শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত'র ভ্রমণ জার্নাল : জঙ্গলের পথে

গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত একটা বিতিকিচ্ছিরি কেলেঙ্কারি যে হবে সেটা যাত্রার আগে কেউই তেমন বুঝতে পারিনি। বেশি আধুনিকতার পাল্লায় পড়লে যা হয় আর কি। রায়পুরে যাবার রিজার্ভেশন শেষপর্যন্ত হলো এপ্রিলের তেরো তারিখে। আনলাকি থার্টিন্থ এ। আবার বাঙলা পঞ্জিকা মতে সেদিনটা ছিল সংক্রান্তি। চৈত্রের শেষ দিন, বছরেরও। ব্যাস, সবে ইডেন গার্ডেন্সের পাশ দিয়ে যাচ্ছি, দুধারেই অনেক পথচারীদের ট্র্যাফিক পুলিশ এদিক থেকে ওদিক টানটান করে দড়ি ধরে দাঁড় করিয়ে রেখে রাস্তায় গাড়ি পার করাচ্ছে। আই পি এল এর খেলা ছিল, কলকাতা নাইট রাইডার্সের আর কার জানি। এইখানেই মেদিনী হল কম্পমান।

আমরা এসি গাড়িতে, তবু মনে হল কি একটা হল। বাঁদিকে কি একটু সরে গেল গাড়ি? ড্রাইভার বিড়বিড় করে কি যেন বললেন, বুঝলাম না। এদিক-ওদিকের গাড়ি থেকে শুনলাম ‘ভূমিকম্প’ হল এক্ষুণি। সময়মতই পৌঁছলাম হাওড়া স্টেশন। আমরা দুজন। আমি আর আমার স্বামী-দেবতা উৎপল। আমাদের এক বন্ধু-দম্পতী আর তাঁদের ছেলের আসার কথা বাগুইহাটি থেকে। তাঁরা এখনও এসে পৌঁছয়নি। সময় আছে এখনও আধ ঘন্টা। ট্রেন, মুম্বাই মেইলে উঠে গুছিয়ে বসেছি, আমাদের ওপর-নিচ মিলিয়ে পাঁচটা বার্থ। আর পাঁচ মিনিট বাকি, কিন্তু ওরা মানে আশিসদারা তো এখনও এলো না। ফোনে বলল ‘এইতো এসে গেছি, আর পাঁচ মিনিট ’। ট্রেনের পেছন থেকে সবুজ ঝান্ডা উড়ছে, দেখে আবার ফোনে বলি- আশিসদা...। ওদিক থেকে উত্তেজিত হয়ে আশিসদা বলে ওঠে- টেনে ধরে থাকো, টেনে ধরে থাকো’। 

গলা শুকিয়ে কাঠ তাও চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করি- কি? কি টানবো? 

ওদিক থেকে ভেসে আসে- চেন ... চেন, আমরা এখনও হাওড়া ব্রিজেই আটকে আছি।’ 

দরজার কাছ থেকে রেল-পুলিশকে অনুরোধ করি একটু দেরি তে ট্রেন ছাড়ার আর উত্তরে শুনি – ‘না-মুমকিন।ট্রেন ক্যায়সে রোকুঁ ম্যাডাম?’ 

আমি মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করি- ‘ তাহলে আমি চেন টানছি।’ 

পুলিশটি আমায় ঠিক আমির খানের ‘এ, কেয়া বোলতি তু’ স্টাইলে বলে ওঠেন – ‘ এ কেয়া বোলতি হ্যাঁয়?’ আর তারপর আর একটু হেসে বলেন- ‘ চেন খিঁচে দেখুন না, আপকো ভি হামাদের অফিসে ধরে নিয়ে যাব, অঔর ইধর ট্রেন ভি ছুটে যাবে। হা হা হা। বন্ধুদের সাথে আপনিও যেতে পারবেন না।’ 

বলতে বলতেই ট্রেন দুলে উঠে চলতে শুরু করে। আমি ঢুকে নিজের জায়গায় বসতেই ওপরের খালি বার্থ গুলো যেন আমায় দেখে হেসে উঠল। 

রায়পুরে পৌঁছই সকাল সাড়ে দশটায়। ট্রেন থেকে নেমেই সারা প্ল্যাটফর্মের ওপরে তাকিয়ে দেখি বৃষ্টির মত কিছু একটা হচ্ছে নিচে আমাদের গা-পর্যন্ত কিন্তু জল আসছে না। সুবীরদা আমাদের নিতে এসেছেন, জানতে চাই এটাকে কি বলে।স্প্রিংক্লার চলছে। আসলে ছত্তিসগড়ের এই সব জায়গায় গরমে এত লু বয় যে, প্রতীক্ষা-রত যাত্রীদের স্বস্তির জন্য এই ব্যবস্থা। স্টেশন থেকে বেরিয়ে গাড়ি পর্যন্ত আসতেই বুঝলাম গরম কাহারে কয়। ও আসল কথাই তো বলা হয়নি। আশিসদারা মুম্বাই মেইল মিস করার পর কার পুণ্যবলে জানিনা, একটু বেশি খরচা-পাতি করে পরের আজাদ হিন্দ এক্সপ্রেসে রিজার্ভেশন পায় আর দেড় ঘন্টা পরেই ওরাও এসে পড়ল বলে। 

পরের দিন সকাল সকাল বেরোবো অনেক প্ল্যান করেও শেষপর্যন্ত আমরা রায়পুর ছাড়ি সকাল ন’টা নাগাদ। এবার একটা বড়-সড় গাড়ি তে সবাই হৈ হৈ করতে করতে। এসি খুব স্ট্রং করেই চালানো ছিল কিন্তু রোদ্দুরের দিকে যারা বসেছে তারা উশখুশ করছিল, পরে জানলার কাঁচে কাগজ লাগানো হয়। আমি সবসময় জানলার ধার পছন্দ করলেও এখন সোনা-মুখ করে গাড়িতে উঠেই মাঝখানে বসে পড়েছি, যাতে গাড়ি যেদিকেই ঘুরুক আমার গায়ে রোদ লাগবে না। আমাদের ড্রাইভার ‘আসিফ’, আমরা যথারীতি ‘আসিফ ইকবাল’ করে ওকে ডাকতে লাগলাম। 

আমাদের গন্তব্য মধ্যপ্রদেশের পাঁচমাড়ি । বাঁ দিকে গোন্ডা, ভিলাই কে রেখে আমরা হাই-ওয়ে দিয়ে ছুটে চলেছি। ছত্তিসগড়ে গাছ-পালা খুব কম। রুক্ষ-সুক্ষ চেহারা প্রকৃতির, বিশেষ করে এই গ্রীষ্মের দাবদাহে। সাড়ে দশটা কি এগারো’টা বাজতেই রাস্তা ঘাট জনশূন্য। গাড়ি কিছু যাচ্ছে। আর বাইক/স্কুটারে যারা যাচ্ছে বোঝার উপায় নেই মেয়ে না মদ্দা। সকলেই ওপর থেকে একটা স্কার্ফ বা পাতলা চাদর দিয়ে নাক, মুখ, মাথা উর্ধাঙ্গ ঢেকে আর চোখে পরা রোদ-চশমা । বুঝলাম হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচতেই এই পর্দানসিনতা। রাস্তার বর্ণনা আলাদা ভাবে করার কিছু নেই আজ। রাস্তা খুবই মসৃণ। ছোট, বড়, মাঝারি গ্রাম-গঞ্জ পেরিয়ে, মন্দির-মসজিদের পাশাপাশি সহাবস্থানে আরাম-চোখ বুলিয়ে আমাদের গাড়ি প্রায় ১২০/১৩০ কি.মি. প্রতি ঘন্টার দ্রুততায় এগিয়ে চলেছে। 

মধ্যপ্রদেশে ঢোকার আগে একবার যেন মহারাষ্ট্রেরও এক ছোট গ্রাম ছুঁয়ে গেল আমাদের পথ। তবে গাড়ি থেকে নেমে যে একটু চোখ বোলাব তার সাহস হয় না। আমাদের কাছে যে পর্দা গুলো নেই। ঠান্ডা-গাড়ি থেকে নামলেই জানি চোখ, নাক, কান, মুখ এবং সমস্ত রোম-কূপ দিয়েই দারুণ অগ্নিবাণের আক্রমণ আসবে। বাবা! দরকার নেই। মধ্যপ্রদেশে প্রবেশের সাথেই গাছ-পালার দেখা তো মিললোই ধীরে ধীরে তা যে ঘন হয়ে আসছে তাও বেশ মালুম হচ্ছে। দূরে দেখা যাচ্ছে সাতপুরা পর্বতমালা। ছোট ছোট পাহাড়, পাথুরে খানিক। রাস্তার পাশে কোথাও কালো এক বিশাল পাথর পড়ে আছে। জানি না কোন যুগে এই প্রস্তর-খন্ড মূল বড় কোনো পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়েছে না কি এই কালো পাথরটি নিজেই বহু কাল আগে এক বৃহৎ পাহাড় ছিলো, কালের অবক্ষয়ের সাথে এও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। 

এদিকে সন্ধ্যের আঁধার নামে বাঙলা’র তুলনায় বেশ দেরিতে। সাতটার কাছাকাছি। কিন্তু সাড়ে ছটার পরই যেন কেমন আলো কম লাগলো। প্রবাদবাক্যি – ‘যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যে হয়’ টি কত বড় সত্যি তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। রাস্তার পাশে পাশে মাঝে মাঝেই বাঘের ছবি দেওয়া সাইন-বোর্ড চোখে পড়ছে। বুঝলাম তেনাদের এলাকায় আমাদের প্রবেশ ঘটেছে। আসিফ ইকবালের বয়স বেশি না। সে প্রথম থেকেই রাস্তা ঘাটে লোকজনদের জিজ্ঞেস করতে বললেও কিছুতেই জিজ্ঞেস করছে না। রাস্তার ওপরের তীর চিহ্ন দেওয়া ডিরেকশনই ফলো করছে। 

বসতি-এলাকা এবং লোক দেখা যাচ্ছে খুবই কম। ভাবছিলাম কলকাতায় সবাই এত গায়ে গায়ে থাকি এখানে এসে ঘর বেঁধে থাকলেই তো হয়। খোলামেলা পরিবেশে। সেকথা বলতে গাড়ির পুরুষেরা বালোখিল্যের কথা জ্ঞান করে উত্তর দিল না। তারা সবাই একবার নামার জন্যে খুবই উশখুশ করছে বুঝলাম। জিন্স পরিহিত লম্বা লম্বা ঠ্যাংগুলি এবার একবার সোজা না করলে আর কোনোদিনই যে সোজা হবে না এটা তারা বেশ নাকি বুঝতে পারছে। এদিকে পাশের পরিবেশ গাছ, ঝোপ আর ফাঁকা ফাঁকা জঙ্গলে ভরা। তবে রাস্তায় একটু দূরে দূরে আলো আছে। দু বার দেখলাম হরিণ দাঁড়িয়ে রাস্তার পাশে। গাড়ির আওয়াজে শরীর, কান সব খাড়া করে একবার দেখে আবার ঘাড় নামিয়ে ঝোপের দিকে চলে গেল। ঘড়িতে সময় রাত প্রায় আটটা। ঠিক হলো ওঠা নামা মিলিয়ে ঠিক পাঁচ মিনিট গাড়ি থামবে। নামবে শুধু ছেলেরা। গাড়ি আবার হু হু করে এগিয়ে গেল। 

বেশ খানিকক্ষণ পর একটা ছোট দোকান দেখে আমরা এবার জানলার কাঁচ নামিয়ে জিজ্ঞেস করি ‘পাঁচমাড়ি আর কতদূর? রাস্তা যে শেষই হচ্ছে না।’ উত্তরে যা শুনলাম তাতে দূরের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে মনে মনে কেঁপে উঠলাম। আমরা নাকি ভুল রাস্তায় অনেকটা এসে গেছি, এদিক দিয়েও গন্তব্যে যাওয়া যাবে কিন্তু সে রাস্তা একেবারেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কাঁচা রাস্তা, হারিয়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশি।অগত্যা যে রাস্তা দিয়ে এলাম আবার গাড়ি ঘুরিয়ে ওই রাস্তায়ই ফিরে যাচ্ছি। খানিকটা এগিয়েই গাড়ি আস্তে হয়ে যেতে সামনে তাকাই সবাই। ঠিক এইখানে একটু আগে ছেলেরা নেমেছিল, সামনে কালো কালো কি রাস্তার ওপর? সেই পাহাড়ের কালো পাথর পড়ল নাকি? দশ মিনিট আগে তো কিছু ছিলো না। ‘সশশশ’ করে ড্রাইভার আমাদের চুপ করিয়ে দিয়ে চুপিচুপি বলে – ভালু । পুরা ফ্যামিলি আয়া হ্যায়। 

আমরা তো হাঁ করে দেখছি সামনে। গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে আলো নিভিয়ে। তিনজন, মা-ভালুক তার বাচ্চা নিয়ে, আরেকটি বেশ বলিষ্ঠ সেটি নাকি পুরুষ-ভালুক, আর এটিই যদি বিরক্ত-বোধ করে তাহলে আমাদের ছেড়ে কথা কইবে না। আসিফ ফিশফিশ করে বলে বাঘ এখানে খুব একটা ডেঞ্জার নয় কিন্তু ভালু খেপলে রক্ষে নেই। আমার বাঁদিক ডানদিকে দুই বন্ধুর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বুঝলাম আমি যা করছি ওরাও ঠিক তাই করছে। আমরা সবাই শ্বাস বন্ধ করে কতক্ষণ থাকতে পারি তার প্র্যাকটিস শুরু করে দিয়েছি। সেই যে ছোটবেলায় পড়েছিলাম না, দুই বন্ধুর মধ্যে থেকে যে গাছে চড়তে পারেনি সে মড়ার মত নিঃশ্বাস বন্ধ করে নিচে শুয়েছিল, মরা মানুষকে তো ভাল্লুক কিচ্ছুটি বলে না। গাড়ির মধ্যেই জানি না কতক্ষণ মড়া হবার প্র্যাকটিস করেছিলাম, গাড়ি স্টার্ট নিতেই সামনে তাকিয়ে দেখি রাস্তা ক্লিয়ার। 

পাঁচমারিতে আগেও আমি এসেছি একবার। জঙ্গল আর পাহাড়ে ঘেরা সুন্দর এক ট্যুরিস্ট প্লেস। পাহাড়, জঙ্গলে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো এই ছোট ক্যান্টনমেন্ট বৃটিশ-আমল থেকেই খুব আকর্ষনীয়। সেন্ট্রাল প্রভিন্সের এটি ছিল গ্রীষ্মকালীন রাজধানী। অবশ্য পাঁচমারির ইতিহাস বলছে, যে সে আরো পুরোন সেই মহাভারতের যুগের। পাঁচ অর্থাৎ ৫ আর মারি(হ) অর্থাৎ গুহা। পাঁচটি গুহা। বলা হয় পঞ্চপান্ডবের সেই অজ্ঞাতবাসকালে তাঁরা এখানে একটি পাহাড়ে পাঁচটি গুহায় কিছুদিন নাকি লুকিয়ে ছিলেন। সেই পান্ডব-কেভ টুরিস্টদের জন্য একটি অন্যতম স্পট এখানে। আমার ভালো লাগছে প্রাকৃতিক এই চারধার। বন-বনস্থলির প্রাচুর্য। উদ্ভিদরাজি আর বন্যপশুর নিভৃত বাস এইখানেই। দুটি পাহাড়ের মাঝামাঝি সবুজ উপত্যাকা নয়নে এক আরামের কাজল পরিয়ে দেয় আবার তার পাশে গভীর এক খাদ এঁকেবেঁকে নেমে গেছে সীমাহীন কোন মৃত্যুপুরীর অজানায় যেন। আছে মহাদেবের জটার মত পাহাড়, নাম জটা-শঙ্কর। 

পাহাড়ি ঝর্ণা বী ফলস নেমে এসেছে ওপর থেকে, ওখানে গেলে তার থেকে গুঞ্জন আসে মৌমাছির বিন বিন সুরের মত। এখানে আমাদের থাকার যে আস্তানাটি বুক করেছিলাম, সেটি ছিল আমার বড্ড পছন্দের। ‘চম্পক ভিলা’। এটি সেই ল্যান্সডাউন সাহেবের কিলা ছিল, তিনিই থাকতেন। বড় বড় গাছ দিয়ে ঘেরা এই ভিলার লনটি তে বসলে আমার আর উঠতে ইচ্ছে করত না। কিন্তু উঠতে হল দেড়দিন পরেই কানহা জঙ্গলের উদ্দেশ্যে। এবার বেরোই একেবারে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরেই। ছয় থেকে সাড়ে ছ ঘন্টা লাগবে বলে শুনেছি। 

আবার যাত্রা। এবার আরো গহিন জঙ্গলে।কানহা টাইগার রিজার্ভ ফরেস্ট মধ্যপ্রদেশের দুটো জেলার মধ্যে পরিব্যাপ্ত। মান্ডলা আর বালাঘাট। ১৯২০ বর্গ কিমি জোড়া এই অরণ্য চারটি জোন’এ ভাগ করা। বালাঘাট জেলার খটিয়া এন্ট্র্যান্স গেট দিয়ে যাওয়া যায় তিনটি জোন – কিসলি, কানহা ও সারহি জোন। এবং মুক্কি এন্ট্র্যান্স গেট দিয়ে ঢোকা যায় মুক্কি জোন’এ। আমাদের গন্তব্য খটিয়া মুখ। দুপুরের রোদ যখন তার নখ দাঁত সব নিজের ভেতর টেনে নিয়ে আবার কাল সকালের জন্য গুছিয়ে রাখছে আর ঠিক যখন আমাদের মনটা চা - চা করে হেদিয়ে উঠছে তখন আমাদের গাড়িটা যে রাস্তাদিয়ে যাচ্ছিল তার দুধারে বিশাল বিশাল সব খেত। শুকনো খেত, শষ্য সবই প্রায় কেটে নেওয়া হয়েছে। তাই অনায়াসে চোখ চলে যায় অনেক দূরে, সেই দিগন্তে যেন। সেই অনেক দূরে খানিক পরে দেখলাম দিগন্তরেখা জুড়ে যেন আগুনের ঝলকানি। গাড়ি এগিয়ে চলে দ্রুতগতিতে। 

এবার আগুন যেন আরো কাছে। অন্ধকারও নেমে আসে। জনমনিষ্যি নেই কোথাও আর আমরা যেন ঢুকে পড়ছি এক আগুনের গহ্বরে। একী রে বাবা! বনের দাবানল? তা কি এখানেও ছুটে আসছে? এদিকে ড্রাইভার আসিফের দেখছি কোনই বিকার নেই, শেষে আর থাকতে না পেরে বলে উঠি- ‘ভাই আসিফ আমরা ঐ সার্কাসের আগুনের ভেতর দিয়ে ছোটাছুটির খেলা জানি না গো। এ তুমি আমাদের কোথায় নিয়ে চলেছো ভাইটি?’ আসিফ গম্ভীর ভাবে জবাব দেয় – ‘ঝুমচাষ’। এখানকার চাষীরা একটা শষ্য তুলে খেত কে পুড়িয়ে তৈরি করে নিচ্ছে পরের শষ্যের জন্যে। ধীরে ধীরে আমরা বাঁশ বনের ভেতরের রাস্তায় এসে পড়ি আর তার ভেতরদিকে বড় বড় শাল গাছের জঙ্গল। অন্ধকারও এক ধাক্কায় বেড়ে গেল অনেকখানি। বেশ খানিক ভেতরে ঢুকে গাড়ির আলোয় দেখি সমকোণিক একটা বাঁকে বাইকে একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। তিনি নিতে এসেছেন আমাদের। 

আমাদের রিসর্টের পরেই জঙ্গল এরিয়া। ঠিক পাশেই একটা পুকুর তাতে অনেক বন্যপ্রাণী জল খেতে আসে, গেট থেকে নিজেদের কটেজে যেতে যেতেই তা শুনে নিলাম। বেশ গা ছমছমে পরিবেশ এই রিসর্টটির। জংলি ঘাস চারধারে, রাতে আলো আছে কিন্তু বড্ডই স্তিমিত। রাতের খাবার খেতে সেই জঙ্গুলে ঘাস পেরিয়ে ডাইনিং হলে যাবার সময় আমরা সবাই মাঝখানে থাকতে চাইছি, কেউই আর ধার দিয়ে হাঁটতে চাইছি না। 

খাওয়ার পর রিসর্টের ম্যানেজার আমাদের বলে দিলেন রাতে কোনো ভাবেই যেন আমরা কটেজের দরজা না খুলি। এমনকি বেয়ারারাও যদি বখশিশের লোভে কোনো জন্তু দেখানোর প্রলোভন দেয় তা যেন আমরা এড়িয়ে যাই। খুব ভোরে অজানা কোনো পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে, উঠে জানলার পর্দা সরিয়ে দেখি খানিক আলো ফুটেছে। এবার নিশ্চয়ই কটেজ থেকে বেরিয়ে সামনেটা দেখা যাবে। বারান্দায় বেরোনোর সাথে সাথেই একটু দূরে পিলে চমকানো একটা কিসের ডাক শুনি। সাহস করে আমরা রিসর্টের গেটের কাছে যাই, দরোয়ান জানায় এই রিসর্টের একশ মিটারের মধ্যেই যে পুকুরটি, সেখানে এইমাত্র এসেছিল এক বাঘিনী জল খেতে, ফেরার সময় এক হুঙ্কার দিয়ে জঙ্গলের ভেতরের দিকে চলে যায়। আর এখন গেটের ঠিক বাইরে মহুয়া গাছগুলির নিচে দলে দলে চিতল হরিণ এসেছে মহুয়া ফুল খেতে। তবে এর পরেই স্থানীয় কিছু মেয়েরা মহুয়া কুড়োতে চলে আসায়, হরিণগুলোও চলে যায়। এত কাছ থেকে বাঘ দেখার সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় সবার ই মুখটা ব্যাজার হল যদিও ম্যানেজার ঘুম থেকে উঠে আমাদের আশ্বস্ত করেন যে জাংগাল সাফারি তে বাঘ আমরা দেখবই। 

কানহা জোন’এ ঢুকি দুপুর সাড়ে তিনটে প্রায়। ওয়েলকাম জানায় হুটোপুটি করা এক দঙ্গল ইয়া বড় ল্যাজ চাকার মত গোল করা হনুমান। বাচ্চাগুলোর ফুর্তি দেখে কে! আমরা আছি দুটি জিপসিতে, দুটিতেই আলাদা আলাদা গাইড দিয়ে চলেছেন নানা তথ্য।আর আমদের চোখের সামনে তরঙ্গায়িত ঘন বনরাজির নিভৃতি, কোথাও সবুজ তৃণভূমি আর হঠাৎ টিলা উঠে গেছে জঙ্গলের পাশে কোথাও। বারাশিংঘার সাথে আবার দেখি কটা বাইসন। এক মনে সবাই ঘাস খাচ্ছে। ময়ূরের ডাক শোনা যাচ্ছিল ঢোকার প্রথম থেকেই, এবার দেখি ওমা! একেবারে আমাদের সামনে পেখমে অপার সৌন্দর্যের ঢেউ আর সঙ্গে সেই জোরাল ডাক। একটু এগিয়েই দেখি এক শেয়াল মশাই রাজার চালে চলেছেন আমাদের গাড়ির আগে। কোনো ভয় ডর নেই। সবাই জানে যে এ জায়গা হচ্ছে তাদের চারণভূমি, এইসব গাড়ি-টাড়ি যেগুলি যাচ্ছে তাদের পাত্তা না দিলেও চলে। 

একটু ছাড়া ছাড়াই দেখি প্রায় চার ফুট পাঁচ ফুট উঁচু সব উইয়ের ঢিবি। এতদিন তো জানতাম যে ভাল্লুকের প্রিয় খাবার মহুয়া, মধু এইসব। এখন শুনলাম ভাল্লুকের আরেকটি প্রিয় খাবার নাকি এই ঢিবি ভেঙ্গে তার ভেতরের উইপোকা। সবই দেখছি কিন্তু আমাদের মন তো পড়ে আছে সেই রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার দেখার প্রতিই। হ্যাঁ এখানের বাঘ ও সেই বাঙলার বাঘই। লেপার্ডও আছে। জঙ্গলের ভেতরে এতক্ষণ গাড়ি আস্তে আস্তে চলছিল হঠাৎ ড্রাইভার কান খাড়া করে কি একটা শোনার চেষ্টা করে, তারপরই বোঁ করে গাড়ি ঘুরিয়ে ‘ অব দেখিয়ে জিসকে লিয়ে আয়েঁ হ্যাঁয়’ বলে ধূলো উড়িয়ে প্রচন্ড জোরে সোজা জিপসি ছোটালো। 

রাস্তা ধূলোয় ভরে গেছে, নাকে রুমাল চেপে ধরি আমরা সবাই, জিপসি গুলোর তো হুড খোলা। পরপর জিপসি গাড়িগুলো ছুটছে একই দিকে। বাঁদিকে একটা খোলা মাঠ জংলি ঘাসে ছেয়ে আছে , ওদিকে কোনায় একটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো জলাধার, তাতে পাইপলাইন ফিট করা যা কি না আমরা জঙ্গলে খানিক দূরে দূরেই বানানো আছে দেখেছি, বন্যপ্রাণীদের জল খাবার জন্য। গাড়িগুলো সব স্থীর দাঁড়িয়ে গেল সারি দিয়ে, আমাদের আগে একটা জিপসি বাকি সব পেছোনে। ডানদিকে অর্জুন আর শাল গাছের বনটার পরেই একটা টিলা উঠে গেছে। যে পথে গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে তার পাশেই শুকনো পাতা পড়ে আছে। চুপ করে আমরা বসে আছি, নির্দেশ মতো মোবাইলের কণ্ঠ রোধ করেছি সেই গেটেই, সে এখন শুধু ক্যামেরা। খুব কাছেই ময়ূর ডেকে চলেছে আর বাঁদিকের ঘাস খাওয়া ভুলে কটা চিতল হরিণ ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের জিপসি গুলো ছাড়িয়ে তাকিয়ে আছে ডানদিকের গাছগুলোর দিকে। 

এরপরই প্রতিটি গাড়িতে বারবার বারণ করে দেওয়া সত্বেও গুঞ্জন শোনা যায় আর সাথেই শুকনো পাতায় খড়র খড়র করে ধীর পদক্ষেপ শোনার সাথেই সেই হলুদ ঝলকানি বেরিয়ে আসে আমাদের একেবারে সামনে। এই সেই মুন্না বাঘ। ঠিক কপালে ইংরিজি C A T ছাপ দেওয়া। ‘মাসিকে মানে বেড়ালকে খুব ভালবাসে বুঝতে পারা যাচ্ছে ‘ পাশথেকে সুবীরদা আস্তে করে বলে ওঠে। আমার অবস্থা এইসব কথা শোনার আর নেই, ভিডিও ক্যামেরাটিও ড্রাইভারকে দিয়ে বললাম – তুমি তোলো ভাই আমার।’ 

মুন্না রাস্তায় নেমে একবার দাঁড়ানো জিপসিগুলোকে যেন জরিপ করে নেয়। প্রথম জিপসিটি ছাড়িয়ে একি আমাদের গাড়ির দিকে এগোচ্ছে কেন? আমি ভুল করে ‘ও মা শেরাওয়ালি’ গানটির জায়গায় মনে মনে গাইতে শুরু করি ‘ তেরা রামজি করেগা বেরা পার উদাসি মন কাহে কো ডরে’। মনে মনে গান গাইলেও যে গলায় এত কম্পন হয় সেদিনই প্রথম জানলাম। নড়া-চড়া না করে আমরা মাথা নিচু করে আছি, আড়চোখে দেখলাম মুন্না ড্রাইভারের দিকের সাইড মিররে নিজের কানের পাশটা চুলকে নিচ্ছে। ঠিক তখুনি টিলার দিক থেকে আবার একটা হুঙ্কার ভেসে আসে আর সঙ্গে সঙ্গে মুন্না তার এতক্ষণের গুডবয় মার্কা চেহারা পালটে রাগী একটা মুখ করে ফেলে ইয়া বড় সব দাঁত বার করে গরর গরর করে টিলার দিকে তাকায় মিনিট খানেক। তারপর হেঁটে বাঁদিকে মাঠে নেমে হরিণগুলোকে একটুও তাড়া না করে যেদিকে বড় জংলি ঘাস সে দিকে চলে গেল। 

মুন্নার গল্প আমরা শুনে এসেছি রিসর্ট থেকেই। প্রায় বছর ১২-১৩ বয়েস। এইখানটা ওর এলাকা। সঙ্গিনী আছে তিন চারজন। কিন্তু পুরুষ বাঘ ও একা, প্রায় ২৫ কিমি এলাকা জুড়ে মুন্নার আধিপত্য। এদিকে গাইড বললেন যে ওদিকের হুঙ্কারও নাকি এক পুরুষ বাঘেরই। খেয়াল করলাম গাইড, ড্রাইভার দুজনেরই মুখ বেশ গম্ভীর হয়ে গেছে। পেছনের গাড়ির দিকে তাকালেন তাঁরা। আর দেখলাম খুব আস্তে আস্তে গাড়ি পেছনের দিকে চলতে শুরু করল। প্রতিটি জিপসিই পিছোচ্ছে। কিন্তু খুব ধীরে কেমন যেন পা টিপে টিপে। তারপরই ডানদিকে দেখি শাল গাছের আড়াল থেকে আবার একটা বড় হলুদ কালো ডোরা মুখ। কিং ফিশার, এই বাঘটির বয়েস আট বছর। 

মুন্নার ব্যবহার খুবই বন্ধুত্বপুর্ণ হলেও কিং ফিশার কিন্তু এখনও অতটা ফ্রেন্ডলি নয় গাইডদের কাছে। এছাড়াও গাইড আশঙ্কা করছেন বড় কোনো বিপত্তির কেননা কিং ফিশার নাকি এ এলাকা দখল করতে চাইছে। পিছোতে পিছোতে বেশ কিছুটা এসেই আবার ব্যাঘ্র-নিনাদ শুনি আর কিং ফিশারকে বেশ ছুটে মাঠের দিকে এগোতে দেখি। বাঘ চুপটি করে খানিক দূর থেকে চলে যাবে আর আমরা বীর দর্পে ক্লিক ক্লিক করব এমনটাই হবে ভেবে এসেছিলাম কিন্তু এযে দুই পুরুষ-ব্যাঘ্রের ভয়াবহ শক্তি-প্রদর্শন লীলা। 

আমরা অবশ্য আর কিছু দেখার সুযোগ পেলাম না কারণ ওখানে এখন থাকলে যেকোনো মুহূর্তে বিপদ নাকি ঘনিয়ে আসতে পারে, তাছাড়া জায়গা খালি করে দিতে হবে এক্ষুণি। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেরা আসবে, ডোমেস্টিক হাতি চড়ে ট্রেন্ড কর্মীরা আসবেন বাঘেদের ডুয়েল থামাতে। এই টাইগার রিজার্ভ ফরেস্টে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মাথার চেয়ে বাঘের মাথার দাম অনেক বেশি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন