শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প 'খোয়াব'

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ক্রোড়পত্রসুধা এখন কিছুদিন থেকে এ স্বপ্নটি দেখে: তাকে খুব নির্জন একটা জায়গায়, বাঁশঝাড় আর বুনো লতাপাতা ঘেরা লাল জমিতে কবর দেয়া হয়েছে। সুধা শ্রীমঙ্গলের মেয়ে, সে স্বপ্নকে বলে খোয়াব। সে বলে, 'আমি খোয়াব দেখলাম আমাকে একটা নির্জন গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে অথচ সেখানে আর কোনো কবর নেই।
আর একজন বৃদ্ধ এক কোণায় বসে কোরআন শরীফ পড়ছেন। কিন্তু বলতে বলতেই সুধার কথায় একটু দ্বিধার মত সুর চলে আসে। তার চোখে সংশয় দেখা দেয়, সে বলে, “ঠিক বলেছি তো? বুড়ো লোকটি বুড়ো নাও হতে পারে। নাকি?' তারপর আমার দিকে এমন গভীর চোখে তাকায় যেন তার এই বিভ্রান্তিটা মোচনের দায়িত্ব আমারই এবং তার স্বপ্নের যেসব জায়গায় ফাক রয়ে যায় সেসবও আমাকেই ভরাট করতে হবে। আমি বলি, 'সুধা তুমি একটা স্বপ্নও ঠিকমত মনে রাখতে পারো না, কেন?' 

সুধা চোখ না নামিয়ে বলে – দেখি তার ভুরুতেও সংশয়ের চিহ্ন জাগে- 'খোয়াবটা গতরাতে দেখেছি, নাকি তার আগের রাতে? দাঁড়াও... খোয়াবকি কোনো বৃদ্ধ লোক আদৌ ছিল? 

আমি বলি, ‘অথবা কবরটা?' 

আমার ভেতরের মানুষটা এ প্রশ্নটি করার সময় একটা আশা-নিরাশার দোলায় পড়ে যায়! আমি টের পাই, কোথায় যেন একটা কা্লো ছায়া জমে। আমি ভয় পাই । সুধার সঙ্গে কবরের কোনো সম্পর্ক থাকুক, সেটা আমি চাই না; কবর আমি খুব ভয় পাই । আমি যখন বলি, ‘অথবা কবরটা?' তখন এমন একটা চাপা-পড়া প্রত্যাশা মাথা তুলতে থাকে, যেন সুধা বলবে, 'তাই তো! সেটা যে কবর তা কী করে বলি । সেটা তো একটা ঘরও হতে পারে, নাকি?' 

কিন্তু সুধা নির্বিকার বলে যায়, ‘কবরটা ঠিক দেখেছি। দেখি যে, কবরটাতে আমি শুয়ে আছি, আর আকাশের একটা একলা ছায়া আস্তে আস্তে আমাকে ঢেকে দিচ্ছে।' 

সুধাকে এসময় মনে হয় সে যেন তার খোয়াবের একেবারে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। 

আমি চমকে তাকাই তার দিকে। সকালের রোদ জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকেছে, টেবিল-চেয়ার আলনার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে; সকালের নানা শব্দ উঠে আসছে চারদিক থেকে এবং এই অতিশয় বাস্তব একটি চিত্রের ভেতর থেকে সুধা আস্তে করে পা ফেলে ফেলে সরে যেতে থাকে। 

আমি জানি তার এই খোয়াবটারও শেষ শোনা হবে না। এ খোয়াবটার শুরু নেই, শেষ নেই। আসলে সুধার কোন খোয়াবই দু' থেকে তিনটে দৃশ্য পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে না। আমার এক এক সময় মনে হয়, নিজেকে বিভ্রমের একটা ঘোরে রেখে দিতেই যেন স্বপগুলোকে তার প্রয়োজন হয়। না হলে, এই আদিহীন অন্তহীন ছাড়া ছাড়া, ওলটপালট স্বপ্ন কেন তাকে এতটা বিভোর করে রাখে? 

আমি একটা খাবনামা যোগাড় করে রেখেছি ঘরে, তাতে দেখি স্বপ্নে কবর দেখলে মানুষ ধনরত্ন পায়-এরকম কথা লেখা আছে। সুধা কিছুদিন আগে স্বপ্নে দেখেছে সন্ধ্যার একটা নদী, যার ওপর নৌকা বেয়ে তাকে নিয়ে যাচ্ছে কেউ - কোথায়, সে জানে না। প্রথমে সে বলল, একটা দেহাতি লোক, পরে বলল না, সে দেহাতি লোক নয়, লোকটার চেহারা তার মনে নেই। বস্তুত লোকটা যে কেউ হতে পারে। তারপর ওই একইভাবে গভীর চোখে সে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল । আমি বললাম, ‘হয়তো তোমার দেখা কোনো মাঝি হবে তোমার খোয়াবের সেই মাঝিটা।’ । 

সে বলল, “আচ্ছা, মাঝি কি কেউ ছিল নৌকাতে, নাকি তা নিজেই চলছিল, শুধু আমিই বসেছিলাম যাত্রী?’ 

প্রশ্নটা এবার আমাকেই করেছে সুধা। আমি তাকে বললাম, তোমার খোয়াবের নৌকটা নিশ্চয় স্বয়ংক্রিয় এবং উন্নত প্রযুক্তির। তাতে বসা মাত্রই সেটা চলতে শুরু করে। কোথায় যাবে, সেটা বলতে হয় না। নিজ থেকে আন্দাজ করেই চলতে থাকে।' বলে আমি নিজে নিজেই হাসলাম, কারণ সুধা ততক্ষণে আবার বুকে তার স্বপ্নে, ওই ছায়াচ্ছন্ন নৌকায় । আমার কথা সে শোনে না। 

মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, সুধার স্বপ্ন যেন এক গোপন কুঠুরি, যার মাথায় - প্রবেশ নিষেধ বিজ্ঞপ্তি টাঙানো রয়েছে, আমার জন্য। ওই কুঠুরি থেকে বেরিয়ে সে আমাকে দেখে, আমি ঠিকঠাক আছি কিনা। তারপর আবার ভেতরে ঢুকে যায়, আমি তাকে কিছু বলবার আগেই। আমার মনে হয় বহুদিন থেকে আমি সুধার স্বপ্নের বাইরে বসে আছি, কবে সে বেরিয়ে এসে বলবে, এবার চল, আমার কাজ শেষ হয়েছে, ঘরে চল। 


এই কদিন থেকে সে দেখছে নির্জন গোরস্থান আর কবরের খোয়াবটা। আমি হিসাব করি, কতদিন হল, আমি বসে আছি। তিন বছর, চার বছর? আর কতদিন? 

সুধার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে বছর পাচেক হল। সুধা নামটি আমিই তাকে দিয়েছি।, খুব আবেগের একটা মুহূর্তে, একটা গান শুনে কথাটা আমার গায়ে পুলক জাগিয়েছিল। সুধার স্বপ্নে দেখা কবরে যদি তার নাম থাকে তাহলে শুধু আঞ্জুমান আরা বেগমই লেখা থাকবে। সুধা নামটির কোনো অস্তিত্ব নেই আমাদের দু'জনের বাইরে। এ কথা মনে হতেই আমার মাথায় একটা চিন্তা এল । আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কবরের খোয়াবটা দু'দিন পুরন হলে, 'সুধা, তোমার কবরে কি তোমার নামটা লেখা দেখতে পেয়েছো? 

সুধা আমার মনের কথাটা ধরতে পারল না। আমার যা উদ্দেশ্য ছিল জানার : কবরটার গায়ে যদি লুফুন্নাহার বা মমতা আর – এ ধরনের কোনো নাম থাকে তাহলে আমি শঙ্কামুক্ত হই। সে বলল, 'মনে নেই। তাছাড়া আমিতো কবরে শুয়েছিলাম।' 

শুনে আমার গা কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি ক্ষীণ আশা নিয়ে সুধাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা ওই নৌকার মাঝিটা, কোনোক্রমে কি আমি হতে পারি? খেয়াল করে দেখতো?' 

সুধা চোখ টিপে হাসল, যেন খুব মজা পেয়েছে। বলল, ‘কেন, তোমার খাবনামায় কিছু লেখা নেই?' 

আমার খাবনামা কেনা নিয়ে সে বেশ কৌতুক করত । আমি বুঝতে পারি, আমার ভেতরে অজান্তে একটা রাগ জন্ম নিচ্ছে। সুধা কোনো সাহায্য করবে না, সে শুধু আমাকে বসিয়ে রাখবে তার স্বপ্নের বাইরে। আর কতদিন? আমার শ্বশুর আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কতদিন থেকে এসব খোয়াব দেখছে আঞ্জুম? 

আমি আঙ্গুলে হিসাব করি, আর শ্বশুর হুকার নল হাতে দূরে উদাস তাকিয়ে থাকেন। 

সুধার খালা বলেন, “তা একটু আধটু খোয়াব দেখলে এত ভয়ের কি বাবা?' 

সুধার মা নেই, বুড়ো খালা আছেন, সংসার দেখাশোনা করেন। তার স্বামী চলৎশক্তিহীন। সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকেন, বিকেলে কাজের লোকজন ধরাধরি করে বারান্দার আরাম কেদারায় বসিয়ে দেয়। কেদারায় বসে বসে একদিন তিনি আমাকে বললেন, ‘খোয়াব-টোয়াব কিছু না, বুঝলে, এসব পাগলামি।‘ 

আমার চোখ কপালে উঠে যায়। বলছে কি বুড়ো? 

আমি যেন তার কথা পুরো শুনতে পাইনি, সেরকম বলি, ‘পাগলামি?' 

‘ওর মা মারা গেল...লোকে বলে মৃগী রোগে।' তিনি বললেন, 'আমি বলি পাগলামি রোগে। 

তোমার খালাকে দেখছো না? সুস্থ মনে হয়? 

খালা শাশুড়ি মাঝে মধ্যে লাল শাড়ি পরে, চুল আঁচড়ে, মাথায় টিপ পরে বারান্দায় ছড়িয়ে বসে থাকেন, আমি দেখেছি। একদিন তিনি একটা চেলাকাঠ দিয়ে একটা গাভীকে এতই মারলেন যে, গাভীটা পরে মরে গেল। তিনি মারছিলেন আর বলছিলেন "ভাগ ভাগ আমার চারদিকে দশ গজ জায়গা দরকার। যে সেখানে আসবে, তার অবস্থা হবে এই গরুটার মত।' এখন ভেবে দেখি সেটা হয়তো পাগলামিই ছিল। অথচ অবাক কান্ড। তার মিনিট পনেরো পর তিনি প্লেটে মাশকাতি হালুয়া সাজিয়ে চা নিয়ে এলেন। আমি তার দশ গজের মধ্যে বসেই চা খেলাম । আমার কিছু হল না। 

আমি চাকরি করি কুলাউড়া জনতা ব্যাংকে। সুধাকে নিয়ে প্রায়ই তোমাকে একটা গাড়ির নিচ থেকে বের করছে লোকজন।' 

আমার গা শিউরে ওঠে। আমি বলি, ‘খাবনামটা না দেখেই বলে দিতে পারি, সুধা আমার কপালে কী লেখা আছে?' 

সুধা হাসে, তার সেই মাধবকুণ্ডের প্রপাতের মত শব্দ করা হাসি। বলে, 'আমি দেখি, তোমাকে মানুষ টেনে বের করছে, আর তুমি রেগে আমাকে ডাকছো।...তুমি সবটা খোয়াব না শুনেই ভয় পাচ্ছ?” 

আমি বলি, 'বুঝেছি, তোমার খোয়াবটা সত্যি হলে আমি চাকরি ছেড়ে গ্যারেজের মেকানিক হয়েছি।' 

কিন্তু এরই মধ্যে সুধার চোখে প্রশ্ন জমে, সংশয় এবং দ্বিধার আলো ছায়া খেলা করে। “দাড়াও,' সে বলে, 'তোমাকে বের করছে গাড়ির নিচ থেকে ঠিক আছে, কিন্তু তোমার শার্টটা? সে রক্তে ভিজে গেছে... নাকি? ঠিক দেখেছি আমি? রক্ত, নাকি অন্য কিছু? আচ্ছা, তুমি যে তুমি, সেও তো আমার মনে নেই। অন্য কেউ তো হতে পারে। নাকি?' 

আমি এরপর শ্রীমঙ্গল যেতে লোকাল ট্রেন ধরি। সে কি ঝামেলা । কিন্তু সুধা ট্রেনে উঠে অন্য মানুষ হয়ে যায়। যেন স্কুলে পড়া মেয়ে । জনালার পাশে বসে, খুব খুশি ভাব। বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মধ্যে হেসে ওঠে, অকারণে – নাকি কোনো কারণ আছে সে হাসির, যা আমরা, আমি এবং কামরাভর্তি অবাক চোখের যাত্রীরা জানতে পারি না। কামরা-ঠাঁসা যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে তাকে দেখে, সে যখন হাসে। 

কিন্তু এ লাইনে যারা লোকাল চলাচল করে তারা নিরীহ মানুষ। তাদের অনেকে, আমি দেখেছি, সুধার হাসি দেখে নিজেরাও হাসে। যড়যন্ত্রকারীর মত। 

যেন সুধার হাসির কারণটা এক সময় তারা আঁচ করতে পারে। কেবল আমি বসে থাকি, নির্বোধের মত। বসে বসে দেখি সুধার চোখে, তার গালের হালকা প্রসাধনীর মত, ফেলে আসা সময়ের একটা স্বচ্ছ আসর জমে। সে রেলের কামরায় আমার সামনে বসে থাকে। কিন্তু আমি জানি সুধা সেখানে নেই। 

যেন সময় একটা হাত বাড়িয়ে তাকে নিয়ে যায়, রেলের জানালা দিয়ে। আর তার একটা শুধু ছায়া পড়ে থাকে পেছনে। 

আমি সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে ভাবি, সুধা তবে জেগেও স্বপ্ন দেখে। আমি সেই স্বপ্নের বন্ধ কুঠুরির বাইরে বসে আছি। কখন সে বেরোবে? আর কতদিন? 

অফিস থেকে ছটায় বের হয়েছি। ব্যাংকের কাজ, এত বিরক্তিকর! কিন্তু বিকেল হতে থাকলেই ভাল লাগতে শুরু করে । ভাবি, একটু পরেই ঘরে ফিরব। 

ঘরে ফিরে চা-টা খেয়ে সুধাকে নিয়ে বেরুব। সুধা কদিন থেকে সিনেমা দেখায় খুব আনন্দ পায়। আজ তাকে নিয়ে যাব জজ ব্যারিষ্টার দেখতে। ছবিটা সুধা এর আগে দু'বার দেখেছে। তার শাবানাকে খুব ভাল লাগে। তা লাগতেই পারে, আমি তর্ক করি না। 

ঘরে ফিরে দেখি সুধা গুম হয়ে বসে আছে পেছনের বারান্দায়। তার কাপড়-চোপড় বিপর্যস্ত। মাথায় চুল এলোমেলো। দু’হাতে মাথা ধরে সে বসে আছে বারান্দার মেঝেতে, তার চারদিকে বইয়ের ছেড়া পাতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কিছু পাতা উড়ছে, এদিক সেদিক। 

আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সুধা! সুধা! কী হয়েছে সুধা?' 

সুধা আস্তে মাথা তুলে তাকায়। দুটি হাত মুঠি করে কপালের দু'দিকে রাখা। চোখ লাল । 

আমি বলি, 'কী হয়েছে, আমাকে বলে সুধা।' সুধা হঠাৎ রেগে যায়, তোমার খাবনামাটা একটা অপদার্থ জিনিস।' ‘অপদার্থ জিনিস হচ্ছে সুধার প্রিয় কটুকথা। আমাকে মাঝে মধ্যে সে বলে 'অপদার্থ জিনিস।' আমি আমল দিই না। 

‘খাবনামা কী দোষ করল?' 

আমি দুপুরে একটুখানি ঘুমিয়েছিলাম', সে বলে, “আর দেখলাম খোয়াবটা। কেউ যেন আমাকে একটা পুতুল বানিয়ে ফেলেছে, আর খেলছে আমাকে নিয়ে। আমি একটা পুতুল হয়ে গেছি, পুতুলের মত ছোট ছোট হাত পা, ছোট ছোট কান নাক, পুতুলের মত একটা জামা পরা...।' 

‘চমৎকার স্বপ্ন, বাঃ।' তাকে চাঙা করার জন্য বলি। 

চমৎকার না ছাই। জেগে উঠে দেখি আমার শ্বাস আটকে যাচ্ছে, আমি তাড়াতাড়ি নেমে খাবনামাটা খুলে দেখি সেখানে লিখেছে, স্বপ্নে পুতুল দেখা মানে বিবাহ নিকটবর্তী...।' 

‘কী সর্বনাশ।' আমি কথাটায় একটু নাটকীয়তা আনতে চেষ্টা করি। কিন্তু ভেতরে একটু টানও পড়ে। সুধা এবং বিয়ের মধ্যে আর তো কোন সম্পর্ক থাকার নয়। 

সুধা বিমর্ষ সুরে বলে, অথচ খোয়াবে কেউ পুতুল দেখলে তার সন্তান হয় । সেটা আমি জানি। আমার এখন সন্তান হওয়ার কথা। নাকি?' 

সুধা থামে, তার চোখ দুটি আরো লাল হয়। সে বলে, যেন খাবনামা-সাহিত্যের প্রতি তার চরমতম তিরস্কার এটি, খাবনামা যারা লেখে, তাদের মাথায় বিয়ে ছাড়া কিছু থাকে না। যতসব অপদার্থ জিনিস।' 

বলে সে চিৎকার করে হাসতে থাকে। তার হাতে খাবনামার অবশিষ্ট পাতাগুলালো টুকরো টুকরো হয়ে যেতে থাকে। একটার পর একটা। তার আক্রোশ আমাকে স্তব্ধ করে দেয়। সুধার হাত দুটি প্রচন্ড রাগে কাপে। তার গলা দিয়ে একটি শব্দ হয়, যেন মাধবকুন্ডের ওপর আষাঢ়ের মেঘ গর্জন করছে, এখনি আছড়ে পড়বে। 

সুধার বাবা সব শুনে বলেন, 'ডাক্তার দেখিয়ে কী লাভ?' আমি বলি 'ঢাকায় ভাল ডাক্তার আছেন, একটু নিয়ে যাই?' তিনি বলেন, তা নিয়ে যাও। কিন্তু এর আগে একটু পীর সাহেবকে দেখালে কেমন হয়? বরমচালের পীর সাহেব এমন অনেক মানুষকে চিকিৎসা করে ভাল করেছেন। খোয়াবের বিষয়টা ঠিক হয়ে গেলে তোমরা আবার সংসার শুরু করতে পারো।' 

তামাকের ধোঁয়ার সঙ্গে কিছু দুঃখ, কিছু ক্ষোভ, কিছু হতাশাও তিনি বাতাসে ছড়িয়ে দেন। আমার এবং সুধার দুটি সন্তান হয়েছিল, কিন্তু জন্মে তারা পৃথিবীটা দেখতে পেল না। দু'টোই জন্মেছে মৃত। 

সুধার ভেতর অবশ্যই একটা বিরাট ওলটপালট বহু আগে থেকেই চলছে। একটা মস্ত গোলমাল। 

সুধার খালার চলৎশক্তিহীন স্বামী আমাকে বলেন, তাঁর সেই ভাঙা কাঁসর ঘন্টার মত অস্বস্তিকর গলায়, বরমচালেরর পীর বলে কেউ নেই। যে আছে, সে একটা ওঝা। একেবারে গ্রাম্য ওঝা। 

আমি বলি,‘শুনলাম তিনি বহু মানুষকে ভাল করে দিয়েছেন।' 

চলৎশক্তিহীন বৃদ্ধ তেরচা হেসে বলেন, 'আঙুমের মাকেও ্তো নিয়ে গিয়েছিল সেই ওঝার কাছে। কিছু হল?' 

তিনি সব সময় আমার দিকে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে কথা শেষ করেন। আমি সেটি পকেটে নিয়ে, কিছুটা দ্বিধার সঙ্গে দুলতে দুলতে কুলাউড়া ফিরে আসি । 

সুধার পুতুলের স্বপ্নটা খুবই নিষ্ঠুর - আমাকে মানতেই হল। বিশেষ করে সে যেভাবে এর ব্যাখ্যা করেছে। আমার এরকম ধারণা হল, সুধার ওলটপালট চিন্তাগুলো যে গুছিয়ে আনবেন, শুদ্ধ করে দেবেন, এমন ডাক্তার হয়তো ঢাকাতেও নেই। তার স্বপ্নের বিষয়গুলো কী করে জানবেন ডাক্তার, যেখানে সে নিজেই জানে না, কী সে দেখছে? 

যেমন বলেছে সে দুদিন আগে ‘আমার মনে হয়েছে পুতুলের যে খোয়াবটার কথা তোমাকে বলেছিলাম, সেটিতে আসলে অন্য জিনিস দেখেছিলাম: কারা যেন পুতুলের বিয়ে দিচ্ছে, আর আমি দেখে খুব হাসছি।' বলে সে আমার দিকে খুব গভীর করে তাকায়, যেন আমিই বলে দেব পুতুলের বিয়ে কারা দিয়েছিল, তাদের সকলের নাম ধাম, বংশ পরিচয়। 

শ্বশুর বললেন, তিনিও যাবেন ওই বরমচালের পীরের বাড়ি। তার বিশ্বাস, মেয়ের খোয়াবের আপদটা এবার কেটে যাবে। 

আমার আর সুধার স্বপ্নের বাইরে বসে থাকতে ভাল লাগছিল না। কেমন একটা শূন্যতা আমাকে গ্রাস করতে চায়, যখন আমি প্রবশে নিষেধ ওই কুঠুরির বাইরে সুধার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। আমি দেখি, সুধার খালার চলৎশক্তিহীন স্বামী, যাকে সুধা সম্বোধন করে ‘মৌয়া' বলে, আমার দিকে তাকিয়ে তেরচা হাসছে - তার ভঙ্গিটি এরকম: আর বসে থেকে লাভ নেই, বাপু, সুধা ফিরবে না । 

লোকটার ওপর আমার রাগ হয়, মনে হয় সে একটা অপদার্থ জিনিস। কিন্তু ওঝারা যদি সাপের বিষ নামাতে পারে, স্বপ্নের বিষ নামানো কি খুবই কঠিন? 

স্বপ্নের বিষ! আমি শিউরে উঠি। 

আমার শ্বশুর, যাকে বলে, খুব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ । ওঝার বাড়ি যাওয়ার পর আমাকে খারিজ করে তিনিই সুধার দায়িত্ব নিয়েছেন। হাত ধরে সুধাকে ওঝার সামনে তিনি বসিয়ে দিয়েছেন, ওঝার শীর্ণ পোড়া-কাঠের মত হাতে সুধার একটা হাত তুলে দিয়েছেন। এখানে তিনিই গুরুত্বপূর্ণ, আমি গৌণ। 

সুধাকে দেখে মনে হল, সে ঘুমের মধ্যে আছে, তার চোখ দু'টি নিস্পৃহভাবে দেখছে সবকিছু। আমার সঙ্গে একবার চোখচোখি হল, যেন খুব মৃদু একটু হাসল সে। 

আমি গুটিয়ে ছিলাম, আমার খানিকটা লজ্জা অথবা গ্লানি হচ্ছিল - ওই ওঝার বাড়িতে তাকে নিয়ে আসাতে । 

কিন্ত সুধার হাসি দেখে আশ্বস্ত হোলাম। যাক, এই খেলাটা শেষ হয়ে যাক, তারপর বাড়ি গিয়ে সুধার সঙ্গে গল্প করা যাবে। গতকাল আমরা আকেটা সিনেমা দেখেছি, মাটির দূর্গ। সেটি নিয়ে আলোচনা করব। সুধা বলেছে ছবিটা তার দারুণ লেগেছে; তবে ওরা দুর্গ লিখেছে দীর্ঘ উকার দিয়ে, এখানেই সুধার আপত্তি। 

ওঝার সঙ্গে বিনয়ের সঙ্গে কথা বলছেন শ্বশুর। ‘পীর সাহেব’ তিনি বলছেন, ‘এবার শুরু করেন। মেয়েটাকে ভাল করে দিন।' 

ওঝা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, 'সবই ওপরঅলার ইচ্ছা।' সে তন্ত্র মন্ত্র পড়ল। চেঁচিয়ে দোয়া-দরূদ পড়ল। তার দুই সাগরেদ একটি ডালাতে করে চাল আর আমাপাতা এবং সরিষা দানা এগিয়ে দিল তার দিকে, সেগুলো ওঝা খুব নাটকীভাবে ছড়িয়ে দিল সুধার গায়ে, মাথায়। তার চুলে চাল আর সরিষার দানাগুলো আটকে থাকল। খুব অস্পষ্টভাবে সব দেখতে থাকল। 

সময় গেল। এবার ওঝা হঠাৎ করে বলল তার এক সাগরেদকে, ‘ওই চেলাটা নিয়ে আয়।' চেলা মানে এক টুকরো চেলা কাঠ। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগে, চেলাটা হাতে নিয়ে সুধাকে সে কয়েক ঘা লাগিয়ে দিল। 

সুধা হাউমাউ করে উঠল। তার ঘুম ভেঙেছে। সে এক বিশাল কষ্টের আর অবিশ্বাসের দৃষ্টি দিয়ে প্রথমে তার বাবার দিকে, পরে আমার দিকে তাকাল। তার চোখে পানি। সে তার দুটি হাত তুলে চেলা কাঠটা ঠেকাতে গেল, কিন্তু ওঝা হুঙ্কার দিয়ে উঠল । ভাগ, ভাগ, সব আপদ বালা মুসিবত, ভাগ। এক অসহ্য তৃতীয় শ্রেণীর নাটক; কিন্তু সুধা কষ্ট পাচ্ছে। এবার ওঝা চেলা কাঠটা দিল আমার শ্বশুরের হাতে এবং কড়া গলায় আদেশ দিল, 'দেন, গুনে গুনে তিন ঘা লাগান, তিন ঘা।' 

শ্বশুর কোনোদিকে না তাকিয়ে সুধাকে তিন ঘা মারলেন। সুধা এখন চুপ, তার প্রতিবাদ নেই, কান্নাও নেই; যেন তাকে মারা হবে, সে তা জানত। তার নিশ্চয় ব্যাথা লাগছে, চোখে পানিও আছে; কিন্তু সে আর কাঁদছে না। মনে হল, হঠাৎ করে সুধা জেগে উঠেছে, তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে প্রাণের স্পন্দন। সুধা? 

সে আমার দিকে তাকাল, গভীরভাবে, যেন মনে হল, তার সায় আছে পুরো ব্যাপারটিতে, যেন... 

ওঝা আবার চিৎকার করে ওঠে, ভাগ, 'ভাগ, সব আপদ বালা মুসিবত, ভাগ।‘ কিন্তু আমাকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে এবার সে চেলা কাঠটা এগিয়ে দিল আমার হাতে। 

আমি? 

পাগল হয়েছেন? পাগল? 

ওঝা ঝাড়বে না। আল্লার হুকুম, তিন ঘা মারতে হবে গুনে গুনে। না হলে খোয়াবের আছর ছাড়বে না, তিন ঘা। 

আমার দেরি দেখে ওঝা অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে, শ্বশুর যেন মনে হল আস্ত গিলে খাবেন আমাকে। 

এক মুহুর্তের জন্য চোখ পড়ে সুধার দিকে, সে তাকিয়ে আছে, মুখে একটা করুণ, কিন্তু নির্ভয় হাসি। 

আমার মনে হল, সুধার জগৎটা অনেক পরিস্কার হয়ে গেছে, সেখানে মেঘ ভেঙে যেন রোদ উঠতে শুরু করেছে। 

আমি চেলা কাঠটা দিয়ে সুধার গায়ে গুনে গুনে তিনবার আঘাত করলাম। আমার কব্জিতে আদেশ দিলাম, যতটা আস্তে পার । আমার বিশ্বাস এর চেয়ে একটা পালক দিয়েও তাকে আঘাত করতে পারতাম। এতটা হাল্কা সেই চেলা কাঠের স্পর্শ, সুধা আঘাত পাবে কি, অবাকই হবে। আমি নিশ্চিত। 

আমার মনে হল সুধা আমার দিকে তাকাল। কিন্তু আমার চোখ মাটির দিকে, আমার হাত কাঁপছে। আমি শুনছি ওঝার গলার আওয়াজ। এবার সে সূরা পড়ছে, সুর করে। চোখের কোণা দিয়ে অনুভবে দেখলাম, সুধাও মাথা নামিয়েছে, দু'হাত দিয়ে মুখ ঢেকে । ওঝা হাত তুলে দোয়া পড়তে লাগল। সকলেই হাত মুখের সামনে মেলে ধরল, শুধু সুধাই দুটি হাতে মুখ ঢেকে বসে রইল। 

সুধার খোয়াব দেখা হঠাৎ করেই যেন বন্ধ হয়ে গেল। আমি বিশ্বাস করতে পারলাম না। তিন চার 

সুধা বাবার বাড়িতেই ছিল; ফিরে এলে দেখি, তার মধ্যে আপাতঃদৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই, কিন্তু সকালে উঠে নাস্তার টেবিলে বসে তার খোয়াবের অনিশ্চিত কাহিনী বর্ণনা আর নেই। 

এতটা অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিলাম ওই প্রাত্যহিকতায় যে, প্রথম ক'দিন খারাপই লাগত। কিন্তু মনে স্বস্তির ভাবটাই ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠল । স্বপ্নের অত্যাচার থেকে অন্তত সে মুক্তি পেয়েছে। আমি দেখেছি, তার ঘুম হচ্ছে আজকাল। তার ভেতরের অস্থিরতাটাও কমেছে। 

আমি বিশ্বাস করতে পারি না, একটা ওঝা কিভাবে সুধার ওলটপালট ভেতরটাকে জোড়া দিয়ে দিতে পারে। 

একদিন আমি বলি, ‘তোমার খোয়াবের আছরটা কী সুন্দর ভাল করে দিল একটা গ্রাম্য ওঝা।' 

সুধা আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন এই প্রথম আমাকে দেখছে সে। তারপর খুব নিচুস্বরে বলে, ‘আমার খোয়াবের আছর ওঝা ভাল করেনি, ভাল করেছ তুমি।’ 


আমি চমকে উঠি। ‘আমি ভাল করেছি?' 

‘ওঝা যখন আমাকে মারল', সুধা বলল, 'আমার কিছুই লাগেনি। ওর হাত কত বড়? বড়জোড় দেড় ফুট, নাকি! কতদূর যেতে পারে দেড় ফুট একটা হাত? 

আমি কিছু না বুঝতে পেরে তার দিকে তাকাই। 

‘কিন্তু তোমার হাতটা এত লম্বা', সুধা বলল, 'তুমি যখন মারলে, আমার একটা জায়গাও থাকল না, যেখানে সে মারটা লাগল না।' 

‘আমি তোমাকে সত্যি বলতে, মারিনি তো, সুধা!' আমি দুর্বলভাবে বলি। 

ওঝা যখন তোমাকে মারতে বলল, আমি ঠিক সে মুহূর্তে একটা খোয়াব দেখছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল যে তুমি ।...' 

হঠাৎ সুধা থেমে যায়। তারপর আরো নিচুস্বরে, প্রায় না শোনার মত করে বলে। তোমার মারটা আমার ভেতরে তোলপাড় করে দিল । তোমার হাতটা এত লম্বা, সে তুমি জান না।' 

সুধা এবার হাসে, একটা রহস্য ঘেরা হাসি। একটু ঝুঁকে পড়ে সে আমাকে বলে, 'তোমার মনে আছে আমি একটা মাঝি দেখেছিলাম খোয়াবে, আমাকে নিয়ে যাচ্ছে নৌকায় করে?’ 

‘হ্যাঁ মনে আছে।' 

আর একটা কবরে কেউ একজন আমাকে শুইয়ে দিল, আর শুয়ে দিয়ে মেঘ হয়ে ছায়া দিচ্ছিল? 

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। 

আর একজন আমাকে পুতুল বানিয়ে ...’ 

‘হ্যাঁ সুধা মনে আছে। সব মনে আছে আমার। আমি বলি । 

তুমি যখন আমাকে মারলে, আমারতো কিছু হয়নি; কিন্তু আমার ভেতরে এই সবগুলো মানুষ-- এই মানুষটি আঘাত লেগে মরে গিয়েছিল।' সুধা এবার হা হা করে হেসে ওঠে। 

সুধার খালার চলৎশক্তিহীন স্বামী আমাকে আগেই বলেছিলেন, 'হাসিটা আগে আসে। তারপর বাকিটা।' 

সুধার সঙ্গে আমিও হাসতে থাকি।। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন