বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

তন্বী হালদারের গল্পঃ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

আজ কেমন আছো?

বহু কথার ফাঁকে ওর কাছে আলগোছে এই কথাটি ছুড়ে দিতে আমার বছরের পর বছর কেটে গেল। সময় বড় দীর্ঘ। দীর্ঘ তার পিছল শরীর। একবার পিছলে গেলে আর ধরা যায় না। প্রমোশনের পর থেকে অফিসের কাজের চাপ বাড়ছিল। নিখিল অবশ্য আমাকে বারবারই বলতো - ঘরে বাইরে এত চাপ সামলাতে পারবে মিনু?


তখন টাকার প্রয়োজন ছিল খুব বেশি, তাই বলেছিলাম খুব পারবো। ঢল নামা জীবনে যৌবন খুঁজতে যাওয়া প্রায় অদ্ভুত এক অঘটন। যদিও তা ছিল আমাদের কাছে একটা অভ্যাস। শুধু অভ্যাস নয়, অসহ্য অভ্যাস। নিখিল কষ্ট ভুলতে চাইতো, অথচ আমি পাশে দাঁড়িয়ে কখনও আহা-উঁহু গোছের শব্দও করতাম না। একটা সময়ের পরে রোজ এসে জিজ্ঞাসা করতেও ভুলে যেতে চাইতাম যে, সে কেমন আছে।

অস্বীকার করবো না, শেষের দিকে আমি সত্যিই পারছিলাম না। শরীরে মনে হাঁপিয়ে উঠছিলাম। আসলে একজন সুস্থ মানুষের প্রত্যাশা আর অসুস্থ মানুষের প্রত্যাশা এক নয়। নিখিল যে ঠিক কী চাইতো আমার কাছে, শেষের দিকে আমি ঠিক বুঝতে পারতাম না অথবা বুঝতে চাইতাম না। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর আমার শরীর তখন নিরবচ্ছিন্ন বিশ্রাম চাইতো। ঘুমের জলে ভেসে যেতে চাইতো ক্লান্ত অবসন্ন শরীর। তখন আমার পাশে শুয়ে কে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তা আমি আর দেখতে পেতাম না বা ইচ্ছাও করতো না।

বাড়ির লোকেরা, বিশেষত মা ছিল খুবই গোঁড়া ধরনের মহিলা। মা’কে এড়িয়ে থাকার জন্য বাবা দিন-রাত অফিস, তাসের আড্ডা কিংবা নিমুকাকুর তেলেভাজার দোকানে পড়ে থাকতো। বাবা যত বেশি তাসের রং চিনতো মা তত বেশি ছোঁয়াছুঁয়ি, পুজোআর্চা, রাশিগ্রহ নিয়ে ব্যস্ত। আমরা তখন তিন বোন— রাণু, ঝুনু, মিনু। বড়দির থেকে পনেরো, আমার থেকে আট বছরের ছোট বুনু যখন এলো, বাবার তখন রিটায়ারের চার বছর বাকি। মা’র বাতিকগ্রস্ত রোগ তখন তুঙ্গে। সে-বছর ভীষণ ঠাণ্ডা পড়েছিল, মা হাসপাতালের ফ্রি-বেডে বুনুকে জন্ম দিয়ে দু’দিনের মাথায় বাড়ি এসে বড়দির কোলে।

কড়ার পুটুলিসুদ্ধ বুনুকে দিয়ে পুকুরে স্নান করতে গেল। রাত্রে কাঁপিয়ে জ্বর এলো। চারদিনের মাথায় গলির মোড়ের হোমিওপ্যাথকাকু স্টেথো দিয়ে দেখেটেখে বললো, ও নগেন, একবার হাসপাতালে নাও, মন করি ম্যালেরিয়া। বাবার তখন ওভারটাইম চলছে। বড়দি আঁতুড়, সংসার, ঝুনু ও আমাকে সামলায়। মাকে তাই আর হাসপাতালে নেওয়া হলো না। এগারো দিনের মাথায় মা হঠাৎ করে বুনুকে বুকের দুধ খাওয়াতে চায়। বড়দি মাকে সাবু খাওয়াতে এসে প্রথম টের পায় মা আর নেই। মানুষের মরে যাওয়াটা তখন আমি খুব ভালো বুঝিনি। আমাদের তিনজনকে বুকে জড়িয়ে বড়দির চিৎকার করে কান্না। বাবা অভ্যাসমতো নিমুকাকুর তেলেভাজার দোকানে তখন চা-মুড়ি-তেলেভাজা খেতে গেলে, নিমুকাকু বলে — আজ সোজা বাড়ি যান দাদা। আপনার বাড়িতে এখন বিপদ। বাবা আঘাত পাবে বলে সত্যিকথাটা তাকে কেউ বলে না। বিপদটা ঠিক কী জানবার জন্য বাবা আড্ডায় গিয়ে হাজির হয়। বাবাকে দেখে মাধোকাকু বুক চাপড়ে কেঁদে ওঠে — নগেনদা, বৌদি আর নেই!

বাবা সেই প্রথম তাসের আড্ডা থেকে মাধোকাকুর সঙ্গে রিক্সায় বাড়ি ফেরে। বাবাকে দেখে আমরা তিন বোনই কাঁদতে শুরু করি। বুনু শুধু বিছানায় ঘুমিয়ে থাকে। পাড়ার কিছু লোক ও মাধোকাকু মিলে মাকে মাঝরাতে শ্মশানে নিয়ে যায়। মুখাগ্নির জন্য বাবাকেও সঙ্গে নেয় প্রায় জোর করেই। আধো-আধো ঘুমে তখন আমি আর ঝুনু আচ্ছন্ন। বড়দি আমাদের দু'জনকে টেনে তোলে —
বলো হরি, হরিবোল, বলো হরি, হরিবোল — আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে যায়।

ঝুনু বড়দির কোলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। বড়দি সান্ত্বনা দেয় — কাঁদিস না আমি তো আছি।

আমি ব’সে ব’সে ঢুলছিলাম। বড়দি আমাকে বুনুর পাশে শুয়ে পড়তে বলে।

রাত ভোর ক’রে মাধোকাকুর সঙ্গে বাবা ফিরে আসে। মাধোকাকুই হবিষ্যির জন্য সবকিছু এনেছিল।

বাবা বড়দিকে ডেকে বলে — রাণু, আমার খুব ঘুম পেয়েছে, একটু বিছানা ক’রে দিবি মা! আর, ওই বাচ্চাটাকে আমার সামনে কোনোদিন আনবি না।
নিখিলের সঙ্গে অনেকদিন আগে থেকেই আমার জীবন শুরু। সমবয়সী ক্লাশমেট নিখিলকে কেন যে জীবনে গ্রহণ করেছিলাম এ-সব প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব আজ আর আমার কাছে নেই। নিখিলকে আমি ভালোবেসেছিলাম, না, নিখিল আমাকে ভালোবেসেছিল সে বোধও ধোঁয়াশা আজ আমার কাছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে, চিকিৎসাবিদ্যার উন্নতিতে মানুষের মৃত্যু এখন অনেকটাই আমাদের জানা। কোন্‌অসুখ করলে কতদিন বাঁচে, কী ধরনের ট্রিটমেন্ট, কত খরচ, সমস্ত হিসেবনিকেশ, মনে-মনে ছক ক’ষে নিখিল আমার কাছে একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। অথচ নিখিলের সঙ্গে অনেক-অনেক আগের জীবনে, যখন স্বপ্ন দেখে দিন কাটাতাম অথবা জলতরঙ্গের টুংটাং ছন্দে জীবনকে সাজাতে চাইতাম তখন কিন্তু আমার মনে হয়নি— নিখিল অসুস্থ। ভীষণ কথা বলতো নিখিল, থেকে-থেকেই দরাজ গলায় রবিঠাকুরের গান গেয়ে উঠতো। কবিতা লিখতো। মিলের পুকুরধারে পাটক্ষেতের আলে আমাকে একলা পেলেই যখন হামলে পড়ে চুমু খেতো, তখনও কি ওর ভিতর এই অসুখটা ছিল? কী জানি, হয়তো ছিল কিংবা না। আমি নিখিলের অসুখকে ভুলে থাকার ছলে কি নিখিলকে ভুলতে চেষ্টা করতাম? কে জানে, কিছুই এখন আর ভাবতে পারি না। বাস্তবটা যে কাচবাক্সে রাখা খটমটে নামের কতগুলো রঙিন মাছ, এটা আমি অনেক পরে বুঝেছিলাম। তখন দিল্লি বহুৎ দূর। তাই নিখিল নামের মানুষটি একসময় আমার কাছে নেহাতই অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বাচ্চার হোম্‌টাস্ক করানোর মতোনিত্যকার ব্যাপার। আসলে মানুষ-মানুষীর সম্পর্কের মোড়কের উপরকার রাংতা যখন উঠে যায় তখন শুধু অভ্যাস, আর এই অভ্যাসের থেকে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু বোধহয় আর কিছু নেই। এখন আমার কাছে একটা প্রশ্ন খুব বিসদৃশ চেহারায় দেখা দেয়। কে কার কাছে ছিলাম? নিখিল আমার কাছে, না, আমি নিখিলের কাছে? পুরোটাই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

মা ম’রে যাওয়ার পর থেকে এগারো দিনের বুনু প্রায় সম্পূর্ণ আমাদের দখলে। বড়দিকে দেখতাম, প্রদীপের আগুনে ওর নাভি সেঁকে দিতো। কাজলের বড় টিপ পরাতো। মা’র পুরোনো শাড়ি কেটে কেটে খানকতক ন্যাকড়ার জামা বানিয়ে দিয়েছিল। ছড়া বলে বলে ঘুম পাড়াতো বুনুকে।

সত্যিই সেই সময় সংসারের তহবিলের খাজনা জোগাতে বাবাকে হিমশিম খেতে হতো। ঝুনু নাকি একদিন লুকিয়ে-লুকিয়ে দেখেছিল, বড়দি বুনুর কান্না থামাতে না-পেরে নিজের বুকের দুধ বুনুর গালে ভ’রে দিচ্ছে। ভোর হলে যেমন আঁধার আসবে, পরতে পরতে যেমন সময় চল্‌কে পড়ে, বুনুও তেমনি একটু-একটু করে বেড়ে ওঠে। অ্যামিবার মতো শরীর ছোট করে মাধোকাকুও একটু-একটু করে এ-সংসারের একজন হয়ে ওঠে। মায়ের শ্রাদ্ধের পর বাবা নাকি একদিন তাসের আড্ডায় গিয়ে বুনুর জন্মকে কেন্দ্র করে ভয়ানক অপমানিত হয়। তারপর থেকে বাবা আর তাসের আড্ডায় যেত না। অফিস থেকে সোজা বাড়ি চলে আসত। মাধোকাকু চুপিচুপি কার্মোজাইমের শিশিতে বাবার জন্য রাম এনে দিত। সেই রাম খেয়ে রাতে বাবার ভালো ঘুম হত। একটু একটু করে দখল নিতে নিতে মাধোকাকু এই সংসারের প্রধান হয়ে ওঠে। বড়দি একদিন বুনুকে বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় ঘুম পাড়াচ্ছে আর মাধোকাকু বড়দির আঁচল সরে যাওয়া বুকে ব্লাউজের উপর থেকে টোকা মারছে - ঝুনু সেই দৃশ্য দরজার আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিল। এমন সময় মাধোকাকুর সঙ্গে ঝুনুর চোখাচোখি হয়ে যেতে ক’ষে এক থাপ্পড় খেয়েছিল ঝুনু সেদিন। আমাদের বোনেদের মধ্যে বুনু ছিল সবথেকে সুন্দর। টকটকে রং, গোল মুখ, ভাসা ভাসা চোখ, একমাথা কোকড়ানো চুল। পাড়ার লোকে বলতো ঝুনু নাকি ঠাকুরদার মতো দেখতে। আমি অবশ্য ঠাকুরদাকে দেখিনি; আমার জন্মের আগেই তিনি গত হয়েছিলেন। বুনুর মুখে ভাত দেওয়াকে কেন্দ্র করে বড়দির সঙ্গে বাবার একদিন তুমুল ঝগড়া হলে। বুনুর যে-কোনো ব্যাপারে বড়দি অসম্ভব দুর্বল ছিল। সেই বুনুর ছোট্ট পাখির মতো শরীরটা দিনকে দিন হলুদ হয়ে আসছে। বড়দি একদিন বুনুকে বুকে করে হোমিওপ্যাথকাকুর কাছে গেল। হোমিওপ্যাথকাকু ওষুধ দিয়ে বললেন — জন্মের পর থেকে মায়ের দুধ পড়েনি পেটে, দ্যাখ্‌ কী হয়।

সেই একরত্তি হাড়-জিরজিরে বুনু দিনের পর দিন ফিকে হলুদ থেকে ক্রমশ গাঢ় হলুদ হয়ে গেল। তারপর একদিন সন্ধ্যাবেলা হিক্কা টেনে মরে গেল। বুনুর আর ভাত খাওয়া হল না। বুনুর মৃত্যুতে বড়দি তখন শোকে পাথর। তিনদিন তিনরাত শুয়েছিল। মাধোকাকুই বুনুকে নদীর তীরে মাটি দিয়ে আসে। যাওয়ার আগে বাবাকে ডেকে বলে — একটিবার দেখবা নাকি নগেনদা?

বাবা জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে - না।

নিখিল যেন ভুলে থাকতে চাইতো তার কোনো অসুখ আছে। এই আপাত-ভোলার মাঝে প্রাণপণে বিশ্বাস করতো সে সুস্থ। একবার বিশ্বাস গড়ে উঠলে বিশ্বাস ছাড়া বাঁচা যায় না। নিখিল বাঁচবে আরও অনেক দিন, লড়াই করেই বাঁচবে। বিশ্বাসের এই শক্ত জমিটাই আমরা যেন চেয়েছিলাম। বিয়ের দু’বছর পর থেকেই জীবনের সব স্বাচ্ছন্দ্যবোধগুলোই হারিয়ে ফেলেছিল নিখিল। শোওয়া, বসা, কথা বলা কোনো ভঙ্গিতেই স্বস্তি বোধ করতো না নিখিল। গড়িয়ে শুয়ে পড়লে মনে হতো এইবার বুঝি একটু আরাম পাবে। আর তখনই শুরু হতো শ্বাসকষ্ট। ঘাড়ে মাথায় কোমরে বালিশ গুঁজে স্বস্তি পাওয়ার প্রাণান্ত প্রয়াস চলতো। উঠতে অনেক সময় লাগতো। উঠে দাঁড়ালে হাঁটতে পারতো না। একটু ঝুঁকে ঝুঁকে দুলে দুলে যদিও-বা কয়েক পা চলতো তারপরেই মুখ থেকে গ্যাঁজলা বের হতো। নিখিলকে একলা রেখে আমার অফিস যাওয়া। শেষের দিকে কয়েক মাস জোর করে একজন আয়া রেখেছিলাম, নিখিল তাতে খুব বিরক্ত হয়ে বলতো, “মিনু, তুমি শুধু শুধু পয়সা নষ্ট করছো।”

রেনি-ডে হ’লে আজকাল স্কুলগুলো ছুটি হয়ে যায় কিনা জানি না, আমাদের সময় হতো। ঝুনু আর আমি একই স্কুলে পড়লেও বাড়ি ফেরার সময় ও আমার সঙ্গে কিছুদূর এসে অন্য রাস্তা ধরতো। সেদিনটাও ছিল রেনি-ডে। উঠোনে পা দিয়েই বড়দির কান্না শুনলাম। গোঙানির স্বরে বিকৃত গলায় মাধোকাকুকে বড়দি যেন কী-সব বলছে। আমি পায়ে পায়ে চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছি। দিদির কী একটা কথার উত্তরে মাধোকাকু ঠাস্‌ ক’রে চড় মারে বড়দিকে। তারপরে হঠাৎ করে দু’জনেই আমার দিকে ভয় পাওয়া চোখে তাকায়। মাধোকাকু মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে হন্‌ হন্‌ করে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। বড়দি দিনের পর দিন ঝিমিয়ে যেতে থাকে। মাঝেমধ্যে বমি করে। বাবার কাছে, একদিন শুনলাম — মাধোকাকু নাকি দেগঙ্গায় জেরক্সের দোকান খুলতে চলে গেছে। ঝুনু একদিন রাত্রে বিছানায় শুয়ে আমাকে খিলখিল করে হেসে বলে - জানিস, বড়দির পেটে বাচ্চা এসেছে!

শেষের দিকে নিখিল আমার সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করতো। বিয়ের বছর-দুই পরে যখন নিখিলের শরীর ভাঙতে শুরু করলো, তারপর আরও পাঁচ বছর বেঁচেছিল। এই সময়ের মধ্যে নিখিলের সঙ্গে আমার কোনোরকম শারীরিক সম্পর্ক ছিল না। প্রবল উৎসাহে আমার কাছে আসা নিখিলের পক্ষে তখন সম্ভব ছিল না। কিছুতেই চাইতো না আমাকে ওর কাছে আসতে দিতে। কিন্তু প্রথম অবস্থায় এমনটা ছিল না। এগারো ক্লাশ থেকে নিখিল আর আমি একসঙ্গে পড়েছি। কলেজ-ইউনিভার্সিটি সব জায়গায় নিখিল আর আমি কখনও আলাদা হবো ভাবতেই পারিনি। একজন দুরন্ত দামাল ছেলের একমাত্র নির্ভরযোগ্য বিশ্বাসযোগ্য আশ্রয় ছিলাম আমি। আমাদের বন্ধুরাও কখনও অবাক হয়নি আমাদের এই নিবিড় সম্পর্ক দেখে, যেন এটাই ছিল ভবিতব্য। সেই নিখিল আর আমি একে-অপরের কাছে দুঃসহ অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলাম। নিখিলের মৃত্যু হবে জানতাম, আর জানতাম বলেই যেন কাউন্টডাউন শুরু করে দিয়েছিলাম। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ — সংসারে-সমাজে যতটা প্রয়োজনীয়; ঠিক ততটাই অপ্রয়োজনীয় একজন রোগজৰ্জর অসুস্থ মানুষ। বিয়ের দু’বছরের মধ্যে সব আলো নিভে যাবে, এ আমি কীভাবে মেনে নেবো? অসহ্য মৃত্যুর অপেক্ষা। যন্ত্রণার লালা গড়িয়ে পড়া ক্লেদ আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। নিখিল কি বুঝতে পারতো? জানি না। আমি যথাসাধ্য অভিনয় করতাম। নিখিলও তো আমায় সহ্য করতে পারতোনা। আমার সুস্থ সজীব হয়ে বেঁচে থাকাকে ও যেন ঘৃণা করতো, তামাশা করতো।


হঠাৎ করেই বড়দি একদিন গলায় দড়ি দেয়। পোস্টমর্টেমের পর পাড়ায় পাড়ায় রাষ্ট্র হয়ে গেল বড়দির পেটের সুপ্ত ভ্রূণটির কথা। বড়দি মরে গিয়ে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল আমাদেরকে। বাবা যেন আরও ন্যুজ আরও বৃদ্ধ হতে থাকে। বয়সের ভারে বাবা ভুল বকতে থাকে। ঝুনু আরও আরও সুন্দর হতে থাকে। স্ফটিক পাত্রে রাখা বেলকুঁড়ির মতো ফুটতে থাকে। আমার কিন্তু এখন খুব মনে পড়ে বাবার ভুল বকতে থাকা সেই কথাগুলো। বাবা কেমন আলাভোলার মতো বলতো, জানিস মিনি, ক্ষমতার বাইরে তোগো জন্ম দিয়া ফ্যালাইছি। রাণু মইরা গিয়াআমাগো সম্মান ফিরাই দিয়া গ্যালো। তুই পড় মিনু। মন দিয়া পড়। তরে নিজের পায়ে দাঁড়ানো লাগবে। ঝুনু, অ ঝুনু - সারাদিন কই টই টই ঘুরিস! ঘরে আয়!

দিনগুলো হেলে গড়িয়ে, দূরে দূরে হারিয়ে গেল। ঝুনু একদিন ঘুরতে-ঘুরতে কোথায় যেন লাটকাটা ঘুড়ির মতো ঘোরাই পথে হারিয়ে গেল। তখন আমি মাধ্যমিক দেবো। মাধোকাকু সেই সময় পাড়ায় খুব নাম করেছে। শালুর বিলের জলা জুড়িয়ে মাল্টিস্টোরিড বানাবে। আচ্ছা, এখন যারা প্রমোটার — তারা কি খুব স্বনামধন্য? রাস্তায় একদিন আমার সঙ্গে সরাসরি দেখা হলো। মোটর সাইকেল দাঁড় করিয়ে চাপা গলায় ডাক দিলো, মিনু শোন্‌।

পায়ে পায়ে এগোই।

মাধোকাকু পেছন ফিরে দেখে নেয়।

- কেমন আছিস তোরা?

— কেন তুমি জানো না?

মাধোকাকু হোঁচট খায়।

— জানি। ঝুনুর মিসিং কেসটা নিয়ে থানায় ডায়েরি করেছিস?

— না।

- কেন?

— লাভ নেই, ঝুনু ফিরবে না।

— তুই জানলি কী করে?

— বড়দিও ঠিক এমনি করে মরে যেতে চেয়েছিল। মানুষ নিজে কিছু চাইলে তাকে কেউ বাধা দিতে পারে না।

মাধোকাকুর চোয়াল ঝুলে পড়ে। মুখের উপর অনুশোচনার কালো ছায়া দুলে ওঠে। পকেটে হাত ঢাকায়। পঞ্চাশ টাকার নোট বার করে গুঁজে দেয় আমার হাতে। মুখে বলে, এটা রাখ্‌। একদিন তোদের বাড়ি যাবো। তোর কাকিমা খুব ভালো হয়েছে। একদিন আসিস না আমাদের বাড়ি! আলাপ করে দেখিস, ভালো লাগবে।

কথাগুলো শেষ করে মাধোকাকু মুহূর্তও দাঁড়ায় না, হুশ করে বেরিয়ে যায়। টাকাটা ইচ্ছা হলেই ফেরত দিতে পারতাম। কিন্তু দিলাম না। তখন আমার জিওমেট্রি বক্স কেনার খুব দরকার ছিল। পুরোনোহাসপাতালের উল্টোদিকের রাস্তায় দাঁড়িয়ে জীবনের পরম সত্য আবিষ্কার করলাম। আদর্শের সঙ্গে প্রয়োজনের কখনও-কখনও আপস করতে হয়।

মাধ্যমিকে স্টার নিয়ে কো-এড স্কুলে এগারো ক্লাশে ভর্তি হলাম। সেখানেই নিখিলের সঙ্গে আমার পরিচয়। সেই পরিচয়ের জলে সর পড়তে-পড়তে আজকের ঘনীভূত অবস্থা। তখন ভূপতিপুরের ভুতুড়ে বাড়িটাতে কেবল আমি আর বাবা। সন্ধ্যাদি রান্নাবাড়ি করতো। বাবার সঙ্গে কথাবার্তার সম্পর্ক - মাসের একদিন ছাড়া প্রায় উঠেই গিয়েছিল। সেই একদিনই বাবাকে যত্ন করে স্নান করিয়ে পরিষ্কার জামাকাপড় পরিয়ে পেনশন তোলাতে নিয়ে যেতাম। পেনশন তোলার দিন সন্ধ্যাবেলা বাবার বায়না - আনন্দকাকুর দোকানে তেলেভাজা কিনে দিতে হবে। সেগুলো নিয়ে বসে বসে গান গাইতো - ‘বনমালী তুমি পরজনমে হইয়ো রাধা’।


নিখিল, আমার সঙ্গে তোমার বন্ধুত্ব-প্রেম-ভালোবাসা সবই খুব স্বাভাবিকভাবে ঘটেছিল। কোনোটার সঙ্গে কোনোটার সংঘর্ষ ছিল না। বাবার আমার কাছে প্রয়োজনের বাইরে কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তখন বাবা নাকি বাড়ির মধ্যে প্রায়শই মাকে, বড়দিকে, বুনুকে দেখতে পেতো। একদিন সন্ধ্যাবেলা চুপিচুপি এসে ফিসফিস করে বলে, ও মিনু - বুনুর লগে দুধ গরম কর্‌। ওর খিদা পাইছে। সেই প্রথম বাবার প্রতি আমার কষ্টমিশ্রিত সহানুভূতি জাগে। নিখিল, তুমি অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত তোমার-আমার সম্পর্কের মধ্যে কোনো জোড়াতালি ছিল না। এই বাজারে আমাকে চাকরি পেতেও কোনো বেগ পেতে হয়নি। তোমার থিসিসও ঠিকঠাক চলছিল। এমনকি উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর যাদবপুরে ভর্তি হওয়ার তিন মাসের মাথায় বাবাও ঠিকঠাক মারা গেল। শুধু ভূপতিপুরের ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের পাশবইটা আমার নামে যাদবপুর ব্রাঞ্চে ট্রান্সফার হলো। বিয়েতে আমাদের বাড়িটা নিমাই সরখেলের কাছে এক লাখ আশি হাজার টাকায় বিক্রি করলাম। সেই টাকা আমাদের স্বপ্নের মতো আটশো স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাট কেনায় লাগালাম। কিন্তু নিখিল — সব ঠিকঠাক চলার মধ্যে তোমার এই অসময়ের অসুখ, অকালমৃত্যু — সবকিছুর ছক সমূলে পাল্টে দিলো। আবিষ্কার হলো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
নিখিল, তোমার মৃত্যুর থেকেও বড় — তোমার এই অসুখে আজ আমি সবথেকে বেশি অপ্রস্তুত। তোমার পরিচিত ডাক্তার দেবাশিস সামন্ত ছাড়া আর কাউকে তুমি দেখাতে চাইতে না। আমি জোর করলে তুমি রাগ করতে। কলেজ-ইউনিভার্সিটির সেই দামাল ছেলে যেদিন শীর্ণ হাতে আমাকে জলের ঘটি ছুড়ে মারলো সেদিন ফিন্‌কি দেওয়া রক্ত-কপাল চেপে বুঝেছিলাম - নিজের কাছে নিজের ঠকে যাওয়া মেনে নিতে সবথেকে বেশি সময় লাগে। বিছানায় শুয়ে-শুয়েও তুমি থিসিস দেখতে, বই পড়তে; বাইরে থেকে দেখে বোঝা যেতো না — কী অসুখ তুমি বয়ে বেড়াচ্ছো তোমার শিরায় শিরায়। তোমার বাধা দেওয়ার ক্ষমতা যখন হারিয়ে গেল, সেই প্রথম এবং সেই শেষ তোমায় নার্সিংহোমে নেওয়া হলো। ডাক্তার তেরচা চোখে আমার দিকে চেয়ে বললেন, লাস্ট স্টেজ। এর আগের প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টগুলোদেখেননি?

— দেখেছি। প্যারাটাইফয়েড, রেনাল ফেলিওর, স্পণ্ডিলোসিস। হার্টেরও সামান্য গণ্ডগোল আছে।

- সরি মিসেস গুপ্তা। হি ইজ এফেক্টেড বাই এইচআইভি পজিটিভ।

মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত নার্সিংহোমটা দুলে উঠলো। চোখের সামনে সিনেমার শেষের কালোপর্দার উপর ‘দি এণ্ড’ লেখাটা যেন ভেসে উঠছে।

ডাক্তার মৃদু ডাক দেন - শুনছেন! ইমিডিয়েট আপনার টেস্টটা করান।

শেষ পৌষের একদিন সকালে নিখিলের বেডের উপর সাদা অ্যাপ্রনের ডাক্তারের কালো মাথা ঝুঁকে পড়লো।

নিখিল তুমি মরে গেলে। ভেবেছিলাম মা, বুনু, বড়দি, ঝুনু, বাবা— সবাই এক-একজন এক-এক রকমভাবে মরে গিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু তুমি, তুমি নিখিল — আমার কৈশোরের বন্ধু, যৌবনের প্রেমিক, উত্তর-যৌবনের স্বামী - আমাকে এ কী দিয়ে গেলে? এ কোন্‌ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন? আচ্ছা, মাধোকাকুর কাছ থেকে জিওমেট্রি বক্স কেনার টাকাটা না-নিলে এই ফসিল কি আবিষ্কার হতোনা! কে জানে! তোমার শ্রাদ্ধের আঠারো দিন পর আজ আমাদের সাজানোগোছানো বড় বেশি ধোপদুরস্ত ফ্ল্যাটটায় একটা বাচ্চার কান্না শুনতে পাচ্ছি। কে কাঁদে? বুনুর গলা!
আচ্ছা নিখিল, তোমার দেশের বাড়িতে কে কে থাকেন? তাঁদের সম্পর্কে আমি কোনোদিনই আগ্রহী ছিলাম না। তোমার সেই হরিতালী পিসি মেয়ের বিয়েতে কিছু টাকা চেয়ে চিঠি লিখেছিল না? নিখিল, এ অসুখ তুমি আমায় দিতে পারো না। অসম্ভব। আমি প্যাথলজিক্যাল টেস্ট করাবো না। আমার ভয় হচ্ছে নিখিল! প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে আমার বড় ভয়! ঝুনু, দিদি আমার - ভালো আছিস তো! বুনু, কাঁদিস না বুনু! খুব খিদে পেয়েছে তোর তাই না! বাবা, তুমি তেলেভাজা খাবে না?

মা, ওমা, আমার যে খুব বাঁচতে ইচ্ছা করে। তুমি একবার, শুধু একবার কাছে ডাকো

না!
— মিনু বেলা গ্যাছে, ঘরে আয়!






...............................................................................................................

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন