শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্প রেশমি রুমাল নিয়ে আলোচনা : বদরুন নাহার

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের রেশমি রুমাল গল্পটির প্রেমে পড়ে যাই তাঁর প্রেম ও প্রার্থনার গল্পগ্রন্থ পাঠারম্ভেই। আর এই ভাললাগার পেছনে জড়িয়ে যায় আন্তঃনগর ট্রেন, সহযাত্রির মুখ, আত্মগোপন করে যাত্রা, পরকীয়ার হাতছানি না-কি মনের হুহু করা নিস্তব্ধতায় উড়ে আসা রেশমি রুমাল আর সে-ই পুরোনো নেপথেলিনের গন্ধ! যা ছোট্ট একটা গল্পের শরীর জুড়ে বিরাজমান। না-কি এই রুমালটি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছিন্নপত্র! ভাবনারা নানাদিকে ছুটো ছুটি শুরু করে। পাঠক তখন গল্পকে নিয়ে ছুটে চলেন স্টেশন থেকে স্টেশনে।
হয়ত তাঁর নিজের গন্তেব্যের পথে। যে পথে নেমে যায় হাজারো যাত্রি। ছোটগল্পের আদি সংজ্ঞার আলেখ্যে লেখক চরিত্রের হাতে ধরিয়ে দিতে চান রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র! পাঠক দেখেন কই? এটা তো পোড়া চন্দন কাঠের কয়লার অক্ষর। যার পেছনে পেছনে ঘোড়া ছুটিয়ে ধেয়ে এসেছে সে। বিষয়টা হচ্ছে এই গল্পের পেছনে ছুটে চলা, থেমে যাবার উপায় নেই, ঘটনা আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে।

লেখক নিজেই গল্পে সে যাত্রাপথের সমাপ্তি টেনে আনেননি। যদিও পাঠকের স্বস্তির বিষয়টি যেন সৈয়দ মনজুরুল রাখতে চেয়েছিলেন। গল্পটি পাঠে যে অনুভ‚তি তৈরি হয় তা বিস্তারিত করার আগে গল্পের সংক্ষিপ্ত কাহিনী উল্লেখ করা প্রয়োজন, তাতে এই যাত্রার সঙ্গে পাঠক নিজ অবস্থানটি সহজে বেছে নিতে পারবে বলে বিশ্বাস।

উল্লেখ্য যে গল্পের মূল চরিত্র হিসাবে লেখক নিজে এখানে উপস্থিত। সিলেট থেকে ঢাকা যাবার দীর্ঘ যাত্রার সারাদিনটা নষ্টই হওয়া নয়, সেই সাত সকালে উঠে শুধু মাত্র এক কাপ চা খেয়ে লেখক রাস্তায় নেমে পড়েন। আর সেই সঙ্গে তিনি ভাবতে থাকেন আবহাওয়া, সহযাত্রিদের সঙ্গে কথা না বলে, ঘুমিয়ে এবং বইপড়ে দীর্ঘ যাত্রা পথটি পাড়ি দিবেন। যে তাড়াহুড়ো নিয়ে ট্রেনে ওঠা তা ক্রমশ যেন ঝিমিয়ে পড়ে, কেননা আটার ট্রেন সাড়ে আটাও সিলেট ছেড়ে যায় না, সে ট্রেন ছাড়ে সাড়ে এগারোটায়। এরই মাঝে নেমে যায় অনেক যাত্রি। ঝুম্পা লাহিড়ীর নেমসেক পড়তে লেখকের ভাল লাগেনি। তিনি ছিন্নপত্র পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেলেন। কিন্তু কুলাউড়ায় এসে, কেমিষ্ট্র বই হাতে বসে থাকা ছাত্রটি লেখককে ডেকে তুলে। সে নেমে যাবার সময় বলে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছে। কেননা লেখক তার বোনের বিয়ে এবং তা নিয়ে র্দুভাবনার কথা শুনেছেন এবং সে হতাশা থেকে উত্তোরণের কথা বলেছিল। এরপর আমরা দেখতে পাই গল্প লেখকের সামনে ডানে বসে থাকা দম্পত্তি এবং তাদের বন্ধুর দিকে চলে যায়। তাদের পারস্পারিক কথোপকথন, ফ্লার্ট করা এমন কি বন্ধুর স্ত্রীর প্রতি গনি নামক চরিত্রের লেহন দৃষ্টি অধ্যাপককে অস্বস্থিতে ফেলে। লেখক এই তিন জনের সম্পর্কে আরও অনেক তথ্য জানান, সে জানার উৎস উজ্য থাকলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে এখন তিনি আমাদেরকে গল্পের মাঝে নিয়ে যাচ্ছেন। এতক্ষণ যেন তার যাত্রা পথের বিস্তারিত জানাচ্ছিলেন মাত্র আর এখন তিনি যেন এই দম্পত্তি আর তাদের বন্ধুর গল্পে নিয়ে যান। কিন্তু কুলাউড়া থেকে লংলা ছয় কিলোমিটার দূরত্বে সে গল্প চলে যায় একশ বছর আগে। কেননা আবদুল মোসাব্বির চৌধুরী তার ভাতিজা-বউ নিয়ে এই ট্রেনে উঠে পড়েছেন। কাহিনী এখন তোরঙ্গে জমে থাকা নেপথেলিনের গন্ধে ভরপুর। আঞ্জুমান আরা নামের সুন্দরী যে রেশমী চিঠির কথা বলে এবং অপেক্ষা করে দৈব্য ঘটনা ঘটে যাবার। আমরা তখন স্বাতী নামক আর্কিটেক্ট মেয়েটি আর তার গাছের গুড়ির মতো স্বামী মাহফুজ এবং বন্ধু গনি থেকে সরে আসি। ডুবে যাই আঞ্জুমান আরা নামক সুন্দরী বধুর গল্পে। সামন্তপ্রভুর চরিত্রে মাথায় পাগড়ি পড়ে উপস্থিত হওয়া আবদুল মোসাব্বির চৌধুরীর দিকে চোখ গেলে আমরা আর গনিকে দেখতে পাই না। আর আসলেই দৈব্য ঘোড়া ছুটিয়ে এলে, সহসা স্বাতীর স্বামী মাহফুজ আসন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করে স্বাতীকে। যেন গাছের গুড়ির মাঝে প্রাণের ছোঁয়া ফিরে আসে, মূলত ফিরে আসে প্রেম। প্রেমহীনতা আর প্রেম ফিরে পাওয়া মানুষ তাদের নিজেদের পরিবর্তন চিহ্নিত করলেও লেখক আমাদের যেন নতুন রূপে পাঠ করান রবিঠাকুরের ছিন্নপত্র। যা তিনি তুলে দিতে চেয়েছিলেন স্বাতীর হাতে।



রেশমি রুমাল গল্পটি স্বাধীন আর পরাধীনতার প্রেক্ষাপটে নারীর অবস্থান চিহ্নিত করে এবং পাঠান্তে আমাদের মনে হবে নটেগাছটি মুড়োলো, আমার গল্প ফুরোলো। বাংলা সিনেমার নায়ক-নায়িকার মহামিলনের স্বস্থি যেন লেখক আমাদের দিতে চেয়েছেন। কিন্তু তারও আগে গল্প বলে আমাদেরকে নিয়ে গিয়েছেন ভাবনার নানা প্রান্তে।




সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে উত্তারাধুনিক গল্পকার হিসাবে আমরা জানি। এজানা তার গল্পপাঠের অনুভ‚তিজাত অবস্থান থেকে ঘোষিত হয়। যেহেতু রেশমি রুমাল গল্পটিতে লেখকের স্বয়ং উপস্থিতি আমরা পেয়েছি তাই লেখক সম্পর্কে কিছু বিষয় উঠে আসে প্রসঙ্গক্রমে। গল্পে যে অধ্যাপকের ভাল লাগে ঠাকুর মশায়ের ছিন্নপত্র এই অধ্যাপক কি সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নন, রবীন্দ্রপ্রয়াণবার্ষিকী ২০১৩সালে অগাষ্টে একটি দৈনিকের পাতায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিন্নপত্র, পূর্ণপট নামের যে প্রবন্ধ লেখেন তার শুরুটা ছিল এরকমÑ“ছিন্নপত্র পড়াটা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। আমি এই চিঠিগুলো পড়েছি টেবিলে বসে, বৃষ্টির দুপুরে গায়ের ওপর কাঁথা টেনে চৌকিতে শুয়ে, নৌকায় বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা দিয়ে ভাসতে ভাসতে এবং দূরপাল্লার বিমানে আঁটসাঁট আসনে বসে, পাশের যাত্রীর নাসিকা গর্জন শুনতে শুনতে। অনেকবার পড়া হয়ে গেলে আমার মনে হয়েছে, এই চিঠিগুলো চেয়ার- টেবিলে বসে পড়ার নয়, এগুলো ঘরকুনো বাঙালির জন্য তিনি লেখেননি। একটি চিঠিতে তিনি যে বলেছেন ভারতীয়দের চরিত্রের দুটি দিক আছেÑ গৃহী এবং সন্ন্যাসী। সেই সন্ন্যাসীর জন্য তিনি এসব লিখেছেন।” ২০১৪ সালে অক্টোবর মাসে আরও একটি দৈনিকে লেখক ছিন্নপত্র নিয়ে কথা বলেন, তিনি বলেনÑ“রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র আমি অনেকবার পড়েছি। যতবার পড়েছি ততবারই মুগ্ধ হয়েছি। আমি মনে করি রবীন্দ্র সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গুণ হচ্ছে এই ছিন্নপত্র।”

লেখকের এই মুগ্ধতা আমরা রেশমি রুমাল গল্পেও খুঁজে পাই। যেন ছিন্নপত্র পাঠের অনুভবকে নিজের চেনা শহরের মানুষের মাঝে খুঁজে ফিরছিলেন তিনি। তাই তো লটবহর নিয়ে লংলা স্টেশনে লেখক ইতিহাস থেকে তুলে আনেন প্রেক্ষাপট। গল্পাংশ থেকেÑ ‘সেই ব্রিটিশ আমলের মধ্যদিনে, তখন লংলার জমিদার তার অনেক জমি দিয়েছিলেন রেললাইনের জন্য। একটা শর্ত অবশ্য ছিল তার। লংলা স্টেশনটা হবে কুলাউড়া থেকে, যাকে বলে, এজ দ্য অ্যারো ফ্লাইজ অর্থাৎ একদম সোজা, একটা বাঁকও থাকবে না সে পথে।”

সেই বাঁকহীন পথে যেতে যেতে প্রকৃত দম্পত্তি হিসাবে অঙ্কিত মাহফুজ-স্বাতী চরিত্রের মাঝে উপস্থিত বন্ধু গনির ফ্লার্ট করা অস্বস্তির পরিবেশে অধ্যাপকের কল্পনাজাত চরিত্রের আগমন। তন্দ্রাগ্রস্থ চোখে আবদুল মোসাব্বির আর আঞ্জুমান আরা উঠে আসে। মানুষের জৈবিক চাহিদার চিরাচরিত কামুক পুরুষ গনি এবং আবদুল মোসাব্বির চৌধুরী। অন্যদিকে ভালবাসার আকাঙ্খায় ব্যথিত নারী স্বাতী ও আঞ্জুমান আরা। ভিন্ন সময়ের দুই নারী। লেখক এই ছোট্ট পরিসরে নারীর চরিত্রে সময়ের ঘটে যাওয়া তারতম্যের ছাপ ফেলেছেন দক্ষতার সাথে। আঞ্জুমান আরা পড়তে এবং লিখতে পারে জেনে অধ্যাপক অবাক হন। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে যা স্বাভাবিকতার মাপকাঠিতেই ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু সেই আঞ্জুমান আরা মুক্তির শেষ প্রচেষ্টা হিসাবে আসার আগে স্বামীর উদ্দেশ্যে রেশমি রুমালে পোড়া চন্দন কাঠের কয়লা দিয়ে চিঠি লিখে এসেছে। দৈব্য ঘটনা ঘটে যাবার আসায় সে প্রতিক্ষীত। আর যদি তা না ঘটে তবে বিকল্প চিন্তাও তার মাঝে খেলে গেছে। আর তা জেনে অধ্যাপকে শিউরে ওঠেন। মেয়েটি ভৈরবে গিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিবে। ভয়ঙ্কর সে মৃত্যুর দৃশ্য বর্ননায় লেখক যে আলোর রশ্মি দিয়ে বোনা শাড়ির জন্যই কি শুধু অধ্যাপক চোখ বুজেছিলেন? না-কি একজন সুন্দরী নারীর ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত দেহের ধাক্কা সামলাতে, নাকি অন্য কিছু, প্রেমের অপমৃত্যুকে প্রত্যক্ষ না করতে এই চোখবোজা। এমন সব ভাবনার দরজার সামনে এনে পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেন লেখক।

আর মেয়েটি এই বোকা ছেলের সঙ্গে বিয়ে প্রসঙ্গে একথাও জানায় যে গাছের গুঁড়ির মতো ছেলেটিকে কেন সে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। লেখক সুকৌশলে এই বক্তব্যের ভেতর দিয়ে অনেক কথায় বুঝিয়ে দিলেন। এমন সুন্দরী মেয়েকে জমিদার পরিবারের বোকা ছেলেকে বিয়ে করতে হয়েছে কেন, সে প্রশ্ন নিতান্তই অবান্তর। একশ বছর আগের আঞ্জুমান আরা তার নারী চরিত্রের মাঝে সময়ের চেয়েও যেন এগিয়ে। যখন ভারতবর্ষই পরাধীন, উপনিবেশের জালে। সেই সময় প্রেক্ষাপটে অঙ্কিত নারী চরিত্র আঞ্জুমান আরাকে লেখক অনেক দূরদর্শী এবং বিচক্ষণ হিসাবে তুলে ধরেছেন।

অন্যদিকে বর্তমান সময়ে এসে, এই বিশশতকের নারী স্বাতী। শিক্ষিত, সমাজে উচুতলার মানুষ। যে ভালবেসেছিল মাহফুজকে। কিন্তু তাদের জীবনে ভালবাসার সেই অবস্থান যেন নেই। স্বাধীন চেতা স্বাতী তাই স্বামীর বন্ধুর সঙ্গে ফ্লার্ট করছে, পরিকল্পনা করছে নানাবিধ। কিংবা স্বাতী হয়ত বন্ধু গনির হাতছানিতে উজ্জ্বীবত হয়ে উঠছে। আর এইসবের মাঝে জৈবিক চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ হিসাবে উপস্থিত থাকে। পাঠক হয়ত ভাবতে পারতো যে স্বাতী তার নিভে যাওয়া ভালবাসাকে অন্য কারো মাঝে নতুন করে প্রজ্জলিত করবে। কিন্তু লেখক এখানে আখ্যানের মোড় ঘুড়িয়ে দিলেন। আঞ্জুমান আরার জীবনে ঘটে যাওয়া দৈব্য ঘটনার ছলে। মাহফুজের মুখে ফুটে ওঠে নতুন প্রাণ। যার অভাবেই স্বাতী হয়ত ছুটে চলছিল গনির দিকে। কিন্তু মাহফুজের ভেতর নতুন করে প্রেমের সন্ধান পেয়ে স্বাতী সহসা বলে ওঠেÑ ‘না ভাই, ওই সময়ে শ্রীলঙ্কা যাওয়া যাবে না,’।

লেখক কি তাহলে বোঝাতে চেয়েছিলেন একটু ভালবাসা পেলে নারী পুরুষকে ছেড়ে যেতে পারে না। কিন্তু গল্পের শেষ লাইনটি আমাদের ভাবনাকে আরও অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যায়। শেষ লাইনটি উল্লেখ্যÑ স্বাতী যদি না ঘুমাত, তাকে ছিন্নপত্রটা এগিয়ে দিতাম পড়ার জন্য।

তার মানে সন্ন্যাস যাত্রা ছেড়ে স্বাতী যে আবার গৃহে ফিরে গেল। তাকে লেখক ছিন্নপত্রের আয়নায় দেখে নেবার অবকাশ দিতে চাইলেন। পূর্বে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছিন্নপত্র বিষয়ক লেখায় আমরা দেখতে পাই তিনি বলছেন ছিন্নপত্রÑ“ সেই সন্ন্যাসীর জন্য তিনি এসব লিখেছেন।” তাহলে স্বাতীকে আসলে তিনি কোন উদ্দেশ্যে এই বইখানা পড়তে দিতে চেয়েছিলেন? প্রচন্ড একটা দ্ব›দ্ব রেখেই তিনি শেষ করলেন। যেখানে স্বস্তি মিলল কিন্তু রহস্য ভাঙ্গল না।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের রেশমি রুমাল শুরুর যে তাড়া আমরা অনুভব করি, আধা ঘন্টা আগে ট্রেন স্টেশনে চলে আসায় এবং সর্বপরি ট্রেন আটায় না ছেড়ে সাড়ে এগারোটায় ছেড়ে যাওয়ার মাঝে অধ্যাপকের মধ্যে অনেক ধ্যান ভঙ্গ হয়। সহযাত্রিকে এড়িয়ে যাওয়ার ফন্দিফিকির ভেঙ্গে পড়ে। তিনি চোখের সামনে ঠাকুরের ছিন্নপত্র তুলে ধরে রাখতে চাইলেও তাঁর চোখ যেন যাত্রিদের চোখে-মুখে পর্যবেক্ষণের রশ্মি ফেলে ফেলে তুলে আনে রেশমি রুমাল ভর্তি চরিত্র। বৃদ্ধের ছেলেটির নিস্পৃহতার ধরণ, পানি পানের কৃতজ্ঞতায় বৃদ্ধের চিকচিক চোখ আর কেমিস্ট্রির বই হাতে কলেজছাত্র-এর লজ্জা এবং কুন্ঠিত হওয়া কিছুই অধ্যাপকের চোখ এড়িয়ে যায় না। আসলে তিনি দেখবেন না বলেই যেন ভালো করে দেখে রাখেন। অস্বস্থি লাগলেও অধ্যাপক জেনে যান যে স্বাতী মেয়েটি ইংরেজিতে কথা বলছে কারণ সে বুয়েট থেকে আর্কিটেকচার পাশ করে এখন নির্মাণবিদ নামের ফার্মে কাজ করে। স্বামী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং স্বামীর বন্ধুটিও। এবং তাদের যে প্রেম করে বিয়ে তাও সে যেনে যান। কিংবা বলা যায় ট্রেনের যাত্রিদের দেখে তিনি চরিত্র নির্মাণ করতে এইসব যাবতীয় ব্যাখ্যার উপস্থাপন করেন। আর তা বেশ যৌতিক আকার ধারণ করেই পাঠকে টেনে নিয়ে চলে। আমাদের দেশের শিক্ষিত জনমানুষেরা অনেক সময় কমন প্লেসে আলাপচারিতায় ইংরেজি ভাষাকে ব্যবহার করি, তাতে আমজনতার কাছ থেকে নিজেদের ব্যক্তিগত অনেক বিষয় আশয় আড়াল করা যায়। লেখক রেশমি রুমালে বেশ কয়েকবার স্বাতী ও বন্ধু গনির কথোপকথন যে ইংরেজিতে তা প্রকাশ করেছেন। এই ইংরেজির আড়ালও যে কখনও কখনও খোসে পরে, তা অতি সুনিপুণভাবে তিনি গল্পের ভেতর নিয়ে এলেন, আবদুল মোসাব্বির চৌধুরী একটা ইংরেজি চিঠি প্রচুর কসরত করে পড়তে থাকলে অধ্যাপক চিঠিটা পড়ে দেবার প্রস্তাব দেয় এবং এ প্রস্তাবে চৌধুরী সাহেব অবাক হন। আর এই ঘটনায় আমাদের আবাক হওয়া আবদুল মোসাব্বির সাহেবের মুখটাই জেগে ওঠে না, সহসা পাঠক হতচকিত ভঙ্গিতে দেখতে পাবে স্বাতী ও গনিকে। যা বলছিলাম তাড়া থেকে ক্রমশ হেলেদুলে চলা ভঙ্গিতে চারপাশের অবস্থান দিতে দিতে গল্পকার আমাদেরকে আধুনিক জীবন যাপনের দিকে নিয়ে যান আর তা থেকে তন্দ্রার বাহানায় আমাদের যেন স্বপ্ন দেখান, কিংবা স্বপ্নও নয়। কি এক স¦াভাবিক ব্যাখ্যা সিনেমার শুটিং এর ছলে নিয়ে আসেন আঞ্জুমান আরার গল্পে। পাঠকের ঝুলে যাবার কোন অবকাশ নেই। পাঠকের শিড়দারা আরও খাড়া হয়ে যাবার মতো তিনি গল্পকে বুনে চলেন।

সিনেমার শুটিং প্রসঙ্গে আমার বাংলা সিনেমার কথা মনে হল। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের রেশমি রুমাল গল্প পড়তে পড়তে আমার খানিকটা বাংলা সিনেমার কাহিনীকে খুব মনেপড়ে। বিশেষত এই গল্পের দু’জন ভিলেন চরিত্রকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি প্রথম বন্ধু গনি এবং দ্বিতীয়জন আবদুল মোসাব্বির চৌধুরী। বাংলা সিনেমায় ভিলেনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং পছন্দ বা আচার-আচরণ খুবই খারাপ থাকবে। তাহলে এই ছোট্টগল্পের মধ্যে আমরা কি মিল পেলাম? তা হচ্ছে দেখা যায় গনি কল্পনায় স্বাতীকে নিয়ে বিছানার দৃশ্য পর্যন্ত দেখে ফেলে, আর অন্য দিকে গনি ক্রিকেট খেলায় পাকিস্তানের সমর্থক। খুব সু²ভাবে দেখলে এটাই খলচরিত্রের বৈশিষ্ট। অন্যদিকে আবদুল মোসাব্বির চৌধুরীর সময় আখ্যানে আফিম দিয়ে ভাতিজাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে ভাতিজা বধু নিয়ে চলে আসা আমাদের বাংলা ছবি খল নায়কচিতই বটে। বিষয়গুলো লক্ষ্য করলে মনে হবে লেখক চরিত্রকে ছেড়ে না দিয়ে নিজের হাতের মুঠোয় করেই পরিকল্পিত বুনে গেছেন। আবার বাংলা সিনেমার সঙ্গে ব্যাপক অমিলও ঘটে গেছে রেশমি রুমাল গল্পে। তা হল নায়ক চরিত্র। এমন গাছের গুড়ির মতো নায়কের বাংলা সিনেমায় ভাত নেই। এইখানেই গল্পকার তার ক্ষমতার সাক্ষ্যকে স্পষ্ট করেন। গল্পের ভেতর অদ্ভুত এবং অভিনবত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের রেশমি রুমাল গল্পের ভেতর এত খন্ড খন্ড গল্পের উপস্থাপন। বৃদ্ধ তার ছেলে এবং তার অসুস্থতায় মনে হবে সে রোগের রসায়ন খুঁজতেই এগিয়ে যাবে গল্প। কিন্তু না সেই কলেজ ছাত্র এবং তার বোনের বিয়ে, পরবর্তী জীবনের ভাবনা। বয়স্ক গুরুগম্ভীর অধ্যাপকের সঙ্গে অল্পবয়স্ক উ”্ছল মেয়েটি হারিয়ে যাবে। গল্প বোধ হয় সেদিকে যাবে। কিন্তু গল্প চলে আসে স্বাতী-মাহফুজ-গনির গল্পে। আসে আবদুল মোসাব্বির চৌধুরী-আঞ্জুমান আরার গল্পে। শেষ পর্যন্ত আমরা দেখি গল্প মূলত রয়ে যায় ছিন্নপত্রে। রেশমি রুমাল পাঠ করতে করতে মনে হবে এ যেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছিন্নপত্র ।






লেখক পরিচিতি
বদরুন নাহার
গল্পকার। প্রবন্ধকার।
নিউ ইয়র্কে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন