শনিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২০

সুজয় দত্তর গল্প : www.অন্তরাল.নেই


সেদিন বিকেলে দক্ষিণ কলকাতার চকগড়িয়ার পঞ্চানন চক্কোত্তি অফিস-ফেরত গড়িয়াহাটের আদি ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ে একটু আধটু কেনাকাটা সেরে যেই না বাইরে বেরিয়েছেন, পকেটে বেজে উঠলো জনপ্রিয় বাংলা ব্যান্ডের জীবনমুখী গান। পাঞ্জাবীর ভেতরে মোবাইলের অস্থির কাঁপুনি। এমনিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে দেশী রাজারাজড়াদের ওপর ব্রিটিশের চাপিয়ে দেওয়া সেই 'ক্ষমতাহীন দায়িত্ব আর দায়িত্বহীন ক্ষমতার' নীতি তাঁর বাড়িতেও বহাল মোবাইল ফোনের ব্যাপারে।
রিংটোন, প্লাষ্টিক জ্যাকেটের রং, ব্যাকগ্রাউন্ডের ছবি -- সব ঠিক করার আর নিরন্তর গেম খেলে যাওয়ার জন্মগত অধিকার তাঁর নাতিনাতনীদের। তাঁর দায়িত্ব শুধু টাকা ফুরোলে টাকা ভরা, চার্জ ফুরোলে চার্জ দেওয়া। এমনও হয়েছে বারকয়েক যে, কোন ফাঁকে চুপিসাড়ে বিচ্ছুদুটো রিংটোন বদলে দিয়েছে জানতেও পারেননি, তাই বাসের মধ্যে নিজের ব্যাগের সাইড-চেন থেকে শাহরুখ খানের লেটেস্ট হিট বাজছে শুনেও ভেবেছেন এ নির্ঘাত অন্য কারুর -- আমারটা তো শিলাজিতের "জলফড়িং"। যাই হোক, আজ পকেট থেকে ফোনটা বার করে কল রিসিভের বোতামটা টিপতেই ওপাশ থেকে মুখঝামটা। গিন্নীর। 

"পই পই করে বললাম না বুল্টির বিয়ের নমস্কারী শাড়ী-জামা সব দক্ষিণাপন থেকে কেনা হবে? নাহলে সাউথ সিটি মল বা হাইল্যান্ড পার্ক মলের শ্রীনিকেতন থেকে? সর্দারি করে গড়িয়াহাট গেছ কোন আক্কেলে? হ্যাঁ?"

বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হবার জোগাড় পঞ্চাননের। কাকপক্ষীকেও তো জানাননি আজ ফেরার পথে শালীর ছোটমেয়ে বিয়ের কেনাকাটা করতে এমুখো হবেন! গিন্নী জানলো কী করে? ম্যাজিক না দৈববাণী? নাকি চীনের রাজধানীর মতো এই শহরেরও প্রতিটি আনাচেকানাচে শয়ে শয়ে সিকিউরিটি ক্যামেরা বসানো আছে প্রত্যেকের প্রতিটি নড়াচড়ার ওপর নজর রাখতে? আমতা আমতা করে গিন্নীকে শুধোলেন, 

---"তু-তুমি বুঝলে কী করে আমি কোথায়?"

---"ন্যাকামি হচ্ছে? একটু আগেই রিমলি-ঝিমলির সঙ্গে দেখা হয়নি তোমার?"

---"হয়েছিল তো। তাতে কী?" ব্যাপারটা ঠিক পরিষ্কার হয়না পঞ্চাননের কাছে। পাড়াপ্রতিবেশী রণেনবাবুর স্ত্রী শ্যামলিকা ওরফে রিমলি আর তার কলেজে পড়া ফ্যাশনদুরস্ত বোন কুসুমিকা ওরফে ঝিমলি সামনেই ট্রেডার্স অ্যাসেম্বলি নামের দোকানটা থেকে হাতে কয়েকটা প্যাকেট ঝুলিয়ে এই দোকানে এসে ঢুকেছিলো মিনিট পনেরো-কুড়ি আগে। ওরা তো এখনো আদি ঢাকেশ্বরীর ভেতরেই রয়েছে। ওরা খবর দেবে কী করে?

---"ধ্যাত্তেরি! ঝিমলিই তো টেক্সট করলো রুমুকে -- তোমাকে দেখেছে শাড়ী বাছতে।"

ও হরি। এর মধ্যে টেক্সট মেসেজও পাঠানো হয়ে গেল? অবশ্য আশ্চর্য কিছু নয়। রুমু অর্থাৎ পঞ্চাননের সদ্য-গ্রাজুয়েট ছোটমেয়ে আর ঝিমলি গলায় গলায় বন্ধু। রাতদিন মোবাইল কানে ফিসফিস গল্প করেই চলেছে অথবা পুটুর পুটুর করে টেক্সটিং। এতো কী কথা থাকে আজকালকার ছেলেমেয়েদের? ভেবে পাননা পঞ্চানন। ট্রামে বাসে রাস্তায় ঘাটে অফিসে বাজারে শপিং মলে যেদিকে তাকাও যখন তাকাও সবাই কোনো না কোনো অদৃশ্য পার্টনারের সঙ্গে বাক্যালাপে মশগুল। অনেকসময়ই বাহ্যজ্ঞানশূন্য। সামনে কে আছে না আছে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। এইতো সেদিন নাতিটা হাঁস-সন্দেশ খাওয়ার বায়না করল বলে পাড়ার গোবিন্দর মিষ্টির দোকানে গিয়েছিলেন। দোকানে ঢুকে দুটো হাঁস-সন্দেশ চাইতেই যে ফচকে ছোঁড়াটা কাউন্টারে ছিল, সোজা বলে দিলো "আজ হবেনা। কাল সকালে আসুন।"

---"সেকী? ওই তো শোকেসে সাজানো আছে দেখতে পাচ্ছি।"

---"আরে যা বলছি করুন না। আপনার ভালোর জন্যই তো বলছি।"

---"ভালোর জন্য মানে? চ্যাংড়ামি হচ্ছে? গোবিন্দ, এই গোবিন্দ, আয় তো এদিকে একবার। দেখ তো কী সব উল্টোপাল্টা কথা বলছে --"

মালিকের নাম শুনেই ছোঁড়াটার সম্বিৎ ফিরেছে। এক গাল হেসে জিভ কেটে বলল, " না না দাদু, ওটা আপনাকে বলিনি, আমার বড়মামাকে। পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছে বুড়োর, তো আজই এক্ষুণি মধ্যমগ্রাম থেকে এখানে এসে পিয়ারলেস হাসপাতালে নাম লেখাতে চায়। এই ভর সন্ধ্যেবেলা ওসব হয়, বলুন?" তখন পঞ্চাননের খেয়াল হল ছেলেটার হেলানো ঘাড় আর কাঁধের মাঝে মোবাইল ধরা। কথা বলতে বলতে কাস্টমার সামলাচ্ছে। মাল্টিটাস্কিং!

এর তো তবু মোবাইলটা দৃশ্যমান। ইদানীং আবার আরেক শ্রেণীর লোক চোখে পড়ে যাদের হঠাৎ দেখলে মনে হবে নির্ঘাত কোনো মাথার ব্যামো আছে, নয়তো থিয়েটারের পার্ট আওড়াচ্ছে। হাতে ফোন-টোন কিছু নেই কিন্তু অনর্গল স্বগতোক্তি করে যাচ্ছে। মাসকয়েক আগে একদিন সকালবেলা অফিসের চার্টার্ড বাস ধরার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, হঠাৎ দেখেন একটা ঢ্যাঙা চেহারার স্যুটেড-বুটেড লোক দুহাত কোটের পকেটে রেখে ইতস্ততঃ পায়চারী করছে আর নিজের মনে বিড়বিড় করে চলেছে। কৌতূহলী হয়ে কান পাততে দু-চারটে কথা শোনা গেলো। 

"আরে, সবকিছু কি অতোই সোজা? দেখছেন না কীরকম বাজার? ওসব এরিয়ায় জমি খোঁজা -- মিনিমাম দু-লাখ সত্তর হাজার।" 

কে জানে, হয়তো জমি-বাড়ীর ব্রোকার-টোকার গোছের কিছু হবে। ক্লায়েন্টের মুখোমুখি হবার আগে বাসস্ট্যান্ডেই ঝালিয়ে নিচ্ছে কী বলবে। নাকি অফিস বা ক্লাবের নাটক-ফাটকে চান্স পেয়েছে, তাই পার্ট মুখস্থ করছে? সে-জিনিস পঞ্চানন নিজেও এককালে বহু করেছেন। পোশাক ওরকম না হলে, মানে গায়ে ঢোলা পাঞ্জাবী আর কাঁধে শান্তিনিকেতনী ঝোলা থাকলে, হয়তো সন্দেহ করতেন লোকটা আপনভোলা কবি। ওর কথাগুলোর মধ্যে বেশ ছন্দমিল আছে। যাইহোক, সেদিন বাসে পাশের সীটে বসেছিল শুভজিৎ -- ইয়ং ছেলে, সল্ট লেকের সেক্টর ফাইভে চাকরি করে, আজকালকার ভাষায় যাকে বলে 'টেক-স্যাভি'। ওকে ব্যাপারটা বলতেই গোঁফ নাচিয়ে মুচকি হেসে বলল, "ওর বোধহয় blue tooth আছে মেসোমশাই, তাই ওরকম করে কথা বলছে।" নিজের অজ্ঞতা ঢাকতে আর কথা বাড়াননি পঞ্চানন, কিন্তু মনে মনে ভেবে কূল পান না -- blue tooth আবার কী! কোনো দাঁতের রোগ-টোগ নাকি? মনে আছে অনেক বছর আগে যখন আক্কেল দাঁত উঠেছিল, যন্ত্রণায় রাতে ঘুম হতোনা, রাত্তিরবেলা বারান্দায় অস্থির হয়ে পায়চারী করতে করতে বাবাগো-মাগো-পারিনাগো করতেন। নীল দাঁত হলে বুঝি মুখ দিয়ে কাতরানি না বেরিয়ে বিষয়-সম্পত্তির কথা বেরোয়? এই ঘটনার বেশ কিছুদিন বাদে এগারো ক্লাসে পড়া বড়নাতি ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছিল blue tooth আর হ্যান্ডস-ফ্রি ফোনের রহস্য।

মোবাইল ফোন জিনিসটা যদি শুধুই গতানুগতিক দৈনন্দিন জীবনে এরকম নিরীহ মজার উপাদান হতো, তাহলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু এ অতি মারাত্মক জিনিস। এর স্টিল ক্যামেরা আর ভিডিও ক্যামেরার শ্যেনচক্ষু থেকে নিজেকে আড়াল করা শিবেরও অসাধ্য। পঞ্চাননের নিজের অফিসেরই লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক শ্যামাপদ হালদারের একবার কী হাল হয়েছিল, ভাবলে হাসিও পায়, আবার শিউরেও উঠতে হয়। লোকটা এমনিতে ভালো, আপাদমস্তক নিরীহ গোবেচারা টাইপ। শুধু একটাই বদঅভ্যেস -- রাস্তায়-ঘাটে আড়ালে-আবডালে ছোট বাইরে যাওয়া। থাকে উত্তর কলকাতার ঘিঞ্জি পাড়ায় গলির গলি তস্য গলিতে। ওখানে ওভাবে হালকা হবার সুযোগ অনেক। কিন্তু গত বছর একদিন ছেলেকে যাদবপুর ইউনিভার্সিটির এডমিশন কাউন্সেলিংয়ে দিয়ে ওখান থেকে বাস ধরে অফিসে আসার পথে ওই কান্ড করেছিল। আর করবি তো কর একেবারে একাউন্টস ডিভিশনের রঞ্জিত মুখুজ্জের বাড়ীর লাগোয়া গলিতে ! জানা ছিল না যে ওখানে অফিস কলিগের বাড়ী, জানলে কি আর --। বেচারার এমনই ভাগ্য যে ঠিক সেই সময়েই মুখুজ্জের ছোটছেলেটা দোতলার জানলায় দাঁড়িয়েছিল ওর সদ্য-চাকরি-পাওয়া দাদার নতুন স্যামসুং গ্যালাক্সিটা হাতে নিয়ে। এমন মওকা কেউ ছাড়ে? সঙ্গে সঙ্গে খটাক। আর এরকম একটা স্ন্যাপ চেপে রাখা যায়? সোজা ফেসবুকে। সঙ্গে আবার ক্যাপশন "ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া"! ফেসবুক এমনিতেই তিল কে তাল করার জায়গা, আর এ তো একেবারে 'কট রেড হ্যান্ডেড'। একদম সামনে থেকে তোলা। অতএব 'বার্তা রটি গেল ক্রমে'। এর পরের কদিন হালদারকে ওর হাঁটুর বয়সী জুনিয়র ছোঁড়াগুলো যা নাজেহাল করেছিল, কহতব্য নয়। ক্যান্টিনে করিডোরে অফিস-ফ্লোরে পাশ দিয়ে গেলেই "কি দাদা, পেয়েচে নাকি?", "কি দাদা, আজ কোথায় হল? উত্তর না দক্ষিণ?" শুনতে শুনতে মেজাজ হারিয়ে গালাগাল করতো ও। তাতে তো আরোই পোয়াবারো।  

মোটকথা এই ঘটনার পর পঞ্চাননও একটু বেশী সাবধান হয়েছেন। হালদারের রোগ ওঁর নেই, যেটা আছে সেটা এই বয়সে খুবই স্বাভাবিক। দুপুরে গিন্নীর গুছিয়ে দেওয়া টিফিনটা খেয়ে বিকেলের দিকে একটু ঝিমুনি আসে। সেরকম নাক ডাকিয়ে ভাতঘুম মোটেও না, নেহাতই ঝিমুনি। কিন্তু টেবিলে জমা ফাইলপত্তরের আড়াল থাকলেও কেউ কোনোদিন ওঁর অজান্তে টুক করে মোবাইলে ছবি তুলে "ম্যায় মুলাজিম হুঁ সরকারী" গোছের একটা মুখরোচক ক্যাপশন-সহ ফেসবুকে দিয়ে দিলেই কেস জন্ডিস। রিটায়ারমেন্টের মুখোমুখি এসে এরকম হেনস্থার কথা ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়। এমনিতে এই ফেসবুক জিনিসটার মাথামুন্ডু বোঝেননা তিনি, একাউন্ট খোলার তো প্রশ্নই নেই। কিন্তু লোকমুখে এর যা কীর্তিকলাপ শোনেন, তাতে গভীর বিতৃষ্ণা জন্মে গেছে ওটার ওপর। যখন ছোট ছিলেন, দেখতেন রোজ বেলা বারোটা নাগাদ পাড়ার বুড়িমানুষরা রান্নাবান্না চানটান ঠাকুরপুজো সেরে ওঁদের পুরোনো বাড়ীর লাল সিমেন্টের রকে জমায়েত হতেন। ওঁর ঠাকুমা ছিলেন সেই দ্বিপ্রাহরিক আড্ডার মধ্যমণি। ফোকলা দাঁতে মুড়ি-বাতাসা বা চিঁড়ে-গুড় চিবোতে চিবোতে জগৎ সংসারের এমন বিষয় নেই যা নিয়ে আলোচনা করত না সেই বুড়ির দল। অমুক বাড়ির মেজোছেলে ভিন্নজাতে বিয়ে করেছে বলে তাকে ত্যাজ্যপুত্তুর করা হবে, তমুকের মেয়ের বিয়েতে পাত্রপক্ষ এক কানাকড়িও পণ চায়নি, অমুকের ননদেরা দিনরাত উঠতে-বসতে খোঁটা দেয়, তমুকের বৌটা এতো দজ্জাল যে শাশুড়িকে তিনমাসে বাড়িছাড়া হতে হয়েছে -- এইরকম আরো কত কী। সিংহভাগই পরনিন্দা-পরচর্চা। তবে ধর্মকর্ম আর রান্নাবান্নার কথাও হতো অনেক। আরো একটা জিনিস হতো মাঝেমধ্যে -- আত্মগরিমা প্রচারের প্রতিযোগিতা। আমার ছেলে হেড-আপিসের বড়বাবু হয়েছে তার বিরাট হাঁকডাক, আমার নাতি 'ম্যাট্টিকে' এতো ভাল পাশ করেছে যে ওর 'ম্যাস্টররা' বলেছে এ-ছেলে দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে, আমার নাতনীর এমন বনেদী ঘরে বিয়ে হয়েছে যে বাপের বাড়িতে বেড়াতে এলেও ঠাকুর-চাকর সঙ্গে নিয়ে আসে -- ইত্যাদি। এসব বহুযুগ আগের কথা। কিন্তু আধুনিক যুগের এই ফেসবুক-নামক সর্বজনীন আড্ডাখানায় যা হয় বলে শুনেছেন, সেটা কি এর থেকে খুব আলাদা? খোলাখুলি পরনিন্দা-পরচর্চা হয়তো হয়না, কিন্তু চোরাগোপ্তা বা ঠারেঠোরে তো চলতেই থাকে। যুগের সঙ্গে তাল রেখে আলোচ্য বিষয়বস্তুর পরিধিও বিশাল -- আহার-বিহার-বিনোদন-প্রসাধন-আবরণ-আভরণ-ফ্যাশন-প্যাশন কিছুই বাদ নেই। আর আত্মপ্রচার? ওরেব্বাবা ! "কাল মুম্বাই হয়ে গোয়ায় পৌঁছেছি। বর্ষায় গোয়ার বীচগুলো কী রোমান্টিক !" (সঙ্গে ছবি)। "ওমা, কী বিউটিফুল ! আমরাও না এখন হানিমুনে কাংড়া ভ্যালীতে। লাহুল-স্পিতি সিম্পলি এক্সকুইসিট।" (সঙ্গে আরো ছবি)। "ইস কী মজা করছিস রে তোরা ! কিন্তু কলকাতার পুজোটাই তো মিস করলি। আমরা তাই আন্দামান থেকে ভাইজ্যাগ হয়ে ষষ্ঠীর আগেই ফিরে এসেছি।" (সঙ্গে গোটা একটা পিকাসা অ্যালবামের লিংক)। "ওরে নাঃ, জনগণ কী মস্তি মারছে ! ওয়েটিং ফর মাই টার্ন। লক্ষ্মীপুজোর দিনই ব্যাংকক ফ্লাই করছি আমরা --"। এরকম চলতে থাকবে, চলতেই থাকবে, ক্রমশঃ বড় হতে থাকা স্নো-বলের মতো। আচ্ছা, এসবে ক্লান্তি আসেনা মানুষের? আসেনা বোধহয়। নাহলে কি আর মুখেভাত হবার আগেই আজকালকার শিশুদের 'মুখেবই` (মানে ফেসবুক একাউন্ট খোলা) হয়ে যায়? তবে নাতিনাতনীদের একটা ব্যাপার জেনে খুব মজা পেয়েছিলেন পঞ্চানন। ওই 'লাইক' করার ব্যাপারটা। চকিতে মনে পড়ে গিয়েছিল "হীরক রাজার দেশে"তে রাতের "ঠিক কিনা?" -- এই প্রশ্নের উত্তরে চাটুকারদের "ঠিক", "ঠিক", "ঠিক"। অথবা ছোটবেলায় ঠাকুমার দ্বিপ্রাহরিক রকের আড্ডায় শোনা "খাঁটি কথা কয়েছ চাটুজ্জে-গিন্নী", "এক্কেরে হক কথা গো বামুনদিদি", ইত্যাদি। পুরোনো জিনিস কেমন নতুন মোড়কে ফিরে ফিরে আসে! 

কিন্তু একা রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর। ওই যে 'ট্যুইটার' না কী যেন। ছোটবেলায় মফস্সলের বাড়ীতে ভোরবেলায় পাখীর কুহু-কাকলিতে ঘুম ভাঙত। তখন কি স্বপ্নেও ভেবেছিলেন এই 'পাখীর ডাক' কালের ফেরে বিশ্বায়িত, জনগনায়িত হয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত করে দেবে? খবরের কাগজে খেলার পাতা আর বিনোদনের পাতার আদ্ধেক জুড়ে সেলিব্রিটিদের ট্যুইট। আই পি এল ক্রিকেট টুর্নামেন্টে কেউ হয়তো পরপর তিনটে ছক্কা মারল, সঙ্গে সঙ্গে বলিউডের কোনো মহারথীর হাত নিশপিশ করে উঠল, ট্যুইটারে মেসেজ গেলো "কেয়াবাত! কেয়াবাত! চালিয়ে যাও গুরু, দুরমুশ করে দাও।" যা দেখে সেই হীরোর লেটেস্ট ছবির হিরোইন আর চুপ করে থাকতে না পেরে "বেশি বাতেলা করোনা ডার্লিং, ঘরের মাঠে সবাই রাজা। আসুক না আমাদের এখানে, দেখ লেঙ্গে !" ব্যস, মুহূর্তে শুরু হয়ে গেল চেন রিঅ্যাকশন। আর 'পাবলিক' নামক সর্বভুক পেটুকটি তো আছেই এসব গোগ্রাসে গেলার জন্য। মিডিয়াও সেরকম -- রাস্তার ধুলোবালিরও যদি মার্কেট ভ্যালু থাকে তাই তুলে এনে ডিশে সাজিয়ে যত্ন করে পরিবেশন করবে কাঁটাচামচ সহকারে। যাইহোক, সেলিব্রিটিদের 'কাকলি-কূজন' নিয়ে আদেখলেপনা নাহয় তাও মানা গেল। কারণ হাজার হলেও তেনারা তারকা, তাঁদের স্টারডাস্ট পেয়ে আমজনতার জীবন ধন্য হয়। রবিঠাকুর বলে গেছেন না,"শুধু তোমার বাণী নয়গো হে বন্ধু হে প্রিয়, মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিও"? তো ওই তারকারাও শুধু রূপালী পর্দায় তেনাদের অমর বাণী (যথা "যো ডর গ্যায়ে সমঝো মোর গ্যায়ে", "আব তেরা কেয়া হোগা কালিয়া?", "মোগাম্বো খুশ হুয়া", "পিকচার আভিভি বাকী হ্যায় দোস্ত", ইত্যাদি) বর্ষণ না করে মাঝে মাঝে ট্যুইটারে জনতার প্রাণে ক্ষণিকের পরশ দিয়ে যান। কিন্তু আমজনতা যখন ট্যুইট করে -- নিজেদের মধ্যে? সে এক অতুলনীয় অভিজ্ঞতা। সকালে হয়তো আপনি চা-টা খেয়ে আরাম করে খবরের কাগজটা নিয়ে বসেছেন, কারো কাছ থেকে ট্যুইট এলো "এইমাত্র বাজার করে ফিরলাম"। তা ফিরলি তো ফিরলি, আমার তাতে কী? আমি কি জানতে চেয়েছি? অতঃপর ট্যুইট, "বাজারে আজ পদ্মার ইলিশ বারোশো টাকা। কিনে আনলাম। " কিনেছিস বেশ করেছিস! পকেটে মাল্লু আছে, চুটিয়ে বাবুগিরি করেছিস, তা নিয়ে ঢ্যাঁড়া পেটানোর কী আছে? সঙ্গে সঙ্গে আবার ট্যুইট, "এখন বাথরুমে ঢুকব।" মহা মুশকিল তো! এরপর বাথরুমে ঢুকে কী করছিস সেটাও কি ট্যুইট করবি? আসলে বাস্তবে যারা নক্ষত্রজগতের বাসিন্দা হতে পারেনি, তারা এইভাবে নিজেদের নক্ষত্র কল্পনা করতে ভালোবাসে -- যেন তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি নড়াচড়া ক্যামেরাবন্দী হয়ে সিনেমা হবে। ট্যুইটগুলো যাদের পাঠানো হচ্ছে তাদের কেমন লাগতে পারে -- সেসব ভাবার কোনো প্রশ্নই নেই। মাঝখান থেকে এই ট্যুইটারের নেশায় পঞ্চাননের নাতিনাতনীর প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ইংরেজী বানান ভুলে যাচ্ছে। ওখানে তো ভাওয়েল-টাওয়েলের বালাই নেই, শব্দের মাঝখানে হঠাৎই সিলেবেল উধাও হয়ে গিয়ে বসে পড়ে সংখ্যা বা বিচিত্র সব চিহ্ন। যেমন বৌমার অনুরোধে একদিন ছোটনাতিকে ইংরেজী ডিকটেশন দিচ্ছিলেন, দেখলেন ছেলেটা তাতে লিখেছে "ILL O8 4 U"। অর্থাৎ কিনা "আই উইল ওয়েট ফর ইউ"। EDUCATION-এর “I” টা বেমালুম বাদ। বলতে গেলে আবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে ফিল্মস্টারি কায়দায় বলবে "ইটস নট ইম্পরট্যান্ট"। হ্যাঁ, সে তো একশোবার -- ট্যুইটারের চেয়ে ইম্পরট্যান্ট বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আর কিছু আছে নাকি?

যদি থাকে, তার নাম ইউটিউব। বিজ্ঞানীরা যে বলেন একজন মানুষের বংশগতি, চেহারা, জৈবিক প্রবৃত্তি, মানসিক গঠন এই সমস্তকিছুর হদিশ পাওয়া যায় তার জেনেটিক কোড থেকে -- ভুল বলেন। আজকাল একজন মানুষের আসল পরিচয় জানা যায় তার ইউটিউব 'ফুটপ্রিন্ট' থেকে। তার জন্মের পরের প্রথম কান্না, অন্নপ্রাশনের প্রথম ভাত খাওয়া, হাতেখড়ির প্রথম অক্ষর, জন্মদিনের পার্টি, পৈতের অনুষ্ঠান, গ্রাজুয়েশন সেরিমনি, বিয়ের গায়েহলুদ, হানিমুন ট্রিপ, সন্তান জন্মানো -- সমস্তকিছু ভিডিও ফুটেজ-রূপে ইউটিউবে গচ্ছিত থাকে। যেন ইউনিভার্সাল ব্যাংকের সেফ ডিপোজিট। কেউ চাইলেই 'ক্যাশ উইথড্র' করে টাটকা টাটকা দেখিয়ে দাও। পঞ্চাননের এখন মনে পড়লে হাসি পায়, প্রথম যখন ইউটিউবের নাম শুনেছিলেন নাতনীর কাছে, ছোট্ট মেয়েটা লাফাতে লাফাতে এসে যখন বলেছিল "দাদু, আমার ইউটিউব দেখেছো? আমার ইউটিউব দেখেছো?", ঠিক বুঝতে পারেননি কিসের কথা জিজ্ঞেস করছে। ভেবেছিলেন হয়তো টুথপেস্ট বা গোঁদের আঠার টিউব-ফিউব হারিয়ে ফেলেছে। বলেছিলেন ওর মায়ের ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারগুলো ভালো করে খুঁজে দেখতে। শুনে সেই একরত্তি মেয়ের কী খিলখিল হাসি ! যাইহোক, এই ইউটিউব জিনিসটা যদি ওঁর ছোটবেলায় থাকতো, বেচারা বড়দা-টার আঙ্গুলগুলো বেঁচে যেত। পঞ্চাননের বড়দা আসলে স্কুলে পড়ার সময় মফস্সলের এক অখ্যাত গুরুর কাছে তবলা শিখতেন। সেই গুরুর কাছে মাঝেমধ্যেই বিখ্যাত তবলচিদের আসাযাওয়া ছিল. তাঁদের কেউ আল্লারাখার শিষ্য, কেউ বা উস্তাদ আলম খানের। হয়তো কোনোদিন গুরুর কাছে বড়দা সবে ঘন্টাতিনেক প্র্যাক্টিস করে উঠেছেন, আঙ্গুলগুলো টনটন করছে। ঠিক সেই সময় হাজির ঐরকম কোনো এক মহাগুরু। ছাত্রের পরিচয় পেয়েই তার পিঠ চাপড়ে "সাব্বাশ বেটা, দিখা তো জরা কেয়া শিখা"। ব্যস, আবার বাবু হয়ে বসে ধা-ধিন-ধিন-ধা না-তিন-তিন-তা -- যতক্ষণ না থামার অনুমতি মিলছে। আজকালকার ছেলে হলে হয়তো স্রেফ বলে দিত, "স্যার, আপনার ইমেল এড্রেসটা দিয়ে দিন, ইউটিউবের লিংকটা ফরওয়ার্ড করে দিচ্ছি -- ওতেই আমার সব রিসাইটাল পার্ফর্মেন্সগুলো আছে, দেখে নেবেন।"

অবশ্য এতকিছুর মধ্যে পঞ্চানন এই খবরও রাখেন যে এহেন ফেসবুক-ট্যুইটার-ইউটিউবের কল্যাণেই আট বছর আগে আরব দুনিয়ায় গণবিপ্লব ছড়িয়ে পড়েছিল দাবানলের মতো। দেশের পর দেশে যদি উল্টেছিলো একনায়কদের। একেই বলে e-গণতন্ত্র। আরো একটা চমকপ্রদ খবর শুনেছিলেন পাড়ার ভবতোষবাবুর বছর-দুয়েক আমেরিকায় কাটিয়ে আসা ছেলের কাছে। নিউইয়র্কে না কোথায় কোন এক প্রেক্ষাগৃহে ট্যুইটারপ্রেমী দর্শকদের জন্য আলাদা করে কিছু আসন নির্দিষ্ট করা থাকে, যেখানে বসে থিয়েটার চলাকালীনই তাঁরা ট্যুইট করে অভিনয় বা অভিনেতা সম্বন্ধে মতামত জানাতে পারেন। শুধু তাই নয়, সেই মন্তব্য অনুসারে দর্শকদের চাহিদা বুঝে তৎক্ষণাৎ বদলে যেতে পারে নাটকের গতিবিধিও। অর্থাৎ ইন্টারএক্টিভ হিস্ট্রিওনিক্স। শুনে ভাবছিলেন পঞ্চানন, এটা সেই শিশির ভাদুড়ী-অহীন্দ্র চৌধুরী-মহেন্দ্র গুপ্তর বা শম্ভু মিত্র-অজিতেশ বাঁড়ুজ্জের যুগে হলে ব্যাপারটা কিরকম দাঁড়াতো? হয়তো কোনো দুঃখের সিনে শিশিরবাবু আবেগমথিত গলায় বলছেন "আমার সাজানো বাগান তছনছ হয়ে গেল"। দর্শকাসনে থেকে চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে কিছু দর্শক ট্যুইট করল, দুঃখের একটু ওভারডোজ হয়ে যাচ্ছে। মেসেজ পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে শিশিরবাবু সামলে নিলেন, "না না, মানে তছনছ হতে যাচ্ছিল, কিন্তু এখনো হয়নি -- আশা আছে"। 

এইসব সাত-পাঁচ সত্তর-পঁচাত্তর ভাবতে ভাবতে প্রথমে অটো তারপর বাসে করে বাড়ী পৌঁছে গেলেন পঞ্চানন। হাতে তখনও আদি ঢাকেশ্বরীর প্যাকেটগুলো ধরা। গিন্নীর হুঁশিয়ারী সত্ত্বেও ভাবলেন একবার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে চোখের দেখা দেখাবেন সবাইকে জিনিসগুলো -- হয়তো পছন্দ হতেও পারে। জুতো-টুতো খুলে ঘরে ঢুকতেই ছোটনাতি কোথা থেকে বোঁ করে দৌড়ে এসে সুর করে বলতে লাগল, "দা-আ-দু, দা-আ-দু, তুমি ধরা পড়ে গেছ, ঠাম্মাকে বলে দেব, বলে দেব।" তটস্থ হয়ে ভাবেন, আবার কী করলাম রে বাবা ! মুখে বললেন, "যা যা, মেলা বকিসনি তো। সামনে উইকলি টেস্ট না? এখন খেলে বেড়াচ্ছিস যে বড়? বলবো মাকে?" একটুও না দমে বাচ্চাটা প্যান্টের পকেট থেকে ফটাস করে বার করলো তার কলেজে পড়া জ্যাঠতুতো দাদার নতুন ব্লাকবেরীটা, কী সব টেপাটেপি করে চোখের সামনে মেলে ধরল জলজ্যান্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ। তিনতলার চিলেকোঠার ছাদে একা পঞ্চানন -- হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। বিচ্ছুর দল কোন ফাঁকে ক্যামেরাবন্দী করে ফেলেছে। হাই ব্লাডপ্রেসার আর হার্টের রুগী পঞ্চাননের যে ও-জিনিস একেবারে বারণ। এখন কী করে সামাল দেওয়া যায়? 

হে ঈশ্বর! কী বিচিত্র তোমার লীলা। নিজের বাড়ীতে নিজের চিলেকোঠার ঘরে নিজের একান্ত নিভৃত মুহূর্তে নিজের লুকোনো প্যাকেটের সিগারেট -- তারও কি একটুখানি অন্তরালের অধিকার নেই? বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি?


লেখক পরিচিতি:
সুজয়
দত্ত ওহায়োর ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাক্রন- পরিসংখ্যানতত্ত্বের (statistics) অধ্যাপক। জৈবপরিসংখ্যান বিশ্লেষণতত্ত্ব (biostatistics) তাঁর গবেষণার বিষয়। তিনি কলকাতার বরানগরের ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন ছাত্র। ছোটগল্প, বড় গল্প, প্রবন্ধ রম্যরচনার পাশাপাশি নিয়মিত কবিতাও লেখেন। এছাড়া করেছেন বহু অনুবাদ -- হিন্দি থেকে বাংলায় এবং বাংলা থেকে ইংরেজিতে।  তিনি হিউস্টনের "প্রবাস বন্ধু" সিনসিনাটির "দুকুল" পত্রিকার সম্পাদনা সহসম্পাদনার কাজও করেছন। এছাড়া শিকাগোর "বাতায়ন" পত্রিকাটির জন্মলগ্ন থেকে সেটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন। এই তিনটি পত্রিকায় প্রকাশিত লেখাগুলি ছাড়াও "অপার বাংলা" নামক ওয়েব-ম্যাগাজিনটিতে আর ভারতের মুম্বাই থেকে প্রকাশিত "কবিতা পরবাসে" নামক বার্ষিক কাব্যগ্রন্থটিতে রয়েছে তাঁর লেখা। সম্প্রতি নিউ জার্সির "আনন্দ মন্দির" তাঁকে "গায়ত্রী  গামার্স স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কারে" সম্মানিত করেছে। সাহিত্যরচনা ছাড়া অন্যান্য নেশা বই পড়া, দেশবিদেশের যন্ত্রসঙ্গীত শোনা কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র বাজানো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন