সে সময় আর মানুষগুলোর হাত থেকে কীভাবেই বা পালিয়ে এসেছিলো সে, তা আজও অস্বচ্ছ তিয়াষার নিজের কাছে ।

সে সময়ের কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধের প্রভাবই সময়গুলোর স্বচ্ছ ছবি স্মৃতিতে গাঢ় হতে দেয়নি। সবকিছুই তাই আবছা, অস্বচ্ছ।

তবে এরপরের দিনগুলোর ছবি খুব স্পষ্ট বা বলা যায় দগদগে।

সেখান থেকে পালিয়ে এলেও বিভৎস মানুষগুলো তিয়াষার পিছু ছাড়েনি। পালিয়ে আসার পরেই শুরু হয় মানসিক নির্যাতন। ভয় দেখানো, হুমকি-ধামকি তখন আর শুধু তিয়াষা পর্যন্ত সীমিত থাকলো না। ওর বাবাকেও নানাভাবে অপদস্থ আর ভয় দেখানো শুরু হলো। বলা হলো,

তিয়াষাকে লেখা ছাড়তে হবে। ফেসবুকে সমাজ সংস্কারক হবার চিন্তা বাদ দিতে হবে।

তিয়াষা ছেড়ে দিলো। তবে লেখা নয়, নিজের বাড়ি।

শহরে এসে থাকা শুরু করলো সে। ভাবলো, গ্রামের অকাট্য মূর্খ মানুষগুলো যুক্তি বুঝতে চায় না। কিন্তু শহরের মানুষগুলো তো শিক্ষিত, উদার। এরা তার উদারচিন্তায় বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না।

বেশ কিছুদিন এমনই চললো। তিয়াষা মন খুলে প্রচলিত চিন্তার বিপরীতে নিজের যুক্তি প্রকাশ করতে লাগলো নির্বিঘ্নে।

সেই সময়েই পরিচয় হলো কল্লোলের সাথে। ফেসবুকের কল্যাণেই তিয়াষার জীবনে এলো সে।

কল্লোল ছিল ফেসবুকে তিয়াষার ফলোয়ার।

কল্লোলও লেখে,তবে তিয়াষার মতো সরাসরি নয়। কিছুটা হেঁয়ালি করে, কিছুটা আড়াল রেখে।

কল্লোল নিজে থেকেই আগ বাড়িয়ে বন্ধুত্ব করলো তিয়াষার সাথে। সাহসী মেয়ে তার খুব ভাল লাগে।

নিজের অক্ষমতাকে খুঁজে পেল তিয়াষার ক্ষমতায়।

তবে শুরুতে তিয়াষা এসব ভাল লাগা না লাগায় খুব একটা পাত্তা দিতো না। তখনও সে নিজের বিশ্বাসকে যুক্তি দিয়ে সকলের সামনে রাখতেই মনযোগী বেশী।

আর এমন সময়েই এলো দ্বিতীয় আঘাত। 

একদিন গলির মোড়ে তিয়াষার রিক্সাটা ঢুকতেই একটি মোটরসাইকেল ধাক্কা মেরে পালিয়ে গেলো।

তবে এক্ষেত্রে বেচারা রিক্সাওয়ালার কপাল খারাপ ছিল। সেই এক্সিডেন্টে তারই বেশী ক্ষতি হয়। তিয়াষার শুধু হাতপায়ের কিছু জায়গা কেটেছিঁড়ে গেলো।

কল্লোলের সহায়তায় ডাক্তারের চেম্বার থেকে বাসায় ফেরার পরেই সে বুঝতে পারলো, এটা এক্সিডেন্ট ছিল না।

মোবাইলে রাস্তায় মুখ থুবরে পড়ে থাকা অন্যকারো রক্তাক্ত ছবি পাঠিয়ে বলা হলো,

তিয়াষার ভবিষ্যতের ছবি।

এরপর তিয়াষা নিজে আর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

সেই মূহুর্ত থেকে কল্লোলই হয়ে ওঠলো তিয়াষার অভিভাবক। সব সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করলো সে তিয়াষার জন্য।

শহরের এক কোণে নিরিবিলি একটি বাড়ি ভাড়া করা হলো। তিয়াষাকে রাখা হলো সেখানে। হারিয়ে গেলো সে, তার চেনাজানা পৃথিবীর সকলের কাছ থেকে।

এ বাড়ির ঘোরটোপে ঢোকার কিছুদিন পরেই তিয়াষা জানতে পারলো শুধু সে নয়, তার বাবা-মাও হারিয়ে গেছে।

খবরটা অবশ্য কল্লোলই এনে দিয়েছিলো।

তিয়াষা এই বাড়িতে আছে, এটা বাবা-মা কেও জানানো বারণ ছিলো। তাদেরকে ব্যবহার করে যে কেউ তিয়াষাকে খুঁজে বের করতে পারবে। বাবা-মা নানারকম বিড়ম্বনায় পড়তে পারে। তাই তিয়াষা তাদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো। আক্ষরিকভাবেই বিছিন্ন হয়ে গেলো তাদের থেকে।

তবে তাতে খুব একটা লাভ হলো না। প্রতিনিয়ত ভয় দেখিয়েও যখন বাবার কাছ থেকে কিছু জানতে পারলো না ওরা, তখন আক্রমণ করে বসলো তিয়াষাদের বাড়ি।

আত্মরক্ষায় বাবা-মা পালিয়ে গেছে-----কল্লোল এটা বললেও তিয়াষা বুঝতে পারলো আসলে হারিয়ে গেছে তারা।

কবে, কীভাবে মা-বাবাকে ফিরে পাবে তার উত্তর জানা নেই তার।

বাবা-মাকে হারিয়ে ফেলার সেই দুঃসহ সময়েই তিয়াষার সঙ্গী হয়ে আসে নীরু।

তিয়াষা জানে নীরু এখন দরজার আড়ালেই আছে। কল্লোল আর তাকে পাশাপাশি দেখে বিরক্ত হচ্ছে।

তবে এখন নীরুর কথা ভাবতে ইচ্ছা করছে না ওর।

বাবা-মা'র কোনো খবর পাওয়া গেলো কিনা বা এই বন্দি জীবন থেকে বেরিয়ে মুক্ত যে দেশে যাবার কথা তাদের, তার অগ্রগতি হলো কিনা এখন শুধু তাই জানতে ইচ্ছে করছে তিয়াষার।

কিন্তু কল্লোল কেন যেন নির্ভার করতে চায় না তাকে।

তাই তো কল্লোল চোখ সরু করে অনাকাঙ্ক্ষিত সময়ের গল্প করে যায়। ঈগলের মতো ছোঁ মেরে দু'একটি ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর ঘটনার গল্প টেনে এনে ফেলে তার সামনে। কথায় কথায় জানিয়ে দেয়, দু'দিন আগেই সকালবেলা অফিস যাবার পথে খুন করা হয়েছে একজন ফেসবুকিয় সমাজ সংস্কারককে। বা বেগুনবাড়িতে ঘটে যাওয়া একইরকম ঘটনা।

আঁতকে ওঠা তিয়াষার চোখেমুখে ভয় দেখে স্বস্তি পায় কল্লোল। তবে গলায় সহানুভূতি এনে বলে,

' আমরা তো অল্পকিছুদিন পরেই জার্মান চলে যাবো। সেই দেশে মুক্ত পাখির মতো উড়বে তুমি। আর কয়েকটা দিন....'

তবুও ভয়টা অস্বস্তি হয়ে লেপ্টে থাকে তিয়াষার চেহারায়।

ভয়ার্ত মানুষটির গা ঘেঁষে বসে কল্লোল, হাত দু'টো মুঠোয় ভরে।

--আরেহ্, তুমি এটুকুতেই বিচলিত হচ্ছো?

--সব কেমন ওলোটপালট হয়ে গেলো।

--কোথায় ওলটপালট হলো? ভাল হয়েছে বরং। আমরা নিভৃতে প্রেম করতে পারছি।

কল্লোল অক্লেশে বলে যায়,

--নতুন কিছু লিখলে? কতদিন তোমার লেখা কবিতা শোনাও না।

এই কথাগুলোর অর্থ অন্য।

কল্লোল এখন বসার ঘরের সেগুন কাঠের টেবিলে গ্লাস সাজিয়ে বসবে। সাথে কিছু ড্রাই ফ্রুটস আর চিকেনের পাকোড়া। কাড়ি কাড়ি আ্যালকোহল পেটে চালান দিবে আর ভকভক করে ঢেকুর তুলবে। এগুলোর সাথে তাল মেলাতে মধ্যম স্বরে নিজের লেখা পাঠ করে যাবে তিয়াষা। কল্লোল দু'একবার বাহ্, বাহ্ করে আস্তে আস্তে তলিয়ে যাবে ঘুমে।

প্রতিবারের মতো কল্লোল ঘুমিয়ে পড়তেই নীরু নিঃশব্দে এসে দাঁড়ালো পাশে। মুখ ঘুড়িয়ে নীরুকে দেখলো তিয়াষা।

' আজ রাতে কল্লোল মেঝেতেই থাক। চল তুই আর আমি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।'

নীরু পা টিপে টিপে মেঝেয় পড়ে থাকা কল্লোলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। নিস্পলক তাকিয়ে থাকে কল্লোলের দিকে। ওর চোখে অদ্ভুত একটা মায়া।

কল্লোলের প্রতি নীরুর একটা সুপ্ত আসক্তি আছে, যা তিয়াষা অল্প কিছুদিন হলোই বুঝতে পেরেছে। আর এই আসক্তি লুকিয়ে রাখতেই ও অতিরিক্ত এড়িয়ে চলে কল্লোলকে তিয়াষার সামনে।

কিন্তু আজ নীরু'র কিছু একটা হয়েছে। এখন এড়িয়ে গেলো না সে কল্লোলকে। বরং খুব কাছে গিয়ে বসলো কল্লোলের। কয়েকমূহুর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে কিছু একটা বলতে ঠোট নাড়তেই, তিয়াষা নিজের ঠোঁটে আঙুল রেখে ইশারায় চুপ করতে বললো ওকে।

' এখন কিছু বলিস না। কল্লোল জেগে গেলে ওকে সামলানো মুস্কিল হবে। আজ কয়েক পেগ বেশী খেয়েছে।'

নীরু চুপ করে থাকলো কিন্তু ওর চোখের শব্দগুলো নীরু ঠিক ঠিক পড়ে নিলো। তবে কিছু বুঝতে দিলো না। বললো,

' চল, আজ রাতে অনেক গল্প করবো আমরা।'

অন্যদিন কল্লোলের সামনে নিজের প্রাধান্য পেলে নীরু খুব খুশি হয়। তবে আজ সবকিছুতেই অন্যরকম দিন। তাই এমনটা হবার আশা করলো না তিয়াষা।

কিন্তু সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। নীরুর চোখে সুক্ষ্ম হাসি ফুঁটে উঠলো।

এই হাসি তিয়াষার খুব চেনা।

এ বাড়িতে যখন তিয়াষা আর নীরু থাকে তখন খন্ড খন্ড সুখ ভাগ করে নেয় ওরা দু'জনে মিলে।

কখনো তিয়াষা গুনগুন করে গান গায় নীরু একমনে শোনে। আবার কখনো নীরুর অর্থহীন বকর বকরের একনিষ্ঠ শ্রোতা হয়ে যায় তিয়াষা।

তিয়াষার সাথে এমন কিছু একান্ত সময় পেলেই নীরুর চোখে উপচে পড়ে খুশি।

আসলেই নীরুটা খুব ন্যাওটা তিয়াষার। নিজের স্বল্প সামর্থ্য আর অসীম ইচ্ছা দিয়ে তিয়াষাও নীরুকে ভাল রাখে, আগলে রাখে। একটি সন্তানের জায়গা, একটি বন্ধুর জায়গা নিজের অগাচরেই দিয়ে রেখেছে নীরুকে সে। জীবনের ভুলভাল সব বৃত্তান্ত থেকে সরিয়েও রাখে নীরুকে সে।

তিয়াষা অস্বীকার করে না, নীরুর ভুলভ্রান্তি। নীরু যা করে তা সবসময়ই ঠিক নয়। তবুও নিজের সব দূর্গতির ঝাঁপি শুধু নীরুর কাছেই খুলতে পারে ও।

সেই ঝাঁপি ভর্তি যত দূর্দশা আছে তার গল্প এতদিনে মুখস্থ হয়ে গেছে নীরুর। তবুও প্রতিবার মন দিয়ে শোনে। চোখের কোণে দরদ ঢেলে তিয়াষার দিকে তাকিয়ে থাকে। তিয়াষার সব জ্বালা জুড়িয়ে যায় ওটুকু দরদেই।

এর পাশাপাশি কল্লোলের কথাও ভাবে তিয়াষা। সবকিছুতেই হিসাব তার। কয়দিন থাকবে, কতবার ভালবাসার কথা বলবে---এ সবকিছুর হিসাব একদম কড়া কল্লোলের। তিয়াষাও বাড়াবাড়ি করে না। কল্লোলের সাথে ওর হিসাবটা মোটামুটি পরিষ্কার।

তিয়াষা কল্লোলকে ভালবাসে না। তবে নীরু'র মতোই ও প্রাধান্য পেতে ভালবাসে। তাই কষ্ট হলেও তাকে সহ্য করে নেওয়া যায়। আর এর সাথে মুক্ত হবার স্বপ্ন তো আছেই।

কল্লোল তার হিসেবমতো দু'দিন থেকে চলে গেছে। এ বাড়ি আপাতত আড়ম্বরহীন। তিয়াষার এতে কোনো আক্ষেপ নেই। সবসময় সুখের লেবাস পড়ে থাকাই বরং বিড়ম্বনার।

কিন্তু সেই অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেয়েও ফুরফুরে হতে পারছে না তিয়াষা এখন।

আজ তিনদিন ধরে ফেসবুক একাউন্ট ডিজ্যাবল হয়ে আছে। ওই জগতটা থেকে দূরে থাকলে অস্থিরতা বাড়ে তিয়াষার। দূর্দশার এই সময়ে ওই একটাই মাধ্যম পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ রাখার। কীইবা করেছিলো সে? নিজের মনের কথা, বিশ্বাসের কথা অকপটে লিখেছিলো শুধু।

তবুও মানুষগুলো এভাবে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য করছে তাকে। খুব বেশিদিন এভাবে বন্দী থাকতে হবে না তিয়াষাকে। ছেড়ে চলে যাবে এই শহর।

চলে যাবে এক ভয়হীন শহরে। ভয়হীন শহরের স্বপ্ন কল্লোলেরই দেওয়া। সেই স্বপ্নপূরণের জন্যই তিয়াষার এই প্রেম প্রেম খেলা।

কল্লোল চলে যাবার পরেই প্রতিবার ঘরগুলো পরিষ্কার করে তিয়াষা। বেঁচে যাওয়া আ্যালকোহল, কল্লোলের ব্যবহৃত কাপড়, বিছানার চাদর সব সরিয়ে রাখে সে। এগুলো দেখলেই গা গুলিয়ে ওঠে তিয়াষার। মানুষটাকে যে ক'দিন দূরে রাখা যায় তাই সই! অন্তত কিছু সময় তো প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারবে।


তিয়াষা সবকিছু পরিষ্কার করে। এরপর চেস্টার ড্রয়ারে কল্লোলের কাপড়গুলো রাখতে যায়। তখনই সবুজ রঙের পাসপোর্টগুলোতে চোখ আটকে যায় তার।

মুক্ত জীবনের ভিসা থাকার কথা এমনই পাসপোর্টে।

পার্সপোট হাতে নেয়। পাতা উলটে দেখে মুক্তির সিল। আনন্দে ভেসে যাবার কথা তিয়াষার। কিন্তু তা পারে না তিয়াষা। দম বন্ধ হয়ে আসে ওর।

পাসপোর্ট টা কল্লোলের। সেখানে জার্মানের ভিসা।

কল্লোল তো তাকে কিছু বললো না। সে নিজের মুক্তির সিল পোক্ত করলো কবে? তিয়াষার কাছে সব লুকিয়ে গেলো, কেনো?

তাহলে কল্লোল এবার হারিয়ে যাবে তিয়াষার কাছ থেকে। ওর জন্য এই বন্দি জীবনই বরাদ্দ রাখলো কল্লোল।

পাশেই নিজের সবুজ পাসপোর্ট মুক্তির সিলবিহীন হয়ে পড়ে আছে।

প্রত্যাখ্যাত হয়েছে তিয়াষা। প্রবঞ্চিত হয়েছে তিয়াষা। 

মুক্তজীবন নিয়ে তার দরজায় কেউ এসে দাঁড়ায় না। দাঁড়াবে না।

থাক, কারো হাত বাড়াবার দরকার নেই। তিয়াষা নিজেই মুক্ত হবে।

অল্প অল্প করে জমানো ঘুমের ওষুধগুলো আজ তিয়াষার প্রত্যাশা মেটাবে। স্বস্তির জন্য আর কিছুর দরকার নেই। মুক্ত হবে আজ তিয়াষা।

কিন্তু নীরু অস্থির হয়ে ওঠেছে। বারবার তিয়াষার কাছে আসে, আবার অন্যঘরে যায়, আবার ফিরে আসে। গায়ে গা লাগিয়ে বসে। করুণ চোখে তাকায় মেঝেয় শুয়ে থাকা তিয়াষার দিকে।

নীরুর এই দরদ টুকুই তো তিয়াষার পিছুটান। নিজের সমুদ্রসমান ক্লান্তি দূরে ঠেলে হাত বুলাতে থাকে নীরুর সারা শরীরে সে। চোখের কোণায় পুষে রাখা দরদ আজ দরদর করে জল হয়ে ঝরছে নীরুর।

তিয়াষার হাত থেমে যাচ্ছে, চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। সব ক্লান্তি ভর করছে তার দেহে। তিয়াষা আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ে।

আর নীরু, ম্যাও ম্যাও শব্দে জাগিয়ে রাখে নিথর বাড়িটাকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন