শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত'র গল্প : একরাত্রি

রাত এখন ক'টা? গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড দিয়ে মোটর চলে গেল পশ্চিমে। যত রাতেই হোক, দাঁড়াও এসে জানলার সামনে, দেখতে পাবে একটা মোটর সাঁ করে বেরিয়ে গেল। কোথায় যায়, কোথায় থামে কে জানে। 

ঝিরঝির বৃষ্টি নেমেছে। শীতের শেষে বসন্তের বৃষ্টি। শীতকে মনে করিয়ে দেওয়ার বৃষ্টি। আকাশের করুণা। সবাই ঘুমুবে শান্ত হয়ে। বৃষ্টির শব্দে পায়ের শব্দটি শোনা যাবে না।

যদি আসে নিশ্চয়ই খালি পায়ে আসবে। অনেক রাতে হঠাৎ-ওঠা চাঁদের হাসিটির মতো আসবে। কিংবা গহন অরণ্যে পাওয়া কৃষ্ণসার হরিণীর মতো। 

কিন্তু আসবে কি? কেউ আসে? 

আজ যদি না আসে তবে আর আসবে কবে? এমন শুভরাত্রি বিধাতা ফরমায়েস দিয়ে তৈরি করিয়েছেন। জামাইবাবুর মায়ের অসুখের খবর পেয়ে দিদি আর জামাইবাবু চলে গিয়েছেন কলকাতা। পরাশবাবু হাসপাতালে। তার স্ত্রী কাছাকাছি কাকার বাড়িতে। উপরে শুধু, ও আর ওর মা। মাকে একটু ফাঁকি দিতে পারবে না তো মেয়ে হয়েছে কেন? 

প্রথম দিনের ঝগড়ার কথাটাই মনে পড়ছে ভবদেবের। 

একটা গাছ এসে পড়েছিল ভবদেবদের এলেকায়। গোলাপ গাছ। আর ধরবি তো ধর সেই গাছেই ফল ধরল। 

সেই ফলই নৃশংস হাতে ছিড়ে নিয়েছিল ক্ষণিকা। ভেবেছিল কেউ দেখতে পাবে না বুঝি। তাড়াতাড়িতে ছিড়ঁতে গিয়ে নরম ডালটাকে জখম করে ছেড়েছে। 

‘ও কি, ও ফল ছিঁড়লেন যে?” চকিতে সামনে এসে হুমকে উঠেছিল ভবদেব। 

‘এ গাছ আপনাদের ভাড়া দেওয়া হয়নি’।রূঢ় উপেক্ষায় পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছিল ক্ষণিকা। 

'সে কি কথা! ঘরের সামনের এ ফালি জমিটুকু যদি আমাদের, জমির উপরকার এ ফুলগাছও আমাদের। একেবারে আমার ঘর ঘেঁসে এই গাছ। হাত বাড়ালেই ধরা যায় রীতিমত’। 

কী অপূর্ব যুক্তি। মনে-মনে হেসেছিল নিশ্চয়ই ক্ষণিকা। যেহেতু হাত বাড়ালেই ধরা যায় সেহেতু আমার অধিকার! বাঁকা ভুরু সঙ্কুচিত করে বলেছিল ক্ষণিকা, ‘কিন্তু এগাছ আপনারা পোঁতেননি, আমরা পুঁতেছি—‘ 

'আপনারা তো আরো অনেক পুঁতেছেন। বাগান সাজিয়ে বিলিতি তারের বেড়া দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু ফুল হয়েছে একটাতেও ? গাছ পোঁতা আর তাতে ফুল ফোটানো এক কথা নয়। পুকুর অনেকেই কাটে কিন্তু পূণ্য না থাকলে তাতে জল হয় না।' 

কী অপুর্ব উপমা! উপেক্ষার ভঙ্গিতে আবার পিঠ ঘুরিয়েছিল ক্ষণিকা। দীর্ঘবৃন্ত ফুলটা খোঁপায় গুঁজতে-গুঁজতে বলেছিল, ‘ফুল যদি ফুটে থাকে তবে ভাড়াটেদের পূণ্যে ফোটেনি, যাদের বাড়ি তাদের পূণ্যেই ফটেছে।' | ‘কিন্তু ছিঁড়ে নেবার সময় তো পূণ্যবানের ভঙ্গি বিশেষ ছিল না হাতে চোখে। যেন কেউ দেখতে না পায় এমনি ভাবে তাড়াতাড়ি ছিনিয়ে নিয়ে চোরের মত পালিয়ে যাওয়ার মতলব।' 

‘নিজের পাঁঠা যে ভাবে খুশি সে ভাবে কাটব তাতে অন্য লোকের কি’। 

“কী হয়েছে রে ক্ষণু?” আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এসেছিল সুনয়নী। | এক মুহুর্ত দেরি হয়নি বুঝে নিতে। কতদিন বহু যত্নে দুই চোখের ভালোবাসা দিয়ে যে ফুলটিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল ভবদেব, তা আর নেই। মোচড় খেয়ে ডালটাও হেলে পড়েছে। কতবার বলেছে সুনয়নী, ফুলটিকে তুলে এনে ফুলদানিতে রেখে দে। উত্তরে বলেছে, তেমন কেউ যদি থাকত দেবার মত তার জন্যে তুলে আনতুম। তেমন যখন কাউকে দেখতে পাচ্ছি না তখন গাছের ফুল গাছেই থাক। 

‘আমিই ফুলটা ছিঁড়েছি দিদি’। পিঠ ঘুরিয়ে খোঁপাটা দেখিয়েছিল ক্ষণিকা। ঘষা-ঘষা ওড়া-ওড়া চুলের শুকনো খোঁপার মধ্যে টাটকা একটা। রক্তগোলাপ। 

'বা, চমৎকার।' গাল ভরে হেসে উঠেছিল সুনয়নী। বলেছিল, 'কেশবতী রাজকন্যের মাথায় উঠেছে, ফুলের আর কী চাই। 

সুন্দর করে হেসে উঠেছিল ক্ষণিকা। বিজয়িনীর ভঙ্গিতে মাথা উদ্ধত করে চলে গিয়েছিল সমুখ থেকে। 

কোথায় যাবে! অহঙ্কারে মাথা চাড়া দিয়ে চলতে গেলে আলতো খোঁপায় থাকবে কেন গোলাপ। খসে পড়ে গিয়েছিল মাটিতে। যাক পড়ে। নেব না কুড়িয়ে। পিছন ফিরে তাকিয়েও দেখব না। সোজা চলে গিয়েছিল গরবিনী--সকালের রোদ্দুরে সারা গায়ে যৌবনের ঝলক দিয়ে। 

ছিন্নবৃন্ত বিধ্বস্ত গোলাপের দিকে তাকিয়ে ছিল ভবদেব। বিহ্বল বৃন্তাশ্রয় ছেড়ে মাটিতে লুণ্ঠিত হয়ে পড়ে থাকলেও কম সুন্দর নয় গোলাপ। 

ইম্পিরিয়াল ব্যাঙ্কের ঘড়িতে ঢং করে একটা বাজল। এখনো ঘুমুতে যায়নি ভবদেব। চেয়ারে বসে সিগারেট টানছে। পরিপাটি করে বিছানা পাতা। একটিও ভাঁজ নেই, রেখা নেই। উচ্ছ্বসিত কোমলতায় প্রসারিত হয়ে আছে। সমস্ত ঘর অন্ধকার। খানিক আগে একটা মোমবাতি জ্বালিয়েছিল। পরে কি ভেবে নিবিয়ে দিয়েছে ফুঁ দিয়ে। 

অন্ধকারেই আসুক পথ চিনে। আকাঙ্ক্ষার তাপ লেগে-লেগে অন্ধকারই তার মূর্তিতেতে দীপায়িত হোক। 

কিন্তু সত্যি কি আসবে? বলে গেলেও আসা কি সম্ভব? আসা কি মুখের কথা? 

এখনো বষ্টি চলেছে ঝিরঝির। এলোমেলো হাওয়া উঠেছে। দুদিকের দু দরজাই ভেজানো ছিল এতক্ষণ। হাওয়ায় শব্দ হতে পারে ভেবে ছিটকিনি লাগাল ভবদেব। কথা আছে, ঠেলে যদি বোঝে দরজা বন্ধ, আঙুলের টোকা মারবে। তার দরকার হবে না। এ অঞ্চলে চলে এলেই অনায়াসে বুঝতে পারবে ভবদেব। হাওয়ায় পাবে তার গায়ের গন্ধ, শুনবে তার শাড়ির খসখস। 

হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে আলগোছে। মা আর মেয়ে এক ঘরে শোয়, হয়তো মা-ই এখনো আচ্ছন্ন হয়নি। অন্তত নিশ্চিন্ত হতে পারছে না ক্ষণিকা। প্রতীক্ষা করছে। এদিকে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের মোমবাতি। 

নিয়তির পরিহাসের কথা কে না শুনেছে। হাতের পেয়ালা মুখে তোলবার আগে হাত থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে। নিজেকে প্রস্তুত করবার জন্যে আরেকটা সিগারেট ধরাল ভবদেব। 

ফুলটাকে মাটিতে অমনি ফেলে যাবার পর, মনে আছে সুনয়নী তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিল : দে ঐ গাছের নির্বংশ করে একেবারে শেকড় উপড়ে। কতদিনের চেষ্টায় কত কষ্ট করে ফুল ফোটানো হল। এখন বলে কিনা বাড়ির মালিক বাড়িউলি। এর পর হাটে-মাঠেঘাটে যেখানেই থাকি না কেন, মাথার উপরে বাড়িওলা নিয়ে যেন না বাস করতে হয়। 

কি সব দিনই গিয়েছে! নিচের তলার ভাড়াটে, বাড়িওলার ভাব সব রকমেই যেন নিচের তলায়। কূয়োর থেকে পাম্প করে জল দিত, তা ভাড়াটেরা সব শেষে। পাঁচ মিনিট হতে না হতেই সুইচ-অফ। কী ব্যাপার? ঝামা-মারা টান জায়গা মশাই, কুয়ো শুকিয়ে এসেছে। এমনি নিত্যি। ভর-গ্রীষ্মের দিনে কলসী-কূঁজোও ভরাট হয়নি; বর্ষায় যখন সচ্ছল জল তখনও বড়জোর দশ মিনিট। সট করে সুইচ অফ করে দিয়ে বলেছে, মফস্বলে কারেন্টের দাম কত। 

প্রথম সরকারী ঝগড়া হয়েছিল চাকর রামলখনকে নিয়ে। নিচে আলাদা মতন একটা ফালতু ঘর ছিল, ভাড়া দেওয়ার সময় বলা হয়েছিল, ওটা চাকরের ঘর, ভাড়াটেদের এজমালি। কিন্তু থাকবার বেলায় বাড়িওলার ড্রাইভার আর দারোয়ান। চলবে না কথার ঘোর-ফের, চাকরের জায়গা দিতে হবে। মুখে হার মেলেহিল পরাশর, কিন্তু টিপে দিয়েছিল দারোয়ানকে। তার দাপটে সাধ্য কি রামলখন শোয় সেই ঘরের মধ্যে। তার জায়গা বারান্দায়। 

সত্যি রামলখন আজ বারান্দায় শোয়নি তো? ভবদেব বলে দিয়েছে বাইরের ঘরে শুতে। কিন্তু বলা যায় না, যেমন বুদ্ধি, হয়তো প্রভুর নিরাপত্তার কথা ভেবে একেবারে বাইরের দরজা ঘেসে শুয়েছে। কে জানে সেইটেই হয়তো মস্ত বাধা হবে ক্ষণিকার। 

খুট করে ছিটকিনি খুলে দরজা ফাঁক করে তাকাল একবার বাইরে। না, বারান্দা ফাঁকা। আশপাশ নিঝম। দূরে স্টেশনের লাল--শাদা-সবুজ আলোর পিণ্ডগুলি জ্বলছে স্থির হয়ে। আপ দুন আর ডাউন দিল্লি এক্সপ্রেস চলে গিয়েছে এতক্ষণে। আরো কত ট্রেন আসবে যাবে। যে ট্রেনের অবধারিত স্টেশন এই ঘর সেই আর এসে পৌঁছুল না! 

যা অবধারিত তার জন্যে কেন এই অধীরতা? 

চোখের উপরে একটা তারা জ্বলছে দেখতে পেল। যা অবধারিত তাতে সুখ নেই, যা অভাবনীয় তাতেই সুখ। মেঘলা আকাশ দেখবে ভেবেছিল দেখল একটা তারা! অত্যাশ্চর্য আনন্দে ভরে উঠল মন। 

এমনি একটা অত্যাশ্চর্যের জন্য প্রতীক্ষা করছে ভবদেব। অবধারিতের জন্যে নয়। 

চরম ঝগড়া হয়েছিল সেদিন। 

উপর থেকে ভিজে কাপড় ঝোলায় এই নিয়ে ভবদেবরা আপত্তি করেছে বহুদিন বারান্দায় উঠতে-নামতে ঠিক নাকের সঙ্গে ঠোকাঠুকি হয়, মাথার উপরে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে। শোনেনি বাড়িওলারা। বলেছে, ও ছাড়া জায়গা নেই কাপড় মেলবার। মুখের প্রতিবাদে কাজ হয়নি, তাই গেরো মেরে ভিজে কাপড়ের কুণ্ডলী পাকিয়েছে নিচে থেকে। ঢিল বা অন্য কিছু ধূলোবালি বেঁধে দিয়েছে। 

কিন্তু সেদিন অন্যরকম হয়েছিল। শুকিয়ে এসেছে একটা শাড়ি, খসে পড়েছিল নিচে, নিচের বারান্দায় সিঁড়ির উপর। বিকেলের ঘর ঝাঁট দিচ্ছিল রামলখন, চোখে পড়তেই কুড়িয়ে নিয়েছিল ব্যস্ত হাতে। ভবদেব সেইমাত্র ফিরেছে আপিস থেকে, চোখাচোখি হতেই বলেছিল, ‘রেখে দে।' 

গুটিয়ে-পাকিয়ে লুকিয়ে রেখে দিয়েছিল রামলখন। আর তক্ষুণিই তরতরিয়ে নিচে নেমে এসেছিল ক্ষণিকা। সুনয়নীকে জিগগেস করেছিল, ‘আমাদের একটা শাড়ি পড়েছে দিদি?’ 

‘কই না তো। সুনয়নী ভিতরের বারান্দায় চা করছিল, অবাক মানল। ‘কি রকম শাড়ি? কার শাড়ি’? 

‘বৌদির শাড়ি। তেমন দামি কিছু নয়। কিন্তু নিচে পড়লেই যদি তা আর ফেরৎ না পাওয়া যায় –’ 

‘বা, সে কি কথা? রামলখন তো এইমাত্র ঝাঁট দিচ্ছিল বাইরে। হ্যাঁ রে, রামলখন, বাইরে শাড়ি দেখেছিস একটা?’ 

মাটি-লেপা উনুনের মত মুখ করে রামলখন বললে, 'আমরা দেখতে যাব কেন?” 

‘বেশিক্ষণ হয়নি। আমিই তুলছিলুম, গেরো খুলতে পড়ে গিয়েছে—’ 

‘হাওয়ায়ও তো উড়ে যেতে পারে—’ ভিতর থেকে টিপনী কেটেছিল ভবদেব। 

উড়নতুবড়ির মত ঝলসে উঠেছিল ক্ষণিকা। বলেছিল, ‘মাপ করবেন দিদি, আমি সার্চ করব।” 

‘সার্চ করবে?’ প্রথমটা থমকে গিয়েছিল সুনয়নী। পরে মুখে হাসি টেনে বলেছিল, ‘এই দেখনা আমাকে।' বলে আঁচল ঝাড়া দিয়েছিল। 

‘বডি-সার্চ নয়, বাড়ি-সার্চ।’ 

‘আপনি মেয়ে-পুলিশ নাকি?” ভবদেব এবার এসেছিল মারমুখো হয়ে । ‘সঙ্গে ওয়ারেন্ট আছে?” 

‘ও সব চোর ধরতে ওয়ারেন্ট লাগে না। কলকাতার বাসে-গ্রামে পকেট মারা গেলে প্যাসেঞ্জারদের পকেট সার্চ করার রীতি আছে।’ 

এ একটু বেশি বাড়াবাড়ি হচ্ছে না ক্ষণু?’ আপত্তি করেছিল সুনয়নী। 

‘হয়তো হচ্ছে কিন্তু উপায় নেই।’ 

‘উপায় নেই?” আবার ঝাঁজিয়ে উঠেছিল ভবদেব : ‘আপনি কাউকে দেখেছেন চুরি করতে ?’ 

‘চোখে দেখিনি, কিন্তু কানে শুনেছি। শুনেছি, শাড়িটা নিচে পড়ামাত্রই একজন বলছেন আরেক জনকে, রেখে দে। পরের জিনিস জেনে তা ছলনা করে রেখে দেওয়াটাও অসাধুতা।’ 

‘এতই যখন জানেন তখন সোজাসুজি এসে ভালোমানুষের মতন চাইলেই হত!’ 

‘ভিক্ষে করে নেওয়ার চাইতে দাবি করে নেওয়ার মধ্যে গৌরব আছে।’ যৌবনের অহঙ্কারে সারা গায়ে ঝঙ্কার তুলেছিল ক্ষণিকা। বলেছিল, ‘দিয়ে দিন।’ 

রামলখনকে ভবদেব বলেছিল দিয়ে দিতে। 

শাড়িটা পেয়ে ছেলেমানুষের মত হেসে উঠেছিল ক্ষণিকা। মনে হয়েছিল যেন তার গায়ের অঞ্চল থেকে শুন্য একঝাঁক বক উড়িয়ে দিল। 

অবাক যত না হয়েছিল তার চেয়ে বেশি রেগে উঠেছিল সুনয়নী : ‘তুই দিতে গেলি কেন? সার্চকরা বার করে দিতাম।’ 

‘তুমিই তো লাই দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছ! নইলে ও কোন সুবাদে তোমাকে দিদি বলে? মাসি না, পিসি না, বৌদি না—‘ 

‘মনে হচ্ছে তোর সুবাদে।’ ঠাট্টা করেছিল সুনয়নী। 

‘আমার সুবাদে! দেখি আজ থেকে সমস্ত স বাদ দিলাম দিদি। বাসাড়ে যখন হয়েছি তখন চাষাড়েই হব ঠিকঠাক।’ 

লজ্‌ঝর একটা ফ্যান ভাড়া করে এনেছিল ভবদেব। এ-সি কারেন্টের পাখা, বাটি-শুদ্ধু ঘোরে। পুরো দমে চালালে প্রলয়ঙ্কর শব্দ হয়, ঘর-দোর কাঁপে, মনে হয় সিলিং বুঝি ফেটে পড়বে। সেই শব্দ উপরে যায়, উপর থেকে ফেরাফিরতি বল খেলে, দুপ-দাপ চালায়, কিন্তু কতক্ষণ চালাবে, এদিকে পাখা ঘুরছে দিনরাত। শুধু তাই নয়, শুরু করেছিল দেয়ালে পেরেক ঠুকতে, শার্সি ভাঙতে, মেঝেতে হাতুড়ি পিটতে। আর কি করা, উচ্ছেদের নোটিশ দিয়েছিল বাড়িওলা। উলটে রেন্ট কন্ট্রোলের কাছে নালিশ করল ভাড়াটে। জল বন্ধ, আলো বন্ধ। 

লাগ ভেলকি লাগ। 

এমনি যখন জলদতালে বাজনা বাজছে, তখন খবর এল ভবদেবের চাকরি স্থায়ী হয়েছে। প্রমোশন পেয়েছে ইউরোপীয়ান গ্রেডে। কিছুকাল পরেই কোয়াটার্স দেবে কোম্পানি। 

দেখতে-দেখতে একটা ভোজবাজি হয়ে গেল। খারিজ হয়ে গেল সমস্ত মালিমামলা। আকাশ বাতাসের বদলে গেল চেহারা। নিচের ঘরে আলো জলল শুধু নয়, নতুন পয়েন্ট বসাল পরাশর। জল দিতে লাগল চৌবাচ্চা ছাপিয়ে। বন্ধ হয়ে গেল উপরের দুপদাপ। কাপড় শুকোতে লাগল ছাদের উপর প্রসারিত হয়ে। শুধু তাই নয়, পরাশর নতুন একটা নিঃশব্দ পাখা দিলে ভবদেবকে। ভাড়া? ভাড়ার জন্যে কি। 

আশ্চর্য, সময়ে অসময়ে নিচে নামতে লাগল ক্ষণিকা। সুনয়নীর কাজকর্মে হাত মেলাতে লাগল। দু-একটা রান্নাও নাড়ল-চাড়ল। 

কখনো-সখনো হাত রাখতে গেল ভবদেবের টেবিলে। ভবদেবেরও ঘন-ঘন নেমন্তন্ন হতে লাগল উপরে। পরাশরের মা, আর বৌদিও চলে এল সামনে, নতুনতরো আত্মীয়তার আলো ফেলে। 

পরাশরের মা বললেন, গায়ের রং একটু কালো হলে কি হবে, দিব্যি স্বাস্থ্য। 

‘আর লেখাপড়া?' ফোড়ন দিল বৌদি। 

সব জানা আছে। মনে-মনে হেসেছিল ভবদেব। আসলে চাকরি, বড় বাহালি চাকরি। আসলে টাকা। আসলে কোয়ার্টার্স। 

হাল ঠিক ছেড়ে দেয়নি, কিন্তু মুষ্টিটা একটু শিথিল করেছিল ভবদেব। দেখি হাওয়ার টানে কোথায় গিয়ে উঠি, কোন রোমাঞ্চের বন্দরে। দেখি উদ্ধত কি করে বিগলিত হয়, দুরুহ-দুর্জ্ঞেয় কি করে সরল হয়ে আসে। 

দক্ষিণের আকাশ অনেকখানি জুড়ে লাল হয়ে উঠেছে। বার্ণপুরের ফার্নেস। যেন উদ্যত বজ্রের মতো জ্বলছে কোথায় মহাভয়ঙ্কর। দাহের ওপারে নির্দয় শাসনের মত। যেন বলছে রূঢ়ভাবে, তর্জনী আস্ফালন করে, কোনো নিয়মের ব্যতিক্রম চলবে না, কোনো স্খালনের ক্ষমা নেই, নেই কোনো বিচ্যূতির নিষ্কৃতি। 

তাই, ভয় পেয়ে গিয়েছে ক্ষণিকা। কুঁকড়ে-সুঁকড়ে ভয়ের কুণ্ডলীর মধ্যে অভ্যাসের জড়পিণ্ড হয়ে পড়ে আছে। 

যদি এই ভয়টুকু না থাকে তবে কিসের জয়। এই ভয়টুকু আছে বলেই তো নির্জন গিরিশিখরের ডাক। ডাক সেই পথ-হারানো গহন অরণ্যের। সঙ্গ-লেশহীন সমুদ্রতীরের। সেই ডাকটি কি এই মহান রাত্রি পৌঁছে দিতে পারেনি ক্ষণিকার কানে কানে ? 

বটেই তো। সেও নুন-নেবু মেশানো ফিকে জল-বার্লি। একটি অভ্যস্ত জীবনের জীর্ণতার জন্যে অপেক্ষা করছে ধৈর্য ধরে। রাত্রির ক্লান্তিতে প্রতিটি প্রভাতকে মলিন দেখবার বাসনায়। নেই তার মধ্যে সেই আনন্দোদ্ভব উদ্ঘাটনের স্বপ্ন। সর্ব-অর্পণের ব্যাকুলতা! রাজকন্যার ভিখারিনী সাজবার তাপসশ্রী! তাহলে তাকে দিয়ে আর কি হবে? যাকে ভালোবাসি তার সঙ্গে আজ দেখা হবে মহারাত্রির মৌনে, সমস্ত হিসেব-কিতেবের বাইরে, কোনো রকম কৃত্রিম মীমাংসা না মেনে-- এই উজ্জ্বলতাটুকু এই নবীনতটুকু যদি সে উপহার দিতে না পারে, তবে তার দাম কী, তবে তার মহত্ত্ব কোথায়! 

ভালোবাসা না ছাই! মোটা জাঁকালো চাকরি। টাকা। স্ববাসের কাছে কোয়ার্টার্স। 

গ্যারাজ থেকে গাড়ি বের করে দিয়েছিল পরাশর। চলুন যাই কল্যাণেশ্বরী, বরাকরের ডাকবাংলো। এবার তোপচাঁচি। এবার আরো দূরে, পরেশনাথ। 

কেমন একটা ঘোর-ঘোর নতুন দৃষ্টি এসেছিল ভবদেবের চোখে। রক্তে নতুনতরো আবাদ। হঠাৎ ঘুম-ভেঙে যাওয়ার মধ্যে হঠাৎ মনে-পড়ে যাওয়ার সুগন্ধ। নতুন দৃষ্টির সঙ্গে নতুন দৃষ্টি যখন সাক্ষাৎ হয়, তখন সমস্তই যেন চক্ষুময় হয়ে ওঠে। অলক্ষ্য একটি নিমন্ত্রণের ভাষা নীরবে গুঞ্জরন করতে থাকে। আশ্চর্য, যে চোখে আগে চকমকি পাথর ছিল তাতে এখন একটি লজ্জা একটি গম্ভীর কোমলতা দেখা দিয়েছে। একটি ধরা-পড়ার প্রস্তুতির লাবণ্য। কি করে এ সম্ভব হতে পারে ভেবে পায়নি ভবদেব। কে রচনা করল এই রুক্ষ মাটির শ্যামায়ন!নিষ্পাদপের দেশে অজানা পক্ষিকাকলী। 

কিন্তু ঐখানেই শেষ। আর কোনো ঐশ্বর্য নেই। শুধু একটি দৈনিক জীবনযাত্রার মধ্যে সমাপ্তি পাবার জন্যে প্রতীক্ষা করছে। 

সুনয়নীকে বলেছিলেন পরাশয়ের মা : ‘তুমিই তো কত্রী। এখন বলো কি তোমার দাবিদাওয়া!’ 

‘দাবিদাওয়া যে কিছু নেই তা আমি জানি।’ সুনয়নী বলেছিল হেসে হেসে, ‘কিন্তু আমিই কর্ত্রী কিনা তাই জানি না।’ 

সেই দাবিদাওয়া জানবার জন্যেই সেদিন এসেছিল ক্ষণিকা। ছুটির দ্বিপ্রহরে। সুনয়নীর সুতো ধরে ভবদেবের নির্জনতায়। 

ভবদেব বলেছিল,‘একদিন মধ্যরাত্রে আসতে পারো ?’ 

দু চোখে অন্ধকার দেখেছিল ক্ষণিকা। ভয়ে পাংশু হয়ে গিয়েছিল। ‘চার দিকে এত ভিড়, কোনো সম্ভাবনা নেই, তা আমি জানি।' রাজনীতিকের নিরুদ্বেগ গলায় বলেছিল ভবদেব : 'কিন্তু গ্রহ-নক্ষত্রের ষড়যন্ত্রে যদি কোনো দিন সেই মসৃণ মহারাত্রি আসে, আসবে?' 

মুচকে হেসে সম্মতির ঘাড় নেড়েছিল ক্ষণিকা। 

সেই মহারাত্রি সমাগত। কিন্তু ক্ষণিকার সাড়া নেই। আকাঙ্ক্ষার স্বীকৃতির নিচে আত্মদানের স্বাক্ষরটি ছিল না। পরিমিত জীবনের অপ্রমত্ত শান্তির কূপে তৃষানিবৃত্তির অপেক্ষা করতে লাগল। রাত্রির মঞ্জুষায় দিল না তাকে একটি উজ্জ্বলতম দিনের উপহার। দিল না তাকে একটি বাঙ্ময়ী নিস্তব্ধতা। তার পৌরুষকে মহিমান্বিত করল না একটি বলবান বিশবাসে। 

সত্যিই তো, বিশ্বাস কি। যদি অবশেষে ছিন্নসূত্র মালার মত ধূলোয় ফেলে দেয় ভবদেব! কে না জানে অবিবেকী পুরুষের খামখেয়াল! যদি তার কাছে সহসা সমস্ত মূল্য খুইয়ে বসে! যদি এক লহমায় সমস্ত রহস্যের অবসান হয়! যদি শেষ ছত্রের সঙ্গেসঙ্গেই কবিতাটি থেমে যায়, সমস্ত কথা, সমস্ত সরে যায় ফুরিয়ে। 

তার চেয়ে নিষ্পত্তির দৃঢ়ভূমি অনেক ভালো। অনেক ভালো ধৈর্যের ফুলশয্যা। 

সে তো শুধু একটা নিয়মপালনের রাত্রি। সে সব ফুল তো বাজারে কেনা। কিন্তু সে ফুলশয্যার চেয়ে এ তৃণশয্যার অনেক ঐশ্বর্য। আকাশের অনাবৃতির নিচে শ্যামলতার উন্মুক্তি। 

তবে তাই হোক, এখানেই ইতি পড়ুক। তোমার অক্ষত অন্তরের পূণ্যস্থানে ফটক এঁটে দাও। তুমি থাকো তোমার অক্ষোভে অক্ষম হয়ে। আমি এবার শুয়ে পড়ি। ভবদেব বিছানার দিকে তাকালো। এবার শুয়ে পড়ি। বৃষ্টিটি আর নেই। 

অন্যায্য অভিমান করে লাভ কি। বাধাবিঘ্নগুলোও বুঝতে হয়। বড় বন্ধনগুলো নেই বটে কিন্তু ছোট কন্টক অনেকগুলি। 

‘বিমলাকেই আমার বেশি ভয়।’ বলেছিল ক্ষণিকা : ‘ওর দুটো রোগ, দুটোই সাংঘাতিক। এক হিংসে, দুই অনিদ্রা।’ 

‘দুটো বড়ি দিচ্ছি, খাইয়ে দিয়ো চালাকি করে।' বলেছিল ভবদেব। 

এটুকু এলাকার মধ্যে চার-চার ঘর ভাড়াটে বসিয়েছে পরাশর। সাধে কি আর ভবদেব তাকে হাড়কিপ্পন চশমখোর বলে! গ্যারেজের উপরে দুখানা ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছে বিমলা আর বিমলার মাকে। বিমলার মা ধাইগিরি করে। রাত্রে যদি কল আসে তবে বিমলাকে ক্ষণিকার কাছে শুতে পাঠায়। তেমন যদি কিছু ঘটে আজ অঘটন তাহলেই তো বিপদ! একে পাশে শোবে তায় আবার ঘুম নেই। 

কিন্তু ভবদেবের নিজের ভয় নাগমশাইকে। ভাড়াটে বসাবার আগে আর বাছবিচার করেনি পরাশর। কোথাকার এক বিপত্নীক নিঃসন্তান ঠিকেদারকে ঘর দিয়েছে একখানা। জীবনে দুটি মাত্র ব্যসন, রাতে চোর ধরা ও দিনে নাকের ডগায় চশমা বসিয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে ইতি-উতি উঁকি-ঝুঁকি মারা। পাড়ার রক্ষীদলের সর্দার। জানলা দিয়ে কোন চোর হাত বাড়াল কোন মশারির মধ্যে, কোথায় গার্ডে ড্রাইভারে ষড় করে ট্রেন থামিয়ে ওয়াগন ভাঙল—এই সবেরই ফিরিস্তি করে। বাড়ির আনাচে-কানাচে, কখনো বা ট্রেনের লাইনের ধারে টহল দেয়। যখন ঘরে থাকে, জানলার ভাঙা খড়খড়ির ফাঁকে চশমা ঠেকিয়ে চেয়ে থাকে। 

শুধু, নাগ নয়, কালনাগ। দুপেয়ে সাপ। তার উদ্যত ফণা ডিঙিয়ে আসা কি সহজ কথা? 

তারপর এদিককার একতলার সেডের খগেন মিত্তির। সে আবার যোগধ্যান করে। করবি তো কর ঘরে বসে কর। তা নয়, ঘরের বাইরে এজমালি গেটের কাছে আম গাছটার তলায় চেয়ার পেতে বসে থাকে। চোখ বুজে শিরদাঁড়া খাড়া করে। সত্যিকার হলে ভাবনা ছিল না, টের পেত না কিছু। ভণ্ড বলেই ভয়। চোখ চেয়ে দেখে ফেলবে ঠিক সময়। 

বৃষ্টিতে উপকার করেছে। যোগীবর ঘরে গেছেন। কিন্তু নাগমশায়ের খড়খড়িটির কি দৃশ্য কে জানে। কে জানে বড়ি খেয়ে কেমন আছে বিমলা। কে জানে তার মা কোথায়। 

ভুল করে না ইচ্ছে করে নিজেই বড়ি খেয়ে ফেলেছে কিনা তার ঠিক কি। 

বাধা হয়তো আর কোথায়ও নয়, বাধা তার মনে। সে আত্মীয় হতে চায়, আপন হতে চায় না। সংহত তুষারপিণ্ড হয়ে থাকবে, হবে না সীমাতিক্রান্তা নির্ঝরিণী। এও একরকম অহঙ্কার। আমি পবিত্র, আমি অব্যাহত, আমি অপ্রমত্ত এই অহঙ্কার। 

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল ভবদেব। বি-এন-আরের রাত্রের ট্রেনটাও চলে গেল এতক্ষণে। আর কি। কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে খেল এক গ্লাশ। এবার পরাভূত শয্যায় গিয়ে লজ্জিত ঘুমটুকু সেরে নি। 

ঠুক ঠুক ঠুক ঠুক! 

হৃৎপিণ্ড শব্দ করে উঠল নাকি? রুদ্ধদ্বার দেবমন্দিরে কি আপনা থেকেই ঘণ্টা বেজে উঠল! 

ঠুক ঠুক ঠুক ঠুক! 

কোন দিকের দরজা? ভিতর বারান্দার, না, বাহির বারান্দার ? কোন সিঁড়ি দিয়ে নামল? বিমলা কি ঘুমিয়েছে? তার মার আজ কল আসেনি? নাগমশায়ের খড়খড়ি কি বুজে গেছে? ছাড়া চেয়ারে আবার এসে বসেনি তা যোগীবর। 

ও কি, কতক্ষণ বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখবে? দরজা বন্ধ দেখে ও আবার ফিরে যাবে নাকি? 

খুট করে ছিটকিনি টানল ভবদেব। দরজাটা একটু ফাঁক করল। সুট করে ঢুকে পড়ল ক্ষণিকা। নিয়তির পরিহাস নয়, সত্যি সত্যি ক্ষণিকা। 

কাঁপছে, লতার মত কাঁপছে। যত ঠাণ্ডায় নয় তত ভয়ে। যত উচ্ছ্বাসে নয় তত উৎকণ্ঠায়। শুধু বললে, অস্ফুট নম্রটবরে বললে, 'আমি এসেছি।' 

মাধুর্যসিন্ধুর দুটি তরঙ্গের মত মনে হল শব্দ দুটোকে। আমি এসেছি হে গুহাহিত গোপন পুরুষ, আমি এসেছি। হে আকর্ষী বংশী, আমি শুনেছি তোমার ডাক, চিনেছি তোমার পথ। তুমি এবার আমাকে ধরো, আমাকে নাও আমাকে ভাঙো। আমাকে শুন্য করে পূর্ণ করো। 

কি করবে কিছু বুঝে উঠতে পারল না ভবদেব। হাত ধরে টেনে আনল কাছে, বসতে বলল না বিছানায়, কি আশ্চর্য, দরজায় ছিটকিনি লাগাতে পর্যন্ত ভুলে গিয়েছে। 

ইলেকট্রিক লাইট নয়, মোমবাতি জ্বালাল ভবদেব। স্নিগ্ধ আলোতে দেখল ক্ষণিকার ক্ষণকরুণ মুখখানি। ভোগবিরত পূণ্যশ্রী তাপসিনীর মুখ। 

বললে, 'তুমি এসেছ। এর উত্তরে আমি কী বলতে পারি ? বলতে পারি আমি আছি। একজন আছে, আরেকজন আসে। এ আছে বলেই তো সে আসে। আর সে আসবে বলেই তো এ বসে আছে অন্ধকারে। তাই নয়?’ 

অদ্ভুত সুন্দর করে হাসল ক্ষণিকা। 

'তোমাকে কী দিই বলো তো?’ পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল ভবদেব। খোলা জানলা দিয়ে হাত বাড়াতেই পেল সেই গোলাপ গাছ। বৃন্তাশ্রয়ে বিহ্বল একটি গোলাপ জেগে আছে। ঘ্রাণে-বর্ণে গদগদ হয়ে। শুষ্ক গর্বরূপে নয়, সুধাসরস প্রেমরূপে। নিবেদনের বেদনায় আনন্দময় হয়ে। 

সন্তর্পণে ফুলটি ছিঁড়ল ভবদেব। ক্ষণিকার স্তুপীকৃত চুলের মধ্যে গুঁজে দিলে। 

দরজা খুলে এগিয়ে দিতে গেল ক্ষণিকাকে। 

ক্ষণিকার চোখে জলের ছোঁয়া লেগেছে। ছোঁয়া লেগেছে কণ্ঠস্বরে। আর্তস্বরে বললে, ‘এ কি, আপনি চললেন কোথা ?’ 

‘বা, কি কথা? তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।’ 

‘আপনি?’ দেয়ালের পাশে কুণ্ঠিত হয়ে দাঁড়াল ক্ষণিকা। ছায়া হয়ে মিশে যেতে চাইল। বললে, ‘যদি কেউ দেখে ফেলে, সব বুঝে নেবে।' 

‘যাতে ভুল না বোঝে তাই তো আমি চাই। বনো কোন সিঁড়ি দিয়ে নেমেছিলে ? বিমলাকে কটা বড়ি দিয়েছ ? নাগমশায়ের খড়খড়ি ফাঁক ন্যাকড় দিরে বন্ধ করেছ নাকি? আর যোগীবরের কি খবর? যোগনিদ্রার চেয়ে সুখ নিদ্রা অনেক আরামের। যাও, নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোও গে। কোনো ভয় নেই-- 

পরিত্যক্ত বিছানায় এসে শুলো ক্ষণিকা। বালিশে মুখ গুঁজে দিতে লাগল ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন