বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২০

স্মৃতি ভদ্রের গল্প : লেটারবক্স ও হলুদ চাঁদ

৮৫-১৫, ১৬৮ প্লেস। বাড়িটার ঠিকানা। রাস্তা থেকে তিনটি সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে একটু ফাঁকা জায়গা। এরপর সাদা রঙের বাড়িটি। দোচালা ধরণের ছাদের রঙ সবুজ। 

তবে সবুজ রঙটি ঢাকা তখন সাদা তুষারে। সেদিনই প্রথম আমার তুষার দেখা। জেটল্যাগের ক্লান্তিতে তুষার নিয়ে আমার সকল ফ্যান্টাসি ততক্ষণে উধাও হয়ে গেছে। ট্রানজিটসহ ২৮ ঘন্টার দীর্ঘ যাত্রাপথ। আর এর উপর ইমিগ্রেশনের বাড়তি ঘন্টা দেড়েক।
এ পর্যন্তও ঠিক ছিল। কিন্তু রোমিং করে নেওয়া নম্বর থেকে ইকবাল চাচাকে রিচ করতে যখন দুই ঘন্টা লেগে গেলো, তখন ইচ্ছে করছিলো সব ফেলে ছুটে দেশে চলে যাই।

এই যে ছুটে দেশে যাবার ইচ্ছেটা, সেদিনের পর তা আমার বাকী জীবনে একমাত্র ইচ্ছে হয়ে দাঁড়ালো।

ইকবাল চাচার হলুদ ট্যাক্সিক্যাবে আমি এসে পৌঁছেছি এ বাড়িতে। উনি বেশ করিতকর্মা। ফিফটি ফাইভ প্লাস লোকটি এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি অব্দি আধা ঘন্টার রাস্তায় এ দেশ সম্পর্কে আমাকে মোটামুটি প্রাথমিক ধারণা দিয়ে দিয়েছেন।

‘এদেশে কিন্তু সব কাজ নিজেকেই করতে হয়।'

কথাটির সত্যতা খুব তাড়াতাড়িই প্রমাণ হয়ে গেলো। 
তেইশ কেজির দু'টো লাগেজ কোনোরকমে টেনেহিঁচড়ে আমি একাই পৌঁছালাম এ বাড়ির চিলেকোঠায়।

হ্যাঁ, চিলেকোঠা। তবে নিউইয়র্কে এটাকে এটিক বলে। আমার বর্তমান ঠিকানা। ছোট কিন্তু গোছানো। ঢুকতেই একটু ফাঁকা জায়গা। তার একপাশে একটি চুলা আর ফ্রিজ বসানো। তার পাশেই একটি বেডরুম। সেখানে একটি বেড আর একটি টেবিল। কিন্তু কোনো চেয়ার নেই। তবে এ এপার্টম্যান্টে অকৃপণ জায়গা খরচ করা হয়েছে শুধুমাত্র বাথরুমে। সাদা প্রসস্থ বাথটাব, একটি ওয়াইড বেসিন টপে রাউন্ড শেপের মিরর আর একটি চৌকো ছোট্ট জানালা।

তখনো আমার জানা নেই, প্রতি বড় পূর্ণিমায় হলদে চাঁদ এ জানালাতেই ঝুলে থাকে।

আমাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে ইকবাল চাচা চলে গেছেন। তিনি এ বাড়ির মালিক। আর এই নতুন দেশে আমার অভিভাবক। বাবার দূর সম্পর্কের ভাই তিনি।

এটিক এই এপার্টম্যান্ট আমার ভালই লাগছে। ক্লাস শুরু হবে সামনের সপ্তাহে। এরমধ্যে আমার সব গুছিয়ে নিতে হবে। আমি চিরকালই খুব গোছানো স্বভাবের। অনেকে অবশ্য এটাকে বাতিক বলে। আমি সব কাজ লিস্ট ধরে ধরে করি। তবে কোনো কারণে একটি কাজ স্কিপ করতে হলেই আমার অস্বস্তি শুরু হয়। সে অস্বস্তি মাঝেমধ্যে এংজাইটিতে বদলে যায়। আর এই একটি কারণেই আমার বাবা মা অপ্রস্তুত হয়ে যান আমাকে নিয়ে।

আমার কাজের লিস্ট:

(১)গ্রোসারী

(২)রান্না

(৩) লাগেজ থেকে কাপড়গুলো ক্লোজেটে রাখা।

লিস্টের প্রথম কাজ গ্রোসারী করতে গিয়ে অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা হলো আমার। বাঙালী গ্রোসারীর গেটে দাঁড়ানো একজন লোক। আচরণ খুব স্বাভাবিক। কিন্তু পোশাকে কোথাও একটি অস্বাভাবিকতা। মাইনাস ৩ ডিগ্রীতে একটা পাতলা সোয়েটার গায়ে জড়ানো। একগাল হেসে আমাকে বললেন,

‘ গুড মর্নিং!'

এদেশীয় আদবকেতায় অনভ্যস্ত আমি প্রতি সম্ভাষণের জন্য সময় নিয়ে ফেললাম বেশ। আর ঠিক তখনি লোকটি আমার দিকে বেশ খানিকটা এগিয়ে এলেন। প্রায় ফিসফিসিয়ে বললেন,

‘ ওয়েলকাম টু দিস হ্যাভেন!'

আর দাঁড়ালেন না। রেড সিগন্যালের থামা গাড়িগুলোর সামনে দিয়ে প্রায় দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে গেলেন।

তবে ওটুকুনই। এরপর অভিজ্ঞতাহীন আমি প্রথমবার সব ভূলভাল গ্রোসারী করে ফিরলাম। লিস্টের দ্বিতীয় কাজ রান্না করতে গিয়ে দেখলাম হলুদ না কিনে দুইটা মরিচের গুড়া কিনেছি। আদা আর হলুদবিহীন চিকেনের ঝোল চিকেন স্ট্যু বলে মনকে প্রবোধ দিলাম।

এরপর লিস্টের তিন নম্বর কাজ। লাগেজ খোলার আগে ক্লোজেট টা একটু ঝেড়েমুছে নিতে গেলাম। আর সেখানেই পেয়ে গেলাম ব্রাউন রঙের বড় একটা ভারি খাম। খামটির মুখ খোলা।

অবাঞ্ছিত জিনিষ টা অদ্ভুতভাবে আমাকে আগ্রহী করে তুললো। ভেতরে হাত দিয়ে বের করে আনলাম এ ফোর সাইজের দাগ টানা একটি কাগজ। না, সাদা কাগজ নয়। লেখা রয়েছে তাতে।

                                                             (১ নং)

                                                                                              তাং

                                                                                         ১২-০৭-৯৭

নীহার,
জানি এ নামটি তোমার পছন্দ নয় মোটেও। তবে আজ তুমি রেগে যাবে না আমি জানি। আগের চিঠিতে তোমার উদ্বেগ আমি বুঝতে পেরেছি। এই দূরদেশ থেকেও আমি যেন দেখতে পাই তোমার চিন্তাগ্রস্ত মুখটি। কিন্তু আজ তোমার সকল উদ্বেগের অবসান হবে। কারণ আমি খুব ভাল একটি খবর দেবো। সেবার চিঠিতে লিখেছিলাম একটি ভাল চাকুরীর ইন্টার্ভিউ দিয়েছি। আশা ছিল চাকরীটা হবে। হ্যাঁ, এপোয়েন্টম্যান্ট লেটার পেয়েছি। আর অল্প কিছুদিন অপেক্ষা। ওয়ার্ক পারমিট-এর পর গ্রীনকার্ড পেতে খুব বেশী সময় লাগেনা।

আর অল্প কয়দিন অপেক্ষা করো। কল্পনার পঙ্খীরাজ নয়, বিমানে করে উড়িয়ে নিয়ে আসবো এদেশে তোমাকে।

আর ক'দিনের অপেক্ষা।

ইতি
রাশেদ
নিউইয়র্ক

খুব সাধারণ একটি চিঠি হতে পারতো এটি। বিদেশ থেকে লেখা প্রিয়জনের কাছে একটি সাধারণ চিঠি। কিন্তু দু'টি কারণে তা হলো না। প্রথমত, চিঠিটি অরিজিনাল নয়, ফটোকপি। আর দ্বিতীয়ত, চিঠির অন্যপাশে পেন্সিল দিয়ে পয়েন্ট করে আরোও কিছু লেখা।

১. এখানে একটি ইন্ডিয়ান গ্রোসারীতে আমার কাজ হয়েছে।

২. ওয়ার্ক পারমিটের এপ্লিকেশন রিফিউজ হয়েছে।

আমি গোলকধাঁধায় পড়ে গেলাম। আর এই ধাঁধার জন্যই ব্রাউন রঙের খামটির ভেতরে অনান্য কাগজগুলোর প্রতি আমার আগ্রহ দ্বিগুণ হয়ে গেলো।

আমি খামটি নিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলাম। ভেতর থেকে বের করে আনলাম এক স্তুপ কাগজ।

এবার একটি সুগন্ধি লেটার প্যাডের পাতা। তাতে জলছাপে কয়েকটি হার্টশেপ। পরিছন্ন আর সুন্দর হাতের লেখায় চিঠিটি আমার কাছে শুরুতে ক্যালিগ্রাফি মনে হলো।




                                                           ( ২নং চিঠি)

সুপ্রিয় রাশেদ                                                                                                     তাং১৫-০৯-৯৭


না, নীহার বলায় রাগ করিনি। কারণ এবারের চিঠি পাবার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ঝামেলার ভেতর দিয়ে গিয়েছি। বড় খালু মানে তোমার আব্বা খুব অসুস্থ ছিলেন। আর এদিকে আমার বড় ভাই তাঁর এক বন্ধুর বিয়ের প্রপোজাল নিয়ে এসেছিলো আমার জন্য। তবে তোমার চিঠি সকল সমস্যার সমাধান হয়ে এসেছে এবার। বড় খালু তোমার চাকুরীর খবর পেয়ে অর্ধেক সুস্থ হয়ে গেছেন। আর তিনি নিজেই বড় ভাইকে সেই বিয়ের প্রপোজাল ফিরিয়ে দিতে বলেছেন। বড় ভাইকে কথা দিয়েছেন এক বছরের মধ্যেই আমাকে তিনি তাঁর বাড়ির বউ করে নিয়ে যাবেন।

এজন্য এখন থেকে তোমাকে 'নীহার' ডাকার একচ্ছত্র অধিকার দিলাম।

আর হ্যাঁ, তোমার এই ভাল খবর পেয়ে আমি নফল নামায পড়েছি।

তাড়াতাড়ি তোমার চিঠি পাবো।

এই প্রত্যাশায়
নীহার (নীহারিকা)
খুলনা

চিঠিটা পড়তে পড়তে আমি কল্পনার চোখে একজন উচ্ছল নীহারিকাকে দেখতে পারছিলাম। আর ভাবছিলাম এইসময় রাশেদ আর নীহার নিশ্চয় আমেরিকার কোথাও থিতু হয়েছে। খুব সুন্দর সংসার হয়েছে।

এখন ওরা কোথায় তার যদি কোনো তথ্য পাওয়া যায় সে আগ্রহ থেকেই পরের কাগজটি হাতে নিলাম।

এটিও সেই সুগন্ধি লেটার প্যাডের পাতা।




                                                           (৩নং চিঠি)

রাশেদ,                                                                                                               তাং ০৭-০১-৯৮

কেমন আছো? খুব উদ্বেগ নিয়ে লিখছি তোমায়। প্রায় তিনমাস হয়ে গেলো তোমার কোনো চিঠি নেই। আমরা সকলেই খুব চিন্তায় আছি।

নতুন চাকরীতে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছো, বুঝতে পারি। তবুও দু'চার লাইনের একটি চিঠি পাঠিও।

বড় খালুর অস্থিরতা আবার বেড়েছে।

তাড়াতাড়ি লিখবে।

নীহারিকা

এবার নীহারিকার উদ্বেগ আমাকেও ছুঁয়ে গেলো। কী হলো রাশেদের? সে ভাবনা থেকেই পরের চিঠিটি হাতে নিলাম।




                                                                      (৪ নং চিঠি)


নীহার                                                                                                                            , তাং০৯-০৩-৯৮

কেমন আছো জিজ্ঞেস করবো না। জানি খুব চিন্তায় আছো। সবকিছুর জন্য দুঃখপ্রকাশ করলেও নিজের দায় অস্বীকার করছি আমি। তোমার কোনো চিঠি এরমাঝে পায়নি আমি।

নতুন চাকুরীতে ব্যস্ততা আছে, তবে তা কোনোভাবেই তোমাকে অগ্রাহ্য করে নয়।

একটি খবর দেবার আছে। আমার এসাইলামের কাজ অনেকদূর এগিয়েছে। এখন তোমার একটু সহযোগিতা প্রয়োজন। দেশে আমার বিরূদ্ধে যে পলিটিক্যাল কেসগুলো আছে তার কপি পাঠাতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

আমি অপেক্ষায় থাকলাম।

ইতি
রাশেদ

পলিটিক্যাল কেস' রাশেদ তবে দেশে রাজনীতি করতো। বেশ ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার। আমি কল্পনায় একজন ছাত্রনেতা দেখে নিতে পারতাম। কিন্তু ইকবাল চাচার কথা হুট করে মনে পড়ে গেলো।

ইকবাল চৌধুরী, বাবার দূর সম্পর্কের ভাই। নব্বইয়ের দশকে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে আমেরিকায় এসেছিলেন। আর দেশে ফেরেননি। এখানে অনেক কষ্টে লিগ্যাল ইমিগ্রেন্ট হয়েছেন।

চিঠিগুলো ইকবাল চাচার। এই ধারণা পোক্ত হয়ে গেলো আমার। অন্যের ব্যক্তিগত চিঠি এভাবে পড়ছি, ভাবতেই উইয়ার্ড লাগলো। ব্রাউন খামটি এবার হাতে ধরতেই অস্বস্তি হলো।

সামনে ওপেন করা লাগেজ হঠাতই আমাকে তাড়া দিতে শুরু করলো। আর ঠিক তখনি ডোরবেলের আওয়াজ আমাকে পুরোপুরিভাবে ফিরিয়ে নিয়ে এলো এই চিলেকোঠায়।

আমি সামনের ব্রাউন খামটি তাড়াহুড়ো করে ক্লোজেটে ঢুকিয়ে দিলাম। চেহারা থেকে যতটুকু সম্ভব অস্বস্তি ঝেড়ে ডোর ওপেন করলাম।

সামনে ইকবাল চাচা আর একজন মহিলা।

' তোমার চাচী।'

আমি সালাম দেবার ভঙিতে হাত তুললাম।

' কেমন লাগছে এ দেশ?' বলতে বলতে মহিলাটি ভেতরে ঢুকলেন। তবে উত্তরের সময় না দিয়েই গ্যাসের চুলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।

' রান্নার পর সবকিছু ক্লিন করে ফেলবে অল পারপাস ক্লিনার দিয়ে। না হলে ককরোচ হবে। পেস্ট কন্ট্রোল করিয়েছি অল্প কিছুদিন।'

আমি শুধু 'হ্যাঁ' সূচক মাথা নেড়ে মধ্যবয়সী নীহারকে দেখতে থাকলাম। চুল বার্গেন্ডি কালার করা। এই বয়সেও স্কিন বেশ টানটান। তবে হাসলে চোখের চারপাশটা কুঁচকে যাচ্ছে। তবে সেখানে সরু কাজল মনে করিয়ে দেয় তিনি কারো নীহার।

ইকবাল চাচা ততক্ষণে বেডরুমের আয়রন রেডিয়েটরের সামনে চলে গিয়েছেন।

' হিট ঠিকঠাক মতো হয়তো? অনেকদিন চেক করা হয়নি। মাত্র তিনদিন সময় পেয়েছিলাম এই এপার্টম্যান্ট ক্লিন করতে।'

প্রায় চাচার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে চাচী বললেন,

' এই এপার্টম্যানের আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখানে বাথরুম আমি করিয়েছিলাম নিজের জন্য। ইচ্ছে ছিল ব্যবহার করবো। কিন্তু তা আর হলো কই? এত অপরিছন্ন করে রেখেছিলো বাথরুমটা...... '

আরোও কিছু বলতেন চাচী। কিন্তু ইকবাল চাচা তাড়া দিলেন। উনি কাজে বের হবেন।

চাচীও 'বাই' বলে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি পেছন থেকে বললাম,' বেডরুম ক্লোজেটের স্লাইডিং ডোরটা খুব একটা স্মুথ নয়।'

কমপ্লেইন নয়, আমি আসলে চিঠির খামটার জন্য কথা পাড়লাম। এতে যদি ওনাদের চিঠিগুলোর কথা মনে পড়ে। কিন্তু লাভ হলো না। সামনের সপ্তাহে চাচা লোক এনে ডোর ফিক্সড করে দেবেন বলে তরতর করে নেমে গেলেন।

ফিরে এলাম লাগেজের কাছে। লিস্ট অনুযায়ী কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে ব্রাউন খাম আর রাশেদ-নীহার। ভেতরে অস্থিরতা বাড়ছে। আমি আর এক মুহূর্তও দেরী করতে রাজী নই।

ব্রাউন খামটা ক্লোজেটের সবচেয়ে নীচের তাকে রেখে আমি কাপড় গোছানো শুরু করলাম। সব কাজ শেষ করতে রাত বেশ হয়ে গেলো। বাইরের নিঃস্তব্ধার সাথে ঘরের আয়রন রেডিয়টের একঘেয়েমি শব্দ মিলেমিশে আমাকে নিঃসঙ্গ করে তুললো।

আমি স্কিন কেয়ারের প্রোডাক্টগুলো নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। আর তখনি চোখে পড়লো চৌকো জানালায় হলুদ চাঁদটি দোল খেতে খেতে আমায় দেখছে।

আমি গিয়ে দাঁড়ালাম জানালার পাশে। হলদে চাঁদ থেকে এক টুকরো আলো আমার হাতের আঙুলে এসে পড়লো। আমি দেখলাম তা পাখির পালকের মতো নরম। একটু পর আমার শরীর ভরে গেলো হলুদ পাখির পালকে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম দু'টো ডানাও আছে আমার।

আমি উড়তে লাগলাম। ছুটতে লাগলাম দেশের দিকে।

হঠাতই হলদে চাঁদটি জানালা থেকে খসে পড়লো। বাইরে নিঃস্তব্ধতায় আছড়ে পড়ছে তুষার। আমার ডানা দু'টোয় তুষার জমে। ভারী হয়। ওড়ান শ্লথ হয়ে আসে। আমি ক্লান্ত হয়ে জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ি আমার এটিক এপার্টম্যান্টে। ডানা দু'টো খুলে তুষার ঝেড়ে যত্ন করে রেখে দেই।

অপেক্ষা আবার জানালায় হলদে চাঁদের।

তবে হলদে চাঁদের অপেক্ষায় আমি প্রায় ভুলেই গেছি ব্রাউন খামের অস্তিত্ব।

আমার ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। স্প্রিং সেশন। ব্যস্ত হয়ে পড়েছি পড়াশুনো নিয়ে।

এখন আমি ভুলভাল গ্রোসারী কম করি। রান্নাতে হলুদ একটু কম দিয়ে ঝাল বেশী দিয়ে লালরঙের চিকেন রান্না করতে পারি। আর আয়রন রেডিয়েটরের একঘেয়েমি শব্দ ঢাকি নেটফ্লিক্সে ' দ্যা ক্রাউন' দেখে।

প্রায় অভ্যস্ত হয়ে আসা এই সময়ে আমি অবশ্য একদিন অল্প সময়ের জন্য অপ্রস্তুত হয়েছিলাম।

ঘটনাটি গত সপ্তাহের। গ্রোসারী করতে গিয়েছি। বাঙালী গ্রোসারী থেকে। লিস্ট অনুযায়ী একে একে সব নিয়েছি।

১. স্পিনাচ

২. ব্রোকোলি

৩. অনিয়ন

৪. চিকেন

৪. ইন্ডিয়ান পিকেল

৫. ব্রেড

৬. ডার্ক রোস্টেড কলম্বিয়ান কফি

সব নিয়েছি। ক্যাশ কাউন্টারে পেমেন্ট করে বেরিয়ে আসছি। তখনি কোথা থেকে প্রায় উড়ে ঘাড়ের কাছে এসে পড়লেন সেই লোকটি।

চেঁচিয়ে বললেন,' গুড ইভিনিং। আর্লি স্প্রিং ব্লোজম হেয়ার। হোপ ইউ এনজয়িং।'

অপ্রস্তুত আমি। ঘাড় নেড়ে কোনোরকমে প্রতি উত্তরে, 'ইয়েস, ইট ইজ.........' বাক্য শেষ করতে পারলাম না।

যেভাবে এসেছিল সেভাবেই হ্যাভি উইন্টার জ্যাকেট গায়ে জড়ানো লোকটি অন্যদিকে চলে গেলেন।

মানুষটিকে নিয়ে মনে কিছু প্রশ্ন আর কৌতুহল নিয়ে ফিরলেও তা গায়েব হয়ে যায় সহসাই। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছি আমার রুটিন ওয়ার্কে।

অনেকদিন এপার্টম্যান্ট সেভাবে ক্লিন করা হয়নি। দু'একটি ককরোচ চোখে পড়ছে। আমি তাড়াহুড়ো করে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার বের করলাম। আনাচেকানাচে সবজায়গা ভ্যাকুয়াম করছি। হঠাতই বেডের নীচে একটি কাগজে চোখ আটকালো। হাত বাড়িয়ে বের করে আনলাম।

ব্রাউন খামের চিঠিটি। রাশেদ এসাইলামের জন্য কাগজ পাঠাতে বলছে নীহারকে। চিঠির মানুষগুলো এখন আমার চোখের সামনেই থাকে। তাই আগ্রহ নেই তেমন একটা। আমি চিঠিটা খামে ফেরত রাখতে গেলাম। তখন চোখে পড়লো অপরপাশে নোট করে পেন্সিল দিয়ে কিছু লেখা।

১. চিঠি পেয়েছিলাম কিন্তু উত্তর দেওয়া হয়নি।

২. আমার এসাইলামের এপ্লিকেশন ডিনাই হয়েছে। ওয়ার্ক পারমিট রিনিউ হবে কীনা জানি না।

'ওয়েট অ্যা সেকেন্ড' নিজের মনেই বলে উঠলাম।

চিঠিটা একপাশ অন্যপাশকে অপোজ করছে। আমি আবার দু'পাশ মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। এবার লক্ষ্য করলাম পেন্সিল দিয়ে যেপাশে লিখছে সেখানে একটি ক্যালিগ্রাফি। খুব মন দিয়ে দেখলে বোঝা যায় এটি একটি নাম। যার শুরু ইংরেজি অক্ষর 'এ' দিয়ে। বাকি নামটুকু অবশ্য উদ্ধার করতে পারলাম না।

আমি ক্লোজেট থেকে ব্রাউন খামটি আবার বের করলাম। এবার চিঠির স্তুপ একটানে সব বেরিয়ে এলো।

দেখলাম তারিখ মিলিয়ে চিঠিগুলো সাজানো।
আমি পড়া শুরু করলাম।

                                                              (৫ নং চিঠি)

প্রিয় রাশেদ                                                                                              তাং১২-০৫-৯৮

আজ যখন তোমাকে লিখছি তখন কাঁঠালচাঁপা গাছের ফুলগুলো ফুটতে শুরু করেছে। এ গাছে ফুল এলেই তোমার কথা খুব মনে পড়ে। তোমার প্রিয় ফুল এটি। যাহোক, কাজের কথায় ফিরি।

বড় খালুর প্রেশার খুব আপডাউন করছে কিছুদিন। আমি দু'বেলা গিয়ে ওষুধ খাইয়ে আসি। যতটুকু সময় থাকি, শুধু তোমাকে নিয়ে গল্প করেন। তোমার এসাইলামের অগ্রগতি শুনে খুব খুশি হয়েছেন।

আমি সব কাগজপত্রের কপি পাঠিয়ে দিলাম। পেয়ে জানিও।

আর পাঠালাম কাঁঠালচাঁপার ঘ্রাণটুকু।

ইতি
নীহার (নীহারিকা)

পড়তে পড়তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আমার। নীহারের জন্য বুকের ভেতর শূন্য হয়ে এলো। আমি পরের চিঠিতে গেলাম।




                                                                   (৬নং চিঠি)


নীহার,                                                                                                                         তাং ১০-০৭-৯৮

আশা করছি ভাল আছো। অফিসে কাজের খুব প্রেসার। তাই আজ সংক্ষেপে লিখছি। কাগজগুলো এক্সেপ্ট করেছে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি। খুব তাড়াতাড়ি গ্রীনকার্ড পেয়ে যাবো। আমি এখানে বাড়ি কেনার কথা ভাবছি। আর দেশে আব্বার ঘরটাও ভেঙে দোতলা করে দেবো। আব্বাকে বলো ইট, সিমেন্টের দাম কেমন তা খোঁজ নিতে।

আজ রাখছি।

ও হ্যাঁ, কাঁঠালচাঁপার ঘ্রাণ এখনো পাই তোমার চিঠি থেকে।

ইতি
রাশেদ

এপাশ শেষ করেই আমি ওপাশে গেলাম। হ্যাঁ, এখানেও পেন্সিল দিয়ে নোট করে লেখা।
১. আমার গ্রোসারীর কাজ চলে গেছে।
২. সামনের মাস থেকে কীভাবে বাসা ভাড়া দেবো জানি না।

আমি যেন একটি গেম অবজার্ভ করছি। ট্রুথ আর ফলসের পাজল।

আমার কৌতুহল আস্তে আস্তে অস্থিরতায় পরিণত হচ্ছে। আমি পাজল মেলাতে ধৈর্য্যহারা হয়ে পড়ছি।

আমি সময় নষ্ট না করে চিঠিতে গেলাম।

                                                                   (চিঠি নং ৬)

রাশেদ,                                                                                                                  তাং০৫-০৯-৯৮

ভালোবাসা জানিয়ে শুরু করছি। আজ মন খুব ভাল আমার। বড় খালুর প্রেসার এখন বেশ স্টেবল। বড় খালু নিজেই লক্ষ্মী ট্রেডার্সে গিয়ে ইট, সিমেন্টের একটা হিসেব নিয়ে এসেছেন। চিঠির সাথে পাঠালাম ওটা।

আজ একটা ইচ্ছা জানিয়ে রাখি তোমাকে। নিউইয়র্কের বাড়ির একটি ঘর কিন্তু আমার লাইব্রেরী হবে। ব্যক্তিগত। আমার সব পছন্দের বই থাকবে সেখানে। বাড়ি ফাইনাল হলে জানাবে। আমি রোজা মানত করেছি।

নিউইয়র্কের বাড়ি নিয়ে বিস্তারিত জানার আশায় শেষ করছি।

তোমার
 নীহার

এই চিঠির সাথে স্টেপল করা একটি রশিদ।

লক্ষ্মী ট্রেডার্স
বড়বাজার, নিউমার্কেট রোড
খুলনা

১০০০ ইট - ৬০০টাকা
১টন রড- ২৫০ টাকা
সিমেন্ট বস্তাপ্রতি- ২৫০ টাকা

রাশেদের উত্তর দেখার তড় সইছিলো আমার। আমি পড়া শুরু করলাম।

                                               (৭ নং চিঠি)

নীহার                                                                                                          তাং ১০-১১-৯৮

গ্রীনকার্ড এসেছে গত সপ্তাহে। এখানে বাড়ি ফাইনাল করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। বেশ ঝামেলা এসবে। ফাইনাল করে বাড়ির ছবি পাঠাবো।

ভাল থেকো।

ইতি
রাশেদ

খুব ছোট চিঠি। আমি অপরপাশে পেন্সিল দিয়ে লেখা নোটে চলে গেলাম।

১. দু'মাস ভাড়া দিতে পারছি না।
২. বাড়িওয়ালা বাসা ছেড়ে দিতে বলছে।

এর নীচে ক্যালিগ্রাফির মতো সেই সিগনেচার।

আমি এখনো গোলকধাঁধায়। প্রতি চিঠিতেই নোট করে অপোজ করা হচ্ছে।

আমি উত্তর খুজতেই চিঠি স্তুপ থেকে আরেকটি চিঠি তুলে নিলাম।

                                                (৮নং চিঠি)
রাশেদ,                                                                                                  তাং ০১-০৩-৯৯

আজ কতদিন হলো তোমার কোনো খবর জানি না। নিউইয়র্কের নতুন বাড়ির কোনো খবর দিলে না। বড় খালুর শরীর হঠাত করে খারাপ করেছে। এই শরীরেও প্রতিদিন লক্ষ্মী ট্রেডার্সে গিয়ে বসে থাকেন। রাজমিস্ত্রির সাথেও কথা বলেছেন। তুমি টাকা পাঠালেই বাড়ির কাজে হাত দেবেন।

একটা অনুরোধ করছি। রাখবে? অল্পদিনের জন্য দেশে আসো। 

বড় ভাইয়া আবার বিয়ের প্রপোজাল আনছে আমার জন্য।

কবে আসছো জানিয়ে চিঠি দিও।

ইতি
নীহারিকা

পরের চিঠি।



                                                                          (৮নং চিঠি)


রাশেদ,

আজ আটমাস হলো তোমার কোনো খবর জানি না। বড় খালু খুব অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি এখন।

তুমি ভাল আছো তো?

চিন্তায় আছি।

ইতি
নীহারিকা

                                                                     (৯ নং চিঠি)

রাশেদ,
আমি জানি না এই চিঠি তোমার কাছে পৌছাবে কীনা। গত একবছর তোমার সাথে যোগাযোগ নেই।

আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলে দেশের বাইরে থাকে, জাপানে।

আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

ইতি
নীহারিকা

এই চিঠির পেছনে পেন্সিল দিয়ে নোট করা। রাশেদের হাতের লেখা।

* আমাকে ক্ষমা করে দিও নীহার।*

এখানে একটি বিয়ের কার্ডও পেলাম।

এখানে এসে থমকালাম আমি। চিঠিগুলো তাহলে ইকবাল চাচা আর চাচীর নয়।

শুধুমাত্র ইকবাল চাচার। বিয়ের আগের অন্য কোনো সম্পর্কের চিঠি। তাহলে চাচী নীহার নয়। নীহার অন্য কেউ।

এরপর আর কোনো চিঠি নেই। কাগজের স্তুপ থেকে এবার আমার মন উবে গেলো। চাচা নিশ্চয় এখানে লুকিয়ে রেখেছেন চিঠিগুলো। কাঠখোট্টা লোকটির ভেতরের এই রূপটি আমাকে সমব্যথী করে তুললো।

নীহার এখন নিশ্চয় জাপানে। স্বামী আর সন্তানদের নিয়ে তাঁর গোছানো সংসার নিশ্চয়। তবে সেখানে হয়তো কাঁঠালচাঁপার গাছ নেই। রাশেদ, মানে ইকবাল চাচাকে মনে পড়বে যে তার।

আমি সবগুলো চিঠি যত্ন করে খামে ভরলাম। এগুলো আসলে চিঠি নয়। এক জীবনে অনেকগুলো জীবন যাপন করি আমরা। এগুলো ইকবাল চাচার আরেক জীবনের গল্প।

ক্লোজেটের সবচেয়ে উপরের তাক থেকে আমার কাপড়গুলো নামালাম। ফাঁকা সে জায়গায় বেশ আড়াল করে ব্রাউন খামটি রাখলাম।

মনে মনে পণ করলাম খামটিতে আর কখনো হাত দেবো না।

স্প্রিং শেষ হয়ে সামার চলে এসেছে। আমি এখন অনেকটাই অভ্যস্ত। সামার সেশনে খুব একটা কোর্স নেই আমার। ক্লাস কম, তাই বাসাতেই বেশী সময় থাকা হয়। চাচী মাঝেমধ্যে এসে খবর নিয়ে যান। তবে ইকবাল চাচার সাথে দেখা হয় কম।

প্রায় দুই সপ্তাই আগে দেখা হয়েছিলো এ বাড়ির ফ্রন্ট ইয়ার্ডে। দেশীয় কিছু সবজীর চারা লাগাচ্ছিলেন। আমাকে দেখেই কথা পাড়লেন। ইকবাল চাচা নয়, চাচী।

হাতের দেশীয় লাউয়ের চারা দেখিয়ে বললেন,' এখানে এগুলোর ভালো ফলন হয়। আর ওগুলো লালশাকের বীজ।'

চাচীর কথা শুনতে শুনতেই আমি তাকালাম ইকবাল চাচার দিকে। একমনে গার্ডেনে কাজ করছেন। লাইট পার্পল রডোডেনড্রন গাছের পাশে একটা অচেনা গাছেন চারা লাগাচ্ছেন।

কী ভেবে জানি না আমি প্রশ্ন করলাম,

' ইকবাল চাচা, এটা কি কাঁঠালচাঁপার গাছ?'

উনি থমকে গেলেন। হাত থেকে চারাটা একটু আগলা হলো।

' না, এটা উইপিং চেরী।'

এরপর আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

'তোমারো কাঁঠালচাঁপা পছন্দ?'

আমি সজাগ হয়ে গেলাম। চাচা বুঝে ফেলেছেন, আমি তাঁর চিঠি পড়েছি। খুব বিব্রতকর এটা। এবার অভিনয়ের আশ্রয় নিলাম। মুখে কৃত্রিম উদাসীনতা এনে বললাম,

' দেশে আমাদের নতুন এপার্টম্যান্টের ছাদ বাগানে কাঁঠালচাঁপার গাছ আছে। আম্মুর প্রিয় ফুল এটি।'

' ও তাই বলো! আমি ভাবছিলাম এটিক এপার্টম্যান্টে যেই থাকে সেই কাঁঠালচাঁপা পছন্দ করে।'

চাচার এই কথাতে একটা প্রচ্ছন্ন কৌতুক ছিল।

আমি অবাক হলাম। আর সে কৌতুকের সুত্র খুঁজতেই কথা কন্টিনিউ করতা লাগলাম,

' এখানে কাঁঠালচাঁপার গাছ পাওয়া যায়?'

ততক্ষণে ইকবাল আবার মনযোগী হয়ে উঠেছেন উইপিং চেরীতে। খুব নির্লিপ্তভাবে বললেন,

' না, এই শীতের দেশে ওসব গাছ হয়না। এদেশে একজনই পাগলের মতো হন্যে হয়ে কাঁঠালচাঁপা খুঁজতো।' 

শেষবাক্যটিতে আমি একইসাথে শ্লেষ আর কটাক্ষ খুঁজে পেলাম। আর কথা বাড়ালাম না আমি।

চাচা আর চাচীকে পেছনে ফেলে এটিক এপার্টম্যান্টের দিকে এগোতে থাকলাম।

সিঁড়িতে উঠতে উঠতে কানে এলো চাচীর গলা।

' ছেলেটা আমার শখের বাথরুমটার কী হাল করে রেখেছিলো!'

কে, কখন চাচীর শখের বাথরুমের বেহাল অবস্থা করেছিলো, তা জানতে অবশ্য খুব একটা আগ্রহ জাগেনি আমার।

তবে এই ক'দিনে একজন মানুষ আমার সকল আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিদিন মধ্য দুপুরে মানুষটি দাঁড়ায় এ বাড়ির গেটে। লেটার বক্সের পাশে। কিছু সময় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এরপর মেইলম্যান এলেই উশখুশ করা শুরু করে।

মেইলম্যান কোমড়ে ঝোলানো অসংখ্য চাবির গোছা থেকে একটি চাবি দিয়ে লেটারবক্স খোলে। পাশে দাঁড়ানো সেই মানুষটি উঁকি দিয়ে কিছু খোঁজেন লেটারবক্সে। মেইলম্যান এড্রেস মিলিয়ে কিছু লেটার আলাদা করে। মানুষটি প্রায় মেইলম্যানের ঘাড়ের উপর দিয়ে লেটারগুলো দেখার চেষ্টা করেন। মেইলম্যান কিছু একটা বলে মানুষটিকে।

মাথা নিচু করে মানুষটি একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ান। কিছুসময়। এরপর হাঁটতে শুরু করেন।

তবে মানুষটির চেহারা অস্পষ্ট এটিক থেকে। কারণ তার মাথায় কাউবয় টাইপের একটা হ্যাট থাকে সবসময়। 

গত দু'সপ্তাহের ছবি এটা। আমি এটিকের জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকি। মধ্য দুপুরে প্রতিদিন। যতক্ষণ না মানুষটি হাঁটতে হাঁটতে মিশে যায় ডাউনহিলের ওই রাস্তায়।

এখন মধ্য সামার। গত কয়েকদিন রেকর্ড ব্রেক হাই টেম্পারেচারে খুব ভোগান্তি গেলো। এটিক এপার্টম্যান্টগুলোতে সামারে খুব কষ্ট হয়। দোচালা ধাঁচের ছাদ সবটুকু তাপ শুষে ভেতরে উগড়ে দেয়।

আমি তাই সময় পেলেই বাথটাবে রিলাক্সিন সল্ট গুলে চুপচাপ কিছু সময় পড়ে থাকি। আজ সন্ধ্যাতেও তেমন ছিলাম।

ল্যাপটপে মৃদূস্বরে বেজে চলেছে জন ডেনভারের ' কান্ট্রি রোড টেক মি টুম হোম'

আমার চোখ বন্ধ। ঘর ভরে যাচ্ছে হলুদ আলোয়। সে আলো তীব্র হয়ে আমার বন্ধ চোখের পাতায় টোকা দিলো। আমি চোখ মেললাম। দেখলাম, জানালায় ঝুলে আছে হলদে চাঁদ। 

চাঁদ থেকে হলুদ আলো বাথটাবের পানিতে মিশতে লাগলো। বাথটাব ভরে গেলো নরম পাখির পালকে।আমি ডানা দু'টো পড়ে নিলাম।

আমি উড়ছি। আমি ছুটছি।

হঠাৎ আমার ডানা দু'টো থেমে গেলো। খুব মৃদূভাবে ভেসে আসছে হই হট্টগোলের আওয়াজ।অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই আওয়াজ তীব্র হলো। খুলে পড়লো আমার ডানা দু'টো। আমি ফিরে এলাম এটিক এপার্টম্যান্টের বাথটাবে।

তাকালাম চৌকো জানালায় । না, বড় হলদে চাঁদটা এখন আর জানালায় নেই।

আমি বাথটাব থেকে উঠলাম। কী ব্যাপার জানার আগ্রহ থেকে গিয়ে দাঁড়ালাম জানালায়।

নীচে স্ট্রীট লাইটের ম্লান আলো। দেখতে পেলাম কয়েকজন মানুষের জটলা। হঠাৎ তীব্র সাইরেন বাজিয়ে এলো এন ওয়াই পি ডি-র পুলিশ কার। সেই কারের আলোয় আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম ইকবাল চাচাকে।

পুলিশের সাথে উত্তেজিত হয়ে কিছু বলছেন।

বড় কোনো ঝামেলার আঁচ পেলাম। আমি নেমে এলাম এটিক থেকে।

তিনজন পুলিশ এসে দাঁড়িয়েছে লেটার বক্সের পাশে। বলা যায়, তারা ঘিরে দাঁড়ানো লেটার বক্সকে। ইকবাল চাচা অনবরত বলে চলেছেন,

' দ্যা ক্রেজি ম্যান ডেসট্রয় মাই লেটারবক্স। হি ইজ মেন্টালি আনস্টেবল। এভরি আফটারনুন হি কেম হেয়ার, গড নোজ হোয়াই? হি ক্যান ডু এনেথিং হার্মফুল টু আস। প্লিজ পুট হিম ইন জেইল। বাই দ্যা ওয়ে, হি ইজ এ্যা ইলিগ্যাল ইমিগ্রেন্ট।'

চাচীও চাচার স্বরের সাথে ডেসিমাল মিলিয়ে বলে উঠলো,

' আমাদের এটিক এপার্টম্যান্ট প্রায় দখল করে নিয়েছিলো। খুব অপরিছন্ন ছিল। বাথরুমের কী হাল করে রেখেছিলো!'

পুলিশ নয়, উত্তর এলো অন্য জায়গা থেকে। পুলিশের ঘিরে রাখা জায়গা থেকে কেউ বলে উঠলো,

'আই এম নট এ্যা ক্রিমিনাল। আই কেম হেয়ার অনলি ফর লেটার।'

এবার আমার চোখ গেলো মানুষটির দিকে। পুলিশের ঘের থেকে একটু বেরিয়ে এসেছে। আমার দিকে চোখ পড়লো তার। একটু হাসল। এরপর চিৎকার করে বলে উঠলো,

' ওয়েলকাম টু দিস হ্যাভেন।'

তারপরেই আচমকা সে দৌঁড়াতে শুরু করলো। ভেদ করে বেরিয়ে গেলো মানুষের দেয়াল।

অপ্রস্তুত পুলিশগুলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মানুষটি নেমে গেলো রাস্তায়। সে থামছে না। শুধুই ছুটছে। গ্রীণ ট্রাফিক সিগন্যাল অগ্রাহ্য করে সে ছুটছে।

তবে পারলো না বেশীদূর এগোতে। তাকে থামতে হল। সে থামলো একটা সিটিবাসের সামনে।

আমি ফিরে এসেছি এটিক এপার্টম্যান্টে। মধ্যরাত এখন। চারপাশ নিঃস্তব্ধ। তবে মাঝেমাঝে ব্যত্যয় ঘটছে। পাইন পাতার শব্দে। বাতাসে বাড়ি খেয়ে তা ঝরছে।

বাসার সামনে একটি গাড়ি এসে থামলো। ইকবাল চাচা ফিরলেন।

নীচের ফ্লোর থেকে সবসময়ই একটু আধটু কথা ভেসে আসে। আমি সাধারণত ইগনোর করি। অন্যের ব্যাপারে কিউরিয়াস কম আমি। কিন্তু আজ পারলাম না ইগনোর করতে।

' মারা গেছে হাসপাতালে।'

ইকবাল চাচার ম্রিয়মাণ কন্ঠ।

'আহারে! এদেশে এসে খুব কষ্ট করেছে। শেষে তো মাথাটাও খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।'

' ওর পকেটে এই চিঠটা ছিল।' ইকবাল চাচার মুখে 'চিঠি' শব্দটি শুনে আমি কান খাড়া করলাম।

'কই দেখি' চাচীর অত্যুৎসাহী কন্ঠ।

চাচী পড়ে চলেছেন।

নীহার,
আজ তোমাকে আর মিথ্যে বলবো না। এদেশে আমার কিচ্ছু নেই। বাড়ি নেই। চাকুরী নেই। গ্রীণকার্ড নেই।

ছিল শুধু তোমায় লেখা মিথ্যা চিঠিগুলো।

মিথ্যেয় ভরা চিঠিগুলোর জন্য ক্ষমা করো আমাকে।

ইতি
আকবর

চাচী থেমে গেলেন।

চারপাশ আবার নিস্তব্ধ। খুট করে একটি শব্দ হলো।

আমি তাকালাম জানালা দিয়ে নীচে। দেখলাম হলুদ চাঁদটি ভাঙা লেটারবক্সের পাশে নিষ্প্রভ পড়ে আছে।

1 টি মন্তব্য: