শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প 'অপমৃত্যু'

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ক্রোড়পত্র
পঞ্চানন কর্মকার লেনটিকে কেউ বলে পাঁচু কর্মকার লেন, কেউ উমেদ আলী হাওলাদার রােড । এই শেষ নামকরণটি এক আহলাদী ঘটনাই বটে । উমেদ আলী ছিলেন এ মহল্লার আদিবাসীদের একজন, টাকা-পয়সা ছিল, প্রভাব প্রতিপত্তি তাে ছিলই। তিনি একদিন ফজরের নামাজ পড়ে ছাদে পায়চারি করতে গিয়ে পা ফসকে নিচে পড়ে মারা গেলেন। মারা গেলেন কথাটা সহজেই বলে ফেলা হল; আসলে অত সহজে জগৎ থেকে নিষ্ক্রান্ত হননি হাওলাদার।

তার মাথাটা থেঁতলে গিয়েছিল, ঘাড় মটকে, হাত-পা ভেঙে একটা ভেজা বালিশের মত জবুথবু হয়ে পড়েছিলেন তিনি পুরাে একটি ঘণ্টা। অত ভােরে ছেলেমেয়ে দূরে থাকুক, কাজের লােকজনও জাগে না - জাগেও নি সেদিন। পরে, পিতার শােকে ছেলেরা রাস্তার নামটা পালটে রেখেছিল উমেদ আলী হাওলাদার রােড। তারা লােক ভাড়া করে সবগুলাে বাসা আর দোকানের মাথায় রং দিয়ে লিখে দিল স্বর্গ পিতার নাম। রাস্তার মোড়ে সিমেন্টের খােদাই করা ফলকও লাগাল – এমনকি ওয়ার্ড কমিশনার বশিরুল হককে দিয়ে তার উদ্বোধনও করাল। আর এ উপলক্ষে যে মিলাদ হল তা পড়াতে কেরানীগঞ্জ থেকে এক পীর সাহেব এলেন | এসে বললেন, ‘ভাল করেছেন, বাবাজানেরা। রাস্তাটার হিন্দুয়ানি নামটা এবার ঘুচবে।' কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, পাঁচু কর্মকার লেনের আদি পরিচয়টাই বহাল রয়ে গেল । কেন রয়ে গেল, তা বলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়- এটি সমষ্টিক মনস্তত্বের বিষয়, এবং এক সুপ্রাচীন রহস্য। কার্ল ইয়ং বলতে পারতেন; কিন্তু তিনি তাে বেঁচে নেই, নাকি? যা হােক, শিক্ষিত দুএকজন পঞ্চানন কথাটা ব্যবহার করতে থাকলেন, অন্যরা পাঁচু; কিন্তু উমেদ আলীর স্মৃতি, অন্তত রাস্তার সঙ্গে জড়িয়ে যেটুকু থাকার কথা ছিল, ক্রমেই উবে যেতে থাকল। এক সময় শুধু দু’একটা সাইনবাের্ড এবং সিমেন্টের নাম ফলকটাতেই উমেদ আলী বেঁচে রইলেন। 

কি বললেন? আপনার বাসায় কাজের লােকজন ফজরের অনেক আগেই উঠে যায়? হতে পারে; আপনি ভাগ্যবান মানুষ। কিন্তু উমেদ আলীর গৃহস্থালীতে ভােরের আলাে ঢুকত সূর্য ওঠার অনেক পর। এমনও দিন গেছে, উমেদ আলী নামাজ পড়ে এক কাপ চায়ের জন্য হা-পিত্যেশ করেছেন; কিন্তু কে দেবে তাকে চা? স্ত্রী গত হয়েছেন। তাঁর জন্য রান্না ঘরে গিয়ে ওকালতি করে, তেমন কেউ নেই। তাঁর হয়তাে ইচ্ছে হয়েছে মােড়ের চা দোকানে গিয়ে দোকানদারকে জাগিয়ে এক কাপ চা খাবেন, কিন্তু ছেলেরা বিষয়টাতে অসন্তুষ্ট হবে, এ বিবেচনায় তিনি নিজেকে নিবৃত্ত করেছেন। বেচারা উমেদ আলী! 

সে আঁজ বছর সাতেক হয়ে গেল । 

পঞ্চানন কর্মকার লেনটি - আমরা ইতিহাসকে সম্মান করে এ নামেই রাস্তাটাকে অভিহিত করতে চাই- এক বিচিত্র এবং বিভ্রান্ত ভূগােল। খুব দীর্ঘ নয় রাস্তাটি, দুশ থেকে আড়াইশ গজ - কিন্তু এরই মধ্যে দু’টি বাঁক খেয়েছে । খেয়ে, শেষ হয়েছে। হালিমুন্নেসা গার্লস স্কুলের আড়াআড়ি দেয়ালে। সে দেয়াল এত উঁচু যে হঠাৎ দেখলে মনে হবে নাজিমুদ্দিন রােডের জেলখানা। একেতাে রাস্তাটা এভাবে কানা, তারপর অপরিসর। দুটো রিকশা পাশাপাশি চলতে পারে না, বেধে যায়। আকাশ থেকে দেখলে রাস্তাটাকে একটা সাপের মত মনে হবে; কিন্তু আকাশ থেকে কে দেখবে ওই কানাগলিকে? উমেদ আলী হাওলাদারের দুতলা বাড়িটা পুরনাে, কিন্তু বেশ সমর্থ চেহারার। লােহার সিঁড়িটাও দারুণ। বাসার উল্টোদিকে অনেকখানি জায়গা নিয়ে আরেকটা বাড়ি, যার মালিক ফরিদ আলী হাওলাদার, উমেদ আলীর অগ্রজ। তাঁর যে এত বড় একটা বাড়ি থাকতে পারে ঢাকা শহরে, তাকে দেখলে কেউ সেটা ভাবতে পারত না। বেশভূষা, চাল-চলন ঠিক একটা ভিখিরির মতন । আসলে মাথাটা খারাপ ছিল তার; কিন্তু উন্মাদ ছিলেন না। খুবই ভদ্র এবং বিনয়ী ছিলেন, বলা যায়; শুধু পাগলামী উঠলে রাস্তার মােড়ে গিয়ে দাড়িয়ে ভিক্ষা করা শুরু করতেন । পাগলের নাকি ভীষণ শক্তি থাকে শরীরে, লােকে বলে। তারও যে ছিল, সেটি প্রমাণিত হত যখন তাঁর ছেলেরা তাকে ফিরিয়ে নিতে আসত। একচুলও কিন্তু সরাতে পারত না তারা তাকে, ওই রাস্তা থেকে। কী অবাক কাণ্ড, ভাবুন। এই সরু, চিপা রাস্তায় এত জমি নিয়ে কে বানাল বাড়ি? সে-ও কি পাগল ছিল? কে জানে! কিন্তু লােকে বলে, এ-ই ছিল পাচু কর্মকারের আদি বাড়ি। তার উত্তর পুরুষেরা এটি ফরিদ আলীর কাছে বিক্রি করে চলে যায় ভারতে। ফরিদ আলীর মাথা সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল নিশ্চয়ই। 

সম্পত্তি নিয়ে মানুষ একশ’ রকমের কথা বলে, যে কোন সম্পত্তি নিয়েই, আপনি দেখবেন। তার কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক, হিসেব নেয়া ভারী কষ্ট। 

ফরিদ আলীর ছেলেরা বাবাকে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত করতে না পারলেও তার দেখভালের ত্রুটি করেনি। তারা - সব মিলিয়ে চারজন, কিন্তু সবচেয়ে ছােটটাকে এখন আমরা ধর্তব্যের মধ্যে আনছি না; কেন, পরে জানাচ্ছি - পালাক্রমে সৌদী আরবে গিয়েছে, আশির দশকে, ওই ছােটটি ছাড়া। তারা এত টাকা নিয়ে ফিরেছে। যে কী করবে সে টাকা দিয়ে ভেবে পাচ্ছিল না। 

ফরিদ আলী হাওলাদার স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছিলেন, জন্ডিসে ভুগে। ছেলেরা তাঁর নামটা অমর করার জন্য অবশ্য রাস্তার ওপর হামলে পড়েনি, বরং এফ এইচ গার্মেন্টস নামে একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি বসিয়ে দিল রাস্তার মােড়ে, কিছুটা এগিয়ে যে বিলকিস প্লাজা, তার তিন, চার ও পাঁচতলায় । 

তাতে, চার ভাই মিলে ফুলে ফেঁপে আরাে বড়লােক হতে থাকল। সম্পত্তি ও সম্পদে চতুর্থ ভাইটিরও একটা ভাগ আছে, এ কথাটি বড় তিন ভাই কখনাে অস্বীকার করেনি ।

উমেদ আলীর তিন ছেলের সঙ্গে চাচাতাে ভাইদের সম্পর্ক খুবই ভাল ছিল। ছিল, অর্থাৎ উমেদ আলী যতদিন বেঁচে ছিলেন। তিনি যখন ছাদ থেকে পড়ে, থেঁতলে, ভেজা বালিশের মত লুটিয়ে থেকে, প্রাণত্যাগ করেন, তখন ফরিদ আলীর ছেলেরা - একটি ছাড়া - সবাই সৌদী আরবে। তারা ফিরে এলে টাকার পাহাড়ই প্রধানত আড়াল করে দিতে থাকল দুই জ্ঞাতি পরিবারকে। আসলে কি জানেন, অর্থই জগতে সব অনর্থের মূল। হাসলেন যে, কথাটা শুনে? কিন্তু ভাই, এতাে স্বীকার করেন যে, টাকা-পয়সা না থাকলে আপনাকে কেউ জিজ্ঞেসও করে না? অথচ, টাকা থাকলে সবাই হাত পাতে, নয়তাে আপনি স্বার্থপর হয়ে যান। কিছু একটা যাহােক ঘটে, যা সম্পর্ক নষ্ট করে, মানুষের মধ্যে। 

ফরিদ আলীর দালান-পাঁচু কর্মকারের আদি বাড়িটি - এতটা জীর্ণ ছিল যে, এক রাতে মটমট শব্দে ছাদের সিঁড়িঘরটি ভেঙে পড়ল। ছেলেরা পরের দিনই কাজে নামল। বারাে-তেরাে কাঠার মতাে জমি, একটা কিনার ঘেঁষে পাঁচতলা একটা ফ্ল্যাট বাড়ি তুলতে শুরু করল তারা। তারপর মাস চারেক হয়তাে হবে, অন্য কিনার ধরে তুলতে লাগল আরেকটা ফ্ল্যাট বাড়ি, পাঁচতলা। যেন জমি কুঁড়ে উঠতে লাগল দুটি তালগাছ, অথবা দুটি পাহাড়,অথবা দুই পতাকা। এমনি পরস্পর সম্পর্কিত দুই দালান এর দোতলা শুরু হয় তাে ওর একতলা শেষ হয়; এর জানালা লাগে তাে ওর দরােজায় কপাট লাগে। এমনি অবস্থা ।

পাড়ার লােকের বিস্মিত এবং কৌতূহলী চোখের সামনে রাতারাতি দু’টি পাঁচতলা। বাড়ি বাড়িয়ে গেল পাঁচু কর্মকার লেনের পিঠের মাঝখানটাতে, দুই কুঁজের মতো। তারপর, দ্রুত ভেঙে, সরানাে হল পুরনাে বাড়িটি – পাচু কর্মকারের ঐতিহাসিক দালানটি। এ রাস্তার মানুষজন খুব যে বিত্তশালী তা নয় - দু’এক ঘর বাদ দিয়ে । বেশির ভাগ, বলা যায় মধ্যবিত্ত । আপনি হয়তো ভাবছেন, যে লােকের একটা বাড়ি আছে ঢাকা শহরে, সে মধ্যবিত্ত হয় কিভাবে। কিন্তু পাচু কর্মকার লেনে বাড়ি থাকা আর না থাকা কি আর এমন আলাদা? এই অলিগলি - তস্য গলিতে তাজমহল থাকলেই বা কি? গেঞ্জির আবার বুক পকেট!

তাছাড়া বাড়িঘরগুলাে এমন জরাজীর্ণ যে, দেখলে মনে হবে তাদের অন্তিমদশা ইতিমধ্যেই পার হয়ে গেছে। কেমন ভিখিরি ভিখিরি ভাব রাস্তাটার লােকজনের, বাড়িঘরের । ফকির মিসকিন লেন নাম দিলে হয়তাে সুবিচার করা হত পাঁচু কর্মকার লেনের প্রতি। সত্যিকার ভিখিরিরা, নেহাৎ কপাল মন্দ না হলে, এই গলিতে পা রাখেনা। ভিখিরিরও রুচিবােধ আছে, নাকি?

তবুও পাড়া বলে একটা জিনিস আছে, একটা কাঠামাে, একটা প্রাণ আছে। এ পাড়ার ডজন পাঁচেক বাড়িঘর -- তাতে একটা সমাজ সমাজ ভাবও আছে। তাদের সকলের কাছে ফরিদ আলী হাওলাদারের ছেলেদের ফুলে ফেঁপে ওঠা খুব ভাল বা সুখকর লাগল না। ছেলেগুলাে যে ক্রমেই বড়লােক হচ্ছিল, তাতে অনেকেরই প্রবল আপত্তি ছিল, উমেদ আলীর মেজো ছেলে রিয়াজ ছিল যাদের সম্মুখ সারিতে। কিন্তু একজন মানুষ ধনী হতে থাকলে আপনি আর কী বলতে পারেন, তাকে; নিশ্চয় একরকম অভিযােগ তুলে তাকে প্রশ্ন করতে পারেন না, এই যে ভাই, আপনি বড়লােক হচ্ছেন কেন? অথবা, আপনার এত টাকা কেন?' এইসব প্রশ্ন নিজের মনেই মানুষ করে, সহস্রবার করে; কিন্তু সামনাসামনি কিছু বলে না। হয়তাে সামনাসামনি শিরদাঁড়াহীন হাসি হেসে বলে, “কেমন আছেন, কবির ভাই? অথবা, আপনাকে অনেকদিন দেখি না যে, শহিদ ভাই?' কবির ও শহিদ ফরিদ আলীর ছেলে। নাবিল সেজো ছেলে ! আর ছােট ছেলের নাম আদিল, যদি জানতে চান । 

কিন্তু পাড়ার লােকের কণ্ঠে কিছুটা গুঞ্জন শােনা যেতে লাগল যখন কবির-শহীদদের টুইন টাওয়ার মাটি খুঁড়ে উপরে উঠতে থাকল। নিদেনপক্ষে বারাে থেকে চৌদ্দটি ফ্ল্যাট- অর্থাৎ বারাে থেকে চৌদ্দটি নতুন পরিবার, এই কানাগলির পরিপৃক্ত জীবনে । এদের গ্রহণ করবে কিভাবে পাঁচু কর্মকার লেন? এই রাস্তাটি কি তৈরি অতিরিক্ত চৌদ্দটি পরিবারের জন্য? এর নর্দমা, এর বিদ্যুতের লাইন, এর পানীয় জলের জং ধরা পাইপগুলি কি সহ্য করতে পারবে চৌদ্দ পরিবারের বাড়তি চাপ? পাঁচু কর্মকার লেনের অধিবাসীরা জানে, ঢাকার সর্বত্র এখন আকাশে ওঠার প্রতিযােগিতা। এমনকি যে একতলা-দোতলার পুরনাে ঢাকা, যার জীবন এখনও অর্ধেকটা মাটিতে, সেখানেও অভ্রভেদী দালান উঠছে - মানুষেরা পাখির খােপের মতাে ওইটুকু ঘরগুলিতে গাদাগাদি করে থাকে – আর, নতুন ঢাকাতে তাে কথাই নেই। কিন্তু পাঁচু কর্মকার লেন? যেখানে ইতিহাস চলৎশক্তিহীন, যেখানে সময় এমনভাবে পরিবর্তনকে এড়িয়ে যায় যেন ছোঁয়াচে রােগ, এবং যেখানে ভুগােল আটকে থাকে আত্নাদর আর বিভ্রান্তির ফাঁদে? এখানে মানুষ গতকালটাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়। কবির-শহীদদের দালান দু'টি পাচু কর্মকার লেনের স্থাপত্যে একশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান, সে বিষয়ে কারাে সন্দেহ নেই। সিরামিক ইট, বা এলুমিনিয়ামের চৌকাঠ, অথবা টিন্টেড গ্লাস - রীতিমত বৈপ্লবিক এর নির্মাণ সামগ্রী আর নকশা । কিন্তু এরই মধ্যে পাড়ার লােকজনের নাভিশ্বাস উঠছে। দিনে রাতে ইট, বালি, সিমেন্ট, লােহালক্কড় বােঝাই ঠেলাগাড়ির আনাগােনা নষ্ট করছে পাড়ার শান্তি ও নির্মাণ শ্রমিকদের হৈ চৈ, হট্টগােল; সিমেন্ট মিক্সার থেকে শুরু করে ইট ফেলা-তােলার শব্দ অতিষ্ট করে তুলেছে পাড়ার জীবন। পাঁচু কর্মকার লেনের লােকজনের বিরক্তি ধরে গেছে । পারলে বােমা মেরে উড়িয়ে দেয় দুটি দালান। 

কবির-শহীদদের টুইন টাওয়ার বানানাে শেষ হলে এগুলাে নিয়ে পাড়ার চায়ের দোকানটাতে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে যায় । কখন ভাড়াটে আসবে, কী ধরনের ভাড়াটে আসবে, কোন উপার্জন শ্রেণীর ভাড়াটে আসবে। পাড়ার দু' এক নবীন যুবক অবশ্য গােপনে অভিনন্দন জানিয়েছে ফ্ল্যাট বাড়ি দুটোকে – তাদের আশা, অন্তত পাঁচ-সাত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়-পড়া মেয়েতাে আসবে নির্ঘাৎ। তাতে কিছু না হলেও নতুনত্ব যােগ হবে। যে কটি মেয়ে আছে এ পাড়ায়, তাদের দেখে দেখে চোখ পচে গেছে। তাছাড়া, পাড়ার মেয়ে বলে কথা, সবাই চেনে সবাইকে। পাড়ার লােকজনের মধ্যে হালকা একটি উত্তেজনা - উত্তেজনা না বলে কৌতুহল বলাই ভাল - টুইন টাওয়ারের টেনান্সী নিয়ে। সবাই চায় ভাল মানুষরা আসুক কলেজের শিক্ষক, ব্যাংকের অফিসার অথবা ছাপােষা, যদিও, কেউ না এলেই খুশি হ’ত সবাই, ওই কিছু নবীন যুবা বাদে। 

পাড়ার মানুষদের অবশ্যই কিছুই একটা আন্দাজ করা উচিত ছিল টুইন টাওয়ারের টেনান্সী বিষয়ে, রাস্তার মােড়ে যখন একটি ঝকঝকে নতুন ট্রান্সফর্মার লাগিয়ে দিল ডেসার লোকজন, এক দুপুরে, তা দেখে । তারা বরং আনন্দিত হল এই ভেবে যে, বশিরুল হক, যে সরকারি দলে যােগ দিয়ে নির্বাচন করে আবার ওয়ার্ড কমিশনার হয়েছে, তার একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অন্তত রেখেছে। পাড়ার মানুষ তখনও কিছু আন্দাজ করতে পারল না - কেন তা ভেবে আমরা অবাক হই - যখন ডজন ডজন টিউব লাইট নিয়ে বিদ্যুৎ মিস্ত্রিরা এসে হাজির হল এক সকালে এবং দ্বিতীয় পাঁচ তলাটির সবগুলাে ফ্ল্যাটে লাগিয়ে দিল সেসব। তবে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির যন্ত্রপাতি ও বাকিসব জিনিসপত্র নিয়ে আবার যখন ঢুকল সারি সারি ঠেলাগাড়ি পাচু কর্মকার লেনে, মানুষ বুঝল এবং জানল এবং জেনেশুনে আক্রোশে ফেটে পড়ল। এবার আর কারাে সন্দেহ রইল না, কবির ও শহীদ ভাইদের উদ্দেশ্য কি। অবশ্য, স্বীকার . করতে হবে যে, এ বিষয়ে তারা কোনাে লুকোচুরি খেলেনি - প্রথম থেকেই খুব খােলামেলা ছিল তাদের কর্মকাণ্ড। তারা মেসার্স কে. এস. গার্মেন্টস লেখা এক বিশাল সাইনবাের্ড টাঙিয়ে দিল দ্বিতীয় পাঁচতলাটির মাথায় থেকে, একদিন ।

পাঁচু কর্মকার লেনের লােকজন বুঝল, যুদ্ধ তাদের উঠানে নিয়ে এসেছে ফরিদ আলী হাওলাদরের ছেলেরা। এবার আর একটা বাজারের সঙ্গে কোনাে পার্থক্য থাকবে না পাঁচু কর্মকার লেনের পাড়ার । নবীন যুবাদের প্রাথমিক হিসেব মতে, দু থেকে তিনশ লােকের কাজ জুটবে কে. এস. গার্মেন্টস-এ, যাদের নব্বই ভাগ হবে মহিলা। এ সম্ভাবনায় তাদের খুশি হওয়ার কথা ছিল - কিন্তু গার্মেন্টস এর মেয়েরা নিতান্তই সাদামাটা, গ্রাম্য । মােটেও আকর্ষণীয় নয়। কোথায় কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্রী, আর কোথায় গার্মেন্টস এর মেয়ে! যদিও, দু'এক যুবা বিষয়টিকে খােলা মন নিয়ে দেখার জন্য ভবিষ্যতের হাতে ছেড়ে দিল । কে জানে, একটা অমূল্য রতন বেরিয়ে আসতেও পারে ছাইয়ের গাদা থেকে । 

উমেদ আলীর ছেলেদের জন্য সুবর্ণ সুযােগ এনে দিল কে. এস, গার্মেন্টস এর সূচনা। সাইনবাের্ড মাত্র উঠেছে, মেশিনপত্র ফিট হচ্ছে ঘরগুলােতে কিন্তু কাজ শুরু হয়নি। রিয়াদ রিয়াজ মিলে পাড়ার লােকদের সংগঠিত করতে শুরু করল কে, এস, গার্মেন্টস এর বিরুদ্ধে। রিয়াজের সঙ্গে আপনাদের আগে পরিচয় হয়েছে, এবার আসুন পরিচিত হােন রিয়াদ ও নিয়াজের সঙ্গে। এদের সম্পর্কে পাড়ার লােকের খুব উঁচু ধারণা নেই, কোনােদিন ছিলও না। বস্তুত লােকজন অপছন্দই করে তাদের – তাদেরও টাকা-পয়সা আছে, ব্যবসাপাতি আছে -- বাদামতলীতে ট্রান্সপাের্ট আর চালের রমরমা ব্যবসা তাদের। কিন্তু এই এক ইস্যুতে পাড়ার মানুষের সহানুভূতি পেল তারা! সবাই এই সিদ্ধান্তে এল যে, কে, এস, গার্মেন্টস কিছুতেই চালু হতে পারে না । এটি হলে পাঁচু কর্মকার লেনের অস্তিত্ব বিলােপ হয়! তারা রিয়াদ-রিয়াজের নেতৃত্ব মেনে নিল । আগে টিকে থাকা, পরে মানুষের বাছবিচার। তাছাড়া, জ্ঞাতি দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব, অনেক নাটকীয়তা আছে, মজা আছে। তারা গেল ওয়ার্ড কমিশনারের কাছে, কিন্তু বশিরুল হক পরিষ্কার জানিয়ে দিল, কবির-শহীদেরা কর্পোরেশন থেকে অনুমতি নিয়েছে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছে, ডেসা তাদের নতুন ট্রান্সফর্মার দিয়েছে। দেখেন নাই, আপনারা?' জিজ্ঞেস করল বশিরুল হক ।

ডেসা ঘুরে, কর্পোরেশনের ছােট বড় মাঝারি কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে দেন-দরবার করে, এ অফিসে সে অফিসে ধর্ণা দিয়ে পাড়ার লােক বুঝতে পারল, কবির শহীদের খুঁটি তারা যতটা হালকা ভেবেছিল, ততটা নয় । উল্টোটিই বরং। কে.এস গার্মেন্টসকে রােখা এখন কারাে জন্য সম্ভব নয় । আতিকুর রহমান এডভােকেট প্রস্তাব দিলেন, কোর্টে একটা কেস করে দিলে কেমন হয়। একটা ইঞ্জাংশন নিয়ে নিলে? তিনি কাগজপত্র তৈরিতে মনােনিবেশ করলেন । কিন্তু দ্বিতীয় দিনেই থানার দারােগা হাসান আলী এসে উপস্থিত তার চেম্বারে । বিলকিস প্লাজার নিচতলায় ওই চেম্বার, যদি জিজ্ঞেস করেন। আতিকুর রহমানের বাসায় কাজের মেয়েটি গায়ে আগুন লেগে মারা গিয়েছিল বছরখানেক আগে। নেহাৎই অপমৃত্যু এবং সেরকম একটি ডায়েরি হয় ওই থানায় । কিন্তু হাসান আলী খুব নিরীহভাবেই বলল আতিকুর রহমানকে, উকিল সাহেব, আঙ্গুরা মারা যাবার আগে এরকম একটা কথা বলে গিয়েছিল তার মামাকে যে, আপনার বিবিসাহেবাই তার গায়ে কেরােসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। বিষয়টা অবশ্য ফর্মাল কেস হিসেবে আসে নি’- এইখানে কিছুক্ষণ থামল হাসান আলী, তাকাল ডানে বাঁয়ে, এবং গলা নামিয়ে বলল, “কিন্তু আসতে কতক্ষণ? আমি বলি, আপনার একজন শুভানুধ্যায়ী হিসেবে, বিবিসাহেবা যেন গলা চড়িয়ে ঝগড়া না করেন। বুঝেন তো, একটা ঘটনার জের আরেকটা ঘটনার ওপর পড়তে পারে ! পড়েই থাকে সচরাচর।' 

হাসান আলী হাসতে হাসতে চলে গেল। আতিকুর রহমান আর কি করেন, মাথার চুল ছেড়া ছাড়া? তার স্ত্রীর পাড়ায় একটা পরিচিতি আছে বটে, দজ্জাল মহিলা হিসেবে। মাঝে মাঝে চন্ডমূর্তিতে প্রকাশ্যেই চড়াও হন কাজের লোকজনের ওপর। আর তার যে গলা - আতিকুর রহমান সাহেব নিজেও ভুক্তভােগী একজন, যদি জিজ্ঞেস করেন। তিনি বললেন রিয়াদকে, পরদিন, ভাই, কাগজপত্র ঘেটে দেখলাম আমাদের কোন কেস নেই। মামলা করার মতাে কোনাে গ্রাউন্ড নেই। তিনি ‘আমাদের কথাটা জোর দিয়ে উচ্চারণ করলেন। 

রিয়াদের মুখ দেখে মনে হল, যেন অত্যন্ত আশাহত হয়েছে, কিন্তু আমরা জানি, মনে মনে সে খুশি হল। তার অন্য একটি পরিকল্পনা আছে, সেটা এখন এগুবে। বস্তুত সে আশাই করেছিল, উকিল সাহেব এরকম নৈরাশ্যের কিছু বলবেন। 

৯.
কবির-শহীদ যে খুব দুর্বিনয়ী, তা নয়। মােটামুটি ভদ্র তাদের ব্যবহার, যদিও জ্ঞাতি ভাইদের সঙ্গে নয়। তবে টাকার অহংকারটাই ইদানীং বেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। চোখেমুখে একটু ঔদ্ধত্যের ভাব। অর্থের সঙ্গে ক্ষমতা এসেছে, কাজেই কতদিন আর বিনয়ী থাকে, অথবা বিনয়ী সেজে থাকে? তাছাড়া ক্ষমতা জারি রাখার জন্য যে শক্তির প্রয়ােজন, সেটিও তাদের যােগাড় করতে হয়। এবং এ ব্যাপারে তাদের সাহায্য করছে টাকা। ভারী মজা, এই অর্থ-ক্ষমতা-শক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক। একটা আরেকটার জন্ম দেয়, একটা না হলে আরেকটা চলে না। কী সুন্দর! 

পাড়ার নবীন যুবাদের অনেকেই এখন দিনরাত শহীদ ভাই, কবির ভাই, করে। এদের পকেট, যদি কেউ খুঁটিয়ে দেখে, আগের থেকে অনেক ভর্তি দেখতে পাবে। কাজেই এক ভােরে টিফিন ক্যারিয়ার হাতে মেয়েদের কাফেলা শুরু হয়ে গেল পাঁচু কর্মকার লেনের মধ্য দিয়ে। কে, এস, গার্মেন্টস এর লােহার গেট সকাল আটটায় বন্ধ হয়ে যায় দারােয়ান দাড়িয়ে পাহারা দেয় গেটে। বারাে থেকে বত্রিশ বছরের মেয়েগুলাে উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ায় আটটার আগে পৌছে যাওয়ার জন্য। পাড়ার স্কুল কলেজ ছেলেমেয়েদের ভারী অসুবিধা হয়। ঠোকাঠুকি লাগে, রাস্তাটা জ্যাম হয়ে থাকে টিফিন ক্যারিয়ার বাহিনীর ভিড়ে। আবার সন্ধ্যায় যখন বের হয় মেয়েগুলাে, মনে হয় কোনাে গােরস্তানে পড়ুয়া দরোজা খুলে মৃতেরা যেন বেরিয়ে পড়েছে- এমনি নির্জীব, বিবর্ণ, নিরক্ত দেখায় গার্মেন্টস এর রুগ্ন, ভগ্নস্বাস্থ্য করুণ চেহারার মেয়েগুলােকে। পাড়ার লােকজন আবার দিশেহারা হয় এদের বিক্ষিপ্ত ভিড়ে । 

কে. এস. গার্মেন্টস স্থায়ী হয়ে গেল। পাড়ার মানুষ এটাকে জীবন-মৃত্যুর মত অবধারিত একটি ঘটনা হিসেবে মেনে নিল। মানুষ, যাকে বলে, অভ্যাসের দাস, কি বলেন? কিন্তু এরপর, আশ্চর্য কান্ড, পাচু কর্মকার লেনের নামটাও, অন্তত যােগীনগর বকুলতলা মােড়ের রিকশাঅলাদের কাছে হয়ে গেল গার্মেন্টস-এর গলি। উমেদ আলীর নামকে স্মরণীয় করে রাখতে যেখানে ব্যর্থ হল তার মাস্তান প্রকৃতির ছেলেরা, সেখানে, কোনাে প্রচেষ্টা ছাড়াই, ভিখিরি স্বভাবের ফরিদ আলীর ছেলেরা তাদের গার্মেন্টসকে চিরস্থায়ী খ্যাতি এনে দিল। 

এখন, এমনকি গুলিস্তান থেকেও একটা রিকশা ধরে গার্মেন্টস-এর গলি যাবেন বললে আপনি পৌঁছে যেতে পারেন উমেদ আলীর ঘরেতে। উমেদ আলীর বাড়ি মােটেও শ্রীহীন নয়, কিন্তু রিকশাঅলা তার সামনে আপনাকে নামিয়ে দিয়ে গলার ঘাম মুছবে, এবং ঘুরে, প্রশংসার নেত্রে তাকাবে টুইন টাওয়ারের দিকে। আপনি উমেদ আলীর ছেলে হলে সহ্য করবেন এ দৃশ্য? নাকি লাগাবেন এক ঘা ওই রিকশাঅলাটাকে? 

১০
গল্পটা শেষ করতে হয়, দিন ফুরিয়ে আসছে। না, আমাদের নয়, গল্পেরই কারাে কারাে । 

একরাতে, সন্ধ্যা রাতের দিকে, বস্তুত, ভয়ানক আগুন লাগল দ্বিতীয় পাচতলা দালানটির পঁচতলায়। দেখতে দেখতে আগুনের লেলিহান শিখা... 

হাসছেন যে, ভাই? সংবাদপত্রের ভাষা শুনে? করবটা কি, বলুন, এ ভাষা ব্যবহার না করে? আগুন যখন লাগে, যে ভাষাই আপনি ব্যবহার করুন না কেন তাকে বর্ণনা করতে, তার কাজ কিন্তু একটাই- পুড়িয়ে ফেলা। কাজেই শিখা লেলিহান হােক আর অভ্রভেদীই হােক, কে,এস, গার্মেন্টস মুহূর্তের মধ্যে বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ল, এবং কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পাচতলার সব মালামাল গেল পুড়ে। 

আগুন এবার নামল চারতলায়। আগুন নামে কি করে? সে আমরা কি করে বলি? দমকলের মানুষজনকে জিজ্ঞেস করুন। 

দমকলের কথাটা এমনি এমনি উল্লেখ করা হল না। এর একটা প্রয়োজনীয়তা আছে, গল্পের জন্য। কারণ এডভােকেট আতিকুর রহমানের মাথায় যে মামলার চিন্তাটা এসেছিল, তার মূলে ছিল কে,এস গার্মেন্টস-এর অগ্নি নির্বাপণ সুবিধাদির অনুপস্থিতি। পাচু কর্মকার লেনের কে, এস, গার্মেন্টস-এ যদি আগুন লাগে, আল্লা না করুক -- এডভােকেট আতিকুর রহমান জজের সামনে কথাগুলি যেভাবে বলবেন, তার একটা মহড়াও দিয়ে দিয়েছিলেন মনে মনে - তাহলে দমকল আসবে কিভাবে? রিকশা চড়ে? 

কবির-শহীদ এবং তাদের অনুজ নাবিল, সবাই নেমে পড়ল আগুন নেভাতে। কিন্তু তার আগে যে হট্টগােল, আর নৈরাজ্য, ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি, চিৎকার শুরু হল, তা কহতব্য নয়। ভাগ্যিস সন্ধ্যার শিফট ছিল। এই আধা শিফটে আনুষঙ্গিক কাজগুলােই হয়, সে জন্য শ্রমিক বেশি ছিল না, জনা চল্লিশেক, কিন্তু আগুন লাগলে মানুষ মাত্রই পাগল হয়ে যায় - সব বুদ্ধি বিবেচনা, যুক্তিজ্ঞান লােপ পায়। মানুষ প্রাণ বাঁচানাের জন্য হয় চিৎকার করে, নয় যেদিকে পারে উধ্বশ্বাসে দৌড় লাগায়, নয় ভিড়ের মধ্য দিয়ে বের হতে গিয়ে একটা লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে দেয়। চুপচাপ দাড়িয়ে ঠাণ্ডা মাথায় অবস্থাটা বিবেচনা করছে, এমন একজন মানুষকেও পাবেন না আপনি। আর কে, এস. গার্মেন্টেস এ কাজ করে তাে সরল সাধাসিধা কিছু মেয়ে। হয়তাে ঢাকা এসেছে। মাত্র ছ মাস এবং জীবনের প্রথম একটা এতবড় আগুন দেখেছে। তাদের চিৎকারে পুরনাে ঢাকার পিতলের মতাে আকাশে ঝন ঝন শব্দ হতে লাগল। 

এটি অবশ্য কথার কথা; এমন শব্দ হতে কে কবে শুনেছে, ঢাকার আকাশে? কি নীট যা ফল হল এই অগ্নিকান্ডে দুটি মেয়ে প্রাণ হারাল । একটি আগুনে পুড়ে, একটি ভিড়ের চাপে আর, কি আশ্চর্য, দালানের একটি দারােয়ান ছাদ থেকে লাফ দিয়ে মরল । উমেদ আলীর মতই সে থেতলে, ঘাড়গলা পিঠ ভেঙে, একটা ভেজা বালিশের মত পড়ে রইল রাস্তায়। 

কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক সংবাদ, আগুনে পুড়ে মরল শহিদ, ফরিদ আলীর মেজো ছেলে। 

একজন প্রত্যক্ষদর্শী - প্রত্যক্ষদর্শিনীও বলা যায়, মেয়ে বলে, যদি এই ভাষিক লিঙ্গ বিভাগ মার্জনা করেন – জানাল একজন লােক, তাকে সে আগে দেখেনি, ধাক্কা দিয়ে শহিদকে ফেলেছে আগুনে ! হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর কবিরও বলল, তাকেও ধাক্কা দিয়েছে পেছন থেকে কেউ একজন। কিন্তু পাড়ার লােকজন সেরকম কাউকে দেখল না । তার ভাবল, আগুন লাগার পর যে মহা ধাক্কাধাক্কি শুরু হয় এতে এরকম মনে হতেই পারে কারাে। আর ওই মেয়েটির চোখ তাে ধোয়ায় ফুলে ঢােল হয়ে গিয়েছিল, সে এত পরিস্কার দেখল কি করে? 

না, আপনি যা ভাবছেন, তা নয়। পাড়ার লােক প্রকৃতই মন খারাপ করল। গার্মেন্টসটা পুড়ে যাওয়ায় তারা খুশিই হল, কিন্তু প্রাণহানিতে বিচলিত হল। শহিদ সম্পর্কে যা ই ভাবুক লােকে, তাই বলে এমন অপঘাতে প্রাণ দেবে ছেলেটি? আর এই সরল মেয়েগুলাে, কী করুণ তাদের চিরবিদায়! 


১১. 

এত বড় একটা দুর্ঘটনার পর পুলিশী তদন্ত হবে, এ তাে জানা কথা। কিন্তু পুলিশ কিছুই পেলনা, দুর্ঘটনার আলামত ছাড়া। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট । অথবা অসাবধানে সিগারেটের শেষ অংশ - না, না সিগারেট এখানে কে খাবে? গার্মেন্টসের মেয়েরা খুবই ভদ্র, তারা সিগারেট খায় না, তবে গরম ইস্ত্রি ফেলে রাখতে পারে কাপড়ের ওপর, অনেকক্ষণ, অসাবধানে। বস্তুত আগুনটা শুরু হয় পাঁচতলার আয়রনিং সেকশানে। 

কিন্তু পুলিশের পথ রােধ করে একদিন দাঁড়াল আদিল, ফরিদ আলীর যে ছেলেটি পিতার মতই প্রতিবন্ধী – পাগল বলাটা অশােভন, মােটেও ঠিক নয়; কারণ তার মধ্যে উম্মাদের কোনাে লক্ষণ নেই। স্বল্পবুদ্ধি, হাবাগােবা এসব বলা যায়, যদি ইচ্ছে হয় কারাে বলতে।

এ ছেলেটিই শুধু সৌদী আরব যায়নি, বস্তুতঃ সৌদী আরব কী বা কোথায়, এ সম্পর্কে তার কোনাে ধারণাই নেই। 

আদিল বলল পুলিশকে, রিয়াদই আগুন দিয়েছে তাদের গার্মেন্টস-এ ! এবং কবির। যে বলেছে তাকে ধাক্কা মেরেছ কেউ একজন, সে নিঃসন্দেহে রিয়াদ। রিয়াদই ধাক্কা মেরে শহীদকে আগুনে ফেলে পুড়িয়ে মেরেছে । 

হাসান আলী দারােগা বদলি হয়েছে অন্যত্র, তার জায়গায় এসেছে বদিউজ্জামান খান। বদিউজ্জামান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. এ. পাস করেছে, মনস্তত্ত্ব বিষয়ে । মানুষটাও দয়ামায়াহীন নয়। সে বলল আদিলকে, কিন্তু আদিল, রিয়াদতাে সেদিন ঢাকাতেই ছিল না । সে গিয়েছিল চাটগাঁ, ব্যবসার কাজে। তার সাক্ষ্য প্রমাণ আছে।'

আদিল, স্বল্প বুদ্ধি হওয়ার কারণে, বাকরহিত হয়ে গেল। তার চোখ দুটি শুধু উত্তেজিতভাবে ঘুরতে থাকল। বদিউজ্জামানের মনে পড়ল মনস্তত্ত্ববিদ্যার দু'একটি জটিল পাঠ, যেগুলাের গভীরে সে যেতে সময় পায়নি। তার উৎসাহও জাগল। সে কোমল স্বরে, পুলিশের স্বর যতটা কোমল করা যায়, প্রশ্ন করে, এ ধারণা তােমার মনে এল কিভাবে? 

আদিল প্রবল উত্তেজনার সঙ্গে যুদ্ধ করে, কণ্ঠস্বরকে যতটা সম্ভব বাগে এনে বলল, ‘রিয়াদ চাচাকে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে মেরে ফেলল না? 

চাচা অর্থাৎ উমেদ আলী হাওলাদার। 

‘তুমি জানলে কি করে?” ‘

আমাকে চাচা বলেছেন। তিনি শানে পড়েছিলেন, আমি শব্দ শুনে গিয়েছিলাম দেখতে। দেখি মাথাটা থেঁতলে রক্ত বেরুচ্ছে। 

আদিলের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়। তার নাকে পরিশ্রমের ঘাম জমে। কথাগুলি বলতে গিয়ে যেন তার দম আটকে যাচ্ছিল। 

বদিউজ্জামান তার এই জটিল উত্তেজনা দেখে আর জিজ্ঞেস করে না, অত ভােরে সে ওইখানটাতে কি করছিল । কিন্তু সে আপন মনে মাথা নাড়ে। হতে পারে, খুবই সম্ভব। কারণ, সে ও শুনেছে উমেদ আলী বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন বাদমতলীর চাল আর ট্রান্সপাের্টের ব্যবসা। বাড়িটাও লিখে দিতে চেয়েছিলেন হালিমুন্নেছা গার্লস স্কুল অথবা সলিমুল্লাহ এমিতখানা অথবা যে চায় তাকে। তারও মাথায় কিছুটা সমস্যা ছিল, বিশেষ করে শেষ বয়সে। হয়তাে তিনিও, বলা যায় না, ওই পাগলদেরই একজন ছিলেন । 

কিন্তু আদিল বলে কথা। হাবাগােবা, স্বল্পবুদ্ধি ছেলে। তার কথার কি দাম? কি দেখতে কি দেখেছে। বদিউজ্জামানের চোখের সামনে এইমাত্র ভেসে উঠেছে hallucination বিষয়ে জটিল পরিচ্ছেদটি । আদিল চলে গেল, তার চোখ ঘুরছে ক্রমাগত। 


১২.
পাঁচু কর্মকার লেনের জীবনে স্বস্তি ফিরে এল। গার্মেন্টস বন্ধ, লােকজন নেই ফরিদ আলীর বাড়িতে; শ্রমিক দারােয়ান, পাহারাদার সব হাওয়া । নিজের বাড়ির ছাদ থেকে রিয়াদ দেখে টুইন টাওয়ারের ভূতুড়ে অবস্থা। দেখে তৃপ্তির হাসি হাসে । এবার পরিকল্পনার বাকি অংশগুলি। ধীরে ধীরে এগুনাে যাবে, তাড়া নেই। সে সিগারেট ধরায় এবং নিজের মনে হাসে। আশ্চর্য, উমেদ আলীর মত ছাদের আকর্ষণে পেয়েছে তাকে। প্রায় সন্ধ্যাতেই সে ছাদে বসে। চা খায়। দিনের হিসাব মেলায়। একটা টুলে পা তুলে দিয়ে অলস ভঙ্গিতে সিগারেট খায়, চাঁদ দেখে, পায়চারি করে। আর মাঝে মাঝে নিচের শনিটা দেখে, যেখানে রান্নাঘরের জানালা গলিয়ে অদ্ভুত কিছু আলাে পড়ে ! কেন সে ওই শানটাকে দেখে, আমরা বলতে পারি না। 

১৩. 
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারে, কী বলেন? কিন্তু না, এখানে শেষ করলে বদিউজ্জামানের পড়া মনস্তত্ত্ববিদ্যা, এবং সত্য অথবা বাস্তব, আমাদের ক্ষমা করবে। সামান্যই একটু বাকি, এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলব, আপনিও এক নিঃশ্বাসে শুনে ফেলবেন । 

১৪. 
এক সন্ধ্যায়, ঠোঁটে সিগারেট চাপিয়ে অনেকক্ষণ ছাদে পায়চারি করল রিয়াদ। কে, এস, গার্মেন্টস এ আগুন লাগার প্রায় বছর হতে চলেছে। আজ চাঁদ নেই, কিন্তু বিদ্যুৎ আছে। নিচে শানটাও দেখা যায়, রান্নাঘরের জানালা গলিয়ে উপচে পড়া আলােয়। হঠাৎ একটা চিৎকার শােনা গেল। তারপর ধপ করে মারাত্মক একটি পতনের শব্দ। একটা নরম ভারী বস্তু, যার ভিতরে শক্ত কিন্তু ভঙ্গুর কিছু জিনিসপত্র আছে- যেমন মানুষের শরীর উঁচু থেকে পড়লে যে শব্দ হয়। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে বাড়িয়ে দেখল রহমতী, কাজের মেয়ে । দেখে, সে আকাশ ফাটানাে চিৎকার দিয়ে উঠল। এই ভারী বস্তুটি আর কিছু না, আর কেউ না, সঠিক ভাবে বলতে গেলে - সে আমাদের রিয়াদ। তার ঘাড়গলা ভেঙ্গে গেছে, মাথাটা থেতলে গেছে, সে পড়ে আছে একটা ভেজা বালিশের মত | দরােজার পেরেকের মত মৃত । 

১৫. 
রহমতী এখনও বলে, গায়ে একটা সাদা চাদর জড়ানাে একজন বুড়াে লােককে সে উড়াল দিয়ে চলে যেতে দেখেছে আকাশের দিকে, রিয়াদ নিচে পড়ার পর, ওই শান থেকে। রহমতী বলে; বুড়া সাহেব । অর্থাৎ উমেদ আলী। মার্ক শাগাল বেঁচে থাকলে রহমতীর এই উড়াল দেয়া বুড়াের গল্পে দারুণ আমােদ পেতেন। যারা কুসংস্কারে বিশ্বাস করে, তারা রহমতীর কথা লুফে নেয়। কিন্তু বদিউজ্জামান মনস্তত্ত্ব পড়েছে। সে কি করে তা বিশ্বাস করে? পাড়ার দু'একজন ছােকরা তাকে জানায়, বুন্ধু আদিলকে তারা দৌড়ে বেড়িয়ে যেতে দেখেছে উমেদ আলীর বাড়ির ফটক পেরিয়ে, রহমতীর ওই আকাশ ফাটানাের চিৎকারের খানিকক্ষণ পর । আদিল বলে, আমি রাস্তায় খেলছিলাম। রহমতীর চিৎকার শুনে ভয় পেয়ে পালাই। বদিউজ্জামান জানে, যতবারই আদিলকে জিজ্ঞেস করবে, ওই একই উত্তর পাবে সে । এর নড়চড় হবেনা। স্বল্পবুদ্ধির মানুষ মিথ্যা বলতে পারে না। তারা তাকে জোর দিয়ে বলে, ক্রমাগত বলে। সত্য বলতে বলতে তাদের মুখে ফেনা ওঠে। আদিলকে বিশ্বাস না করে কি পারে বদিউজ্জামান? 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন