শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

কাজল সেন'এর ঝুরো গল্প : ছুরি

ছুরিটা ঝন্টুর ডান পকেটেই থাকে। প্রয়োজনে যাতে ঝট করে বের করা যায়। তবে এখনও পর্যন্ত সে প্রয়োজন হয়নি। আর তাই ঝন্টু ঘরে থাকলে একটি ছোট্ট ড্রয়ারের ভেতর, আর বাইরে বেরোলে ঝন্টুর প্যান্টের ডান পকেটে ছুরিটা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েই থাকে। এজন্য ঝন্টুর মনে একটা আক্ষেপও আছে। আসলে কখনও ব্যবহার করার ছুরিটা কতটা কার্যকরী অর্থাৎ প্রয়োজনে কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, তা এখনও পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারেনি ঝন্টু। তবে সবার অজান্তে তার প্যান্টের ডান পকেটে ছুরিটা সন্তর্পণে রেখে খুব আত্মবিশ্বাসী থাকে। রীতিমতো বেপরোয়া কায়দায় মেন রোডের ওপর দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে চলন্ত অটোরিক্সা থামিয়ে আদেশ করে, আমবাগান চলিয়ে! তুরন্ত!

আমবাগান মানে কোনো আমের বাগান নয়, কোনো একসময়ে নিশ্চয়ই তাই ছিল, এখন ঘন জনবসতি। তা ঝন্টুকে মাঝে মধ্যে এই আমবাগানে আসতে হয় সম্রাজ্ঞীর জন্য। আসতেই হয়। তবে সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে দেখা করার কোনো কর্মসূচি তার আদৌ নেই বা থাকে না, বরং তার আসা সম্রাজ্ঞীকে দেখার জন্য। আবার এলেই যে দেখা হয়, তাও নয়। কোনো কোনোদিন হারাধনের পান দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চে বসে পুরোটা দিন পেরিয়ে গেছে, এমনও হয়েছে। এক ঝলকের জন্যও সম্রাজ্ঞীকে দেখতে পায়নি। তবে সুখের দিন হলে, একনাগাড়ে আধাঘন্টা পর্যন্ত তার চোখের কিছুটা দূরে সম্রাজ্ঞীকে ঘোরাফেরা করতে দেখতে পেয়েছে। কখনও সম্রাজ্ঞী দোতলা বাড়ির ছাদে এসে দাঁড়িয়েছে, কখনও বাড়ির সামনের লনে হাঁটাচলা করেছে, আবার কখনও বাড়ির গেটের মুখে ঠায় সময় কাটিয়ে দিয়েছে কোনো বান্ধবীর সঙ্গে আড্ডা মেরে। 

ব্যস এইটুকুই। এইটুকু দেখার জন্যই হারাধনের পান দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চে নির্লজ্জের মতো বসে থাকা। প্রথম প্রথম হারাধন আপত্তি করেছিল। এ আবার কী? একজন অবিবাহিতা মহিলাকে এভাবে একটা উটকো লোক দিনের পর দিন তার সামনে বসে লাইন মারবে, এটা কখনও সহ্য করা যায়? এরকম হ্যাংলামো সে তার ঠাকুরদার জীবনকালেও দেখেনি। 

একদিন তো পাড়ার কয়েকটা চ্যাংড়াছেলে এই লাইন মারার জন্যই ঝন্টুকে বেধড়ক ঠ্যাঙালো। হারাধন অবশ্য বাধা দিতে গেছিল। সেদিন ঝন্টুকে হারাধনই বাঁচিয়েছিল। তার যুক্তি ছিল, শুধুমাত্র লাইন মারার জন্য ঝন্টুকে সাবধান করা যেতে পারে। ঠ্যাঙানি নয়। তবে এর বেশি বাড়াবাড়ি করলে তারও কিছু করার নেই। 

দিন দুয়েক পরে এই কথাটাই হারাধন বোঝাতে গেছিল ঝন্টুকে। কিন্তু তার উত্তরে যা শুনল, তাতে রীতিমতো হকচকিয়ে গেছিল হারাধন। ঝন্টুর সঙ্গে নাকি সম্রাজ্ঞীর বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল। দুই বাড়ির দেখাদেখিও হয়েছিল। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক সম্বন্ধটা পাকা হয়নি। আর তাই বিয়েটাও হয়নি। অথচ ঝন্টু ততদিনে সম্রাজ্ঞীর প্রেমে পড়ে গেছে। হাবুডুবু খাচ্ছে। তার পক্ষে তো আর ক্রিজ ছেড়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়! 

কিন্তু আত্মরক্ষা তো করা প্রয়োজন! সেদিন সে যে গণপিটুনি খেয়েছিল, নিরস্ত্র ছিল বলেই না আত্মরক্ষা করতে পারেনি! সুতরাং এবার সশস্ত্র হওয়া জরুরি। নিতান্তই লুকিয়ে চুরিয়ে অনেক দর কষাকষি করে ছুরিটা তাকে কিনতেই হয়েছিল।

1 টি মন্তব্য:

  1. পড়লাম । প্রহারই প্রেমিকের একমাত্র প্রাপ্য । ওই চুরিও তো প্রেম ছাড়া কিছু বোঝে না ।

    উত্তরমুছুন