শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

'ভাষা বিকৃতি আমাদের হীনমন্যতা ও দাসত্ববোধের প্রকাশ' - সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম


সাক্ষাৎকার গ্রহণ : স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান :
আর ক’দিন পরেই স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী অতিক্রম করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছরে আমাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি সম্পর্কে আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম :
আসলে আমাদের এ দেশটার প্রধান সমস্যা হচ্ছে জনসংখ্যার ভার। যার ফলে দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব ও সামাজিক সুস্থিরতার অভাব। যখন একটি দেশে এসব শক্তি কার্যকর থাকে তখন তার কাংখিত উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়ে। পশ্চিমের দেশগুলো বহু আগেই এগিয়ে গেছে, এ সমস্যাগুলো ভালোভাবে তারা সমাধান করেছে। আমাদের পূবের অনেক দেশ এই সমস্যার সমাধান করতে পারেনি বলে পিছিয়ে আছে। দক্ষিণ এশিয়াতে এ সমস্যাগুলো সবচেয়ে প্রকট। 

যখন বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে তখন এ দেশের সামনে সমস্যার একটা পাহাড় ছিল। আমি বলব, গত প্রায় পঞ্চাশ বছরে আমাদের অর্জন একেবারে কম নয়। প্রধান অর্জন দেশের জনসংখ্যাকে খাদ্য দিতে পারছেন আমাদের কৃষকরা। প্রথম অর্জন তাদের। জনসংখ্যার হার থেকে প্রতিবছর বেশি হারে তারা খাদ্য উৎপাদন করেছেন। যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা খাদ্য উৎপাদন করেছেন সেই প্রযুক্তি দিয়ে উন্নত বিশ্বে এই পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব নয়। তাদের প্রজ্ঞা এবং স্থানীয় জ্ঞান কাজে লাগিয়েছেন তারা। দেশটিকে অন্তত অভুক্ত রাখেনি। এটি আমাদের প্রধান অর্জন।

দ্বিতীয় অর্জন হচ্ছে, এই কৃষির হাত ধরে যখন মানুষ খেতে পারে তখন তার অন্যান্য চিন্তাও বিকশিত হয়। যেমন শিক্ষা। আমি মনে করি, এই ক’বছরের মস্ত বড় অর্জন হচ্ছে শিক্ষার বিস্তার। শিক্ষার গুণগত মানের প্রশ্নে আমি এখন যাব না। কারণ প্রচন্ড বাধা বিপত্তির মধ্য দিয়ে শিক্ষার যে প্রসার ঘটে তার প্রধান কাজ হয় বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারা। বিশেষ করে সন্তানদের কাছে, শিশুদের কাছে। এটি কিন্তু আমরা খুব সাফল্যের সঙ্গে করতে পেরেছি। ফলে এখন আমি যদি উচ্চ শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলি তাহলে আমাকে বলতে হবে যে, বাংলাদেশের এই যে দারিদ্র্য, এই যে সম্পদের সীমাবদ্ধতা, এই প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে আমরা সংগ্রাম করে আমাদের শিক্ষাকে অন্তত একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছি, যেখান থেকে সে উড়তে পারে, উড়াল দিতে পারে। শিক্ষার যে সার্বজনীনতার আশা আমরা করেছিলাম, সেটা কিন্তু মোটামুটি অর্জন হয়েছে আমাদের। আমাদের মেয়েদের শিক্ষা ক্ষেত্রে ঢোকার বিষয়টি বাংলাদেশের মতো একটি দেশে অকল্পনীয় ব্যাপার। ভারতে যেটি সম্ভব হয়নি, পাকিস্তানে যেটি সম্ভব হয়নি।

স্বকৃত নোমান :
শিক্ষার অগ্রগতি হয়েছে এটা সত্যি কথা। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে তো একটা নৈরাজ্য চলছে। আমাদের দেশে বহুমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা জারি রয়েছে। যেমন সনাতন পদ্ধতির কওমি শিক্ষা ব্যবস্থা, সরকারি মাদ্রাসা শিক্ষা, বাংলা মাধ্যম সাধারণ শিক্ষা এবং ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা। আসলে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাটা কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : 
আমি তো মনে করি শিক্ষা একমুখীন হওয়া উচিত। আমাদের সমাজ নিশ্চিত করেছে তিন ধারায় আমাদের শিক্ষা অগ্রসর হবে। দরিদ্রদের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা, মধ্যবিত্তদের জন্য বাংলা মাধ্যম শিক্ষা এবং উচ্চবিত্তদের জন্য ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা। পাশাপাশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে উচ্চবিত্তদের জন্য, অথবা মধ্যবিত্ত যাদের পক্ষে সম্ভব তাদের জন্য, আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে মধ্যবিত্তদের জন্য। এরকম একটা বিভাজন সমাজে হয়ে গেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এই যে অরাজকতা, এটাকে কিন্তু আমি দীর্ঘস্থায়ী একটা সমস্যার লক্ষণ বলে মনে করছি না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক যে সমস্যাগুলো ছিল, সেই সমস্যাগুলো আমরা প্রথমেই কাটাতে পারিনি। মাদ্রাসা শিক্ষা একটা সমাজে এতখানি প্রয়োজন নেই। কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষা পাচ্ছে দরিদ্রের সন্তানরা। তাদের বেতন দিতে হচ্ছে না, অনেক সময় তারা থাকার জায়গা পাচ্ছে, অনেক সময় তাদেরকে খাদ্য এবং কাপড়-চোপড়ও দেয়া হচ্ছে। আদর্শগত কী কারণে এটি হচ্ছে সেই বিবেচনায় না গিয়েও আমরা বলতে পারি অন্তত শিক্ষা তো পাচ্ছে। সে তো অশিক্ষিত থাকছে না।


স্বকৃত নোমান : 
কিন্তু এই শিক্ষা কি সমকালীন যুগের সঙ্গে যাচ্ছে? কার্যকরী শিক্ষা হচ্ছে?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম :
হ্যাঁ, এই শিক্ষা কার্যকরী হচ্ছে না। কিন্তু আপনি আশ্চর্য হবেন যে, মাদ্রাসাগুলো থেকে যখন অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, তারা কিন্তু এক-দুই বছরের মধ্যে আমাদের মূল ধারায় পা রাখতে সক্ষম হয়। তাদের কত জনের ভেতর মৌলবাদ কার্যকর, কতজনের ভেতর কার্যকর নয় এরকম কোনো জরিপ হয়নি। কিন্তু আমার যেটা ধারণা, একটা সন্তান যখন মাদ্রাসায় যায় তাকে প্রথমেই আমি মৌলবাদী ধরে নেব, এটা কিন্তু অন্যায় হবে। তাকে আমি শিক্ষার পরিবেশ দিতে পারছি কিনা সেই প্রশ্নটি প্রথম জিজ্ঞেস করতে হবে। তার জন্য প্রাইমারি স্কুলের দ্বার আমি উন্মুক্ত করতে পেরেছি কিনা, তার পরিবারকে আমি বুঝাতে পেরেছি কিনা যে, এমন শিক্ষা হওয়া উচিত, যে শিক্ষা ভবিষ্যতের জন্য কার্যকরী। আমাদের পরিবারগুলোতে কিন্তু আমরা এসব সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারিনি। এ সমস্ত না করে আমরা শুধু আশা করব সবাই প্রাইমারি স্কুলে যাবে, এটা ঠিক না। আর মাদ্রাসার যে একটা ঐতিহ্য আছে আমাদের দেশে, সেই ঐতিহ্য থেকে সবাই চট করে বেরিয়ে আসবে এটাও ঠিক না। তখনই বেরিয়ে আসবে যখন আমরা বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিক শিক্ষাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারব একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে, একেবারে সহজলভ্যভাবে এবং যার প্রণোদনা থাকবে, পরিবারগুলো বুঝতে পারবে যে, এখানে আমার সন্তানকে দিলে এই সন্তান ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠা পাবে। আপনি একটা জরিপ নিয়ে দেখুন, অনেক পরিবার সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছে তার কোনো বিকল্প নেই বলে। সাধারণ শিক্ষায় যদি যায়ও তবে তার তো খাদ্য দিতে হবে, তার পোশাক দিতে হবে। সেক্ষেত্রে অনেক মাদ্রাসা শিশুদেরকে রাখছে এবং তাদেরকে খাদ্য এবং পোশাকও দিচ্ছে।

স্বকৃত নোমান : 
এসব দেওয়ার পেছনে তাদের বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নেই?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম :
কী কারণে দিচ্ছে সেই কারণে আমি এখন যাচ্ছি না। আমার বক্তব্য হচ্ছে, মাদ্রাসা শিক্ষাকে যদি আমরা আধুনিকায়ন করি, একটা পর্যায়ে নিয়ে আসি, পশ্চিমবঙ্গে যেটা করা হয়েছে, মাদ্রাসা শিক্ষা থেকে বেরিয়ে একটি ছেলে বা একটি মেয়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিয়ে টিকে যাবে। যদি আমরা সেটা করতে পারি তাহলে মাদ্রাসার সংখ্যা এমনিতেই কমে যাবে। কারণ যারা মাদ্রাসায় সন্তানকে ধর্মীয় কারণে পড়াচ্ছেন তারা সেখানে পড়াবেন এবং একই সঙ্গে তারা ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হতে পারবে। আর যারা কোনো বিকল্প ছাড়া সন্তানকে মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছে তারা তখন আমাদের প্রাইমারি স্কুলে বাচ্চাগুলোকে পাঠাবে। এই বিষয়টা কিন্তু আমাদের নিশ্চিত করতে হবে জাতীয়ভাবে। সমস্যা হচ্ছে এগুলো নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে। মাদ্রাসা সম্পর্কে কিছু বললেই ধর্মভিত্তিক দলগুলো ক্ষিপ্ত হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। কারণ তাদের একটা ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জায়গা এই মাদ্রাসাগুলো এবং তারা সেখানে অনেক বিনিয়োগ করছে। 

তো আমরা যদি এখানে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, রাজনৈতিকভাবে এদেরকে প্রতিহত করতে হবে এবং বস্তুগতভাবে প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজগুলোতে আমরা অত্যন্ত ভালো বিনিয়োগ করে সেগুলোকে উন্নত করতে পারি, তাহলে দেখা যাবে আমাদের বাংলা মাধ্যমে শিক্ষার বহু পুরনো ঐতিহ্য আবার পুনরুজ্জীবিত হবে। এবং সেখানে যে পরিবারগুলো সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠাচ্ছে বিকল্পহীনভাবে, তারা কিন্তু তাদের সন্তানদের তখন স্কুলে পাঠাবে। তখন একটা ভারসাম্য তৈরি হবে। আমাদের দেশে যদি কোনো পরিবার চায় যে সন্তানকে ধর্মীয়ভাবে শিক্ষিত করবে, সেই অধিকার তার আছে। কিন্তু তখন যেখানে তাকে উচ্চমাত্রার আধুনিক শিক্ষা দেবে, তা থেকে ওই ধর্মীয় শিক্ষা শেখার পরও দেশের যে কোনো ক্ষেত্রে সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। সেটি কিন্তু আমাদের পক্ষে সম্ভব। একটা উদাহরণ হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা বোর্ড ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে। 

দ্বিতীয়ত এই যে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার একটা দিক। এর কারণ হচ্ছে, আমাদের বাজারে ইংরেজির খুব প্রয়োজন। আমরা এখন বৈশ্বিক মাত্রায় চলে গেছি। আমাদের পোশাক শিল্প বলুন কি জাহাজ শিল্প বা আমাদের ফুল রপ্তানি বলুন, আমরা কিন্তু বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর এখন যে নব্য-উপনিবেশ চলছে, আমরা না চাইলেও তার ভেতর আমরা সম্পৃক্ত হয়ে যাব। সেখান থেকে বেরুতে আমাদের সময় লাগবে। যখন আমরা অর্থনৈতিকভাবে একটা সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে দাঁড়াতে পারব তখন হয়ত বিশ্বায়নের ঢেউকে আমরা ফিরিয়ে দিতে পারব। তার আগ পর্যন্ত বিশ্বায়নের ঢেউতে যাতে আমরা তলিয়ে না যাই সেজন্য আমাদেরকে নিজেদের মতো বিশ্বায়নকে গ্রহণ করতে হবে এবং নিজেদের মতো আত্মীকরণ করতে হবে। সেখানে টিকে থাকার জন্য আমাদের যোগ্যতার প্রয়োজন। শ্রীলংকা গ্রহণ করেছে, ভারত গ্রহণ করতে শুরু করেছে। আমাদেরও সেই যোগ্যতা অর্জনের জন্য ইংরেজির প্রয়োজন আছে। কিন্তু যেভাবে বিশৃঙ্খলভাবে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল-কলেজ চলছে এবং তাদের পাঠক্রমে যে অসঙ্গতি, সমস্যা সেগুলোকে যদি আমরা বজায় রেখে এগিয়ে যাই, তাহলে কিন্তু আমাদের সেটা অর্জন কোনোদিনই সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে শিক্ষা নিয়ে একটা নতুন চিন্তা করতে হবে।


স্বকৃত নোমান : 
বর্তমান শিক্ষানীতি কতটা যুগোপযোগী এবং আপনার চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে কতটা মিল বলে আপনার মনে হচ্ছে?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : 
আমি খুব আনন্দিত যে, ২০১১ সালের শিক্ষানীতি উপরোক্ত বিষয়গুলোকে অনেকটাই সুরাহা করেছে। একটা শিক্ষানীতি একটা দিক নির্দেশনা দেয়। পরবর্তীকালে যদি শিক্ষাবান্ধব সরকার আসে এবং যে সরকার মাদ্রাসা শিক্ষাকে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেখবে না, তাহলে আগামি ১০ বছরে এসব অসঙ্গতি মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। 

আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমার কথা হচ্ছে, আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজনের তুলনায় আসন সীমিত। আমরা যদি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াতাম আর উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে একটা শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে পারতাম যে, সবাইকে কলা-বিভাগ, মানবিক বিভাগে পড়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের দেখতে হবে আমাদের কত প্রকৌশলী দরকার, কত ডাক্তার দরকার, কতজন পেশাজীবী প্রয়োজন। এই কোটা যদি ঠিক করে ফেলতে পারতাম তাহলে সমস্যাগুলো থাকত না। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে যদি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে দেখা যাবে আমরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংখ্যা বাড়াতে পারব। কারণ প্রতিটি জেলায় খুব উন্নত একটা করে কলেজ আছে। যেমন সিলেটের এমসি কলেজ, বরিশালের বিএম কলেজ, কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ। এগুলোকে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদায় উন্নীত করা যায়। তার মানে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস-দর্শন পড়ানো হবে তা কিন্তু নয়। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল এ বিষয়গুলো পড়ানো হবে। যে প্রযুক্তিগুলো আমাদের জন্য প্রয়োজন, একুশ শতকের জন্য তৈরি হওয়ার জন্য যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের প্রয়োজন, যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ আমাদের প্রয়োজন, সেগুলো যদি আমরা সবখানে ছড়িয়ে দিতে পারি, তাহলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চাপ কমে যাবে। কে চায় এত টাকা খরচ করে সন্তানকে পড়াতে? কিন্তু আমি এর দুটো ইতিবাচক দিক দেখি। প্রথমত, এসব ছাত্রছাত্রী কিন্তু এর আগে ভারতে গিয়ে পড়াশোনা করেছে। এক সময় ভারতে আমাদের ৫০ হাজার ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করেছে। আপনি ভাবুন কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হয়েছে সেখানে! এখন সেই সংখ্যা কমে তিন থেকে পাঁচ হাজারে নেমে এসেছে। এটা একটা ইতিবাচক দিক। 

দ্বিতীয়ত, এটা শিক্ষার অগ্রগতি প্রমাণ করে। আমাদের অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার কিন্তু সঞ্চয় ভেঙে, জমি বিক্রি করে সন্তানদের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন। শিক্ষার প্রতি আমাদের একটা বিশাল আগ্রহ এবং নিষ্ঠা, এটাই কিন্তু তার প্রমাণ। মানে তার সন্তানকে তিনি শিক্ষাহীন রাখতে চান না। কাজেই এই নিষ্ঠা বা এই যে প্রত্যয়, এটির সঙ্গে যদি আমাদের প্রস্তুতিটা মিলাতে পারি, তাহলে শিক্ষার ক্ষেত্রে এই অরাজকতা থাকবে না। জনসংখ্যার বিশাল চাপে যেরকম ঢাকা শহর ডুবে যাচ্ছে মনে করছি আমরা সেরকমভাবে একই কারণে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তৈরি হয়েছে। বাজারের চাহিদা এবং জোগান থাকলেই তো বাজার সৃষ্টি হয়। এই বাজারটাই তৈরি হয়েছে এখন। আমরা যদি এর শৃঙ্খলার বিষয়টি পুনঃস্থাপিত করতে পারি, তাহলে আস্তে আস্তে এদের সংখ্যাও কমে যাবে এবং এরাও বিশেষজ্ঞ বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে দাঁড়াবে। এদেরও দরকার আছে। কারণ তারা যে পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারে, আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সে পরিমাণ করতে পারে না। আমেরিকাতেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রচুর, একই সঙ্গে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে। শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হলে তখন দেখা যাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়তে যাচ্ছেন তারা সর্বোচ্চ একটা বিশেষজ্ঞতার জন্য সেখানে যাচ্ছেন। তখন তাদের সংখ্যাও কমে যাবে। এইচএসসি পাস করে যারাই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে চাচ্ছে তাদের প্রত্যেকেরই যদি জায়গা দেয়া যায় তাহলে এই অরাজকতা আর থাকবে না। অরাজকতা না থাকলে নীতিনির্ধারণ অনেক সহজ হয়ে যাবে। নীতি প্রণয়ন এবং প্রয়োগটাও অনেক সহজ হয়ে যাবে। 

সুতরাং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মানেই নেতিবাচক নয়। তবে তাদের বেশিরভাগই শিক্ষাকে বাণিজ্য হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো যেমন সিএসআর করে, এরকমভাবে এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাদের সিএসআর হিসেবে পাঠ্যশিক্ষা ক্রমে দর্শন অন্তর্ভুক্ত করেছে, বাংলা অন্তর্ভুক্ত করেছে। এটা ভালো। আমি মনে করি, সামাজিক চাপ থাকলে এবং তাদের দায়বদ্ধতা থাকলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব। ২০১১ সালের শিক্ষানীতি এবং ২০১০ সালের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষানীতি এ দুটোকে যদি আমরা পাশাপাশি রাখি তাহলে দেখব যে, শৃঙ্খলার বিষয়টি সেখানে আছে। সরকারের সদিচ্ছা বলে আমরা একটা কথা বলি। শিক্ষাবান্ধব সরকার হলে সেটা ঠিক থাকবে। যদি শিক্ষাবান্ধব একজন মন্ত্রী থাকেন, আমাদের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী অত্যন্ত শিক্ষাবান্ধব, তাহলে সেটা সম্ভব। কিন্তু দেখা গেল, আগামীতে সরকার পরিবর্তন হয়ে এমন একজনকে শিক্ষামন্ত্রী দেয়া হলো যিনি বাণিজ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য উপযুক্ত, তখন তিনি বাণিজ্যের দিকেই যাবেন, তখন আর শিক্ষাবান্ধব নীতিগুলো বাস্তবায়ন হবে না।

আমি আমাদের পঞ্চাশ বছরের অর্জন সম্পর্কে বলছিলাম। এই পঞ্চাশ বছরে অর্জনের মধ্যে আমাদের মিডিয়ার অর্জন অসাধারণ। বাংলাদেশের মতো এত সদাজাগ্রত, এত তারুণ্যনির্ভর মিডিয়া শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় কেন, পূর্ব এশিয়াতেও আমি দেখিনি। পত্রপত্রিকাগুলো প্রতিদিন যেভাবে সরকারকে তুলোধুনো করে, বিরোধী দলকে তুলোধুনো করে, যে কোনো স্খলন-পতন কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামান্য একজন শিক্ষক যদি খারাপ একটা কাজ করে থাকে, তবে যেভাবে পত্রপত্রিকায় তুলোধুনো হয় এটা কিন্তু আমাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক মনে হয়।

স্বকৃত নোমান : 
এখন একটা ধারা শুরু হয়েছে যে, পুঁজিপতি তার পুঁজি রক্ষার জন্য হাতিয়ার হিসেবে একটা পত্রিকা বের করছেন। লাভের কথা বিবেচনায় না এনে মিডিয়ার পেছনে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন। আপনার দৃষ্টিতে এই ব্যাপারটা কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : 
সেটা তারা করুক। সেটা করতে গিয়ে তারা হয়ত কিছুটা লাভ পাচ্ছে। কিন্তু লাভটা শেষ পর্যন্ত পাঠকদের, সাংবাদিকদের। ওখানে যারা কাজ করছেন তারা ওই পুঁজিবাদীকে যে তোষণ করছেন তা কিন্তু বলা যাবে না। তার জন্য হয়ত কিছু জায়গা ছেড়ে দেয়া হচ্ছে, তার ছবিটা উঠছে। কিন্তু বেশিরভাগ জায়গাজুড়ে কিন্তু সংবাদ থাকছে। এতে আমাদের সাধারণ পাঠক উপকৃত হচ্ছেন। এটাও কিন্তু আমাদের জন্য এক নতুন সংস্কৃতি। 

আমি যেটা বলছি যে, আমরা বর্তমানে জাগ্রত একটা জাতি। আমরা যেন হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে জেগে আশির দশক থেকে একটা দৌড় দিতে শুরু করেছি। আশির দশকের শেষ পর্যন্ত একটা ঢিমে-তালে অবস্থায় চলেছি আমরা। ’৭৫ সালে জাতির জনককে স্বপরিবারে প্রায় নির্মূল করে ফেলা হলো, তারপর সামরিক শাসন এলো, তারপর একটা সময় স্বাধীনতা বিরোধীরা সংসদে এলো, মন্ত্রীসভায় এলো, তারপর আরেকজন স্বৈরশাসক এলো। এসব সত্তেও কিন্তু আমাদের জনগণ এগিয়ে গেছে। তরুণ উদ্যোক্তরা এসে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ করল। তারা বাইরে থাকতে পারত কিন্তু তা না করে দেশে বিনিয়োগ করল। তৈরি পোশাক শিল্পটা কিন্তু অত্যন্ত তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরে গড়ে উঠল। তারা কিন্তু কাজ করছে। নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সরকারের কোনো সহযোগিতা ছাড়াই। সরকার কোনো নীতি করেনি, কোনো সহযোগিতা করেনি তারপরও। বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে ১৯৯০ সালটি হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ’৯০ সালে আমরা গণতন্ত্রের একেবারে পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করে নিলাম। তারপর দেখা গেল ২০০৭ সালে একটা বড় ধাক্কা খেলাম। যেটাকে আমরা ওয়ান ইলেভেন বলছি। যার জন্য আমরা দোষ দিচ্ছি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে। তখন কিন্তু জনগণ সহ্য করে নিয়েছি যে, হয়ত একটা পরিবর্তন হবে। কিন্তু যে প্রশাসন দুই বছর বাংলাদেশ শাসন করল, তারাও কিন্তু দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠতে পারল না। তাদের কোনো সচ্ছতা ছিল না। কে কতটা মেরেছে এখন পর্যন্ত আমরা জানি না। কিন্তু রাজনৈতিক সরকার হলে খবর পেয়ে যাই আমরা। হাওয়া ভবনের সমস্ত হিসাব আমাদের কাছে আছে। আওয়ামী লীগের যারা টাকা-পয়সা কামাই করছেন এখন তাও কিন্তু আমরা জানি।


স্বকৃত নোমান : মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একটা লক্ষ্য ছিল একটা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেও ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে রাখল। এই নীতিটা তো আওয়ামী লীগের কাছ থেকে মানুষ প্রত্যাশা করেনি। আপনি এই বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমি অনেকদিন এই ব্যাপারটা নিয়ে বিক্ষুব্ধ ছিলাম, কিন্তু ইদানীং একটা চিন্তা আমার মাথায় এসেছে। সেটা এরকম যে, একটা দেশ তার আচার-আচরণে, তার প্রাত্যহিক কর্মকান্ডে তার সরকারি নীতি এবং নীতি প্রয়োগে কতখানি ধর্মনিরপেক্ষ সেটা দেখতে হবে। তার সংবিধান বলুন, বা তার রাষ্ট্রনীতিতে ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ত¡ কতখানি, এটা দেখলে বাংলাদেশে দেখা যায় অন্য চিত্র। বাংলাদেশে যদি ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হয়েও থাকে, যদি এমন হতো যে, এই রাষ্ট্রধর্মের কারণে আমাদের যারা অন্য ধর্মাবলম্বী আছেন তাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে পড়েছে, তাদেরকে চাকরি থেকে, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তখন আমার এটা নিয়ে কষ্ট থাকত। ভারত নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ বলছে, কিন্তু গুজরাটে কী ঘটনা ঘটল? পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানের সংখ্যা শতকরা পঁচিশ ভাগ। কিন্তু তাদেরকে সরকারি চাকরিতে নেয়া হচ্ছে ১.২ ভাগ। তাহলে আমি সেক্ষেত্রে কী বলব? তুমি কাগজে-কলমে অসাম্প্রদায়িক, কিন্তু বাস্তবে খুবই সাম্প্রদায়িক। এবং কলকাতার অনেক জায়গাতে মুসলমানরা বাসাভাড়াও পায় না। এরকম অবস্থা কলকাতা শহরে আছে। কিন্তু ঢাকা শহরে আমরা কি এটা ভাবতে পারি যে, কোনো হিন্দু বা খ্রিষ্টান বাসাভাড়া পাচ্ছেন না? 

তার মানে এটা নয় যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে স্বীকার করে নিলাম আমি। এটি আমাদের মৌলিক বিভ্রান্তি এবং পঞ্চাশ বছরে একটা দুঃখজনক অধ্যায়। সংবিধানের চারটি মূলনীতি নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম। চারটির মধ্যে একটিও আমরা রক্ষা করতে পারিনি। আমাদের যে গণতন্ত্র, এই গণতন্ত্র কিন্তু আমরা কামনা করিনি। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়েছিল। এটাকে আমরা নীতি হিসেবে ধরলে কাজকর্মে তার প্রয়োগ বেশি করে হতো। এটি আমরা করতে পারিনি। যে শক্তিটি পাকিস্তানিদের সহায়ক হয়, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের সহায়ক হয়, তারা এখানে ধর্মান্ধতা প্রতিষ্ঠা করল। তারা শুরু থেকে যে পরিমাণ সক্রিয় ছিল, আমাদের সুশীল সমাজ, আমাদের সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠার জন্য সেই পরিমাণ সক্রিয় ছিল না। বরং মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছে যে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মের অভাব। মানে আমরা কোনো ধর্মমানব না। এটি কিন্তু আসলে ধর্ম নিরপেক্ষতা না।

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে হচ্ছে সকল ধর্মের মানুষ সমান অধিকার ভোগ করবে। ধর্মের ভিত্তিতে কাউকে কোনো বিশেষ মর্যাদা দেয়া যাবে না। এত প্যাঁচাল না করে নিঃশব্দে যদি কাজগুলো আমরা করতাম তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টা সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু সেটা হয়নি। বিশেষ করে সামরিক শাসক যারা এলো, তারা মানুষকে ভুল বুঝিয়ে তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য ইসলাম-পছন্দ বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এলো। পাকিস্তানেও দেখেছি, বাংলাদেশেও দেখেছি ইসলামের নামে যারা অশ্রপাত করেন তারা নিজেদের স্বার্থে করেন। জিন্নাহ নিজেই মদ্যপান করতেন, শুকরের মাংস খেতেন, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তিনি ইসলামকে গ্রহণ করলেন। ইসলামের রাজনৈতিক যে রূপটি সেটি কিন্তু কখনো জনগণের জন্য সুফল নিয়ে আসেনি। ইসলামকে যারা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করবেন তাদের সেই শিক্ষা নেই, সেই প্রজ্ঞা নেই, সেই মানবিকতা নেই। পাকিস্তানের দিকে তাকালেই তো বুঝতে পারি যে, পাকিস্তান কেন ব্যর্থ রাষ্ট্র হচ্ছে। কারণ ধর্মের বিষয়টাকে তারা সেভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। ধর্মের বিষয়টাকে তারা মৌলিকভাবে, একেবারে ফান্ডামেন্টালিজমের ভেতরে ফেলে ব্যাখ্যা করেছে। যার জন্য এখন ওখানকার মেয়েদের স্কুলে বোমা পড়ে। বাংলাদেশে কিন্তু এটা হয়নি। সেজন্য একদিক থেকে আমার একটা হতাশা, কিন্তু আরেক দিক থেকে আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের মানুষ মৌলিকভাবে অসাম্প্রদায়িক। তারা সচেতন থেকেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছে। এবং সামাজিকভাবে একটা মুসলমান সমাজের ভেতর যে ধরনের দ্বন্দ-কলহ দেখা যায়, যেমন ভাই ভাইকে মেরে ফেলছে, এ ধরনের দ্বন্দ-কলহের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেটা সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ নয়। আমাদের দেশে সম্প্রদায়ের যে সহাবস্থান আছে, সেটা পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমার বিশ্বাস নেই। ভারতে তো মোটেও নেই, পাকিস্তানে তো প্রশ্নই ওঠে না। শ্রীলংকাতে কী অবস্থা হয়েছে সেটা তো সবারই জানা।


স্বকৃত নোমান : স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আমাদের সাহিত্যের ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সাহিত্য ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। আমাদের কোনো সাহিত্য-ভাষা ছিল না। ’৪৭ সাল পর্যন্ত আমাদের একটা শূন্যতা ছিল। আমাদের কোনো আর্টস্কুল ছিল না। খুলনায় ছোটখাটো একটা ছিল মাত্র। কিন্তু কলকাতা-মাদ্রাজ-লাহোরে আর্টস্কুল প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে ব্রিটিশরা। আমাদের ছবি আঁকার কোনো ঐতিহ্য ছিল না। তারপর জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসানরা শুরু করলেন। আমাদের এখানে তেমন সাহিত্যিক ছিলেন না। যে কয়জন ছিলেন তারা কলকাতা থেকে বই প্রকাশ করতেন। মীর মোশাররফ হোসেনও সেই কলকাতা থেকে বই প্রকাশ করেছেন। আমাদের এখানে যখন সাহিত্য রচনা শুরু হয়ে গেল, তখন পশ্চিমবঙ্গের লেখকরা এসে বলেন, বাংলা সাহিত্য বাংলাদেশেই টিকে থাকবে। বাংলা ভাষাকে আমরা যে মর্যাদায় নিয়ে গেছি এটা কিন্তু আমাদের বিরাট একটা অর্জন। গুণগতভাবে বাংলাদেশে অসংখ্য উঁচুমানের সাহিত্য পেয়েছি। আমাদের শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা বেড়েছে মানুষের। বইমেলা তার প্রমাণ। আমাদের তিনটা বাংলা বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ আর তৃতীয় বাংলা। তৃতীয় বাংলাও কিন্তু আমরা দখল করতে পেরেছি। ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আমাদের যে অধিকার সেটা আমরা সমস্ত বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে পারব। আমাদের অর্জনগুলো আমরা দেখাতে পারব।


স্বকৃত নোমান : আমাদের এত বড় একটা মুক্তিযুদ্ধ হলো, এই মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক বড় কোনো উপন্যাস তো আমাদের এখনো রচিত হয়নি। কেন হলো না?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : হলো না এই জন্য, যে ইতিহাসে আমি থাকি, যে ইতিহাসের অভিঘাতটা আমি প্রতিদিন অনুভব করছি, সেখান থেকে কিছু দূরত্বে না দাঁড়ালে আমার পক্ষে ওই ইতিহাসটা ভালোভাবে বোঝা সম্ভব নয়। কিছুটা দূরত্ব লাগে। তিন প্রজন্ম পর যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখা হবে, সত্যিকার উপন্যাস হয়ত সেদিন লেখা হবে। আর একেবারে হয়নি যে সেটাও ঠিক না। আমি কয়েকটা উদাহরণ দিই। সৈয়দ শামসুল হকের একটা উপন্যাস আছে, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’। কোনো পরিচ্ছেদ বিবেচ্ছেদ নেই, টানা লিখে গেছেন তিনি। পড়ে দেখবেন, অসাধারণ এপিক। হুমায়ূন আহমেদের অনেক সমালোচনা আছে, কিন্তু তাঁর ‘জোছনা জননীর গল্প’ মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক একটি অসাধারণ উপন্যাস। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’র অনেক মূল্য আছে। আমি বলছি না যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে খুব বড় মাপের কাজ হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে লেখা হয়নি তা নয়।

স্বকৃত নোমান : সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে মান বাংলা এবং আঞ্চলিক বাংলা নিয়ে খুব কথা হচ্ছে এখন। আপনার কী অভিমত?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : এ ব্যাপারে আমার একটা পরিষ্কার অবস্থান আছে। আমি আঞ্চলিক ভাষায় খুব বিশ্বাসী। নিজেও আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করি। আবার একই সঙ্গে আমি একটা মানসম্পন্ন ভাষাতে বিশ্বাস করি। কারণ, এই ভাষাটা একটা সুশৃঙ্খল ভাষা। শৃঙ্খলা না থাকলে আমি দর্শনের বিষয়গুলো, বিজ্ঞানের বিষয়গুলো উপস্থাপন করতে পারব না। শৃঙ্খলা ভাষার একটা পরিভাষা। পরিভাষা সর্বসম্মত হয়। বহুজনের একটা স্বীকৃত ভাষা, যে ভাষা আমাদের মেধা ও মননের প্রকাশ ঘটাবে। আমি যখন একটা আনুষ্ঠানিক কথা বলতে যাব, আমি সেই সর্বজনের গ্রহণযোগ্য একটা মানসম্পন্ন ভাষায় কথা বলব। আমি একটা উদাহরণ সবসময় দিই। আমাকে প্রথম আলোর বন্ধুসভায় নিয়ে গিয়েছিল। আমাকে প্রশ্ন করা হলো, ‘স্যার, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী যে ভাষাটা তার নাটকে চালু করল, তারপর ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে যে ভাষা, এটা তো আমাদের আটপৌরে ভাষা, প্রতিদিনের ভাষা। এ ভাষায় লিখলে ক্ষতি কী?’ 

আমি বললাম, ‘তোমার মায়েরা যখন রান্নাঘরে কাজ করেন তখন কোন শাড়ি পরে কাজ করেন?’

বলল, ‘এই একটা ঘরের শাড়ি পরে কাজ করেন।’ 

আমি বললাম, ‘যখন তারা একটা বিয়েতে যান তখন কি ওই কাপড় পরে চলে যান?’ 

সবাই খুব হাসল। আমি একটা মেয়েকে বললাম, ‘তোমার মা কোনো বিয়েতে যাবার আগে কী করেন?’ 

বলল, ‘অনেক্ষণ চুল আচড়ান, সাজেন, ভালো শাড়ি পরেন ইত্যাদি।’ 

কেন? অনুষ্ঠানের একটা আলাদা বিশেষত্ব আছে সেজন্য। যেদিন তোমাদের মায়েরা বিয়েবাড়িতে যাবেন হলুদ-মরিচ মাখানো শাড়ি পরে, সেদিন তোমরা বাংলা ভাষাকে যাচ্ছেতাইভাবে বাজারে নিয়ে ছেড়ে দিও, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। 

এ কথার পর সেদিন আর কোনো যুক্তি উঠেনি। কবিতা তো একটা পরিশিলিত প্রকাশ। সেই কবিতাতে যদি আমি ‘আইছলাম, খাইছলাম’ ইত্যাদি ভাষা ব্যবহার করি, তাহলে কয়জন পড়বে? ফলে আমার একটা ভাষার দরকার। একইসঙ্গে আঞ্চলিক ভাষাও চর্চা হবে। যখন আমি উপন্যাস লিখছি সংলাপে আঞ্চলিক হোক না, অসুবিধা কী? কিন্তু দর্শনের, বিজ্ঞানের প্রকাশের জন্য একটা ভাষা লাগবে না? একজন ফরাসি লেখক তো ফরাসি-জার্মান ভাষা মিলিয়ে বিকৃত করেননি। আমি কেন বাংলা-ভাষার সঙ্গে ইংরেজি মিশিয়ে বিকৃত করব? আপনি খেয়াল করবেন, হিন্দি সিনেমাতে কিন্তু এসব চলে না। সেখানে একদম পরিশিলিত হিন্দি ভাষা ব্যবহার হয়। যত দায় বাংলা ভাষা নিয়ে! ভাষা বিকৃতি আমাদের হীনম্মন্যতা, এটা দাসত্ববোধের একটা প্রকাশ। বিশ্বমিডিয়া আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করছে, আমাদের ভাষা নিষ্ক্রিয় করে দেবে তারা, আমাদের বুদ্ধি রহিত করে দেবে। স্খলিত ভাষায় কোনো সাহিত্য হয় না, স্খলিত ভাষায় কোনো পরিষ্কার চিন্তা হয় না। ফলে তারা আমাদেরকে একটা নির্বুদ্ধি জাতি তৈরি করে পশ্চিমের যত কিছু আমাদের ওপর চাপিয়ে দেবে। সেটা মোবাইল ফোনই হোক আর ফেয়ার এন্ড লাভলি ক্রিমই হোক। খেয়াল করে দেখবেন, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না। চার-পাঁচজন ছেলেমেয়েকে ডেকে সূর্যাস্ত নিয়ে কথা বলতে বলুন। তারা পারবে না। তারা ‘সকালে উঠলাম, উইঠা খাইলাম বাইরে, খাইয়া দেখি গাছের মইধ্যে লটকাইয়া আছে, সূর্য কোথায়’ এরকম করে কথা বলবে। তার মধ্যে আবার ইংরেজিও ঢুকাবে। যে ছেলে বা মেয়ে নিজের মনের ভাষায় পাঁচ মিনিট গুছিয়ে কথা বলতে পারে না, সে তা একটা উচ্ছৃঙ্খল ভাষার ভিতরে আছে। এ ভাষাটি কার জন্য প্রয়োজন? যারা আমাদের ওপর দাসত্ব চাপিয়ে দিতে চায় তাদের জন্য। ঔপনিবেশিক শাসকরা আমাদেরকে শিক্ষা দেয়নি কেন? শিক্ষিত হয়ে গেলে যে আমি তাদের প্রতিদ্বন্দি হয়ে যাব! যখন কোনো ঔপনিবেশিক শক্তি একটা জায়গায় যায় তখন ওই জায়গার সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দেয়। আমাদেরকে ইংরেজি শিখানো হলো কেন? এই জন্য যে, এমন একটা জাতি তৈরি করা হবে যাতে চিন্তাচেতনায় সবকিছুতে তারা আমাদের অনুকরণ করবে। আমরা কি অনুকরণ করার জন্য তৈরি হয়েছি? 

তাছাড়া আরেকটা কথা বলা হয় পশ্চিম বঙ্গের ভাষা ব্যবহারের ব্যাপারে। পশ্চিমবঙ্গের ভাষা আমরা কেন ব্যবহার করব? আই ডোন্ট কেয়ার পশ্চিমবঙ্গ। আমি আমার ভাষা তৈরি করব। একদিন পশ্চিমবঙ্গ সেই ভাষায় কথা বলবে, লিখবে। এবার আমি পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে সেই প্রমাণ পেলাম। একজন বলল, ‘আপনি যে ভাষায় কথা বলছেন এই ভাষায় অনেক শক্তি।’ এই ভাষাই পঞ্চাশ বছরে আমাদের অর্জন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন