বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

জয়শ্রী সরকার 'এর গল্প : চঞ্চলা সুইপার

ছোট বেলায় বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা টাকা অনেকদিন পর পেলে যেমন আনন্দ হত তেমনই হলো মরিচাপরা পলিথিনটি পেয়ে। সেই কবে চালের গুড়ি দিয়েছিল মা পিঠা খাওয়ার জন্যে। পিঠা বানানো দূরে থাক। পলিথিনটি পর্যন্ত খোলা হয়নি। চকির নিচে থাকতে থাকতে ধূলোয় ধূলোময় হয়ে আছে। আমার যদিও ছুচিবায় আছে তবু পলিথিন থেকে গুড়ি কটা নামালাম। লবন মরিচ রসে গুলিয়ে দুখানা চটা রুটি বানালাম। আহ্! যেনো বিন্নিধানের ধোয়া ওঠা ভাত। তর সয়ছিল না। গরম রুটিতে আঙ্গুলে ডুবিয়ে হামহাম করে বেশ খাচ্ছিলাম। এমন সময়;

বাবু বখশিস দিবেন না? 

কেটকেটা গোলাপী-কালো মিশাল রঙের শাড়ি পরে দরজায় দাঁড়িয়েছে চঞ্চলা সুইপার। হাতে একখানা লম্বা ঝাড়। ঝাড়ুটা বগলের ভাঁজে রেখে দুহাত কপালে ঠেকালো। চঞ্চলা সুইপারকে দেখার কিছু নেই তবু আমি তার দিকে তাকালাম। চোখ তাতানো শাড়ি পরা। নিরিহ গোবেচার চাহনি। তাছাড়া বাবু ডাকের একটা মাজেদা আছে তো? কোন কোন সম্বোধনের সাথে এমন কিছু জুড়ে থাকে যে চাইলেও অবহেলা করা যায় না। যদিও ঘেন্নায় রুটির শেষাংশটা শেষ হলো না, মনে মনে কিছুটা বিরক্তই হলাম। তবু ওর দিকে মনোনিবেশ করতে হলো। ঐ যে বললাম বাবু ডাকের একটা মাজেদা আছে। চাইলেও অবহেলা করা যায় না। 

কিসের বখশিস? 

বাবু সামনে পূজা বখশিশদিবেন না? 

বখশিস! 

পুরান লুঙ্গি আছে বাবু? ছেলেটা কাজে যায়। লুঙ্গি হলে সুবিধা। 

খোঁজে দেখতে হবে। 

ঠিকাছে। খোঁজে রাখবেন আমি পরে আসবো। 


আশ্বাস পেয়ে চঞ্চলা খুশি হয়। ঝাড়– দোলাতে দোলাতে চলে যায় পরিচ্ছন্নতা অভিযানে। 

বারান্দার শেষ মাথায় কবুতরের খোপের মত চারটি ছোট ঘর। দুইটা স্নানঘর, দ্ইুটা প্রাতঃঘর। এ কোয়ার্টারটি পাঁচটি পরিবারের জন্যে বরাদ্দ। একটি পরিবার ছাড়া বাকী সবার স্ত্রী সন্তান দেশের বাড়ি। ফলে সাবলেট সংখ্যা বেশি। আর সাবলেটের সবাই আমি গোত্রের ব্যাচেলর। ব্যাচেলরদের বদৌলতে সারাবছর খোপগুলি পালাক্রমে নষ্ট হয়। এক্ষেত্রে চঞ্চলাই আমাদের একমাত্র ভরসা। তাকে ছাড়া কারো গতি নেই। চঞ্চলা সারাবছর দু’হাত দিয়ে ময়লা পরিস্কার করে। পরিস্কার করে আবার নষ্ট হয়। নষ্ট হয় আবার পরিস্কার করে। কখনো কখনো এগুলোর সৎগতি না করেই চঞ্চলা চলে যায়। বললে কিছুই বলে না, কিছু করেও না। আজ তিনদিন ¯œানঘরে জল আটকে আছে। চঞ্চলা তা না সরিয়েই চলে যাচ্ছে। যেহেতু চঞ্চলার ছেলের জন্যে লুঙ্গি দেবো বলেছি তাই আজ সে কথা ফেলবে না। এমনটা ভেবেই আমি চঞ্চলার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। 

চারদিকে ব্লিচিং পাউডার ছড়ানো। চঞ্চলার পা দুটো ছিটে ছাটা হলুদ মলের সাথে এঁটে আছে। হাত দুটো কমোডের দু’পাশে ঘুরছে। আমার জীভ উগড়ে জল গড়িয়ে পড়লো। মলের ভাগাড় থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চঞ্চলাকে বললাম, সুইপার দিদি, স্নান করা নিয়ে মাথা ফাটাফাটি অবস্থা। জলটা সরিয়ে দিয়ে যেও। ওহ্, যাওয়ার সময় লুঙ্গিটা নিয়ে যেও। সুবোধ বালিকার মত মাথা নাড়লো চঞ্চলা। বুঝলাম আজ স্নানঘরের জল আটকে থাকবে না। 

‘আজকাল ঘরে প্রায়ই চাল থাকে না, ডাল থাকে না, নুন থাকে না। মাস শেষে ভাড়া থাকে না। সব না থাকার সময় জবা ফুল আমার ইশ্বর। করজোড়ে আমি তার সামনে বসে যাই। একমনে বলি, সব ঠিক করে দাও জবাফুল. সব ঠিক করে দাও।’- গতকাল রাতে লেখা লাইনগুলো কয়েকবার পড়লাম। মূলত পড়ার ছলে র্দুগন্ধটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করা । এমন সময় আবার চঞ্চলা। ‘দাদা দেখেন! একবার এদিকে চেয়ে দেখেন, এসব পাইপে ফেললে জল তো আটকাবেই’। তাকিয়ে দেখি বাঁশের কঞ্চির ডগায় একটি প্যাড ঝুলছে। সেখান থেকে পঁচা লাল জল টুপটুপ করে দরজায় পড়ছে। এহেন দৃশ্যটা দেখে কিছুক্ষণ আগে খাওয়া চালের রুটিটা গলাা কাছাকাছি চলে এলো। ‘এই, এই তোমার কোন কমনসেন্স নেই? আশ্চর্য! এইটা আমাকে দেখানোর কি হলো?’ থু থা করে কোনভাবে রুটিটা গলা থেকে পাকস্থলীতে ঠেলে পাঠালাম। মনে মনে ঠিক করলাম লুঙ্গি ওকে দেবো না। ওর গন্ধ মাখা শরীর টা নিয়ে আমার হাত থেকে জিনিস নিয়ে যাবে সেটা কোন ভাবেই বরদাস্ত করবো না। যেমনটি ভাবলাম তেমনটিই করলাম। আমি ওকে পুরনো তালি দেয়া লুঙ্গিটা দিলাম না। ও চলে গেলো। 

দুইদিন পরের কথা। ঘুম ভেঙ্গে প্রাতঃকাজে গিয়ে দেখি চঞ্চলা সুইপার খিটিমিটি করছে। ‘নবাবদের তো কিছু বলা যাবে না। সুইচ টিপলেই জল পড়ে তবু জল ঢালে না। তোমাদের ঘু আমরা হাত দিয়া পরিস্কার করি কিভাবে? আমাদের ঘেন্না নাই!” আমার সাড়া পেয়ে চঞ্চলা থেমে গেল। ‘দাদা, লুঙ্গি দিবেন না?’ ‘হ্যাঁ, যাওয়ার সময় নিয়ে যেও’ বলে পিছু ফিরলাম। 

কিছুক্ষণ পর চঞ্চলা এসে দরোজায় দাঁড়ালো। পরনে লাল পাড়ে কমলা বাটিক শাড়ি। শ্যাওলা পড়া দেয়ালে চুনকাম রঙ যেমন দেখতে। চঞ্চলার গা থেকে মলের গন্ধ আসছে। ওকে দরজায় দাঁড়াতে দিতে আমার ইচ্ছে করছে না। ওকে ছুয়ে লুঙ্গিটা দিতে আমার ইচ্ছে করছে না। তাই চক্ষু লজ্জা রেখে বলেই ফেললাম ‘শোন, স্নান সেরে এসো। তোমাকে ছুলে আমার স্নান করতে হবে।’ চঞ্চলা সুইপার রাগ করলো না। জোর হাত কপালে ঠেকিয়ে ঘন্টা দেড়েক পরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে গেল। 

যেই কথা সেই কাজ। ঘন্টা দেড়েক পর সে ফিরে এল। পরনে হলদে নীলে তাঁতের শাড়ি। কাঁধের পিছন দিক থেকে আসা আঁচলটি কুচির উপর পাখার মত ছড়ানো। একপিঠ ভেজা চুল। সিঁথিতে টকটকে লাল সিঁদূর। কপালে কালো টিপ। আমি লুঙ্গিটি নিয়ে ওর হাতে দিলাম। চঞ্চলার চোখ খুশিতে ঝলকে উঠলো। ওর হাসি হাসি মুখ দেখে আমি ঘেন্নার কথা ভুলে গেলাম। চঞ্চলা এক গাল হাসি ছড়িয়ে নমস্কার ঠুকে চলে গেলো। চঞ্চলাকে দেখার মত কিছু নেই। তবু আমি ওর যাওয়ার পথে তাকিয়েই থাকলাম। 

আমি সুকেশ। বেকার মানুষ। পত্রিকায় মাঝে মধ্যে নামে ও বেনামে ফিচার টিচার লিখি। কখনো টাকা দেয়, কখনো সংশ্লিষ্ট এডিটর নিজেই বিল তুলে হজম করে দেয়। তবু লিখি। সবাই যখন কাজে বাইরে ছুটে আমি তখন চেয়ার টেবিলে বসে দিব্বি আরামে কাটিয়ে দেই। খেয়ে না খেয়ে কাটিয়ে দেই। মাসের যে সময়টা আমি লিখার ফরমায়েশ পাই সে সময় অবশ্য এদিক সেদিক যাই। এটা সেটা খাই। মাস শেষে কিছুদিন ঠিকঠাক ভাড়া মিটিয়ে দিতে পারি। বাকীসময় দিচ্ছি দিচ্ছি করে কাটিয়ে দেই। এই মাসে তেমনটিই হয়েছে। আজ যেমন কিছু একটা খেয়েই কাটিয়ে দিতে হবে। 

তবে আজ আমি খেতে না পেলেও আগামী সপ্তাহে ভালো খাবো। কারণ আজ একটি ফরমায়েশ পেয়েছি। প্রান্তজনদের নিয়ে মোট পাঁচটি ফিচার লিখতে হবে। যদিও পত্রিকায় আমার নাম পাবেন না তবে আমি টাকা পাবো ভালো। এই টাকার জন্যেই চঞ্চলাকে এতক্ষণ আমি সহ্য করছিলাম। চঞ্চলার যাওয়ার পথে তাকিয়ে ভাবছিলাম। চঞ্চলা ইস্যু পাঠক খাবে ভালো। চঞ্চলা এই মূহূর্তে লক্ষ্মীস্বয়ং। তার সাথে কথা আমার বলতেই হবে। তাছাড়া সে তো আর এমনি কথা বলছে না। তাকে আমি আমার পুরনো লুঙ্গি দিয়েছি। প্রয়োজনে আরো দেবো। কিন্তু চঞ্চলাকে নিয়ে কিছু একটা লিখবো। চঞ্চলাকে পাঠক খাবে ভালো। 

ফিচার বিষয়ক ভাবনার চর্তুথ দিনে চঞ্চলা এসে দরজায় দাঁড়ায়।‘বাবু আপানার লুঙ্গিটি কেটে ছেলের মাপে বানিয়ে দিয়েছি। খুব খুশি হয়েছে। ঠাকুর আপনার ভালা করবে বাবু।’ একঝলক হাসি ছড়িয়ে চঞ্চলাকে ঘরে এসে বসতে বললাম। ‘শোন সুইপার দি, আরো একটা পুরনো শার্ট আছে। বের করে রাখবো ক্ষণ। পরে নিয়ে যেও। আর আজ তোমার একটু সময় হবে? কয়টা প্রশ্ন ছিল। এসো না, ঘরে এসে বস।’ 

আড়ষ্ট পায়ে চঞ্চলা এসে ঘরে ঢোকে। বসতে বলায় কিছুটা ইতস্তত করে। যে মানুষ তাকে বারবার দরজা থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে সেই ঘরে ডেকে বসতে বলছে কিছুটা বিহ্বল হওয়ার ব্যাপারই বটে। তবে আমার অনুরোধ সে ফেললো না। আমার বিছানার সামনের চিলতে মেঝেতে সে ঝপ করে বসে গেলো। 

বলেন বাবু, কি বলবেন। 

আচ্ছা এই কাজ তোমার কেমন লাগে? 

‘কাজ যেমন লাগে তেমনই।’ 

তোমার গা থেকে মলের গন্ধ বেরুয় তুমি তা টের পাও? 

‘নাহ্। আগে পেতাম। এখন পাই না। তাছাড়া গন্ধ পেলেই কি ? আমাদের কাজ করবে কে?’ 

লেখাপড়া কতদূর? 

‘স্কুলে যাওয়া আসা করেছি। নাম ঠিকানা লিখতে পারি।’ 

তোমার স্বামী কি করে? ‘পৌরসভার জমাদার আছে।’ নাম কি? 

‘স্বামীর নাম মুখে নিতে নেই’ 

এইসব এখনো আছে নাকি! আচ্ছা তাইলে বাবা মায়ের নাম বল। 

‘বাবা সুশীল দত্ত, মা লিলি দত্ত।’ 

দত্ত! এই টাইটেল আবার কোথায় পেলে? ‘টাইটেল পাইনি এইটা ছিলই।’ বানিয়ে কিছু বলার দরকার নেই সুইপার দি। ‘বানাবো কেনো বাবু? সত্য কথা।’ 

সুইপারদের দত্ত টাইটেল হয় না সে আমি জানী। তুমি বোধহয় জানো না। আমি লেখক! সবার খবরা খববরই আমাদের রাখতে হয়। এতসব তো জানীনা বাবু। তবে মিথ্যা বলছি না। আমার বাবা মা সুইপার ছিলেন না। তাহলে তুমি কেমন করে সুইপার হলে? 

‘বিয়ের পর।, 

তোমারে সুইপারের সাথে বিয়ে দিল? 

‘না গো। সে অনেক কথা।’ 

প্লিজ, আমায় সে কথা বল। আর শোন, কাল তুমি তোমার ছেলের জন্যে একটি শার্ট নিয়ে যাবে। যদিও কেটে ছোট করে দিতে হবে। এখন বল। কিভাবে দত্ত থেকে সুইপার হলে! 

‘আমার বাবা সুশীল দত্ত। ছায়াবানী সিনামাহলের অপারেটর। সকালে খেয়ে কাজে যেতেন ফিরতেন মধ্যরাতে। মর্নিং শো, মেটিনি শো, পাঁচশো, সেকেন্ড শো, নাইট শো বাবাই চালাতেন। দুপুরে বাবার খাবার নিয়ে যেতাম আমি। পথে দাঁড়িয়ে থাকতো একটি ছেলে। গায়ের রং ফর্সা, সুরৎ ভালো। সিনেমায় তো দেখতাম নায়ক নায়িকার জন্যে পথে দাঁড়িয়ে থাকে। ব্যাস্, এই ভাবেই হয়ে গেল। একদিন বাবাকে ভাত খাইয়ে আর ফিরে যাইনি বাড়ি।’ 

কি! তখন তোমার বয়স কত? 

‘দশ বার বছর হবে দাদা।’ 

তাই বলে সুইপারের সাথে চলে গেলে! মুসলমানের সাথে হিন্দুর মেয়ে চলে যায়। খ্রিস্টানের সাথে পাহাড়ি। কিন্তু কায়স্থ ঘরের মেয়ে একেবারে সুইপারের সাথে! তোমার বাবা মা কিছু টের পেলো না?’ 

‘না টের পেলে কি আর এই হয়! পরে জেনেছিল।’ 

রাগে গা জ্বলছে আমার। কেমন কা-টা করলো। মেথরের সঙ্গে পিরিত! স্বেচ্ছায় ময়লার ভাগারে গিয়ে মরা! ইচ্ছা করছে চঞ্চলা সুইপারকে চলে যেতে বলি। যে লুঙ্গিটা দিয়েছি সেটি ফেরত নেই। কিন্তু পুরো গল্পটা শুনতে হবে। তাকে নিয়ে একটি টানটান ফিচার হওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। তাই হাসিহাসি মুখে বললাম ‘পরে কি হল? তুমি কোথায় গেলে?’ 

‘কই আর যাবো! হরিজন পট্টি।’ আচ্ছা তুমি কি জানতে ঐ ছেলে মেথর পট্টিতে থাকে? ‘না জানতাম না! কিন্তু মন দিয়েছি, ঘর ছেড়েছি, তাই মেনে নিয়েছিলাম।’ 

হু! আমার মুখের স্বাদটা যেনো তেতো হয়ে গেছে। একটা সিগারেট খাওয়া দরকার। কিন্তু চঞ্চলাকে থামিয়ে দিলে আর ইমোশনটা থাকবে না। তাই তেতো মুখেই চালিয়ে গেলাম ‘আচ্ছা চঞ্চলা ঐ পল্লীতে তুমি কেমন করে থাকলে?’ 

‘থেকেছি। ছোট্ট ছাপড়া ঘরে শ্বশুড় শ্বাশুড়ি, শ্বাশুড়ির দুই ছানা পোনা, ভাসুর জা, দাদী শ্বাশুড়ি। মাঝখানে পর্দা দিয়ে একপাশে আমরা। নিশ্বাসের বোটকা গন্ধ নাকের ভিতর ঢুকে যায়! ময়লা গন্ধ গরাসের সাথে ঢুকে নাড়িভুরি উল্টে আসে! দরজা ঘেষে শহরের ড্রেন। ড্রেনভরা পলিথিন, কাপড় চোপড়, মাছের আশ্টে, মুরগী গরু খাসির নারী ভুড়ি, পঁচা রক্ত। একবার তো মরা লাশ ও পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়া এখানে সেখানে পোলাপানের গু। শুকরের তান্ডব তো আছেই। সারাক্ষণ মাটি গলে পঁচে পুঁজ পড়তো! দারু গন্ধের কথা আর কি বলবো! দুঃখে যে একটু কাঁদবো তারও উপায় ছিল না। মন দিয়েছিলাম! তার জন্যে ঘর ছেড়েছিলাম! ফিরে যাওয়ারও তো পথ ছিল না!’ 

আচ্ছা হরিজনরা নিশ্চয়ই তোমাকে পেয়ে খুব খুশি হয়েছিল? 

‘খুশি হয়েছিল তবে ওদের নিজেদের তো নিয়ম আছে। নিজ গোত্রে বিয়ের নিয়ম। বাসফোর বাসফোরের মেয়ে বিয়ে করবে, হেলা হেলার মেয়ে, লালবেগী লালবেগী মানে যে যার গোত্রে। আমি গোত্রের বাইরে। তাই সাত দিন আমরা একঘরে হয়ে ছিলাম। কেউ আমাদের সাথে কথা বলেনি। কারো ঘরেও ঢুকতে দেয়নি। তারপর পঞ্চায়েতে সব সমাধান হল। তিনি কান ধরে একশ বার উঠবস করলেন। শ্বশুর মসাই সকলকে নিমন্ত্রণ করে শুকরের মাংস আর দারু খাওয়ালেন। জাতে উঠলাম! সে যে কত গল্প। এক দুনিয়া বইয়ের সমান গল্প বাবু! ’ 

তোমার বাবা মা? তারা? তারা এলো না? 

নাহ! জাত গেছে! নিলে কি আর কলঙ্ক মুছবে! লজ্জ্বা ঢাকতে তারা ভিটে ছেড়ে চলে গেল! শুনেছি ওপাড়ে আছে! সেসব কতদিন আগের কথা! ভাই বোনগুলোকে দেখলে আজ আর চিনবো না। মা বাবা আছে কি নেই তাও জানীনা! ‘ 

মুক্তোর দানা ঝনাৎ ঝনাৎ করে পড়ছে চঞ্চলার চোখ থেকে। চঞ্চলাকে আমার আর সুইপার বলতে ইচ্ছে করছে না। চঞ্চলার গা থেকে এখন ময়লার গন্ধও আসছে না। আমার মাথায় এখন চঞ্চলা ঘুরছে। কোন কারণ নেই তবু চঞ্চলার ঘোরে আমার দুপুর ঘুরছে। চঞ্চলাকে দেখার কিছুই নেই তবু মন চঞ্চলাতেই থেমে থাকছে। 

২টি মন্তব্য:

  1. আপনার লেখা টা পড়ে সত্যি খুব ভালো লাগলো।আমিও শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হলে থাকাকালীন সময়ে উনাকে দেখতাম আর ভাবতাম সমাজ এদের কি দিচ্ছে? কতো বঞ্চনার শিকার ওরা!!! কিন্তু সব থেকে ভালো লেগেছিল বাসফোর মেয়ে পারুলের বিয়ে। আফজাল স্যার এর উদ্যোগে সেই" জাতপাত বিলোপন উৎসব" এ অংশ গ্রহণ করে।

    উত্তরমুছুন
  2. বীথি, তোমার লেখাটা এককথায় দারুণ হয়েছে। ময়মনসিংহ শহর, আমার বেড়ে ওঠার শহর নিয়ে লেখায় আরও ভালো লেগেছে। ময়মনসিংহ শহরের হরিজন পল্লীর ছবিটাও চোখের সামনে ভেসে ওঠলো। ছায়াবানী সিনেমা হলটি চালু হয়েছে কিনা জানিনা।

    উত্তরমুছুন