শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এর গল্প : স্নেহা

এক সন্ধ্যায় বলাকা সিনেমা হলে বসে বসে এক অমর উপদেশ শুনেছিল তাসির: বিশিষ্ট খলনায়ক আহমদ শরীফ মৃত্যুশয্যায় শুয়ে দয়াময়ী কন্যাকে বলছেন, যদি জীবনের শুরুতে তোমার মার দিকে আরেকটু নজর দিতে পারতাম, তার যত্ন নিতে পারতাম, তাহলে আজ আমার এই পরিণতি হতো না।' পরিণতি, অর্থাৎ অপঘাতে আরও নির্দিষ্ট করে বললে, নায়ক ফারুকের বলশালী হাতের আঘাতে—তার নিশ্চিত মৃত্যু। মেয়ের নাম স্নেহা, সিনেমার নাম ভালোমন্দের হিসাব।
না, ঠিক এই কথাগুলো আহমদ শরীফ উপদেশ হিসেবে বলেন নি, উপদেশের আকারে যা বলেছিলেন, তা বলেছিলেন একটু পরে এবং তা হলো: জীবনসঙ্গীকে জানবে নিজের করতলের মতো, তার নিশ্বাসে নিজের নিশ্বাস মেলাবে, তার বিশ্বাসে নিজের বিশ্বাস।' তারপর নিস্তেজ হতে হতে আরও কিছু কথা বলতে চেয়েছিলেন আহমদ শরীফ, কিন্তু অনেক পরিশ্রমে 'মনে রেখো...' পর্যন্ত বলে ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে। 

মৃত্যু তাকে নিজের কোলে পেয়ে কতখানি পুলকিত অথবা বিরক্ত হয়েছিল কে জানে, কিন্তু স্নেহা বুক চাপড়ে কেঁদেছিল। তার কান্নার দুই কারণ—এক. বাবার মৃত্যু, হোক না তিনি ভিলেন, আর দুই, জীবনসঙ্গীর বিষয়ে বাবা যে উপদেশ দিলেন, তা মানা তো মোটেও সম্ভব ছিল না তার জন্য। যে নায়কের হাতের আঘাতে তিনি অক্কা পেলেন, তাকেই তো প্রাণ-মন ঢেলে ভালোবেসেছে স্নেহা। তাকে এখন কী করে জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নেয় সে ? তার পিতার নিশ্চিত মৃত্যু যে ডেকে আনল, সেই লোকটাকে ? বেচারা স্নেহা। তবে সে একা নয়। এরকম দুর্ভাগ্য ছুঁয়ে গেছে অনেককে, যথা হতভাগা হ্যামলেটের প্রিয়তমা ওফেলিয়াকে। তার বাবার পেটে তলোয়ার ঢুকিয়ে মেরেছিল হ্যামলেট, তবে ফারুকের মতো সজ্ঞানে নয়—এই যা রক্ষা। কিন্তু ফল হলো একই। ওফেলিয়া পিতৃহত্যাকারী প্রিয়তমাকে নিয়ে এমন দ্বন্দ্বে পড়ল যে তার মাথাটাই গুবলেট হয়ে গেল। তার প্রশ্নটিও ছিল স্নেহারই: এ লোকের গলায় আমি মালা পরাই কী প্রকারে ? 

জটিল প্রশ্ন। কিন্তু স্নেহা সেটি নিয়ে ভাবতে গিয়ে খেয়াল করে নি, বাবা যে তাকে বলেছেন, জীবনের শুরুতেই স্নেহার মায়ের কথা শোনার কথাটা, তা তো হতে পারে না। তার জীবনের শুরু তো হয়েছে তার নিজের মায়ের হাতে, স্নেহার মায়ের হাতে নয়—বস্তুত স্নেহার মায়ের জন্যই যে তখনো হয় নি! 

তবে বাংলা সিনেমা বলে কথা। এসব সিনেমা দেখতে হলে যুক্তিকে, কাণ্ডজ্ঞানকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হয়। 

যাক সে কথা। 

তাসির অবশ্য তখনো জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার বয়সে পৌছায় নি, মোটে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছে, ইংরেজিতে বিএ অনার্স পড়তে। কিন্তু কথাগুলো তার খুব মনে ধরেছিল। তারপর যখন নায়ক ফারুককে জীবনসঙ্গী হিসেবে মেনে নেওয়া না নেওয়ার ব্যাপারে বড় রকমের দ্বন্দ্বে পড়ল স্নেহা, তখন নিজেকেই একসময় স্নেহার হাতে তুলে দিল সে। মনে মনে বলল, আমি পারি তোমার জীবনের এই শূন্যস্থান ভরে দিতে। সিনেমা শেষ হওয়ার আগেই নিজেকে অবশ্য বোকা বলে একটা গাল দিল সে। কারণ, নানা ঘটনা-উপঘটনার ভেতর দিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ফারুককেই জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিল স্নেহা এবং মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে নিয়ে লাউয়াছড়া ইকোপার্ক পর্যন্ত টেনে নেওয়া সিনেমার শেষ দৃশ্যে নাচ-গানের এক আইটেমে এক পূর্ণর্চাদের আলোয় ফারুকের গলা ধরে নিবিড়ভাবে যখন গাইল স্নেহা, থাকবে তুমি আমার মনে, হৃদয় বনে, রাজার মতো তুমি আমায় ভুলিয়ে দেবে, ফিরিয়ে নেবে, হাজার ক্ষত ইত্যাদি, তাসিরের মনে হলো, পিতার হত্যাকারীকে যে মেয়ে জীবনসঙ্গী করে, তাকে তার ঘৃণা করা উচিত। কিন্তু অবাক, হল থেকে বেরোবার পর স্নেহা তাকে অধিকার করে নিল। অনেক দিন, অনেক সপ্তাহ স্নেহা তার চোখে-মনে লেপ্টে বসে রইল। 

তার মনে হলো, এরকম সুন্দরী মেয়ে ইহজীবনে সে দেখে নি। 

পড়াশোনার চাপ বাড়লে, টিউশনির সংখ্যা বাড়লে একসময় স্নেহা তার মন থেকে চলেও গেল। সেটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে তাসিরের বাবা হঠাৎ একদিন দেহরক্ষা করলে তাসির যে সমুদ্রে পড়ল, তাতে সাঁতার কাটতে কাটতে স্নেহা তো দূরের কথা, নিজের নামটাই তো ভুলে যাওয়ার কথা। মা রইলেন, এক ভাই এক বোন—দুটোই ছোট—রইল, তার দায়িত্বে। পোস্ট অফিসে সামান্য চাকরি করতেন বাবা; মানুষের কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতেন, কিন্তু নিজে কিছুই সঞ্চয় করতে পারেন নি পরিচিতজনদের ভালোবাসা ছাড়া। ভাগ্যিস, গ্রামে একটা বাড়ি রেখে গিয়েছিলেন, আর সামান্য কিছু ধানী জমি। কিন্তু তাসির বুবল, দুটো ভাইবোনকে পড়াশোনা করানো, মায়ের দেখাশোনার জন্য এই ধানী জমি মাত্র ত্রিশ শতাংশ পয়সা। দেবে। ফলে তার জীবন টিউশনিময় হয়ে দাঁড়াল। 

একসময় অবশ্য সে এমএ পাস করল। একটা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে চাকরিও পেল। চার বছরে দুবার বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ফেল করল। চাকরি বদল করল। 



ভাগ্যটা কিছুটা খুলল তত দিনে, এক এনজিওতে মোটামুটি ভালো বেতনের চাকরি মিলল। প্রধানত তার ইংরেজির বরাতে। | তাসিরের গল্পটা অবশ্য আর বাড়ল না। তাতে শুধু কিছু যোগ-বিয়োগ হলো। বোনটাকে বিয়ে দেওয়া গেল, ভাইটা পাস করে চাকরি নিল এক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে—ফ্লোর ম্যানেজার বা এরকম কিছু। তাতে তার কষ্টের ঘরে কিছুটা বিয়োগ হলো। 

এবার সে মনোযোগ দিল মায়ের দিকে। মাকে ঢাকা নিয়ে এল। কিন্তু মা বললেন, তিনি একা থাকতে পারবেন না, তার একটা বউমা চাই। 

বেচারা তাসির। পয়সা কোথায় যে বিয়ে করবে ? তার পরও মাকে হতাশ করতে তার ইচ্ছে হলো না। এক রাতে, যখন মা ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে তার টিনের তোরঙ্গ খুলে একটা মখমলের থলে বের করে ভেতর থেকে গয়নার একটা সঞ্চয় তুলে এনে তাসিরের হাতে দিলেন এবং বললেন, 'এই গয়না শত বিপদে, শত অভাবেও বিক্রি করি নি বাবা, এটি রেখেছি বউমাকে নিজের হাতে পরাব বলে, তাসির কাদতে কাদতে বলল, 'মা, আমাকে আর একটা মাস সময় দাও।” 

মা খুশি হলেন, আবার একটু অবাকও হলেন। তিনি ভেবেছিলেন ছেলে হয়তো ছ'টা মাস চাইবে। 

তবে আজকালকার ছেলে বলে কথা। সময়ের হিসাব করতে ওস্তাদ। 

বললে বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, ত্রিশ বছর বয়স হয়ে গেলেও তাসিরের, যাকে বলে নারীবিলাস, নেই। মেয়ে দেখলে তার চোখ বড় হয় না, দেখার জন্য ব্যগ্রও থাকে না। জীবনটা তার এমনই কঠিন যে, উপার্জনের ধান্দায় স্বপ্ন-দিবাস্বপ্ন দেখার, মেয়ের শরীর কামনা করার, কল্পনায় সম্ভোগ করার ইচ্ছাও তার সচরাচর জাগে না। সচরাচর কেন, জাগে না বললেই তো হয়। সে জন্য নিজেকে এক মাসের একটা ডেডলাইন ধরিয়ে দিয়ে মাকে আপাত-সন্তুষ্ট করে যখন সে পথে বেরোল, দেখল, সর্বনাশ, তার চারপাশে গিজগিজ করছে অসংখ্য মেয়ে, কিন্তু একজনকেও সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। কারও মুখ, কারও হাসি, কারও কালো-বাদামি চুলের বিস্তার, কারও হাতের কোমল ওঠানামা—এসবই তার চোখে পড়ে, সম্পূর্ণ মানুষটা যেন থাকে আড়ালে। তার ভয় হলো, এরকম অসম্পূর্ণ মেয়েদের থেকে কাকে সে বেছে নেবে ? তাকে যে সাহায্য করবে, সেরকম কেউ নেই। বোনটা থাকে রাজশাহী। তা ছাড়া তাসিরকে সে সারা জীবন দেখেছে ঠিক বড় ভাই নয়, বরং অনেকটা বড় চাচার মতো, সেরকমই গাম্ভীর্য, দায়িত্ববোধ, দূরত্ব। সেই লোকের জন্য মেয়ে খোজা, বলতে গেলে বেয়াদবির পর্যায়েই তো পড়ে। 

প্রথম সপ্তাহটা দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়ালে তাসিরের ভয়টা তীব্র হলো। এখন উপায় ? 

উপায়টা তাকে করে দিল স্নেহাই। স্নেহা ? হ্যা ভাই, তবে একটু অপেক্ষা করুন, গল্পটা শুরু হলো মাত্র। 

একটা কাজ নিয়ে এক এনজিও অফিসে গিয়ে তাসির দেখল, রিসেপশন রুমে বসে আছে জনা সাতেক মেয়ে। একটা চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। ছ'মাস আগে হলে মেয়েগুলোকে তার চোখে পড়ত না, কিন্তু আজ পড়ল। ডেডলাইনের মাত্র ১২টা দিন বাকি, সে জন্য। কিন্তু আবারও সেই টুকরো টুকরো ছবি—কারও দ্রু, কারও শঙ্কার ঘামে ভেজা নাক, কারও গালের বিপন্ন লাবণ্য। কিন্তু টুকরাগুলোর মিছিলে হঠাৎ একটা আস্ত ছবি—আস্ত একজন মানুষ—একটি পূর্ণ নারীই বস্তুত—ভেসে উঠল এবং অবাক, মেয়েটি স্নেহা! না না, আহমদ শরীফের মেয়ে স্নেহা নয়, এ মেয়ের কোনো নাম নেই, কিন্তু মুখটা যেন একেবারে স্নেহার মুখ কেটে বসানো। মুখটা সে জন্য পুরোটা দেখা হলো এবং সেই মুখ থেকে ঘাড়, গলা হয়ে তাসিরের চোখ নামল। অথবা উঠল, কারণ, সে মেয়েটির চুলের ওড়াউড়ি দেখল। ফ্যানের বাতাসে উড়ছে চুল কালো-বাদামি, ঠিক স্নেহার যেমন ছিল।। 

কাজ শেষ করে বাইরে বেরিয়ে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকল তাসির। না, ঠিক দাঁড়িয়ে থাকা নয়, একটু দূরের এক চা-বিস্কিটের ঝুপড়ি থেকে কেনা এক কাপ চায়ে তস্তে আস্তে চুমুক দিতে দিতে দাঁড়িয়ে থাকল তাসির। এক কাপ খাওয়া হলে দ্বিতীয় একটা কাপ নিল। সেটি শেষ হওয়ার আগেই এনজিও থেকে বেরিয়ে এল স্নেহা। স্নেহা নামটাই আপাতত থাকুক মেয়েটির, কেন, তা একটু পরে বলা যাবে। 

স্নেহা খুব ধীর পায়ে হাঁটতে থাকল। তার হাঁটা দেখে তাসিরও বুঝল, চাকরিটা হয় নি। এটি মনে হতেই কেন জানি মনটা খারাপ হয়ে গেল তার। স্নেহা বলে কথা। সে এগিয়ে গিয়ে স্নেহার পাশাপাশি হাঁটতে থাকল। তাসিরের পায়ের শব্দে স্নেহা তাকাল, বিরক্ত, ক্লান্ত সে চাহনি। চাকরিটা হয় নি?’ তাসির জিজ্ঞেস করল । 

স্নেহা দাঁড়িয়ে পড়ল। 'আপনি কে? কেন জানতে চান ? 

‘আমি কেউ না। অফিসটাতে একটা কাজে এসেছিলাম। রিসেপশনে আপনাকে দেখলাম। আবার বেরোতে দেখলাম। দেখে মনে হলো চাকরিটা হয় নি। এতে আমার খুব লাগছে। কিছু মনে করবেন না। সরি। এখন চলি।' 

তাসির সত্যি পা চালাল। ‘শুনুন, স্নেহা ডাকল। আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করলেন কেন ? 

ঠাট্টা কেন করব?' বিপন্ন গলায় বলল তাসির। খারাপ লাগছিল, তাই বললাম। মাইন্ড করেছেন, এ জন্য সরি। 

আবার হাঁটা দিল তাসির এবং আবার স্নেহা ডাকল, 'শুনুন। 

তাসির থামল। চাকরিটা হয় নি, স্নেহা বলল, মাথাটা নিচু করে। তাতে অবশ্য অবাক হই নি, কষ্টও পাই নি; কষ্ট পেয়েছি, যখন শুধু আমার নাম জিজ্ঞেস করে একটা প্রশ্নও না করেই আমাকে বলেছে “আসুন”। 

মাটির দিকে তাকিয়ে এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল’ তাসির। এমনই হয়, চাকরিটা নিশ্চয় কে পাবে, তা আগে থেকেই ঠিক করা। যে লোকটা এই এনজিও চালায়, সে একটা এনজিও ব্যবসায়ী। তার নাম রাসেল খান। সিনেমার ভিলেনের মতো। 

স্নেহা হাসল। 

“সরি, আপনাকে কষ্ট দিলাম। চলি,' বলে পা চালাল তাসির। এমনিতেই তার দেরি হয়ে গেছে। অফিসে কাজও পড়ে আছে। কিন্তু চলতে গিয়ে হঠাৎ তার মনে হলো, তার নিজের বস তো ঠিক উল্টো, দয়ালু নায়কের মতো। তাকে কি বলা যায় স্নেহার চাকরির জন্য ? পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে চলা থামাল তাসির। স্নেহাকে বলল, 'আমি একটা এনজিওতে চাকরি করি। আমার বস ভালো মানুষ। তাকে বলব, আপনাকে একটা চাকরি দেওয়া যায় কি না। কেমন ? এই নিন আমার কার্ড। ঠিক সাত দিন পর একটা ফোন করবেন। আচ্ছা চলি। 

তাসির চলে গেলে স্নেহার মনে হলো, এরকম ঘটনাও তাহলে ঘটে। তার মন খারাপটা চলে গেল। যেন মন খারাপ করার কিছু নেই আজ এই ঝকমকে রোদের দিনে। 

না, মাকে আশ্বস্ত করে দেওয়া ডেডলাইন মানা গেল না। তাসির কষ্ট পেল, মাকে বলতে মনটা ভেঙে গেল, তবু বলল, “মা, মনে হয় না এক-দুই মাসে কিছু হবে।' 

মা তার চুল নেড়ে আদুরে গলায় বললেন, 'অস্থির হওয়ার কিছু নেই, বাবা। এক-দুই মাস কেন, ছ'মাস হলেও সমস্যা নেই। একা থাকাটা একটু একটু অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। তারপর আস্তে করে বললেন, 'একটা মেয়েকেও মনে ধরেনি তোর ?” 

তাসির হাসল । বলল, 'ধরবে, মা, সবুর করো।' কিন্তু যা বলতে পারল না, তা তার কষ্টের কথাটা। স্নেহাকে পেয়েও হারানোর কষ্ট। | স্নেহা সাত দিন পর কেন, এর পরের সাত দিন পরও ফোন করে নি। এক রাতে তাসির সিদ্ধান্ত নিল, এনজিও ব্যবসায়ী রাসেল খানের অফিসে গিয়ে প্রোগ্রাম অফিসার নির্মলকে ধরে ওই দিনের ইন্টারভিউর ফাইলটা বের কের সে স্নেহার ঠিকানা-ফোন নম্বর জোগাড় করবে, তারপর তার খোজে যাবে। কিন্তু তারপর আরও সাত দিন চলে গেলেও কাজটি করার সাহস অথবা প্রবৃত্তি তার হলো না। এতে। নির্মলের কাছে সে ছোট হবে। কিন্তু ছোট হয়েও যদি এরকম নিশ্চিতি সে পেত যে স্নেহা তার বাড়িতে তাকে সমাদরে বরণ করবে, তাহলেও ছোট হতে তার আপত্তি ছিল না। কিন্তু স্নেহার বাড়ি গিয়ে হাজির হলে তার ভাই বা বাবা অথবা উভয়ে যে চড়াও হবে না তার ওপর লাঠিসোটা নিয়ে, সেই গ্যারান্টি কোথায় ? 

খুব মনঃকষ্টে পড়ল তাসির। তবে মনঃকষ্টের বয়সটা তেমন বাড়ল না। মনঃকষ্টের দুই দিনের মাথায় স্নেহার একটা ফোনই সে পেয়ে বসল। 

সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাসায় ফিরছিল তাসির। মাইল খানেকের পথ। হেঁটেই ফেরে। ফোনটা এল। নারীকণ্ঠ। 'হ্যালো, তাসির আফসান সাহেব বলছেন? 

‘জি? উত্তরটা তার হঠাৎ উদ্বেগে একটা প্রশ্ন হয়েই দাড়াল। আমি শামসুন্নাহার খানম। আমাকে মনে রাখার কথা নয় আপনার। কিছুদিন আগে একটা এনজিও অফিসে... ইত্যাদি। 

বেশ সময় নিয়েই কথা বলল শামসুন্নাহার। এই মেয়েটিই যে ওই দিনের স্নেহা, তা বুঝতে অবশ্য সময় লাগল না তাসিরের। মেয়েটি যা বলল তা হলো, সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তাসিরের সাহায্য সে নেবে না। সে কারও করুণা চায় না। সে নিজেই চাকরি খুঁজে নেবে। একটা চাকরি সে পেয়েছে শেষ পর্যন্ত, একটা কিন্ডারগার্টেনে পড়ানোর চাকরি। চাকরিটা পেয়েই সে তাকে ফোন করেছে। 

কিন্ডারগার্টেন কেন, জিজ্ঞেস করলেন ? ভাই, দক্ষিণ গোরান মহিলা কলেজ থেকে ইসলামিক ইতিহাসে বিএ করে কি কেউ এনজিওর নির্বাহী অথবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার, অথবা সিটি ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ হতে পারে ? তা-ও ভালো যে মেয়েটি শিক্ষকের চাকরি পেয়েছে। সেই খুশিতে সে ফোন করেছে। - তাসিরকে ধন্যবাদ দিয়েছে। বলেছে, সামনাসামনি দিতে পারলে খুশি হতো, কিন্তু এই শহরের যা যানজট। 

শামসুন্নাহার ইঙ্গিত দিয়েছে ঘটনার এখানেই শেষ। তার ফোনের মর্মবাণী: আপনি ভালো মানুষ, আমাকে একটা অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ। এখন বিদায় । আমাদের এই পলকা চেনাজানার ওপর চিরদিনের পর্দা পড়ল। 

কিন্তু বিদায় বললেই কি তাসির বিদায় হয় ? সে যে স্নেহাকে পুনঃপুনরাবিষ্কার ফলে একদিন শামসুন্নাহারের স্কুলে গিয়ে হাজির হলো তাসির। স্কুলের বাইরের ফুটপাতে। তবে এই ফুটপাতের আশপাশে চায়ের দোকান নেই। তাই সে একটা সিগারেট কিনে টান দিতে থাকল। 

একটা সিগারেট পাঁচটাতে গিয়ে দাঁড়াল। হাঁটাহাঁটি চলল। মানুষের সন্দেহ বাঁচিয়ে স্কুলের গেটে নজর রাখা কঠিন। সেই কাজটি সে করল। 

একসময় স্নেহাকে দেখা গেল। একটা টিয়া-রং শাড়ি পরেছে। চুল বাতাসে উড়ছে যথারীতি। তাকে অপূর্ব লাগছে। 

তাসিরকে দেখে ভয়ানক অবাক হলো স্নেহা। আপনি এখানে?” চোখে বিস্ময়বিরক্তি-জিজ্ঞাসা মিশিয়ে সে জানতে চাইল। 

তাসির বোকার মতো হাসল। আপনার চাকরি সেলিব্রেট করতে ইচ্ছে হলো, তাই। 

‘আমার চাকরি সেলিব্রেট করার আপনি কে?’ একটু রূঢ়ভাবে, সরাসরি বলেই ফেলল স্নেহা। 

স্নেহার কথায় তাসিরের উৎসাহ কপূরের মতো উবে গেল। সে বোকার মতো বলল, “তাইতো, এই কথাটা তো মনে আসে নি, তারপর কিছু না বলেই সে হাঁটা | দিল। 

'শুনুন, স্নেহা বলল, “কিছু মনে করবেন না, কিন্তু আমি একজন টিচার। | আপনার সঙ্গে কথা বলছি রাস্তায় দাঁড়িয়ে, এই বিষয়টা আমাকে বিপদে ফেলতে পারে।' 

‘সেটা কেন হবে?’ তাসির জানতে চাইল। 

স্নেহা হাতের ঘড়ির দিকে তাকাল। আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু আমাকে যেতে | হবে। আমার হাজবেন্ড অফিস থেকে ফিরবে।' 

তাসিরের দুটি পা রাস্তায় আটকে গেল। রাস্তার পাশের টেলিফোনের খাম্বাটা | তার ওপর ভেঙে পড়ল। 

ছ'মাস গেল; আরও ছ'মাস গেল। স্নেহার পর আর কোনো মেয়েই পূর্ণ শরীর নিয়ে ধরা দিল না তাসিরের কাছে। মা হতাশ হলেন, কিন্তু মেনেও নিলেন। তত দিনে | টেলিভিশনে স্টার জলসা আর লাইফ ওকে চ্যানেল দুটি তার দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যার সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এদের নানা সিরিয়াল যখন দেখেন, তখন তার এরকম মনে হয়, পুত্রবধুরা জগতের আপদ। এদের মতো কুটিল হিংস্র প্রাণী পৃথিবীতে নেই। ভাগ্যিস, তাসির বিয়ে করে নি। ঘরে পুত্রবধু নেই বলে তাকে মাথার পেছনে একটা চোখ লাগিয়ে তাই চলতে হচ্ছে না। 

সিরিয়াল দেখার পর অবশ্য কথাটা তিনি ভুলে যান। তবে তাসিরকে আর বিয়ের | জন্য তাগাদা দেন না। তাসিরের উন্নতি হয়েছে—না হয়ে তো যায় না, যেরকম কাজপাগল লোক সে। কাজ ছাড়া কিছুই বোঝে না। তা ছাড়া তার ইংরেজিটা তো আছেই। সেটি আরও ঝকঝকে হয়েছে। দয়াল নায়কের এনজিও ছেড়ে সে বহুজাতিক এক এনজিওতে কাজ নিয়েছে। বেতন বেড়েছে, অফিসের গাড়ি মিলেছে, একটা আস্ত বিভাগের দায়িত্ব পেয়েছে। সেই বিভাগে দুই জুনিয়র এক্সিকিউটিভের পদ খালি হয়েছে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন গেছে। 

ইন্টারভিউয়ের দিন প্রার্থীদের ফাইল দেখতে দেখতে তাসিরের মাথা ঘুরে গেল। ছ’জনের হ্রস্ব তালিকায় জ্বলজ্বল করছে স্নেহার নাম—না, নাম নয়, নামটা তো শামসুন্নাহার, আলো ছড়াচ্ছে তার পাসপোর্ট আকারের ছবি। ছবিটা শুধু মাথা, চুল, গলার এবং কাঁধের একাংশের, অথচ তার চোখের সামনে জেগে উঠেছে স্নেহার পুরো শরীর, তার টিয়া-রং শাড়ি, কাধে ঝােলানো ব্যাগ, মুঠোফোন ধরা হাত এবং আশ্চর্য, পাসপোর্ট ছবির ভেতর অথবা আড়াল থেকেই তার কঠিন কিছু কথা আমাকে আর বিরক্ত করবেন না বা এরকম কিছু। আর ঘণ্টা দুই পর স্নেহাকে সামনে বসিয়ে মিজ রাখসান্দা আর মি, এম আর গনির সঙ্গে মিলে ইন্টারভিউ নিতে হবে। | রাখসান্দা আর গনি তার জুনিয়র, যদি জানতে চান। সে-ই বোর্ড-প্রধান। কিন্তু ওদের সামনে স্নেহাকে তৃতীয়বার আবিষ্কারের বিষয়টি সে কীভাবে মোকাবিলা করবে, ভেবে পেল না, বিশেষ করে আবিষ্কার যেখানে একটা কঙ্কালের হাড়গোড় খুঁজে পাওয়ার মতো। 
এসব ভাবতে ভাবতে সে ঘেমে উঠল। রাখসান্দাকে ফোন করল। 'ক্যান ইউ টেইক ওভার?' সে জিজ্ঞেস করল। রাখসান্দা তাকে বলল, কোনো কারণে তাসির ব্যস্ত থাকলে, ইন্টারভিউ না নিতে পারলে তা পেছানো যাবে। কিন্তু তাসিরকে থাকতে হবে। 'দ্যাটস দ্য কাস্টম, মে বি দ্য রুল, স্যার’, রাখসান্দা বলল। 

আশ্চর্য, রাখসান্দা মেয়েটার সঙ্গে সে কাজ করছে তিন মাস। সুন্দরী মেয়ে, বিয়ে-শাদিও করে নি। কিন্তু তাকে দেখলে সে দেখে তার প্লাক করা ভুরু, হালকা মেকআপ দেওয়া গাল অথবা লিপস্টিক লেপা ঠোট। ভগ্নাংশ মানুষ, সম্পূর্ণ নয়। তাসির নিজেকেই এখন ভগ্নাংশ ভাবতে শুরু করেছে। মানুষ নামের একটা অসম্পূর্ণতা সে। একটা প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা। অথবা জিনের ঘরে কোনো গুরুতর ঘাটতি। 

ইন্টারভিউ শুরু হলো। পরিচয়-টরিচয়, আগে কোথায় চাকরি করেছে, কেন এই চাকরির জন্য আবেদন করেছে প্রার্থী, সেসব প্রশ্ন তাসির করছে শুরুতে, তারপর ছেড়ে দিচ্ছে রাখসান্দা আর গনির হাঁতে। তিনজনের মধ্যে একজনকে তাদের মনে ধরল। চার নম্বরে প্রার্থীর পালা আসতে আসতে তাসির নিজেকে শীতল রেখেছে, শান্ত রেখেছে, হৃৎপিণ্ডের লাফালাফিটা আটকে রেখেছে, কিন্তু ঘামছে, ভেতরে ভেতরে ঘামছে, বাইরেও। চার নম্বর প্রার্থী হিসেবে ঢুকল স্নেহা। এক প্রস্ত হাসি মুখে নিয়েই ঢুকেছে, রাখসান্দার দিকে তাকাতে যা একটু প্রশস্ত হয়েছে। কিন্তু তাসিরকে দেখেই তার সব হাসি উবে গেল। যেন ভূত দেখেছে। সে দাড়িয়ে থাকল, তার সকল শক্তি যেন শেষ। 

রাখসান্দা কোমল গলায় বলল, “হ্যাভ আ সিট, প্লিজ।' তাসির অবশ্য তৈরি ছিল, সে জানত, স্নেহার কঙ্কালটা হেঁটে ঢুকবে এবং তাসিরের মুখ থেকে সব রক্ত সরে গিয়ে সেটি মরা মানুষের মুখের মতো হয়ে যাবে। ভালোই! এক মরা মানুষ তাকাবে এক কঙ্কালের দিকে। সে জন্য তাসির চোখ নামিয়ে ছিল। সে স্নেহার সিভি দেখছিল। তাকে দেখে রাখসান্দা-গনির মনে হলো, যেন সেই সিভিতে সে মজার কিছু আবিষ্কার করেছে। অবাক, ভেতরে ভেতরে ঘামছে তাসির, তার মুখের রক্তও সরে গেছে, হাতটা হয়তো সামান্য কাঁপছেও, কিন্তু বাইরে বেশ একটা নির্বিকার ভাব ধরে রেখেছে। 

হঠাৎ তাকাল সে, সরাসরি চোখ মেলল স্নেহার দিকে, বলল 'নেইম ? 

তাসিরের কাঠখোট্টা গলা শুনে একটু অবাক হলো স্নেহা, বলল, 'শামসুন্নাহার খানম।' 

'আপনি আসতে পারেন,' বাংলায় বলল সে এবং স্নেহা থেকে চোখ ফিরিয়ে তার সিভিটা আবার পরীক্ষা করতে থাকল। 

স্নেহা তড়িতাহত হলো, রাখসান্দা আর গনি অবাক হলো। ব্যাপারটা এতটাই অপ্রত্যাশিত, অবাক হওয়ার মতোই। স্নেহা উঠে দাড়াল। রাখসান্দার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল এবং তাকেই শুধু “থ্যাংক ইউ বলে দ্রুত বেরিয়ে গেল। | রাখসান্দার খারাপ লাগল ব্যাপারটা। স্নেহাকে রীতিমতো অপমান করেছে তাসির, সেরকমই তার মনে হলো। স্নেহার জন্য তার মায়া হচ্ছে, মেয়েটাকে তার খুব পছন্দ হয়েছে। কী আত্মপ্রত্যয়ী মেয়ে। তাসির তার মুখের ওপর ‘আসুন’ বলার পরও নিজেকে সামলে রেখেছে, নিজের ব্যক্তিত্বে একটুকু আঁচড় লাগতে দেয় নি, কোনো ব্যাখ্যাও চায় নি। 

এমন একটি মেয়ে পেলে রাখসান্দার কাজ কত সহজ হতো। সে তাসিরের দিকে ফিরে বেশ কঠিন গলায় বলল, 'স্যার ?” 

অর্থাৎ কাজটা কী হলো ? তাসির বলল, “দক্ষিণ গোরান মহিলা কলেজ। হা।' গনি হাসল। তাসিরের তুষ্টিটা তার প্রয়োজন। 

‘কল দ্য নেক্সট ক্যান্ডিডেট, তাসির বলল রাখসান্দাকে, সব প্রশ্নের আলোচনার ইতি টেনে দিয়ে। 

আধা ঘণ্টা পর একটা সিগারেট খাওয়ার ইচ্ছা হলো তাসিরের। এরকম মাঝেমধ্যে হয় এবং সিগারেট খাওয়া মৃত্যু ডেকে আনে জেনেও খায়। বাড়িতে অবশ্য নয়, অফিসে। কিন্তু অফিস ধূমপানমুক্ত এলাকা, বাইরে রাস্তার ফুটপাতে দাড়িয়ে খেতে হয়। তাসিরের ভালোই লাগে, অফিসের এসি লাগানো ঘরের অপ্রয়োজনীয় ঠান্ডা থেকে বেরিয়ে শরীরে বাতাস লাগাতে, গাড়ির ধোয়া আর ধূলিবালি গায়ে মেশাতে। ভাগ্য ভালো থাকলে রাস্তার পাশ ঘেঁষে অনেক দ্বিধা নিয়ে দাঁড়ানো উঁচু জামগাছটাতে বসা কোনো পাখির ডাক কানে আসে। কিছুক্ষণ নিজেকে একা পায় তাসির। কিন্তু 

একা সময়টা আসলে শূন্যতারই। কোনো বিশেষ ভাবনা মনে আসে না তার। শূন্যতাটা সে পছন্দই করে। মনটা ফাঁকা হলে তার স্বস্তি হয়। 

আজও জামগাছটার নিচে সে দাঁড়াল। একটা সিগারেট ধরাল। উল্টো দিকের বাড়ির নিচতলার দারোয়ান তাকে সালাম দিল। লোকটার ছোট একটা ভাইকে সে তার এক প্রকল্পে ঢুকিয়ে দিয়েছে। একটা কুকুর উদ্দেশ্যহীন ঘুরছে। একটা গাড়ির নিচে শুয়ে আছে আরেকটা কুকুর। 

শীতের দিন। একটু হালকা বাতাস দিচ্ছে। রাস্তাটা চুপচাপ। এটি চুপচাপই থাকে সারা দিন, শুধু সকাল-বিকাল একটু যা ভিড় হয়। এখন রাস্তাটা রোদ পোহাচ্ছে, যেহেতু দিনটা যাচ্ছে দুপুরের দিকে। সিগারেট খেতে খেতে রাস্তার নিরুদ্বিগ্ন এই বিশ্রাম তাকে আনন্দ দিল। সে মুখে হাসি মেলে রাস্তার দিকে তাকাল। তার চোখে পড়ল ওই পারের ফুটপাত থেকে কেউ একজন একটা পা ফেলল রাস্তার ওপর। পাটা এক মুহূর্তে একজন আস্ত মানুষ হয়ে দাঁড়াল। মানুষ মানে নারী। অন্য কেউ হলে সেটি ওই একটি পা-ই থেকে যেত। কিন্তু মানুষটা যে স্নেহা। একমাত্র স্নেহাই পূর্ণ নারী তার কাছে। 

জামগাছের নিচে এসে সােজা হয়ে দাঁড়াল স্নেহা। আমি আজ সারা দিন এখানে আপনার জন্য দাড়িয়ে থাকতাম। আপনার অফিসের দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, দিনে একবার-দুবার বেরোন আপনি, এখানে দাড়িয়ে কৃচিৎ সিগারেটও খান।' 

হা', অনিশ্চিত বলল তাসির। তার খুব ভালো লাগছে স্নেহাকে দেখে, আবার অস্বস্তিও লাগছে। খুব অবাক হয়েছে সে স্নেহাকে তার সামনে দাঁড়াতে দেখে, আবার একটু শঙ্কাও হচ্ছে, স্নেহার উদ্দেশ্যটা কী, সেটি ধরতে পারছে না বলে। তবে স্নেহার একটানা কথাগুলো তাকে সময় দিয়েছে নিজেকে একটুখানি গুছিয়ে নেওয়ার। 

‘আমাকে অপমান করার অধিকার আপনাকে কে দিল?' স্নেহার সােজাসাপ্টা প্রশ্ন। 

‘অপমান করব কেন ? আপনি তো ইন্টারভিউ দিতে এসেছিলেন। আমার কিছু জিজ্ঞেস করার ছিল না, তাই আপনাকে শুধু শুধু বসিয়ে রাখি নি। 

‘তাহলে আমাকে ডাকলেন কেন ? 

ডাকলাম, যেহেতু আপনার যোগ্যতা আছে। কিন্তু আপনি আমার রুমে ঢোকার একটু আগেই দেখলাম, আপনি সিভিতে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। 

‘মিথ্যা তথ্য ? 

‘জি। আপনি লিখেছেন, আপনি অবিবাহিত। অথচ আপনার স্বামী আছেন, তিনি সন্ধ্যা ছ'টায় অফিস থেকে বাড়ি ফেরেন।' 

স্নেহার কঠিন মুখটা হঠাৎ নরম হয়ে গেল। একটু আগের রাগটা যেন তরল হয়ে গেল। সে হেসে ফেলল। বলল, “না, সিভিতে মিথ্যা তথ্য দিই নি। মিথ্যাটা আপনাকে বলেছিলাম। আমার বিয়ে হয় নি, বিয়ে করার সময় পাই নি। 

‘কেন মিথ্যা বলেছিলেন?' কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল তাসির। | ‘মিথ্যা না বললে আপনি বাড়িতে গিয়েই হাজির হতেন,' স্নেহা বলল এবং হাঁটা দিল। | ‘শুনুন, তাসির ডাকল। 'আপনি তাহলে একটু অফিসে আসুন। আপনার ইন্টারভিউটা নিই। 

স্নেহা হাসল। না, তার আর প্রয়োজন নেই। এখন আপনি আসুন,' মুখে হাসি নিয়েই পথে নামল স্নেহা। 

তাসির হিসাব করে দেখল, নতুন বছর আসতে তেরো দিন বাকি। তেরো দিনের তিন-চার দিন যাবে বড়দিনের ছুটিতে। মা চাইছেন বাড়ি যেতে, তার নিজেরও ইচ্ছা, বাড়ি যায় । কিন্তু নতুন বছরের প্রথম দিনটা সে ঢাকাতে থাকতে চায়। মাকে বলল, ‘সামনের মাসে যাব। ছুটি নেব।' | জানুয়ারির এক তারিখ সকালে উঠে সে বাইরে বেরোল। আজ অফিস বন্ধ। দিনটা শনিবার। এখন সে যাবে দক্ষিণ গোরান। গোরানের ভূগোলটা কঠিন, কিন্তু তাকে যেতে হবে এবং যাওয়ার পথে দামি একটা ফুলের দোকান থেকে এক গোছ গোলাপ কিনতে হবে। | দক্ষিণ গোরানের বিষন্ন তলপেটে এক রং ওঠা চারতলা বাড়ির সামনে গিয়ে রিকশা থেকে নামল তাসির। আজ সে অফিসের গাড়ি নেয় নি, রিকশাকেই বেছে নিয়েছে। শীত পড়েছে, কিন্তু শীতটা কেমন একটা চনমনে ভাব এনে দিচ্ছে মনে। তসিরের মেজাজটা ফুরফুরে। তার মনে একটা গানের চরণ বারেবারে বেজে যাচ্ছে, ‘শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন।' 

চারতলা বাড়ির নিচতলায় গিয়ে কড়া নাড়ল তাসির। বিবর্ণ বাড়ি, ম্যাড়মেড়ে দরজা, জং ধরা কড়া। বেল নেই, এমন বাড়িতে বেলটা বেমানান। নিচতলায় দুটি ফ্ল্যাট, মুখোমুখি, মাঝখান দিয়ে ওপরে ওঠার সিড়ি। সিড়ির রেলিং ভাঙা, প্রতিটি সিড়ির গোড়ায় সিমেন্ট উঠে ইট বেরিয়ে আছে। নিশ্চয় সিড়ি বাওয়া কঠিন একটা কাজ মানুষজনের জন্য। সকাল সাড়ে দশটা। কোনো একটা বাড়ি থেকে রান্নার গন্ধ ভেসে আসছে। 

এই দালানে স্নেহাকে সে ভাবতে পারে না। স্নেহার টিয়া-রং শাড়ি এ দালানে মানায় না। 

দরজাটা খুলল, প্রথমে একটা পাট, অল্পখানি। একটি মুখের অল্পখানি দেখা দিল; উকি দিচ্ছে সেই মুখের মালিক। কিন্তু ওই একখানি মুখই যথেষ্ট, সেটিই একটি পরিপূর্ণতার ঘোষণা। পরিপূর্ণতাটা স্নেহা। 

‘আপনি?' স্নেহা যেন আকাশ থেকে পড়ল। 

গোলাপ ধরা হাতটি পিঠের পেছনে চালান করে দিয়েছিল তাসির। সেটি সামনে এনে মুখে একটা ক্ষমাপ্রার্থী হাসি ধরে বলল, “ক্ষমা চাইতে এসেছি।' 

স্নেহার আকাশ থেকে পড়া চোখ এবার পড়ল গোলাপের ওপর। কপালের রেখায় একটা প্রশ্নের চিহ্ন জাগল। 

‘হ্যাপি বার্থ ডে । শুভ জন্মদিন। হাত বাড়িয়ে গোলাপের তোড়া এগিয়ে দিল স্নেহার দিকে। 

‘জন্মদিন হবে কেন ? কে বলেছে ? 

তাসির অবাক হলো, “কেন, আপনার সিভিতে তা-ই লেখা ছিল। স্নেহার অবাক ভাবটা গেল, কপালের ভাজ মেলাল। সে হেসে বলল, আমার স্কুলের স্যার এই দিনটি দিয়েছেন, আমার মা আমাকে জন্ম দিয়েছেন অন্য আরেক দিন।' 

‘সেটি কোন দিন? 

‘সেটি আপনার জানার দরকার নেই। আর হ্যা, আপনার ক্ষমা চাইতে হবে না, সিভিতে দেওয়া জন্মদিনটা আসলেই তো মিথ্যা। এখন আসুন। আর হ্যা, জীবনেও আর আমার ছায়া মাড়াবেন না। 

“ঠিক আছে, তাসির বলল, “কিন্তু গোলাপগুলো তো আপনার জন্য। জন্মদিন ভুল হোক আর না-ই হোক। সেগুলো নিন, প্লিজ।' তাসিরের ‘প্লিজ’-এ প্রচুর অনুরোধ ছিল । তাতে কাজ হলো। স্নেহা হাত বাড়িয়ে ফুলগুলো নিল। তার চোখের তারা ঝিলমিল করল। গোলাপ বিশেষজ্ঞ আবদুশ শাকুর একবার আমাকে বলেছিলেন, গোলাপ একই সঙ্গে নাক এবং চোখকে পরাস্ত করে বলে গোলাপে মানুষ দুর্বল। 

কথাটার প্রমাণ স্নেহা দিল । সে দুর্বল গলায় বলল, “ধন্যবাদ। তিন মিনিট আগে সে তাসিরের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে তাকে রাস্তা ধরিয়ে দিতে চেয়েছিল। এখন সে দরজাটা খুব আস্তে আস্তে বন্ধ করতে শুরু করল, যাতে তা গলিয়ে তাসিরের শেষ কোনো কথা ঢুকে পড়তে পারে। 

পড়লও। এবং তা তাসিরের একটা হঠাৎ মন্তব্য। তাসির বলল, “সিভিতে আপনি আরেকটি তথ্য দেন নি। এটিও খারাপ হয়েছে।' 

‘আচ্ছা? অবাক প্রশ্ন করল স্নেহা। 

‘হ্যা। আপনার নাম যে স্নেহা, তা লেখেন নি। তাসিরের চোখে ছেলেমানুষি দুষ্টামি । 

স্নেহা হাসল। এ ঘটনাও তাহলে ঘটছে। একটি লোক তার বাড়ি এসে বলছে। তার নাম স্নেহা। পাগল ? 

স্নেহাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তাসির বলল, “যেদিন আপনাকে প্রথম দেখেছি, সেদিনই নামটা মনে এসেছে। এ নামই আপনাকে মানায়। 

‘আচ্ছা ?” 

‘জি। আপনার মতো সুন্দর মেয়ের জন্য এ নাম। না, ভুল বললাম, এ নামটা আপনার মতো মেয়ের হলে তা খুব সুন্দর হয়ে যায়। 

স্নেহা দরজাটা অর্ধেক খোলা রেখে দাঁড়িয়ে থাকল। বলল, 'আপনাকে ভেতরে ডেকে এক কাপ চা খাওয়ানো উচিত ছিল। কিন্তু বাবার এই সরকারি বাসায় আড়াইখানা ঘর। এই ঘরে...' একটুখানি করুণ শোনাতে শুরু করেছিল স্নেহার গলা, তাতে সে কথায় রাশ টানল। আশা করি মাইন্ড করবেন না।' 

‘আরে না, আমি বসতে আসি নি, চা খেতে আসি নি। আপনি যে কথাটা অন্তত বলেছেন, তাতে কৃতজ্ঞ। আমি তো ভেবেছিলাম আপনি আমাকে দরজায় দেখেই পুলিশ ডাকবেন। তাসির হাসল। 

হাসল স্নেহাও। কোমল চোখে তাসিরের দিকে তাকাল। দিনটা সুন্দর,' তাসির বলল, 'আপনার জন্মদিন না হোক, বছরের প্রথম দিন। সেলিব্রেট করার মতো। যাক, সেলিব্রেট করা তো হলো। এখন যাই,' তাসির বলল এবং খুব আস্তে, যেন পায়ের নিচে কোথাও একটা মাইন পোঁতা, একটু তাড়াহুড়াতেই সেটা একটা বিস্ফোরণ ঘটাবে, আর মুহূর্তটাকে তছনছ করে দেবে। 

‘আপনি খুব সেলিব্রেশনের ভক্ত, বোঝা গেল। কিন্তু আজ কী সেলিব্রেট করলেন ? কীভাবে করলেন?' চোখে কৌতুক নিয়ে প্রশ্ন করল স্নেহা। 

“এই তো—এই আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা হলো, আমাকে যে চা খাওয়ানো যায়, চা খাওয়ানোর যোগ্য একটা মানুষ যে আমি, এই চিন্তাটি যে আপনার মাথায় এল—এসবই তো সেলিব্রেশন। তাই না? পা দুটি ঘরের বাইরের দিকে ফেলে কথাগুলো বলল তাসির। মনে হলো, এবার সে সত্যি পা চালাবে। 

‘দাঁড়ান, চা খাওয়ানোর কথাটা যখন বলেছি,...' স্নেহা বলল এবং বলা থামিয়ে হঠাৎ কিছু একটা যেন ভাবল। তাসিরের মনে হলো, মুহূর্তগুলো একটা সত্যি সত্যি বিস্ফোরণের দিকে যাচ্ছে, যে বিস্ফোরণটা হবে তার হৃৎপিণ্ডের ভেতর—কথাটা যখন বলেছি,' আবার শুরু করল স্নেহা, চা খাওয়াবই। কিন্তু এখানে নয়, বাইরে কোথাও। ঠিক আছে, আপনি সামনের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ান। রাস্তায় দাঁড়াবার অভ্যাস তো আপনার আছে, তাই না ? তবে সিগারেট খাবেন না। রাস্তার ধুলোবালি, গটগ্ধ খান। পনেরো মিনিট। আমি আসছি।' 

এবার দরজা সত্যি বন্ধ করল স্নেহা। কিন্তু তাসিরের মনে হলো, যে বিস্ফোরণ আজ তার ভেতরে ঘটল, এটা প্রায়ই ঘটবে এখন থেকে এবং এই বিস্ফোরণের শক্তি স্নেহাকে আড়াল করা কোনো দরজাকেই আস্ত রাখবে না। 

রাস্তায় বেরিয়ে তাসির দেখল, অবাক একটা জামগাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে চারপাশের আবর্জনা, গাতাগর্ত, বালির স্তুপ আর বিদ্যুতের আর নানান ক্যাবলের জটপাকানোর অসুন্দরের ওপর দিয়ে। এ রাস্তাতেও জামগাছ! শীতের হাওয়ায় গাছটার পাতা নড়ছে। 

গাছটার নিচে দাড়িয়ে হঠাৎ, কোনো কারণ ছাড়াই আহমদ শরীফকে মনে পড়ল তাসিরের। ভালোমন্দের হিসাব-এর আগাগোড়া ভিলেন লোকটাকে হঠাৎ তার খুব আপন মনে হলো, জামগাছটার মতোই। গাছটার উঁচু ডালে দুটি পাখি বসে আছে। তারা কি জীবনসঙ্গী ? একজনের নিঃশ্বাসে অন্যজন তার নিশ্বাস মেলাচ্ছে? কে জানে। পাখিরা কি একজন আরেকজনের জীবনসঙ্গী হয় ? কত দিনেরই বা জীবন তাদের! | সময়ের হিসাবটা মনে উঠতেই তা বাতিল করে দিল তাসির। জামগাছটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, এর নিচে দাঁড়িয়ে পনেরো মিনিট, অথবা পনেরোটা জীবন, সে স্নেহার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন