শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

মোহাম্মদ ইরফানের গল্প : বেড়া



"তোক কইছি লালীর ন্যাজে ন্যাজে থাকপি। তুই ওক পানিত নামালি কেন হারামজাদী?“

করিমের চিৎকারে ছুটে আসে নসিমন। মেয়ে করিমনের চুলের মুঠি ধরা করিমের হাতে। একনাগাড়ে বকাবকি করে যাচ্ছে --
“কেঙ্কা করিয়া নদীত গেল? এত টাকা দিয়া কিনলু? দুধ বেচি টাকা শোধ দিই। এহন কি হবি? "

করিমনের পাংশু মুখ দেখে মায়া হয় নসিমনের। ধরলার বন্যায় ডুবে, ডায়রিয়ায় ভুগে পরপর দুছেলের মৃত্যুর পর কোল আলো করে আসা এই মেয়ে। বাবা-মায়ের নাম মিলিয়ে নাম রেখেছে করিমন। গাঁয়ের অন্য মেয়েদের তুলনায় কিছুটা বেশী আদর-যত্ন পেয়েই বড় হয়েছে করিমন। কিশোরী কন্যার আবদার মেটাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে বাবা-মা দুজনেই; যদিও সাধ আর সাধ্যের মিলন ঘটে কদাচিৎ।

কি এমন ঘটল যে এত আদরের মেয়েকে এভাবে বকাবকি করতে হচ্ছে? বোঝার কোন চেষ্টা না করেই মেয়ের পক্ষ নেয় মা, "দুইদিন পর সাঙ্গা হবি, এত বড় চ্যাংরির গাওত কেউ হাত দেয়? ছাড়েন অরে।" 

মেয়েকে স্বামীর হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় নসিমন স্বামীকে - "কি করনু মোর ছাওয়াল?" 

"কি করনু?” হাঁপাতে হাঁপাতে জবাব দেয় করিম – “তোর আদরের মাইয়া লালীক বর্ডার পার করি দিছে?"

ঘটনার সূত্রপাত সেদিন দুপুর নাগাদ। গ্রামের প্রান্তে নিজেদের গাভী লালীকে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিল নসিমন। 



বছর দেড়েক আগে মাসিক গোহাটা থেকে হাজার দশেক টাকা দিয়ে এই দুগ্ধবতী গাভীটি কিনেছিল করিম । টাকাটা অবশ্য নসিমনের, ধার হিসেবে পেয়েছে ঋণ বিতরণ অফিস থেকে। সাপ্তাহিক কিস্তিতে শোধ দেয়ার শর্তে। ঋণের লায়েক হতে দুমাস ধরে নিয়ম করে পাপিয়া লিডারের ঘরে হাজিরা দিয়েছে নসিমন । নানান রকম জ্ঞানের কথা শুনেছে, সই দিতে শিখেছে। নসিমনের এত কষ্টের কামাই এক কথায় দখল করে নিতে চেয়েছিল করিম, 'তুই ঘরত থাকি টাকা শোধ দিবি কি করিয়া?' পাপিয়ার কঠিন নজরদারিতে কিছুটা পেছোয় করিম, শেষমেশ রাজী হয় গরু মোটা তাজা করণের যৌথ পারিবারিক প্রকল্পে। 

পাপিয়াই খোঁজ দিয়েছিল গোহাটার। মাসের প্রথম জুমাবার বড় হাট। দূর-দুরান্ত থেকে গো-মহিষাদি নিয়ে হাজির হয় বেপারীরা। ওপার থেকেও আসে সতেজ বলদ আর সরস গাই, কাঁটাতার পেরিয়ে, কানুন মাড়িয়ে। ভারত-মাতার নিষেধাজ্ঞা লক্ষীর মুখ দেখে ভুলে যায় ওপারের রক্ষী। এপারের লোকপালিত প্রহরীও বশ হয় গৃহপালিত চতুস্পদীর মতই। তবে ঘাসে নয়, ঘুষে। 

পাপিয়ার টেন্ডেলকে নিয়ে আসায় খুব সহজেই একটি দুধেল গাই কিনে ফেলে করিম। দাম-দস্তুর করতে গিয়ে ব্যাপারীদের হাতে অপদস্থ হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ায় খুশিই হয় করিম। টেন্ডেল মন্ডলের সাথে ব্যাপারীর আদান প্রদান নিয়ে মাথা ঘামায়না মোটেও। দুদিনের বাছুর ছেড়ে আসতে গাভীটির মনের কি অবস্থা হয়েছিল বোঝার কোন উপায় ছিল না করিমের। তবে কিনে আনার পর থেকে তার আর তার মেয়ে-বৌয়ের গভীর যত্ন-আত্তিতে গাভীর কষ্ট কিছুটা হলেও ঘুচেছে। লালচে-খয়েরী রঙের গাভীকে করিমন আদর করে ডাকে লালী। 

প্রতিদানে লালীও অনেক দিয়েছে, অর্থে-স্বাস্থ্যে-অবস্থায়। লালীর দুধে পুষ্ট হয়েছে করিমনের বাড়ন্ত শরীর, লালীর দুধের সরের আভা যেন উজ্জ্বল হয়ে ফুটেছে উচ্ছল কিশোরীর মুখে গায়ে। দুধ সমবায়ের গাড়ীওয়ালার কাছে দুধ বিক্রি করে যা পায় তাতে নসিমনের ঋণ শোধ করেও কিছুটা থেকে যায় হাতে। করিমের দিন-মজুরি আর নসিমনের কচুশাক কুড়ানিতে দু-একদিন ছেদ পড়লেও চিন্তা করতে হয় না আজকাল আর। লালীর গোবর শুকিয়ে চুলো জ্বালায় নসিমন, কুড়োনো শাকের বোঝা এখন আরো ভারী করতে হয় না শুকনো পাতা আর ডালে। 

লালীকে মাঠে-ঘাটে ঘুরিয়ে ঘাস খাওয়ানোর দায়িত্বটা নিজে যেচেই নিয়েছে করিমন। গরু চরানোর ছলে হাটে-মাঠে বেড়ানোর সহজ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইবে কোন কিশোরী? নসিমনও মেনে নিয়েছে আদুরে মেয়ের আবদার, স্বেচ্ছায় কাঁধে নিয়েছে জাবনা মাখানো, গোসল দেয়া, গোবর সাফ আর শুকোনোর মত কঠিন কাজগুলো । গরীবি শরীরের ছিরি-ছাঁদ কেড়ে নিলেও মায়ের মনের মাধুর্যে টান পড়ে নি এতটুকু।



করিমনদের গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে নদী। ওপারের জলঢাকা এপাশে এসে হয়েছে ধরলা। নদীর দুধার থেকেই উঠে গেছে বেড়া। কাঁটা দেয়া মোটা মোটা তার দিয়ে তৈরী বেড়া দুই নদীকে পৃথক করতে না পারলেও পৃথক করেছে দুই দেশকে, দুই দেশের মানুষকে। কখনো কখনো বেড়ার পাশ ঘেঁষে হেঁটে যায় রক্ষীর দল। রক্ষীদলের অকারন হাঁক অমূলক ভীতির সঞ্চার করে দুপারের লোকজনের মনে। মনের আরো গভীরে প্রোথিত হয় সীমানা পিলার। 

গ্রামের শেষমাথা আর কাঁটাতারের বেড়ার মাঝখানে একখন্ড সবুজ মাঠ। ধরলা পারের বালি এখনো ছুঁয়ে উঠতে পারেনি সবুজটুকুকে। গ্রামের সীমানার বাইরে হওয়ায় এদিকে গ্রামবাসীরও খুব একটা আসা হয় না। পাথারের সবুজ ঘাস তাই উজাড় হয় না সহজে। 

এই নিরিবিলি সবুজ খুবই পছন্দ করিমন আর লালীর। লালীর পছন্দ সবুজ ঘন ঘাস। মুট মুট শব্দে লালীর ঘাস ছেড়া দেখে আর গুনগুনিয়ে গান ধরে করিমন। এক কামরার ঘরে বাবা-মা-মেয়ে। মেঘে-মাঘে লালীও। নিজের একটু জায়গা কোথাও কেউ দেয় নি, দিতে পারে নি করিমনকে। পাথারের সবুজ নির্জনতায় বালিকা খুঁজে পায় তার নিজের জগত। ঘুরে-ফিরে, লালীকে খুঁটায় বেঁধে এক দৌড়ে নদী ছুঁইয়ে দিয়ে আসে। কখনোবা কথা কয় নিজের সাথে, প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় অবোধ প্রাণীর দিকেঃ "আমাক কেমন লাগতেছে রে লালী? ক দেখি, জীবন দাদা আইজ আমাক দেখি কি কবে?" 

এই জীবন দাদাটি করিমনের জীবনে নূতন সংযোজন। কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে এদিকের মতই এক টুকরো জমি। সাদা রঙের একটা বলদকে ওই জমিতে ঘাস খাওয়াতে নিয়ে আসে ধুম কালো এক কিশোর। করিমনের মতই প্রতিদিন দুপুরে। দূর থেকে বলদ আর তার রাখালকে দেখে অনেকই কৌতূহল জেগেছে করিমনের মনে। ইচ্ছে হয়েছে আরেকটু কাছে বেড়ার পাশে গিয়ে আরো ভালো করে দেখে দুটো কথা বলে ওপারের ওই অচিন বালকের সাথে, খোঁজ নেয় তাদের গাঁয়ের, তার বাবা-মার, একটু ছুঁয়ে দেখে ওর ধবধবে সাদা গরুটি। সাহস করেনি মেয়ে। মনে পড়ে গেছে মায়ের সাবধানবাণী, "অচুকা ঘাটা দিয়া যাইস না। অচুদি চ্যাংরার দিকে চাইস না।" সংকোচে, সংস্কারে, সভয়ে সরে এসেছে বেড়ার কাছ থেকে আরো দূরে। 

দূরত্বটা ঘুচিয়ে দিল একদিন লালীই। লালীকে ঘাস খেতে দিয়ে একা একা এক্কাদোক্কা খেলছিল করিমন। করিমনের অমনোযোগিতার সুযোগে খুঁটা ছিড়ে বেড়ার দিকে চলে যায় লালী। করিমনের মতই তারও যেন আকর্ষণ অজানার প্রতি। 

ওপারের সাদা ষাঁড়ের ভঁঅঅ আওয়াজে টের পায় করিমন। দৌড়ে গিয়ে দেখে তার আদরের লাল গাই কাঁটাওয়ালা বেড়ায় গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ বোঁজা লালীর, লেজ নড়ছে। বেড়ার ওপার থেকে লম্বা জিহবা বের করে লালীর গতর আস্তে আস্তে চেটে দিচ্ছে ওপারের শ্বেত শুভ্র বলদ। 

"হুইশ শালা" লালীকে দেখে ওদিক থেকে ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছূটে আসে বলদের মালিক, হাতে থাকা ডালের বাড়ি সপাসপ বসিয়ে দেয় বলদের গায়ে । 

এই প্রথম তাকে কাছ থেকে দেখা করিমনের। কালো গায়ের রঙ কাছে থেকে আরো অনেক কালো লাগে, তবে দূরের ধোঁয়াটে কালো কাছে আসায় কিছুটা চকচকে। পরনের কাপড় করিমনের পোশাকের মতই মলিন। শুকনো রোগা মুখের সামনে বেরিয়ে আছে একসারি উঁচু দাঁত, অনেকটা পুরনো গাড়ি আগলে থাকা পোক্ত মার্ডগার্ডের মত। আর এই সবকিছুর সাথে কিছুটা যেন বেমানান পরিপাটি করে আচড়ানো চপচপে করে তেল দেয়া একমাথা কালো চুল। 

বালকের বিব্রত বদন কিঞ্চিৎ সাহসী করে তোলে করিমনকে। মৃদু গলায় বলে ওঠে সে, "গুরুটাক ওঙ্কা করি মারিয়েন না।"

বালিকার উদারতায় আড় ভাঙ্গে বালকেরও। সচেষ্ট হয় বালকত্ব জাহির করার এই অনায়াসলব্ধ সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহারে। "ওই ধবলা, বেডা তুই জেবন পরামানিকের বলদ হবার যুগ্যি না।" মার্ডগার্ড যতদূর সম্ভব লুকিয়ে বুক চিতিয়ে গলা উঁচিয়ে বলে ওঠে সে। গলার আওয়াজেই যেন বুঝিয়ে দিতে চায় একটা বলদ চরিয়ে বেড়ানো কেবল তার মত একটা জোয়ান পুরুষের পক্ষেই সম্ভব।

ফিক করে হেসে দেয় করিমন। অপ্রস্তুত হয় বালক। বুঝে উঠতে পারে না হাঁসির পাত্রটি কি পরামানিকের পো না তার পরাণ প্রিয় গো? রেগে গিয়ে এক ঝটকায় ধবলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিতেই ফকফকা হয়ে যায় ফিচলেমির ফিকির। 

সঙ্গিনীর স্পর্শে সাড়া দিয়ে জেগে উঠেছে ধবলার অঙ্গ। মানবের মত কাম গোপনের উপায় কিংবা ইচ্ছে কোনটিই বুঝি নেই প্রাণীর। হালকা গোলাপী রঙের পূর্ণোত্থিত পুরুষাঙ্গ (কিংবা বলদাঙ্গ) কাম নয় কৌতুকের উদ্রেক করে বালিকার কৌতূহলি মনে। 

পরামানিকের লুকোনো মার্ডগার্ডও বেরিয়ে আসে। আবারো ঘুরে তাকায় সে বালিকার দিকে। ভরদুপুরে নির্জন পাথারে অচেনা মানুষের চোখে চোখ, নিমেষেই শান্ত করে বালককে। "তোমার বাড়ি কই?", গলার স্বর ধরলার পলি কাদার চেয়েও নরম আর থকথকে করে ভাব জমাতে সচেষ্ট হয় সে।

"হুই গেরামত," বলেই দড়ির হ্যাঁচকা টানে লালীকে নিজের কাছে নিয়ে আসে করিমন। "চল শালী," বলে হনহন করে ফিরে যায় গ্রামের দিকে, নিজের সীমানার ভেতরে। কিছুটা হতোদ্যম হয়ে বেড়ার কাছ থেকে ফিরে আসে জীবনও। দুজনের কেউই খুব একটা মনোযোগ দেয় না তদের প্রিয় শালা-শালীর বিরহী চিৎকারে।

সেদিনের পরে আলাপে-পরিচয়ে আস্তে আস্তে আরো কাছাকাছি আসে জীবন আর করিমন। করিমন জানে জীবনের বাবা পরিমল পরামানিকের চুল কাটার দোকানের কথা, যেখানে গ্রামের ছোট বড় সকলেরই নিত্য যাওয়া আসা। লালীর দুধ দুইয়ে প্রায়ি ওপারে পার করে করিমন। দুধ পারাপারের সময়ে কাঁটাতারের বেড়ার শীতল ধাতব স্পর্শের চেয়েও জীবনের ঘামে ভেজা ধূলোয় ভরা আংগুলের ছোঁয়া অনেক অনেক মধূর মনে হয় করিমনের।



আজ দুপুর নাগাদ বেড়ার পাশে গল্প করছিল জীবন আর করিমন। লালীর দড়ি খুলে দিয়েছিল করিমন। নির্জন দুপুরে নিষিদ্ধ স্বাধীনতা ভোগের গুনাহ প্রিয় সাথীর সাথে কিছুটা ভাগাভাগি করে নিতে চেয়েছে সে। কৃতজ্ঞ কামার্দ্র লালী লজ্জিত ধীর পায়ে বেড়ার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই জীবনের দিকে মন দেয় করিমন। এরই মধ্যে ধবলা আর লালী গুটিগুটি পায়ে কখন এগিয়ে গেছে নদীর দিকে দেখেনি দুজনের কেউই । হঠাৎ হাম্বায় দুজোড়া চোখ চকিতে বিযুক্ত হয়ে ঘুরে যায় একই দিকে। নদীর পাড়ে বেড়ার যেখানে শেষ ঠিক সেইখানটায় ধবলার আরো কাছে যেতে গিয়ে বেড়ার কাঁটায় আটকে গেছে লালী। সীমানা-বেড়া ঠেকাতে পারে না প্রাণীর চালান, ঠিকই আটকে দিয়েছে প্রাণের মিলন। লালীর আর্তচিৎকারে ব্যথিত হয় করিমন। উদ্বিগ্ন চোখে এদিক ওদিক তাকায় সাহায্যের জন্য। কেউ শুনতে পেলে সাঙ্গ হবে তার দ্বিপ্রাহরিক লীলা এই ভয়ও একই সাথে পেয়ে বসে তাকে। 

লালীর বেদনায় লীলাভঙ্গের আশঙ্কায় বিহ্বল করিমনকে পেছনে ফেলে নদীর দিকে ছুট দেয় জীবন। লালীকে মুক্ত করে লালীর মনিবের চোখে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের এই সুবর্ণ সুযোগ হারাতে চায় না সে। 

এরই মধ্যে হাঁচড়ে-পাঁচড়ে নিজেকে ছাড়িয়ে ধবলার কাছে পৌঁছে যায় লালী। ছড়ে যাওয়া চামড়ার ব্যথায় কাতর পশু চোখ তুলেই ধবলার মনিবকে ছুটে আসতে দেখে। লুঙ্গি পরা লাঠি উঁচোনো জীবনের ধাবমান মূর্তি দেখে লালীর বুঝিবা করিমনের বাবার কথা মনে হয় । মারের ভয়ে দৌড় লাগায় লালী। সোজা জীবনদের গাঁয়ের দিকে। 

এবারে হকচকিয়ে যায় জীবনও। কি হতে যাচ্ছে বুঝে নিয়ে লালীর গন্তব্যের দিকে বেশ খানিকদূর ছূটে গেলেও ওকে আর ধরতে পারে না জীবন। ক্লান্ত হতাশাগ্রস্ত জীবন বেড়ার কাছে ফিরে এসে দেখে একমনে জাবর কাটছে ধবলা। করিমনের দেখা নেই কোথাও।



বাড়ি ফিরে বাবার কাছে বানিয়ে গল্প বলে করিমন, "আমি গাইক পানিত দিছি গা ধোবার লাগি। ও হাঁচর পারি ওপারত উইঠল। আমি কত ডাকনু। ও হাঁটি হাঁটি হুই গেরামত ঢুকি গেল।" পরিবারের অন্যতম উপার্জনের উৎস হাতছাড়া হওয়ায়, কেবল হাতছাড়া নয় একেবারে দেশছাড়া হওয়ায় শোকে-দুঃখে দিকপাশ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে করিম। কি করে দেশান্তরী গাভীকে ফিরিয়ে আনা যায় তা ভাবার বদলে মেয়ের উপরে চড়াও হয়, আদরের শাহজাদী এক লহমায় হয়ে যায় হারামজাদী।

"ও এই টুকুন ছাওয়াল, ও কি করবি? ও কি লালীর পিছন পানিত নামি ওর ভাইয়ের মতন পেলাবনত মরবি?" ঘটনার বর্ণনা শুনে আবারো মেয়ের পক্ষ নেয় করিমন। মনে পড়ে যায় বড় ছেলের মৃত্যুর পর কখনই পানিতে নামতে দেয়নি তার সন্তানদের। করিমনকেও পই পই করে বারণ করেছে লালীকে নিয়ে ধরলায় নামতে। করিমন তো এতটা সাহস করার কথা না। সন্দেহ জাগে মায়ের মনে। সন্দেহ প্রকাশে সাহস পায় না সে। আবারো যদি মার খায় মেয়ে। 

"মেয়েক মারি ফেলালি তো আর গরু ফেরত আসপি না, বাজারত গিয়া দেখেন মন্ডল কাকা কিছু করতি পারে কিনা? ওনার এসবগুলাক লোকজনের সাথে চেনাজানা আছে। কিন্তুক ওনার হাতে-ঠ্যাঙ্গে ধইরবেন, পাপিয়া মেডামরে যেন কিছু না হয়। লালী ভাগি গেছে টের পালে মেডাম আমাগোরে বানবার আবি।"

বউয়ের উপদেশ শুনতে ভালো না লাগলেও করার মত একটা কাজ পেয়ে তৎপর হয় করিম। ব্যস্ত-সমস্ত হয়ে রওয়ানা হয় বাজারের দিকে। 



বাজারে ঢোকার মুখে মোশ্তাকের চায়ের দোকানে পেয়ে যায় মন্ডলকে। 

"হিত্তি আইসো।" করিমের আহ্বানে কেরামের আসর ছেড়ে উঠতে রাজী হয় না মন্ডল। 

"কিসের অতো ফইজদারী নাগচে?" খেঁকিয়ে ওঠে সে।

"বিবি পাঠাইছে।" 

নসিমন পাঠিয়েছে শুনে কিছুটা নরম হয় মন্ডল। দোকান থেকে করিমকে বের করে নিয়ে আসে আসে একটু দূরে, করিমের গোপন সমস্যার জট খুলতে। মণ্ডলের ধারণা ছিল বরাবরের মত এবারো স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া-ঝাটির কোন ঘটনা নিয়ে স্বামীকে তার কাছে পাঠিয়েছে নসিমন, আবারো সুযোগ এসেছে দিনের পর দিন ওদের ঘরে যাওয়ার, ওদের উঠতি বয়সের মেয়েটিকে চেয়ে চেয়ে দেখার । নসিমন আর করিম ওকে চোরাই গরুর কারবারীদের বন্ধু ভাবে ভাবে জেনে কিছুটা নিরাশ হয় মন্ডল। পরমুহূর্তে ভাবে, মন্দ কি? গরু পারাপার করে করিমের কাছ থেকে কিছু খসানো যাবে। এছাড়া এই সুযোগে হয়তো গরুর রাখালনী করিমের মেয়েটিকে ঘরের বারও করা যাবে।

মন্ডলের প্রথমেই মনে হয় ওপারে সমীর প্রধানের খোঁয়াড়ের কথা। সে অনেকটাই নিশ্চিৎ সীমানা পেরোলেও প্রধানের খোঁয়াড় এড়াতে পারে নি করিমনের গাভী। সমস্যা হচ্ছে এপারের মাল টের পেলেই অনেক বেশী মুক্তিপণ চাইবে প্রধানের পো। ওপারের টাকায় শোধ দিতে গেলে আরো বেড়ে যাবে খরচ। টাকা নিয়ে সমীর গাই ফেরত না দিলেও খুব একটা কিছু করার থাকবে না মন্ডলের। এই এক গাই নিয়ে সুবেদারের কাছে দরবার করতে গেলে খাজনার চেয়েও বাজনা বেশী হবে। সব মিলিয়ে বেশ জটিল একটা ব্যাপার। 

এসব জটিলতা করিমকে বুঝতে দিতে চায় না মন্ডল। বেশ একটা জানি জানি ভাব নিয়ে তাকে শুধু বলে, "শোন বাহে, তোমার গাই খোয়া গেছে, তুমি দুখ পাইছ, একথা কয়া তো আর ওনাক গাই ফেরত দেয়ান যামো না ।" 

মন্ডলের কথার মানে পুরোটা না বুঝলেও মন্ডলের দেখাদেখি দূরের সীমানার দিকে তাকায় করিম। নিজের অজান্তেই মুখে ফুটিয়ে তুলে বিনয় আর সমীহের ভাব অদেখা ওনার উদ্দেশ্যে, "আমাক নিয়া চলেন, আমি কান্দি কান্দি মোর গাই চাইমো। ওনাক কব গাই না দিলে লোনের মেডাম মোক জেলত নিমো।"

"আনথাও হইও না, বাড়ীত গিয়া দেখ পাত্তি-উত্তি কি আছে, সব একজাগাত কর। যাও, যাও।" একইসাথে আশ্বস্ত করে, আদেশ ঝাড়ে মন্ডল। আবারো তৎপর হয় করিম। রওয়ানা হয় ফিরতি পথে। মনে মনে হিসেব কষে ঘরের কোথায় কত আছে, কি আছে, কার কাছ থেকে কত নেয়া যাবে।



করিম চোখের আড়ালে যেতেই ফতুয়ার পকেট থেকে মোবাইল বের করে মন্ডল। লুঙ্গির গিঁটের ভেতর থেকে বের করে আনে আলগা সিম। নখের খোঁচায় মোবাইলের পেছনটা খুলে এপারের সিম তুলে যত্নে বসিয়ে দেয় ওপারের সিম। 

"সমীরদা, আদাব। একটা লাল গাই কি তোমার ওহানে গেইচে?" ফোন তুলে সরাসরি কাজের কথায় চলে যায় মন্ডল। ওপারের মিনিট ফুরিয়ে গেলে পুরো ব্যাপারটা আরো খরচের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। 

মন্ডলের বর্ণনা শুনে সমীর নিশ্চিৎ করে লালী তার হেফাজতেই আছে। রফা হয় পাঁচশত এপার-টাকায়। শর্ত, সেদিন রাতের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে হবে লালীকে। দেরী হলে প্রতিদিনের খোঁয়াড়ি বাবদ দিতে হবে অতিরিক্ত দুইশত টাকা। 

সমীরের সাথে কথাবার্তা পাকা করে খুশিমনে করিমের বাড়ীর দিকে রওনা করে মন্ডল। যেতে যেতে সিম বদলে ফোন করে সুবেদারকে। একথা সেকথায় জেনে নেয় কৌশলে জেনে নেয় ঠিক কোন সময়টায় টহল দল আসবে তাদের গ্রামের ধারের সীমানা বেড়ার কাছে। সব ঠিকঠাক হলে এবারে ফন্দি আঁটতে থাকে কি করে করিমের মেয়েকে সাথে নেয়া যায়।



পাঁচশ টাকার কথা শুনে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে করিম, "মুই এত টাকা কোটে পামু? আমার ঘরত দুইখান পঞ্চাশ টাকার লোট আছে, ওই নিবার পারেন।"

"তোমাক টাকা দিবার কচ্চি কি আমি? আমাক কেবল করিমনেক সাথত দাও। আমি ওক নিয়া লালীক লয়া আসি। লালী আসলে পর কিস্তি কর‍্যা টাকা শোধ দিও।" 

মণ্ডলের কথায় আশা ফিরে পায় করিম। কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারে না গাই ছুটাতে করিমনের দরকার হবে কেন? করিমের দোলাচল বুঝতে দেরী নেয় হয় না ধূর্ত মন্ডলের। আগেই তৈরী করে রাখা ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়ে লোভনীয় প্রস্তাবটিকে যুক্তিযুক্ত করে তোলায় সচেষ্ট হয় সে, "করিমনের চেয়ে ভালো করি আর কে চেনপে লালীক। ওক না নিলি আমি কেঙ্কা বুঝপো কার গাই কাক ফেরত দিল?"

মন্ডলের সহজ যুক্তিতে করিমের ইতস্ততঃ ভাব কেটে যায়। "করিমনের মা, তোমার চ্যাংরিক কও রেডি হবার। লালীক আনপার যাবি," নির্দেশ স্থানান্তরে বিন্দুমাত্র শিথিলতা দেখায়না সে।

নসিমন পাশে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। মন্ডলের কথায় এত সহজে আশ্বস্ত হয় না সে। কারণে অকারণে করিমনের মুখে-মাথায় মন্ডলের হাত দেয়ার চেষ্টা এতদিন দেখেও না দেখার ভান করেছে সে। ভেবেছে গরীবের মেয়ের গায়ে মেম্বর-মাতবররা তো একটু-আধটু হাত দেবেই, এতে তো আর মেয়ের বিয়ে বেড়ানো বন্ধ হয়ে যাবে না। তবে এই বিকেল সাঁঝে নির্জন মাঠে মন্ডলের সাথে তার মেয়ের একা একা যাবার কথা শুনে অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে মায়ের মন। 

"করিমনের বাপও সাথত যাক। বাপ বেটিত মিলা লালীক আরো ভাল করি চিনে লিবি," মন্ডলের প্রস্তাবের সরাসরি বিরোধীতা করার সাহস হয় না নসিমনের। 

"লোক বেশী হলে শোরগোল হবি। বি ডি আর, বি এস এফ টের পালি গাইগরু তো দূরত থাক, জান নিয়া টানাটানি হবি'" আবারো তৈরী উত্তর দেয় মন্ডল। 

"তালি করিমনের বাপ ফাঁকত থাকি যাওক। অচুকা লোক দেকলি উনি না আগাইব?" ক্ষীণ স্বরে আরো একবার চেষ্টা করে করিমন। 

"ওই করিমনের মা, আনশুন কতা কেনে কও? মুই বুইড়া কি তোমার ওই নাহায়েজ মাইয়াক সাঙ্গা করবার নিচ্চিক? মোক সাত তোমার চ্যাংরিক নাদেমা তো নাই। তোমরা গিয়া তোমাগোর গাই গরু ধরা নিয়া আস?" 

মন্ডলের ছুঁড়ে দেয়া শেষ অস্ত্রটি ঠিকই কাজ দেয়। 

"তুই এত আংসাং কতা কইস কেনে বউ? তোর মেয়া দিনে-দুপুরে একলা পাথারত গেইনু, আইজ তো ওর মন্ডল দাদু থাকপে? ভুল গাই নিয়া আলি তুই কি আবার দন্ডী দিবি?" স্ত্রীকে শাসন করে মেয়ের দিকে ফেরে করিম, "ওই চ্যাংরি, এঙ্কা করি না কান্দি যা লালীক নিয়া আয়। লালীক নিয়া না আলি আইজ আর বাড়িত আইস না।"

অনিচ্ছাসত্তেও মেয়েকে মন্ডলের সাথে ছেড়ে দেয় নসিমন। মনে মনে আল্লার কাছে হাত তোলে, "আমার চ্যংরিটাক দেকিস তুই খোদা?"

করিমের কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকার নোট দুটো নিয়ে পকেটে ভরে মন্ডল। করিমনের হাত ধরে সীমান্তবর্তী পাথারের দিকে রওনা হয়। মন্ডলের ঘামে ভেজা হাতের চাপ কেবলই শক্ত হতে থাকে করিমনের হাতে। অস্বস্তি বোধ করে করিমন। বারবার ফিরে তাকায় পেছনে। দাওয়ায় দাঁড়ানো মায়ের শরীর ছোট হতে হতে হারিয়ে যায় এক সময়।


গাঁয়ে ফিরে শান্তি পায়না জীবন। কেবলই মনে হতে থাকে করিমনের কথা, লালীকে হারিয়ে না জানি কত গালমন্দ খেতে হচ্ছে তাকে? ইস, তার জন্যই তো করিমনের এই দশা। সে ওরকম আচমকা দৌড় না দিলে লালীও হয়তো ছুটে পালাত না। কিছু একটা করার জন্য ছটফট করে কিশোর মন। মনে মনে ভাবে, লালীকে একবারের জন্য খুঁজে পেলেও ঠিক দিয়ে আসবে করিমনের কাছে। যেই ভাবা সেই কাজ। গাঁয়ের এদিক ওদিক ঘুরে সবাইকে শুধোয়, "একটা লাল গাভী দেকিচ্চ বাহে?" বড় রাস্তা পেরিয়ে ওপারের গাঁয়ে এক ঘুরলি দিয়ে আসে। জলঢাকার ধার ঘেঁসে এগোয় খানিকটা। তৃষ্ণার্ত লালী নিশ্চয় জল খেতে চাইবে। 

কোথাও লালীকে খুঁজে পায় না, জীবন। হঠাৎ মনে হয়, আচ্ছা, সমীর প্রধানের খোঁয়াড়িরা ধরে নি তো লালীকে? গ্রামের শুরুতেই তো প্রধান কাকুর খোঁয়াড়। 

দ্রুত হেঁটে প্রধানের খোঁয়াড়ে পৌছে যায় জীবন। 

"কিরে জেবনা, তোর বাপে এবার কি রং করি দিল আমার সাদা কেশ তো সব বাহির হয়া গেল?" জীবনকে দেখেই অভিযোগ শুরু করে প্রধান। 

শুকনো হাসিতে কোনরকমে প্রধানের অভিযোগের উত্তর দিয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই লালীকে দেখতে পায় জীবন। খোঁয়াড়ের একধারে বাঁশের খুঁটার সাথে বাধা লালী। লেজের বাড়ীতে পিঠের ক্ষতে বসা মাছি সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে বারবার। অচেনা পরিবেশে ভীত ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর লালীকে দেখে মায়া হয় জীবনের। 

"ওই লাল গাইটাক আমি ওপার থিকা আসপার দেকচি?" লালীর দিকে ইঙ্গিত করে বলে ওঠে জীবন।

"তুই ঠিকই দেখচু। ওটাক আইজ আগ সাঞ্জত নিবার আসপি।" 

"তুমি ওটাক কিছু খের-আড়া দিবা না? ওর ঘাওত একটু মালিশ লাগায়ে দিবা না?" 

ওপারের সাথে দ্রুত রফা হওয়ায় লালীকে নিয়ে আর বেশী মাথা ঘামায়নি প্রধান। তবে গো-গবাদির প্রতি জীবনের বিশেষ স্নেহের কথা গাঁয়ের আর সবার মত তারো জানা। জীবনের এই গো-প্রীতির সুযোগ নিয়ে ওকে দিয়ে লালীকে যদি কিছুটা দলাই-মলাই করে তৈরী করে নায়া যায় মন্দ কি? টাকার আমদানি না বাড়লেও এতে প্রধানের খোঁয়াড়ের সুনাম তো আসবে।

"তুই যা, ওক নদীর পার নিয়া জল খাবার দে। তোর বাপেক ক এন্টি-সেপটিক লাগায় দিবার ওর গাওত? সব সারি আবার এটে লিয়ে আসপি তাড়াতাড়ি। " 

প্রধানের কথায় আনন্দে নেচে ওঠে জীবনের মন। প্রায় দৌড়ে লালীকে নিয়ে বের হয়ে যায় সে প্রধানের খোয়াড় থেকে। অবাক হয়ে ওদের যাত্রা পথের দিকে ক্ষণিক তাকিয়ে থেকে আবার নিজের কাজে মন দেয় সমীর। ভাবে গাঁয়ের সবাই এভাবে বেগার দিলে তার খোঁয়াড় চালানো কত সোজা হয়ে যেত?


১০

লালীকে নিয়ে সোজা নিজেদের বাড়ীতে চলে আসে জীবন। ধবলাকে দিয়ে সুন্দর করে চেটেপুটে সাফ করে লালীর ঘায়ের জায়গা। বাবার ঘর থেকে মলমের কৌটা বের করে যত্ন করে মেখে দেয় ঘায়ে। ধবলার জন্য তুলে রাখা ফ্যানের অর্ধেকটা খেতে দেয় লালীকে। যত্ন-আদর শেষে লালীকে আবার প্রধান কাকুর খোয়াড়ে রেখে আসার কথা মনে হতেই বিদ্রোহ করে ওঠে জীবনের মন। প্রধান কাকু কার না কার কাছে কত টাকার লোভে পড়ে লালীকে দিয়ে দিচ্ছে, তা কে জানে? এটা হতে দেয়া যায় না। যেভাবেই হোক করিমনের লালীকে ফিরিয়ে দিবে সে করিমনের কাছে। প্রধান কাকুকে বলবে লালী ছুটে গেছে তার কাছ থেকে। যেমনি ছূটে এসেছে ওপার থেকে তেমনি ছুটে ফিরেছে ওপারে। 

যেই মনে হওয়া সেই কাজ। লালীকে নিয়ে পাথারে কাঁটাতারের বেড়ার দিকে পথ দেয় জীবন। খোঁয়াড় এড়ানোর জন্য ঘুরপথ নিতে হয় তাকে। পথে যেতে যেতে ভাবে করিমনকে কি করে খুঁজে পাবে লালী? মনে মনে প্রার্থনা করে, "হে ভগবান, করিমনেক লালীর খোঁজে বেড়ার কাছে নিয়া আসেক।" প্রার্থনা বিফল হলে লালীকে সাবধানে বেড়া পার করে দেয়ার পণও করে সে। একবার বেড়া পার হলে লালী নিশ্চয় খুঁজে পাবে তার ঘর। একবার সে মাঠে ঘুমিয়ে পড়লে ধবলা নিজেই দড়াদড়িসমেত ফিরে গিয়েছিল তাদের ঘরে।


১১

ওদিকে জীবনের দেরী দেখে বিচলিত বোধ করে প্রধান। বিকেল যায় যায়। সাঁঝের শুরুতেই বেড়ার পাশ দিয়ে যাবে টহল দল। গরু আদান-প্রদানের ব্যপারাটা কোনভাবে তাদের চোখে পড়লে মুক্তিপণের টাকার অর্ধেকটাই তাদের দিয়ে দিতে হবে। মুনিষদের একজনকে জীবনের বাড়ির দিকে পাঠায় প্রধান, "ওই মদনা, যায়া দেখ তো পরামানিকের পো আর ওর বলদডায় মিলে মোর গাইটাক চুইদবার লাগছেন কি? কানটা ধর‍্যা ওক লিয়া আয়।" 

মদনা দৌড়ুতে দৌড়ুতে এসে খবর দেয়, জীবন বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেছে বেশ খানিকটা আগে। সঙ্গে নিয়ে গেছে গাইটিকে। খোঁয়াড়ের পেছনে বল খেলছিল যারা তাদের একজন দূর থেকে জীবনকে দেখেছে একটি গরুর দড়ি হাতে সীমানা বেড়ার দিকে যেতে। 

ঘটনা শুনে মাথায় রক্ত উঠে যায় প্রধানের। এখন বুঝতে পারে পরামানিকের পো কেন এত খুশিমনে বেরিয়ে গিয়েছিল। এক টানে চেয়ার থেকে জামাটা নিয়ে গায়ে দেয় প্রধান। হুঙ্কার দেয় মদনার উদ্দেশ্য, "সব কডারি ডাক। শালা পরামানিকের চ্যাংরাক আজ গো-মাইজির গোবর খিলাকে দোমো?"

দলবল নিয়ে সীমানা বেড়ার দিকে রওনা করে প্রধান।


১২

সীমানা বেড়ার কাছে পৌঁছে ধীরে সুস্থে প্রধানকে ফোন দেয় মন্ডল। খুব একটা তাড়া নেই তার। মনে মনে আশা গরু নিয়ে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নামুক। জনহীন অন্ধকার মাঠে সে, করিমন আর এক নির্বাক প্রাণী। ভাবতেই লুঙ্গির নিচে একটা শিরশিরে অনুভূতি হয় মন্ডলের। 

মন্ডলের সিম অদল-বদল দেখে বিস্মিত হয় করিমন। পাপিয়া মেডামের মোবাইলে তার মাকে দু'একবার দুধের গাড়ীর সাথে কথা বলতে দেখেছে সে। তার জানা ছিল না এই জিনিশ দিয়ে ভিন দেশের লোকের সাথেও কথা বলা যায়। ইস, তার এমন একটি থাকলে জীবন দাদার সাথে রাত-বিরাতে কত কথা বলা যেত। জীবন দাদা খোঁজ লাগালে তাদের লালীকে হয়ত সে এতক্ষণে পেয়েও যেত।

গরুর দড়ি হাতে ওপারে একজনকে বেড়ার দিকে আসতে দেখে উৎসুক হয়ে ওঠে মন্ডল আর করিমন। গরু বেড়ার যতই কাছে আসে ততই পরিস্কার হয় তার উজ্জ্বল লাল রঙ। সন্দেহ যায় না তবু মণ্ডলের,

"প্রধান তো একা আসপার নোক না। শালা কাক থুয়ে কাক ফোন করলাম। বি,এস,এফের লোক আবার টোপ লিয়ে আসিচ্চে না তো?"

করিমনের তখন মহানন্দ। লালী আর লালীর দড়ি ধরা কিশোর, দু'জন'ই তার অতি পরিচিত, অতি কাছের। আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করে করিমনের। ইচ্ছে করে এক্কা-দোক্কার চেয়েও অনেক অনেক বড় একটা লাফ দিয়ে বেড়াটা ডিঙ্গিয়ে এক দৌড়ে লালী আর জীবন দাদার কাছে পৌঁছে যেতে। 

হঠাৎ হৈ হৈ রবে আবারো সচকিত হয় মন্ডল। দেখতে পায় লাল গরু আর রাখালের দিকে তেড়ে আসছে একদল লোক। ধাওয়াকারীদের সামনে প্রাধানের পুষ্ট ভুঁড়িটা দেখতে পেয়ে কিছুটা স্বস্তি বোধ করে মন্ডল। যদিও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে না কি ঘটছে।

"জীবন দাদা, আইগাও। ও মন্ডল দাদু, জীবন দাদা লালীক নিয়া আসচে। ওক আপনি বাঁচান," করিমনের চিৎকারে আবারো বিভ্রান্ত হয় মন্ডল। এইটুকুন মেয়ে কি করে ওপারে কানেকশন বানাল, কিছুতেই মাথায় ঢোকে না তার। দ্রুত মোবাইলের রিডায়ালে চাপ দেয় প্রধানকে ধরার জন্য।

ওদিকে প্রাণপণে ছুট লাগায় জীবন। বেড়ার এপাশে যে জায়গায় করিমন আর মন্ডল দাঁড়ানো সেদিকে না গিয়ে নদীর দিকে এগোয় সে। উদ্দেশ্য প্রধান কাকুর হাতে ধরা পড়ার আগেই নদীর কিনারে বেড়ার খোলা জায়গা দিয়ে লালীকে পুশব্যাক করে দেয়া।

এদিকে করিমনকে দেখে যেন চিনতে পারে লালী। নদীর দিকে না গিয়ে সরাসরি বেড়ার দিকে করিমনের পাশে যেতে চায় সে। জীবনের সরব শাসানিতে কাজ হয় না কোনই। 

লালীর হাম্বা, প্রধানের দলের হৈ চৈ, করিমনের আর্তচিৎকার আর জীবনের শাসানিতে হঠাৎ করেই সরগরম হয়ে ওঠে চারদিক। সীমানা বেড়ার দুপাশ জুড়ে চিৎকার চেঁচামেচিতে মনে হয় স্টেডিয়ামে দুদেশের ফুটবল খেলা হচ্ছে, আর বেড়া ঘেরা গ্যালারি থেকে বাহবা আর দুয়ো বর্ষন করে চলেছে দর্শকদল।

"হল্ট, শালা স্মাগলার। হল্ট নেই তো মে গোলি চালা দেঙ্গা।" উদ্যত বন্দুক হাতে সীমানা প্রহরীর গর্জন শুনে নিমেষে স্তব্ধ হয় সকলে। সন্ধ্যা নামার আগেই চলে এসেছে আজ বিএসএফের টহল প্লাটুন।

প্রধানের দল দৌড়ে পালায় যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে। করিমনের হাতছেড়ে গ্রামের দিকে ছুটে পালায় মন্ডল। 

পালায় না শুধু জীবন পরামানিক। একটা শেষ চেষ্টা করে সে। দুই হাতে কাঁটাতারের বেড়া ফাঁক করে লালীকে ওপারে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করে। শক্ত স্টিলের বেড়া ফাঁক হয় না এতটুকু। বরঞ্চ ছড়ে ছিড়ে যায় জীবনের হাত। তবুও দমে না বালক। ক্রমাগত চেষ্টা করে যায় সে, লালীকে করিমনের কাছে পৌঁছে দেয়ার ।


লেখক পরিচিতি:
মোহাম্মদ ইরফান ছোট গল্প লিখেন বাংলায়, অনিয়মিতভাবে। আর্থ-সামাজিক চাপে বিপর্যস্ত, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার ক্রীড়নক, পরিবেশ বিপর্যয়ে বিপন্ন মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, মহত্ত্ব-নীচতার প্রাত্যহিক কাহিনী উঠে আসে তার গল্পে। পেশায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষক ইরফান। গবেষণার বিষয়বস্তু দেশ-বিদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ব্যবস্থাদির পারস্পরিক সম্পর্ক, রূপান্তর আর বিকাশের বিশ্লেষণ - উপাত্ত, পরিসংখ্যান আর গাণিতিক মডেলের সাহায্যে। জন্মভূমি চাঁটগা থেকে অনেক দূরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিবাসী গত দু'দশক ধরে। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন