শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯

বশীর আল্‌হেলাল'এর গল্প : শহীদ আবদুর রশীদের কবর

“মুসাফির, মোছরে আঁখি-জল 
ফিরে চল্‌ আপনারে নিয়া। 
আপনি ফুটেছিল ফুল 
গিয়াছে আপনি ঝরিয়া।” 
--কাজী নজরুল ইসলাম 


খুব তোড়জোড় চলছে। তোড়জোড় তো সেই কবে থেকে চলছে। রাজধানী যাওয়া হবে, তার তোড়জোড়। প্রথম ঠিক হয়েছিল ২৬শে মার্চ উপলক্ষে যাবে, কিন্তু যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তারপর ঠিক হয় ১৬ই ডিসেম্বর যাবে। কিন্তু না, যাবে বললেই কি যাওয়া হয়। এখন ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে যাওয়ার তোড়জোড় চলছে। তা, কত মাস এইভাবে গেল, ভালোই হল। ছেলেটা খানিক ডাঁটালো হল। ওই রকম কচি বাচ্চাকে নিয়ে সফর করতে হয়তো কত ঝামেলা হোত। এখনই কি আর হবে না। ১৬ই ডিসেম্বর না যাওয়ার কারণ ছিল তখন ভরা শীত। কচি ছেলেটাকে আর বুড়ি মানুষকে নিয়ে কোথায় ঘোরে, কোথায় থাকে তার ঠিক নেই।
একটা দিন যেমন-তেমন করে কাটিয়ে দেওয়া। গাছতলায় কি সোহ্‌রাওয়ার্দি উদ্যানে, কিংবা, শুনেছে, বাসস্টপে সব রোদ-বৃষ্টিতে মাথা গোঁজার ছাউনি রয়েছে, যেখানে হোক, মাঝখানের একটা রাত কাটিয়ে দিয়ে চলে আসবে। সকাল হলে আর একবার কবর জিয়ারত করে প্রাণ ভরে ফাতেহা পড়ে স্টেশনে এসে ট্রেন ধরবে। তা, ওই রকম শীতে কী রকম অসুবিধা হোত? ছেলেটাকে টানত, না বিছানা কম্বল টানত? 

এখন এই ফেব্রুয়ারির শেষে আবহাওয়া বড় সুন্দর হয়ে আছে। শীত আছে, কিন্তু মিষ্টি শীত। সাবেরার হৃদয় বড় উতলা হয়ে উঠেছে। কী এক উত্তেজনা তার বুকে ধক ধক করে বাজে। যেমন বেজেছিল বিয়ের বাসরে, স্বামী-সম্মিলনের আগে। মৃদু পায়ে বসন্ত নামছে পথিবীতে। বেলা চড়লে রোদে ওই বসন্ত প্রখর গন্ধ ছড়ায়। না, আর দেরি সয় না। সাবেরা এবার পাগলিনীর মতো ছুটে চলেছে রাজধানীতে। সেখানে এই নব বসন্তে স্বামী তার জন্যে অপেক্ষা করে আছে। সকাল দুপুর সন্ধ্যা ন্যাড়া বাঁশঝাড়ের মাথা ছুঁয়ে নব-ফাল্গুনের হাওয়া এসে গায়ে লাগে। তখন সাবেরা শাড়ির আঁচলে চোখ মোছে।। 

চারজনই ওরা যাচ্ছে। সে সাবেরা, কোলের বাচ্চা পলাশ, দেওর মুর্শেদ আর শাশুড়ি। এ যেন শুধু সেই অভিমানী স্বামীর জন্যে যাওয়া নয়, সেই বীরযোদ্ধা ছেলের জন্যে শুধু যাওয়া নয়, কিংবা বিরাট সেই গৌরবময় পুরুষ ভ্রাতার জন্য কেবল যাওয়া নয়, এই অজ পল্লীতে সেই লোকটার কীর্তির মহিমা যতই হোক বোঝা যায়নি, জানা হয়নি, আমরা কুয়োর  ব্যাং কেবল হাউহাউ করে কেঁদেছি, আমি মুর্শেদ গাঁয়ের স্কুলে বিনা-মাইনের ছাত্র হওয়ার সুযোগ পেয়েছি, আমি সাবেরা সরকারের কাছে হাত পাতলে খয়রাতের টাকাগুলি পেয়েছি, শাশুড়ি বুক চাপড়ে বলেছেন, বৌমা ওই টাকা তুমি নিয়ো না, আমার রশীদ তো ওই টাকার জন্যে জান দেয়নি, সাবেরা তখন ঘোমটার নিচে বুক ফাটিয়ে পিঠ কাঁপিয়ে হা হা করে কেঁদেছে। হ্যাঁ, সেই লোকটার কীর্তির মহিমা বোঝার জন্যেই ওরা রাজধানীতে চলেছে। বিরাট জায়গা সেই রাজধানী ঢাকা। সারা বিশ্বের তীর্থ। হাজার শহীদ সেখানে শুয়ে রয়েছে। উনসত্তরের শহীদ, সত্তরের শহীদ, একাত্তরের শহীদ, বাহাত্তরের শহীদ। পলাশের বাপ রশীদ সেই শহীদদেরই একজন। ওখানে মহানগরীর বুকে শুয়ে রয়েছে। রাজধানীর বুকে লোকে যত্ন করে কবর দিয়েছে। তাতে মর্মর-ফলকে সুন্দর করে লিখে দিয়েছে শহীদ আবদুর রশীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা। সেখানে লোকে ফুল দেয়, বাতি দেয়। শহীদ রশীদের মা বলেন, কেবল আমরাই দেখলাম না। 

এবার তাই দেখতে চলেছেন সবাই। 

যুদ্ধ শেষ হলে খবরের কাগজে শহীদ রশীদের কাহিনী ছাপা হয়েছিল। গাঁয়ের ছেলে গোলাম রব্বানি আর নেয়ামত ঢাকা থেকে এসেছিল। ওরা তো নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেনি। কেবল বলেছে, হ্যাঁ, শহীদদের কত কবর চারদিকে। গোরস্থানে তো রয়েছেই। রয়েছে রাস্তার পাশে, ফুটপাতে, ট্রাফিক-দ্বীপে। সব বাঁধানো কবর। নাম লেখা রয়েছে। 

শহীদ রশীদের মা যখন পরে ঢাকায় ছেলের কবর জিয়ারত করতে যাবেন মনস্থ করলেন তখন একদিন নেয়ামতকে ডাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করেন, হ্যাঁ বাবা, তা, আমার ছেলের কবর খুঁজে পাওয়া যাবে তো। অত বড় শহর। তুমি নিজেও তো দেখনি? 

নেয়ামত বলেছে, দাদি-মা, খবরের কাগজের অফিসে গিয়ে খোঁজ করলে ওরা ঠিক বলে দিতে পারবে। 

সেই ভরসাতেই ওঁরা যাচ্ছেন। একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহর সন্তপ্ত জনতার মেলা হয়ে ওঠে। কত লোকের সঙ্গে দেখা হবে। কত লোক পাওয়া যাবে। শহীদ রশীদের কবর কোথায় এই খবর দিতে পারে এমন একটা লোকও কি আর পাওয়া যাবে না? 

মা বলেন, বৌমা রশীদের কবরে সন্ধ্যা হলে চেরাগ দিতে হবে। তার কী ব্যবস্থা করেছ? মুর্শেদকে একটা টাকা দিয়ে হাটে পাঠাও, কটা মাটির চেরাগ নিয়ে আসুক। 

সাবেরা বলে, তাহলে তো আবার সরষের তেল নিয়ে যেতে হয় মা, সলতে পাকাতে হয়। আমি ভাবছি মোমবাতি দেব। একটু বেশি খরচ পড়বে। তা পড়ুক, মা। আজকাল মোমবাতিই দেয়। 

মা বলেন, বেশ। তাহলে মোমবাতি আনিয়ে নাও। 

মুর্শেদ বিরক্ত হয়ে বলে, ঢাকা শহরে তোমার মোমবাতির অভাব নাই। 

সাবেরা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে লাগে। মা ঘোলাটে চোখ দুটি আকাশের দিকে তুলে কী খুঁজতে লাগেন। তাঁর দুই কোঁচকানো গাল বেয়েও দুটি ধারা বয়ে যাচ্ছে। সাবেরা মনে মনে বলছে, আমার এই দেহমোমবাতি তোমার জন্যে পুড়েই চলেছে, স্বামী। মা মনে মনে বলছেন, তুই সেবার তোর তেরো বছর বয়েসে রাগ করে বাড়ি থেকে তোর খালার বাড়ি পালিয়ে গিয়েছিলি। আমি সেবার তোর মান ভাঙাতে নারকেলের নাড়ু বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। এবার নিয়ে যাচ্ছি মোমবাতি। তোর মান ভাঙবে রে খোকা? 

পলাশ ছুটতে ছুটতে আসছে টলতে টলতে। ন্যাংটা, গায়ে গেঞ্জি। ধুলো মেখেছে। এসে দাঁড়িয়ে দুজনকে দেখে। তারপরে মা’র পিঠে দুমদুম করে কিল বসায়, দাদির পিঠে বসায় দুটো কিল। আগে বলত, কাঁদছ কেন? এখন বলে না। এসেই পিঠে কিংবা গালে কিল-চড় মারে। বুড়ি দাদিকে ক্ষমা করে না। কারণ ওই কান্না তার পছন্দ নয়। কাঁদতে দেখলেই রাগ। সে তখন তার চাচার তৈরি বাঁশের রাইফেলটি তুলে অমনি তার বাবাকে যারা হত্যা করেছে তাদের তাক্‌ করে ক্যাট্‌-ক্যাট্‌ গুলি ছুঁড়তে লেগে যায়। 

এই হচ্ছে তোড়জোড়। তোড়জোড় চলছে। ঢাকায় গিয়ে দুটো রাত একটা দিন যেখানে সেখানে কাটিয়ে দেবে। না, হোটেলে ওঠার সাধ্য তাদের নেই। ছেলেটার চাকরিই বলতে গেলে সম্বল ছিল। বিঘেচারেক ধানজমি রয়েছে, সরকার মাসে একশো টাকা শহীদ-ভাতা দেন। একশো টাকা এখন একশো পয়সার সমান। ওই টাকা সাবেরা অন্য কাজে খরচ করে না। বলে, এ পলাশের টাকা, এতে কেউ হাত দেবে না। পলাশকে মানুষ করব এই টাকা দিয়ে। পলাশ আমার অনেক বড় হবে, অনেক বড় হবে। 

একগাদা রুটি করে সঙ্গে নেবে, বাস্। কিছু আলু ভেজে নেবে। কেবল পলাশকে এটাওটা কিনে খাওয়াবে। বুড়ি মানুষটার কটা মাত্র দাঁত। শুকনো রুটি কি আর চিবোতে পারবেন? তিনি বলেন, বাপু, আমার জন্যে চিন্তা কোরো না। ওখানে যতক্ষণ থাকব, আমার মুখে কি আর কিছু রুচবে? 

এই হচ্ছে তোড়জোড়। তোড়জোড় চলছে। 

শেষে ২০শে ফেব্রুয়ারি ওরা রওনা হয়। মুর্শেদ এক সহপাঠীর এক প্লাসটিকের ব্যাগ ধার করে এনেছিল। তাতে দু-চারখানা গামছাকাপড়, একটা ছোট বালিশ, ঘটি, টিনের গেলাস আর খাবারের পোটলা ভরে স্টেশনে গিয়ে ওঠে। মা একখানা ঘি-রঙের মোটা চাদর আপাদমস্তক গায়ে জড়িয়ে সম্ভ্রান্ত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। সাবেরা পরেছে কালো চিকন-পাড় সাদা শাড়ি। সাবেরাকে ওর বিয়েতে স্বামীর এক বন্ধু লাল টুকটুকে এক হ্যন্ড ব্যাগ উপহার দিয়েছিল। বিয়ের মাস ছয় পরে, পলাশ তখন পেটে, এই বন্ধুর বাড়িই ওরা দু'জন ট্রেনে চড়ে বেড়াতে গিয়েছিল, এই তো দুটো স্টেশন পর, মনে পড়ে, টুকটুকে হ্যান্ডব্যাগটি হাতে ঝুলিয়ে। ব্যাগটা এখনো আছে। আজ হাতে সেই ব্যাগ তো দূরের কথা, একগাছা করে চুড়িও নেই। প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে সাবেরা পলাশকে বুকে চেপে ধরে। মনে মনে বলে, আমার তুই রয়েছিস পলাশ। 

পলাশের খুব আনন্দ। ট্রেনে চড়বে। সে কোলে থাকতে চায় না। নামিয়ে দিলে ছুটোছুটি করে। চারদিকে ছেলেধরার উপদ্রব হয়েছে খুব। কখন হঠাৎ ট্রেন এসে পড়ে। 

অন্য সবার আনন্দ নেই কিন্তু উত্তেজনা আছে। ঢাকা গিয়ে একদিন থেকে চলে আসা, এই ব্যাপারটা মুর্শেদের ভালো লাগছে না। এখানে কত কী দেখার থাকবে। কত সভা, অনুষ্ঠান, পথ-নাটক, কবিতার আসর। একদিনে তার কতটুকু দেখা শোনা যাবে! আর এই একটা দিন তো এই মেয়েমানুষ দুটিকে নিয়ে ঘুরতেই কেটে যাবে। 

মুর্শেদ আজকাল কবিতা লিখছে। হ্যাঁ, সে কবি হবে। আসলে বড়ভাইয়ের শাহাদতই তাকে কবি করেছে। দুটি কবিতা নিয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি সকালবেলা বাংলা একাডেমীতে কবিতাপাঠের আসর হয়। বলা যায় না, যদি ওখানে কবিতা পড়ার সুযোগ জুটেই যায়। 

মধ্যরাতের আগে ওরা কমলাপুর স্টেশনে নামে। স্টেশনের বিরাট উঁচু ঢেউ-খেলানো ছাদ। দীর্ঘ প্লাটফর্ম সাদা আলোয় ঝকঝক করছে। সাবেরা মাথার ওপরে ও চারদিকে তাকিয়ে কেমন ভয় পেয়ে যায়। মা তার বিহ্বল দৃষ্টি কোনো দিকে না পাঠিয়ে পায়ের কাছে ফেলে রাখেন, ঘোমটা আরো টানেন, ছেলের বাহু শক্ত করে ধরেন। যেদিকে যান সেদিকেই যেন মানুষজনের গমগমানির আগুন গায়ে ছ্যাঁকা দিচ্ছে। পলাশ ঘুমোচ্ছে, তাকে কাঁধে নিয়ে মুর্শেদ ওঁদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে। 

কিন্তু মুর্শেদ কী পথ দেখাবে? সে নিজেই পথ চেনে না। তারও ভয় ধরে গেছে। এই প্রথম তার ঢাকায় আসা। যেন নতুন কিশোর মাঝি ছোট নাওটিকে নিয়ে হঠাৎ ছোট খাল থেকে ভাদ্রমাসের উথালপাথাল গাঙে পড়ে থ বনে গেছে। গেটে টিকিটগুলি দিয়ে এরা খোলা চাতালে একটা থাম ঘেঁষে দাঁড়ায়। এখানে-ওখানে লোকে কাঁথামুড়ি দিয়ে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। একদম খালি গায়েও নেড়ি কুত্তার মতো গুটিসুটি মেরে ঘুমোচ্ছ লোক। বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। আহা, লোকগুলি ঠাণ্ডায় বড় কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু এখানে এই ঠাণ্ডা পাকা মেঝেয় ওরা এভাবে শুয়ে রয়েছে কেন? ওদের ঘরবাড়ি নাই। 

দেখতে দেখতে ট্রেনের লোকজন, কোলাহল, মোটরগাড়ি, রিক্সা, অটোরিক্সার আওয়াজগুলি ব্যস্তত্রস্ত ঝাপসা কোনদিকে চলে যায়। প্রবল বায়ু সরে যাওয়ায় এখন নদীর ঢেউ যেন মাথা নামিয়েছে। কেবল কুলুকুলু ধ্বনি কিছু আছে। ছোট-ছোট ছোঁড়ারা পান সিগারেট ফিরি করে বেড়াচ্ছে। মা বলেন, মুর্শেদ, ছেলেটাকে ঘাড়ে করে কতক্ষণ দাড়িয়ে থাকবি? 

তখন ব্যাগ থেকে কাপড় বালিশ বের করে শক্ত ঠাণ্ডা মেঝেয় বিছানা পাতা হয়। তাতে পলাশকে শোয়ানো হয়। সাবেরা বলে, মা, আপনাকে শীতে ধরেছে। আপনি পলাশের পাশে বসেন। 

মা বসেন। তার সত্যি ঠাণ্ডা লেগেছে। এই ফেব্রুয়ারির শেষে যে এমন ঠাণ্ডা পড়তে পারে ভাবেননি। রাজধানীর ঠাণ্ডা এই প্রথম দেখছেন। সাদা কাচের মতো ঝকঝকে আলো আর সাদা কাচের মতোই ঝকঝকে ঠাণ্ডা। এখনই বুঝি মাটিতে ফেলে কেটে কুটে খান খান করে দেবে। আহা, আমার বাছা এই ঢাকার মাটিতে কোথায় এই ঠাণ্ডায় শুয়ে রয়েছে। 

কিসের এত গন্ধ নাকে লাগে, মুর্শেদ? মা বলেন। আমার গা বমি-বমি করে। 

মুর্শেদ বলে, চারদিকে সব ফকির-গরিবের ভিড় দেখছ না? হেগে-মুতে সব কী করে রেখেছে, আখ্‌-থু! 

ওপাশে গিয়ে সে থুতু ফেলে আসে। মা বলেন—মুর্শেদ, আমি ওজু করব। দেখ বাবা, কোথায় পানি পাওয়া যায়। 

এখন তুমি নামাজ পড়তে বসবে? এই তোমার নামাজ পড়ার সময়? কত হাঁটতে হবে, কত জায়গায় যেতে হবে। এখন একটু ঘুমিয়ে নাও, মা। 

মা বলেন, এখানে আমার ঘুম আসবে না, বাবা। 

মুর্শেদ ঘটি হাতে পানির খোঁজে যায়। পানি নিয়ে ফিরে আসে। বলে, ওদিকে পায়খানা-টায়খানা আছে, দরকার হলে বোলো, ভাবী। তবে সাংঘাতিক নোংরা। 

মা ওজু সেরে গামছায় মুখ মোছেন। বলেন, পশ্চিম কোনটা? মুর্শেদ চারদিকে এক চর ঘুরে নেয়। এই যে এই দিকে হবে বলে মনে হয়। 

মা নাকের ওপর থেকে দুটো মশা তাড়ান। তারপর সন্দেহ তাড়াবার চেষ্টা করে গামছা পাতেন। তাতে পা মুড়ে বসেন। পরনের থানের খুঁট থেকে তসবিহ খুলে নেন। তারপর যাবতীয় দুর্গন্ধ, নোংরা যত মানুষের পায়ের আর নাকের শব্দ, দূরে কোন্ ট্রেন-ইনজিন আর মালগাড়ির শানটিঙের আওয়াজ অগ্রাহ্য করে নামাজ আর দোয়া-দরুদে মগ্ন হয়ে পড়েন। সাবেরার ঘুমে চোখ ভেঙে পড়ছিল। গুটিসুটি ছেলের পাশে ঘুমিয়ে পড়ে। মুর্শেদ কোনদিকে কেমন সব পথঘাট তাই দেখে-শুনে রাখার জন্য স্টেশনের বাইরে পা বাড়ায় সাবধানে। 

তারপর, একসময়ে, তখন রাত বোধ হয় শেষ হয়ে এসেছিল, ঠাণ্ডা বেড়েছে, ওদিকের প্লাটফর্মে একটা একলা-ইনজিন এসে চিৎকার জুড়ে দিয়েছিল, তাতে সাবেরার ঘুম ভেঙে যায়, কিন্তু পলাশ ঘুমোচ্ছে, তিনজনে জবুথবু বসে রয়েছে, তখন হঠাৎ দূরে কোথায় যেন শেষ নিশীথের হাওয়ার মতনই আওয়াজে সুরেলা কী শোনা যায়। মুহূর্তে এরা উচ্চকিত হয়ে ওঠে। এ যে সেই গান। কোনদিকে? মা বলেন—মুর্শেদ, ভোর হয়েছে নাকি? এখানে এত আলো, কিছুই বোঝা যায় না, ওঠ্‌, চল্‌। 

বলতে বলতে তিনি তাঁর বাঁকা পিঠ তুলে দাঁড়ান। সাবেরা ছেলেকে ঘাড়ে তুলে নেয়। মুর্শেদ ব্যাগে সব গুটিয়ে নিয়ে ঘাড়ে ঝোলায়। মায়ের হাত ধরে। মা বলেন, আমার যে ফজরের নামাজ হল না, মুর্শেদ। 

মুর্শেদ সেকথার জবাব না দিয়ে বলে, মা প্রভাতফেরী বেরিয়েছে। 

সেই পরিচিত গান তখন আরো দূরে সরে গেছেঃ “আমার ভাইয়ের রঙে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি? ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রুরাঙা এ ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি"।মুর্শেদের হাতে সেই অশ্রুর গরম ফোঁটা ঝরে পড়ে। মা কাঁদছেন। ওরা স্টেশন থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ায়। এদিক ওদিক তাকায়, কিন্তু প্রভাতফেরীটাকে কোথাও পাওয়া যায় না, তার গানও শোনা যায় না। মা চোখে বেশিদূর দেখতে পান না, তবু তিনি চোখ তুলে কপালের ওপর হাত রেখে দেখার চেষ্টা করেন। আকাশে আলো ফুটেছে। বড় সুন্দর হয়েছে পুব-আকাশের রূপ। যেন হাজার পায়রা পাখা মেলেছে ওখানে। 

ওরা এগিয়ে যায়। এই রাস্তাটা আর এক রাস্তায় গিয়ে পড়েছে। সেখানে গিয়ে দাঁড়াতে দেখা যায় বাঁয়ে কুয়াশামাখা অন্ধকার থেকে এক মিছিল বেরিয়ে আসছে। কণ্ঠে সেই গান, মৃদু সুললিত, ধীর তার লয়। মিছিলের পায়ের দিকে তাকিয়ে মুর্শেদ বলে ওঠে—ভাবী, মা, জুতো খোলো।। 

ওরা তাড়াতাড়ি পায়ের স্যাণ্ডেল খুলে ব্যাগে পুরে মিছিলে সামিল হয়ে যায়। কিন্তু মিছিল বড় দ্রুত। যেন সেই প্রত্যুষের হাওয়া। ধরে রাখা মুশকিল। মা পিছিয়ে পড়ছেন। মুর্শেদ বিরক্ত হয়ে বলে, মা, অত আস্তে চললে চলবে কেন? 

মা অসম্ভব চেষ্টায় জোরে পা ফেলার চেষ্টা করে বলেন, আমি যে পারি না রে। 

মিছিল হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। মা একজনকে আঁকড়ে ধরে বলেন—বাবা তুমি শহীদ আবদুর রশীদের কবর কোথায় জান? 

ছেলেটা আকাশ-পাতাল ভেবে বলে, শহীদ আবদুর রশীদ ? কিসের শহীদ? 

মুক্তিযুদ্ধের শহীদ। মুর্শেদ বলে। 

ছেলেটা বলে, নাম শুনিনি তো। 

বলে সে মিছিলের সঙ্গে এগিয়ে যায়। এরা পেছনে পড়ে থাকে। 

তখন দেখা যায় আর এক প্রভাত ফেরী আসছে। তার সামনে দুই ফুটফুটে মেয়ের হাতে বিরাট ফুলের মালা। ওরা এই মিছিলে সামিল হয়। মিছিল এত দ্রুত চলছে যে, কারো সঙ্গে কথা বলাই দায়। মা খপ করে একজনের হাত ধরেন। বাবা, তুমি শহীদ আবদুর রশীদের কবর কোথায় জান? 

ছেলেটা তো অবাক। ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। জিজ্ঞেস করে, কেন? 

মা বলেন, আমি তার মা। এই যে তার ছেলে। 

পলাশ তখন মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ফ্যালফ্যাল করে ঢাকা দেখছে। ছেলেটা বলে, আমি বলতে পারব না। 

বলে জোরে হাঁটা শুরু করে। কারণ তার মিছিল এগিয়ে গেছে। 

রোদও উঠে গেছে। বড় মিষ্টি রোদ রাস্তায় এসে পড়েছে। কুয়াশাগুলি ছিঁড়ে-ছিঁড়ে যাচ্ছে। নারী-পুরুষ ছেলেমেয়ে কিশোর-কিশোরী ফুল-হাতে চলেছে। ছোট ছোট মিছিল চলছে। মায়ের ঠাণ্ডা আড়ষ্ট শরীরের বাঁধনগুলি রোদের তাপে খুলে যেতে থাকে। তিনি তোবড়ানো গাল দুটি তুলে যাকে পান তাকেই জিজ্ঞেস করেন—বাবা, শহীদ আবদুর রশীদের কবর কোথায় বলতে পার? 

কেউ বলতে পারে না। 

ট্রাকে চড়ে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতে গাইতে একদল চলে যায়। মুর্শেদ ভাবে, ওই ট্রাকে যদি মাকে তুলে দেওয়া যেত। উনি যে হাঁটতে পারছেন না, আরো পারবেন না। একজনকে জিজ্ঞেস করে, শহীদ মিনার কদ্দুর এখান থেকে? 

বেশিদূর না, এক মাইল হবে। 

বেশিদূর না, এক মাইল হবে। বলে কী ? মা তো অত পথ হাঁটতে পারবেন না। পারলেও, যেভাবে হাঁটছেন, কঘণ্টা যে লেগে যাবে। সাবেরা বলে—মুর্শেদ, রিকসা কর। 

কেন, রিকসা কেন? মা বলেন। আমরা কি দাওয়াত খেতে বেরিয়েছি? দেখছ না, সবাই ফুল-হাতে হাঁটছে। আমাদের হাতে একগোছা ফুলও নাই। শহীদ মিনারে কী দেব? 

মুর্শেদ বলে মা, তুমি তো হাঁটতে পারছ না। শহীদ মিনারে যেতে কত সময় লেগে যাবে ভেবে দেখ। সেখান থেকে আবার ভাইয়ার কবর খুঁজতে বেরোতে হবে। শহীদ মিনারে দেখবে কত লোক। ওখানে ঠিক খোঁজ পাওয়া যাবে। 

তাহলে কর্‌ রিকসা কর্‌। 

দুই রিকসা লাগে। একটাতে মা আর সাবেরা। অন্যটাতে পলাশকে নিয়ে মুর্শেদ ওঠে। তাতে পলাশের খুব আনন্দ হয়। সে হাততালি দেয়। মায়ের বুকও কেমন গর্বে ভরে উঠেছে, যেন অশ্রুমাখা আকাশের মতো গর্বে। হাতে ফুল নিয়ে চলেছে পুরুষ-নারী শিশু-কিশোরী। চলেছে শহীদ মিনারে। শহীদদের কবরে ওরা ফুলের পাপড়ি আর চোখের পানি ফেলতে চলেছে। সেইসব শহীদের একজন তার ছেলে। তিনি চলেছেন শহীদ-জননী। 

কিন্তু রিকশা নিলেই বা কী হবে! পুলিস ওই পর্যন্ত রিকশা যেতে দেয় না। তাই কি দেয়? যাচ্ছ শহীদ মিনারে। হেঁটে যেতে হবে না মাথা নত করে? কত লোক যাচ্ছে, কত লোক যাচ্ছে! দেখ কারো পায়ে জুতো নেই। মা দেখেন, যেন হাজার হাজার সকালবেলার পদ্মফুল চলেছে শুচিস্নাত শহীদ মিনারের পথে। 

মা তো স্তম্ভিত হয়ে যান শহীদ মিনারে পৌঁছে। এত লোক? লোক যে গিজগিজ করছে। গান হচ্ছে, স্লোগান হচ্ছে। হাতে হাতে ফুল। মেয়েদের খোঁপায় খোঁপায় ফুল, যার খোঁপা আছে। যার এলোচুল তিনি যেখানে পেরেছেন গুঁজেছেন ফুল। ছেলের বাহু আঁকড়ে ধরে মা তাঁর বাঁকা পিঠ যতদূর সম্ভব সোজা করে শহীদ মিনারের দিকে তাকান। শহীদ মিনারের উঁচু চুড়ো মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। মিনারের চাতালে লোক গিজগিজ করছে। ওরা ওখানে কী করছে? ফুল দিচ্ছে? আমার ফুল নাই। কিন্তু পুত্র ছিল, আমি তা-ই দিয়েছি, আমার অশ্রু আছে, তা-ই দেব। 

কিন্তু সিঁড়িগুলি ডিঙিয়ে ওখানে যে কেমন করে যাওয়া যাবে সেই পন্থা বের করতেই বহু সময় চলে যায়। যেদিক দিয়েই চেষ্টা করে, যাওয়া যায় না। মানুষের প্রাচীর পথ আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শেষে জানা যায়, লাইন রয়েছে, লাইনে দাঁড়াতে হবে। অনেক কষ্টে, অনেক হেঁটে লাইনের লেজুড় খুঁজে পাওয়া যায়। সে আসলে ক্রুদ্ধ যেন অজগরের লেজ, মাঝে মাঝেই ঝাপটা মারছে। মা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকেন সাধ্য কী। মুর্শেদ কয়েকজনকে অনুরোধ করে, ইনি এক শহীদের মা। দাঁড়াতে কষ্ট হচ্ছে। এনাকে একটু আগে যেতে দিন। 

এক তরুণ জিজ্ঞেস করে, শহীদের নাম কী? মুর্শেদ বলে, আবদুর রশীদ। আবদুর রশীদ। নাম তো শুনিনি? এই তোরা কেউ শুনেছিস? 

কিন্তু অন্য কে বলে, অনেক ভেজাল শহীদ বেরিয়েছে বাজারে। 

এত হুজ্জত দেখে সাবেরার কোলে পলাশ কেঁদে ওঠে। বলে-- চল মা বাড়ি যাই, ট্রেনে চড়ে বাড়ি যাই। 

অতএব শহীদ মিনাবে মায়ের অশ্রুদেয়া আর হয় না, অশ্রু তিনি যা দেন রাজপথে দেন, মানুষের পায়ের তলায় যা নিমেষে ধূলো হয়ে যায়। 

অনেককে জিজ্ঞেস করা হয় শহীদ আবদুর রশীদের কবর কোথায় কারো জানা আছে কিনা। নতুন আজিমপুর গোরস্থানে মুক্তিযুদ্ধের অনেক শহীদের কবর আছে জানা যায়। আজ শোকার্থী পদচারীদের দিন। তাই ওখানে যেতে রিকসা পাওয়া যায় না। মুর্শেদ একবার ভেবেছিল মাকে ঘাড়ে তুলে নিয়ে যায়। কিন্তু যে কাজ গ্রামে চলে তা এই চৌকস শহরে চলে না। লোকে হাসাবে। হয়তো ইশপের গল্পের সেই বোকা চাষাকে নিয়ে যা হয়েছিল তাই হয়ে যাবে। এর মধ্যে এই রাজধানী সম্পর্কে মুর্শেদের যেটুকু ধারণা হয়েছে, এখানকার মানুষের মেজাজে নুন-ঝাল টক মিষ্টি নাই। এরা কাঁদে যদি, শব্দ হয় না, হাসে যদি, ঠোঁট ফাঁক করে না। 

তবু মা গোরস্তানে পৌঁছোতে পারেন। হায় আল্লা! এমন আলিশান গোরস্থান! আল্লা তার পৃথিবীতে কি স্বর্গ রচনা করে রেখে দিয়েছেন নাকি? মারবেল, রঙিন ইট, মোজাইকে আর গ্রানাইটে তাদের মরণ-পরের সুরম্য কুঠরিগুলি থরে থরে সাজানো রয়েছে। 

তার বুক ভরে যায়। গেটে ঢুকতে ডাইনেই শহীদদের একসার কবর। জিয়ারতের জন্য বেশ কিছু লোক গেছে। একটি কামিনীগাছের নিচে কটি কমবয়েসি ছেলে আর মেয়ে ভালো পোশাক-আশাক পরে দাঁড়িয়ে খুব গল্প লাগিয়েছে। এদের কেউ একজন এখানে এই শহীদদের সঙ্গে শুয়ে রয়েছে। সেই একজন নাকি ডাসা পেয়ারা আর মুরগির মাথা খেতে ভালোবাসত। ভারি সরস ওদের আলোচনা। এদের পোশাকে একটা গন্ধ আছে, কিন্তু সে গন্ধ গোরস্তানের গন্ধ নয়। মা মুর্শেদকে জিজ্ঞেস করেন -হ্যাঁ রে, এরা কি কিরিস্টান ? 

মুর্শেদ গলা নামিয়ে বলে, চুপ কর, মা চুপ কর, কী যে বল তার ঠিক নাই। 

শহীদদের কয়েকটি কবর বাঁধানো, বেশির ভাগ এখনো বাঁধানো হয়নি। কিন্তু প্রত্যেকটিতে নাম লটকানো আছে। মা পায়ে পায়ে এগিয়ে যান। কবরের গায়ে স্নেহে আদরে হাত বুলিয়ে দেন, অশ্রু ফেলেন। মুর্শেদ শহীদের নাম পড়ে। এক এক করে সব কবর জিয়ারত করা হয়। কিন্তু রশীদের নাম নেই। মা কাঁদছেন, দোয়া-দরুদ পড়ছেন। দু'একজকে জিজ্ঞেস করেন-- বাবা, তোমরা কি শহীদ আবদুর রশীদের কবর কোথায় জান? 

কেউ কিছু বলতে পারে না। 

পলাশ কখনো মায়ের কোলে কখনো চাচার কোলে। সে মাঝে মাঝে কাঁদছে। তার কিছুই ভালো লাগছে না। বলছে চল বাড়ি যাই, ট্রেনে চড়ে বাড়ি যাই। 

বাইরে এসে তাকে একটি লজেন্স কিনে দেওয়া হয়। এবার রিকসা পাওয়া যায়। রিকসায় চড়ে ওরা এক জায়গায় নেমে বাংলা একাডেমীর দিকে যায়। সেখানে লোক থই থই করছে। লোক যাচ্ছে, আসছে। বেশির ভাগ খালি-পা বলে শব্দ আছে কম। 'একুশর সঙ্কলন' ফেরি করে বেড়াচ্ছে ছেলেরা, মেয়েরা। ভেতরে গনগন করে মাইক বাজছে। স্বরচিত কবিতা পাঠ চলছে। মুর্শেদ বুক-পকেটে হাত দিয়ে দেখে হ্যাঁ, কবিতা দুটি আছে। সে চঞ্চল হয়ে ওঠে। কিন্তু মাকে নিয়ে হয়েছে ফ্যাসাদ। ভাইয়ের কবর যে খুঁজে পাওয়া যাবে না সে ব্যাপারে এতক্ষণে সে নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু মাকে সেকথা বলা যায় না। মুর্শেদ এখানে গেটে দাঁড়িয়ে ভেতরের সুসজ্জিত প্যান্ডেল দেখছে, মানুষের ঢল দেখছে, কালো মঞ্চে মেদুর আলোকে কবিদের সব বসে থাকতে দেখছে, কবিতা পাঠ দেখছে, ওদিকে যত লোক ধরে ধরে মা জিজ্ঞেস করে ফিরছেন--বাবা, তোমরা কি শহীদ আবদুর রশীদের কবর কোথায় জান? মাকে আর ভাবীকে দুটি চেয়ারে এখন এখানে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিতে পারলে ওঁদের বিশ্রামও হোত, একটা কবিতা পড়ার সুযোগ পাওয়া যায় কিনা তার ধান্দায় ওদিকে একটু ঘোরাও যেত। 

কিন্তু দেখতে দেখতে ওদিকে ফুটপাতে মা-দের ঘিরে বিছু লোক জমে গেছে। মুর্শেদ গিয়ে দেখে মা প্রায় বক্তৃতাই ফেঁদে বসেছেন। তিনি নিজেকে, সাবেরাকে আর পলাশকে জনতার কাছে পরিচিত করাচ্ছেন। জনতা আনন্দ পাচ্ছে। কারণ গ্রামের ওই বুড়ি মেয়েটার গল্প বিশ্বাস হয়, আবার সন্দেহও জাগে। হতেও পারে তার ছেলে বড় বীর ছিল, সে যা দিয়েছে, কেউ তা শোধ করতে পারবে না। হতে পারে, এরা লোক ঠকাতে বেরিয়েছে। লোকেও ওদের নিয়ে মজা করে নিচ্ছে। 

মুর্শেদ তখন মা-দেরকে এই ভিডের ভেতর থেকে বের করে নিয়ে আসে। এক মাঝবয়েসি ভদ্রলোক এগিয়ে এসে মুর্শেদের কানে ফিসফিস করে বলেন, এই যে খোকা, এটা নাও। 

তাঁর হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট। মুর্শেদ অবাক। কেন? 

ভদ্রলোক কাঁচুমাচু করে বলেন, শহীদ আবদুর রশীদ না কী যেন নাম, তার ওই ছেলেকে মিষ্টি কিনে দিয়ে। 

মুর্শেদ বলে, না, আমরা ভিখিরি নই। 

ভদ্রলোক তখন হতভম্ব হয়ে মাফ চেয়ে চলে যান। 

তখন একটি সাদা জমিনের কালোপাড় শাড়ি পরা মেয়ে কোত্থেকে যেন হাওয়ায় উডে আসে। মায়ের হাতে একগোছা লাল সাদা ফুল ঙ্গুজে দেয়। উভয়ে উভয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে শেষে মায়ের দুই গাল বেয়ে অশ্রু নেমে আসে। 

লাভ হয় এইটুকু যে, কিছু শহীদের কবরের সন্ধান পাওয়া যায়। সেসব জায়গা মিরপুর থেকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া রামপুৱা খিলগাঁও পর্যত বিস্তৃত। পলাশকে নিয়ে হয় মুশকিল। সে আর কিছুতে এভাবে ঘুরবে না। মুর্শেদ বলে, হ্যাঁরে এত বড় রাজধানী, ওই যে দেখ, এই বাড়িটা দেখ্‌, তোর ভালো লাগছে না? সন্ধ্যেবেলা তোকে স্টেডিয়ামে নিয়ে যাব, হ্যাঁ। 

না, রাজধানী তার ভালো লাগেনি। সে কেবল কাঁদে আর বলে, চল বাড়ি যাই। ট্রেনে চড়ে বাড়ি যাই। 

সোহ্‌রাওয়ার্দি উদ্যানে গাছতলায় গিয়ে বসা হয়। ঠাণ্ডা মাটি মায়ের পায়ে শান্তি দেয়। তাঁর পায়ের তলায় ফোস্কা পড়ে গেছে। খাবারের পোটলা খুলে পলাশকে খাওয়ানো হয়। মা বলেন—মুর্শেদ, তুইও খেয়ে নে। বৌমা, তুমি খেয়ে নাও। 

মুর্শেদ খায়। সাবেরাও না খাওয়ার মতো করে খায়। কিন্তু মা খান না। বলেন, আমি রোজা রেখেছি, রশীদের কবরে আমি সারাদিন নামাজ-কালাম পড়ব। সূর্য ডুবলে মুখে পানি দেব। 

আবার সন্ধান চলে। পায়ে হেঁটে রিকশায় বাসে সারা শহর ঘুরে বেড়ানো হয়। শহর তো নয়, একটা পৃথিবী। অনেক কবর দেখা হয়। কিন্তু রশীদের কবর পাওয়া যায় না। যেসব কবরে নাম নেই, কেউ বলে না রশীদের হতে পারে। শোনা যায় শেরে-বাংলা নগরে এক মুক্তিযোদ্ধার কবর রয়েছে। যাওয়া হয়। না, রশীদের কবর নয়। খবরের কাগজের অফিসগুলোতে যেতে লেগেছিল। ওগুলোতে আজ শহীদ দিবসের ছুটি, বন্ধ। থানায় গেলে বলে, এ বাপু আমাদের বিষয় নয়, সিটি করপোরেশনের বিষয়। 

মহাখালীতে এক কবর পাওয়া গিয়েছিল, তাতে লেখা ছিল শহীদ আবদুর মজিদ। কেউ বলতে পারে না কোথাকার লোক, কেমন দেখতে ছিল। 

পলাশকে আর বয়ে বেড়ানো যায় না। সে ঘাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। দুপুর গড়িয়ে চলে বিকেলের দিকে। বাংলাদেশ বেতারের সামনে বাস স্টপের এক ছাউনিতে গিয়ে ওরা ভেঙে পড়ে। একটা কুকুর শুয়ে ছিল, বেচারা অনিচ্ছায় গা তুলে চলে যায়। মা গড়িয়ে পড়েন। মনে হয় মূর্ছা গেছেন, দাঁতে দাঁত লেগে গেছে। কিন্তু মুখে পানি দিতে গেলে জেগে ওঠেন, বাঁধা দেন। খানিক পরে উঠে ওজু করে বিলম্বে হলেও জোহরের নামাজটি পড়েন। 

রাস্তা কাঁপিয়ে বড় বড় বাস যায়, ট্রাক যায়, ছোট ছোট সুন্দর সুন্দর গাড়িও যায়। সাবেরা ভাবে, কেন এসেছিলাম। এমন বোকামিও কি মানুষ করে। 

মুর্শেদ ভাবে, ঢাকায় আমাদের আত্মীয়স্বজন নেই সে তো জানা কথা, আমরা সারাদিনের যা হোক খাবারের সংস্থান করেই বেরিয়েছিলাম। তবু মনে মনে একটা আশা নয়,  বরং বাসনা ছিল : শহীদ-পরিবার, মফস্বল থেকে ঢাকায় এসেছে, এসেছে একুশে ফেব্রুয়ারি, এসেছে শহীদ ছেলের, শহীদ স্বামীর কবর খুঁজে পেতে, আশা নয়, বরং বাসনা ছিল, কত লোকে এসে বলবে, আসুন, আমাদের বাসায় দুপুরে চাট্রি খাবেন, আসুন, আমাদের বাড়ি রাতটা থাকবেন। মুর্শেদ সঙ্গে সঙ্গে বলে, ছিহ্‌ আমরা আমাদের কথা ভাবছি, কী পেলাম না তা-ই ভাবছি। কিন্তু সেই শহীদ পেয়েছে। কিছুই কি পেয়েছে? তার কবর ফুল পায়নি, মোমবাতি পায়নি। না পাক। কিন্তু তার স্বপ্ন কী পেয়েছে। তার রক্ত কী পেয়েছে? 

সেই ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে যিনি তখন পঞ্চাশটা টাকা দিতে চেয়েছিলেন, সেই মেয়ের কথা মনে পড়ে যে মাকে ফুল দিয়েছিল। না, এদিক-সেদিক ভালো লোকও সব আছে যাদের বুকে কান্না আছে। কিন্তু কান্নাকে ফাটিয়ে তোলার সাধ কারো নেই। 

শক্ত সিমেন্টে গামছার ওপর পলাশ ঘুমোচ্ছে। 

মা নামাজ শেষ করে বলেন--মুর্শেদ, আমাকে সেইখানটায় নিয়ে চল।। 

কোন্‌খানটায়? 

সেই যে যেখানে শহীদ আবদুল মজিদের কবর রয়েছে। 

সেখানে গিয়ে কী হবে? 

ফাতেহা পড়ব। 

কেন, মা? 

ওটা আমার রশীদের কবরও হতে পারে। হয়তো ওরা নামের ভুল করেছে। 

তাই বুঝি কেউ করে! 

না, আমি ওখানে যাব। মা বলেন। বাসে যাওয়া যাবে না, মুর্শেদ। রিকশায় চড়ে-চড়ে তো সব শেষ করে ফেললি। কটা মোমবাতি দেখ্‌ কোথায় পাওয়া যায়, কিনে নে। 

পলাশকে ঘাড়ে তুলে ওরা আবার যাত্রা করে। 

কবে, সেই তখন ফাঁকা জায়গায় কার বাড়ি তৈরি হওয়ার পর এখন শ্যাওলা ধরা ভাঙা ইটের স্তুপ পড়ে রয়েছে। তার পাশে কাঁটা-নটের গাছে ঘেরা কবরটি। কবরটিকে কারা ওই ভাঙা ইট দিয়েই যেমন-তেমন বাঁধিয়ে রেখে গিয়েছিল। একটা মোটা রড পুঁতে তাতে ছোট একটা টিনের নাম-ফলক ঝুলিয়ে রেখে গিয়েছিল। টিনের খণ্ডটুকু বেঁকে-চুরে গেছে কিন্তু মর্চে ধরেনি, ভালো টিন। কালো পেন্ট দিয়ে লিখেছিল, কালো বর্ডারও দিয়েছিল। শুধু নাম। দু'লাইনে লেখাঃ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মজিদ। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা কথাটা বেশি বড় করে লেখা নামের চেয়ে। বাবার নাম, জন্মস্থান নেই। মা বলেন, দেখ্‌, কী লেখা আছে। আবদুর রশীদ হতে পারে না? 

মুর্শেদ বলে,না মা, আমি ভালো করে দেখেছি। সে আর একবার দেখে। 

মা কবরের পাশে কটা ইটের টুকরো সরিয়ে কিছু ঘাসে কিছু মাটিতে পশ্চিমমুখী পা দুমড়ে বসে মাথায় ঘোমটা টেনে খুব করে ঠোঁট আর বেড়ানো গাল নাড়িয়ে নাড়িয়ে ফাতেহা পড়া শুরু করেন। সাবেরাকে বলেন, তুমিও পড়। 

সাবেরা শোনে না। ছেলেকে নিয়ে ওদিকে ঘুরতে যায়। মুর্শেদের এসব ভালো লাগছে না। একপাশে ব্যাগটি নিয়ে বোকার মতো বসে থাকে। কার না কার কবর। এখনি যদি লোকে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে, কী বলবে? 

কিন্তু মায়ের মনের ভাব ওরা বোঝে না। তিনি কখনো তস্‌বি জপছেন, কখনো কেরাআত পড়ছেন। দুই গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছে। অশ্রু দমন করার চেষ্টা করছেন, কারণ এত শোক আল্লা পছন্দ করেন না, তার এবাদটুকু, এই উপাসনা, প্রার্থনাটুকু তিনি যদি গ্রহণ না করেন তাহলে লাভ কী হল? কিন্তু তিনি ঠেকাতে পারছেন না। বারবার ছেলের মুখ মনে পড়ছে। দুশমনের গুলি খেয়ে যখন সে পড়ে গেছে, রক্তে-ভেজা মাথাটা এপাশ-ওপাশ করছে, তখন নিশ্চয় এই মা-হতভাগীর মুখ তার মনে পড়েছিল। তার কতদিন পরে আমরা জেনেছি, রশীদ, তুই আর নেই। বাবা রে, তোর কাছে আমি এসেছি, এই দেখ্‌, তোর কাছে আমি এসেছি। তুই এখন শান্তি পা, বাবা। 

রশীদ হয়তো এই কবরে নেই। থাকতেও তো পারে। যদি না থাকে, তার কোনো সাথী, সহযোদ্ধাই তো আছে। সেও মায়ের ছেলে। সেও গুলি খেয়ে তড়পাবার সময়ে তার মা'র মুখ মনে করেছিল। ওরা সবাই আমার ছেলে। নিশ্চয় এখানে আমার এক ছেলে রয়েছে। 

হ্যাঁ, লোকজন, ছেলেমেয়ে এসে দাঁড়ায়। চলে যায়। কারো খুব কৌতূহল নেই, স্পৃহা নেই। এই দুটো জিনিস উবে গেছে। 

সন্ধ্যা হলে, কাছেই মসজিদ, আজান পড়লে মা মোমবাতি জ্বেলে দেন। হাওয়া আছে, দেশলাই জ্বালাতে মুর্শেদ সাহায্য করে। মা কয়েক গণ্ডুষ পানি খান। মগরেবের নামাজ পড়েন। তারপর লম্বা অশ্রুভেজা মোনাজাত সেরে বলেন, চল মুর্শেদ, এবার আমরা ফিরি। 

আর তো তাড়া নেই, স্টেশনে ফিরতে বেশ রাত হয়। দুর্গন্ধ কম এমন একটা জায়গা বেছে প্লাটফর্মে গিয়ে বসা হয়। পলাশ আবার ঘুমিয়ে পড়েছিল। সামান্য বিছানা পেতে তাকে শুইয়ে দেওয়া হয়। মা এবার এক দলা সুজি দিয়ে অনেক কষ্টে একটি শক্ত রুটি খান। কিন্তু কাঁদছেন। ঘোলাটে চোখে উজ্জ্বল আলোগুলো দেখছেন আর কাঁদছেন। তাঁর চোখের কোণগুলো কেঁদে কেঁদে সাদা হয়ে গেছে। মুর্শেদ ঘটি ভরে পানি এনে মাকে খাওয়ায়। তারপর নিজে খেতে বসে। কিন্তু সাবেরা খায় না, তাকে খাওয়ানো যায় না। 

খাওয়া সেরে মুর্শেদ একটু ঘুরতে গিয়েছিল। নিজে একটা পান খায়। ভাবে, 'ভাবীর জন্য এক খিলি নিয়ে যাই। পানের খিলিটি নিয়ে এসে দাঁড়াতে দেখে ভাবী নীরবে কঁদছে, দুই গাল বেয়ে বয়ে যাচ্ছে ধারা। মুর্শেদকে দেখে তার দেহ আক্ষেপে আন্দোলিত হতে থাকে। 

মা শুয়ে ঘুমোচ্ছন। পলাশ ঘুমোচ্ছে। তার মুখে ঢাকার পথের ধুলোর একটি মলিন প্রলেপ। কিন্তু ওদিকে প্লাটফরমে হঠাৎ কোত্থেকে মাটি কঁপিয়ে এক ইনজিন এসে সিটি মারতে লেগে গেলে পলাশের ঘুম ভেঙে যায়। সে তারস্বরে কেঁদে ওঠে। মনে হয় তার গলা-চেরা কান্নার শব্দ ইনজিনের চিৎকারকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন