শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

মাহরীন ফেরদৌস : ব্যক্তিগত জার্নাল

: উইম্যান চ্যাপ্টার আর আন্তর্জাতিক ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কাজ করা আমেরিকান সুন্দরী ক্রিস্টির সাজানো-গোছানো বাসায় ঢুকতেই দেজাভু হলো। 

ভাবলাম, এমন কি আগেও হয়েছিল?

আর তারপরেই মনে আসলো, বছরখানেক আগে এমনই এক ডিসেম্বরের রাতে, ক্রিসমাস সিজনে এসেছিলাম ওর আগের বাসায়। আজও তেমন ডিসেম্বরের শীতের রাত, ক্রিসমাসের আগের সময়। লাল-সবুজ রঙে ছেয়ে আছে পুরো বাড়ি। ঘরভর্তি মেহমান। তবে পূর্বের অনেকেই নেই। প্রবাসের জীবন এমনই। প্রতি বছরের উৎসবে কেউ নতুন করে আসে তো কেউ বা যায় চলে। এ পাশে বিশ্বম্যাপ, যেখানে ওর বিদেশি বন্ধুরা নিজের দেশের একটা করে রঙিন স্টিকার লাগিয়েছে। ওপাশে বইয়ের তাকভরা যিশু। নানাদেশি স্যুভেনির, ছবির ফ্রেম, মূর্তি আর কাপড়ের ফুল। আমাকে ক্রিস্টি বলল, 

- ‘তুমিই আমার প্রথম বাংলাদেশী বন্ধু যে এই ম্যাপে স্টিকার আটকাবে। এখন বলো কমলা, সবুজ, নীল কোন রঙ দিতে চাও বাংলাদেশের গায়ে?’ 

আমি দেয়ালে সাঁটানো ম্যাপের দিকে একটু ঝুঁকে; মনোযোগ দিয়ে তাকালাম। প্রায় আট হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশ নীল আর কমলা রঙে জ্বলজ্বল করছে। আমি ছোট্ট একটা সবুজ স্টিকার নিয়ে ভীষণ যত্ন করে আটকে দিলাম। মনে পড়ে গেলো আমার প্রাক্তন এক সহকর্মী লাঞ্চটাইমে ভাত খেতে খেতে তাকিয়ে থাকতো গুগল ম্যাপের দিকে। একদিন প্রশ্ন করেছিলাম, 

- ‘এভাবে কী দেখেন রোজ?’ 

- ‘আমার গ্রামের বাড়িটা দেখি। ঢাকা আমার একদম ভালো লাগে না। শুধু চাকরির জন্য থেকে যাচ্ছি দিনের পর দিন।’ 

ক্রিস্টির ধবধবে সাদা দেয়ালের ম্যাপে বাংলাদেশকে দেখে আমার মনে হলো আবার দেজাভু হবে। এবার ও আমাকে প্রশ্ন করবে আর আমি আমার প্রাক্তন সহকর্মীর মতো উত্তর দেব। 

লিভিং রুমের হইচই ছাপিয়ে এরইমাঝে সান্টাক্লজ সেজে থাকা এক বুড়ো আমার হাতে একগাদা ক্রিসমাস উপহার দিয়ে দেয়। আর আমি ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি ওদের নতুন বাসা। এ পাশে হাতের ওপর তিরতির করে ঘুরে বেড়াচ্ছে পোষা হ্যামস্টার ‘আলবার্ট আন্সটাইন’, নিচের তলার ঘর থেকে মৃদু ঘরঘর শব্দ করছে বিশালদেহী কুকুর ‘বেলা’। সবুজ শার্ট পরে হাসিমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে মধু নামের নার্ডিবীন মেয়েটি। খুব মনোযোগ দিয়ে মেঝেতে বসে রাবারের আংটি চাবাতে ব্যস্ত কয়েক মাস বয়সী শিশু ‘সায়মন’। শ্রীলংকান তিন তরুণী সেলফি তুলে হাসছে খিলখিল করে। আমেরিকান ও মালয়েশিয়ান ছেলেমেয়েগুলো গল্প করছে। আর আমি? মিনিট পনের বেশ উচ্চস্বরে হাসিতামাশা করে, সন্তর্পণে সরে আসছি দেয়ালের কাছে। আর কেবলই দেখছি সবাইকে। 


কিছু সময় পর, কিচেনের কাছে এসে প্লেটে কোকোনাট ব্রাউনি আর গোটা কয়েক চিপস নেওয়ার সময় ক্রিস্টির স্বামী ক্রিস এসে দাঁড়াল আমার সামনে। ফ্রিজের গায়ে আটকে থাকা সাদাকালো হ্যান্ডমেড ম্যাগনেট দেখিয়ে বললাম, 

- ‘কে করেছে এটা?’ 

- ‘আমার গ্র্যান্ডমা। সে ছোট ছোট হাতের কাজ করতে পছন্দ করে। আর তার অদ্ভুত অভ্যাস আছে পৃথিবীর সবকিছু জমিয়ে রাখার।’

- ‘সবকিছু মানে?’

- ‘সবকিছু মানে অবশ্যই ট্র্যাশ নয়; কিন্তু ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র স্মৃতিচিহ্নও জমিয়ে রাখে। তার একটা প্যাসেজ আছে সেখানে দু'পাশের তাকে ছোটছোট অজস্র জিনিস রাখা। আর তাকে ক্রিসমাসেও এমন উপহার দিতে হয় যা আয়তনে ছোট। যাতে করে সে সহজেই রাখতে পারে।’ 

- ‘অদ্ভুত! বেশ স্মৃতিকাতর মানুষ মনে হচ্ছে।’ 

- ‘সে এমনিতেই বেশ আবেগি মানুষ ছিল। আর বছর সাতেক আগে আমার গ্র্যান্ডপা মারা যাবার পর সে এই একাকী জীবন সহজভাবে নিতে পারেনি। তার কাছে গ্র্যান্ডপার সবকিছু আজও একইভাবে অক্ষত আছে। বয়সের কারণে সে কিছুটা ডিল্যুশনে থাকে তাই সব জিনিসপত্রের গায়ে চেনা শব্দ বা শিরোনাম দিয়ে রাখে।’ 

আমি চুপ করে যাই। এই ভুলে যাওয়া রোগ আর স্মৃতি জমিয়ে রাখার ঘটনা যেন আমাকে একটা সিনেমা আর একটা উপন্যাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। কেমন যেন আনমনা লাগে আর তাই ক্রিস্টি কখন নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাই না। নিচু স্বরে বলে ওঠে সে, 

- ‘ক্রিস তোমার যদি কখনও কিছু হয়, আমিও মনে হয় একইভাবে সবকিছু জমাতে শুরু করব।’ 

ক্রিস কী যেন বলতে গিয়েও বলে না। থেমে যায়। আর হঠাৎ করেই আচমকা বিকট শব্দ করে যাওয়া ওয়েদার এলার্টের মতো পরিবেশটা গুমোট হয়ে যায়। মনে মনে নিজেকে দোষারোপ করতে থাকি। কেন যে এত প্রশ্ন করি! এই আনন্দের দিনে কেন বিষাদগ্রস্থ চরিত্রের গল্প টেনে আনি? প্রসঙ্গের মোড় ঘোরাতে হালকা স্বরে বলি, 

- ‘আমার কাছে ১৫ বছরের আগের একটি হলুদ চিরুনি আজও আছে। ওটা দিয়ে বেশ চুল আঁচড়ানো যায়। আর ছোট্ট একটা লাল আয়না আছে ২০ বছরের পুরানো। নাক-চোখ-মুখ ভালো দেখা যায়। নিজেকে চিনতে পারি। ’ 

ওরা শব্দ করে হেসে ওঠে। যদিও ওটা এমন কোনো দারুণ কৌতুক ছিল না। আমি তাও নিঃশ্বাস ফেলি স্বস্তির। তারপর পাশের ঘরে খাবার নিয়ে উঠে যাব ভেবে এগিয়ে যেয়েও বলে বসি, 

- 'আমি একটি মেয়েকে চিনি। যে খুব ছোটবেলায় তার বাবাকে হারিয়ে, বাবার পুরানো খয়েরি চাদর গায়ে দিয়ে থাকত।’ 

ক্রিস্টি এগিয়ে এসে ক্রিসের হাত ধরে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। 

আমি প্লেটের দিকে পূর্ণ মনোযোগ ঢেলে ব্রাউনির মুখে দিতে দিতে বলি, 

- ‘এই ব্রাউনিটা মজার। আজকের সন্ধ্যাটাও খুব সুন্দর। তোমাদের ধন্যবাদ অনেক। আর হয়তো তোমার গ্র্যান্ডমা মনে রাখবেন না কিন্তু তবুও কি তাকে আমার হয়ে ভালোবাসা জানাতে পারো? আমরা সবাই আসলে আমাদের জীবনের কোনো না কোনো স্মৃতি ধরে রাখতে চাই, কিন্তু কম মানুষই পারে তা যত্ন করে আগলে রাখতে।’ 

কথা শেষ করে দাঁড়াই না আর, লিভিং রুমের ঘরোয়া আড্ডায় চলে যাই দ্রুত। একদফা লেমনেড শেষ করে কাউচে বসে থাকি। জানালার বাইরে গাঢ় অন্ধকার। 

আমি জানি, ডিসেম্বরের শহরে এখানেও বয়ে যায় সুতীব্র বাতাস। এখানেও ভালোবাসা যেন পোর্সেলিন। তবুও স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া এক বৃদ্ধা স্যুভেনির কিংবা এ্যান্টিক শপের মতো প্যাসেজে হেঁটে বেড়ায় সমস্ত টোকেন ছুঁয়ে ছুঁয়ে। ঠিক যেন তার ট্রফি এগুলো। আমি জানি, এই এখানে মেঘের নীচে হেঁসেল ঠেলে বিষণ্ণতা, অনভ্যস্ত ব্রেসিয়ারের নিচে বারবারার হৃদয় ঢেকে যায় আর কোনো এক অদ্ভুত জাদুকর দেশলাইয়ের বাক্সর মতো সহজেই ভেঙে ফেলে আমাদের সমস্ত ইলুশ্যন। 

আর একা একা দীর্ঘপথ হাঁটতে হাঁটতে পৃথিবীটাকে আমার একটা পাখির মতো মনে হয়। যেন একটু শব্দেই সে আমার থেকে উড়াল দিয়ে চলে যাবে বহুদূরে৷

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন