রোহণ কুদ্দুস


।।১।।

এক সোমবার সকালে কুবের সেন আবিষ্কার করলেন তাঁর ক্রেডিট কার্ড চুরি গেছে।
কুবের টিভির সামনে বসে কপালভাতি করছেন, ফোনটা এলো। ব্যাংকের ফোন। এক সুমধুরভাষিণী সুপ্রভাত ইত্যাদি জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “স্যর, আপনার দু’মিনিট সময় পাবো এখন?” সকাল সাতটার সময় ১০ সেকেন্ড সময় মেলাও মুশকিল। টিভি-র পর্দায় বাবা কুমারানন্দের দেখাদেখি কপালভাতি শেষ করে সোজা বাথরুম। দাড়ি কেটে, স্নান সেরে ঠিক সাড়ে সাতটায় তিনি খাবার টেবিলে। চিঁড়ে-কলা-চিনি মাখিয়ে হাপুশ-হুপুশ শব্দে জলখাবার সেরেই কুবের অফিসের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দৌড়ান বাসস্ট্যান্ডের দিকে। আটটার বাসটা ফসকে গেলে মুশকিল – অফিস পৌঁছাতে এখন পাঁচ মিনিট এদিক-ওদিক হলেই খচাং করে অর্ধেক দিনের মাইনে কাটা যায়। নতুন বসের মেজাজ টাকের কয়েক ইঞ্চি ওপরে চড়ে থাকে সবসময়।

কিন্তু কী আর করা? মোবাইলের ওদিক থেকে মিষ্টি করে এক ভদ্রমহিলা দু’মিনিট চাইছেন। তার ওপর ব্যাংক থেকে ফোন করছেন। তার মানে আজ কপালভাতিটা গেল। এই সাত সকালেই এরা অফিসে পৌঁছায় কী করে? ব্যাজার মুখে টিভিটা বন্ধ করে কুবের বারান্দায় এলেন – “বলুন ম্যাডাম।”
ফোনের ওপার থেকে ভদ্রমহিলা মিষ্টি হেসে বললেন – “স্যর, আপনার ক্রেডিট কার্ড বিল এখনও ডিউ। কাল বিল জমা দেওয়ার শেষ তারিখ। কালকের মধ্যে বিল জমা না দিলে লেট ফাইন দিতে হবে।” এহেন মিছরির ছুরি কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করার আগেই কুবের মনে করার চেষ্টা করলেন গত চার-পাঁচমাসে ক্রেডিট কার্ডে আদৌ কিছু কিনেছেন কিনা। এক মুহূর্ত চিন্তা করে বললেন – “ঠিক আছে ম্যাডাম, আমি টাকা জমা করে দেবো।” তারপরই মনে পড়ল অফিসের ঠিকানায় ‘ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট’ লেখা একটা লেফাফা প্রতি মাসেই আসে বটে; কিন্তু যেহেতু ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা বন্ধ করে দিয়েছেন, তাই সেগুলো আর খুলে দেখা হয় না। এ মাসেরটাও তাঁর টেবিলের হাজার কাগজপত্রের আড়ালে কোথায় যে পড়ে আছে কে জানে। তাই জিজ্ঞাসা করে ফেললেন – “কত বিল এসেছে বলবেন একটু?” ওদিক থেকে এবার মোক্ষম তীরটা এলো – “আপনার মোট ডিউ আছে আঠাশ হাজার তিনশো একুশ টাকা। লেট ফাইন এড়াতে কালকের মধ্যে অন্তত ছ হাজার পাঁচশো টাকা পে করতে হবে। হ্যাভ এ গুড ডে স্যর।”
ফোনটা রেখে কুবের ধাতস্থ হতে সময় নিলেন। এত টাকা কীভাবে খরচ হলো? শেষবার বিল মেটানোর পর তিনি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারই করেন নি।

মাস ছয়েক আগে পুজোর সময় পুরী যেতে ট্রেনের টিকিট কেটেছিলেন রেলওয়ের সাইট থেকে। কেটেছিলেন মানে তাঁর অফিসের দাশগুপ্ত কেটে দিয়েছিল। দাশগুপ্ত সেলস্‌-এ ঢুকেছে বছর দুয়েক, দারুণ চটপটে ছেলে। ট্রেনের টিকিট কাটতে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বের হবেন শুনে তাঁকে দেখিয়ে দিয়েছিল কোন ওয়েবসাইটে গিয়ে কী করে টিকিট বুক করতে হবে। শেষে ডেঁপোমি করে তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলেছিল – “ইন্টারনেটের মতো জিনিস হয় না সেনদা। ট্রেনের টিকিট হোক বা সগ্‌গের। একটা ক্রেডিট কার্ড থাকলেই কেল্লা ফতে।” ক্রেডিট কার্ড দিয়ে টিকিট কাটো, পরের মাসে বিল এলে ব্যাঙ্কে গিয়ে একটা চেক জমা দিয়ে দাও।
ব্যাপারটা বেশ মনে ধরল কুবেরের। তাঁদের বাড়ির কাছেই একটা শপিং মল মাথাচাড়া দিয়েছে বছরখানেক হয়ে গেল। সেদিন অফিসফেরতা স্বপনের সবজি দোকানটা পাশ কাটিয়ে সোজা ঢুকে পড়লেন ঝাঁ-চকচকে সেই শপিং মলে। নামটা জবরদস্ত – ‘স্বপ্নবাজার’; পুরো পাঁচতলা জুড়ে স্বপ্নের সওদাগরি। শাক-সব্জি, মাছ-মাংস, রান্নার হাঁড়ি-বাসন থেকে আরম্ভ করে জামাকাপড় – সব আছে।
একটা শপিং কার্ট টেনে নিয়ে ঘুরে ঘুরে রাজ্যের সবজি কিনলেন। দু’হাতে দুটো ক্যারি প্যাকেটের ভারে হাতের শিরা ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। কিন্তু কেনাকাটার শেষে টিভিতে দেখা সুদর্শন মডেলের মতো মানিব্যাগ থেকে ফস করে ক্রেডিট কার্ডটা বাড়িয়ে দেওয়ার যে আনন্দ, তার তুলনায় ওটুকু কষ্ট কিছুই নয়। কাউন্টারের ওদিকের মেয়েটা মিষ্টি হেসে তাঁর কার্ডটা নিয়ে ঘষে দিলো একটা গাবলু মার্কা যন্ত্রে আর তারপর বাড়িয়ে দিলো পেমেন্ট রিসিপ্ট। অটোগ্রাফ দেওয়ার মতো তাতে সই করে মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিলেন। তারপর দু’হাতে গাবদা দুটো প্যাকেট নিয়ে দরজার দিকে এগোতেই ইউনিফর্ম পরা দারোয়ান হাসিমুখে দরজা খুলে দিলো। ক্রেডিট কার্ডের কী মহিমা! সরকারি অফিসের ছাপোষা কেরানিকেও মুহূর্তের মধ্যে বাদশাহ বানিয়ে দেয়। কেন যে এই লাইনটা ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলো তাদের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করে না? “মুহূর্তের মধ্যে বাদশাহ!” হাঁচোড়-পাঁচোড় করে হাতের বোঝা দুটো নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে কুবের নিজের ভাবনায় পুলকিত হয়ে উঠলেন।
কিন্তু পরের মাসের ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট হাতে পেয়েই কুবেরের মনে একটা কুটিল প্রশ্নের উদয় হলো – মুহূর্তের মধ্যে বাদশাহ নাকি মুহূর্তের জন্যে বাদশাহ? তিনজনের পুরীর রিটার্ন টিকিট বাদ দিয়েও, চারবার স্বপ্নবাজারে বাদশাহগিরি, একটা সওনা বেল্ট আর একটা ফুট ম্যাসাজার। শেষ দুটো বস্তু তাঁর গিন্নির আবদারে টিভি-র বিজ্ঞাপন দেখে কেনা। বেল্টটার প্রথমবার ব্যবহারেই কোমর আর শিরদাঁড়ার ব্যথায় দু’দিন শয্যাশায়ী ছিলেন বলে ম্যাসাজারটাতে পা দিতে সাহস পেলেন না। তাঁদের কাজের লোক পঞ্চার মা বহুদিন ধরে একটা কাঠের পিঁড়ের জন্যে ঘ্যানঘ্যান করছিল; এখন ঐ ফুট ম্যাসাজারে বসে সে আনাজ কাটে, কাপড় কাচে।
সেই প্রথম এবং শেষবার কুবের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেছিলেন। বিল চোকাতে জমানো টাকাতেও হাত দিতে হয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলেন কার্ডটা পুড়িয়ে ফেলবেন বা মাটিতে পুঁতে দেবেন। কিন্তু অসময়ে কাজে লাগতে পারে ভেবে কার্ডটার অন্তিম সংস্কার না করে কাউকে কিছু না জানিয়ে সেটা লুকিয়ে রেখেছিলেন শোবার ঘরের বাঙ্কের ওপর – বাতিল একটা কার্ডবোর্ডের বাক্সে পুরানো কিছু খবরের কাগজ আর পত্রিকার মধ্যে একটা খামে মুড়ে। এই ক’মাসে তিনি ক্রেডিট কার্ডটার অস্তিত্ব প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন।

ফোন রেখে কুবের হাজির হলেন শোবার ঘরে। মনের মধ্যে বুদবুদের মতো হাজারটা কী, কোথায়, কেন-র ওপরে ঘুরছে একটা বড় জিজ্ঞাসা চিহ্ন – কে?
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করার মতো বদখেয়াল গিন্নির হবে না। তাহলে কি পুলু? তাঁর ছেলে পুলু সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। এই বয়সেই ছেলেমেয়েদের বাবার ক্রেডিট কার্ডের মতো নির্ভার পাখনার প্রয়োজন হয়। বাঙ্ক থেকে বাক্সটা চটজলদি নামিয়ে কয়েকটা কাগজ এদিক-ওদিক সরিয়ে খামটা পেয়েও গেলেন। যেভাবে রেখেছিলেন, সেভাবেই সেলোটেপ আঁটা আছে একেবারে। কাঁপা-কাঁপা হাতে খামটা ছিঁড়তেই তার পেট থেকে বেরিয়ে এলো একদা তাঁর গলায় ফুটে থাকা হাড় – ‘কুবের সেন’ লেখা প্লাস্টিকের সেই আশ্চর্য চিরাগ। কার্ডটা হাতে নিয়ে বিস্ময়ের চোখে সেটা উলটে-পালটে দেখছেন, হঠাৎ গিন্নি হাজির – “সক্কাল-সক্কাল এই ময়লাগুলো ঘরে না ফেললেই নয়? পঞ্চার মা আজ আসবে না। আমার ঘর মুছতে মুছতে দুপুর হয়ে যাবে। আর কাজ না বাড়িয়ে চান করতে যাও।”
চান করতে করতে কুবের চিন্তায় ডুবে গেলেন। তাঁর ক্রেডিট কার্ড খোওয়া যায় নি। গত চার-পাঁচ মাস ধরে খামবন্দি পড়ে আছে। অথচ ঐ কার্ডে তাঁর বকেয়া আঠাশ হাজার টাকা! নিশ্চয় ব্যাঙ্ক থেকে কোনও গণ্ডগোল করেছে। আর কারও ক্রেডিট কার্ড বিল তাঁর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। কুবের ঠিক করলেন এদের কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে কড়কে দেবেন।
হঠাৎ দরজায় গুমগুম ঘুষি – “বাবা, তোমার হলো? আমার কলেজ যাওয়া হবে না আজ আর।” পুলুর মুষ্ট্যাঘাতে কুবেরের সম্বিত ফিরল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে জামাপ্যান্টে নিজেকে সেঁধিয়ে দিয়ে কোনওরকমে নাকে-মুখে দুটো গুঁজেই ছুটলেন বাস ধরতে।

নিজের নির্ধারিত সিটে বসেই কুবের ফোঁত করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে দেখলেন পাশের সিটের অনিমেষ সান্যাল তাঁর দিকে ভ্রুকুটি নিয়ে তাকিয়ে আছেন – “এরকম ঝোড়ো কাকের মতো উড়তে উড়তে এলে? ব্যাপার কী?” কুবের আঙুল চালিয়ে মাথার চুলগুলো ঠিক করতে করতে আলগোছে উত্তর দিলেন – “আর বোলো না। সকাল-সকাল ঝামেলায় পড়েছি।” সান্যাল তাঁর কুড়ি বছরের সহকর্মী। প্রায় দিনই পাশাপাশি বসে অফিসে যান। সংসারের মোহমায়া, স্ত্রীর মুখঝামটা, সরকারের স্বজনপোষণ, বিরাট কোহলির তিরিক্ষি মেজাজ – এই সব নিয়েই সুখ-দুঃখের কথা হয় একটু-আধটু। তাই আজকের ক্রেডিট কার্ড কাণ্ডের কথাও বলেই ফেললেন কুবের।
ঘটনা শুনে সান্যাল চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন কুবেরের দিকে – “আমি তখনই বলেছিলুম কিন্তু। ঐ ফাঁদে পা দিওনি। শুনলে আমার কথা? কোথাকার কে মেয়ে, জানা নেই, শোনা নেই; তার মায়ের কিডনি অপারেশনের জন্যে তুমি ক্রেডিট কার্ড নিয়ে ফেললে।”
কুবের সংশোধন করে দিলেন – “মায়ের অপারেশন নয়, দিদির। বিধবা দিদির।” সান্যাল নাক দিয়ে ঘোঁৎ করলেন একটা – “ঐ হলো। মা অন্ধ। বিধবা দিদির কিডনি ফেল। আর ভাইয়ের হাত উড়ে গেছে বোম বাঁধতে। এ যেন হিন্দি ফিলিম দেখছি। আর তার মধ্যে তুমি হয়েছো ত্রাতা। ফাদার ফিগার।” এই নিয়ে সান্যাল আগেও তাঁকে কথা শুনিয়েছেন। তাই কুবের এই প্রসঙ্গ এড়াতে জানালার বাইরে মনোনিবেশ করলেন। সান্যাল তবু ছাড়ার পাত্র নন – “তখন খুব তো ক্রেডিট কার্ড গছিয়েছিল। এখন তাকে ফোন করে বলো কেমন বাঁশটা খেয়েছো তুমি।”

মেয়েটার নাম মল্লিকা। কী করে তাঁর ফোন নাম্বার পেয়েছিল কে জানে। একদিন রোববার দুপুরে ফোন করে জিজ্ঞাসা করল – “স্যার, আপনার ক্রেডিট কার্ড দরকার?” কুবের খাওয়া-দাওয়ার পাট সেরে সবে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়েছেন। মেয়েটা ক্রেডিট কার্ডের মহিমা ব্যাখ্যান যা করল তার অর্ধেক কানের বাইরেই থেকে গেল, যেটুকু ঢুকল তার পুরোটাই আবার কান থেকে গড়িয়ে বালিশে পড়ে গেল। ফোনটা কোনওমতে কাটতে পারলে বাঁচেন, তাই আলগোছে দু-চারটে ‘হুঁ-হাঁ’ করে ফিরে গেলেন দিবানিদ্রায়।
‘না’ বলতে পারাটা যে মানুষকে কত বড় ঝামেলার হাত থেকে বাঁচাতে পারে সেটা কুবের টের পেলেন পরের দিন। অফিসে একগাদা ফাইলের মধ্যে ডুবে আছেন; এক মহিলার ফোন এলো – “স্যর, মল্লিকা বলছি। আপনি ডকুমেন্টগুলো এনেছেন তো?” কুবের আকাশ থেকে পড়লেন – “কীসের ডকুমেন্ট?” ফোনের ওপ্রান্তে মল্লিকা বেশ ক্ষুব্ধ – “আপনার ক্রেডিট কার্ডের ডকুমেন্ট। কাল কথা হলো যে?” ভাতঘুমের আবছা স্মৃতি হাতড়ে বিশেষ সুবিধা করতে না পেরে কুবের ব্যস্ততা দেখালেন – “আমার এখন অনেক কাজ। আপনি পরে ফোন করুন।” ওদিক থেকে করুণ স্বর ভেসে এলো – “কিন্তু স্যর আপনি যে কাল বলেছিলেন আপনার অফিসে আসতে। আমি কতদূর থেকে এলাম। আবার ফিরে যাবো?”
মেয়েটা তাঁর অফিসের উলটোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে। কুবের রাস্তার দু’দিক দেখে নিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হলেন। এই আপদ এখনই ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। ক্রেডিট কার্ডের মতো সৌখিন জিনিস তাঁর মতো ছাপোষা লোকের জন্যে নয়। টাকাপয়সা প্লাস্টিকের হলে নেহাতই খেলনা মনে হয়। তিনি মেয়েটার কাছে আসতেই মেয়েটা তার কাঁধের ঝোলা থেকে ফস করে একটা ফর্ম বের করল – “স্যর এই ফর্মটাতে আপনাকে তিন জায়গায় সই করতে হবে। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। সাথে প্যান কার্ড, পাসপোর্ট বা ভোটার আইডি কার্ড...” মেয়েটাকে থামিয়ে দিয়ে কুবের দৃঢ় গলায় বললেন – “দেখুন দিদিমণি, আমার ক্রেডিট কার্ডের দরকার নেই। কাল বোধহয় আমি ঘুমের ঘোরে ছিলাম, তাই আপনাকে অফিসে আসতে বলেছিলাম। কিন্তু সত্যি করেই আমার কোনও কার্ডের...” কথা শেষ করতে পারলেন না কুবের। তার আগেই মেয়েটা ফোঁপাতে আরম্ভ করেছে।
“আপনি প্লিজ একটু ভাবুন স্যর, বাড়িতে চারজন মানুষ আমরা। একা আমাকে সংসার চালাতে হয়। মা আগে সেলাই শেখাত, এখন চোখের অসুখে আর দেখতেই পায় না। বাবা চলে যাওয়ার আগে দিদির বিয়ে দিয়েছিল, সেও বিধবা হয়ে গেল। এখন তার কিডনির অসুখ। একটা ভাই। কুসঙ্গে পড়ে সেও গোল্লায় গেছে।” কুবের পড়লেন মহা ফাঁপরে। মেয়েটা কথা বলতে বলতে ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ করে কাঁদছে। তাঁর মতো মধ্যবয়স্ক মানুষের সামনে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকা তরুণী বোধহয় খুব একটা শুভ লক্ষণ নয়। আশেপাশের পথচারীরা ঘুরে ঘুরে দেখছে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে পকেট থেকে রুমাল বের করে মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিয়ে একটু নরম গলায় বললেন – “দ্যাখো মল্লিকা, এইভাবে কেঁদো না। এই নাও।” মানিব্যাগ থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে বললেন – “এটা রাখো। বাসভাড়া।” মেয়েটা ফোঁপাতে ফোঁপাতে টাকাটা তাঁর হাত থেকে নিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় প্রশ্ন করল – “আপনি সত্যিই কার্ডটা করাবেন না? আপনারটা হলেই এ মাসে পঞ্চাশটা হয়ে যেত। দিদির অপারেশান করাতে টাকার খুব দরকার।”
কুবের মেয়েটাকে ভালো করে দেখলেন এতক্ষণে। এলোমেলো চুল, চোখে মুখে অযত্নের ছাপ স্পষ্ট, পরণে একটা ছাপা সালোয়ার কামিজ, হাতের সরু কব্জিতে একটা শস্তা ঘড়ি। কেমন মায়া হলো। তাঁর ছেলে পুলুরই বয়সী হয়ত। এই বয়সে এই একা মেয়েকে সংসার চালাতে হচ্ছে। একটু দোনামনা করে জিজ্ঞাসা করলেন – “কার্ডটা নিলে কী ব্যবহার করতেই হবে? আমার তো ক্রেডিট কার্ড কোনও কাজে লাগে না। বুঝতেই পারছ।”

দিন দশেকের মধ্যেই ক্রেডিট কার্ড পৌঁছে গিয়েছিল তাঁর অফিসের ঠিকানায়। মল্লিকার কথা এখন মনে পড়ে যেতেই কুবের মোবাইল থেকে তার নাম্বারটা খুঁজে বের করলেন।
দু’চারবার রিং হতেই ওদিক থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো – “কে বে?” কুবের আন্দাজ করলেন, নিশ্চয় মল্লিকার বখাটে ভাইটা। গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর হলেন – “মল্লিকা আছে?” ওপারের ব্যক্তিটি একটু থমকে জিজ্ঞাসা করলেন – “কী দরকার?” কুবের একই স্বরে বললেন – “সেটা মল্লিকাকেই বলব। ফোনটা দিন।” ওদিক থেকে ঘ্যাসঘ্যাস করে হাসি ভেসে এলো – “আমাকে টপকে মল্লিকা, চন্দনা, রেশমা কাউকে পাবেন না। কী দরকার আমায় বলুন। আর যদি মাল দেখার পর টাকাপয়সার কথা বলতে চান, আমার অফিসে চলে আসুন। পুরো ক্যাটালগ নামিয়ে দেবো।”
ফোন কেটে সান্যালের দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত হাসলেন কুবের – “মনে হয় মল্লিকার নাম্বার বদলে গেছে।”


।।২।।

অফিসে পৌঁছে প্রথম দু’ঘণ্টা অন্য আর কিছু চিন্তার সুযোগ পেলেন না কুবের। সোমবারের সকালের ঝড়-ঝাপটা সামলে সাড়ে এগারোটা নাগাদ একটু ফুরসত পেতেই তাঁর টেবিলের কাগজপত্র হাতড়াতে আরম্ভ করলেন। ক্রেডিট কার্ডের স্টেটমেন্টটা খুঁজে বের করা দরকার। খুঁজতে খুঁজতে দু’মাস আগের একটা স্টেটমেন্ট বের হলো। এমন সময় এসে হাজির দাশগুপ্ত – “সেনদা, এই বিলটা ভেরিফাই করা দরকার। লাস্ট মান্থের এরিয়ারে ঢুকে গেছে। সকাল থেকে বড়কর্তা আমার মাথা খাচ্ছেন।” তারপরই কুবেরের টেবিলের ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্র আর ফাইলের লটবহর অবস্থা দেখে মুচকি হাসল – “কী হারালেন আবার?”
দাশগুপ্তকে পেয়ে কুবের আশার আলো দেখতে পেলেন। সোমবার সবার তাড়া থাকে, তাই সংক্ষেপে ব্যাপারটা সারলেন – “আমার ক্রেডিট কার্ডে আঠারো হাজার টাকা বিল এসেছে বলছে, কিন্তু আমি লাস্ট ক’মাস ওটা ইউজই করিনি। কী করি বলো তো?” দাশগুপ্ত যা উত্তর দিলো, তাতে আশার আলো লোডশেডিং-এর রাতে তেল কমে আসা হ্যারিকেন হয়ে গেল।
বাইরের দেশে নাকি এখন প্রচুর এরকম ঘটনা ঘটছে। অনলাইন হ্যাকিং, ব্যাঙ্ক থেকে তথ্য চুরি এরকম আরও হাজারো উপায়ে ক্রেডিট কার্ড নাম্বার, তার এক্সপায়েরি ডেট, সিভিভি নাম্বার ইত্যাদি হাসিল করে বদমাশ কিছু লোকজন সাধারণ মানুষের পকেট ফাঁক করছে। চিন্তার বিষয় হলো, সম্প্রতি ভারতেও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সাথে সাথে ক্রেডিট কার্ড লুটেরার সংখ্যাও বিপজ্জনক হারে বাড়ছে।
কুবেরের মাথায় হাত দেখে দাশগুপ্ত তাঁর কাঁধে হাত রাখল – “প্রথমে কার্ডটা ব্লক করুন। তারপর থানায় গিয়ে ডায়েরি করুন একটা।” কুবের টেবিলে রাখা জলের বোতল থেকে এক ঢোক জল খেয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করলেন – “কার্ড ব্লক করব কী করে?” দাশগুপ্ত একেবারে মুশকিল আসান পীর – “কাস্টমার কেয়ারে ফোন করুন। আপনার ক্রেডিট কার্ড নাম্বার বলুন। ব্যাস! তারপর আর যাই ঘটুক না কেন আপনার কার্ড আর কেউ ব্যবহার করতে পারবে না।” কুবেরের হ্যারিকেন এবার লো ভোল্টেজের টিমটিমে একশো ওয়াট বাল্ব – “কিন্তু ঐ আঠাশ হাজারের কী হবে?” দাশগুপ্ত হাতের কাগজটা সামনে বাড়িয়ে ধরে তাড়া দিলো – “সেটা তো আমি জানি না, ব্যাঙ্ক বলতে পারবে। আপনি প্লিজ এই বিলটা ভেরিফাই করে দিন।”

দাশগুপ্তকে বিদায় করে কুবের খুঁজে পাওয়া স্টেটমেন্ট থেকে কাস্টমার কেয়ারের একটা নাম্বার পেলেন। সেটাতে ফোন করতে ঝাড়া পাঁচ মিনিট ধরে এক মেশিনকণ্ঠী তাঁকে আশ্বাস জোগাতে লাগলেন শীঘ্রই কেউ না কেউ তাঁকে সাহায্য করবেন, কাস্টমার কেয়ারের সমস্ত কর্মী অন্য গ্রাহকদের খিদমত করতে ব্যস্ত। বারবার একই কথা শুনতে শুনতে কুবের যখন ফোনটা কাটবেন ভাবছেন, তখনই একজন মানুষের গলা পাওয়া গেল ওদিক থেকে – “নমস্কার স্যর। আমার নাম বিকাশ, আপনার ফোন ব্যাঙ্কিং অফিসার। আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?”
কুবের সংক্ষেপে তাঁর সমস্যার কথা জানিয়ে বললেন – “আমি আমার ক্রেডিট কার্ডটা ব্লক করতে চাই।” বিকাশ জানতে চাইল – “স্যর ব্লক করার কারণ কি? আপনি কার্ডটা হারিয়ে ফেলেছেন? নাকি চুরি হয়েছে?” কুবের বিস্মিত গলায় বললেন – “আমি তো এখনই বললাম আপনাকে। আমার কার্ড আমার কাছেই আছে। আমি ব্যবহার করিনি। কিন্তু তবু তাতে নাকি আঠাশ হাজার টাকার টাকার বিল এসেছে।” বিকাশ বিজ্ঞের মতো ভারি গলায় বলল – “ব্যাপারটা জটিল। যাই হোক, আপনার কার্ডের নাম্বারটা বলুন।” স্টেটমেন্ট দেখে ষোল সংখ্যার একটা নাম্বার আওড়ালেন কুবের।
সামান্য নীরবতার পর বিকাশ বিরক্ত গলায় বলল – “কিন্তু স্যর, আপনার কার্ডের আউটস্ট্যাণ্ডিং এ্যামাউন্ট জ়িরো। আপনি আঠাশ হাজার বলছেন কেন?” কুবের প্রথমে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন – “আপনাদের ব্যাঙ্ক থেকে এক ভদ্রমহিলা সক্কাল সক্কাল ফোন করে মজা করেছেন তাহলে। আপনারাই জানেন। যাই হোক, আমি তবুও কার্ডটা ব্লক করাতে চাই।” বিকাশ ওদিক থেকে সতর্ক গলায় জিজ্ঞাসা করল – “স্যর, আপনাকে হয়ত ভুল করে কেউ ফোন করেছিলেন, কিন্তু তার জন্যে আপনি কার্ডটা ব্লক করে দেবেন? যদি কোনও বিপদে-আপদে দরকার পড়ে?” কুবের এবার অধৈর্য্য হলেন – “এই কার্ড ব্লক না করলেই আমি একদিন না একদিন বিপদে পড়ব। বেশি পাঁয়তারা না করে যেমন বলছি, তেমন করুন।”

কিন্তু পরের দিনই ব্যাঙ্ক থেকে আবার ফোন এলো।  বক্তব্য প্রায় একই। আঠাশ হাজার তিনশো একুশ টাকার মধ্যে অন্তত সাড়ে ছ হাজার আজকের মধ্যে না দিলে লেট ফাইন যোগ হবে পরের মাসের স্টেটমেন্টে। কুবের বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললেন – “দেখুন ম্যাডাম, কিছু একটা ভুল করেছেন আপনারা। আমি কালই আপনাদের কাস্টমার কেয়ারে ফোন করেছিলাম। একজন বললেন, আমার কার্ডে কোনও ডিউ নেই। আমি কার্ডটা ব্লকও করে দিয়েছি।” ওদিক থেকে ভদ্রমহিলা সামান্য থমকালেন – “আপনার ক্রেডিট কার্ড নাম্বারটা বলবেন প্লিজ।” গতকালের খুঁজে পাওয়া স্টেটমেন্টটা হাতের কাছেই ছিল। সেটা দেখে কার্ডের নাম্বার বললেন কুবের। দু-তিন সেকেন্ড চুপ করে ওদিক থেকে বিনীত গলায় ভদ্রমহিলা বললেন – “স্যর, আপনি ঠিকই বলেছেন। যে কার্ড নাম্বার আপনি দিয়েছেন, সেটাতে কোনও কিছু কেনাকাটা করা হয়নি। এক টাকাও ডিউ নেই। কিন্তু...” একটা নাটকীয় সেমি কোলন বসিয়ে ভদ্রমহিলা বোমাটা ফাটালেন এবার – “আপনার এই কার্ডের একটা এ্যাড অন কার্ড নিয়েছিলেন আপনি গত মাসে। সেই কার্ডে আঠাশা হাজার তিনশো একুশ টাকা ডিউ আছে।”
কুবের তোতলালেন – “এ্যাড অন কার্ড মানে?” ওদিক থেকে স্কুল টিচারের গলায় ব্যাখ্যা এলো – “কোনও কার্ড হোল্ডার চাইলে তাঁর প্রথম ক্রেডিট কার্ডের সাথেই অন্য আর একটা ক্রেডিট কার্ডের জন্যে আবেদন করতে পারেন। সাধারণত স্ত্রী বা পরিবারের আর কারোর নামে সেটা নেওয়া হয়, উপহার দেওয়ার জন্যে।” কুবের প্রতিবাদ করলেন – “কিন্তু আমি তো আর কোনও কার্ডের জন্যে এ্যাপ্লাই করিনি।” ওদিক থেকে ভদ্রমহিলা কঠিন স্বরে উত্তর দিলেন – “স্যর, আমাদের রেকর্ড বলছে আপনি কাস্টমার কেয়ার ফোন করে একটা এ্যাড অন কার্ডের জন্যে এ্যাপ্লাই করেছিলেন এবং গত ১২ই এপ্রিল আপনার অফিসের ঠিকানায় কার্ডটা ক্যুরিয়রে পাঠানো হয়েছিল। আপনি সেটা সই করে নিয়েছেন।” কুবেরের মাথায় বিশেষ কিছুই ঢুকছে না আর। কী আতান্তরে যে পড়লেন! তবু ক্লান্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন – “আর ঐ কার্ডের স্টেটমেন্টও কি আমার অফিসের ঠিকানাতেই পাঠিয়েছেন আপনারা?” সামান্য সহানুভূতির সুরে ভদ্রমহিলা বললেন – “হ্যাঁ স্যর। আপনি চাইলে আমাদের কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে এই কার্ডটাও ব্লক করাতে পারেন। আর আপনি নিজে যদি এ্যাশ অন কার্ডের জন্যে এ্যাপ্লাই না করে থাকেন, তাহলে পুলিশকেও জানাতে পারেন। তবে আপাতত এ মাসের স্টেটমেন্টের হিসাব মতো টাকাটা মিটিয়ে দিতে হবে।”

“একটা টাকাও দেবেন না সেনদা। আমার কথা শুনুন। পুলিশে কমপ্লেন করুন।” দাশগুপ্ত বেশ জোর দিয়ে বলল। সান্যাল ঢ্যাঁড়স ভাজা দিয়ে রুটির টুকরো মুখে ঢুকিয়ে বললেন – “আর একটা কার্ডের জন্যে তুমি এ্যাপ্লাই করো নি। তাহলে কার্ডটা এলোই বা কী করে? আর সেটা নিয়ে খরচাই বা করছে কে?” অফিসের ক্যান্টিনে রোজ না হলেও প্রায়ই একসাথে লাঞ্চ করেন তাঁরা। বাড়ি থেকে আনা ডিমের তরকারি কুবেরের মুখে রুচছে না আজ। তিনি কাঁধ ঝাঁকালেন – “কোনও আইডিয়া নেই।”
দাশগুপ্ত উত্তেজিত গলায় বলল – “এ তো জলের মতো পরিষ্কার ব্যাপার। একটা জালিয়াত চক্র ব্যাঙ্কের দু-চারজন লোককে ঘুষ দিয়ে অনেক লোকের... ধরুন, শ’খানেক বা হাজার খানেক লোকের ক্রেডিট কার্ড ডিটেলস বের করেছে। তারপর তারা ক্রেডিট কার্ডের আসল মালিক সেজে এ্যাড অন কার্ডের জন্যে কাস্টমার কেয়ারে ফোন করছে। তারপর তারা তক্কে তক্কে থাকছে, ক্যুরিয়ারের লোকজন কার্ডটা ডেলিভার করতে এলে আসল মালিকের বদলে তারা সেটা হস্তগত করছে। হয়ত এর জন্যে ক্যুরিয়ার কোম্পানির কিছু লোককেও তারা টাকা খাইয়ে রেখেছে।”
সান্যাল মাথা নেড়ে হাসতে হাসতে বললেন – “তুমি ডিকেটটিভ গপ্পো লেখো নাকি হে ছোকরা? কোত্থেকে পাও এসব?” দাশগুপ্ত এই টিপ্পনীতে পাত্তা না দিয়ে কুবেরকে বলল – “আপনি থানায় গিয়ে একটা ডায়েরি করে আসুন সেনদা।”
কুবের ব্যাজার গলায় বললেন – “ফোনটা আসার পরেই থানায় ছুটেছিলাম। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। দারোগাবাবু সব শুনেটুনে বললেন, আপনার বাড়ি তো বাগনানে। সেখানেই ডায়েরি করতে হবে।”
সান্যাল অবাক গলায় বললেন – “কিন্তু তোমার কার্ড তো অফিসের ঠিকানায় এসেছে। যারা কার্ডটা হাতিয়েছে, তারাও এখানেই কাজটা করেছে বোঝা যাচ্ছে। তাহলে বাগনানের পুলিশ কী করবে?”
চেয়ারে হতাশ ভাবে গা এলিয়ে দিলেন কুবের – “আমিও সেটাই বললাম। সামান্য তর্কাতর্কিও হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডায়েরি নিলো না। বলে কিনা, হয় বাগনানে গিয়ে ডায়েরি করতে, নাহলে লালবাজারে সাইবার ক্রাইম বাঞ্চে গিয়ে কমপ্লেন করে আসতে।”
দাশগুপ্ত তেতোমুখে বলল – “পুলিশের এসব ব্যাপার তো আর নতুন কিছু নয়। হয়ত বাগনান থানার পুলিশ বলবে কার্ড অফিসের ঠিকানায় এসেছিল, তাই এই থানায় কমপ্লেন লেখাতে। আপনাকে বোধহয় ঐ লালবাজারেই যেতে হবে।” সবার খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, তাই টিফিন বাক্স গোছাতে গোছাতে দাশগুপ্ত আবার প্রশ্ন করল, “যাক গে, এই নতুন কার্ডটাও ব্লক করে দিয়েছেন তো?”

না। নতুন কার্ডটা কুবের এখনও ব্লক করেননি। ব্যাঙ্ক থেকে ফোনটা পাওয়ার পর নতুন কার্ডের স্টেটমেন্টটা তিনি খুঁজেপেতে বের করে তড়িঘড়ি থানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু থানায় ডায়েরি না করাতে পেরে নিজেই স্টেটমেন্টটা খুঁটিয়ে দেখছিলেন। এক মাসে আঠাশ হাজার টাকা যে কেউ খরচ করতে পারে। কিন্তু এই লোকটা যতই জালিয়াত হোক না, খরচের হিসাবে চোখ বোলালেই বোঝা যায় বেশ রুচিশীল।
প্রথমেই একটা অনলাইন বুকস্টোর থেকে রবীন্দ্র রচনাবলীর সেট। ইস্কুলে পড়ার সময় ব্রজেনবাবুর কাছে ইংরাজি পড়তে যেতেন কুবের। পড়ার ঘরের বুকশেলফে সারি দিয়ে সাজানো থাকত রবীন্দ্র রচনাবলীর সব কটা খণ্ড। সেই থেকে সাধ জেগেছিল, একদিন নিজেও কিনবেন। কলেজে পড়ার সময় টিউশানি পড়িয়ে টাকা জমাতেন। কিন্তু একশোর গণ্ডি পেরোনোর আগেই কোনও না কোনও ভাবে সেই টাকা খরচ হয়ে যেত। কখনও কেনা হয়নি। এখনও পরিচিতদের কারও বাড়ি বইগুলো দেখতে পেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে অজান্তে।
তারপর আছে কলকাতার একটা অভিজাত পাঞ্জাবী দোকানের সাড়ে চার হাজার টাকার বিল। নিশ্চয় দামী ধুতি-পাঞ্জাবী। নিজের বিয়ের সময় এমন পোশাক পরতে পান নি তিনি। সদ্য চাকরি পেয়েছেন তখন, বাবার সামান্য পেনশন। তাই সাধ থাকলেও তাঁর বিয়ের সব কিছুই ছিল অনাড়ম্বর।
তারপর আরও কিছু ছোটখাটো জিনিস। একটা এম পি থ্রি প্লেয়ার, পুলু গতবার জন্মদিনে বলেছিল কিনে দিতে। এই মাসে, পরের মাসে... এভাবে কখনও সেটা কেনা হয় নি।
কলেজে থাকতে বিনতা বায়না করেছিল একদিন দামী রেস্তোরাঁয় গিয়ে খেয়ে আসার। কুবের কথা দিয়েছিলেন, চাকরি পেলেই। কিন্তু বিনতা অপেক্ষা করেনি। সে আর কারও সাথে সেই রেস্তোরাঁয় যাতায়াত শুরু করল। কুবেরের বুকের মধ্যে রোলার গড়িয়ে গেল। নাম করা একটা রেস্তোরাঁয় আড়াই হাজার টাকা খরচ।
ঈর্ষায় কুবেরের চোখ জ্বালা করতে লাগল। সারা জীবন তিনি নিজে যা করতে চেয়েছেন, যা পেতে চেয়েছেন, তার বেশ কিছু জিনিস লোকটা এই এক মাসে তাঁর হয়ে করে ফেলেছে; তাঁরই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে। লোকটাকে দেখতে তাঁর দারুণ ইচ্ছা করছে। পুলিশ সাহায্য না করুক, তিনি নিজেই লোকটাকে খুঁজে বের করবেন। তারপর তাকে বুঝিয়ে দেবেন, অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে নিজের শখ মেটানোটা খুব সহজ। কিন্তু একমাস তাঁর জুতোতে পা গলিয়ে, তাঁর মতো করে বেঁচে, তাঁর মাইনেতে সংসার চালিয়ে তাঁর ক্রেডিট কার্ডটা এভাবে ব্যবহার করে দেখাক লোকটা।

ফেরার পথে বাসে বসে বসে লোকটাকে ধরার ফন্দি বের করতে লাগলেন কুবের। তাঁর ক্রেডিট কার্ড চোর ধূর্ত হলেও একটা সূত্র ঠিকই ছেড়ে গেছে। কার্ড স্টেটমেন্টের শেষের দিকে পাওয়া গেছে একটা ব্যায়ামাগারের নাম, যাকে আজকাল লোকে জিম বলে ডাকে। ‘আইরন ম্যান জিম’-এ সপ্তা দুয়েক আগে ভর্তি হয়েছে লোকটা। জিমটা তাঁদের অফিসের কাছেই, বাস থেকে নেমে অটো রিক্সা করে অফিসে যাওয়ার পথে পড়ে। রোজই দেখতে পান বড় একটা হোর্ডিং-এ ইংরাজিতে লেখা আছে জিমের হাজার ফিরিস্তি। আর একপাশে শরীরের সবকটা পেশী বের করে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে একটা পালোয়ান। কাচের দরজা-জানালা বসানো ঝাঁ-চকচকে একটা দোতলা বাড়ি। বাইরে থেকেই দেখা যায় দেহ কসরতের আধুনিক সব যন্ত্রপাতি। অফিস থেকে ফেরার সময় দেখেন শেষ বিকালে বেশ কিছু ছেলেমেয়ে সেখানে ব্যায়াম করছে।
কুবেরের একটা মধ্যবিত্তমাফিক ভুঁড়ি গজিয়েছে বছর দশেক। ছেলে প্রায়ই বলে, “বাবা, ওসব ভুঁড়ি-ফুঁড়ির দিন গেছে। দরকার হলে জিমে ভর্তি হও, বাড়িতে ব্যায়াম করো, যা খুশি করো। কিন্তু প্লিজ ভুঁড়ি কমাও। আমার বন্ধুরা হাসাহাসি করে।” জিমে গিয়ে শরীরচর্চার সময় কোথায়? তাছাড়া ছাপোষা কেরানীদের ওসব বিলাসিতা মানায় না। তাই টিভিতে বাবা কুমারানন্দের দেখাদেখি কপালভাতি করেন রোজ সকালে উঠে। দ্রুত ফল পেতে গিন্নির কথা মতো সওনা বেল্টও কিনেছিলেন। কিন্তু সেটা আর কাজে লাগল কোথায়?
নিজের ভুঁড়ি ছেড়ে কুবের আবার আসল রাস্তায় নিয়ে এলেন চিন্তাকে। যতই কায়দা করুক না কেন লোকটা, কুবের মনে মনে হাসলেন, ‘কুবের সেন’ লেখা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে জিমে ভর্তি হতে লোকটাকে নিশ্চয় নিজেকে কুবের সেন নামেই পরিচয় দিতে হয়েছে। কুবের ঠিক করলেন, আগামীকালই আয়রন ম্যান জিমে হানা দেবেন। আর ঠিক এই কারণেই এই কার্ডটা ব্লক করান নি তিনি। লোকটা সতর্ক হয়ে যেতে পারে। না হয় আর একদিন তাঁর কার্ড নিয়ে আরও হাজারটা টাকা খরচা করবে। কিন্তু হাতে-নাতে ধরতে পারলে, পুরো টাকাটা কড়ায়-গণ্ডায় উশুল করে নেবেন। 

“আমি কুবের সেনের সাথে দেখা করতে চাই। উনি এখন আছেন এখানে?”
রিসেপশানের মেয়েটা তাঁকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে উত্তর দিলো – “সরি স্যর। আমরা এভাবে কারও ইনফরমেশান দিতে পারি না।”
কুবের আন্দাজ করেছিলেন এমন উত্তর পেতে পারেন। তাই ভারিক্কি চালে বললেন – “ম্যাডাম, আমি পুলিশ থেকে এসেছি।” মেয়েটা তাঁকে একবার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল। মিনিট খানেকের মধ্যেই সাথে আর একজন ষণ্ডা মতো লোককে নিয়ে এলো। লোকটা এসে কুবেরকে জিজ্ঞাসা করল – “কী চাই?”
কুবের প্রমাদ গণলেন। ভেবেছিলেন পুলিশ শুনেই ঝটপট সব উগরে দেবে মেয়েটা। কিন্তু তার বদলে সে ডেকে এনেছে এই পালোয়ানকে। কুবের ঘাবড়ালেও টানটান বুক ফুলিয়ে দাঁড়ালেন – “আমি কুবের সেনের সঙ্গে দেখা করতে চাই।” ষণ্ডা লোকটা সরু চোখে তাকাল – “আপনি নাকি পুলিশের লোক? আইডি দেখান স্যর।”
কুবের শেষ চেষ্টা করলেন। বেশ মেজাজ দেখিয়ে বললেন – “দেখুন। পুলিশের কাজে বাধা দেবেন না। আমার অত সময় নেই। কুবের সেন থাকলে ওনাকে ডেকে দিন। নাহলে বলুন কখন এলে ওনাকে পাবো।” ষণ্ডাটা অবিচল গলায় বলল – “অনেকেই ওসব গপ্পো দেয় দাদা। যদি পুলিশের লোক হন, আইডি দেখান। যা জানতে চান, পাবেন। নাহলে ঝামেলা করবেন না প্লিজ।”

হঠাৎ কুবেরের ঘুম ভেঙে গেল। ঠান্ডা হাওয়ায় বাসের সিটে বসেই চোখ লেগে এসেছিল। আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে শুনলেন কন্ডাক্টর চেঁচাচ্ছে, বাসটা বাগনান বাস-টার্মিনাসে ঢুকছে।


।।৩।।

কুবের জিমে ঢুকে দেখলেন, একদিকে একটা টেবিলে একটা অল্পবয়সী ছেলে বসে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ওটাই রিসেপশান ডেস্ক। কুবের গুটিগুটি এগিয়ে গেলেন। ছেলেটা খাতির করে চেয়ারে বসাল তাঁকে। তারপর একটা কাগজ এগিয়ে দিলো – “এই ফর্মটা ফিল আপ করে দিন স্যর। তারপর আমি আপনাকে আমাদের ফিজ আর পেমেন্ট অপশানগুলো বুঝিয়ে দেবো।” কুবের ফর্মটার দিকে এক নজর দেখে হাসার চেষ্টা করলেন – “আমি এক বন্ধুর খোঁজে এসেছি।” তারপর হাতের ছাতাটা দেখিয়ে বললেন – “কাল আমার বাড়ি ফেলে এসেছিল। ফেরত দিতে এসেছি। ওর বাড়ি গিয়েছিলাম। বাড়ির লোক বলল, বিকেলের দিকে এখানে ব্যায়াম করতে আসে।” ছেলেটা সরল বিশ্বাসে জিজ্ঞাসা করল – “আপনার বন্ধুর নাম?” কুবের নির্বিকার মুখে বললেন – “কুবের সেন।”
ছেলেটা তার সামনে রাখা কম্পিউটারে চোখ রাখল। খুটখাট কয়েকটা মাউস ক্লিক করে বলল – “পেয়েছি। কিন্তু ওনার তো মঙ্গল, বেষ্পতি আর শনি। কাল আসবেন উনি। আপনি চাইলে ছাতাটা আমায় দিতে যেতে পারেন, আমি ওনাকে দিয়ে দেবো।” কুবের মাথা নাড়লেন – “না। না। আমি নিজেই কাল একবার চলে আসব। এই সুযোগে কুবেরের সাথে দেখাও হয়ে যাবে।” ছেলেটা স্মিত হাসল – “ওনার স্লট ৪টে থেকে ৬টা।”

পরদিন কুবের অফিস থেকে সাড়ে তিনটে নাগাদ বেরিয়ে পড়লেন। শালার শরীর খারাপ, হসপিটালে দেখতে যেতে হবে – এরকম একটা ভুজুং-ভাজুং দিয়ে গিয়ে হাজির হলেন জিমে। কালকের ছেলেটাই আজও বসে আছে রিসেপশানে। তাঁকে দেখে হেসে ইশারা করল একদিকে রাখা তিনটে চেয়ারের দিকে। নকল কুবের সেনের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে উৎকণ্ঠায় তাঁর অল্প অল্প ঘাম দিতে লাগল। লোকটা যদি ধরা পড়ে গিয়ে পালিয়ে যায়? আগে থেকে পুলিশে খবর দিয়ে আসা উচিত ছিল। তাছাড়া এদের মতো চোর-জোচ্চরদের নেটওয়ার্ক ভালোই থাকে। উলটে যদি আর দু-তিনজন লোক এনে তাঁর ওপরই চড়াও হয়। এভাবে একা আসাটা এখন মনে হচ্ছে বোকামি হয়েছে। দাশগুপ্ত বা সান্যালকে সাথে আনলে ভালো হতো।
হঠাৎ শুনলেন কে যেন তাঁর নাম ধরে ডাকছে। সম্বিত ফিরে পেতেই দেখেন, রিসেপশানের ছেলেটা এক ভদ্রলোককে ইশারা করে দেখালো তাঁর দিকে – “আপনার বন্ধু আপনার জন্যে ওয়েট করছেন।” কুবেরের দিকে এগিয়ে এলেন তাঁরই বয়সী একজন। পরনে টি-শার্ট, ট্র্যাকশুট আর স্পোর্টস শু। হয়ত তাঁর পয়সাতেই কেনা। এই লোকটাই গত দু-তিনদিন তাঁর সমস্ত অশান্তির কারণ। লোকটাকে হাতের কাছে পেলে হাজারটা কথা শোনাবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু এখন তার দিকে তাকিয়ে রাগের বদলে কুবেরের মনে বিস্ময়ের উদ্রেক হলো। চেহারা দেখে মনেই হয় না, লোকটা জোচ্চর হতে পারে। একটা লোক, যে যাচ্ছেতাই খরচের মধ্যেও রবীন্দ্র রচনাবলী কেনে, তার সাথে এই ঝকঝকে চোখ দুটো দারুণ মিলে যায়। তাঁর সামনে এসে অমায়িক হেসে বলল – “আপনাকে তো চিনলাম না।”
কুবের এক মুহূর্তের জন্যে থমকে গেলেন। কোথাও কী ভুল হচ্ছে? সারাদিন চোখা চোখা বাক্যবাণ শানিয়ে রেখেছিলেন। এই লোকটাকে সেই সব কথা বলতে কুণ্ঠা জাগে। কুবের হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে লোকটার হাত ধরে ঝাঁকালেন – “কুবের কত বদলে গ্যাছো। চেনাই যায় না।” লোকটা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। কুবের একগাল হেসে বললেন – “আমি চিন্ময়। চিন্ময় গাঙ্গুলি। ম্যাথ অনার্স। চিনতে পারলে না এখনও?” এক মুহূর্তের জন্যে লোকটার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল যেন। অন্যের নাম নিয়ে তার টাকাওপয়সা ওড়ানো সহজ। কিন্তু সেই অন্য লোকটার কলেজ-বন্ধু সামনে এসে দাঁড়ালে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ষোল আনা। তবু বোঝা গেল লোকটা বুদ্ধিমান। পরিস্থিতি সামাল দিতে একগাল হেসে কুবেরকে জড়িয়ে ধরল সে। হো-হো করে হাসতে হাসতে বলল – “তুমিও আগাগোড়া বদলে গ্যাছো। টাক, ভুঁড়ি – এক্কেবারে সুখী গৃহকোণওয়ালা মানুষ। তাই প্রথমে চিনতে পারিনি।” তারপর তাঁর হাত ধরে টান দিলো – “এ্যাদ্দিন পরে দেখা। চলো বাইরে কোথাও গিয়ে বসি।”

কুবের এবং নকল কুবের এক গ্লাস করে লস্যি নিয়ে বসেছেন একটা ছোটখাটো রেস্তোরাঁয়। কুবের নিজের আচমকা অভিনয়ের থেকেও বেশি অবাক হয়েছেন লোকটার প্রতিক্রিয়ায়। চিন্ময় গাঙ্গুলিকে চেনে না এমন কিছু একটা বলে অনায়াসে এড়িয়ে যেতে পারত সে, কিন্তু তা না করে কেমন স্বাভাবিকভাবে লস্যি নিয়ে বসেছে তাঁর সাথে। যেন সত্যি করেই কতদিনের বন্ধু।
লস্যিতে একটা চুমুক দিয়ে লোকটা তাঁকে জিজ্ঞাসা করল – “তুমি আমার খোঁজ পেলে কী করে?” কুবের সতর্ক উত্তর দিলেন – “গত সপ্তায় ব্রজর সাথে দেখা হয়েছিল। সে বলল, তুমি এখানেই কোথাও থাকো। আজ এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম। তোমার ঠিকানা তো জানতাম না। তবু ভাবলাম খোঁজ নিই, যদি পেয়ে যাই। এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে ঐ জিমে গিয়ে খোঁজ করলাম। পেয়ে গেলাম।”
লোকটা তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। এবার কুবেরের ভয় হলো। লোকটা কী বুঝে ফেলেছে? খুবই স্বাভাবিক, তাই হয়ত হঠকারিতা করে না পালিয়ে গিয়ে কৌশলে তাঁকে নিয়ে এসেছে এখানে। কিছুক্ষণ পর কেটে পড়বে। আর হয়ত জীবনেও ঐ জিমের দিকে পা বাড়াবে না। কুবের অসহায় বোধ করতে লাগলেন। নিজেই শার্লক হোমসগিরি না করে পুলিশে খবর দিয়ে আসা উচিত ছিল। কিন্তু যা হওয়ার তা হয়েছে, এখন ঠান্ডা মাথায় এগোতে হবে। কায়দা করে লোকটার ডেরা জেনে নিতে পারলেই কেল্লা ফতে।
লস্যিতে চুমুক দিতে দিতেই টুকটাক কথা চলতে লাগল। আসল কুবের কী করেন, কোথায় থাকেন, কটা ছেলেমেয়ে ইত্যাদি। অফিসের ঠিকানা বাদ দিয়ে আর সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলেন কুবের। জানলেন নকল কুবের সেন বিয়ে-থা করে নি। কলকাতার একটা নামী থিয়েটার দলের হয়ে নাটক করে। তবে সেখানে তার নাম অলখ বিহারী। হা-হা করে হাসল লোকটা – “যতই হোক, কুবের নাম নিয়ে কি আর মঞ্চে নামা যায়?”
এক মুহূর্তের জন্যে কুবেরের চোখের সামনে অতীত ফিরে এলো। কলেজে পড়ার সময় বাংলা ডিপার্টমেন্টের অসিতবাবু ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ করার তোড়জোড় করছিলেন শুনে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন মহড়ার প্রথম দিনে। তাঁর ইচ্ছা ছিল তিনি বাল্মিকীর ভূমিকায় অভিনয় করবেন। অসিতবাবুকে এই কথা বলতেই হা-হা হেসে উঠলেন – “ওরে! বাল্মিকী ডাকাত তো কী হয়েছে? সুদর্শন ছিলেন। কুবের নিয়ে কি মঞ্চে নামা যায়?” কুবের কলেজে পড়ার সময় কন্দর্পকান্তি ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু ‘কুবের’ ছিলেন না মোটেও। রিহার্সাল রুমে অসিতবাবুর সেই নিষ্ঠুর অপমান এতদিন গোপনে কাঁটার মতো ফুটে ছিল, আজ অপরিচিত এই লোকটা সেই ক্ষতে আবার তীব্র আঘাত করেছে। মুখটা তেতো হয়ে গেল কুবেরের।
কে এই লোকটা? কুবেরের এতদিনের কাঙ্ক্ষিত জিনিসগুলোকে সে নিজের করে নিয়েছে তাঁরই নাম ভাঁড়িয়ে। এ পর্যন্তও ব্যাপারটা কাকতালীয় বলে মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু অসিতবাবুর ঐ কথাটা সে জানল কী করে? তবে কি এ লোকটা তাঁরই কলেজের কোনও সহপাঠী? তাঁর ক্রেডিট কার্ড চুরি করে বেহিসাবী খরচ, তারপর তাঁর অফিসের কাছেই একটা জিমে সেই কার্ড ব্যবহার করে সূত্র হিসাবে রেখে যাওয়া – এসব কী লোকটার তাঁর কাছে নিজেকে ধরিয়ে দেওয়ার মারাত্মক কোনও পরিকল্পনা? কুবেরের চিন্তা তালগোল পাকিয়ে গেল। কী চায় লোকটা? তাঁর এত খুঁটিনাটি অচেনা এই লোকটা জানল কেমন করে?

মাঝে ফোন এসেছিল, বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে বিরক্তমুখে ফোনটা শব্দ করে টেবিলে নামিয়ে রাখল লোকটা। কুবের জিজ্ঞাসা না করে পারলেন না – “কোনও প্রবলেম?” লোকটা মাছি তাড়ানোর মতো করে হাত নাড়ল – “ছাড়ো। আজকাল কথা দিয়ে কথা রাখার লোকজন আর নেই দুনিয়াতে। কথা ছিল রোববার আমার সাথে ইডেনে ফাইনাল দেখতে যাবে। আজ ফোন করে বলছে, আসতে পারবে না।” তারপরই হঠাৎ উল্লসিত হয়ে উঠে সে কুবেরের হাতে হাত রাখল – “তুমি চলো।”
কুবের সত্যি করেই দারুণ অবাক হলেন – “আমি?” তিনি ভেবেছিলেন লোকটা তাঁকে এড়িয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু তার বদলে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে যাওয়ার ডাকছে কেন? হয়ত তিনি নিজেই ব্যাপারটাকে জটিল করে দেখছেন। হয়ত লোকটা তাঁকে একেবারেই সন্দেহ করেনি।
লোকটা টেবিল চাপড়ে বলল – “আলবাত। ভেবে দ্যাখো। তোমার সাথে দেখা হলো। আর সাথে সাথে ফোন এলো। ওপরে যেই বসে থাকুন না কেন...” লোকটা আকাশের দিকে আঙুল দেখাল – “তিনি চান বহুদিন পর দেখা হওয়ার পর দুই বন্ধু একসাথে আরও কিছুটা সময় কাটাক।” কুবের লোকটাকে কিছুতেই পড়তে পারছেন না।
কুবের সেনের সাথে তাঁর কলেজের বন্ধু চিন্ময় গাঙ্গুলির দেখা হয়েছে প্রায় তিন দশক পরে। কুবের সেন চান চিন্ময় গাঙ্গুলি তাঁর সাথে ক্রিকেট দেখতে চলুন। গল্পটা খুব স্বাভাবিক এবং নিটোল। কিন্তু এই টেবিলে বসে থাকা দু’জনই জানেন তাঁরা দুটো চরিত্রে অভিনয় করছেন মাত্র। কুবের সেন বা চিন্ময় গাঙ্গুলি – কেউই স্বনামে এই গল্পে নেই।
তাঁর নীরবতার সুযোগে লোকটা আবার জোর দিয়ে বলল – “কোনও আপত্তি শুনছি না। এই রোববার আমরা দু’জন ফাইনাল দেখতে যাচ্ছি ইডেনে।” রোববার তাঁর কাজ কিছুই থাকে না। তার ওপর লোকটাকে পাকড়াও করার আর একটা সুযোগ পাওয়া যাবে তখন। তবু কুবের মৃদু প্রতিবাদ করলেন – “কিন্তু এখন কাগজে তো দেখি প্রায় সব ক্রিকেট ম্যাচেই নাকি গড়াপেটা হয়।” তাঁর দিকে সামান্য ঝুঁকে গলার স্বর নামিয়ে লোকটা হাসল – “গীতা না উপনিষদ কোথায় যেন লেখা আছে এই পৃথিবীর সবটাই নাকি মায়া, মিথ্যের মধ্যে বেঁচে আছি আমরা। তবুও তো আছি, বেঁচে থাকতে দোষটা কোথায়?”

লোকটা তাঁকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল। কুবের বাসে ওঠার আগে লোকটা হঠাৎ আর্তনাদ করে উঠল – “আরে, তোমার নাম্বারটাই তো নেওয়া হয়নি।” কুবেরের নাম্বারটা জেনে নিয়ে নিজের মোবাইলে টাইপ করে একটা কল করল – “ওটা আমার নাম্বার, সেভ করে নাও।” কুবের বাসে উঠে অভ্যাস মতো জানালার ধারে বসলেন। লোকটা তাঁর জানালার কাছে এসে বলল – “রোববার তাহলে ধর্মতলায় দেখা হচ্ছে। যেমন কথা হল, ছ’টার মধ্যে চলে এসো। আটটা থেকে ম্যাচ শুরু হবে।”
বাসটার চাকা আস্তে আস্তে নড়তে শুরু করেছে, কুবেরকে তাই চেঁচাতে হলো – “অত রাতে বাড়ি ফিরব কী করে?” লোকটা হাসতে হাসতে হাত নাড়তে লাগল – “চিন্তা কোরো না। আমি তো আছি।”
বাসটা তখন বেশ গতি নিয়েছে। তাই লোকটা শেষে কী বলল আর বোঝা গেল না। বোধহয় বলল – “দরকার হলে আমার বাড়ি থাকবে।” আনমনে কুবের হেসে উঠলেন। সংসারমুক্ত এক বাউণ্ডুলে। মনের আনন্দে মঞ্চে ওঠে অলখ বিহারী নামে। হতে পারে সেটাও একটা বানানো নাম; কিন্তু এত মিথ্যের মধ্যে, জালিয়াতির মধ্যেও লোকটা নিজের মতো করে যেন কুবেরের স্বপ্নের জীবনযাপন করছে। কুবের মোবাইল বের করে লোকটার নাম্বারটা ‘অলখ বিহারী’ নামে তুলে রাখলেন। অমন ঝকঝকে বুদ্ধিমান দিলখোলা মানুষের সাথে কুবের নামটা বেমানান।


।।৪।।

পরদিন অফিসে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই দাশগুপ্ত হন্তদন্ত হয়ে এলো – “সেনদা, আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে।” কুবের বোতল ধরে জল খাচ্ছিলেন। ইশারায় ভুরু নাচালেন – কেন? দাশগুপ্ত একটু হাসল – “সাইবার ক্রাইম ব্রাঞ্চে আমার একজন বন্ধু আছে। তাকে কাল রাতে ফোন করে আপনার কেসটা বললাম। যে বলেছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনাকে নিয়ে আসতে। সাথে ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্টটা নিয়ে নেবেন। লাঞ্চের পরে পরেই বেরিয়ে যাব।”
কুবের ডান হাত দিয়ে ঠোঁটটা মুছে একটু গুম হয়ে বসে থাকলেন। কাল বিকালে অলখ বিহারীর সাথে দেখা হওয়ার পর থেকেই ক্রেডিট কার্ড চুরির ব্যাপারটা গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি বহু বছর পর একজন হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে খুঁজে পেয়েছেন আর তার সাথে এই রবিবার তিনি ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে যাবেন। এই কথাটাই তাঁর মনে ফুরফুরে বাতাসের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সকালে স্নানের পর গলা খুলে রজনীকান্ত গাইছেন দেখে গিন্নি জিজ্ঞাসাই করে ফেললেন – “ক’দিন তো থম মেরে বসেছিলে, আজ হলো কী হঠাৎ?” বাড়িতে ক্রেডিট কার্ড চুরির ব্যাপারটা জানান নি তিনি। কিন্তু খেলা দেখতে যাবার ব্যাপারটা চেপে রাখতে পারলেন না।
জলখাবার খেতে খেতে একগাল হেসে বললেন – “অনেকদিন পর কলেজের একজনের সাথে দেখা হয়েছে। তার সাথে এই রবিবার ফাইনাল দেখতে যাব ইডেনে।” কথাটা যে অর্ধসত্য তা গিন্নিকে বলার সময় কুবেরের মনে একবারের জন্যেও উঁকি মারেনি। কিন্তু এখন দাশগুপ্তের কথায় যেন সম্বিত ফিরে পেলেন তিনি। অলখ বিহারী একজন অপরাধী, তাঁর এবং তাঁর মতো আরও অনেক নিরীহ মানুষের টাকাপয়সা নিয়ে জালিয়াতি করছে। এক বিকালেই এই অপরিচিত জোচ্চর লোকটা তাঁর অবচেতনে বন্ধুর জায়গা করে নিয়েছে। এটা কি কুবেরের দুর্বলতা? নাকি অলখ বিহারীকে বুঝতে বড়সড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে কোথাও?
হাতে অনেক কাজ জমে আছে। তবু কুবেরের আজ কাজে মন বসছে না। আনমনে অফিসের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। হঠাৎ পকেটে ফোনটা কুড়ুং করল, ম্যাসেজ এসেছে। ফোন বের করে দেখলেন অলখ বিহারী পাঠিয়েছে। আগামীকাল ছটা নাগাদ ধর্মতলায় মেট্রো সিনেমার সামনে দেখা করতে লিখেছে। মেসেজটা পড়ছেন, এমন সময় কব্জির ওপর কী একটা এসে পড়ল। গাঢ় তরল। হালকা সোনালি। কৌতূহলে ওপরে তাকালেন কুবের।
অফিসের দোতলার কার্নিশে একটা মৌচাক গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকমাস। মৌমাছিগুলো কাউকে বিরক্ত করে না, তাই তাদের মৌচাকের ব্যাপারেও সবাই উদাসীন। এখন বোধহয় সেই মৌচাকের উদ্বৃত্ত মধু গড়িয়ে পড়ছে। কুবের দেখলেন, যেখানে দাঁড়িয়েছেন তার চারপাশে আরও কয়েক ফোঁটা মধু পড়েছে যত্রতত্র। মাছি এসে বসছে তার ওপর। লাইন দিয়ে যাতায়াত করছে কিছু খুদে পিপড়েও। মাগনা মধু পেলে খাওয়ার লোকের অভাব হয় না। কুবেরের কপালের ভাঁজগুলো মিলিয়ে গেল। অজান্তেই তাঁর চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল। এখনই তাঁর ক্রেডিট কার্ডটা ব্লক করাতে হবে।

***

“চিন্তা করবেন না। খুব শিগগির আপনার ক্রেডিট কার্ড চোরকে আমরা পাকড়াও করছি।” কুবেরের ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্ট দেখতে দেখতে মন্তব্য করলেন অনির্বাণ। সাইবার ক্রাইম ব্রাঞ্চের এই অফিসার দাশগুপ্তর ক্লাসমেট।
দাশগুপ্ত জিজ্ঞাসা করল – “কতদিন সময় লাগবে বলে মনে হয়?”
অনির্বাণ হাতে ধরে রাখা কাগজটা টেবিলে রেখে এবার সোজাসুজি তাকালেন – “এভাবে তো বলা মুশকিল। কলকাতা আর তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় একটা চক্র কাজ করছে কিছুদিন হলো। বেশ কিছু কমপ্লেন আমরা পেয়েছি।” কুবেরের দিকে আঙুল দেখিয়ে অনির্বাণ বললেন – “কিন্তু এনার চোর আর পাঁচটা পাতি চোর-ছ্যাঁচড়ের থেকে আলাদা। রবীন্দ্র রচনাবলী পড়ে। দামী পাঞ্জাবী পরে। আইপডে গান শোনে। এনিওয়ে, সে যাই কিনুক না কেন, আশা করছি আগামী দু-তিনদিনের মধ্যে সুসংবাদ দিতে পারব।”
কুবের ঢোঁক গিললেন – “এত তাড়াতাড়ি?” অনির্বাণ একটা সিগারেটের প্যাকেট বের করে সামনে ধরলেন – “ঘাবড়াচ্ছেন কেন? অপরাধী তাড়াতাড়ি ধরা পড়লে অসুবিধা আছে নাকি আপনার?” নিজের রসিকতাতেই মুচকি হাসলেন তিনি।
দাশগুপ্ত কুবেরের হয়ে উত্তর দিলো – “আসলে পুলিশ ডায়েরি নিচ্ছিল না বলে সেনদা একরকম আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার জায়গায় দু-তিনদিনে কেস শলভ করে ফেলবি বলছিস। আমাদের দেশে এমনটা বিশ্বাসই করা যায় না।”
কুবেররা সিগারেট না নেওয়ায় একাই সিগারেট ধরিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন অনির্বাণ। একটা বড় টান দিয়ে জানালার বাইরে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন – “এই ইন্টারনেটের যুগে দেশের গণ্ডি মুছে গেছে। পুরো পৃথিবী এখন একটা সমতল টেবিল। যারা টেকনোলজির সুবিধা নেয়, তারা ঐ টেবিলের ওপরে, একেবারে মাঝখানে।” নিজের টেবিলের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন অনির্বাণ – “বাকিরা টেবিলের কিনারায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, কখন কেউ এসে দয়া করে তাদের ধাক্কা দিয়ে টেবিলের পাশে রাখা ডাস্টবিনটাতে ফেলে দেবে।”
এমন একটা নাটুকে সংলাপ দিয়ে অনির্বাণ সিগারেটটা এ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলেন – “আমরা, পুলিশরা এখন ল্যাদ ঝেড়ে ফেলে টেবিলের মাঝখানে যাওয়ার চেষ্টা করছি। ওখানেই এখন ক্রিমিনালদের রমরমা।” কুবেরের দিকে অনির্বাণ করমর্দনের জন্যে হাত বাড়িয়ে দিলেন – “আপনি বাড়ি গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোন কুবেরবাবু। আপনার চোর আর টাকা দুটোই খুব শিগগির পেয়ে যাবেন।”


।।৫।।

রবিবার দুপুরের খাবার খেয়েই কুবের বেরিয়ে এলেন বাড়ি থেকে।
গিন্নি গজগজ করছিলেন – “টিভিতে খেলা দেখলেই হয়। তা নয় কোন মুলুকে গিয়ে খেলা দেখতে হবে। তারপর রাত দুপুরে খেলা দেখে ফেরা।” কুবের আশ্বাস দিলেন – “অত ভেবো না। সাথে আমার বন্ধু থাকবে। তেমন বুঝলে আজ রাতটা তার ওখানেই কাটিয়ে দেবো।” গিন্নির গলায় বিরক্তি – “তোমার হয়েছেটা কী? কোত্থেকে এক বন্ধু পেয়েছ, তার ওখানে রাত কাটাবে? কাল অফিসের কী হবে?” কুবের পায়ে জুতোটা গলাতে গলাতে কাঁধের ব্যাগে একটা চাপড় মারলেন – “একটা শার্ট-প্যান্ট ঢুকিয়ে নিয়েছি। তুমি চিন্তা কোরো না, আমি ফোন করে দেবো।” এবার তাঁর গিন্নি অবাক এবং ক্ষুব্ধ – “তলায় তলায় এত প্ল্যান করে ফেলেছ আমায় না জানিয়ে, যা ইচ্ছে করো।”

বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে হাঁটতে একবুক নিশ্বাস নিলেন কুবের। মনের মধ্যে একটা ঘুড়ি গোঁত্তা খেয়ে উড়ছে এদিক-ওদিক। অলখবিহারী খেলা দেখতে নেমন্তন্ন করেছে বটে, কিন্তু টিকিটটা নিশ্চিত তাঁর ক্রেডিট কার্ডেই কেটেছে সে। এই টুর্নামেন্টের টিকিট ওদের ওয়েবসাইট থেকে ক্রেডিট কার্ডে পাওয়া যায় বলে ক’দিন আগেই কাগজে পড়েছেন। অতএব, নিজের পয়সাতেই খেলা দেখতে যাচ্ছেন তিনি। বিয়ের পর কোনওদিন এভাবে একা একা কোথাও যান নি। হ্যাঁ, ইলেকশান ডিউটিতে কবার বেশ দূরে দূরে গিয়ে বাড়ির বাইরে রাত কাটিয়েছেন। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা তার থেকে অনেক আলাদা।
অলখ বিহারীর সাথে পরিচয় হওয়ার পর নিজে থেকে পুলিশকে খবর দিতে কোথাও একটা বাধছিল তাঁর। সে কাজটা দাশগুপ্তই করে দিয়েছে। দু-তিনদিনের মধ্যে অলখ বিহারী পুলিশের হেফাজতে চলে যাবে আর তাঁর পুরো টাকাও পুলিশ উশুল করে দেবে। জীবন আবার আগের মতোই সহজ। বাসে যেতে যেতে পুরো রাস্তাটাই গুনগুন করতে করতে কাটিয়ে দিলেন কুবের।

ধর্মতলায় পৌঁছে মেট্রো সিনেমার চত্বরে দাঁড়িয়ে কুবের ঘড়িতে দেখলেন ছটা পাঁচ। অলখ বিহারীকে একটা ফোন করবেন কিনা ভাবছেন। হঠাৎ পিঠে কে টোকা দিলো – “কখন থেকে ডাকছি...” অলখ বিহারীর দিকে তাকিয়ে কুবের আমতা আমতা করলেন – “শুনতেই পাই নি।” মনে মনে ভাবলেন, নিশ্চয় তাঁকে পেছন থেকে ‘চিন্ময়’ নামে ডেকেছে এই নকল কুবের সেন, তাই তিনি খেয়ালই করেন নি। এবার সতর্ক থাকতে হবে।

স্টেডিয়ামের কাছে পৌঁছে দেখলে লোকারণ্য। যেন উৎসব হচ্ছে একটা। বাইরে হাজারটা হকার তাদের পসরা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের একজনের দিকে কুবেরের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল অলখ বিহারী। লোকটা কুড়ি টাকার বিনিময়ে দু’গালে তেরঙ্গা এঁকে দিচ্ছে। টিভিতে জাতীয় পতাকায় গাল রাঙানো ছেলে-মেয়ে দেখেছেন কুবের। কিন্তু নিজে দারুণ সংকোচে পড়লেন – “এ তো ছেলেমানুষী।” অলখ বিহারী তাঁর আপত্তিতে কানই দিলো না।
একটা লম্বা লাইনের সাথে সাথে হাঁটতে হাঁটতে দু’জন গিয়ে ঢুকলেন স্টেডিয়ামের মধ্যে। নিজেদের সিট খুঁজে নিয়ে আয়েশ করে বসলেন কুবের। অলখ বিহারী টুক করে কোথায় একটা গেল। মিনিট দশেক পরে ফিরে এলো দুটো পলিথিন ব্যাগ হাতে – “এগুলো তাড়াতাড়ি পেটে চালান করো, নাহলে খিদে পাবে।” শিঙাড়া, এগরোল আর প্ল্যাস্টিকের পাউচে জল। দুপুরের খাবার খেয়েছেন অন্তত ছ ঘন্টা হয়ে গেছে। কুবের গোগ্রাসে গিলে, জলে খেয়ে রুমালে মুখ মুছে একটা ঢেকুর তুললেন – “আহ!”
অলখ বিহারী পাশ থেকে খোঁচা দিলেন পাঁজরে – “খেয়েদেয়ে বসছ কী জন্যে? এ হলো টোয়েন্টি-টোয়েন্টি খেলা। এসব কেউ বসে দেখে না। এবার চার হাত-পায়ে খাড়া হতে হবে আমাদের।” তারপর নিজের পিঠব্যাগ থেকে রঙচঙে কিছু কাগজ বের করলেন – “এগুলো হাতে রাখো। মাঝে মাঝে তুলে দেখাবে।”
কুবের হাতে নিয়ে দেখলেন ইংরাজিতে লেখা কিছু শ্লোগান। কিছু ক্রিকেটারদের ছবি একসাথে সাঁটা। তিনি অবাক হয়ে তাকালেন চারপাশে। পুরো স্টেডিয়াম উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। চিৎকার-চেঁচামেচি, হাজারটা রঙ – তাঁর চেনাশোনা জীবনের অনেক বাইরের ছবি। তাঁর নিজেরও গালে তেরঙ্গা আঁকা, হাতে রঙ-বেরঙের পোস্টার। ততক্ষণে টস শুরু হয়েছে। দু’দলের ক্যাপ্টেনকে দেখাচ্ছে একপাশের বড় স্ক্রিনে। রবি শাস্ত্রী হাতে মাইক্রোফন নিয়ে মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন – “সুন্দরী কলকাতা। আজ ফাইনাল, আরও রূপসী তুমি।” আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল সবাই। অলখ বিহারী কোত্থেকে একটা ভেঁপুর মতো বাঁশি বের করে বাজাতে আরম্ভ করেছে। কুবের চুপ করে আছেন দেখে তাঁর দিকে মুখ করে জোর বাজাল বাঁশিটা। হঠাৎ কী একটা ঘটলো কুবের নিজেও জানেন না। দু হাত আকাশের দিকে তুলে চিৎকার করে উঠলেন – “হো ও ও ও ও...” মনে হলো একটা জবরজং পোশাক শরীর থেকে খসে পড়ল তাঁর পায়ের কাছে। পালকের মতো হালকা হয়ে গেলেন তিনি।
তারপর যতক্ষণ ম্যাচ চলল কুবের একটানা লাফিয়ে চেঁচিয়ে হাতের প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে জনতার একজন হয়ে গেলেন। এমনকি একটা দলের ব্যাটিং-এর পর বিরতিতেও আর সবার সাথে গলা মিলিয়ে স্লোগান দিতে লাগলেন তিনি। মাঝে একবার ক্যামেরা ঘুরল তাঁদের ব্লকের দিকে। জায়ান্ট স্ক্রিনে চার-পাঁচ সেকেন্ডের জন্যে দেখা গেল কুবেরের লাফ-ঝাঁপ। কুবের উত্তেজনায় অলখ বিহারীর হাত ধরে চেঁচাতে লাগলেন – “আমায় দেখিয়েছে, আমায় দেখিয়েছে।”

খেলা শেষ হওয়ার পর স্টেডিয়াম থেকে বেরোতে বেরোতে প্রায় একটা বেজে গেল। ধর্মতলার দিকে হাঁটতে হাঁটতে কুবের ভাঙা গলায় অলখ বিহারীকে বললেন – “সবথেকে মজার ব্যাপার হলো, যে দুটো দল খেলল তারা বাইরে থেকে এসেছে। চেন্নাই আর মুম্বাই। সেখানে যারা খেলছে, তারাও কেউ বাঙালি নয়। বেশ কিছু খেলোয়াড় আবার ভারতের বাইরের। তাও সবাই কেমন চেঁচিয়ে যাচ্ছিল এক নাগাড়ে।” অলখ বিহারী মুচকি হেসে বলল – “সে তো তোমার গলার আওয়াজেই টের পাচ্ছি।” তারপর একটু থেমে সে বলল – “আসল কথাটা হলো এখন এন্টারটেনমেন্টের জন্যে মানুষ আর দেশোয়ালী ভাইকে খোঁজে না। ওসব পুরোনো সেন্টিমেন্ট মানুষ কবেই ঝেড়ে ফেলেছে। এই ইন্টারনেটের যুগে দেশের গণ্ডি মুছে গেছে। পুরো পৃথিবী এখন একটা সমতল টেবিল।”
কুবের থমকে গেলেন। শেষ কথাটা অনির্বাণ গত পরশু বলেছিলেন। অলখ বিহারী তা জানতে পারল কেমন করে? কুবেরের পায়ের নীচের মাটি হঠাৎ যেন চলকে উঠল। অলখ বিহারীর আর একটু কাছে এগিয়ে গিয়ে তিনি ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – “কে তুমি?” অলখ বিহারী বাঁকা হেসে বলল – “আমি কে সেটা জানার আগে তোমার উচিত নিজেকে জানা। তুমি কি নিজেকে জানো কুবের? তুমি কি জানো তোমার আসল নাম চিন্ময় নয়?”
অলখ বিহারীর কাছে কুবের ধরা পড়ে গেছেন। হয়ত প্রথম থেকেই সে জানে তাঁর আসল নাম চিন্ময় নয়, কুবের। যেমনটা আগে তিনি ভেবেছিলেন, সেটাই হয়ত ঠিক। তাঁর ক্রেডিট কার্ড চুরি করে, সহজ কিছু সূত্র ছড়িয়ে এই লোকটা হয়ত নিজে থেকেই তাঁর কাছে ধরা দিতে চাইছিল, বা তাঁকে টেনে আনতে চাইছিল নিজের কাছে। কিন্তু কেন?
আর কিছু বলার আগেই কুবের লক্ষ্য করলেন সামনে থেকে দুটো লোক ফুটপাত ধরে তাঁদের দিকে দ্রুত হেঁটে আসছে। পেছনে ঘাড় ঘোরাতেই ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোতেও বুঝতে পারলেন আরও একটা লোকের সাথে এগিয়ে আসছেন অনির্বাণ। দূরত্ব ক্রমশ কমছে।
কুবের উত্তেজনায় ধাক্কা দিলেন অলখ বিহারীকে – “তুমি পালাও। এরা পুলিশ।” তারপর অলখ বিহারীর পাথর দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বললেন – “বিশ্বাস করো আমি তোমায় ধরিয়ে দিতে চাইনি।” নিজেকে কেমন যেন বিশ্বাসঘাতক মনে হলো। একটা দারুণ অপরাধবোধে অসংলগ্ন কথাগুলো সাজাতে চাইলেন কুবের – “আমি পুলিশের কাছে গেছলাম ঠিকই। কিন্তু আজ এরা এখানে আসবে জানতাম না। সত্যি বলছি। তুমি পালাও। আমার টাকা ফেরত দিতে হবে না। আমি তোমার কথা এদের কিচ্ছু বলিনি।”
ততক্ষণে পুলিশ কুবেরদের ঘিরে ফেলেছে। পালানোর আর কোনও পথ নেই।


।।৬।।

কুবেরের গিন্নি আর দাশগুপ্ত অনির্বাণের টেবিলের উলটোদিকে বসে। জানালার বাইরে ভোরের রোদ।
গতকাল সন্ধ্যায় কুবেরের বাড়ি হানা দিয়েছিল পুলিশ। একটু খোঁজাখুঁজির পরই শোবার ঘরের খাটের তলা থেকে একটা পুরানো তোরঙ্গে পাওয়া গেল জিনিসগুলো। রবীন্দ্র রচনাবলীর পুরো একটা সেট। দামী একজোড়া ধুতি-পাঞ্জাবী। একটা আইপড সাফল। আরও কিছু ছোটখাটো জিনিস। যেন একটা চোর ছাতারে গৃহস্থ বাড়ি থেকে তার পছন্দের সমস্ত ঝকমকে জিনিস নিয়ে এসে তুলেছে তার বাসায়। তারপর যখের ধনের মতো আগলে রেখেছে সেই পরম সম্পদ।

অনির্বাণ কুবেরের গিন্নির দিকে তাকিয়ে সহানুভূতির গলায় বললেন – “আপনার কর্তা যা করেছেন, সেটা খুব আনকমন কিছু নয়। ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিকে ফাঁকি দিতে অনেকে অনেক রকম ফন্দি আঁটেন। কিন্তু যেটা সবথেকে অবাক করার মতো ব্যাপার, সেটা হলো এসব করার পর পুলিশে এসে কমপ্লেন করা। হয় ভদ্রলোক ঘাঘু, নাহলে মাথায় ছিট আছে।”
ভদ্রমহিলা ফুঁপিয়ে উঠলেন। পুলিশ লক-আপে তাঁর স্বামী। লোকটার সাথে ঘর-সংসার করছেন বছর পঁচিশ হয়ে গেল। কিন্তু কখনও তাঁকে অপরাধী বা পাগল কোনওটাই মনে হয়নি। কী ভাবে যে এমনটা হলো, তা তাঁর মাথাতেই ঢুকছে না। দাশগুপ্তও যেটুকু চিনেছে কুবেরকে, তার সাথে এই ঘটনা মেলে না। সেও তাই নির্বাক।
অনির্বাণ এবার দাশগুপ্তর দিকে তাকালেন – “কেসটা সহজ হয়ে গেছে ঐ রবীন্দ্র রচনাবলী থেকেই। যে শপিং ওয়েবসাইট থেকে ওটা কেনা হয়েছিল, সেখানে ক্রেডিট কার্ড স্টেটমেন্টের পেমেন্ট আইডি দিতেই তারা ডেলিভারি এ্যাড্রেস দিয়ে দিলো। ঠিকানাটা কুবেরবাবুর বাড়ির।” তারপর নিজের মনেই বললেন – “পুলিশকে ভুল ইনফরমেশান দিয়ে ক্রেডিট কার্ড বিল ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা। এ্যামাউন্টটা কম বলে বাঁচোয়া। মুচলেকা দিয়ে এবারের মতো ছেড়ে দিতে পারি। কিন্তু এরপর কোনও ত্যাঁদড়ামি করলে খুব ঝামেলায় পড়বেন।”

সেই সময় একটা ছোট্ট খুপরির মেঝেতে পাশাপাশি বসে আছেন কুবের আর অলখ বিহারী। কুবের এখনও বুঝতে পারছেন না অলখ বিহারী কী নিজে থেকে ইচ্ছা করেই ধরা দিয়েছে, নাকি তাঁর জন্যেই সে পুলিশের খপ্পরে এখন। আরও একটা ধন্দ তাঁর মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তিনি এই ঘুপচি ঘরে কী কারণে বন্দি।
ধরা পড়ার পর থেকেই অলখ বিহারী চোখ বন্ধ করে ঝিমোচ্ছিল। কুবের আস্তে করে তাকে ঠেললেন – “অলখ বিহারী।” সে চোখটা অল্প খুলল। কুবের মৃদু স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন – “তুমি চাইছিলে আমি যেন তোমায় খুঁজে পাই। তাই ঐ জিমে গিয়ে নাম লিখিয়েছিলে। আমি বুঝতে পেরেছি।” অলখ বিহারী মুচকি হেসে ঘাড় নাড়ল – “ঠিকই ধরেছো।” কুবের একই স্বরে প্রশ্ন করলেন – “কিন্তু কেন?”
অলখ বিহারী এবার মুখ তুলে তাকালো কুবেরের দিকে। চোখে চোখ রেখে বলল – “উত্তর তো তুমি নিজেই দিয়ে দিয়েছো। আমি চাইছিলাম তুমি আমায় খুঁজে পাও।” তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে বলল – “তোমার নামে আর একটা ক্রেডিট কার্ড নেওয়া, সেটা চুরি করে তোমার নাম ভাঁড়িয়ে জিনিসপত্র কেনা, জিমে ভর্তি হওয়া – এই সবকিছু ঐ একটা কারণেই করা। তুমি যাতে আমায় খুঁজে পাও।”
কুবের কিছুই বুঝলেন না, তবু প্রশ্ন করলেন – “কিন্তু এখন যে পুলিশ ধরল তোমায়? তার কী হবে? কীভাবে ছাড়া পাবে?”
অলখবিহারী খুপরির একমাত্র গরাদওয়ালা দরজার দিকে এগিয়ে গেল – “আমার নাম অলখ বিহারী। আমায় কি চাইলেই ধরে রাখা যায়?” তারপর ছায়ার মত দরজার গরাদ ভেদ করে সে চলে গেল ঘরের বাইরে। কুবেরের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল– “চলি হে কুবের। আর হয়ত দেখা হবে না এ জীবনে।”

অলখ বিহারী চলে যাচ্ছে। তাঁর একমাত্র ঝকঝকে বুদ্ধিমান দিলখোলা বন্ধু সারা জীবনের জন্যে চলে যাচ্ছে। তবু কুবেরের এতটুকু কষ্ট হচ্ছে না। বরং অদ্ভুত এক সুখে ঘুম নেমে আসছে সারা শরীর জুড়ে। শান্তিতে চোখ বুজে তিনি শুনতে পেলেন সার দেওয়া খুপরিগুলোর গরাদে টোকা দিতে দিতে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে অলখ বিহারীর গলা। নীচু গলায় ভেঙে ভেঙে সে গাইছে – “আমারে বাঁধবি তোরা সেই বাঁধন কি তোদের আছে... আমি যে বন্দী হতে সন্ধি করি সবার কাছে...” 



লেখক পরিচিতি
রোহণ কুদ্দুস


কবি, গল্পকার। সম্পাদক--সৃষ্টি ওয়েব পত্রিকা। প্রকাশক।

পেশায় সফট ওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। পেশার কারণে নানাদেশ ঘুরেছেন।