টিভির সাউণ্ডটা মিউট করে দময়ন্তী ফোনটা ধরে। দূরভাষের কথোপকথন শেষ হলে দ্রুত প্রয়োজনীয় কয়েকটা ই-মেইল সেরে তৈরী হয়ে নেয় সে। আজ অফিস থেকে গাড়ী পাঠায় নি। অগত্যা নিজে ড্রাইভ করেই এখন যেতে হবে সিউড়ি। কি করবে কাজটাই যে এমন! চিফ-এডিটর সুকান্তদা চান দময়ন্তীই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য যোগাড় করে রিপোর্টটা লেখে। যদিও দুজন স্থানীয় জুনিয়ারকে পাঠান হয়েছে স্পটে! ধর্মতলার কাছাকাছি কোথাও থেকে ফটোগ্রাফার শান্তনুকে তুলে নিতে হবে। হেড-ফোনে শান্তনুকে পার্ক-স্ট্রীট মেট্রো-স্টেশনের কাছে অপেক্ষা করতে বলে গাড়ীর স্টিয়ারিং ঘোরায় সে। প্রচণ্ড যানজট! ইদানীং রাস্তার যা বেহাল অবস্থা তাতে দুর্গাপুর-এক্সপ্রেস-ওয়েতেও যানজটে নাকাল হতে হবে! চারিদিকে ট্র্যাফিকের একঘেয়ে ক্যাকোফোনি কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক করলেও দময়ন্তী মনে মনে বেশ খুশী। সুকান্তদা ওর উপর নির্ভর করে। তাই এই সেনসিটিভ ইস্যু কভার করতে ওকেই বেছে নিয়েছেন। এর অর্থ, সামনের জুলাই মাসে মুখ্যমন্ত্রীর জাপান সফরে সুকান্তদা ওকে সুযোগ দিতে পারে। ওদের মিডিয়াহাউস থেকে ও হয়ত মুখ্যমন্ত্রীর সফর-সঙ্গী সাংবাদিক হিসাবে জাপান ঘুরে আসতে পারবে!

ময়দার তাল থেকে ছোট ছোট করে লেচি কেটে হাতের কায়দায় সেগুলোকে রুটির আকার দিয়ে কালো বৃহদাকার চুল্লীর ভিতর ঢোকাচ্ছে। এরপর হাতে গামছা জাতীয় কিছু পেঁচিয়ে একটা একটা করে সেঁকা গরম রুটি বের করে আনছে। আরেকটা অল্পবয়সী ছেলে উদাসীনভাবে একের পর এক সেঁকা রুটিতে ঘি বা মাখন জাতীয় কিছু মাখাচ্ছে। গাড়ীর এসি থেকে নেমে এই গরমে দুর্গাপুর-এক্সপ্রেস-ওয়ের দার্জিলিং-মোড়ের এক ধাবায় বসে দময়ন্তী ছেলে দুটোকে লক্ষ করছে। বৈশাখের এই প্রখর রোদের তেজ বা উনুনের গনগনে আঁচের হলকা কোনকিছুই কাহিল করতে পারে নি এই সদ্য তরুণ আর প্রায় কিশোর ছেলেটাকে। আসলে রুজি ব্যাপারটাই বোধহয় এরকম! নাহলে গতকাল রাতে এডিট-এর কাজ করেও আজ দময়ন্তী আসে সিউড়ির কোন কলেজে ছাত্র-নির্বাচনের মারামারির খবর করতে? মুখ্যমন্ত্রীর জাপান সফরের বিষয়টা না থাকলেও কি ও সুকান্তদাকে না বলতে পারত? এখন আর ভেবে লাভ নেই। চারঘন্টা গাড়ী ড্রাইভ করে খিদেতে পেটে আগুন জ্বলছে। তাই পাতে তরকারী সহযোগে গরম রুটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মনটা ভাল হয়ে গেল। শান্তনু খেতে খেতেই বলল, “একটা জিনিষ লক্ষ করেছ, আগে যেখানে হাইওয়ের ধারে ভাতের হোটেল থাকত, এখন শুধুই ধাবা!” মুখের চিবানো রুটিটা শেষ করে দময়ন্তী বলে, “বেশ ইন্টারেস্টিং! সাধারণত, উত্তর-ভারতের হাইওয়েগুলোতে এই ধরনের ধাবা দেখা যায়।” শান্তনু রুটি চিবোতে চিবোতে বলে, “বুঝতে পারছো না, বাঙালী এখন আর মাছে-ভাতে নেই! এখন তো রুটি-তড়কায় উত্তরণ হয়েছে, এরপর দেখবে পিৎজা আর নুডলস-এর দোকানই শুধু থাকবে।” “ভাল বললেন তো, এই নিয়েই একটা ফিচার লেখা হয়ে যেতে পারে। বাঙালীর দোষ নেই! মাছের যা দাম! মাছেরা এখন শোপিসের মত মাছ-বিক্রেতাদের দোকানগুলোতেই শোভা পায়!” কথাগুলো বলেই ঢকঢক করে ঠাণ্ডা বিসলেরির বোতল থেকে জল গলায় ঢালল দময়ন্তী।

দুজনের খাওয়া শেষ হলে আবার গাড়ী চলল হাইওয়ে দিয়ে। সিউড়ি মোড়ের কাছে একটা ট্রাফিকে গাড়ীটা দাঁড়ানোর সময় শান্তনু জিজ্ঞেস করল, “যে ছেলেটা মারা গেছে আগে কি তার বাড়ীতে যাবে? বাড়ীর লোকের বাইট নিতে? না, কলেজে যাবে?” দময়ন্তী ভেবে দেখল কলেজে যাওয়াই ভাল। আগে সরেজমিনে তদন্ত করতে হবে। বাড়ীর লোকের বাইটও অবশ্য নিতেই হবে। তবেই না রিপোর্টটা কমপ্লিট হবে! মনে হওয়া মাত্র স্থানীয় জুনিয়ার ট্রেনি-জার্ণালিস্ট শ্রীতমকে ফোনে ধরল। “হ্যাঁ, আমরা সিউড়ি গভর্নমেন্ট-কলেজের দিকে আসছি। কি খবর? ডেডবডি কি পোস্ট-মর্টেমে চলে গেছে? অধ্যক্ষ এখনও কলেজে ঘেরাও?” ওপ্রান্তের উত্তর শুনে দময়ন্তী গাড়ীর স্পিড বাড়ায়। 

সিউড়ি গভর্নমেন্ট কলেজের সামনে পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। তারই মাঝে লাল, সবুজ, গেরুয়া নানা রঙের পতাকা নিয়ে কয়েকজন স্লোগান দিয়ে চলেছে। স্থানীয় লোকেদের ভিড়ও রয়েছে। পুলিশের ঘেরাটোপের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসছেন কলেজের অধ্যক্ষমহাশয়। অধ্যক্ষমহাশয়কে দেখে স্লোগান-বাহিনী আরও উত্তেজিত। “সুবল মণ্ডলের খুনীদের শাস্তি চাই।” দময়ন্তী বোঝার চেষ্টা করছে, গণ্ডগোলটা তাহলে কারা করেছে? সবাই তো দোষীদের শাস্তি দাবী করছে! তাহলে কোন রাজনৈতিক দল সুবল মণ্ডল নামে ছেলেটাকে পিটিয়ে খুন করল? ওর কাছে খবর ছিল, কলেজে ছাত্র-নির্বাচনে উত্তেজনা ঘিরে দুই দলের মারামারি। আর তার জেরে একটা ছেলে মারা গেছে। ঠিক মারা যায় নি, ছেলেটাকে বিরোধীপক্ষের ছেলেরা পিটিয়ে মেরেছে। মৃত ছেলেটা কোন পক্ষের? বিরোধী পক্ষই বা কারা? এই তথ্যগুলো সঠিক দিতে পারবে শ্রীতম। কিন্তু তার আগে অধ্যক্ষের একটা ইন্টারভিউ নিতে হবে। অন্যান্য মিডিয়ার সাংবাদিকেরা তাদের প্রশ্নবাণ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে অধ্যক্ষমহাশয়ের উপর। দময়ন্তীও এগিয়ে গেল। 

সাংবাদিক ১- “আপনার কলেজে ক্লাশ চলাকালীন এধরনের ঘটনা ঘটল! আপনি কি পুলিশে এফ-আই-আর করেছেন? আপনার দায়িত্ব কতখানি বলে আপনি মনে করেন?”

অধ্যক্ষ- দায়িত্ব? আমি অবশ্যই আমার দায়িত্ব পালন করেছি। পুলিশকে ফোন করেছি।

সাংবাদিক ২- এফ-আই-আর করেছেন? কাদের বিরুদ্ধে আপনার অভিযোগ?

অধ্যক্ষ- না এফ-আই-আর করি নি। কারা করেছে আমি বলতে পারব না? আর ছাত্রটি তো কলেজের ভিতর মারা যায় নি।

সাংবাদিক ১- আপনার কলেজে ছাত্র-সংসদ নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনার দরুণ ছেলেটিকে বিশ্রীভাবে মারা হয়। ছেলেটি গুরুতর আহত আপনার কলেজেই হয় এবং এরপর হাঁসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় এমবুলেন্সে ছেলেটি মারা যায়। আর আপনি বলছেন কলেজের ভিতর মারা যায় নি? কিন্তু ছেলেটাকে তো কলেজের ভিতরেই মারা হয়েছিল। 

অধ্যক্ষ- দেখুন আমি কিছু বলতে পারব না। আমাকে তালা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। আপনাদের সামনেই পুলিশ আমাকে তালা খুলে উদ্ধার করে আনে।

সাংবাদিক ৩- আপনার কলেজে ইউনিয়ানরুমে দরজা বন্ধ করে একটা ছেলেকে বীভৎসভাবে পিটিয়ে একেবারে মেরে ফেলা হল। আর আপনি বলছেন যে আপনি কিছু জানেন না?

অধ্যক্ষ- (বেশ উত্তেজিত হয়ে) না কিছু জানি না। বলছি তো আমাকে তালা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। 

সাংবাদিক ৪- ছেলেটা কি রাজনীতি করত? কোন বিশেষ দলের হয়ে ছেলেটা রাজনীতি করত?

অধ্যক্ষ- রাজনীতি অবশ্যই করত। নাহলে টার্গেট হল কিভাবে? তবে কোন দলের বলতে পারব না?

ভীড়ের মধ্যে থেকে কে যেন বলে উঠল-“না! সুবল কোন রাজনীতি করত না!” সাংবাদিকেরা সহ গোটা ভীড়ের দৃষ্টি সেই আওয়াজের উৎস খুঁজতে লাগল। অধ্যক্ষ হাতজোড় করে সাংবাদিকদের অনুরোধ করলেন, “আমায় আপনারা ছেড়ে দিন। আমি কিছু জানি না। এতক্ষণ তালাবন্দী থেকে আমি ক্লান্ত! টয়লেটে পর্যন্ত যেতে পারি নি। আপনাদের যা জিজ্ঞাসা পুলিশের কাছে করুন।” এই পর্যন্ত বলে অধ্যক্ষমহাশয় গাড়ীতে উঠে গেলেন। দময়ন্তী সহ অন্যান্য সাংবাদিকেরাও তাদের নিজেদের গাড়ীতে উঠে মৃত ছেলেটির বাড়ীর দিকে গেল। 

ছোট্ট একতলা বাড়ীটাকে ঘিরে প্রচুর ভীড় জমেছে। দময়ন্তী ভীড় ঠেলে ভিতরে ঢোকে। বাইরের ঘরে কেউ নেই। ঘর পেরিয়ে সরু বারান্দা। বারান্দা দিয়ে সোজা গিয়ে যে ঘরে সে ঢোকে সেখানে শোকে পাথর হয়ে যাওয়া দুই মহিলা। একজন ষাটোর্ধব, আরেকজন ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হবেন। প্রশ্ন করে জানতে পারে যে ওরা মৃত ছেলেটির মা আর দিদি। তাদের ঘিরে কয়েকজন প্রতিবেশী বা আত্মীয় রয়েছেন। কথা বলে বোঝা গেল সকলেই প্রতিবেশী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে প্রতিবেশীরাই। ছেলেটার পরিবারে মা আর দিদি ছাড়া আর কেউ নেই সম্ভবত। সুবল মণ্ডল রাজনীতি করে কি না –এই প্রশ্নের উত্তর কেউই দিতে পারল না। কেউ তাকে কোনদিন কোন রাজনৈতিক মিছিলে বা মিটিং-এ দেখে নি। ফুটবল খেলা, আবৃত্তি করা- এইগুলো ছাড়া সুবলের আর কোন কার্যকলাপের কথা কেউ কোনদিন শোনেনি বা দেখেনি। প্রতিবেশীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় কোন সাংবাদিকই শোকে মূহ্যমান সুবলের মা-দিদিকে প্রশ্ন করতে পারছে না। প্রত্যেকেরই টার্গেট সুবলের মা-দিদি। ওদের প্রতিক্রিয়া, ওদের অভিযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই খবরের উপর স্টোরি করার জন্য। দময়ন্তী জানে সুবলের মা-দিদির সাথে কথা না বললে ওর এখানে আসাই বৃথা। সেক্ষেত্রে স্টোরিটাও হবে না। আর স্টোরি না হলে ওর ভাগ্যে জাপান যাওয়ার শিঁকেও ছিড়বে না। তাই ধৈর্য-সহকারে সে অপেক্ষা করে। 

বডি পোস্ট-মর্টেম হয়ে একটা ট্রাকে করে ফিরে এসেছে। দময়ন্তী লক্ষ করল, বড় বড় শাদা রীদ, রজনীগন্ধা আর লাল গোলাপে মৃতদেহ ঢেকে রয়েছে। ট্রাকের পিছন পিছন এলো আরেকটা ট্রাক। রাজনৈতিক পতাকা হাতে জনা কয়েক ছেলে আর তাদের নেতা। তারা স্লোগান দিচ্ছে, “কমরেড সুবল অমর রহে! তোমায় আমরা ভুলছি না ভুলব না!” স্লোগানের মধ্যেই ধুলো উড়িয়ে হাজির অন্য-এক রঙের পতাকাধারী ছেলেসমেত আরেকটা ট্রাক। “শহীদ সুবল মণ্ডল অমর রহে। খুনীদের শাস্তি চাই!” এরই মধ্যে সাইরেন বাজিয়ে একগাড়ি পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে এলেন এলাকার বিধায়ক। এরপর এক-এক করে রাজ্যের মন্ত্রী, সাংসদ। সবারই দাবী সুবল মণ্ডল তাঁদের দলেরই কর্মী। সবাই নিহত সুবলকে সুবিচার দিতে বদ্ধ পরিকর। মন্ত্রীমশাই ঘোষণা করলেন, সুবলের পরিবারকে পাঁচলাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেবেন। সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলের নেত্রী সদর্পে ঘোষণা করলেন, ক্ষতিপূরণের কথা তিনিই আগে ভেবেছিলেন। মন্ত্রীমশাই নিজের দলের ক্যাডারদের বাঁচাতে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন। সাংসদ আর কোন বাক-বিতণ্ডায় না গিয়ে মৃতের পরিবারের জন্য দশ লাখ ঘোষণা করে দিলেন। স্লোগানে মুখরিত হল শোক-সন্তপ্ত পরিবারের আবাস-স্থল। এতক্ষণ পাথর হয়ে থাকা মৃত ছেলেটার দিদি এবার এগিয়ে আসছে ভীড় ঠেলে। কিন্তু পৌঁছতেই পারছে না তার মৃত ভাইটার কাছে। দময়ন্তীর মনে হল একবার কি ভাই-এর মাথায় হাত রাখতে চাইছে বছর পঁয়ত্রিশের মেয়েটা? না এগোতে পারছে না। শুরু হয়ে গেছে আবার কাজিয়া। সবাই বলছে সুবল আমাদের দলের কর্মী। কেউ বলছে সুবল লাল, কেউ বলছে সে সবুজ, কেউ বা সুবলকে গেরুয়া করেই ছাড়বে। বিড়বিড় করে সুবলের দিদি কি যেন বলছে। দময়ন্তী অভ্যস্থ ভীড় ঠেলায়। সে এগিয়ে যায় সুবলের দিদির কাছে। সুবলের দিদি কি বলছে শোনাটা জরুরি। 

“বন্ধ কর! সুবল লাল, সবুজ, গেরুয়া কিছুই নয়। ওর প্রিয় রঙ নীল। নীলের মধ্যে ও খুঁজে পেত আকাশের বিশালতা, অসীমের ব্যাপ্তি। বোদলেয়ার, রিলকে, ফ্রস্ট,এলিয়েট, কিটস- ছিল ওর জগত।” দময়ন্তী কর্ডলেস মাইকটা চেপে ধরে সুবলের দিদির মুখের সামনে। সে আরো বলে, “ভাই কোনদিন কোন রাজনীতি করেনি। আপনারা দয়া করে ওর উপর রাজনীতির রং ছেটাবেন না!” একটু থেমে সে আবার বলে, “আমাদের কোন ক্ষতিপূরণের দরকার নেই। যদি ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, তাহলে ভাইকে ফিরিয়ে দিন।” এইবার সে উন্মাদের মত চিৎকার করে ওঠে, “বল শুয়ারের বাচ্চারা আমার ভাইকে ফিরিয়ে দিতে পারবি?” কেমন যেন হিস্টেরিক হয়ে পড়ে ও। দময়ন্তী লক্ষ করে ভীড়ের মধ্যে কে যেন বলে ওঠে, “শোকে দুঃখে পাগল হয়ে গেছে মেয়েটা! অল্প-বয়সে স্বামী গেছে। আর এখন ভাই চলে গেল। মেয়েটার আর কেউ রইল না।” দময়ন্তী ঘরের ভিতর লক্ষ করে সুবলের মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে। শান্তনু নির্বিকারভাবে পটাপট ছবি তুলে যাচ্ছে। দময়ন্তী জানে সাংবাদিকদের নির্বিকার হতে হয়। ঠিক যেন, হাইওয়ের ধারের ধাবায় রুটি সেঁকা সেই ছেলে দুটোর মত। প্রখর রোদের দাবদহে, গনগণে উনুনের আঁচে অথবা অন্তরের প্রদাহে তাদের নির্বিকার থাকতেই হয়! দময়ন্তী নির্বিকার থাকার চেষ্টা করলেও সুবলের দিদির কথা শুনে আর ঘরের ভিতর সুবলের মায়ের অজ্ঞান হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে একটা কান্না যেন গলার মধ্যে ডেলা হয়ে জমে আসছে। 

না, সুকান্তদাকে খুশী করে জাপান যাওয়ার জন্য নয়। একটা ছেলে যে রাজনীতি কোনদিন করলই না। বোদলেয়ার, রিলকের কবিতার জগতে যে বিচরণ করত তার এই পরিণতি কি করে হয় তা ওকে জানতেই হবে। সত্যি ঘটনা সমাজের কাছে তুলে ধরতেই হবে। অন্তত আরেকটা সুবলকে যেন অকালে চলে যেতে না হয়! আরেকটা সুবলের পরিচয় নিয়ে কোন রঙের খেলা না চলতে পারে! তাই দময়ন্তী রাতটা সিউড়িতে সরকারী গেস্ট-হাউসেই কাটাবে ঠিক করে। শান্তনুকে জানিয়ে দেয়। শান্তনু অন্য সাংবাদিকবন্ধুর গাড়ীতে কলকাতায় ফিরে আসে।

সকাল থেকে শ্মশান, থানা, পার্টি-অফিস ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হলেও সুবল হত্যার সঠিক কারণ দময়ন্তী এখনও জানতে পারে নি। যে ছেলেটা রাজনীতির ধারে কাছে ঘেঁষেই নি কখনো, তাকে কেন ইউনিয়ন-রুমে তালাবন্ধ করে বীভৎসভাবে মারা হল? সুবলের বন্ধুরা সব এতটাই শকড যে কেউ মুখ খুলতে রাজী নয়। সবাই এককথা বলছে, “কিছু জানি না, কিছু বলতে পারব না!” এক আতঙ্কের পরিবেশ ছড়িয়ে রয়েছে গোটা সিউড়ি জুড়ে। শারীরিক, মানসিক দুইভাবেই দময়ন্তী বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। গেস্ট-হাউসের বিছানায় নিজের হাক্লান্ত শরীরটা ছুড়ে দিয়ে সে কিছুক্ষণের জন্য চোখ বোজে। এরমধ্যেই মোবাইল বেজে ওঠে। স্ক্রিনে সুকান্তদার নম্বরটা ভেসে ওঠে। সব রিপোর্টই তো ও মেইল করে পাঠিয়েছে। তাহলে? ফোনটা ধরার সঙ্গে সঙ্গে সুকান্তদার উত্তেজিত গলার স্বর ভেসে আসে। “কি ব্যাপারটা কি তোর? এখনও কেন সিউড়িতে পড়ে আছিস? কাল সকালেই কলকাতা ফিরে আয়। আমাদের আর কোন আপ-ডেটের দরকার নেই।” সুকান্তদাকে থামিয়ে দময়ন্তী বলে ওঠে, “কিন্তু আমি তো এখনও এই খুনের আসল কারণটাই জানতে পারি নি। আর একটা ইন্টারেস্টিং খবর হল ছেলেটা রাজনীতি করতই না। বরং রাজনীতি থেকে শত-হস্ত দূরে ছিল। তাহলে কেন?” “তোমাকে তাহলের উত্তর খুঁজতে হবে না। তুমি সাংবাদিক। পুলিশ বা গোয়েন্দা নও।” বেশ কেটে কেটে কথাগুলো বলে সুকান্তদা। দময়ন্তী ধীর অথচ সুস্পষ্ট ভাবে উত্তর দেয়, “সাংবাদিকের কাজও খানিকটা গোয়েন্দার মত নয় কি? সত্য উদঘাটন করে সমাজকে জানান।” “সাংবাদিকেরা জঞ্জাল সাফাই অভিযানে নামে না। ছাত্র-নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সব কলেজেই ছোটখাটো সংঘর্ষ হয়। এখানে একটা ছেলে মারা গেছে এবং গোটা ব্যাপারটা বেশ সেনসিটিভ হয়ে পড়েছিল বলে তোকে পাঠিয়েছিলাম। এখন যা কিছু আপডেট স্থানীয় প্রতিনিধিরাই দেবে।” এই পর্যন্ত বলে সুকান্তদা একটু থামে। এরপর বেশ মোলায়াম স্বরেই বলে, “দময়ন্তী পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন মানেই রক্তপাত। তা সে ছাত্র-সংসদের নির্বাচন হোক কি বিধানসভা, কি লোকসভা নির্বাচন! আজকে নতুন নয়। আমাদের আগের প্রজন্ম, তার আগের প্রজন্মও দেখেছে পশ্চিমবঙ্গের রক্তাক্ত রাজনীতি। আমরাও দেখছি, আমদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও হয়ত রাজুনীতির একই রূপ দেখবে। মানুষ এখানে শুধুই নির্বাচন জেতার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যামাত্র। শুধু শুধু তুই, আমি ভেবে তো কিছু করতে পারব না! তারচেয়ে এখন সিউড়ি থেকে ফিরে আয়। এদিকে আরও বেশ কিছু জায়গায় সংঘর্ষ হচ্ছে সেগুলোর ফলো-আপ কর। বরং নতুন একটা কলম-ই লেখ- পশ্চিমবঙ্গের রক্তাক্ত রাজনীতি। বেশী সরকার বিরোধী কথা লিখিস না, একটা নিরপেক্ষ টাইপের লেখ! সবকটা দলকেই টার্গেট কর!” সুকান্তদা অনুরোধ করছে না নির্দেশ দিচ্ছে? চাকরীর পদমর্যাদা অনুযায়ী নির্দেশ ও দিতেই পারে। দময়ন্তী কথা না বাড়িয়ে বলে, “ঠিক আছে।” “গুড-নাইট”, বলে সুকান্তদা ফোনটা কেটে দেয়। দময়ন্তী ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইন্টারকমে হোটেলের রিসেপশনে ফোন করে জানাতে যায়, সে কাল সকালে রওনা হবে। বিলটা যেন রেডি রাখে। এরমধ্যেই ইন্টারকম বেজে ওঠে, “ম্যাম, আপনার সাথে দেখা করতে দুজন এসেছে। বলছে বিশেষ দরকার। আপনার পরিচিত।” একমুহুর্ত ভাবে দময়ন্তী। ও যে সুবলের মৃত্যুর কারণ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে সেটা রাজনৈতিক নেতা থেকে পুলিশ কেউ-ই পচ্ছন্দ করছে না। বরং পুলিশ সুপার খুব কড়া ভাবে ওকে বলেছিল, “ম্যাডাম, শুধু শুধু জল ঘোলা করবেন না! আমাদের কাজ আমাদেরই করতে দিন!” তাই ও দোনামনা করছে এই এত রাতে কারোর সাথে দেখা করাটা ঠিক হবে কি না? এর মধ্যেই রিসেপশনিস্ট বলে ওঠে, “ম্যাডাম, আপনি না দেখা করলে, কাইন্ডলি একটু ফোনে জানিয়ে দিন।” ফোনের ওপ্রান্ত থেকে শ্রীতমের গলা পায়। “দময়ন্তীদি, আমি সুবলের এক বন্ধু প্রদ্যুত নস্করকে আমার সঙ্গে এনেছি। ও ঘটনার দিন কলেজে ছিল। সুবলের ক্লাসমেট। ওর নামটা গোপন রাখলে ও যা জানে সব বলবে বলছে।” দময়ন্তী বেশ উত্তেজিত। “হ্যাঁ, চলে আয় তোরা।” শ্রীতম ছেলেটা তো বেশ করিৎকর্মা!

প্রদ্যুত আর শ্রীতমকে সোফায় বসিয়ে দময়ন্তী খাটে বসে। ভয়েস-রেকর্ডারটাও অন করে দেয়। প্রথমে প্রদ্যুত একটু নার্ভাস ফিল করছিল। দময়ন্তী আশ্বস্ত করে, “তোমার নাম কোথাও ব্যবহার করব না। আর তাছাড়া, আমাদের তো প্রিন্ট-মিডিয়া। কোথাও টেলিকাস্টের তো প্রশ্নই নেই। তুমি যা জানো বল!” প্রদ্যুত বলে যায়। “আমাদের কলেজে ছাত্র-নির্বাচন পরশু। গত একমাস ধরেই সকাল বিকাল দুবেলা ছাত্র-সংসদের ছেলেরা কলেজে মিছিল করে। কলেজে উপস্থিত সব ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাশ ছেড়ে মিছিলে আসতে বাধ্য করা হয়। স্যার-ম্যাডামরা কিছু বলেন না। সেদিনও এরকম একটা মিছিলের জন্য আমাদের ক্লাশ থেকে ডেকে নেওয়া হল। সুবল মিছিলে না গিয়ে লাইব্রেরীতে গেল। ওর একটা বই ফেরত দেওয়ার ছিল। পরে ইউনিয়ান-রুমে ডেকে ওকে খোকাদা ধমকে দেয়। আর বলে এবার থেকে সবকটা মিছিল-মিটিং-এ ও যেন থাকে। খোকাদা চার বছর আগে কলেজ ছেড়েছে। তবু অঞ্চলের ছাত্র-যুব নেতা বলে প্রায়ই কলজে আসে। সুবল তাও ওদের কথা শোনে নি। সরাসরি মিছিলে যেতে না বলেছিল কলেজের ছাত্র-সংসদের জেনারেল-সেক্রেটারিকে। সামনের মাসে ফাইনাল পরীক্ষা। এরমধ্যে ওর আটেন্ডেন্স-শর্ট হয়। অথচ ও তো রেগুলার কলেজে ক্লাশ করে! তাই প্রিন্সিপাল-রুমে এ নিয়ে কথা বলতে যায়। প্রিন্সিপাল ওকে অ্যাপ্লিকেশন লিখতে বলে। সুবল অ্যাপ্লিকেশন লিখে জমা দিতে গেলে দেখে খোকাদা বসে চা খাচ্ছে প্রিন্সিপালের সাথে। সুবলকে ইউনিয়ান-রুমে দেখা করতে বলে। আমরা সবাই ওকে বোঝাই। কাল থেকে মিছিলে থাকব বলে, -ওদের সাথে আপোষ করে নিতে বলি। সুবল ইউনিয়ান-রুমে ঢোকে। এরপর যা হয়, তা তো আপনারা সবাই জানেন।” এই পর্যন্ত বলে প্রদ্যুত থামে। কারোর মুখে কোন কথা নেই। ঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে পড়েছে। 

শ্রীতম বলে, ‘দিদি দারুণ খবর! দময়ন্তী চুপ করে থাকে। খবরের আগে মানুষ সত্য!

পরদিন সকালে দময়ন্তী সুবলের দিদিকে নিয়ে থানায় এফ আই আর করে। ফেরার পথে সুকান্তদার এস এম এস পায়ঃ এসবের মধ্যে না জড়ালেই ভাল করতিস।



লেখক পরিচিতি
রিমি মুৎসুদ্দি
গল্পকার। অনুবাদক। প্রবন্ধকার। সাংবাদিক।