শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

অমিত ভট্টাচার্যের গল্প: সমুদ্রে

পাল্লায় পড়ে ফুটো ট্যাঁকেই সমুদ্রের হাওয়া খেতে যেতে হোল।মাসের শেষ,তবু বন্ধুদের অবদার ঠেকান গেলো না।তাছাড়া ব্যাপারটাও নাকি প্রেস্টিজের।

‘সবাই ম্যানেজ করতে পারে আর তুমি পার না’। বউয়ের ধ্যাতানিতে তখনকার মতো সুড়সুড় করে রাজি হয়ে গেলাম।পরে যোগ হল আরও কিছু আবদারের ঝক্কি।

‘অনেকেই তো কেনাকাটা করবে।তাদের সঙ্গে বেরুলে কিছু তো কিনতেই হ্য়।যারাই বাইরে আসে কিছু নাকিছু কেনে।একেবারে কিছু না কিনলে কি চলে?’ ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ ট্যাঁকের ফুটো ছোট থাকলে তা টেনে বাড়াবার দায়িত্ব নিলো স্বয়ং আমার স্ত্রী দীপা।

এ অবস্থায় সামনের মাসটার কঠিন ভবিষ্যৎ মাথায় নিয়ে সমুদ্রের নরম বালির ওপর একা একা হাঁটতে হাঁটতেই সুযোগটা এসে গেল।

সাদা মুক্তোটা মুঠোয় ধরে বারবার দেখতে দেখতে বেশ হাল্কা লাগছিল নিজেকে।সদ্য সদ্য সমুদ্র থেকে তোলা এমন টাটকা একটা মুক্তো ক’জন তার বউয়ের হাতে তুলে দিতে পারে? তাও আবার এই দামে! এইপয়সায় বউ ভোলানোর এমন উপহার পুরী ছাড়া ভাবাই যায় না। আপাতত যে বন্ধুদের জন্য ধার করেও আসতে হোল, তারাও এখন ক্ষমার তালিকায়। এককথায় আমার মুড এখন বেশ ফুরফুরে।

মায়ের চাপাচাপিতে বিয়ের পর থেকেই খরচের বন্যা যেন লেগেই আছে। ধার করে ধার শোধ দিতে না দিতেই আবার ধার। ঠিকমতো কথা রাখতে না পারার দায়ে একবার তো মানসম্মান নিয়েই টানাটানি হবার জোগাড়। তার ওপর পুজো আসতেই গোদের ওপর বিষফোড়া। খরচ কমাবার ভয়েনিজে নিজেই বেরোলাম কেনাকাটা করতে। মাইল খানেক হেঁটেও দাম আর আইটেমে কিছুতেই খাপ খাচ্ছে না । ওদিকে বউএর অনুরোধ, নতুন শালির জন্য অন্তত ভালো দেখে একটা শাড়ি এনো। তার বর্তমানপ্রেমিকটি নতুন।এই তিন নম্বরটা টিকে যেতেও পারে। তবে ছেলেটি নাকি একটু খুঁতখুঁতে। সুতরাং তার সংগে শালি যে শাড়ি পরে ঘুরবে এবং যেটা তার জামাইবাবুর দেওয়া, সেটা ভাল না হোলে চলে? মুখে আর কিছু বললাম না। মনে মনে ভাবলাম, অন্যের দেওয়া শাড়ি না পরিয়ে ব্যাটানিজে একটা দিক না। আর না পারে তো গলায় দড়ি দিক। তাহলেবেচারি শালি আমার আরও দু চারবার প্রেমিক পাল্টাবার সুযোগ পাবে।

যা হোক, আমার ভাবনা মতো তো আর ভগবান পথ দেখাবেন না। তাই ভিড়ে উপচে পড়া একটা দোকানের দিকে আমিই এগিয়ে গেলাম। দেখি, দোকানের বাইরে স্ট্যান্ডে রং-বেরঙের শাড়ি ঝুলছে। ওপরে লেখা, ‘যা নেবেন একশো’। দোকানদার ছেলেটি ব্যস্ত হাতে আর একজনের থেকে শাড়িগুলো নিয়ে নিজের গায়ে চড়াচ্বছে। 

আমার পাশে দাঁড়ানো এক ফোচকে মহিলা গলা নামিয়ে চুপিচুপি তার সঙ্গিনীকে বলল, ‘দ্যাখ দ্যাখ, একেবারে হিজড়ে লাগছে।‘ তারপর দুজনেই হাসতে হাসতে কুঁজো। আমাকে ওরা লক্ষ্য করেনি। ওদের পেছনে দাঁড়িয়ে আমারও হাসি তখন রোখে কে!

দোকানদার বলল, ‘কী দাদা, একা একা হাসলেই হবে? শাড়ি নিয়ে বাড়ি গিয়ে বউদিকেও হাসান।‘ এর মধ্যে একটা শাড়ি বেশ পছন্দ হয়ে গেছে। প্রায় একইরকম একটা শাড়ি ওই শোকেসে ঝুলছে। তবে দুটোর দামে বেশ তফাৎ। দোকানদারের ভুলে এটা হতে পারে! ‘ তিনি দিলে সবই মেলে।‘এ অবস্থায় নাস্তিক থেকে আস্তিক হতে সময় লাগে না। চটজলদি শাড়িটা কিনে ওই শোকেসের দামটাই গেঁথে ফেললাম মাথায়।

এদিকে শালিকে দামি শাড়ি দিচ্ছি বলে হাবভাবেও সেটা টিকিয়ে রাখা দরকার। কিন্ত অঙ্কুরেই তা বিনাশ করে দীপা বলল, এটা কোন ফুটপাতের গো?

ফুটপাতের মানে? কী বলতে চাও? 

কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে দীপা আঁচ পেতে চাইল, কে তাকে ঠকাচ্ছে দোকানদার না আমি।

চটপট দোকানের নাম বলতেই সে বলল, বাক্সটা কই?

সঙ্গে সঙ্গে জিভ বেরিয়ে গেল আমার। সত্যিই তো আনা হয়নি সেটা। কাগজে মোড়া একটা শাড়ির দাম কতই বা হবে? নিজের ভুল ঢাকতে যুক্তি দিলাম, শাড়ির পরে বাক্স বগলে নিয়ে আবার কাকে কবে দেখলে?

তাবলে দেওয়ার সময় একটা বাক্স থাকবে না? এখন তো বাক্স প্যাটরাতেই যত জেল্লা।

ঠিক আছে কাল নিয়ে আসব’খন। দীপাকে তখনকার মতো আস্বস্তকরলাম।

পরদিন দোকানে গিয়ে বাক্স চাইতেই দোকানদার আশ্চর্য। ‘বাক্স পাননি?’

-না।

-রসিদ এনেছেন?

-আপনারাই তো বললেন, সেলের মালের মালের রসিদ হয় না। একটু ঝাঁঝিয়ে বললাম।

-কী বাজে বকছেন বলুন তো। দোকানদারও ডেটেঁ জবাব দিল।

-হ্যাঁ। কাল এখানে স্ট্যান্ডে ঝুলিয়ে শাড়ি বেচছিলেন না ?

আমার কথা শুনে দোকানদার এবার তার নাকে নস্যি গুঁজে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগলো। তারপর জিগ্যেস করল, ওটা কি পরার জন্য কিনেছেন?

-মানে? 

-মানে সোজা। যদি পরার জন্য কিনে থাকেন তো মিনিট কয়েক পরে খুলে রাখতে বলবেন। আর হ্যাঁ, ওই মিনিট কিন্ত নড়াচড়া চলবে না ।

এই মুহূর্তে মেজকাকার কথা ভীষন মনে পড়ছে। আফশোসও হচ্ছে যথেষ্ট। কত করে বলত, মনা ব্য্যয়াম কর।ব্যায়াম কর। দিনকাল খারাপ। টিকে থাকতে হলে শরীর সাস্থ্য শক্তপোক্ত করতে হবে। নইলে বাঁচা দায়।

হাতের কাছে শো-কেসের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে স্বর্গত মেজমামার আদেশ শুনতে পেলাম। ভেঙ্গে দে মনা, ভেঙে দে। ঠিক তখনই কাছে এসে নিচু গলায় দোকানদার বলল, সবই মস্তানি বুঝলেন। আমাদের ?মতো এরকম একটা এক নম্বর দোকানের গায়ে বসে দু’নম্বর মাল বেচার সুবিধে নিচ্ছে। আপনি কেন, অনেক উকিল মোক্তারও ঠকে গেছে। কিছু বলতে গেলেই দাদা-দিদি ডেকে আনবে।

এরপর লোকটা তার আরও দু;খের কথা শোনাতে চাইলেও ওসবে আমার তখন মন নেই। ডাহা ঠকা যে ঠকেছি বোঝা হয়ে গেছে। যদিও আমার ক্ষেত্রে এটাই প্রথম না। প্রতিবারের মতো এবারও প্রতিজ্ঞা করলাম। কাউকে আর বিশ্বাস করব না। যেন আমার বিশ্বাসের ওপরই জগত সংসার দাঁড়িয়ে আছে! আর উপায়ই বা কী বলুন তো? কাউকে বিশ্বাস করতে না পারা যে বড় কষ্টের।

হ্যাঁ, তবে এই আজকের মুক্তোটা একেবারে খাঁটি। এটার দাম বাড়িয়ে দিলে দীপা নিশ্চই আর অন্য কিছু কিনবে না। বেচারি কেন যে আমার কাঁধে এসে ঝুলল। সত্যিই তো, শখ আল্লাদ থাকবে না? আর তা কতই বা কাটছাঁট করা যায়। ওর ভাগ্য খারাপ তাই। নইলে একটা শাড়ি বা গয়নার দোকানের মালিকের ঘরের বউ হওয়ার মতো রূপ লাবণ্য দীপার অবশ্যই ছিল। বিয়ে করতে চাইনি বলায় দীপা একদিন মুখের ওপরই বলল, মা চাপাচাপি করল আর তুমিও ভালো ছেলের মতো জুতো খুলে পিঁড়িতে গিয়ে বসে পড়লে না?

উত্তর দিতে পারিনি।

হোটেলে ফিরে বেশ গদগদ হয়েই দীপার হাতে মুক্তোটা তুলে দিলাম। ও ভালো করে সেটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো। নিজের দিকে পাল্লা ভারী রাখার জন্য আগেই বললাম, এবার আর কারও ওপর ভরসা না। নিজেই দেখেবুঝে নিয়ে এলাম,বুঝলে। লোকটা সমুদ্র থেকে সবে তুলেছেআর সঙ্গে সঙ্গে খপাৎ। দামি বটে, কিন্ত মুক্তোটা এক নম্বর।

স্বামী-স্ত্রীর কথার মধ্যেই হঠাৎ বরেন এসে হাজির। ব্যাটা পাছার ওপর আড়াআড়ি হাতদুটো রেখে বিজ্ঞের ভঙ্গিতে জানতে চাইল সব। তারপর ঠোঁটে একটা বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বিশেষজ্ঞের মত দিয়ে বলল, তোর মতো লোক পেলে কি আর ঠকানোর লোভ কেউ সামলাতে পারে?

সত্যি বলতে কী, ঠকতে ঠকতে আমারও আত্মবিশ্বাস এমন তলানিতে এসে ঠেকেছে যে জোর দিয়ে কিছুতেই বলতে পারি না, জিতেছি। তবু বললাম, লোকটা না হয় ঠকালো, তাবোলে নিজের চোখদুটো তো আর ঠকাবে না। স্বচক্ষে দেখলাম, লোকটা জল থেকে তুলে পাড়ে দাঁড়ানো তার শাগরেদকে মুক্তোগুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে।

বরেন বলল, আজ্ঞে জল থেকে না। ওগুলো ওদের মুখের ভেতর থাকেক্যাবলা। আর তোর মতো খদ্দের দেখলে অমনি ওরা পি সি সরকার হয়ে যায়।

বরেনের মুখের কথা শুনে দীপা তার মুঠোয় ধরা মুক্তোটা বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে বলল, ও ম্যাগো, দাম দিয়ে কার একটা এঁটো পাথর নিয়ে এলো দ্যাখো। যাও শিগগির ফেরত দিয়ে এসো।

আমার তরফে বুঝিয়েও কোন লাভ হলো না। বরেনের ধুনোর গন্ধ তখনো ওর নাকে লেগে আছে। মুক্তোটা এখন ঘরে রাখা মানেই নাকি আমার নির্বুদ্ধিতার প্রতীক করে রাখা। অগত্যা আবার ছুটতে হলো সেটা নিয়ে।

অনেক কষ্টেসৃষ্টে সেই লোকটাকে যখন খুঁজে পেলাম,তখনও সে জোয়ার-ভাটার তালে তালে সমানে তার হাতদুটো বালির ভেতর ঢোকাচ্ছে আর বার করছে। পাড়ে দাঁড়ানো লোকজন দেখে দ্বিগুন তার উৎসাহ। নোনাজল আর ঘামে ভেজা গায়ের গেঞ্জিটা শরীরের সঙ্গে লেপটে ওকে একজন খাঁটি পরিশ্রমী বলে মনে হচ্ছে। কিছুক্ষন আগে এই ছবিটাই হয়তো ওর সম্পর্কে আমার ভেতর একটা শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছিল। এবং সেই সুযোগটাই সে কাজে লাগিয়েছে। তাই ও যখন বলল, সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে ঝিনুক ফেটে এগুলো বেরিয়ে আসে, বিশ্বাস করেছিলাম।ওসব লোকদেখানো ম্যাজিক-ফ্যাজি্কের কথা মাথায় আসেনি। যদিও এই মুহূর্তে ওর হাবভাব একটুও ভালো ঠেকছে না আর। ও চায় পাড়ে দাঁড়ানো সব লোকই ওর কাছে ঠকে যাক। একই কায়দায় জল থেকে তুলে তুলে শাগরেদকে একটা একটা করে ছুঁড়ে দিচ্ছে আর লোকজন সাব পালটা লোভের দৃষ্টি ছুঁড়ছে সেদিকে। বরেনের কথায় আমার দৃষ্টি অবশ্য এখন একটু অন্যরকম। মনে হচ্ছে,ব্যাটা ঠিকই বলেছে।

ইতিমধ্যে এক রোমিওকে দেখলাম, প্রেমিকার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ বিপুল উৎসাহে সে একা এগিয়ে গেল জলের দিকে।দূর থেকে দেখা যাচ্ছে তার হাতের তালুর ওপর মুক্তোগুলো ফেলে লোকটা কী বোঝাচ্ছে। বেছে বেছে একটা তুলে সে পকেট থেকে পার্স বার করল। কেন যেন মনে হলো, কিনুক ব্যাটা কিনুক। এ পৃথিবীতে আমি একাই শুধু বোকা হবো কেন? পরক্ষণেই ভাবলাম, লোকটা সবাইকে এভাবে ঠকিয়ে যাবে? ইচ্ছে হলো, চেঁচিয়ে বলি ওগুলো সব ঝুটো, কিনো না। কিন্ত ততক্ষনে রোমিও মুঠোয় পুরে মুক্তো নিয়ে ফিরতে শুরু করেছে। পাড়ে দাঁড়ানো প্রেমিকার মুখে হাসি দেখে তারও দাঁত দেখা যাচ্ছে। সামনের দুটো একটু উঁচু। ঠোটের পর্দা নামিয়ে সে দুটো আড়াল করার চেষ্টা করেও পারছে না। ভেজা বালির ওপর তার পা দুটো ঢুকে ঢুকে যাচ্ছে। চলনের ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, সিনেমায় দেখা কোন স্লো মোশন প্রেমিক। প্রেমিকার সামনে এসে মুঠো খুলে দাঁড়াতেই মেয়েটি নিজের হাতের ভেতর তার হাতটা আঁজলার মতো কোরে ধরে মুক্তোটার দিকে তাকিয়ে রইল। আহা, কী ভালোবাসা! কী বিশ্বাস!

দীপাও যদি এভাবে নিতে পারত। কিন্ত সে তো এখন বরেনের চ্যালা। চ্যালারা চিরকালই মিসগাইডেড । আচ্ছা,যদি ধরেও নিই ওটার কোন দাম নেই, আমার দেওয়াটারও তো একটা দাম থাকতে পারে, না কি?

তুমুল রোদে এক এক করে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে পাড়। লোকটা আমায় দেখেও দেখছে না। দূর থেকেই হাঁক পেড়ে তাকে মুক্তোটা ফেরত দিতে চাওয়ার ইচ্ছে ও কারণ দুইই জানালাম। শুনে এতক্ষ্ণণে লোকটা বেশ উপেক্ষার সুরেই তার ভাষায় যা বলল, তার সারমর্ম হলো, বেড়াতে এসে তো অনেক টাকাই ওড়ান।না হয় গরীবকেও দুটো দিলেন। অথচ দানের বদলে এটা যে নেহাতই আমার কাছে একটা ঠকে যাওয়ার ঘটনা, তা তাকে কে বোঝায়!

এরপর আরও কিছুক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে লোকটার জন্য অপেক্ষা করে করে এক দার্শনিক চিন্তার শিকার হয়ে পড়লাম। মনে হলো, এই কাড়াকাড়ি, এই জানা অজানার মাঝেই তো বেঁচে থাকার সুখ-দু;খ সব জড়িয়ে আছে। আমাকে কিংবা ওই রোমিওকে ঠকিয়ে লোকটা যেমন বাঁচতে চায়, আ্মার বা ওই প্রেমিকটিরও তো কখনও কখনও আমাদের প্রিয়জনদের কিছুটা হলেও ঠকাতে হয়। কেউ কম কেউ বেশি। কেউ সফল কেউ বিফল। তফাত শুধু ওইটুকু। 

ভাবনার মধ্যেই হইচই করে কারা যেন এগিয়ে আসছে। তাকিয়ে দেখি, সদলবলে আমার বন্ধু ও তাদের স্ত্রীরা। সঙ্গে দীপাও আছে।

কাছে এসে দীপা জিজ্ঞেস করল, কি গো, লোকটাকে পেলে? 

ওই তো ব্যাটা মুক্তো তুলছে। এই বলে যেই সমুদ্রের দিকে তাকে দেখালাম, দীপা অমনি প্রতিবাদ করে বলল, উঁহু, আবার বলে মুক্তো। বরেনদা কী বলল শুনলে না? যেভাবে হোক ওটা ফেরত দিয়ে দিও।

আরে বাবা, ফেরত নিলে তো দেব। শালা সেই থেকে রোদে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

ঠিক আছে ঠিক আছে। এখানে তো তোমার অন্য কাজ নেই। একটু ধৈর্য ধরে বোস। ও জল থেকে উঠলে বোল। দীপা আমায় শান্ত করল।

বালির ওপর দীপার রঙিন পোষাকটা বেশ মানিয়েছে। চোখে সানগ্লাস আর লাল ছাতার তলায় ওকে কেমন নায়িকা নায়িকা লাগছে। বিয়ের আগে প্রথম যেদিন ওকে দেখতে যাই, সেদিনও এমন একটা ভালোলাগাকাজ করেছিল। সমুদ্রের হাওয়ায় ওর গায়ের ওড়নাটা এখন ওরই মতো উড়ুউড়ু।

দীপা বলল, তুমি তাহলে হোটেলে চলে যেও। আমরা সবাই মিলে একটু মার্কেটিংয়ে যাচ্ছি।

তার ঠোঁটে তখন প্রশ্রয় আদায়ের হাসি। আমার তরফে কোন উত্তর না পেয়ে নিজেই আবার উদ্যোগী হয়ে বলল, ও হ্যাঁ, তোমার পার্স থেকে কিছু টাকা নিয়েছি কিন্ত।

সবার সামনে কী আর বলি! শুধু বললাম, বাকিটা কোথায়? 
- সে তুমি জানো। আমি কী করে বলব?

যাঃ, তার মানে, সবটাই গেল। মনে মনে প্রমাদ গুনলাম।

এরপর সঙ্গীরা ওকে তাড়া দিয়ে নিয়ে চলল।

চড়া রোদে পাড়ে এখন আমি ছাড়া সামান্য দু-একজনকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেখা যাচ্ছে।

ওদিকে লোকটা কিছুতেই জল ছেড়ে পাড়ে আসছে না। শেষমেষ বিরক্ত হয়ে হাঁক পেড়ে বললাম, ও ভাই, তুমি তো লোক ঠকাতে ওস্তাদ। তা আমার ওই টাকার বদলে বউ ঠকানো শিখিয়ে দেবে?

সে এবার বেশ বেপরোয়া হয়েই জবাব দিল। বলল, সেটা পারলে কী আর রোজ রোজ আপনাদের ঠকাতে হত?

ওর এই উত্তর শুনে মনে হলো, হয়তো ভাগ্যের সামান্য হেরফেরে ও জলে, আমি ডাঙায়।

জীবন যুদ্ধে যে যার মতো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।

৪টি মন্তব্য: