ছেলেবেলায় খুব মন লাগতাম ভাইফোঁটার উপোষে | মন লাগাতাম মানে ধরুন বেলা নটা কি দশটা পর্যন্ত পেট শুকতাম | সেসময় এত কম সময়ের ব্যবধানে খাওয়ার আগ্রহ তৈরি হতো যে সামান্য সময় না খেয়ে থাকলেই মনে হত পেট শুকিয়ে মাঠ হয়ে যাচ্ছে | তখন আমার কোনো ভাইরা জন্মাননি | ফলে ফোঁটা দিতাম ঠাকুরদাকে | নটা বাজামাত্তর মনে হতো --এবার ঠাকুরদা বড় দেরি করছেন ফোঁটা নিতে |
উফ কখন খাওয়াবেন আমায় ? কথাটা শুনে খুব অবাক হচ্ছেন নিশ্চয় | ভাইফোঁটায় ভাই খাওয়াচ্ছে বোনকে | এমনটাই ছিল আমার ঠাকুরদার স্টাইল | আমার কাছ থেকে তাঁর ফোঁটা নেয়ার দস্তুর | আসনে বসে সুন্দর এক লাল চেলিতে আমাকে পুরো পাকিয়ে নিয়ে খাওয়াতে বসতেন ঠাকুরদা | খিদেতে লুচি মিষ্টি কোনটা কখন কীভাবে খাবো প্রতিবারই গুলিয়ে ফেলতাম | হাসতে হাসতে লাল দৈ এ গরম লুচি চুবিয়ে জিভের ডগায় ধরতেন ঠাকুরদা | উত্তেজনায় চেলি বেনারসিখানি কতবার যে খুলে ধুলোয় গড়াগড়ি দিয়েছে ! ইজের আর টেপ ফ্রকেই চালিয়ে যেতাম লুচির লুঠতরাজ | একবার ভাইফোঁটায় এলো না আমার লাল চেলি | প্রবল অভিমানে ঠাকুরদার থেকে সামান্য দূরে বসে আছি | এখানে একটা কথা বলে নি, খুব রাগ হলেও ঠাকুরদা অশোকের থেকে কখনো বেশি দূর যাইনি | জীবনভোর যাইনি | তাঁর মৃত্যুর পরেও না | বলতে পারেন যাওয়ার সাহসই হয় নি আমার | খালি মনে হতো , প্রিয় অশোকের থেকে দূরে গেলেই গাছবিহীন তপ্ত মাঠে হেঁটে মরতে হবে আমায় | ---তো যেকথা হচ্ছিল | সেদিন ঐ সামান্য দূরে বসেই দেখলাম, গুটিগুটি ঠিক আমারই মতো করে ঠাকুরদার পাশে এসে বসেছে আমাদের কাজের মাসির দুই মেয়ে | শান্তি আর সুধা | তারাও আজ ঠাকুর্দাকে ভাইফোঁটা দেবে | মানে ঠাকুরদার ভাইফোঁটা খাবে | হিংসেতে চুরচুর হতে হতে দেখছিলাম ঠাকুরদার হাত থেকে ঠিক আমারই মতো করে গোগ্রাসে লুচি দই খেতে শুরু করেছে মেয়ে দুটো | গুম খেয়ে আমি | ফোঁটা শেষে ঠাকুরদা আমাদের তিনজনকে দিলেন তিনটে টেপ ফ্রক | সাদা জামায় তিনটে নীল সুতোর হাঁস | তিনটেতেই একরকম পাখি | ফ্রকের জমিন থেকে একই উচ্চতায় উড়ছে তারা | বুঝলাম আমার লাল চেলির টাকায় কেনা | একটার টাকায় তিনটে | লালজরি বদলে তাই তিন নীল হাঁস | হেসে মরছি | তিনজনেই হাসছি তখন | খিলখিলিয়ে | দৌড়োতে দৌড়োতে সোজা মাঠে | মাঠ দাপায় ঠাকুরদাদার তিনবোন | তিন সখী তো ! Sorry ! অশোক মার্ক্সবাদ পড়েননি | না কোনো স্টাম্পড মর্ক্সিস্ট লিটারেচার | নব্য জাতিতোষণ বা জাতিখেদানোয় ( দুটোই এক তো নাকি ? ) কীভাবে react করতেন তা নিয়ে আমি sure | 100 পার্সেন্ট



নিকষ আঁধারে নয় ---ছোটবেলায় ভয় পেতাম শেষ বিকেলে | বিকেল যখন সন্ধ্যের গড়ন নিত ধীরগতিতে | রাত নেমে গেল তো নেমেই গেলো | এবার তাতে ঝুপসি হয়ে থাক বসে | থাকতেই হবে তোমায় | অন্যরকম কিছু ভাবারই উপায় নেই তোমার | কিন্তু এই রে ! এ যে শালা ভূষকালি হয়ে যাচছে এবার গোটা দুনিয়াটা ---দুনিয়ার যত গাছপালা ক্ষেতখামার ---এই হবে হবে ভাবটাতেই ভয় খেতাম | শুধু ভয় নয় আলো ফুরোনোটা কিছুতে মানতে পারতাম না | দমাদম রাগ হত | রাগ একবারে গা মনের ছাল ছাড়িয়ে নিত | আর ভয় খেয়ে যেতে পারি এরকম মনে হলেই একা ফাঁকা হয়ে যেতাম | যাতে আমার ভয় পাওয়াটা কারোর চোখে না পড়ে | মেজাজি বদখত এবং যখন তখন এক হাত নিয়ে নেয়া মেয়ে হিসেবে গাঁ ঘরে যে সোশ্যাল স্টাটাস ছিল আমার , লোকের চোখে সেটি খোয়াতে রাজি ছিলাম না মোটেই | তাই ভয় পেলেই টপ করে সেটি গিলে ফেলতাম | গেলার ফলে ভয় যে আরো ক বিঘত বাইরে বেরিয়ে আসত তা কে বোঝে ! ফাইভ সিক্সের পরীক্ষা দিয়ে গেছি দেশের বাড়িতে | গাছ পাখিতে ভরা আমাদের সেই বাড়িটার পিছনে ছিল এক প্রকাণ্ড প্রান্তর | আমরা ছোটরা বলতাম দৈত্য -দানো প্রান্তর | দৈত্য মাঠের ওপরে এক রেল লাইন | তখন সে লাইন ঝড়তিপড়তি | গাড়ি চলত না তাতে --পড়েই থাকত কেবল | অবশ হতে হতে লাইন মিশে যাচ্ছিল মাঠের সাথে | আমার ছোট ঠাকুরদা তারাপদ কেবল দেখাতেন দুটোকে আলাদা করে | মাথা ঝাঁকাতাম --কই গেল তোমার রেললাইন ? খালি তুমিই দ্যাখো ছোটদাদু ? আর কেউ দেখি না কেন ? বাড়ন্ত ফসল চোখের আড়ালে নিয়ে যাচ্ছে লাইনটাকে --তবু সেটা তোমার দেখা চাইই ? তারাপদ হা হা হাসেন | বোধহয় বলেন ---" যা দেখা যায় কেবল তাই কি ঠিক রে ? " বিরক্ত হতে গিয়েও ভালোবেসে ফেলি তারাপদকে | রোজ রোজ ভালোবাসি | তারাপদ সন্ধের উদ্ভিদ হয়ে অভয় দেন | সাহসী করেন আমায় | সাহস নিয়ে সে সন্ধেতে বসে আছি বাগানের পিছন সীমানায় | ক্ষেতের পাশে গাছের গুড়িতে মাথা সেট করে | বসেই আছি --- হঠাৎ দেখি দূরের লাইন টপকে আসছে এক আবছা মূর্তি | একদম sure আমি --নয় ভুত নয় চোট্টা | determined -- ভয় পাব না এবং গায়ের লোম একচুলও খাড়া করব না | মূর্তি কাছে চলে এল | আসামাত্তর মূর্তির চুলের মুঠি ধরে ঘোরাতে লেগেছি | আচমকা মারে বেশি চেঁচাতেও পারেনি বুড়ি | কাতরাচ্ছে কেবল। দুখে রুখু বুড়িমা | না খেয়ে খেয়ে আরো রোগভোগা হয়ে যাবে এমনই পণ তার | খাবার টাবার খোঁজাখুঁজি করতে গিয়েছিল লাইনের ওপারে | এখন তারাপদর কাছে এসেছে খিদে কমাবার ওষুধ নিতে | বলতে ভুলেছি --আমার ছোটঠাকুরদা ছিলেন ডাক্তার | তবে ওষুধের সাথে পথ্য বিনা পয়সায় বিলোনো ছিল তাঁর নেশা | বকুনি খেতেন সবার কাছে তবু বোকা বোকা হাসতেন --ফের বিলোতেন খাদ্য | সে রাতে বুড়িটাকে প্রচুর বকে তারাপদ তাকে চারটে ডিম দিয়েছিলেন | বুড়ি ফাটিয়ে কাঁচা খেতে যাচ্ছিল | গম্ভীর গলায় তাকে সংযত করলেন চিকিৎসক ঠাকুরদা --" খিদে পেটে অত দ্রুত খেও না | আগে আমার ওষুধটুকু খাও --তারপর এস -আমি সেদ্ধ বানিয়ে দিচ্ছি |" তখন চাঁদ উঠে গেছে | আমার দেখা আবছা প্রেত মানুষের মত ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে | হাতের ডিমগুলো দেখছে আর বড্ড কাঁদছে গো | জোছনা লেগে আরো সাদা দেখাচ্ছে ডিমের খোলা | কটকটে সাদা | তারাপদর চোখে শ্বেত স্রোত --- " ওরে যা চোখে দেখা যায় তাই কি কেবল ---? "-- হে তারাপদ ! আপনি বোধহয় জেনে গেলেন না সেরাতে কত ভালোবেসেছিল আপনাকে ময়ূরাবতী | please --আমায় দিয়ে যান আপনার সেই দুটো চোখ ! যা দিয়ে আপনিই কেবল দেখতে পান দেশের অমোঘ সত্যকে !



লাভলী | লাভলী | আমার স্কুলের ছাত্রী | এই ডাউন সিনড্রোম বাচ্চাটি তার স্বাভাবিক স্বভাব মাধুর্যে অচেনাকে কাছে টানতে পারে মাত্তর পাঁচ মিনিটের মধ্যে | স্বল্প বুদ্ধি --হৃদয় পর্বত | কী বলব আপনাদের ---স্রেফ এনতার চুমু মেরে মেরেই এই কাজটি করে ফেলে সে | নিজে ফতুর হয় , ভরপুর করে উল্টোদিকের চুমু ভর্তি গাল নিয়ে বসে থাকা মানুষগুলোকে | কাল লাভলী ক্লাসে খেলছিল আরেকটি বাচ্চার সাথে | ও হ্যাঁ ,এখানে বলে রাখি ক্লাসে লাভলীর খেলে বেড়ানো ,দিদিমনিদের কাপে ফুড়ুক ফুড়ুক চা খাওয়া আজকাল আর কোনো খবর নয় | বরং সে যেদিন সামান্য পরিমানে খাতাবইয়ে মনযোগী হয় ,সেদিন লাভলী খবর হয় সারা স্কুলপাড়ায় | তো কাল তুমুল বাঁদরামোর "মোমেন্ট এন্ড মুডে " সহপাঠীকে নিয়ে দুম করে মাটিতে পড়ে গেল লাভলী | পড়ে গিয়ে তার ঝাক্কাস চোখদুটো আরো ডাগর হয়ে উঠলো | বুঝলাম , প্রচন্ড লেগেছে লাভলীর | লাভলী ভাই এমনই | যন্ত্রনায় আনন্দে ফেস কাটিং সেম রেখে দেবে একদম | মিষ্টতায় বহর তার এমনই বেশি যে আপনি ধরতেই পারবেন না কোনটায় লাভলী লুব্ধ বেশি ? বা কোনটা লাভলীর কাছে বেশি লোভনীয় ? সুখ না দুখ ? কালও পড়ে গিয়ে নিজে এত ব্যাথা পেলো ! অথচ উঠে পড়ল ঝটপট | যেন আঘাত ভোলার বিরাট তাড়া আছে তার | ড্যাম স্মার্ট ভঙ্গিতে জাস্ট দুবার ছোট্ট হাতদুটো ঝাঁকাল | মনে হলো , সকালের প্রথম রোদ্দুরে ছাদের আলসের পায়রা নাচল | আর তারপরই হেসে জড়িয়ে ধরলো তার সহপাঠীকে ,মানে যাকে নিয়ে সে পড়ে গেছিল | তাকে কত কত আদর করে চলল লাভলী | হাসলো | তার চুল ঘেঁটে দিলো | নিজে নিজে গল্প বানিয়ে ভোলাল তার বন্ধুকে | সবচেয়ে হতবাক হলাম যখন দেখলাম, লাভলীর আদর পেয়ে অন্য বাচ্চাটা কেমন আঁকড়ে ধরেছে তার বন্ধুকে | একটুও কাঁদছে না ,একটুও চেঁচাচ্ছে না সেই অন্য হাইপার একটিভ ছেলেটা | অনেকটা ক্ষন দুজনে দুজনকে জড়িয়ে বসে রইল লাভলী আর লাভলী-সখা | দুজনের কেউই মাকে বা আমাদেরকে ডাকলো না | ভ্রূক্ষেপই করল না | ছাদটা এখন রোদে ভরা | তাতে খেলছে শত পায়রা |


ইদানিং আমার দিনগুলো চলছে , অনেকটা ভাদ্রের বাদলবেলার মত | এই বৃষ্টি তো এই রোদ | এই বিষাদ তো এই হর্ষ | উল্লাস আর উল্লাস | বলতেই পারেন ,ওহে ময়ূরা এ আর নতুন কী ? কী এমন নতুন ঘটল তোমার জীবনে ? সোনা আর লোহার পরতে পরতে মোড়া এ জীবন তো আমাদের সবারই | তা হবে ! হবে তাই | ----তাই আজ দিনটা আচনক কেমন ভালোবাসায় গামাখামাখি হয়ে গেল | সকালটায় অবসাদে ভরে ছিলাম | ভালো লাগছিলো না | মোটেও ভালো লাগছিলো না আমার | অনেকক্ষন ধরে দাঁত মেজে আর একফোঁটা চান না করে গেলাম স্কুলে | মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম ,পড়া না পারলেই সের দরে কিলোবো সবকটাকে | ক্লাসে ঢুকলো অর্পিতা | ডাক্তারি মতে intellectually challenged এবং ডাউন সিনড্রোম | ঢুকে সে নিজের নির্দিষ্ট টুলে বসলো আর আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসলো | বিরক্ত হয়ে মুখ ঘোরালাম | আজই এত হাসতে হবে তোকে ? দেখছিস মনমগজ কিচ্ছু ঠিক নেই আমার ! মনে মনে যখন এসব বকছিলাম ,দেখি দূর থেকে মন দিয়ে আমাকে দেখে যাচ্ছে সে | ফট করে উঠে এসে আমার গালে দুটো চুম্মা দিয়ে ফের নিজের সিটে ফিরল | অন্যদিন দেয় না ,আজ দিলো চুমুগুলো | তারপর ব্যাগ থেকে দুটো বিস্কুটের প্যাকেট খুলে সবাইকে দিতে লাগলো | দিদিমণিদেরও | খিঁচিয়ে বললাম --" জন্মদিন" ? বললে --"-না সবাইকে নিয়ে আজ খাব |" কথাগুলো শুনে অবাক হলাম | 'সবাইকে দিয়ে ' বলার পরিবর্তে কেমন মিষ্টি করে বললে " সবাইকে নিয়ে " | ছেলেমানুষ তো | সবাইকে নিয়ে খাবে বলেছে বটে কিন্তু সবাইয়ের মধ্যে ভাগের হিসেব ঠিক করতে পারেনি বেচারা | নিজের জন্য কেবল একটি কমলা ক্রিম বিস্কুট রেখে সব বিলিয়ে দিলো সাথীদের | এই রে ! বেলা বারোটায় ঢুকলো দুটো লেট লতিফ ছাত্র | রাবণের হাসি হেসে বললাম --" এবার কী করবি রে অর্পি ?" নিমেষে নিজের বিস্কুটটা ডেস্কে ফেলে স্কেল মেরে দুই টুকরো করে ফেলল সে | দিয়ে দিলো তার শেষ দুই সাথীকে | ছোট আঙুলের ফাঁকে লেগে থাকা কমলা ক্রীমটুকু মাত্র নিজের জন্য রাখলো সে | সব দিয়ে দিলো রে আমার মেয়েটা | দিয়ে আরো জোর জোর হাসতে লাগল | হাসতেই লাগলো | মেয়েটা যে আমার দুপুরটাকে চিটেগুড় বানিয়ে ছাড়লো রে |পাল্লা দিয়ে চুমু খাই তোকে !




এক মানুষ দুখ দেয় | অন্য মানুষ জল মোছে | দৃঢ় হাতে ঘষে ঘষে তুলে ফেলে জলছবি | উজ্বল হয় নতুন হর্ষ | কাল রাতভোর বিচ্ছিরি কান্নার কিরিকিরি চলছিল আমার | কান্নার কিরিকিরি --এ শব্দ আমার | কান্না থেকে বেরোতে না পারলেই এই সব পিকুইলিয়ার শব্দ বুনি আমি | নিজের শব্দে নিজেকে গাল পাড়ি | তো আজ সকাল অব্দি চলল সে গ্লানি | বেশ খানিকটা বেলা গেলে প্রিয় মানুষের নতুন সম্বোধন এল | সাজলাম | গহনায় নয় | আনন্দে | সাজতে সাজতে মনে হল ----" ওহ ! দুদিন বাদে সরস্বতী পুজো | আজই তো স্কুলের পুজোর বাজার সারতে হবে | বাচ্চাদের বেখাপ্পা পছন্দের মিষ্টান্ন --কদমা , রঙিন মঠ , তিলের নাড়ু বেশি বেশি করে কিনতে হবে | শসা , আপেল ইত্যাদি ফালতু ( শিশুর মতামতে ) পুষ্টিকর ফল কম | আর একটি মায়াময় দেবীমূর্তি -- যে কিনা তার নরম দুটো নয়নে চেয়ে থাকে শিশুর পাঠবইয়ে | কতকাল ধরে যে সে চেয়ে আছে শিক্ষরত মানুষের পানে ! হাঁটছি বাজারে | হঠাৎ -----| অদূরে অপূর্ব এক মূর্তি | মহানাস্তিকও যাকে পুতুল না ভেবে দেবী ভেবে সুখ পায় | ঠোঁট দুটো কী আদুরে কী আদুরে ! সবুজ আর হলদে আভায় কী সপ্রতিভ দেবীর মুখ ! দর শুরু হল | সাতশো টাকা | সঠিক দামই বলেছেন দোকানি | আর সঠিক বলছেন বলেই দাম কমাবার ব্যাপারে একেবারেই রাজি হলেন না | বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও না | শেষে |একবার কেবল বললাম ---" ভাই এটা একটা প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের স্কুল | আমাদের অত টাকার বাজেট নয় |" ---" অন্য ঠাকুর নিন " | বললাম ---" এই ঠাকুরটার দুরকম রঙের মিশেল ওরা খুব ভালোবাসবে | জানেন ভাই , এ সব বাচ্চা রঙের রকমারি খুব ভালোবাসে |" ঘন ঘন মাথা নাড়া চলছে দোকানির | রাফ টাফ কথাও বলে চলেছেন | যতদুর মনে হয় --শেষ কথাগুলো নিজের মনেই বলতে বলতে চলে যাচ্ছিলাম | চলে যাচ্ছিলাম দেবীকে ছেড়ে | বিক্রেতাকেও ছেড়ে অনেকটা দূরে যখন ---দেখি মাথা নাড়া বন্ধ করে স্থির চোখে আমার দিকে চেয়ে আছেন | দৌড়ে এসে আমার হাতটা চেপে ধরলেন |----" দিদি আমার বাচ্চাটাও তো এরকম হতে পারত ! আপনি ওই দামেই নিয়ে যান | এই মুর্তিটাই নিয়ে যান | দাঁড়ান --সাজগুলো পরিয়ে দি ! " দেখলাম --- নারাজ দোকানি উত্তেজনায় থরথর | কমকরে শ চারেক লোকসান দিয়ে কাঁপা হাতে আরো আরো রঙের গয়না পরিয়ে দিচ্ছেন | বাচ্চারা রঙ ভালোবাসে কিনা | ঠাকুর নিয়ে রাস্তার এপারে দাঁড়িয়ে ফল কিনছি | --কে যেন দেখছে আমায় ! চোখ তুলে দেখি ---ওপারে দোকানি | পথের অগুনতি মানুষের ফাঁক দিয়ে দুই চোখ তাঁর হাসছে | রাফটাফ চোখে এখন খুব প্রীতি ! খুব | আমার দেবতা হাসে | ভক্ত দেখে | হাঁ হয়ে দেখে | ময়ূরা এতো ক্যালাস তুই ? একটা নমস্কার করে আসবি তো | -- বাক্সে তোল আজকের পাঠ | ভাগ যা ইঁদুরের পাল | 



মলটোভা গোলা হালকা গরম দুধের মতো সামান্য হলকা | সাথে ত্যাদোড় হাওয়া | বড় মিঠাই বাতাস | ছোটবেলায় এমন হাওয়া উঠলে বলতাম --" মা কী হাবা গো ! " 

টাকিতে থিয়েটার ক্যাম্প ও ওয়ার্কশপে এসেছি | থিয়েটারে নির্জনতা কল্পনা তৈরিতে সাহায্য করে -- এমন এক বিশ্বাস নিয়ে এসেছি আমি ও নোটো থিয়েটারের সব কর্মীরা |দুপুরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি এপার নদীতে | ইছামতীর ওপারে বাংলাদেশের ঝালমিঠে জঙ্গল। | এপারে ভেসে আসছে ওপরের সুফিগান | কীর্তনের সামান্য প্রভাব ছিল তাতে | মায়া জাগছিল শুনতে শুনতে | অমরদাকে বললাম -- " এপারে সুর পৌঁছয় | তবু দেশটায় যেতে পারব না ?" অমর চট্টপাধ্যায়ের কাঠখোট্টা উত্তর ---" বেড়াতে যাবে | তারপর ফিরে আসবে |" নোটো থিয়েটারের যুগমনির্দেশক অমর মাঝে মাঝে এমন বিরক্তিকর সত্য বলেন | গান ছেড়ে পিছু ফিরলাম | ভারতের দিকে | বিকেলে দিপানজন জিজ্ঞেস করলে মাঝিকে --নদীর মাঝ অব্দি গিয়ে কেন নৌকা ফেরাচ্ছেন ভারতের দিকে ? আরেকটু চলুন please |" -------- " আর তো যাওয়া যাবে না দাদা | হাফ জল ওদের |" অবাক আমাদের সবচেয়ে যুক্তিবাদী কর্মী --- " মাটি ভাগ জানি জলভুমিও ভাগ ? আমরা তো ওদের বন্ধু দেশ ---তাও আরেকটু এগোনো যাবে না ? নিশ্চয় আরেকটু এগোনো যাবে --- ! " স্বপন দেখা যুবকটিকে তখন কে বোঝায় --" ওরে দিপাজন মাঝি ভাগ | হাল ভাগ | দাঁড় ভাগ | সব পাউরুটির স্লাইস | -----? " ফেরার পথটা টাকির হোটেলগুলোর দিকে মুখ করে বসে রইল দিপানজন | হোটেল নৌকার দূরত্ব কমে নিঃশেষ হল | তাও ঐভাবেই রইল | ওই সেই ভারতের উৎকট রঙিন হোটেলগুলোর দিকে তাকিয়ে | অভিমান না হতাশা তা বুঝিনি | নাকি দুইয়ে মিলে তিননম্বর কোনো অনুভূতি ? সন্ধেরাতের আকাশতল | ছাদে নোটোর ক্যাম্প চলছে | একটা গোটা চাঁদ । ওমা কী হাবা কী হাবা ! পূর্ণ শ্বাস নেয়া শেখাতে লাগলেন অমর চট্টপাধ্যায় | প্রশ্বাস পরিপূর্ণ | সত্য স্বদেশ | ছাদে দাঁড়িয়ে নদীর ধারের দেশের মানুষগুলোকে পুতুল পুতুল লাগছিল | মনে হল --- নদীর ধারে শ্যামল ঘাসে পুতুল ফেঁদেছে কোনো আরেক থিয়েটার | লোভ বললে : একটা ছবি নে মনে|






লেখক পরিচিত

ডঃ ময়ূরী মিত্র
শিশুশিক্ষিকা ,নাট্যনির্দেশক , অভিনেত্রী এবং প্রাবন্ধিক| নাট্য গবেষক। কোলকাতায় থাকেন।
অধ্যাপক পবিত্র সরকারের তত্বাবধানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 2009 এ Phd ডিগ্রি লাভ | গবেষণার বিষয় ---" ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাঙালি মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক উত্তরণ ও নাটকে রাজনীতি " --সিপাহী বিদ্রোহ থেকে স্বদেশী আন্দোলন।