শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কয়েকটি গল্প -অমর মিত্র

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এদেশে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে স্বল্প পরিচিত। আমি তাঁকে কয়েক বছর জেনেছি মাত্র। তাঁর কথা বিশেষ শুনিনি এপার-ওপার, দুই পারের লেখকদের মুখেও তেমন ভাবে। এই বিষয়ে একটি অভিজ্ঞতা আছে। ২০০০ সালে যখন প্রথম ঢাকায় যাই, শহীদুল জহিরের কথা বলেছিলেন ওয়াসি আমেদ, ভাস্কর চৌধুরী, আবু হোসেন শাহরিয়ার, শামিম রেজারা। আমি ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ বইটি পাঠক সমাবেশ থেকে নিয়ে আসি।
এখানে সেই বই নিয়ে লিখি ঐ ২০০০ সালেই। তার বেশ কয়েক বছর পরে বাংলাদেশের এক বন্ধু চট্টগ্রামের মাসুদ করিম কলকাতায় এসেছিলেন আমার জন্য কয়েকটি বই উপহার নিয়ে। তার ভিতরে ছিল ‘ডলু নদীর হাওয়া’। পড়ে বিস্মিত হয়েছিলাম। কিন্তু তাঁর কথা বাংলাদেশের লেখক অগ্রজ বা অনুজের মুখে শুনিনি। পরে, অনেক পরে তিনি এদেশে উচ্চারিত হতে থাকেন ইন্টারনেটে দেশ-বিদেশ ভেদাভেদ মুছে গেলে। সাহিত্যে এমন হয়। নীরবতা দিয়ে লেখকের সৃষ্টিকে অবহেলা করা যায়। কিন্তু ইতিহাস তাঁকে ফিরিয়ে আনেই। 

সৈয়দ মনজুর ইসলামের নামও সেই ভাবে এখানে কেউ বলেননি। তরুণ লেখকরা তাঁকে চেনেন না। আমি বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকায় তাঁকে পড়েছি। শব্দঘর, রাইজিং বিডি, এই সময় ইত্যাদি। আর কালি ও কলম তো আছেই। প্রথম পড়ি বোধ হয় কালি ও কলম পত্রিকায়। পড়ে চমকে উঠেছিলাম। এই তীব্রতা তো বহুদিন পাই না বাংলা গল্পে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা গিয়েছিলাম। বাতিঘর থেকে তাঁর একটি গল্পের বই কিনে এনেছিলাম। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাঁর গল্প নিয়ে আমাকে আবিষ্ট করেছেন। তাঁর গল্পের সুতীব্র কথন আমাকে বিব্রত করে রেখেছে বহু সময় ধরে।

তিনি বাংলাদেশের সমাজ জীবনের কথা লেখেন। বাংলাদেশের সমাজজীবনের অন্ধকার তাঁর লেখার উপাদান। লেখার গুণে তা আমাদের এই বাংলার গল্পও হয়ে ওঠে। গল্প তখনই সর্বজনীন হয়ে ওঠে যখন তা দেশকাল ছাড়িয়ে এমন এক সত্যে পৌঁছয় ‘যারে আমি পারি না এড়াতে’। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে আমি এড়াতে পারি না। আমি এখন তাঁর কয়েকটি গল্পের কথা বলি। ডিডেলাসের ঘুড়ি, নোলক এবং অল্টার ইগো। প্রকৃতিগত ভাবেই স্বার্থপর এবং নিষ্ঠুর মানুষের হিংস্রতার কোনো পরিমাপ করা যায় না। মানুষের ভিতরের যে অন্ধকার প্রদেশটি আছে, সেই প্রদেশের কথাই লেখেন মনজুরুল ইসলাম। মানুষের প্রেম, কাম, ঈর্ষা, নিষ্ঠুরতা সবই তাঁর লেখার বিষয়। আসলে বিষয়টি তিনি যেভাবে উপস্থাপিত করেন, একই সঙ্গে সেই বিদ্রুপ আর মানুষের নিরুপায়তার বিবরণ আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছে বহু ক্ষেত্রে।

ডিডেলাসের ঘুড়ি গল্পের ইমান এক অনাথ বালক। তার জন্মের ন’মাসের ভিতর একই দিনে বাবা ও মা মারা গিয়েছিল। বাবা ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে ছাদ থেকে পড়ে যায় শান বাঁধানো কলতলায় , আর মা সেই মৃতদেহ দেখে যে মূর্ছা গেল, আর জ্ঞান ফেরেনি। ন’মাসের ইমান কী ভাবে বড় হয়ে উঠেছিল সেই বৃত্তান্ত দেননি লেখক। মানব সন্তান তো, সে বেঁচে থেকে বড় হয় । হোসেন মিঞার গ্যারেজে কাজ করে ইমান, শিশু শ্রমিক। ইমানের বাবা সেতু মিঞার ঘুড়ির নেশা ছিল। ঘুড়ি বানাত সে খুব ভালো। হোসেন মিঞার বড় ভাইয়ের সঙ্গেই সে পড়েছিল নিচে। ডিডেলাসের ঘুড়ি এক গ্রিক মিথ। ডিডেলাস তার পুত্রের দুপাশে মোমের ডানা লাগিয়ে আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ডানার মোম সূর্যের তাপে গলে যেতে থাকে। এই গল্পে ডিডেলাস নেই। তার অনাথ পুত্র আছে। এই গল্পে ইমানের ঘুড়ির নেশা আছে। বালক কী করে এক ভয়ানক হত্যাকান্ড দেখে ফেলে শেষ অবধি রাষ্ট্রের কাছে দোষী সব্যস্ত হয় সেই কথা লিখেছেন লেখক। তাইই তো, আরক্ষা বাহিনী, বিচার ব্যবস্থা সবই তো রাষ্ট্র ব্যবস্থার অঙ্গ। একটি ক্ষুধার্ত বালকের ভয়ানক পরিণতি বুকে ভয় ধরিয়ে দেয়। আমি কাহিনির ভিতরে ঢুকতে চাই না। গল্প পাঠের পর পাঠক ধরতে পারবেন, কোন ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ বেঁচে থাকে। হ্যাঁ, ইমানের ঘুড়ির নেশা তার বাবা সেতু মিঞার রক্তের থেকে পাওয়া। সেতু মিঞা তাকে উড়ানের নেশা দিয়ে গিয়েছিল। সেই নেশাই তার মোমের ডানা গলিয়ে দিয়েছিল যেন। মিথের ব্যবহার যে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই সত্য উন্মোচনে আমরা শঙ্কিত থাকি। 

নোলক গল্পটি কাম ও প্রেম যে আদিমতায় চলে গেছে, তার চিহ্ন আমি আল মাহমুদের গল্পে পেয়েছিলাম। পৃথিবীর সাহিত্যে এই কাহিনি কম লেখা হয়নি। মানিকে আছে, তারাশঙ্করে আছে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের লেখাতে আছে তাঁর মতো করে। সাহিত্যে কি আর নতুন কথা বিশেষ বলা হয়ে থাকে ? মানুষের ষড় রিপু, প্রেম, নিষ্ঠুরতার নতুন ব্যাখ্যা কী আর হবে, শেষ অবধি সেই কথাই হয়ত বলা হয়ে থাকে যা আগে বলা হয়েছে, নতুন ভাবে বলায় তা নতুন লেখা হয়ে ওঠে। ফর্ম এখানে বড় ভূমিকা নেয়। কাহিনি তো আধার মাত্র। উপাদান মাত্র। যা নির্মাণ করা হবে, তাইই সত্য। বারই গ্রামের নুলো পায়ের সুন্দরী গায়িকা জ্যোৎস্নার যে কাহিনি শুনিয়েছেন তা আমাকে বিব্রত করেছে স্পষ্ট। জ্যোৎস্না অপূর্ব গায়। তার গান শুনে বাঘও তার শিকার ছেড়ে লেজ গুটিয়ে বসে। মনে হয় আকাশ থেকে পরি নেমে এসে গান গাইছে জ্যোৎস্নার গলায়। জ্যোৎস্নাকে গায়ক মাক্কু শাহ ফকির তার গানের আসরে নিয়ে বসে। তালিম দিতে দিতে এক সময় প্রস্তাব দেয়, নিজের শিষ্যা করে নেবে। জ্যোৎস্নার প্রতি প্রেম জন্মেছিল মাককু শাহর। সেই প্রেম কাম-গন্ধহীন ছিল না। জ্যোৎস্নার মাথায় হাত রেখে শিহরিত হয়েছিলেন মাক্কু শাহ। মাক্কু শাহর প্রস্তাবে রাজি হয়নি জ্যোৎস্নার বাবা ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হাতেম আলি । জ্যোৎস্নাকে একটি নোলক উপহার দিয়ে প্রত্যাখ্যাত মাক্কু শাহ আচমকা ফিরে গিয়েছিলেন নিজের গাঁয়ে। দুঃসংবাদ এসেছিল। জ্যোৎস্না বছর ২৪-এর যুবতী। তার প্রেমে পড়ে কামার্ত হয় মকন। মকন হলো ঐ গ্রামের সিরাজুদ্দিন মিঞার পুত্র। সিরাজুদ্দিন বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে একটা হাত খুইয়েছিল, আর সেই বাঘকে পিটিয়ে মেরেছিল মকন। এই বিবরণে পাঠক বুঝতে পারছেন কোন আদিমতায় প্রবেশ করছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। হ্যাঁ, তিনি তা পারেন। রূঢ় বাস্তবকে কাপড়চোপড় পরিয়ে সামাজিক করে তোলার দায় তাঁর নেই। নেই যে তা ডিডেলাসের ঘুড়ি গল্পে টের পেয়েছি। কাজের কিশোরী মেয়েটির যখন ভয়ার্ত হয়ে তার রক্তাক্ত স্তন ঢেকে ছাদে উঠে আসে, পিছু পিছু আসে বুড়ো কামার্ত দারোগা, পাঠক আপনি ভয়া পাবেন। এখানে মকনের বীর্যপাত হয়ে যায় জ্যোৎস্নাকে দেখে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পে যেন আমাদের এপারের ক্ষুধার্ত প্রজন্মের লেখকদের ছায়া দেখি, কিন্তু তাঁর আধুনিকতা অন্য। তাঁর লেখায় রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পোষিত এই সমাজ যেভাবে অন্বিত হয়, তার তীব্রতা অনেক বেশি। এই গল্প জীবনের অনেক নিকটে। কামার্ত প্রেম, আদিমতা…, এই জীবন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ে পেয়েছি, প্রাগৈতিহাসিক স্মরণ করুন। একজন লেখক তাঁর পিতৃপুরুষ লেখকদের উত্তরাধিকার বহন করেন, কিন্তু তার মতো হয়ে ওঠেন না। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামও হননি। এই গল্প প্রেম এবং প্রতিহিংসার। শেষ অবধি সেই হত্যাকান্ডেই তা শেষ হয়। হয়েই যায় যা, তা না হয়ে অন্য কিছু হয় না। হতে পারে না, তাই হয় না। ঈর্ষা আর সন্দেহে জ্যোৎস্নার নাক থেকে মাংস সমেত ছিঁড়ে এনেছিল নোলকটিকে। ছিড়েছিল মকনই। হত্যার আগে তা ঘটেছিল। 

তাঁর অন্য একটি গল্প অল্টার ইগো এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি উকিল, পাবলিক প্রসিকিউটার এবং সাজাপ্রাপ্ত আসামীর। জোড়া খুনের আসামী দাউদের ফাঁসির হুকুম আদায় করেছিলেন খোন্দকার আফজাল তাঁর যুক্তিজাল প্রতিষ্ঠা করে। দাউদের উকিল বলেছিল, খোন্দকার আফজাল ভুল করেছেন। নিম্ন আদালতের রায় হাইকোরটে গিয়ে বদলে যাবে, দাউদ তাঁকে চিনে রাখল। নিম্ন আদালতে বিচারের সময় দাউদের হিংস্র দৃষ্টি দেখেছিলেন তিনি। উচ্চ আদালতে গিয়ে মৃত্যুদণ্ড রহিত হয়ে, চোদ্দ বছর কারাদণ্ড, সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে তা হলো সাতবছর। ইতিমধ্যে তার চার বছর কেটে গেছে, তিন বছর বাদে মুক্তি পেয়ে খুনি দাউদ তাঁকে ফোন করে ভয় দেখাতে লাগল। খোন্দকারের জন্য সে তার বিবির জানাজায় উপস্থিত থাকতে পারেনি, কবরে মাটি দিতে পারেনি, শোধ নেবেই। খোন্দকার অবসর নিয়ে গ্রামে ফিরলেন। তিনি একা মানুষ। স্ত্রী নেই। পুত্র-কন্যারা সংসার করছে। দেশে থাকে, বিদেশেও। গ্রামের বাড়িতে এক পুত্র থাকে। সে বাবার নিরাপত্তার জন্য ভালো ব্যবস্থা করল। খোন্দকার থানায় জানালেন, প্রথমে ভয় পেয়েছিলেন, ধীরে ধীরে দাউদের ফোন পেতে পেতে খোন্দকারের সঙ্গে খুনী দাউদের সূক্ষ্ম এক ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়ে যায়।

এই তিন গল্পের ভিতরে অল্টার ইগো সবচেয়ে নাড়া দিয়েছে আমাকে। গল্প তো শুধু কাহিনির বয়ন নয়। তা কাহিনি ছাড়িয়ে এমন কোনো মাত্রায় তা পৌঁছবে, যার ভিতর দিয়ে পাঠক অকথিত কাহিনির সন্ধান পেয়ে যাবে হয়ত। দাউদের নামে অভিযোগ জানানয়, দাউদের মেয়ে এসে থানায় ক্ষমা চেয়ে গেছে। তার বাবা যাতে খোন্দকার সায়েবকে ফোন না করে, ভয় না দেখায়, সেই ব্যবস্থা সে করবে। এক অপরাধী এবং এক ব্যবহারজীবীর ভিতরের দ্বন্দ্ব নিয়েই এই বিচিত্র গল্প। ফোন এলে খোন্দকার আর ভয় পান না। বরং দাউদকে উপদেশ দেন। দাউদ বলে, তাঁকে কত নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করবে তার কল্পিত বিবরণ। এই গল্প অন্তিমে গিয়ে এমন এক মানবিক ঘটনায় পৌঁছে যায়, যার কোনো তুলনা নেই। হ্যাঁ, তাঁর ডিডেলাসের ঘুড়িও সেই জায়গায় পৌঁছেছিল, কিন্তু তা ছিল চুড়ান্ত অমানবিক। 

সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে খুঁজে খুঁজে পড়তে হবে, অন্তত আমাকে।




লেখক পরিচিতি
অমর মিত্র
কথাসাহিত্যিক। প্রবন্ধকার। নাট্যকার।
কোলকাতায় থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন