ইতালো কালভিনোর গল্প: প্যাঁচালো এক অস্তিত্বের নির্মাণ





অনুবাদ: বিপ্লব বিশ্বাস

অধিকাংশ শামুকের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান জৈব গড়ন এই প্রজাতিদের জীবনে সামান্যই গুরুত্ববহ যেহেতু তারা একে অপরকে দেখতে পায় না আর বড়োজোর আশপাশের জনেদের সম্পর্কে একটা অস্পষ্ট অনুভূতি কাজ করে। এতে করে অবশ্য আমাদের চোখে দেখতে সুন্দর উজ্জ্বল রঙের ডোরাকাটা খোলক ( যেমনটি অনেক শামুকের খোলকেই দেখা যায়) স্বাধীনভাবে স্থিত যে কোনও সম্পর্কের ক্ষেত্রে দৃশ্যমানতায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

তুমি বলছ যখন আমি শিলাখণ্ডে সেঁটে ছিলাম,সেই আমার মতো? - কিউএফডব্লিউএফকিউ(Qfwfq) জানতে চায়,- যখন ঢেউগুলো ওঠানামা করছিল আর আমি সেখানে নিশ্চল, চ্যাপটা অবস্থায় সব সময় যা পাচ্ছিলাম চুষে খাচ্ছিলাম আর এর সম্পর্কে ভাবছিলাম? যদি সেই সময়টার কথাই জানতে চাও, সে বিষয়ে আমি বেশি কিছু বলতে পারব না। আর গড়ন? আমার কোনও গড়নই ছিল না ; অর্থাৎ, আমি জানতাম না তেমন কিছু গড়ন আমার ছিল, কিংবা তোমারও কিছু ছিল কি না, জানতাম না। আমি এলোপাথাড়িভাবে চারদিকে কমবেশি বেড়ে উঠেছিলাম ; একে যদি তুমি প্রতিসাম্য বলো, আমার মনে হয় আমার সেটাই ছিল কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি আমি কখনোই এ ব্যাপারে কোনও মনোযোগ দিইনি। কেন আমি অন্য পাশে না বেড়ে এক পাশে বেড়েছি? আমার না ছিল চোখ, না মাথা, দেহের এমন কোনও অংশও ছিল না যা অন্য যে কোনও অংশের চাইতে আলাদা ; এখন আমি যুক্তি দিয়ে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করি, আমার যে দুটি ফুটো ছিল তার একটি মুখ, অপরটি পায়ু, আর আমার তাই দ্বিপার্শ্বিক সামঞ্জস্য ছিলই, ঠিক বিলুপ্তপ্রায় সামুদ্রিক আর্থ্রোপড( মাকড়সা জাতীয়) যৌগিক চোখের ট্রাইবোলাইটের আর বাকি তোমাদের মতো, কিন্তু আমার স্মৃতি থেকে ওই ফুটো দুটোকে আলাদাভাবে আমি বোঝাতে পারি না, যে দিক থেকে ইচ্ছে আমি যে কোনও বস্তু চালান করতে পারি, ভিতরে বা বাইরে দুটোই এক, পার্থক্য আর বিরাগ অনেক পরে অনুভব করেছি। প্রতিটি মুহূর্তে কাল্পনিক ব্যাপার - স্যাপার আমাকে আড়পে নিয়েছিল, সেটা ঠিক ; উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, বগলের নিচে চুলকোনোর ধারণা কিংবা পা মুড়ে বসা বা একবার গোঁফ গজানো। আমি তোমার সঙ্গে কথায় এই শব্দগুলো ব্যবহার করছি নিজেকে স্পষ্ট করার জন্য ; এর পরেও ছিল অনেক খুঁটিনাটি বিষয় যা আমি দূরদৃষ্টিতে আনতে পারিনি : আমার কিছু কোষ ছিল, কমবেশি একে অপরের মতোই আর তারা সকলে কমবেশি একই রকম কাজ করত। কিন্তু যেহেতু আমার কোনও গড়ন ছিল না আমি সব রকম রূপই আমার মধ্যে অনুভব করতে পারতাম ; আর গোলমাল করার, এমনকি রূঢ় কিছু হলেও, ক্রিয়া, প্রকাশ ও সম্ভাবনা সবই ছিল। সংক্ষেপে, আমার ভাবনাচিন্তার কোনও সীমা ছিল না, সর্বোপরি সেগুলো ভাবনাচিন্তাই ছিল না কেননা সে সব ভাবার জন্য আমার কোনও মস্তিষ্কই( মগজই)ছিল না। ; প্রতিটি কোষ আপনা থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে ভাবনার বিষয় ভেবে নিত, কোনও প্রতিমূর্তির মাঝ দিয়ে নয় যেহেতু আমাদের এখতিয়ারে কোনওরূপ প্রতিমূর্তিই ছিল না, কিন্তু সহজভাবে সেখানে কাউকে বুঝবার অস্পষ্ট রূপরেখা ছিল যা সেখানে কোনও না কোনও পথে আমাদের সমভাবে বুঝবার শক্তি থেকে আমাদের বাধা দেয়নি।

এটি ছিল সমৃদ্ধ, মুক্ত আর পরিতৃপ্ত অবস্থা, সেই সময় আমার অবস্থা এমনই ছিল, তুমি যেভাবে ভাবতে পারো তার ঠিক বিপরীতে। আমি ছিলাম অবিবাহিত ( সেইকালে আমাদের জনন প্রক্রিয়ার জন্য এমনকি অস্থায়ী সংযোগ ব্যবস্থারও দরকার পড়ত না), স্বাস্থ্যবান, আমার অধিক কোনও আকাঙ্ক্ষাও ছিল না। তুমি যখন যুবক, তোমার সামনে পড়ে থাকে সকল প্রকার বিবর্তন, প্রতিটি রাস্তাই থাকে খোলা, আর ওই একই সময়ে তুমি সেই শিলার ওপর অবস্থানের ঘটনাকে উপভোগ করতে পারো, চ্যাপটা শম্বুক- পিণ্ড, স্যাঁতসেঁতে তবুও সুখী। যদি পরবর্তীকালে যে সব সীমাবদ্ধতা এসেছে তার সঙ্গে নিজেকে তুলনা করো, যদি ভাবো, কীভাবে একটি গড়নের অধিকার অন্যান্য রূপসকলকে বহিষ্কার করে, সেই একঘেয়ে যাপন থেকে যেখানে শেষত তুমি ফাঁদে পড়ে যাও, ঠিকাছে, সেইকালে জীবনকে সুন্দর বললে আমি কিছু মনে করব না।

নিশ্চিতভাবে বলতে গেলে, আমি যে নিজেতে খানিক গুটিয়েই বাস করতাম, তা সত্যি, আজকের দিনের একে অপরের সম্পর্কযুক্ত আমাদের জীবনের সঙ্গে তার কোনও তুলনাই চলে না; এবং আমি এটাও স্বীকার করব যে অংশত আমার বয়সের কারণে ও অংশত আমার পারিপার্শ্বিক প্রভাবের ফলে- ওই যে সকলে আমাকে আত্মপ্রেমী বলে, আমি খানিকটা তেমনই ছিলাম। আমি বলতে চাইছি আমি আমার খোলকের মধ্যে থেকেই সব সময় নিজের দিকেই চেয়ে থাকতাম; চেয়ে চেয়ে নিজের ভালো দিক, সমস্ত ত্রুটি, সব লক্ষ করতাম আর আমি উভয় দিক থেকেই নিজেকে পছন্দ করতাম। আর তুমি এটাও অবশ্য স্মরণ করবে, আমার তুলনা করার কোনও শর্ত ছিল না।

কিন্তু আমি অতটা পিছিয়ে পড়া ছিলাম না যে আমাকে ছাপিয়ে কোনও কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিলাম না : স্পষ্টত যে শিলাখণ্ডের গায়ে লেপটে ছিলাম এবং প্রতিটি ঢেউয়ের সঙ্গে যে জল আমাকে ছুঁয়ে যেত, আবার দূরের অন্যান্য বস্তুসকল - সব মিলিয়েই তো জগৎ। জলই ছিল খবরা-খবরের উৎস, বিশ্বস্ত তথা সংক্ষিপ্ত : এই জল আমার কাছে ভক্ষ্য বস্তু বয়ে আনত যা আমি আমার বহিঃপৃষ্ঠের মাঝ দিয়ে শুঁষে নিতাম, আবার অন্যান্য অভক্ষ্য বস্তুও বয়ে আনত যা আমার চারপাশে কী আছে সে বিষয়ে একটি ধারণা গড়তে সাহায্য করত। ব্যাপারটা এইরকম ছিল : একটা ঢেউ আসত আর আমি পাথরের গায়ে আঁকড়ে থেকে প্রায় অগোচরে নিজেকে খানিকটা তুলে ধরতাম - এ ক্ষেত্রে আমাকে যা করতে হত, চাপ কিছুটা ঢিল দিতে হত - আর আমার নিচ দিয়ে যে জল বয়ে যেত তাকে ফটাস শব্দে আঘাত করতাম, যে জলে ভরা থাকত নানান বস্তু, অনুভূতি ও উদ্দীপক( তীক্ষ্ণ আঁশ)। তুমি কখনোই জানতে না সেই উদ্দীপকগুলি কীভাবে পরিণতি ঘটাত, কখনও এমন সুড়সুড়ি দিত যে হেসে মরে যেতাম, অন্যান্য সময়ে একটা কাঁপুনি, একটা জ্বালাভাব, একটা চুলকানি ; সুতরাং তা ছিল ফুর্তি ও আবেগের অবিরাম ঢেঁকিকলের খেলা। কিন্তু এটা অবশ্যই ভেবো না আমি সেখানে অসাড়ে পড়ে থেকে যা আমার দিকে ছুটে আসত তাকেই মুখ বুজে গ্রহণ করতাম : কিছুক্ষণ পর আমি কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম যা দিয়ে দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারতাম যে কোনও ধরনের বস্তু আমার কাছে আসছে এবং তাদের নিয়ে কেমন ব্যবহার করা উচিত, শ্রেষ্ঠ উপায়ে তাদের ব্যবহার করা কিংবা অধিক অপ্রীতিকর ফলাফল এড়িয়ে যাওয়া। পুরোটাই ছিল এক সংকোচনের খেলা, আমার প্রতিটি কোষ ব্যবহার করে, অথবা সঠিক সময়ে দেহকে শিথিল করে : আর আমি আমার পছন্দ অনুযায়ী প্রত্যাখ্যান, আকর্ষণ এমনকি ঘৃণায় থুতুও ছেটাতে পারতাম।

আর এভাবেই আমি শিখেছিলাম যে সেখানে অন্যান্যরাও ছিল, আমার চারপাশে সে সবের অংশবিশেষে ভরা থাকত, সেইসব অপরেরা যারা শত্রুভাবাপন্ন, আমার থেকে আলাদা অথবা বিরক্তিকরভাবে সমজাতীয়। না, এখন আমার চরিত্রের এক বেসুরো ধারণা তোমাকে দেব যা সবটাই ভুল। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের প্রত্যেকে নিজের নিজের কাজে চলে গেল, কিন্তু অন্যান্যদের উপস্থিতি আমাকে পুনরায় নিশ্চিত করেছিল, আমার চারপাশে বসবাসযোগ্য একটি অঞ্চল গড়ে তুলেছিল, শঙ্কাপূর্ণ ব্যতিক্রমী হবার ভয় থেকে আমাকে মুক্ত করেছিল যেখানে আমি পতিত হতে পারতাম যদি টিকে থাকার ঘটনাই একমাত্র আমার কপালের লিখন হত, যা হত এক ধরনের নির্বাসন।

তাই আমি জানতাম এই অপরদের মধ্যে কেউ কেউ নারীও ছিল। জলে এক বিশেষ কাঁপনের সঞ্চার হত, ব্রুম…ব্রুম…ব্রুম জাতীয় এক শিহরণ, মনে পড়ছে যখন প্রথম এই শিহরণ সম্পর্কে জানলাম কিংবা প্রথম নয়, মনে পড়ছে এই জানার ব্যাপারে যখন সচেতন হলাম সেই বস্তু হিসেবে যা আমি সব সময় জানতাম। এই কম্পনসমূহের অস্তিত্ব আবিষ্কারের সময়, বিশাল কৌতূহল আমাকে আঁকড়ে ধরেছিল, সে সব দেখার জন্য ততটা নয় কিংবা দৃষ্ট হবার জন্যও নয় - যেহেতু, প্রথমত আমাদের কোনও দৃষ্টিশক্তি ছিল না এবং দ্বিতীয়ত লিঙ্গবিভাজন তখনও সেভাবে হয়নি, তাই প্রতিটি ব্যক্তিসত্তাই একে অপরের সঙ্গে অভিন্ন এবং যে কোনও একটিকে দেখে আমি নিজেকে দেখার চাইতে অধিক আনন্দ অনুভব করতাম না - কিন্তু আমার আর তাদের মাঝে কোনও কিছু ঘটবে কি না সে ব্যাপারে কৌতূহল জাগত। আমার মধ্যে একটা মরিয়া ভাব কাজ করত, বিশেষ কিছু না করার আকাঙ্ক্ষা যা হতে পারত অবান্তর এটা জেনেই যে সেখানে বিশেষ কিছু করার ছিল না কিংবা সাধারণও, শুধু কোনওভাবে সেই কম্পনে সাড়া দেওয়া ছাড়া,অনুরূপ কম্পনের সাহায্যে,বা বরং আমার নিজস্ব কম্পনের মাধ্যমে কেননা, যথেষ্ট নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, সেখানে এমন কিছু ছিল যা অন্যের মতো একইরকম নয়, অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি যে তুমি বলতে পারো এটা হরমোন থেকে এসেছিল, কিন্তু আমার পক্ষে তা ছিল খুবই সুন্দর।

তাই তখন তাদের একজন পকাত করে ডিম পাড়ল আর আমিও কপাত করে গিলে নিয়ে সে সব নিষিক্ত করলাম : গোটাটাই হল সমুদ্রের গভীরে, সূর্যের তাপে কবোষ্ণ জলের সঙ্গে মিশে; ওহো, তোমাকে তো বলতেই ভুলে গেছি, যে সূর্য সাগরের জল আর শিলাখণ্ডকে তপ্ত করত তাকে আমি অনুভব করতে পারতাম।

আমি বলেছিলাম, তাদের একজনের কথা। কারণ, প্রথমে যে সকল নারী,সংকেত পাঠিয়ে সমুদ্রের জল অস্পষ্ট কুয়াশার মতো আমাকে আঘাত করত যেখানে আমার ক্ষেত্রে সবই ঠিক ছিল আর আমি কে কেমন সেদিকে নজর না দিয়ে খুঁড়ে খুঁড়ে দেখতাম, হঠাৎ বুঝতে পারলাম তাদের মাঝে আমার রুচির সঙ্গে কে সবচেয়ে ভালো যায়, সেই রুচি যার স্বাদ আমি অবশ্যই আগে কখনোই পাইনি। অন্যভাবে বলতে গেলে, আমি প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। যা আমি বোঝাতে চাই তা হল, আমি চিনতে শুরু করেছিলাম, অন্যদের সংকেত থেকে একজনের সংকেতকে আলাদা করে বোঝার জন্য, কার্যত সেই সকল সংকেতের জন্য অপেক্ষারত ছিলাম। আমি তাদের খুঁজে বের করলাম, আমি যে সব সংকেত সৃষ্টি করেছিলাম সে সবের সঙ্গে অপেক্ষারত সংকেতে সাড়া দিয়েছিলাম কিংবা আমিই তার কাছ থেকে আসা সংকেতগুলিকে জাগিয়ে তুলেছিলাম যার উত্তর আমার নিজস্ব সংকেতের মাধ্যমে দিয়েছিলাম অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, আমি সেই নারীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম আর সে-ও আমার প্রেমে ; তাই জীবনের কাছ থেকে আর কী-ই বা আমার চাওয়ার আছে?

এখন অভ্যেস পালটে গেছে আর এটা তোমার কাছে মনে হয় অভাবনীয় ঠেকছে যে কেউ ওইরকম এক নারীকে ভালোবাসতে পারে, তার সঙ্গে বিন্দুমাত্র সময় অতিবাহিত না করে। এবং তবুও তার সেই সামুদ্রিক জলে তরলায়িত অভ্রান্ত অংশের মাঝ দিয়ে যা জলের ঢেউ আমার দখলে এনে দিয়েছিল, তার মাঝ দিয়ে সেই নারী সম্পর্কে যথেষ্ট খবর পেয়েছিলাম, যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না : না, কোনও ভাসাভাসা, গোত্রীয় তথ্য নয় যা তুমি এখন পাও, দেখে,গন্ধ শুঁকে, স্পর্শ করে ও গলা শুনে - বরং তা প্রয়োজনীয় তথ্য যা সেই সময় শেষত আমার কল্পনায় গড়ে তুলেছিলাম। যথাযথ নির্ভুলভাবে আমি তার সম্পর্কে ভাবতে পারতাম, সে কীভাবে গড়ে উঠেছিল সে ব্যাপারে ততটা নয়,যা তার সম্পর্কে ভাববার গতানুগতিক ও কুরুচিপূর্ণ পথ হতে পারত বরং কীভাবে সে তার বর্তমানের অবয়বহীনতা থেকে এক বিশাল, সীমাহীন সম্ভাব্য অবয়বে পরিণত হবে, নিজস্ব সত্তা বজায় রেখেও। সে কোন রূপ ধারণ করবে তা আমি কল্পনা করিনি, কিন্তু আমি তাদের কথা মাথায় রেখে সেই বিশেষ গুণের কল্পনা করেছিলাম যা সে তার অবয়ব গড়তে নিয়োগ করবে।

অন্যভাবে বলতে হয়, আমি তাকে ভালোই জানতাম। আর আমি তার বিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম না। প্রতিটি মুহূর্তে সন্দেহ, উদ্বেগ আর ক্রোধের বশবর্তী ছিলাম আমি। আমি কিছু দেখাতে চাইনি, তুমি আমার চরিত্র ভালোই জানো, কিন্তু অনুমান পেরিয়ে সেই অনুভূতিহীন মুখোশের নিচে এমনকি এখনও নিজেকে স্বীকারোক্তির পথে আনতে পারিনি। একাধিকবার আমি সন্দেহ করেছি যে সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী ছিল, সে শুধু আমাকেই সংকেত পাঠাত তা নয়, অন্যদেরও পাঠাত ; একাধিকবার ভেবেছি তাদের একজনের গতি রোধ করি কিংবা আমার প্রতি প্রেরীত সংকেতে অনান্তরিকতার সুর আবিষ্কার করি। আমি হিংসুটে ছিলাম, এখন এটা স্বীকার করছি, তা যে বেশি করে তার প্রতি অবিশ্বাস থেকে তা নয়, তার চেয়ে অধিক নিজের ব্যাপারে অনিশ্চিততা থেকে : কে আমাকে নিশ্চিত করত এই ব্যাপারে যে আমি কে তা প্রকৃতই সে বুঝেছিল? অথবা আমার উপস্থিতির ঘটনা সে বুঝতে পেরেছিল? সাগরের জলকে ধন্যবাদ যে তার মাধ্যমেই আমাদের মধ্যেকার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল - এক পরিপূর্ণ সম্পর্ক। এর বেশি আমি আর কী চাইতে পারতাম? - যা আমার জন্য ছিল একান্তই ব্যক্তিগত, দুই অনন্য ও স্পষ্ট ব্যক্তিসত্তার মাঝে ; কিন্তু তার ক্ষেত্রে? কে আমাকে নিশ্চিত করত যে আমার মধ্যে যা সে খুঁজে পেতে পারত তা অন্যের মধ্যেও খুঁজে পেত না কিংবা আমার মতো আরও দুই তিন দশ বা একশোজনের মধ্যে? কে আমাকে নিশ্চিত করত যে আমাদের এই যৌথ সম্পর্কে তার বর্জন অবিবেচনাপ্রসূত, বেপরোয়া ছিল না, এক ধরনের - এরপর কে? - সমবেত উল্লাস?

ঘটনা হল, এইসব সন্দেহমালা যে সত্য ছিল না তা সূক্ষ্ম, কোমল, ব্যক্তিক তরঙ্গের দ্বারা আমার কাছে দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন হয়েছিল, কখনও কখনও তা আমাদের সংযোগের মাঝে বিনয়ী কম্পনের সূত্রে ; কিন্তু কী হত যদি নির্দিষ্টভাবে লজ্জা ও অনভিজ্ঞতাহেতু সে আমার বৈশিষ্ট্যের প্রতি যথেষ্ট নজর না দিত আর অন্যেরা এই সারল্যের সুযোগ নিয়ে বাঁকা পথে কৌশলে ঢুকে পড়ত? আর কী-ই বা হত তার মতো এক অনভিজ্ঞ আনাড়ি যদি বিশ্বাস করত যে সেটি আমিই এবং একে অপরের থেকে পার্থক্য বুঝতে না পারত আর সে কারণে আমাদের চরম খেলাটা এক অচেনাদের বৃত্তে ছড়িয়ে পড়ত…?

ঠিক তখনই আমি চুনাজাতীয় পদার্থ নিঃসরণ করতে শুরু করলাম। এক অভ্রান্ত কায়দায় নিজের উপস্থিতি জানান দিতে কিছু করতে চাইলাম, একটি কিছু যা আমার ব্যক্তিগত উপস্থিতিকে সুরক্ষিত করে, বাকিদের নির্বিচার নড়বড়ে অবস্থা থেকে। এখন আমার অভিপ্রায়ের নতুনত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কথার পর কথার পাহাড় গড়ে লাভ নেই ; প্রথম শব্দ যা উচ্চারণ করেছিলাম তা যথেষ্টরও অধিক : তৈরি করো। আমি তৈরি করতে চেয়েছিলাম, আর কখনও কিছু তৈরি করিনি বা তুমি কিছু বানাতে পারো তা ভাবিনি এই ঘটনা বিবেচনা করে যে এটাই এক বিশাল ঘটনা। তাই প্রথমে যা আমার সামনে ঘটল তা থেকে প্রথম বস্তুটি গড়তে লাগলাম, তা হল একটি খোলক তৈরি করা। আমার দেহের মাংসল আবরণের প্রান্ত থেকে কিছু ক্ষরণগ্রন্থি ব্যবহার করে আমি গ্রন্থিরস নিঃসরণ করতে শুরু করলাম যা চারদিকে এক বাঁকা আকৃতি নিল যতক্ষণ না তা একটি কঠিন ও বিচিত্র বর্মরূপে আমাকে ঢেকে দেয় - যার বাইরের দিকটা খসখসে আর ভিতরের দিকটি মসৃণ তথা উজ্জ্বল। স্বাভাবিকভাবেই, আমি যা তৈরি করছিলাম তার ওপর আমার কোনও নিয়ন্ত্রণের উপায় ছিল না : আমি জড়াপটকি করে সেখানে রয়ে গেলাম, নিশ্চুপ ও অলস আর ক্ষরণ করতেই থাকলাম। এমনকি আমার পুরো দেহটা খোলকের ভিতর ঢাকা পড়ে যাওয়ার পরেও। আমি আর এক পাক শুরু করলাম। সংক্ষেপে, আমি সেই খোলকগুলির একটি পেঁচিয়ে বসালাম যা তুমি যখন তাদের দেখো, ভাবো তা বানানো কতই না কঠিন ; কিন্তু যা তোমাকে করে যেতে হবে তা হল না থেমে অবিরল বানিয়ে যাওয়া, একই পদার্থ ত্যাগ করে যাওয়া আর তাতেই সেগুলো ওইরকম আকার নেবে, এক পাকের পর আর এক পাক।

একবার টিকে গেলে, ভিতরে বসবাসের জন্য এই খোলক ছিল দরকারি তথা অপরিহার্য, আমার বেঁচে থাকার জন্য সুরক্ষার ঢাল। সৌভাগ্যের বিষয় যে এটি আমি বানিয়েছিলাম কিন্তু তা বানানোর সময় কীভাবে বানাতে হবে, সে ব্যাপারে আমার কোনও ধারণা ছিল না ; আমার প্রয়োজন আমাকে তাগাদা দিয়েছিল। অপরপক্ষে, এটা অনেকটা সেইরকম যখন কেউ ' হা ' বা ' হাম্ফ' জাতীয় বিস্ময়প্রকাশক শব্দ উচ্চারণ করে ভাবে, সে ঠিকঠাক হয়তো তা বানাতে পারবে না, কিন্তু তবুও সে তা বানিয়ে ফেলে আর সেভাবেই আমিও এই খোলকটি বানিয়ে ফেলেছিলাম : পুরোপুরি নিজেকে প্রকাশ করার তাগিদে। আর এই আত্মপ্রকাশের মাঝেই তার সম্পর্কে আমি আমার সকল ভাবনা নিয়োগ করেছিলাম, আমার ভিতর যে ক্রোধের জন্ম সে দিয়েছিল তাকে বের করার জন্য,তার বিষয়ে ভাবার আমার প্রেমার্ত পথের জন্য, তার জন্য বেঁচে থাকার দৃঢ়তার জন্য, নিজের সত্তার জন্য আকাঙ্ক্ষাহেতু, তার নিজস্ব সত্তার জন্যও এবং তাকে যে ভালোবাসা দিয়েছিলাম যা নিজের জন্যও বটে - এই সমস্ত কিছু যা একমাত্র বলা যায় সেই শঙ্খ - খোলকের অন্দরে যা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বানানো হয়েছিল।

নিয়মিত বিরামের মাঝ দিয়ে যে চুনাজাতীয় পদার্থ আমি নিঃসরণ করছিলাম তা নানাবর্ণিল হয়ে নির্গত হচ্ছিল যার ফলে খোলকের প্যাঁচের মাঝ দিয়ে বেশ কিছু সুন্দর সুন্দর ডোরা দাগ গড়ে উঠেছিল আর এই খোলককে আমার থেকে ভিন্ন বস্তু মনে হচ্ছিল কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা ছিল আমারই অংশ, আমি কে, তার ব্যাখ্যা, আমার সেই চিত্রল নির্মাণ যা আয়তন, ডোরাকাটা দাগ, বর্ণ ও কঠিন পদার্থের ছান্দিক প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়েছিল। আবার এটি ছিল তারও অনুরূপ প্রতিকৃতি কেননা ওই একই সময়ে সেও আমার মতোই সাদৃশ্যযুক্ত একটি খোলক বানাচ্ছিল এটা না জেনেই যে আমরা এই খোলক বানানোর সময় একে অপরেরটি নকল করছিলাম, এমনকি অন্যরাও অন্যদের নকল করে সে সব বানাচ্ছিল ; সুতরাং আমরা আগে যেখানে ছিলাম সেখানেই ফিরে যাব শুধু সেই ঘটনা ছাড়া যে এই সমস্ত খোলক একইরকম তা বলার ক্ষেত্রে আমি খানিক তাড়াহুড়ো করে ফেলেছিলাম কারণ তুমি খুব খুঁটিয়ে দেখলে সমস্ত রকমের ছোটো ছোটো পার্থক্য আবিষ্কার করতে পারতে যা পরবর্তীকালে বিশাল আকার নিতে পারত।

তাই আমি বলতে পারি যে আমার খোলক নিজেকেই গড়ে তুলেছিল, আমাকে বিশেষ কোনও কষ্ট না দিয়ে তা অন্যভাবে না হয়ে একভাবে প্রকাশ পেয়েছিল ; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সেই গড়ে ওঠার কালে আমি অমনোযোগী ছিলাম ; পরিবর্তে আমি ক্ষরণের কাজে নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলাম, এক মুহূর্তের জন্যও চিত্তবিক্ষেপ না ঘটিয়ে, অন্য কিছু সম্পর্কে চিন্তা না করে কিংবা বরং : সব সময় বিশেষ কিছু নিয়ে ভেবে যেহেতু কীভাবে এই খোলকের বিষয়ে ভাবতে হয় তা জানতাম না, এবং ঠিক এই জন্যই, অন্য কিছু সম্পর্কে কীভাবে ভাবতে হয় তাও জানতাম না, কিন্তু এই খোলক বানানোর প্রচেষ্টার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলাম সেই প্রচেষ্টা - ভাবনা যে আমি একটি কিছু বানাচ্ছি, একটি কিছু : অর্থাৎ আমি ভেবেছিলাম সকল বস্তুই বানানো সম্ভব। তাই এটা কোনও একঘেয়ে কাজ ছিল না কেননা ভাবনার চেষ্টাসব যা এর সঙ্গে জড়িত ছিল তা অসংখ্য ধরনের ভাবনায় ছড়িয়ে গিয়েছিল, প্রতিটি চেষ্টা ছড়িয়ে গিয়েছিল নানাবিধ অজস্র কাজের মাঝে যার প্রতিটির দ্বারা বহু জিনিস বানানো যায় আর এই প্রতিটি বস্ত গড়ে তোলায় এই চেষ্টার আভাস থাকে, পাকে পাকে এই খোলক বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রেও…

(২)

( আর এখন পাঁচশো মিলিয়ন বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর আমি চারদিকে তাকিয়ে দেখছি আর ওই শিলাখণ্ডের উপর দিয়ে রেলওয়ে বাঁধ চলে গেছে আর সেখানে একটা ট্রেন অতিক্রম করছে ওলন্দাজ মহিলাদের একটা দঙ্গল নিয়ে যারা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আর ট্রেনটার শেষ কামরায় এক একক যাত্রী দ্বিভাষী সংস্করণের ' হেরোডোটাস ' পড়ছে ; এরপর ট্রেনটি হাইওয়ের নিচের সুড়ঙ্গের ভিতর হারিয়ে গেল যে বড়ো রাস্তায় একটা সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে যাতে লেখা ' মিশর পরিদর্শন করুন ' আর তখনই একটা ছোট্ট আইসক্রিম ভর্তি ওয়াগন এক বিশাল ট্রাককে পেরিয়ে যেতে চেষ্টা করছিল যে ট্রাকে ছিল পেপারব্যাকে প্রকাশিত ' আর এইচ - স্টাইল ' নামের একটি কোশগ্রন্থ সাময়িকীর কিছু কিস্তি, কিন্তু ট্রাকটি তখন ব্রেক কষল যেহেতু একঝাঁক মৌমাছির মেঘ ড্রাইভারের দৃষ্টিকে আড়াল করেছিল ; সেই মৌমাছির দল কয়েক সারি মৌচাক থেকে উড়ে এসে রাস্তা পার হচ্ছিল ; মৌচাকগুলো ছিল মাঠের মধ্যে যেখান থেকে নিশ্চিতভাবে এক রানি মৌমাছি উড়ে এসেছিল আর তার পিছপিছ টেনে এনেছিল এক ঝাঁক পুরুষ মৌমাছি, ঠিক ট্রেনের ধোঁয়ার উলটো দিকে যে ট্রেনটাকে আবার দেখা গেল সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে, সুতরাং ক্বচিৎ কিছু তোমার দৃষ্টিগোচর হবে, এতে মৌমাছির মেঘলা ঝাঁক আর কয়লার ধোঁয়াকে ধন্যবাদ দিতেই হয়, ব্যতিক্রম ছিল ওপরদিকে কয়েক গজ দূরের এক কৃষক যে কিনা কোদাল দিয়ে মাটির ঢেলা ভাঙছিল আর তার অজান্তেই সে তার কোদালেরই মতো নব্যপ্রস্তরযুগীয় আর একটি কোদাল মাটির সঙ্গে তুলে এনে আবার পুঁতে দিল এমন একটা বাগানে যা ঘিরে আছে একটি জ্যোতির্বিজ্ঞানগত মানমন্দির যেখানে টেলিস্কোপগুলি আকাশের দিকে তাক করা এবং যার চৌকাঠে বসে মানমন্দিরের তত্ত্বাবধায়কের মেয়ে এক সাপ্তাহিক কাগজের পাতায় কোষ্ঠীছক পড়ছে আর সেই পত্রিকার প্রচ্ছদে তারকা ক্লিয়োপেট্রার মুখমণ্ডল দেখা যাচ্ছে :

এ সবই আমি দেখছি কিন্তু কোনওভাবেই বিস্মিত হচ্ছি না কেননা খোলক তৈরি করা মোমের খোপে মধু তৈরির কাজকেও সূচিত করে, তার সঙ্গে কয়লা, টেলিস্কোপ, ক্লিয়োপেট্রার রাজত্বকাল, তার সম্পর্কে ফিল্ম, পিরামিড, ক্যালডিয়ার { এখনকার দক্ষিণ ইরাক} জ্যোতিষীদের রাশিছক, হেরোডোটাস কথিত যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যের কথা, তাঁর লিখিত কথাসব, সমস্ত ভাষায় লিখিত রচনাবলি এমনকি ওলন্দাজ ভাষায় লেখা স্পিনোজার লেখাপত্র,চোদ্দ ছত্রে লিখিত তাঁর জীবন ও রচনার সারমর্ম যা আছে ওই ট্রাকভর্তি বিশ্বকোষীয় কিস্তির মাঝে যে ট্রাক আইসক্রিম ওয়াগনকে উপেক্ষা করে চলে গেল - এই সবকিছুকেই তা সূচিত করে আর তাই আমি বোধ করি যেন খোলক বানানোর সময় বাকি সবই আমি বানিয়েছিলাম।

আমি চারদিকে তাকাই, কাকে খুঁজছি? এখনও সেই নারীকে আমি খুঁজছি ; পাঁচশত মিলিয়ন বছর ধরে আমি তার প্রেমে মজে আছি, আর যদি দেখি বালির ওপর কোনও ওলন্দাজ মেয়ে গলায় সোনার মালা পরা এক সৈকত নজরদার ছেলের সঙ্গে বসে আছে আর ছেলেটি তাকে ভয় দেখানোর জন্য মৌমাছির ঝাঁকটা দেখাচ্ছে, তাহলে সেখানেই আমার ' সে ' আছে : একটি কাঁধ তুলে গণ্ডদেশ না ছোঁয়া পর্যন্ত তার অননুকরণীয় ভঙ্গি দেখে তাকে চিনতে পারি এবং তখন প্রায় নিশ্চিত হই, বা বরং বলা যায় পূর্ণ নিশ্চিত হই তার সঙ্গে সেই মানমন্দির দেখভালের লোকটির মেয়ের কিছু মিল অবশ্যই আছে বা ক্লিয়োপেট্রার চরিত্রে অভিনয় করা সেই তারকার কিংবা বাস্তবের ক্লিয়োপেট্রার সঙ্গে, কিংবা হয়তো আসল ক্লিয়োপেট্রার চেহারার কোন অংশ প্রতিনিধিত্বকারী বলে সবাই বলে বা সেই মৌমাছির ঝাঁকের আগে আগে প্রবল ধাবমানতার সঙ্গে উড়ে চলা রানি মৌমাছি,বা কাগজের সেই মহিলার ছবি কেটে ছোটো আইসক্রিম ওয়াগনের প্লাস্টিকের উইন্ডস্ক্রিনে সেঁটে দেওয়া ছবিটি যার পরনে সমুদ্রতটের ওলন্দাজ মেয়েটার মতো স্নানের পোশাক আর যে কিনা এখন তার ছোট্ট ট্রানজিস্টর রেডিয়োতে এক মহিলার গান শুনছে সেই একই গলা যা এনসাক্লোপিডিয়া বয়ে নিয়ে যাওয়া ট্রাক ড্রাইভার তার রেডিয়োতে শুনছিল আর সেই একই গলা, আমি নিশ্চিত, পাঁচশো মিলিয়ন বছর ধরে শুনে আসছি, এ নিশ্চিতভাবেই আমার সেই নারী যার গান শুনছি আর যার প্রতিকৃতি চারদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি যেখানে শুধু দেখছি শ্বেত পালকের গাংচিল সাঁ করে সমুদ্রের উপরিতলে নেমে আসছে যেখানে এক ঝাঁক হেরিংজাতীয় ছোট্ট অ্যানচভি মাছ মুহূর্তের জন্য চিকচিক করে উঠছে তখন আমি নিশ্চিত এক মেয়ে গাংচিলের মাঝে তাকে চিনতে পারি আর এক মুহূর্ত পরেই আমার সন্দেহ হয় সে হয়তো একটি অ্যানচভি মাছ যদিও সে হতেই পারে হেরোডোটাস নামাঙ্কিত কোনও রানি বা দাসী বা শুধু সেই বইয়ের পৃষ্ঠায় উল্লিখিত যে বইটি সেই পাঠকের বসার জায়গা চিহ্নিত করে রাখা আছে যে পায়ে পায়ে ট্রেনের করিডরে গিয়েছে সেই ওলন্দাজ ভ্রমণার্থীদের সঙ্গে আলাপ জমাবে বলে ; আমি বলতে পারি, আমি এই মহিলাদের প্রত্যেকের প্রেমে মজে আছি এবং একই সময়ে নিশ্চিতভাবেই একান্তে সেই তারই সঙ্গে সর্বদা প্রেমে নিমজ্জিত আছি।

এবং যত বেশি আমি এদের প্রত্যেকের সঙ্গে প্রেমে পড়ে নিজেকে পীড়িত করি, তত কম তাদের সামনে নিজেকে এনে বলি : এইতো আমি!, নিজেকে ভুল বোঝানোর ভয় থেকে এমনকি আমাকে অন্য কেউ ভেবে সে ভুল বোঝে অনেক বেশি সেই ভয় থেকে, কেননা সেই অন্যজন, আমার প্রেমিকা আমার সম্পর্কে যত কিছুই জানুক, সহজেই আমার জায়গা নিতে পারে,ঠিক যেমন সেই সোনার মালা পরা সৈকত নজরদার ছেলেটা বা মানমন্দিরের পরিচালক, বা একটা গাংচিল, একটা পুরুষ অ্যানচভি মাছ, বা হেরোডোটাসের পাঠক কিংবা হেরোডোটাস স্বয়ং, বা ওই আইসক্রিম বিক্রেতা, যে ধুলোময় পথ ধরে তটে নেমে এসেছে কাঁটাওয়ালা নাশপতি ঝাড়ের মধ্যে আর এখন স্নানের পোশাক পরা ওলন্দাজ মেয়েরা বা স্পিনোজা বা ট্রাক ড্রাইভার তাকে ঘিরে ধরেছে যে ট্রাক ড্রাইভার সংক্ষিপ্ত আকারে লেখা ও হাজার বার পুনঃকথিত স্পিনোজার জীবন ও রচনা বহন করে নিয়ে চলেছে কিংবা সেই একাকী পুরুষ মৌমাছি যে তার প্রজাতির অনুবৃত্তি রক্ষা করার ভূমিকা পালনের পর মৌচাকের তলায় মৃত পড়ে আছে - তারা যে কেউ সেই জায়গা দখল করতে পারে।)

(৩)

…যার অর্থ এই নয় যে খোলকটি সর্বপ্রথম তার বিশেষ আকার নিয়ে একটি খোলক হিসেবে ছিল না যা আলাদা কিছু হতে পারত না কারণ সেই নির্দিষ্ট আকৃতিই আমি তাকে দিয়েছিলাম, সেই একমাত্র আকৃতি যা আমি দিতে পারতাম বা দিতাম। যেহেতু খোলকটির একটি আকার বা গড়ন ছিল, তাই বিশ্বের আকারও পালটে গিয়েছিল এই অর্থে যে এখন এর মধ্যে খোলক ছাড়া এ বিশ্বের আকৃতি যা হতে পারত তার অন্তর্ভুক্ত ছিল খোলকের আকৃতিও।

এবং তার পরিণাম ছিল বিশাল : কারণ ঢেউজনিত আলোর আন্দোলন, আঘাতকারী পদার্থ তাদের মাঝ থেকে বিশেষ প্রভাব সৃষ্টি করে, প্রথমেই রং যেমন যে পদার্থ দিয়ে আমি ডোরা দাগ বানিয়েছি যার দ্বারা বাকিদের থেকে আলাদাভাবে আলোড়ন তোলা গেছে ; কিন্তু সেখানে তেমন ঘটনাও ছিল যে একটি গোলাকার পিণ্ড বা তার আয়তন অন্যান্য পিণ্ডের আয়তনের বিশেষ সম্পর্কে প্রবেশ করে, আমার অজ্ঞাতসারেই সকল ঘটনাক্রম ঘটে যায় যদিও তারা বর্তমান ছিল।

এই প্রক্রিয়ায় ওই খোলক, খোলকদের দৃশ্যমান প্রতিকৃতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় যার - আমি যতদূর জানি - এই খোলকের সঙ্গে ভীষণ মিল, একমাত্র ব্যতিক্রম, খোলকটি এখানে আর তার প্রতিকৃতিসকল অন্যত্র গড়ে উঠেছে, সম্ভবত অক্ষিপটের ওপর। তাই একটি প্রতিকৃতি অক্ষিপটকে পূর্বানুমান করে যা আবার পালা করে এক জটিল প্রক্রিয়াকে পূর্বানুমান করে যা মস্তিষ্ক থেকে উদ্ভূত। তাই ওই খোলক তৈরি করতে, আমি তার প্রতিকৃতিও বানিয়েছিলাম - একটা নয়, অবশ্যই, অনেক কেননা একটি খোলক দিয়ে ইচ্ছেমতো অনেক খোলক- প্রতিকৃতি বানানো যায় - কিন্তু শুধু সম্ভাবনাযুক্ত প্রতিকৃতি কারণ একটি প্রতিকৃতি গড়তে আমার পূর্বে উল্লিখিত সমস্ত আবশ্যিক বস্তুর প্রয়োজন : মস্তিষ্ক থেকে নির্গত অপটিক কোষপিণ্ড, বাইরে থেকে ভিতরে তরঙ্গ বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অপটিক তন্তু যা অন্য প্রান্তে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নির্মিত কোনও বস্তুতে শেষ হয় বাইরের বস্তু দেখার জন্য, যার নাম চোখ। এখন এটা ভাবা হাস্যকর যে একটি মস্তিষ্ক থাকা সত্ত্বেও কেউ সাধারণভাবে অন্ধকারে ছিপের মতো একটি তন্তুকে ফেলে রাখে ; যতক্ষণ না চোখ হাজির হচ্ছে, কেউ জানতে পারে না বাইরে কোনও দেখার বস্তু আছে কি নেই। আমার ক্ষেত্রে এই দরকারি সরঞ্জামের কোনওটাই নেই, সুতরাং এ ব্যাপারে কিছু বলার অধিকারী আমি নই ; যাই হোক, আমার নিজস্ব একটি ভাবনা আমি লালন করেছিলাম,যেমন কিছু দৃশ্যমান প্রতিকৃতি গড়ে তোলা গুরুত্ববহ ছিল আর চোখেরা ফলত পরে আসবে। আমি তাই আমার বহিরঙ্গের অংশ গড়ায় মন দিয়েছিলাম ( আর এমনকি আমার বাইরের অংশ ভিতরের অংশকে শর্তাবদ্ধ করেছিল) যা একটা প্রতিকৃতিকে সৃষ্টি করেছিল বা বরং বলা যায় একটি সুন্দর প্রতিকৃতি ( যখন তা ছিল অন্যান্য প্রতিকৃতির সঙ্গে তুলনায় কম সুন্দর বা কুৎসিত বা সহজভাবে বিদ্রোহাত্মক ঢঙে বিতৃষ্ণাজনক)।

যখন কোনও শরীর স্পষ্ট ও চেনার যোগ্য ক্রমানুসারে উজ্জ্বল তরঙ্গ নির্গত বা প্রতিফলিত করতে সফল হয় - আমি মনে করতাম - এই তরঙ্গমালা নিয়ে সে কী করে? না, এ প্রথম যে পাশ দিয়ে চলে যায় তার ওপর তা ছেড়ে দেয়। এবং কীভাবে সেই পথিক এই তরঙ্গের সামনে পড়ে আচরণ করবে আর সে তা ব্যবহার করতে পারে না আর যা এইভাবে হঠাৎ গ্রহণ করতে হলে তা এমনকি বিরক্তিকরও হতে পারে? সে কি তার মাথা কোনও গর্তে লুকিয়ে ফেলে? না, সে একে সেই দিকে বের করে দিতে ঠেলতে থাকে যতক্ষণ না চোখের তরঙ্গের কাছে যে বিন্দুটি বেশি প্রকাশিত তা আলোক সংবেদী হয়ে প্রতিকৃতি রূপে তার যান্ত্রিকতাকে উন্নত করে ব্যবহার করতে পারছে। সংক্ষেপে, আমি চোখ - মস্তিষ্কের সংযোগ সুড়ঙ্গরূপে অনুভব করতে পারছিলাম যে সুড়ঙ্গ বাইরে থেকে খোঁড়া সেই শক্তির দ্বারা যা প্রতিকৃতি হয়ে উঠতে প্রস্তুত, পুরনো কোনও প্রতিকৃতি ভিতর থেকে তুলে নেবার ইচ্ছার চাইতে।

আর এ ক্ষেত্রে আমার কোনও ভুল হয়নি : এমনকি আজও আমি নিশ্চিত যে সেই প্রকল্প - সমস্ত দিক থেকে সঠিক ছিল। কিন্তু আমার সেই ভাবনায় ভুল ছিল যে আমাদের কাছে দৃষ্টিও আসবে, অর্থাৎ আমার কাছে বা তার কাছে। আমি আমার নিজের প্রতিকৃতিকে সুসংহত ও রঙিন করে প্রসারিত করেছিলাম তার দৃষ্টিগত গ্রহণ ক্ষমতায় প্রবেশ করার জন্য, তার কেন্দ্র দখল করার জন্য, সেখানে জাঁকিয়ে বসার জন্য যাতে করে অবিরল সে আমাকে ব্যবহার করতে পারে, স্বপ্নে এবং স্মৃতিতে, ভাবনাচিন্তা তথা দৃষ্টি সহকারে। এবং ওই একই সময়ে আমি অনুভব করেছিলাম সে তার একটি প্রতিকৃতি বিকিরণ করছিল এমন নিখুঁতভাবে যে তা আমার কুয়াশাচ্ছন্ন, পিছিয়ে পড়া অনুভূতিগুলোর ওপর নিজেকে চাপিয়ে দেবে, আমার মধ্যে এক অন্তর্গত দৃশ্য-ক্ষেত্র গড়ে তুলে যেখানে তা নিশ্চিতভাবে তীব্র আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাবে।

তাই আমাদের প্রচেষ্টাসকল এক অনুভূতির সঠিক বস্তু হয়ে উঠতে আমাদের পরিচালিত করে যে অনুভূতির প্রকৃতি কেউই পুরোপুরি জানত না, আর পরে যা তার বস্তুর নিখুঁত রূপের মাঝ দিয়ে ঠিকঠাক গড়ে উঠেছিল যা, কার্যত, আমরাই। আমি দৃষ্টি, চোখ বিষয়ে বলছিলাম; একমাত্র একটা বিষয় আমি আগাম দেখতে ব্যর্থ হয়েছি : শেষ পর্যন্ত যে চোখগুলি কিছু দেখার জন্য খুলে গিয়েছিল তা আমাদের ছিল না, ছিল অন্যদের।

অবয়বহীন, বর্ণহীন, অযত্নে এক সঙ্গে গাঁথা বস্তা বস্তা নাড়িভুড়ি, আমাদের চারদিকের জগতে গাদাগাদি করে বাস করছিল, নিজেদের নিয়ে কী করবে, কীভাবে নিজেদের প্রকাশ করবে এবং কীভাবে নিজেদের পোক্ত, পূর্ণ রূপে পরিচিত করাবে যেমন যারা তাদের দেখবে তাদের দৃষ্টিগত সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধ করতে - সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র ভাবনাচিন্তা না করে। তারা এল, চলে গেল, কিছুক্ষণ ডুবে থাকল, তারপর বায়ু, জল আর শিলাখণ্ডের মাঝের ফাঁকে নির্গত হল, চুপিসারে ঘোরাঘুরি করে। আর ইতোমধ্যে আমরা, আমি, সে ও অন্যান্য যারা নিজেদের অবয়ব গঠনের জন্য সংকুচিত হয়ে বের হবার ইচ্ছায় ছিল , আমরা সব সেখানে ক্রীতদাসের মতো অন্ধকারময় কাজগুলো করার জন্য ছিলাম। নিজেদের ধন্যবাদ দিই, সেই খারাপভাবে নিরূপিত জায়গাটা এক দৃশ্যমান ক্ষেত্রে পরিণত হল ; আর এর ফল ভোগ করল কারা? এই অনুপ্রবেশকারীরা যারা আগে কখনোই দৃষ্টির সম্ভাবনার প্রতি তাদের চিন্তাভাবনা প্রসারিত করেনি ( যেহেতু তারা ছিল কুৎসিত, তারা একে অপরকে দেখে কিছু লাভ করতে পারেনি), এইসব প্রাণীগুলো যারা সব সময় অবয়ব গঠনের বৃত্তির প্রতি কান দিত না। যখন এই কাজের কঠিন অংশটি করতে গিয়ে আমাদের পিঠ কুঁকড়ে গিয়েছিল অর্থাৎ কিছু দেখার মতো সৃষ্টি করতে গিয়ে, তারা তখন শান্তভাবে সহজতম কাজটার দিকে ঝুঁকেছিল : তাদের অলস, ভ্রুণ সম্বন্ধীয় সুগ্রাহী অঙ্গসমূহকে যা গ্রহণ করতে হবে তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে ; অর্থাৎ আমাদের প্রতিকৃতি। আর এখন আমাকে তারা বলার প্রয়োজন বোধ করেনি যে তাদের কাজও পরিশ্রমসাধ্য ছিল : তাদের মাথায় যে আঠালো বস্তুপিণ্ড ভরা ছিল সেখান থেকে যে কোনও জিনিস বেরোতে পারত, আর একটা আলোকসংবেদী যান্ত্রিকতা এই সবগুলোকে একত্রিত করতে খুব বেশি কষ্ট স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু এটা যখন নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে এগিয়ে আসে তা হল অন্য গল্প। তোমার সামনে যদি কোনও দৃশ্যমান বস্তু দেখার না থাকে, এমনকি জমকালো কিছুও, তাহলে দৃষ্টির সামনে তুমি কী রাখবে যা নিজেদের চাপিয়ে দেবে? কয়েকটি শব্দে এর সারাংশ হল : আমাদের অপদস্থ করে,আমাদের ক্ষতি করেও তারা তাদের দৃষ্টির উন্নতি ঘটিয়েছিল।

সুতরাং দৃষ্টি, আমাদের দৃষ্টি যার জন্য আমরা অস্পষ্টভাবে অপেক্ষা করছিলাম তা সেই দৃষ্টি যা অন্যান্যরা আমাদের কাছ থেকে নিয়েছিল। যে কোনও একভাবে, বিশাল বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল : হঠাৎই, আমাদের চারদিকে, চোখ সব খুলে যেতে লাগল, তার সঙ্গে অক্ষিপট, মণি বা চোখের তারা : জেলিফিশ বা অক্টোপাস জাতীয় প্রাণীর ফোলা ফোলা, বর্ণহীন চোখ, মোটা দেহ, ভোঁতা নাকের ভোজ্য মাছ ও সামুদ্রিক মিষ্টি ব্রিম মাছের হতচকিত, থকথকে চোখ, গলদা চিংড়ি জাতীয় মাছের ফুলের ডাঁটির মতো বহির্গামী চোখ, মাছি ও পিঁপড়ের মতো স্ফীত ও পলকাটা চোখ। এখন একটা কালো, উজ্জ্বল সিল মাছ বোকার মতো চোখ পিটপিট করতে করতে এগিয়ে আসছে। একটা শামুক তার মাথার লম্বা শুঁড়ের ওপর থাকা গোলাকার চোখদুটি প্রসারিত করছে। গাংচিলের প্রকাশহীন চাপা চোখ জলের উপরিতল পরীক্ষা করে দেখছে। কাচের মুখোশের ওপার থেকে জলের নিচের এক জেলের ভ্রূকুটিপূর্ণ চোখ জলের গভীরতা মেপে দেখছে। ছোটো দূরবীনের লেন্স ফুঁড়ে সামুদ্রিক জাহাজের ক্যাপটেনের চোখ ও আমার খোলকের সমবিন্দুগামী হয়ে এক স্নানরতার চোখ, আমার উপস্থিতি ভুলে গিয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। দূরদৃষ্টিযুক্ত লেন্সের দ্বারা গঠিত হয়ে আমি কোনও প্রাণীবিদের দূরদৃষ্টির অনুভূতি লাভ করছিলাম, নিজেকে রোলিফ্লেক্স ক্যামেরার লেন্সে বাঁধতে চেষ্টা করছিলাম। সেই মুহূর্তে এক ঝাঁক ছোট্ট অ্যানচভি, সবেমাত্র যাদের জন্ম হয়েছে, আমার সামনে দিয়ে চলে গেল, তাদের দেখতে এতই ছোটো যে প্রতিটি শাদা মাছের মধ্যে মনে হচ্ছিল শুধু চোখের কালো মণিরই জায়গা হবে, এবং তা এক ধরনের পিচুটি যা সমুদ্র অতিক্রম করছিল।

এই সব চোখই আমার। আমি তাদের সম্ভব করে তুলেছিলাম ; আমারই ছিল সক্রিয় ভূমিকা ; কাচামাল দিয়ে তাদের সাজিয়ে দিয়েছিলাম যা কিনা প্রতিকৃতি। চোখের সঙ্গেই বাকিসব গড়ে উঠেছিল, তাই চোখ যাদের আছে তাদের প্রতিটি বস্তুই গড়ে উঠেছিল, তাদের প্রতিটি গড়ন এবং কার্যকলাপ, আর বস্তুর পরিমাণ যা, চোখকে ধন্যবাদ,তারা করতে পেরেছিল, তাদের প্রতিটি গড়ন ও কাজে, সে সব এসেছিল আমি যা করেছিলাম তা থেকে। অবশ্য, তারা শুধু আমার অস্তিত্বে সাময়িকভাবে আভাসিত ছিল তা নয়, অন্যদের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ক্ষেত্রে, নারী - পুরুষ নির্বিশেষে, ইত্যাদি ইত্যাদি, আমি যখন আমার খোলক গড়তে শুরু করি ইত্যাদি ইত্যাদি। অন্য কথায় বললে, আমি প্রতিটি বস্তুই নিশ্চিতভাবে আগে থেকে দেখতে পেয়েছিলাম।

আর সেইসব চোখের প্রতিটির তলেই আমি বাস করতাম বা বরং অন্য আমি বাস করত, আমারই কোনও প্রতিকৃতি, এবং তা সেই নারীর প্রতিকৃতির সম্মুখীন হয়েছিল যা ছিল তার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিকৃতি, দূরে যা মেলে দেয়, চোখের তারার অর্ধতরল ক্ষেত্র পেরিয়ে, চোখের তারার অন্ধকার অংশে, অক্ষিপটের আয়নাঘরের মতো, আমাদের প্রকৃত উপাদানের মাঝে যা তট, সীমারেখা ছাড়াই প্রসারিত হয়।
----------------
মূল গল্প: দ্য স্পাইরাল

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ