সোমবার, ৮ জুলাই, ২০১৯

স্বপ্নময় চক্রবর্তী'র গল্প : বেহেশতের কুঞ্জি

ট্রেন থেকে গুমা স্টেশনে নেমে জিজ্ঞাসা করলাম, “সক্‌রিবাসা মহিম হালদার স্মৃতি উচ্চবিদ্যালয় কত দূর?”
‘চার মাইল’।
চার মাইল? মানে শ্যামবাজার টু ধর্মতলা? নাকি রবীন্দ্র সদন? ঘণ্টা দেড়েক লাগবে। রিক্সা ভাড়া যা বলল তা ট্রেন ভাড়ার ডবল। কী করা যাবে।

ইন্টারভিউতে আমি ছাড়া আর মাত্র তিনজন ক্যানডিডেট। সেক্রেটারী এম-এ আর বিএড সার্টিফিকেট দেখলেন।
‘অনার্স নেই?
‘এম-এ প্রাইভেট ?’
“আজ্ঞে।” 
“সাহিত্যসেবা করেন লিখিছেন, আনিছেন কিছু?”

আমি ব্যাগ থেকে বের করলাম পাঞ্চজন্য পদাবলী, মুকুর, চৈতন্য,..
‘থাক! থাক! আর দরকার নেই—‘

আমার স্বরচিত কাব্যগ্রন্থও আছে একটা। ব্যাগ থেকে বের করি। 

‘বাব্‌বুস। বইও প্রকাশিত হয়েছে? প্রকাশক কে দেখি, আমারও একটু...’ 

বইয়ের নাম হৃদয় গভীরে মুক্তা। 
উৎসর্গ—বেলগাছিয়া আশ্রমের আশ্রমমাতা শ্রীশ্রীজয়মাকে। 

‘আধ্যাত্মিক লাইনে আছেন নিকি?’
‘তা একটু আছি।’
‘বাঃ খুশী হলাম। উদাহরণস্বরূপ একটু পাঠ করুন দিনি, শুনি—‘

প্রথম কবিতাটাই পড়তে লাগলাম।

জিজ্ঞাসা। 
জীবনের খাঁজে খাঁজে যে অন্ধকারগুলো 
জমাট বেঁধে আছে হাজার বছর ধরে 
অসহিষ্ণু, কাম ক্রোধ লোভ মোহের আবরণে, 
সেখানে তোমার কৃপার আলো
পড়বে কি! 

আমার এই দেহভাণ্ডকে রঙে রঙে রাঙিয়ে 
ভাবছি ভালই ত আছি। 
কিন্তু মহাকালের বারিধারায় উঠে যাবে
এই রঙ
সংশয় ভিন্ন ক্লেদ ঘাম রক্তে 
কত মলিনতা.. 

“থাক থাক! হাই থট! হাই থট! কি বলেন হেডমাস্টারমশাই?”

হেডমাস্টার মশাই একটু চিন্তায় পড়েছেন, জিভ দিয়ে টাকরায় চাপ দিলে মুখ থেকে বাঁধানো দাঁত ঈষৎ বেরিয়ে আসে। মুখটা বন্ধ করে আবার দাঁতটা ঢুকিয়ে নেন। তারপর বললেন, 'কলকাতা থেকে এখানে যাতায়াত সম্ভব নয়। এখানে থাকতে হবে কিন্তু। পারবেন?”



রোজ রাত্রে শ্রীশ্রীমায়ের বাণী পড়ি, তারপর ডাইরি লিখি। শ্রীশ্রীজয়মা বলেছেন--তোর পাপের কথা তোকেই বলবি, তোর পাপের জন্য তুই নিজেই নিজেকে বকবি...। আমি ডাইরিতে পাপের কথাও লিখি, তারপর আত্মসংশোধনের জন্য অনুশোচনা করি। আজ লিখলাম--

আজও আমার চোখ গেল। জানলা বন্ধ করতে গিয়েও পারলাম না। গোপনে মেয়েদের শরীর দেখা পাপ। পাপ করিয়াছি। ফ্রকপরা মেয়েটা একতলার দেওয়ালে প্রায়ই ঘুটে দিতে আসে। গোবর নিতে নিচু হয়, হাতের তালুতে গোবরের দলা নিয়ে উঁচু করে ছুঁড়ে দিচ্ছে। মৃদু কম্পন। আজও একবার চোখাচোখি হল। অন্যায় হয়েছে। 

তারপর চিঠিটা লিখে ফেললাম-- পরম পূজনীয়া বৌদি, ভালই আছি। একতলায় সায়েন্সের টিচার ফেমিলি নিয়ে থাকেন। আমি দোতলায় আছি। দোতলা হতে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখি। খাওয়ার কষ্ট নেই। সেক্রেটারী হালদার মশায়ের ভাইপো কেরোসিনের ডীলার। তিনি প্রতি সপ্তাহে দুই লিটার কেঃ তৈল পাঠিয়ে দেন। খাঁটি ঘি আছে, ভাতে-ভাতে ঘি দিয়ে খাই।

একটা মজার কথা শুনবে? ইস্কুলের সেক্রেটারী তাঁর এক শালীর জন্য আমাকে খুব করে ধরেছে। আমার রাশিচক্রের সঙ্গে নাকি খুব মিল। আমি যত বলি, আমি দীক্ষিত, পেঁয়াজ-রসুন খাই না, উনি বলেন, আমাদের স্বজাতি। শেষকালে ঠিকানা দিতে বাধ্য হয়েছি। যদি উনি চিঠি দেন, তোমরা বলে দিও আমি বিবাহ করব না। 

বৌদি এখানে কবে আসতে পারবে! এলে এক আশ্চর্য সুন্দর জিনিস দেখাব। রজনীগন্ধার ক্ষেত। হাজার হাজার রজনীগন্ধার স্টিক। গতকাল রাত্রে জ্যোৎস্নার আলোয় ঐ রজনীগন্ধা বনে বসন্তের ঐ আকুল সমীরণে আমি একা একা বসেছিলাম। কী অপূর্ব মদিরতা। সৃষ্টিকর্তার কী মহান লীলা...


৩.

সেক্রেটারীমশাই নেমন্তন্ন করে খাওয়ালেন। কত বড় মাছের পিস। বললেন, একটা এঁদো পুকুর আছে। হাত তেলতেলে হল। জানালেন কম তেলে খাওয়া অভ্যেস নেই। সরষের তেলের দাম যতই হোক, রেপসীড ঘরে ঢোকান না। নেমন্তন্নের কথা হেডমাস্টার বা অন্য কাউকে জানাতে নিষেধ করলেন। বললেন ওরা বড় কুচক্রী। এইসব ভালবাসার ওরা কদর্থ করবে। 'রান্না কেমন?’ সেক্রেটারীর স্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললুম ‘অপূর্ব।' সেক্রেটারী মশাই বললেন—এদের বোনেরা রাঁধে ভাল। ছোটটিও। এর যেমন রং দেখিচেন, ছোট বোনটি আরও ফর্সা। মুখে বড় লক্ষ্মীশ্রী। সেক্রেটারীর স্ত্রী সত্যিই কালো। কালো বলে আমার কোন ইয়ে নেই। তবে আমি কিছু না বলে চুপ করেই রইলাম। গুরুজনদের সঙ্গে নারীরূপ সম্পর্কে কথাবার্তা আলোচনা করার শিক্ষা পাইনি আমি।

খাবার পর একটু বিশ্রাম। হালদার মশাই বললেন—একটা খেদ আছে। গাঁয়ে সবই আছে, শুধু কালচার নেই। আমি জিজ্ঞাসা কবিতাটা ইন্টারভিউর দিন পুরোটা শোনাতে পারিনি, আজ শোনালাম। উনি দীর্ঘশ্বাস সমেত বললেন উচ্চমার্গের চিন্তাধারা। এবার গ্রামের কালচারের জন্য কিছু করুন। আমিও ছোট দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। উনি তারপর বললেন—চলুন, রজনীগন্ধার চাষ দেখিয়ে আনি। আপনার ভাল লাগবে।

একটু আগে হাল্কা বৃষ্টি হয়েছিল বলে বাতাসে সোঁদা গন্ধ। মাটিতে রবার জুতোর ছাপ পড়ছে। কচুপাতার গায়ে দু এক ফোঁটা টলটলে জল লেগে রয়েছে। রজনীগন্ধা ক্ষেতের কাছে এলাম। উনি হাঁক দিলেন—এরশাদ...আর দু হাতে ফুল সরাতে সরাতে রজনীগন্ধা বনের গভীর থেকে বের হয়ে এল একজন খালি গা মানুষ, ওর দাড়ির রং রজনীগন্ধার মতই, মানুষটা বলল—জে...।

--'কাল ক’ কিলো মাল গেছে?' 
--'বলেন ফুল। ফুলকে মাল বলতি হয় না'।

মালিকের যথাযযাগ্য সমাদরটা যে হচ্ছে না, তা যেন আমি বুঝে ফেলেছি। তাই ইঙ্গিতময় ঘাড় নেড়ে সেক্রেটারীমশাই আমায় বললেন--“অ্যায়। শুরু হল পাগলামী। বুঝলেন, ইশকুরু একটু ঢিলে আছে।’

ক্ষেতের ঠিক মধ্যিখানে মনে হল যেন ছোট্ট চালাঘরের মত কি একটা। জিজ্ঞাসা করলাম, ওটা কী?'

এরশাদ বললে, “মেফতাহুল জান্নাত। মানে বেহেশতের কুঞ্জি, মানে স্বর্গের...’ 

সেক্রেটারী আবার বললেন, ‘আয়।' 

আমি দু হাতে রজনীগন্ধার শরীর সরিয়ে সরিয়ে এগুতে থাকি। একটা সরু পথ মত আছে, তার দু পাশের রজনীগন্ধা যেন সার সার সাদা শাড়িপরা শাঁখ বাজানো মেয়েরা, কী সুবাস বাতাসে, ঠিকই বলেছিল এরশাদ। এটাই স্বর্গ। আমি অপূর্ব উচ্ছ্বাসে এগুতে থাকি, পিছন পিছন সেক্রেটারী মশাই। ক্ষেতের ঠিক মাঝখানে চারটে খুঁটির উপর রোদ আড়াল হবার মত একটা খড়ের ছাউনি। ওখানে একটা চাটাই, টুকিটাকি কয়েকটা জিনিস। ঐখানে দাঁড়িয়ে একবার গোল হয়ে ঘুরি। এক আশ্চর্য পরিবেশ। কবিগুরু...কবিগুরু...একটাও জুতসই কবিতা মনে এল না।

কী ময়য়? কেমন লাগতিচে? 
--অপূর্ব! 
—এ অঞ্চলে আমি একাই ফুলের চাষ করি। 
—এরশাদই চাষ করে না? 
—ও তো লেবার। ক্ষেতটা তো আমার। যেমন আমার স্কুলে....

আচমকা কথাটা থামানোর ফলে সামান্য কাশলেন সেক্রেটারীমশাই। তারপর বললেন, এ আমার বেয়াই-এর বুদ্ধি। বড়মেয়ের বোচ্চেন, বে দিছি কোলাঘাটে। ও দিকি খুব ফুলের চাষ হয়। বেয়াই দু বিঘে করত। ইটভাটায় পড়তা বেশি বলে ঐ জমিতে বেয়াই ইটভাটা দিল। এরশাদ মালি তখন নাকি খাওয়া-দাওয়া ত্যাগ করে বসি থাকত। সে সময় আমি নাতি দেখতে কোলাঘাট গিছিলাম। বেয়াই আমায় মতলোব দিল ফুল কর। এরশাদ কাজ জানে ভাল। তিন কুলে কেউ নেই, ফুলের মধ্যি পড়ি রয়েছে।

এক দঙ্গল প্রজাপতি হৈ-হৈ করতে করতে বাইরের মাঠ থেকে ফুলের বাগানে ঢুকল।



স্কুল আজ স্ট্রাইক। এস. ডি. ও. অফিস ঘেরাও। যশোর রোড পর্যন্ত পাকা রাস্তা চাই। হ্যান্ডবিলের লেখা থেকে জানলাম এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবি একটা পাকা রাস্তা। প্রতি বছর ভোটের আগে কথা দেওয়া হয় শীঘ্র রাস্তা হবে কিন্তু হয় না। বাসরাস্তা হয়ে গেলে মাত্র সোয়া এক ঘণ্টায় কলকাতা যাওয়া যাবে। 

বাসরাস্তা হয়ে গেলে বেশ হয়। কলকাতা থেকেই যাতায়াত করা যাবে। কলকাতা না থাকলে সাহিত্য হয় না।

আজকের ছুটিতে কয়েকটা কবিতা লিখতেই হবে। গতকাল একটা কবিতার লাইন মাথায় এসেছিল-- 'রজনীগন্ধা বনে দিল মিঠে হাওয়া,
সেই সুগন্ধে তোমাকেই কাছে পাওয়া।'

কবিতা লেখাও আজকাল মহা ঝকমারি হয়েছে। দাড়িওলা আঁতেল সম্পাদকরা মিল দেখলে বা কবিতা বোঝা গেলেই খচে যান। পরের লাইনগুলো ভাবছি লিখব।
'জিব্রাইল পরী মাঝরাতে নামে মাঠে/
এরশাদ আলী আসমানে পথ হাঁটে।'

এই লাইনদুটো কিছুটা আধুনিক আধুনিক মনে হচ্ছে। নবাংকুরে পাঠাব। জিব্রাইলের পর পরী না লিখে জিন লিখলে বোধ হয় ভাল শোনায়। রেলিঙ-এ দাঁড়াই। কত দূর মাঠ। হাওয়ায় সবুজের রং উঠে আসে। মেয়েটা আসছে, হাতে গোবরের বালতি। কাঁপছে।



'ধন্যবাদার্হ' কথাটা কি ঠিক? কেমন যেন লাগছে। ধন্যবাদের যােগ্য কথাটা বসালে রিস্ক নেই। 'আপৃক্ত’ লিখব নাকি 'সম্পৃক্ত'ই থাকবে-- ঝামেলা! একটা মানপত্র লিখতে হচ্ছে স্থানীয় এম এল এ-র জন্য। এত খাটছি আমি, তলায় লেখা থাকবে সকরিবাসা গ্রামের অধিবাসীবৃন্দ। আগামীকাল সংবর্ধনা। এম এল এ-র অক্লান্ত পরিশ্রমে ও চেষ্টায় যশোহর রোড পর্যন্ত পাকা রাস্তা স্যাংশন হয়েছে। এম এল এ খুব বুদ্ধি করে একজন প্রভাবশালী ভি আই পি-কে দিয়ে এই অঞ্চলে একটা বাগানবাড়ি কিনিয়েছেন। খুব তাড়াতাড়ি নাকি রাস্তার কাজ শুরু হয়ে যাবে। সংবর্ধনা হবে স্কুলে। তাই ফাংশন। কত আবৃত্তি শেখাতে হচ্ছে। এসেছে শরৎ আছে, আজি এ প্রভাতে রবির কর আছে। ক্লাস টেনের প্রবীরের গলাটা ভাল। ও করবে আঠার বছর বয়স। পদঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা-- করার সময় হাতটা এম এল এর দিকে যাবে। বলা আছে।



রাস্তাটা যাচ্ছে একেবারে হালদারবাবুর রজনীগন্ধা ক্ষেতের পাশ দিয়ে। মাপবাবুরা টেবিল বসিয়ে কি সব যন্ত্রে চোখ লাগিয়ে মাপজোক করতে শুরু করেছেন, ছেলেবুড়ােরা গোল হয়ে রগড় দেখে...জমির দাম বেড়ে গেল। দ্বিগুণ, তিনগুণ, চারগুণ..হালদার মশাই বললেন, ফুলচাষে লাভ কি? রজনীগন্ধা ক্ষেতটা প্লট করে বেচে দেব। খদ্দের পেলে বলবেন।

শ্রীশ্রীজয়মার আশ্রমে একটা চিঠি লেখা দরকার। জরুরী চিঠি।


৭.

শ্রীশ্রীজয়মা সঞ্জীবন দাদা আর মৃত্যুঞ্জয় দাদাকে পাঠালেন জমি দেখতে। শ্রীশ্রীমার বাণী বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে হবে, ভরিয়ে দিতে হবে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে উনিশটা আশ্রম আছে। উঃ ২৪ পরগনায় আর একটা আশ্রমের জন্য জমি খোঁজা হচ্ছিল। সঞ্জীবনদা আর মিতুনদা খুব পছন্দ করলেন জমিটা। দরদাম নিয়ে মায়ের কৃপায় বিশেষ অসুবিধা হল না। টাকা পয়সার ব্যাপারটা সেটল হলে হালদার মশাই খুশি। 

হালদার মশাই বারবার বলেছিলেন এরশাদ ফেরশাদকে এখন কিছু বলতে হবে। না। ব্যাটা বাগড়া দিতে পারে। এমনিতে হাবাগোবা, তলে তলে পঞ্চায়েতে ভাব। পঞ্চায়েতের মাতব্বর এসে বলতেই পারে জমি বেচে দিলে এরশাদ খাবে কি? ফুল ছাড়া সে অন্য চাষ করে না।

সঞ্জুদা মিতুনদা নিয়ে বেশ কাটল। ঝিঙে গোস্ত আর টকডাল রাঁধলাম। অনেকদিন পর মায়ের কথা আলোচনা হ’ল। সঞ্জুদা পিঠ চাপড়ে বললেন-- বেশ আছো হে সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং। এখানকার আশ্রমের ভারটা তোমাকেই নিতে হবে হে...মায়ের হুকুম পাবে, বলে রাখলুম। 

সঞ্জুদা আর মিতুনদাকে বাসে তুলে দিই। ফিরে আসবার সময় আমার অগোচরেই আমি রজনীগন্ধা ক্ষেতের দিকে চলে যাই। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি অনেক সময় কে যেন কোন কোন কাজ আমাকে দিয়ে করিয়ে নেয়। | বেশ দূর থেকেই হাওয়ায় হাল্কা সুবাস। এক দঙ্গল প্রজাপতি ওদিক থেকে এল। সুর্যদেব অস্ত যাচ্ছেন। মৃদু হাওয়া। ফুলের গোছাগুলি ঢলে ঢলে পড়ছে। এখান দিয়েই রাস্তাটা চলে যাবে সোজা যশোর রোডে। আর এখানেই বোধ হয় হবে আশ্রমের প্রধান ফটক। বেশ বড় গেট হবে। মাধবীলতা বাইবে। এখান থেকে মোরাম ফেলা রাস্তাটা চলে যাবে ঠিক মধ্যিখানে, এখন যেখানে এরশাদের বেহেশতের কুঞ্জ, ওটাই মায়ের ছবি রাখবার উপযুক্ত জায়গা। মাতৃমন্দির ঘিরে তৈরি হবে আশ্রম। গুহাশ্রম। গার্হস্থ্য ধর্মেই সব ধর্মের পরীক্ষা। হাতে কাম মুখে নাম। কেবল ঋতুরক্ষার জন্যই স্ত্রী সহবাস। মাতৃবাণীতে মা নিজেই বলেছেন এ বড় কঠিন কাজ। সকলে পারে না। নারী শরীর আগুনের মত। পুরুষ পতঙ্গ সেদিকে ধায়।

সেক্রেটারীর শালীটা বেশ সেক্সি। 

রজনীগন্ধা বনে কিছুটা এগিয়ে যাই। আমার সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি ফুলের রঙে মিশে যাচ্ছে। চাঁদও উঠলো। একটু ফাঁকা মত জায়গা। বসে পড়ি। ফুরফুরে হাওয়া। আমার মাথা ছাড়িয়ে উঠছে ফুলের শীষ। খুব ইচ্ছে করছে ফুলের বিছানায় শুয়ে পড়ি, গড়াগড়ি যাই, এই কোমল শুভ্রতার মধ্যে সম্পূর্ণভাবে মিশে যাই...

এমন সময় এরশাদের গলা শোনা যায়। হবা...এই হবা...

হবা কি? আঁ? পাগলে কত কি বকে, কত কি করে। একদিন দেখি কি, আঁজলা ভরা ঝরা রজনীগন্ধ নিয়ে হাঁটুগেড়ে বসে বিড়বিড় করছে। আমি বললাম কি করছ? ও বলল আল্লার দ্রব্য আল্লাকে দেলম। মুসলমানরা কি আমাদের মত ফুল দেয়? আমি তো জানি না। তারপরই আপন মনে হাঁক পেড়েছিল..সেরবৎ দাও এদিকে। আমি অবাক চোখে ওর দিকে তাকালে ও বলেছিল— বেহেশতের সাকীরা চরে, জানেন না, ওরা কোন পাত্রে আঙুর রস, কোন পাত্রে মধুর মত মিষ্টি পানি নিয়ে ঘোরে...এই বলে তোবড়ানো অ্যালুমিনিয়ামের গেলাসে মাটির ঘড়া থেকে জল নিয়ে বলেছিল পান করেন।

হবা, হবারে...এরশাদের গলা। একটু যেন ভেজা। আর্দ্র। চাপা। একটা নারীকণ্ঠও ভেসে এল যেন...

উঠে দাঁড়াই। ঘোরলাগা ফ্যাকাসে আলোয় দূরে দুটো অস্পষ্ট অবয়ব। দেখবি হবা, দেখবি, একটু পরেই কত ফিরেশতা নামবে এখানে...

এরশাদ বসে আছে ওর বেহেশতের কুঞ্জে, ঐ করবী গাছটার তলায়। সঙ্গে একটি মেয়ে, ফ্রক পরা। এরশাদের সাদা দাড়িতে চন্দ্রালোক। সন্ধ্যারতির চামর ব্যাজনের মত এরশাদের সাদা দাড়ি মেয়েটার মুখের সামনে দোলে, মেয়েটার মুখের উপর ; শরীরের উপর পালকের মত ঘুরছে সাদা দাড়ি।

....আমি আর এগোই না, নিচু হই। বসে পড়ি। ফুল ডাঁটির ফাঁকা দিয়ে দেখতে পাই, বেশ দেখতে পাই এরশাদ একমুঠি রজনীগন্ধা ছড়িয়ে দিল মেয়েটার গায়ে,তারপর হাঁটুগেড়ে বসল মেয়েটার সামনে, আকাশে তাকাল। মেয়েটার কোমরে হাত রাখল। চাঁদের মায়াবী আলো ক্রমে চোখসহা হয়ে গেলে মেয়েটাকে চেনা লাগে, মেয়েটাকে চিনে ফেলি আমি। 

মেয়েটার আশ্চর্য শরীরের ভাঁজে ভাঁজে আলো খেলা করে, ভাঁজে ভাঁজে ছায়া খেলা করে। আমি আমার ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ নীরবে শুনি। মায়া সম্মােহন। আমি নির্বাক। এরপর মেয়েটা মৃদু পায়ে পিছন দিকে হেঁটে গেলে রজনীগন্ধা বন ওকে ঢেকে নেয়। আমার পাপচক্ষু—ততক্ষণ পর্যন্ত শুধু স্থির দেখে যায়। 

আমি পাপ করিয়াছি। ডাইরিতে লিখি। পাপ? কেন পাপ? মেয়েটাকে এভাবে দেখেছি আমি, তাই পাপ? নাকি পাপ আমি নীরবে দেখেছি, তাই পাপ? এরশাদ ওকে ইভ ভেবেছিল, পৃথিবীর আদিম নারী। আমি ঝোঁপের আড়াল থেকে শয়তানের মত...নাকি তাই পাপ?



ঘুঁটে দিতে ক'দিন ধরে মেয়েটা আসছে না। কে জানে কেন। কে জানে কেন ক'দিন ধরে মনটা বড় উচাটন লাগছে। কি একটা ভার মনে ঢুকে আছে। ভার না ভয়? হালদারবাবুকে বলব বলব করেও বলা হল না। একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম—ঘুঁটে দিতে এসে যে মেয়েটা দেয়ালগুলো নষ্ট করে যায়, সে কে?

হালদার মশাই বলেছিলেন--“ও তো সোনা বোষ্টমীর মেয়ে, ওরা সব লুজ ক্যারেকটার"। তারপর আমার চোখের দিকে না তাকিয়েই বললেন, “রেজিস্টিরিটা ভালয় ভাল চুকি যাক, শালীর ফটো সঙ্গে নিয়ি আপনার দাদার সঙ্গে কথা কয়ি আসব। আপনার নিষেধ শুনব না।' এরপর আমার চোখের দিকে তাকালেন। 'পরশু রেজিস্টিরি খেয়াল আছে তো, সকাল সকাল তৈরি হয়ি নেবেন, আর আপনার প্লটটা রাস্তার ধারেই রাখিচি'।

একটা প্লট আমার নিজস্ব। আস্তে ধীরে যখন পারবো, শোধ দেবখনে। 

হালদারবাবু বলে দিয়েছেন। বলেছেন দালাল লাগলেও তো ওকে কিছু দিতে হত। 

হালদারমশাই এরপর বললেন—আজ সক্কালবেলা একটু ঝামেলা মতন হয়ি গেল। এরশাদ এসিছিল, বোয়েচেন, মাপজোক হচ্ছে তো, ব্যাটা, বুজতি পেরেচে জমি বেচে দিচ্ছি, ও ব্যাটা বলে কি...

আমি তক্ষুণি বলে ফেলি—এরশাদটা সুবিধের নয়, বুঝলেন, আমি নিজে দেখেচি, ঐ ঘুঁটে দিতে আসে যে মেয়েটা তার সঙ্গে...

—আঁ, বলেন কি, ডিটেল বলেন দিনি, শুনি, হালদার মশাই চেয়ারটা আমার আরো কাছে টেনে নিয়ে দ্রুত সিগারেট ধরালেন।

আমার কাছে সব শুনলেন হালদারমশাই। সিগারেটে শেষ টান মেরে বললেন--মোক্ষম পয়েন্ট পেয়েছি। যদি কিছু বলতে আসে, বলে দেব ফুল বাগানে নষ্টামি চলছিল, বন্ধ করেছি। সাক্ষী দেবেন।



মানব শরীর সপ্ত ধাতুতে নির্মিত। রস রক্ত মাংস মেদ অস্থি মজ্জা শুক্র। এই সপ্ত ধাতুর মধ্যে শুক্রই সকল ধাতুর সার, সুতরাং সর্বোৎকৃষ্ট। শুক্রই বীর্যবত্তার কারণ স্বরূপ। কায়মনোবাক্যে এই বীর্যকে বিচলিত হইতে না দেওয়া, পরন্তু সংযম ও সাধনা দ্বারা...

মন খারাপ থাকলেই মায়ের বাণী। এখন তাও ইচ্ছে করছে না। হাল্কা হবার জন্য হালদার মশাইকে ঐ সব বলতে গিয়ে উল্টে আরও ভার হয়ে আছে মনটা। কেন এই ভার? কেন বারবার সেই মায়া আলোয় দেখা সেই শরীরটা ভেসে ওঠে, কেন ঐ বুড়াে, এরশাদের কথা মনে হলে দাঁতে দাঁত চাপি, কেন বারবার পাঁচিলের দিকে তাকাই, যেখানে দাগগুলো পড়ে আছে...ঘুঁটের দাগ।

আজ রাত্রেই সঞ্জীবনদা আর মৃত্যুঞ্জয়দা আসবে, থাকবে খাবে। সকাল বেলা রেজিষ্ট্রি আপিস যাওয়া আছে। কিছু রান্না করা দরকার। হালদার মশাইয়ের চাকর এসে খবর দিল--বাবু ডাকছেন। সাক্ষী দিতে হবে।

বড় মুশকিলে পড়া গেল। ঝুট ঝামেলা এক্কেবারে ভাল লাগে না আমার। না যাওয়াটা খারাপ দেখায়। তাছাড়া আমার নামেও একটা দলিল হচ্ছে। বলে ফেললাম পুজোয় বসেছি, সেরেই আসছি।

একটু পরেই বের হলাম। রেডিওতে খবর হচ্ছে। এরশাদ কি এখনো ও বাড়িতে আছে? হালদার বাড়ি যেতে হলে রজনীগন্ধা ক্ষেত্রের পাশ দিয়ে যাওয়া যায়, তবে একটু দেরি হয়। হোক। রজনীগন্ধা বনে ঢুকে যাই। চাঁদ উঠছে একটু দেরিতে। পরিপূর্ণ গোল নয়, একটু ক্ষয়েছে। রজনীগন্ধা গুলোর আশেপাশে সব কচি কচি চারা উঠছে। ওরা জানে না এখানেই ওদের কবর।

সামনে কে যেন বসে আছে । ফ্রকপরা। সেই মেয়েটা? আমি আর একটু সামনে গেলে ও উঠে দাঁড়ায়। আমি ওকে স্থির দেখতে থাকি। ও মাথা নিচু করে।

এবার ও পেছন ফেরে। পা বাড়ায়। আমি এগিয়ে যাই। ওর সামনে দাঁড়াই। ওর হাত ধরি। 'এরশাদের জন্য অপেক্ষা করছিলে তুমি'?

ও কথা বলে না। আমি বলি, 'বুড়ােটার কাছে কি পাও তুমি'?

ও কথা বলে না। নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে ওর বুকের ওঠানামা।

আমি ওর কানের কাছে আমার মুখ নিয়ে যাই। ওর মাথায় রেপসীডের গন্ধ। বলি— আমি সব জানি। দেখেছি। ওর কাছে কি পাও।

ও বলে--'ওর টাকা পোঁতা আছে'। 

কে বলেছে? 

আমি জানি। ও এখানে পড়ে থাকে।

বেহেশতের কুঞ্জে জোনাকি জ্বলে, ঝিঁঝি ডাকে। আমি ওর দু কাঁধ ধরি। কাছে টেনে নিই, বুকের মধ্যে দামামা... জোনাকি, ঝিঁ ঝিঁ, হাওয়া, রজনীগন্ধার ঘ্রাণ, চাঁদের আলো, আমার বুকে প্রবল দামামা...

পায়ের শব্দ শুনি, পায়ের শব্দ এগিয়ে আসে। হবা, হ...বা...হবা রে... আমি ছিটকে যাই, বাঁহাতে চেটোয় মুছি কপালের ঘাম।

এরশাদ এক মুহুর্ত স্থির, তারপর ওর নিজের চুল মুঠি করে ধরে ভীষণ ঝাঁকুনি দিয়ে ভয়ানক আর্তনাদ করে। তারপর রজনীগন্ধা বন তছনছ করে আলোছায়ায় হারিয়ে যায়।


১০

হালদার মশাইকে বললাম পুজোয় দেরি হয়ে গেল একটু।

হালদার বললেন সব ঠিক আছে। এরশাদ ব্যাটা কিছু অস্বীকার যায়নি। ও বলে কিনা এসব বেহেস্তী ব্যাপার, আপনি এসব বুঝবেন না। হালদার স্পষ্ট বলে দিয়েছেন—কাল থেকে পথ দেখ। জমি বেচে দেওয়া হবে।

ঘরে ফিরে ডাইরি নিয়ে বসলাম। পাপ। পাপ করিয়াছি। আর কিছু লিখতে পারছি না । ভয়। 

হৈ-হৈ করে সঞ্জুদা মিতুনদা এসে পড়ল। পাপ’ কেটে দিলাম।


১১

ভোর। কাঁচা রাস্তার গায়ে সাইকেল টায়ারের আলপনা শিশিরে ভিজেছে। সুর্য বন্দনা করি। গতরাত চিল হয়ে সূর্যমন্ত্রে ছোঁ মারে। গতরাত ভুলে যেতে চাই। প্রার্থনা শেষে চিড়েভেজা খেয়ে হালদার বাড়ির দিকে যাই।

আটটার মধ্যে আমরা রেডি। হালদারবাবুর বাড়ির সামনে জটলা। পাটভাঙা ধুতি পাঞ্জাবি পরা হালদারবাবুর কপালে ঘাম।

—কি সব বলছে শুনছেন, এরশাদ নাকি মরে পড়ে আছে।

হালদারবাবুর সঙ্গে আমরাও যাই। রজনীগন্ধা বনের ঠিক মাঝখানে এরশাদের বেহেশতের কুঞ্জি। ওখানে শুয়ে আছে ও। ঠোঁটের কোণায় ফেনা, রক্ত। কালো পিপড়ের সারি। সামনে একটা গর্ত খোঁড়া। কোদালটা পড়ে আছে।

গুপ্তধন ছিল নাকি? ওর টাকা পোঁতা আছে, মেয়েটা বলেছিল। 

এরশাদ শুয়ে। সকালের রোদুর পড়েছে। ঠোঁটের কোণায় ফেনা। 

কাছেই ভেজা মাটির গায়ে কি যেন লেখা। 

আমার এইখানে কবর হইবে। ইতি এরশাদ। 

হালদারমশাই অক্ষরগুলোর উপর দাঁড়ালেন। ওঁর জুতো একটা অক্ষর থেকে অন্য অক্ষরের দিকে গেল। ক ব র এর উপর ফুটে উঠল মোকাসিন জুতোর ভাঁজ ভাঁজ নকশা।

আমায় হাতের ঝাপটে ডাকলেন হালদারবাবু। আমি 'ইতি’র সামনে দাঁড়াই। উনি আমার হাত ধরে টানলেন। আমার পা হেঁচড়ে গেল ‘এ’র উপর দিয়ে ‘র’-এর উপর দিয়ে, তালব্যশ আকারের উপর দিয়ে...

‘দেখুন দিকি'?

এরশাদের সাদা চুলে আর দাড়িতে তবু বাতাস খেলা করে যায়। রজনীগন্ধা বনে তবু বাতাস খেলা করে যায়। রজনীগন্ধা বন। আমার এইখানে কবর হইবে। এরশাদের হাত মুঠো করা। মাটিমাখা হাত।

ব্যাগ থেকে দলিলের গোছাটা বের করলেন হালদারমশাই। বললেন, আপনারা যান, চোখ বুলিয়ে দেখবেন একটু—দোষটোষ আছে কি না। আমি আসছি।

কস্য সম্পূর্ণ নির্দায় ও নির্দোষ অবস্থায় স্থাবর সম্পত্তি সাফ কবলা মিদং কার্য্যঞ্চাগে জিলা উঃ ২৪ পরগনা মৌজা...

দোষের আমি কিই বা বুঝি ?


২টি মন্তব্য: