শ্রেণি নির্বিশেষে সব ভারতবাসীই জানে যে থানা কোনো শপিংমল কিংবা সিনেমা হল কিংবা পার্ক নয়। ইচ্ছে হলেই সেখান থেকে ঘুরে-বেরিয়ে আসা যায় না। নেহাত যেতে বাধ্য হলে বেরিয়ে আসার পথটা সহজ করে রাখতে মুরুব্বি গোছের মানুষকে সঙ্গে রাখতে হয়। তেমন মুরুব্বি না পাওয়া গেলে অন্ততঃ সঙ্গী জোগাড় করার চেষ্টা করতে হয় যাতে বিপদের খবরটা পাঁচকান হয়। চেষ্টা, কারণ সঙ্গী পাওয়াটা অত সহজ হয় না। বিনা কারণে তো আর বন্ধুর সংজ্ঞা বিষয়ক শ্লোকটা তৈরি হয়নি। সুতরাং হাতে-পায়ে ধরেও দু-একজনকে সঙ্গী হোতে রাজী করাতেই হয়।
বিষয়টা যখন সাধারণ জ্ঞানের পর্যায়ে পড়ে তখন বলা যেতেই পারে বাঙালপাড়ার বাসিন্দা শ্রীমতি হেলেন বারুইয়ের কোনো মুরুব্বি কিংবা সঙ্গী বিনা, এমন কী লাগোয়া ঘরের প্রতিবেশিদেরও কাউকে কিছু না জানিয়ে সাত সকালে ছোট ছেলেকে কোলে চাপিয়ে একা একা থানায় চলে যাওয়াটা আদৌ উচিত হয়নি। শুধু উচিত-অনুচিতের প্রশ্ন নয়, হেলেনের এই হঠকারিতাকে সন্দেহের ঊর্ধেও রাখা যায় না কারণ এক্ষেত্রে বিপদকালে বুদ্ধিনাশ গোছের কোনো তত্ত্বও খাড়া করা যাচ্ছে না। কোন বিপদের আশঙ্কায় থানায় ছুটল হেলেন? একজন পুরুষ মানুষের আগের দিন সকালে একটু হাওয়া খেয়ে আসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে সারারাত না ফিরলে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। কিংবা তার পরের দিনও ব্রাহ্ম মূহুর্তে যদি দরোজার কড়া না নাড়ে তাতেই বা বিপদ সঙ্কেত কোথায়? এটুকু ছাড় পুরুষ মানুষের না থাকলে তো মানুষজন্মই বৃথা! হোতে পারে বাঙালপাড়ার অন্যান্য পুরুষদের মতো পল্টন বারুইয়ের ততটা পুরুষাকার তো ছিলই না বরং বউ ঘেঁষা টাইপের ছিল, তবু দমবন্ধ পরিস্থিতিতে বেড়ালও যে বাঘ হয়ে ওঠে সে কথাটাও তো হেলেনের মাথায় রাখা উচিত ছিল!
মোদ্দা কথাটা এখানেই। গত একবছর ধরে যা চলছে তাতে পল্টনের এই আচরণ অত্যন্ত স্বাভাবিক । চিন না জাপান নাকি রাশিয়া, কোন একটা দেশ ষড়যন্ত্র করে একটা বিশ্রি রোগ ছড়িয়ে দুনিয়ার মানুষকে একেবারে নাকাল করে ছেড়েছে। শুধু খাবার জোগাড়ের জন্য বাইরে বের হও, কাজ হয়ে গেলেই সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ো গর্তে। একী মানুষের জীবন নাকি ইঁদুরের? শুধু খাদ্য সংগ্রহই তো মানুষের একমাত্র কাজ হোতে পারে না! তাছাড়া গুষ্টিশুদ্ধ থাকার মতো ঘর গোটা বাঙালপাড়ায় ক’জনের আছে? রাতেই যেখানে পুরুষদের ফুটপাতে গিয়ে শুতে হয় সেখানে দিনভর সবাই মিলে একটা ঘরে থাকাটা সম্ভব? তাছাড়া রোগটা আদৌ সত্যি, নাকি পুরোটাই বিশেষ উদ্দেশ্যে ছড়ানো গুজব, সে ব্যাপারেই যখন মানুষ নিঃসন্দেহ নয় তখন বাঙালপাড়ার মানুষদের কীসের দায় পড়েছে শুয়োরের মতো গাদাগাদি করে থাকার?
তবু থাকতে হয়েছে। শুধু বাঙালপাড়ার মানুষদের নয়, কবরডাঙা, পোড়াবস্তি, ঝিলপাড়, সর্বত্রই এক চিত্র। পুলিশের লাঠি সব অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। শুধু লাঠি পেটা নয়, প্রকাশ্য রাস্তায় কান ধরে ওঠ-বোসও করতে হয়েছে, বয়স নির্বিশেষে।
তা হোক গে। তবু লুকোচুরি যে একদম ঘটেনি তাতো নয়। ঘটাটাই স্বাভাবিক। বে-আইন না থাকলে আইনের প্রয়োজনটা কোথায়! সুতরাং কে কিভাবে লাঠির আঘাত এড়িয়েছে কিংবা কোন কায়দায় দুটো ওঠ-বোস কম করেছে, এনিয়ে গোপন আসর বসেছে, সেখানে কৃতিত্বের পাশাপাশি পুলিশের মায়ের চরিত্র নিয়ে বিশ্লেষণও চলেছে। কিন্তু মৌজ আসেনি। অতটা আতঙ্ক নিয়ে মস্তি করা যায় না।
স্বস্তির কথা এটুকুই যে লকডাউন পুরোপুরি উঠে না গেলেও বেশ কিছুদিন হলো শাসনের রাশ একটু আলগা হয়েছে। ইদানিং হুটহাট পুলিশ তাড়া করছে না। রাস্তায় জটলা দেখেও উপেক্ষাই করছে চলতি পুলিশ ভ্যান। সুতরাং এরকম একটা সময়ে হাত পায়ের জঙ ছাড়াতে পুরুষ মানুষ যে হাওয়া খেতে বেরুবে তাতে অবাক হওয়ার কী আছে! যদি রাতে না ফেরে তাতেও তো আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু নেই। ব্যক্তিটি পল্টন হলেও নয়।
অথচ সেখানে কিনা পরের পুরো দিনটা অপেক্ষা না করে হেলেন সাতসকালে কাউকে কিচ্ছু না জানিয়ে একা একা ড্যাঙডেঙিয়ে থানায় চলে গেল! এবং শুধু যাওয়া নয় আগবাড়িয়ে এমত সন্দেহও প্রকাশ করে এলো যা কিনা সরাসরি না হলেও পরোক্ষ ভাবে খুনেরই ইঙ্গিতবাহী। নিশ্চিন্ত না হয়ে কোনো স্ত্রীর পক্ষে কি স্বামীর বিষয়ে ওরকম অলক্ষুণে কথা বলাটা সম্ভব? অতএব খুব সঙ্গত কারণেই হেলেনের এই সব আচরণ পরবর্তীতে প্রশাসনের সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এবং সে কারণেই হেলেনের গ্রেপ্তার সংক্রান্ত ব্যাপারে গোটা বাঙালপাড়াও প্রশাসনকে দায়ী করতে পারে না। যদিও এসব প্রসঙ্গ পরে জরুরি হয়ে উঠবে আপাতত সেই সকালের কথা।
থানার অবস্থান পাড়া থেকে খুব বেশি দূরে না হওয়ায় বাঙালপাড়ার মানুষরা কথায় কথায়, “আমাদের থানা” হিসেবে পরিচয় দেয়। সেই ভরসায় একা একা রওনা দিলেও থানার গেটে পৌঁছে হেলেনের বুক ছমছম করে ওঠে। কিন্তু গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ঘেমে-নেয়ে একশা হওয়ার জন্য তো আসা হয়নি! তাছাড়া পল্টন কথায় কথায় বলত দারোগা সাহেব নাকি ওকে খাতির করে সুতরাং ভয় কীসের!
বারান্দার মুখোমুখি ঘরটার দরোজার সামনের টেবিলটাতে যিনি বসে আছেন তিনিই দারোগা সাহেব কিনা প্রথমে বুঝতে পারে না হেলেন। তবে পরক্ষণেই মনে হয়, সম্ভবত নয়। কারণ পল্টনের বৃত্তান্ত অনুসারে দারোগা সাহেবই থানার সবচে বড় অফিসার। বড় অফিসারের চেহারা কি এত রোগাসোগা হবে? বয়সও এমন কিছু বেশি নয়। সর্বোপরি পেল্লায় গোঁফও নেই।
তাহলে উপায়? মানুষটা একবার তাকালে নাহয় জিজ্ঞেস করা যেত দারোগা সাহেব আছেন কিনা? কিন্তু উনি এমন মোবাইল দেখতে ব্যস্ত যে বিরক্ত করতে সাহস পায় না হেলেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উপায় খুঁজতে থাকে।
এমন সময়ই আচমকা হুঙ্কার, কী ব্যাপার, মুখে মাস্ক নেই কেন?
চমকে ওঠে হেলেন। যদিও পুলিশ সাহেবের নিজের মুখেও কোনো মাস্ক নেই তবু বুঝতে পারে ভয়ঙ্কর অন্যায় করে ফেলেছে সে। যা পুলিশের পক্ষে স্বাভাবিক সেটা সাধারণ মানুষের জন্য যে বে-আইনি, এই তথ্য জানা থাকায় মাথা নীচু করে হেলেন। এমন তো নয় যে বাড়িতে মাস্ক নেই! পল্টন জোগাড় করে এনেছিল। একটা নয়, তিনটে। ফ্যাকাশে কাপড়ের সাদামাটা নয়, রীতিমত রঙিন। এক চিলতে নয়, প্রায় চোখ ঢেকে ফেলা। এবং রাজনৈতিক দলের প্রতীক চিহ্ন দেয়া। কোন দল মানুষের কতটা পাশে ছিল, তারই ঠোস সবুদ এইসব মুখোস।
প্রথম প্রথম কয়েকদিন হেলেন পরেছিল কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি। দমবন্ধ হয়ে আসতে চায়। একই অনুভূতি হয়েছিল পল্টনেরও। হায়, তখন কে জানত মাস্কটা এভাবে কাজে লাগবে!
বাড়ি গিয়ে মাস্ক পরে আসা যায় বটে কিন্তু ওই বস্তুগুলো এখন আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে থাকে হেলেন।
ফের হুঙ্কার আসে, মুখে আঁচল জড়াও।
এবার দুটো কারণে খুশি হয় হেলেন। প্রথম কারণ--সমস্যার এত দ্রুত সমাধান সে আশা করেনি। দ্বিতীয় কারণ হলো পুলিশ সাহেবের চেহারা যতই রোগাসোগা হোক, না থাকুক পুরুষ্ট গোঁফ তবু ধমকটা বেশ কড়া। সুতরাং ব্যক্তিটি দারোগা সাহেব হলেও হোতে পারে। দ্রুত আঁচল দিয়ে মুখটা আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে নেয় হেলেন। কোলের সন্তানটি মায়ের আচমকা রূপ পরিবর্তনে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
দেশলাই বাক্স থেকে একটা কাঠি বের করে কান খুঁটতে খুঁটতে পুলিশ সাহেব প্রশ্ন করেন, থাকো কোথায়?
--বাঙালপাড়ায়।
--খবর কি তোমাদের ওখানকার?
এতক্ষণে প্রসঙ্গে ঢোকার সুযোগ পেয়ে খুশি হয় হেলেন। সেই সুযোগে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে তড়বড়িয়ে বলে চলে, আমার স্বামী ছার, পল্টন বাড়ুই ছার, আপনি চিনেন তারে ছার, মানুষটার কোনো খবর নাই ছার। কাল সকাল থিকে ছার। বললো, এখনই আসতেছি, দিন পার রাত পার, কোনও পাত্তা নাই ছার। আমার ভয় করতেছে ছার, কেউ কিছু করলো নাকি! আপনি একটু দ্যাখেন ছার।
এরপর যখন হেলেনের কান্নায় ভেঙে পড়ার কথা ঠিক তখনই এক হুঙ্কার, ভেতরে ঢুকেছ কেন? বাইরে দাঁড়াও। যাও, দূর থেকে কথা বলো।
যথাবিহিত সম্মান জানানো সত্ত্বেও স্যারের এহেন ব্যবহারে হেলেনের সব উৎসাহ ফের নিভে যায়। চোখ মুছতে মুছতে ফিরে যেতে হয় পুরনো অবস্থানে। পুলিশ সাহেবও সন্তুষ্ট হয়ে প্রশ্নটাকে খোলসা করেন।
–করোনায় ক’জন টপকেছে তোমাদের বস্তিতে?
প্রশ্ন শুনে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে হেলেন বারুই। কারণ সংখ্যাটা তো নির্দিষ্ট ভাবে কারোরই জানা নেই। বস্তিতে কয়েকজনের যে করুনা অসুখটা ধরেনি এবং তাদের মধ্যে কয়েকজন যে খসেও পড়েনি তেমন নয় কিন্তু সবটাই কানাঘুষো। প্রমাণ নেই কোনো। খবরটা যাতে জানাজানি না হয় সেই চেষ্টা আপ্রাণ করেছে সেসব পরিবারের মানুষগুলো। কারণ জানাজানি হলে ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। একেই তো চিকিৎসার কোনো বন্দোবস্ত কোথাও নেই উপরন্তু জানাজানি হলে পাড়ার লোকেরা পরিবার সুদ্দু সবাইকে পাড়া ছাড়া করে দেবে। মরো গিয়ে ফুটপাতে। কিন্তু মরেও তো রেহাই নেই, দাহ করার উপায় থাকবে না। সুতরাং পাড়ায় যে ক’জন মারা গিয়েছে সব ক’টাই হার্টফেল কেস। তারা সত্যি সত্যিই করোনা রোগী ছিল কিনা সেটা হলফ করে বলতে পারবে না হেলেন। তাছাড়া করোনায় মৃত্যুর সঙ্গে পল্টনের নিখোঁজ হওয়ার সম্পর্ক কতটুকু! তার তো জ্বর, কাশি কিছুই ছিল না।
উত্তরের প্রত্যাশায় না থেকে পুলিশ সাহেব ফের মোবাইলে ব্যস্ত হয়ে পড়লে হেলেন দাঁড়িয়ে থাকে মুখে আঁচল জড়িয়ে। অপেক্ষায় থাকে দারোগা সাহেবের পরবর্তী পদক্ষেপের।
২।।
হেলেনের সঙ্গে যার কথাবার্তা হয় তিনি আদৌ ওসি নন, অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইনস্পেক্টর বিমল মাইতি। ওসি কোথায় ডুব মেরেছে কে জানে! তাবলে এমনও নয় যে ডিউটিতে ফাঁকি মেরে বিমল মোবাইলে গেম খেলতে ব্যস্ত। ফেসবুক এবং ইউটিউব দেখছেন ঠিকই তবে সেটা সময় কাটানোর জন্য নয়, বিশেষ প্রয়োজনে।
এই একটা যন্ত্র এসেছে বটে! অকাজে কিংবা কুকাজে এর সঙ্গে পাল্লা দেয়ার ক্ষমতা কারুর নেই। পৃথিবীর যে কোনো কোণে ঘটে যাওয়া ঘটনার নিখুঁত বিবরণ সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে। ব্যস, নিমেষে খবরটা জানাজানি হয়ে যায়। টিভিতে নিউজ দেখার কিংবা খবরের কাগজের জন্য হাপিত্যেশ করে থাকার প্রয়োজন পড়ে না।
দু-একটা ভাসুর ভাদ্রবউ কেচ্ছা কিংবা হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সমূহ যে চোখে পড়ে না, তা নয় কিন্তু সেসবে এখন মন নেই বিমলের। এই মুহূর্ত্বে বিমলের প্রয়োজন বিশেষ একটা খবরের, লকডাউন উঠে যাবার খবর। লকডাউন উঠে যাওয়া মানেই ট্রেন বাস চালু হয়ে যাওয়া। প্রথমদিকটায় কড়াকড়ি থাকবে নিশ্চয়ই। পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর রাখা হবে। সুতরাং দিব্যি হাওয়া খেতে খেতে ঘুরে আসা যাবে বাড়ি থেকে।
কিন্তু কবে আসবে সেই সুদিন? বাতাসে খবর ভাসছে যেকোনো দিন লকডাউন তুলে নেয়া হবে। তুলনা টানা হচ্ছে অন্যান্য রাজ্যের যেখানে কোভিডে মৃত্যু হলেও জীবনযাত্রা মোটামুটি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এমন কী খোদ কেন্দ্রীয় সরকারের মতেও লকডাউনের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। দেশকে অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে তুলে আনতে কল-কারখানায়, ব্যাঙ্কে, সরকারি দপ্তরে কর্মসংস্কৃতির ধুম শুরু করে দিতে পরামর্শ দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী।
সমস্যাটা শুরু হয়েছে সেখানেই। কেন্দ্র বনাম রাজ্যের সব ইশুতেই যখন লড়াই তখন এক্ষেত্রেও কিসের সমঝোতা! তাছাড়া এরাজ্যে ছুটি ঘোষণা করাটাই হলো জনপ্রিয়তা ধরে রাখার মূল হাতিয়ার। তাতে শুধু সরকারি কর্মচারীরা নয়, যারা দিন মজুর তারাও নাকি খুশী হয়! এনিয়ে বিস্তর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, সমালোচনা সহ্য করতে হওয়া সত্বেও রাজ্য সরকার নিজস্ব নীতিতে অনড়। এবং হাতিয়ারটা যে কাজেও আসে তার প্রমাণ বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফল। তাছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার তো পাশাপাশি বলেই রেখেছে, কোনো রাজ্য সরকার প্রয়োজন বোধ করলে লকডাউন ঘোষনা করতেই পারে। সেই স্বাধীনতা তাদের থাকছে। সুতরাং অসুবিধে কোথায়! বিরোধীরা যতই লকডাউনকে অপ্রয়োজনীয় মনে করুক প্রয়োজন ব্যাপারটা নিতান্তই আপেক্ষিক। একজনের প্রয়োজন অপর জনের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হোতেই পারে, কে তার পরোয়া করে! বিরোধীদের পরামর্শ মেনে কে কবে প্রশাসন চালিয়েছে? বরং লকডাউনকে ছুটির সঙ্গে গুলিয়ে দেয়াটা তো চক্রান্ত! ওরা চাইছেই এই রাজ্য করোনায় মৃতদের তালিকায় এগিয়ে থাকুক। সেটা হচ্ছে না জন্য ওদের এত গাত্রদাহ। রাজ্য সরকার চট করে ফাঁদে পা দেবে না। চলুক না ঢিলেঢালা পর্বটা যতদূর চলে। তুম ভি খুশ, হাম ভি।
আর বিমল মাইতির দুশ্চিন্তাটা এখানেই। একটা বছর থানার মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হয়েছে। কেউ কেউ যে দু-একদিনের জন্য বাড়ি থেকে ঘুরে আসেনি তা নয়। তবে ছুটি নিয়ে নয়, ওসি সাহেবের সঙ্গে রফা করে। চেষ্টা বিমলও করেছিলেন কিন্তু ওসিবাবু প্রতিবারই দূরত্বের অজুহাত দিয়েছেন। বলেছেন, যদি গিয়ে ফেঁসে যাও, ফিরতে না পারো আর করোনা বাঞ্চোত যদি ফের বাড়াবাড়ি শুরু করে তোমার পোঁদে একটা বাঁশ, আমার পোঁদে গোটা বাঁশঝাড়। বোঝো না, কোন জমানায় চাকরি করতে হচ্ছে?
যুক্তি অকাট্য। করোনাকে কোনো বিশ্বাস নেই। তবু কথাগুলো পছন্দ হয়নি বিমল মাইতির। বাছুরহাটা কী এমন দূরে! মোটে সাড়ে ছ’ ঘন্টার পথ। অবশ্য সরাসরি কোনো ট্রেন নেই। ঝাড়গ্রাম অবধি গিয়ে তারপর বাস, তারপর ভ্যানরিক্সা। হোক না। ওটা কোনো সমস্যাই নয়। বাড়িতে খবর দিলেই মটোর বাইক চলে আসবে ঝাড়গ্রামে। তাছাড়া ফেঁসে যাওয়া বলতে কী বোঝাতে চাইছেন ওসি সাহেব? বিমল কিংবা পরিবারের কারুর করোনা আক্রান্ত হওয়া? এ তো ঘোর অলুক্ষুণে কথা!
অধস্তনের মনের কথা পড়তে অসুবিধে হয়নি ওসি সাহেবের।
--যাবে, যাবে। পরিস্থিতিটা একটু স্বাভাবিক হোক। তদ্দিন তোমার যন্তরটা জল ঢেলে ঠান্ডা করে রাখো।
ঊর্ধতনের রসিকতাটুকুকে গায়ে না মেখে এতদিন অপেক্ষা করেছেন বিমল। কিন্তু পরিস্থিতি একদিন স্বাভাবিক হলেই পরদিন বিগড়ে বসে। কে জানে বিগড়োনটা সত্যি সত্যি ঘটে, নাকি মিডিয়া ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখায়! মানুষকে আতঙ্কিত করে যে ওরা কী সুখ পায়! মানুষ কি এমনি এমনি মারা যায় না? প্রতি বছর ডেঙু, ম্যালেরিয়া, এমন কী কালাজ্বরেও কত মানুষের মৃত্যু হয়। তখন তো লকডাউনের কথা ওঠে না! শুধু অসুখ কেন, মানুষ তো খুনোখুনি করেও মারা যাচ্ছে। না খেতে পেয়ে মরে না মানুষ? দুর্ঘটনায় মরে না? সেসবের মতো এই মৃত্যুটাকেও মেনে নিয়েছে মানুষ। সুতরাং এখন লকডাউন তুলে নিতে অসুবিধাটা কোথায় !
তবে মোটামুটি ঠান্ডা হয়েছে পরিস্থিতি। খোদ ওসি সাহেবও বলেছেন, খবর আছে শিগ্রি লকডাউন উঠে যাবে। ট্রেন চালু হলে ঘুরে এসো।
বাতাসে ভাসা উড়ো খবরটাকে সাহেবের মুখে প্রতিষ্ঠা পেতে দেখে খুশি হয়েছেন বিমল মাইতি। তবু ভদ্রতা করে বলেছেন, আপনাদের অসুবিধে হবে না তো, স্যার?
সিগারেট টানতে টানতে গম্ভীর মুখে ওসিবাবু জবাব দিয়েছেন, হলে হবে। তাবলে তো তোমাকে মাথায় বীর্য উঠিয়ে মরতে দিতে পারি না! যেরকম ফুঁসে আছ, বাপ রে!
কথাটা যদিও আপত্তিকর। কারণ বাড়ি মানে কি শুধু স্ত্রী? মা, বাবা, ভাই, বোন, ছেলে, মেয়ে এরা কেউ নয়? তবু প্রতিবাদ না করে মুচকি হেসেছেন বিমল।
কিন্তু এসব ঠাট্টা ইয়ার্কির বয়সও তো দিন দিন বাড়ছে, কবে ঘোষিত হবে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন?
এহেন দশায় যদি মুখ তুলতেই দেখা যায় দরজার সামনে একটা মেয়েমানুষ এসে দাঁড়িয়ে আছে তাহলে কার না মেজাজ খারাপ হয়! মহিলা যে ভিখিরি নয় সেটা বুঝতে অসুবিধে হয়নি বিমলের। কারণ ভিখিরির তো সাহস হবে না থানায় ঢুকে ভিক্ষে চাওয়ার। নিশ্চয়ই কোথাও ঝামেলা বেঁধেছে। যদি দাঙ্গা গোছের কিছু ঘটে থাকে মাথা ঘামানো মানেই ফেঁসে যাওয়া। কেস ডায়েরি লেখা, এনকোয়ারি, গ্রেপ্তার, কোর্ট, লকডাউন উঠে গেলেও এসব ঝামেলা ফেলে কোথাও যাওয়া যাবে না। সুতরাং নাইট ডিউটি শেষ হোতে যখন আর মোটে ঘন্টা খানেক বাকি তখন দেশলাই কাঠি দিয়ে কান চুলকোতে চুলকোতে হেলেনের কথাগুলো শুনে ফের মোবাইলে ডুবে যেতেই পারেন বিমল।
এছাড়া কী বা করার ছিল! সব কথা কানে তুলে লাভও নেই। মেয়েলোকটা যেটুকু বলেছে তাতেই স্পষ্ট বোঝা গিয়েছে কেসটা স্বামী-স্ত্রীর হাতাহাতি, চুলোচুলি সংক্রান্ত। এবং উপস্থিত মহিলার শরীরে কোনো ক্ষতচিহ্ণ নেই। থাকলেও সেটা চোখে পড়ার মতো নয়। যদি বা থাকত তাতেও উত্তিজিত হওয়ার মতো কিছু নেই। এই শ্রেণীর মানুষদের বধূ নির্যাতন কেস দেয়া চলে না। এদের আজ ঝাড়পিট কাল মোহব্বত। এজলাসে দাঁড়িয়ে গোটা ঘটনাটাই অস্বীকার করবে আর কোর্টে জমে থাকা মামলার পাহাড়কে উচ্চতা বাড়াতে সাহায্য করার দোষে বিমল মাইতিকে জজ সাহেবের কাছে ধমক খেতে হবে। এছাড়াও আছে লোকাল নেতার সমস্যা। পারিবারিক ঝামেলায় পুলিশের মাথা গলানোর অর্থ এলাকার দাদাকে অপমান করা। পুলিশই যদি এসব সমস্যার সমাধান করবে তাহলে লোকাল কমিটি, কাউন্সিলর, এরা আছে কেন? সুতরাং নিজের প্রতিপত্তি দেখাতে একদল অনুগামী নিয়ে থানায় এসে দাদা টেবিল চাপড়ে ধমকে যাওয়াটা অবধারিত। ঘটনার গুরুত্ব অনুয়ায়ী বাধ্যতা মূলক বদলিও অসম্ভব কিছু নয়। স্বামীটা হয়ত তেমন শক্তিশালী নয়। বউয়ের হাতে মার খেয়ে অভিমান করে কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছে। ফিরে না এসে যাবে কোথায়! বউ থানায় চলে এসেছে শুনলে ছুটতে ছুটতে চলে আসবে। তাহলে করোনার মরসুমে তদন্তে গিয়ে ভিড়ভাট্টা, ধাক্কাধাক্কির ভেতরে পড়ে ঝুঁকি বাড়িয়ে লাভ কী!
এইসব কারণেই হেলেনের কেসটাকে কানের ভেতরে ঢুকতে দেননি বিমল মাইতি। বরং তখনই আচমকা মোবাইল স্ক্রিনে নলহাটি স্টেশনে পাবলিক বনাম রেলপুলিশের খন্ডযুদ্ধের দৃশ্য ভেসে ওঠায় মনযোগী হয়ে পড়েছিলেন সেদিকে। পুরো খবরটা খুঁটিয়ে দেখছিলেন। অত্যন্ত স্বাভাবিক এই জনরোষ। চাকরিস্থল খোলা থাকবে অথচ পরিবহন চালু থাকবে না সেটা হয়! এরকম ঘটনা যত ঘটবে তত তাড়াতাড়ি ট্রেন চালু হবে। মানুষের দাবীকে উপেক্ষা করার সাধ্য ভোটে জিতে আসা সরকারের থাকতে পারে না।
ভিডিও ক্লিপিংটা দেখার পর যখন স্ক্রিনে ভেসে ওঠা মন্তব্যগুলো পড়ছিলেন বিমল মাইতি, দেখছিলেন কে কতটা সরকারকে তুলোধোনা করছে ঠিক তখনই ফোনটা ঝনঝনিয়ে ওঠে।
--গুডমর্নিং, হরিগঞ্জ থানা।
--তোমার কাছে কেউ ডায়েরি করতে এসেছিল?
ওপারের কন্ঠস্বর চিনতে অসুবিধে হয় না বিমল মাইতির।
–কিসের ডায়েরি স্যার?
–এসেছিল কিনা?
--কোথা থেকে স্যার?
বিমলের লাগাতার পাল্টা প্রশ্নে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে ওসি সাহেবের।
–বাংলা কথা বোঝো না। যা জিজ্ঞেস করছে সেটার উত্তর দাও। কেউ এসেছিল?
-- না তো স্যার!
বিমলের উত্তরে ওপাশে থমকে যান ওসি।
--আসেনি! আচ্ছা, ঠিক আছে। যদি আসে তাহলে ডায়েরিটা নিয়েই এনকোয়ারিতে বেরিয়ে যাবে। ওক্কে?
--ওক্কে।
লাইন কেটে দেয়ার পরও মনটা খিঁচখিঁচ করে বিমলের, উত্তরটা কি সঠিক হলো? কিন্তু যে এসেছিল সে তো ডায়েরি করতে চায়নি! তাছাড়া ওরকম একটা মেয়েছেলের হয়ে ওসি সাহেব অতটা ব্যস্তই বা হোতে যাবেন কেন! নিশ্চয়ই অন্য কেউ আসবে। সময় নিয়ে আসুক। বাকি তো মোটে মিনিট পঁয়তাল্লিশ। ওটুকু সময় ইউটিউব দেখেই কাটিয়ে দেয়া যাবে।
কিন্তু পনের মিনিটের ভেতরে ফের বেজে ওঠে ফোন। ফের ওসি সাহেব।
--তুমি বের হওনি?
--কোথায় স্যার?
--বললাম যে, বাঙালপাড়ায়! তুমি কি আজকাল কানে কম শুনছ?
যদিও ওসি সাহেবের এই ঊষ্মা অন্যায্য কারণ কেউ ডায়েরি করাতে এলে তারপর তদন্তে বেরোনর হুকুম ছিল। তাছাড়া এর মধ্যে বাঙালপাড়ার প্রসঙ্গই বা আসে কিভাবে! তেমন কোনো আদেশ তো ছিল না। বিমল কথা না বাড়িয়ে চুপ করে থাকেন।
--এখনই যাও। স্পট থেকে প্রয়োজন হলে ফোন করবে আমাকে।
থানা ফাঁকা রেখে বের হওয়াটা সঙ্গত হবে কিনা, তানিয়ে ভাবনা থাকলেও ওসি সাহেবের মেজাজ বুঝে কথা বাড়ান না বিমল মাইতি।
--ওক্কে স্যার।
ওসি সাহেব ফোন কেটে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় সাব- অ্যাসিস্টান্ট ইনস্পেক্টর অরুণ চক্রবর্তী এসে ঢোকেন।
--সাত সকালে কী যে ঝামেলা। ওসি সাহেব এমন তাড়া লাগালেন যে ছুটে আসতে হলো। বাজারটাও করে উঠতে পারলাম না। যান, বেরিয়ে পড়ুন।
সচরাচর দেরিতে ডিউটিতে আসা লোককে আগে ঢুকতে দেখে যা বোঝার বুঝে নিয়েছিলেন বিমল তবু জিজ্ঞেস না করে পারেন না, কেসটা কী বলুন তো?
অবাক চোখে তাকান অরুণ।
--আপনাকে বলেননি সাহেব! আমাকে তো বললেন মার্ডার কেস। নিশ্চয়ই হাইপ্রোফাইল কেউ হবে, নাহলে কি সাহেবের এত মাথাব্যথা থাকত! আমি বললাম, স্যার, কেসটা আমি টেকাপ করবো? সাহেব বললেন, না বিমল যাক।
সুতরাং এরপর সবটাই কপালের দোষ বিবেচনা করে একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বেরিয়ে পড়া ছাড়া কী করার থাকতে পারে বিমল মাইতির!
৩।।
শহর কোলকাতার দক্ষিণ প্রান্তের যা কিছু বিস্তৃতি সবই তো উদ্বাস্তুদের সৌজন্যে। হোগলা বন, মশা, শেয়াল ভামেদের আস্তানা ঘুচিয়ে গড়ে উঠেছিল নতুন বসতি। সেগুলোর মধ্যে আড়ে-বহরে যেগুলো গুরুত্বযোগ্য তাদের মধ্যে বাঙালপাড়া অন্যতম। তেমনটা হওয়াই স্বাভাবিক কারণ উদ্বাস্ত তো শুধু দেশভাগের সময়েই আসেনি, একাত্তর এবং পরবর্তীতেও বহু এসেছে এবং তাদের কেউ কেউ অন্যান্য জায়গায় ঠাঁই নিয়েছে তবু এই বস্তির পত্তন যেহেতু দেশভাগ পর্বে ঘটেছিল তাই বেশির ভাগই বেছে নিয়েছে এই বস্তি। হয়তো নামের আকর্ষণে কিংবা আত্মীয়দের আমন্ত্রণে।
কারণ যেটাই হোক বিমল মাইতির মাথায় তখন অন্য চিন্তা, কিভাবে তদন্তটা শুরু করবেন। বাঙালপাড়া বস্তি তো একটুখানি জায়গা নয়। তাহলে কি প্রথমে হেলেন বারুইয়ের খোঁজ করা উচিত? যদিও মহিলা খুন সংক্রান্ত একটা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল কিন্তু খুনটা যে হয়েইছে সে কথা তো বলেনি। যদি খুন হওয়া ব্যক্তি হেলেনের স্বামী না হয়ে থাকে এবং সে যদি এখনও ফিরে এসে না থাকে তাহলে কি ডায়েরিটা এবার নিতে হবে? খোঁজ করতে গিয়ে যদি দেখা যায় হেলেনের স্বামীও খুন হয়েছে তাহলে তো দুটো কেসই বিমলের ঘাড়ে পড়বে!
সাতপাঁচ উদ্ভট চিন্তাসহ বিমল মাইতিকে রওনা দিতে হয় বটে কিন্তু বাঙালপাড়ার মুখটাতে পৌঁছতেই সব আশঙ্কা নিমেষে খালাস। পুলিশের অপেক্ষায় থাকা মানুষগুলো গাড়ি দেখা মাত্র যেভাবে ছুটে আসে এবং মিছিল করে স্পটে নিয়ে যায় তাতে বিমলের চিন্তাভাবনার কোনো অবকাশ থাকে না। এটাই স্বাভাবিক।
কোথাও খুন হবে এবং খবরটা নিমেষে জানাজানি হবে না, এমনটা কবে কোথায় হয়েছে! বিমলও জানেন এসব তথ্য কিন্তু লকডাউন সংক্রান্ত উৎকণ্ঠা কাবু করে ফেলায় মনে পড়েনি।
ঘটনাস্থল আদৌ বাঙালপাড়া বস্তিতে নয়। বরং উত্তর দক্ষিণের রাস্তাটাকে সীমান্তের মর্যাদা দিয়ে বস্তিটার পশ্চিম প্রান্ত যেখানে থমকে গিয়েছে, যেখান থেকে ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাট সাম্রাজ্যের শুরু, সমবেত জনতা বিমলকে টেনে নিয়ে যায় সেদিকে। ভ্যানটা যে বাড়িটার সামনে থামতে বাধ্য হয় সেটা ওই এলাকার পক্ষে নিতান্তই বেমানান। ভাঙাচোরা একটা বাড়ি। তবে পাশে প্রাচীরে ঘেরা অনেকটা খালি জমি। এখন তো জমি মানেই সোনার খনি, বিশেষ করে এই অঞ্চলকে তো অনায়াসে হীরের খনি বলা যায় সেখানে এতটা জায়গা অবহেলায় পড়ে থাকতে দেখে অবাকই হন বিমল।
বিমল যেহেতু জমির কারবারী নন তাই ভ্যান থেকে নেমে ভ্রু কোঁচকান।
–বডি কোথায়?
প্রাচীরের ওপার থেকে কেউ একজন গলা বাড়িয়ে আহ্বান জানায়, ভিতরে আসেন ছার।
তবে কি প্রাচীর ডিঙোতে হবে? কিন্তু এই সমস্যারও নিমেষে সমাধান হয়ে যায়। প্রাচীরের ঘেরাটোপ অটুট নেই। এককোণে রীতিমত অবৈধ প্রবেশের উপযোগী পথ বানানো রয়েছে। উৎসাহী জনতার পিছু পিছু মাথা হেঁট করে সে পথেই ঢুকলেন বিমল মাইতি।
ভেতরে যতই ঝোপঝাড় থাকুক জায়গাটা যে নিতান্তই অবহেলায় পড়ে আছে সেটা বলা যাবে না। এই নিরালাটুকু কাজে আসার নমুনা হিসেবে ইতস্ততঃ ছড়ানো রয়েছে বেশ কিছু মদের বোতল, তাস, সিগারেটের প্যাকেট এবং দক্ষিণ কোন ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটা চালাঘর।
লাশটা শোয়ানো ছিল চালাঘরটার সামনে। এগিয়ে যান বটে বিমল কিন্তু লাশটার বুকের ওপর একজন মহিলা উপুড় হয়ে পড়ে থাকায় মহিলা কিংবা লাশ, কোনো মুখই চোখে পড়ে না। বিমলের ইশারায় জনতা মহিলার কাঁধে হাত রাখে। যেহেতু সব শোকেরই একটা বাউন্ডারি লাইন থাকে এবং সেটা এতক্ষণে পেরিয়ে যাবার কারণে মহিলাও বিনা আপত্তিতে উঠে দাঁড়ায়। বিমল আড়চোখে দেখেন মহিলাকে, হেলেন বারুই। অর্থাৎ দুটো কেসই এক। বাড়তি ঝামেলা রইল না। কিন্তু সন্দেহটা সত্যি হওয়ার পর মহিলা ফের থানায় ছুটে গেল না কেন? এমন কাকে জানালো যে ঘটনাটা পৌঁছে গেল খোদ ওসি সাহেবের কানে?
যাকগে সেসব কচকচি আপাতত শনাক্তকরণের ঝামেলাট মিটে যাওয়ায় মোবাইল বের করে বিভিন্ন কোণ থেকে লাশের বেশ কয়েকটা ছবি তুলে ডায়েরি বের করেন বিমল।
--কে প্রথম দেখেছে লাশটা?
অনেকগুলো হাত ওঠায় বোঝা যায় দর্শনের কোনো প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় স্থান নেই। সবক’টা নামই ডায়েরিতে লিখে নিলেন বিমল।
দ্বিতীয় জিজ্ঞাসায় জানা যায় লাশ পোঁতা ছিল চালাঘরটার মেঝেতে।
--পুলিশ আসার আগেই লাশটা খুঁড়ে বের করলেন কেন?
দারোগাবাবুর এহেন বোকা প্রশ্নে প্রত্যক্ষদর্শীরা পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। ঘরের ভেতরে আচমকা একটা ঢিবি গজিয়ে উঠতে দেখলে কৌতূহলী হওয়াটা যেকোনো মানুষের পক্ষেই অত্যন্ত স্বাভাবিক। আর সামান্য একটু মাটি সরাতেই যদি মানুষের আঙুল বেরিয়ে আসে তাহলে পুরোটা না খুঁড়ে থাকা যায়! তাছাড়া পুরো লাশটা আবিষ্কৃত হওয়ার আগে তো কেউ ভাবতেই পারেনি যে মাটি ফুঁড়ে পল্টনের শরীর বের হবে। কেনই বা ভাবতে যাবে, গতকাল সকাল থেকে যে পল্টন নিখোঁজ সেই খবর তো কারুর জানা ছিল না!
--আমরা মনে করছিলাম করুণা রুগীর লাশ বুঝি! যদিও আমাদের অ্যালাকায় ওই রকম কিছু হয় নাই তবু কে বলতে পারে, বেপাড়ার কেসও তো হইতে পারে!
পোড়ানোর অসুবিধে থাকায় গোপনে লাশ পুঁতে রাখার মতো ঘটনা কিছু কিছু ঘটেছে বটে কিন্তু আচমকা করোনা প্রসঙ্গ উঠে আসায় বিমল মাইতির ফের মনে পড়ে যায় লকডাউন উঠে যাবার সম্ভাবনার কথা এবং মোবাইলে নিউজ ফের একবার পরখ করার লোভ সামলানো তার পক্ষে কষ্টকর হয়ে ওঠে। তবে সজাগ থেকেই কাজটা করায় কথাগুলো কানে ঢুকতে অসুবিধে হয় না।
--নিজেদের চোখে পল্টনের লাশ দেখেও কিন্তু আমরা বিশ্বাস যাই নাই, শিউর হওয়ার জন্য ওর বাড়িতে গেছিলাম। দেখি তালাবন্ধ। তখন দাদাকে ফোন করলাম, বলো দাদা কী করব? দাদা বলল, আমি দেখতেছি। ব্যস, তারপর থিকে আমরা এইখানে।
মোবাইলে চোখ রেখেই বিমল জানতে চান, দাদাটা কে?
দারোগাবাবুর প্রশ্নে হতবাক হয়ে যায় জনতা। এই এলাকায় দাদা কে, সেটা বলে দিতে হবে! একজনই দাদা, মলয় ঘোষ। ওয়ার্ড কাউন্সিলর। তারচেও বড় পরিচয়, মন্ত্রী উত্তম ঘোষের ছোটভাই।
--আপদে বিপদে দাদা-ই তো আমাদের সব।
পরিচয়টা জেনে যাবার পর বিমলের বুঝতে অসুবিধে হয় না খুনের খবরটা ওসি সাহেবের আগাম জেনে যাওয়া এবং বিমলকে তড়িঘড়ি এনকোয়ারিতে পাঠানোর রহস্য। মোবাইলটা তাড়াতাড়ি পকেটে ঢুকিয়ে চালাঘরের ভেতরে প্রবেশ করেন।
লাশ পুঁতে রাখা গর্তটা দেখে বিস্মিতই হন বিমল। যদিও পল্টন এমন কিছু পাঠান চেহারার নয় তবু ক্ষয়াটে চেহারার এক স্বাভাবিক উচ্চতার মানুষকেও এখানে পুঁতে রাখা সম্ভব নয়, গর্তটা বড়জোর এক কিশোরের জন্য মাপসই। তাহলে লাশটাকে কিভাবে ওই গর্তে ঢুকিয়ে মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল? দুমড়ে মুচড়ে? কোলকুঁজো করে? চিৎ নাকি উপুর করে? কিন্তু সেই তথ্য যাচাই করার মতো কোনো ঠোস প্রমাণ পাওয়া যায় না। কারও মতে চিৎ হয়ে, কারো মতে কাত হয়ে, কারো মতে উপুর হয়ে লাশটা শুয়ে ছিল।
ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা গোটা কয়েক মাটির খুঁড়ি, এক বান্ডিল তাস এবং পোড়া বিড়ির টুকরো ছাড়াও বিমলের নজরে পড়ে এক কোণে থাকা কোদালটার দিকে।
--এটা এখানে কে এনেছে?
একমাত্র এই প্রশ্নটারই উত্তর মেলে না। সেটাই স্বাভাবিক কারণ কোদালটা কেউ আনেনি, এখানেই রাখা ছিল। জিনিসটা মাটি খুঁড়ে লাশ বের করতে সাহায্য করলেও ওটা কিভাবে এখানে এলো সেই প্রশ্ন তখন কারো মাথাতেই আসেনি।
সমস্যাটার সমাধান করে দেয় খোদ হেলেন।
--এইটা তো আমাদের কোদাল। কাল সন্ঝায় ভুতো নিয়ে আসছে।
--ভুতো কে?
--ল্যাংড়া ভুতো।
--কেন নিয়ে এসেছিল?
--বলে নাই।
--তুমি দিলে কেন?
এই প্রশ্নের কী উত্তর হবে বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে পড়ে হেলেন। এই বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে জনতার মুখেও। পাড়ার লোক কোনো জিনিস চাইলে সেটা না দিয়ে থাকা যায়? তাহলে তো একসঙ্গে থাকাই চলে না।
ভুতোর কেসটা পরে দেখা যাবে। আপাতত প্রয়োজন জমির মালিকের সাক্ষ। দেওয়ালের ভাঙা অংশ দিয়ে বেরিয়ে পড়েন বিমল মাইতি। উপস্থিত জনতা যদিও পিছুপিছু আসে তবু চেষ্টা করে দারোগাবাবুকে সতর্ক করার।
--সাবধান ছার, ডাইনিবুড়ি কিন্তু মহা খচ্চর। সব্বাইকে খিস্তি করে। মলয়দা, উত্তমদাকেও ছাড়ে না।
তথ্যে যে ভুল ছিল না সেটা দরজার কড়া নাড়তেই টের পেয়ে গেলেন বিমল। ভেতর থেকে ভেসে এলো মহিলা কণ্ঠ, কোন খানকির পুত রে? দর্জা ভাংলে কি তর মায়ের নাঙে সারাইয়া দিবে?
বিমল ঘাড় ফিরিয়ে দেখেন উপস্থিত জনতার মুখে মুচকি হাসি। যদিও ভেসে আসা প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা সমীচীন নয় তবু ঘটনার লাগাম হাতে রাখতে বিমলকে বলতে হয়, দরজাটা খুলুন। থানা থেকে এসেছি।
প্রশ্নের প্রথমাংশের উত্তর পেলেও পরেরটুকুর উত্তর না মেলায় কোনো জবাব আসে না দরোজার ওপার থেকে। এমন কী দরোজা বন্ধই থাকে। বাধ্যত জনতার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করতে হয় বিমলকে। জনতা যেন এই ইশারাটুকুরই অপেক্ষাতেই ছিল। নিমেষে কয়েকজন এগিয়ে এসে দরজায় দমাদম লাথি কষিয়ে তারস্বরে চিৎকার করে, দিদিমা দরজা খোলো, পুলিশ আসছে।
এতক্ষণে লাথি কিংবা ঘটনার গুরুত্ব বুঝে দরজা খুলে যায়। দরজার ওপাশে এক বৃদ্ধা। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও একদা যে দীর্ঘাঙ্গী ছিলেন সেটা গঠন দেখেই বোঝা যায়। চেহারাতে প্রাচীন অভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। চোখ থেকে যেন আগুন ঝরে পড়ছে।
--নমস্কার। থানা থেকে এসেছি।
‘থানা’ শুনেই মহিলা মুখে কাপড় চাপা দিলেন। গত লকডাউনের পর থেকেই এটা চালু হয়েছে। মানুষ মাস্ক আঁটায় অভ্যস্ত না হলেও পুলিশ দেখলেই রুমাল, আঁচল, যে যা দিয়ে পারে মুখ চাপা দেয়। বিমলও পকেট থেকে মাস্ক বের করে মুখে আঁটেন।
--বাড়িতে পুরুষ কেউ আছেন?
–পুরুষ দিয়া কী হইবো? গুলী করবেন? আমারেই করেন, ঝামেলা চুইক্যা যাক।
যেকোনো কারণেই হোক ভদ্রমহিলা যে পুলিশের ওপর খুবই বিরক্ত সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না বিমলের। এসব ক্ষেত্রে খানিকটা আন্তরিক ব্যবহার কাজে দেয়। সেক্ষেত্রে চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘরে ঢোকাটা প্রয়োজন। কিন্তু করোনার মরসুমে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরে ঢুকে তদন্ত করা নিষিদ্ধ। এক্ষেত্রে সেই প্রয়োজনটা আছে কিনা বুঝতে না পেরে বাইরে দাঁড়িয়েই বিমল বললেন, ওদের ডেকে দিন। প্রয়োজন আছে।
--কী পোয়োজন? আমারে কন।
মহিলা সত্যিই ঠ্যাঁটা। সচরাচর এসব ক্ষেত্রে যে দাওয়াইটা প্রযোজ্য সেই বাঁজখাই পুলিশি ধমকটা দিতে ইতস্তত বোধ করেন বিমল।
--একটা মার্ডার কেসের এনকোয়ারি করতে হবে। আপনার হাজব্যান্ড কিংবা ছেলে বাড়িতে থাকলে ডেকে দিন।
ধমক না দিলেও ‘মার্ডার’ শব্দটাকে গুরুত্ব দিয়েই কথাটা বলেন বিমল কিন্তু মহিলার ওপর সেটার কোনো প্রভাবই পড়ে না যেন!
--হ্যারা থাকলে তো কবে উত্তম আর মলয়রে কান ধইরা নাক খত দেওয়াইতো। নোঙ্গর ব্যাটার সাহসই হইত না জ্বালাতন কইরবার।
এই উত্তম যে চিত্রতারকা উত্তমকুমার নন, মন্ত্রী উত্তম ঘোষ সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না বিমল মাইতির। অমন প্রভাবশালীর প্রতি ভদ্রমহিলার এহেন বিষোদ্গার সেটাও কিনা এই বয়সে পৌঁছে! এতটা সাহস দেখে মনে মনে তারিফ না করে পারেন না বিমল। কিন্তু এখানে আসার উদ্দেশ্য যেহেতু পরমবীর চক্রের জন্য নাম সুপারিশ করা নয় এবং মন্ত্রীকে গালাগালি করার পর্বটাকে দীর্ঘ হোতে দিলে নিজের চাকরি বিপন্ন হোতে পারে তাই তিনি সরাসরি প্রসঙ্গে ঢোকেন।
--আপনাদের জমিতে একটা লাশ পাওয়া গিয়েছে। সেই ব্যাপারে এনকোয়ারি করতে এসেছি।
বিমল খেয়াল করলেন ’মার্ডার’ শব্দটার মতো ‘লাশ’ শব্দটাতেও ভদ্রমহিলার কোনো চিত্তচাঞ্চল্য ঘটলো না। বরং হাত উল্টে জবাব দিলেন, এইডাতে অবাক হওনের কী আছে! হিম্মত থাকলে উত্তম আর অর ভাইরে ধইরা ডান্ডা পিটা করেন, আরও অনেক লাশ বাইর হইয়া আইবো। ওই দুইডাই তো লাশের ঠিকাদার।
আশেপাশে না তাকিয়েও বিমল বুঝতে পারেন উপস্থিত জনতা তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, যা কিনা যথেষ্ট বিব্রতকর। কথাগুলো উত্তম ঘোষের কানে উঠলে কোথাকার জল কোথায় গড়াবে কে জানে!
--কাকে কী জিজ্ঞেস করব সেটা আমাদের ব্যাপার। জমিটা যখন আপনাদের তখন আপনাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতেই হবে।
এবার ভদ্রমহিলার মধ্যে খানিকটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
--যাউক, তাইলে স্বীকার গেলেন যে জমিটা আমার?
এহেন উদ্ভট প্রশ্নে অবাক হয় বিমল।
--আপনার কম্পাউন্ডের ভেতরে থাকা জমি তো আপনারই হওয়ার কথা!
ফের উত্তেজিত হয়ে ওঠেন মহিলা।
--কথা আবার কীসের? আলবত আমার। কাগজপত্র সব আছে। আপনাগো থানায় গিয়ে দেহাইছিও সেইসব কিন্তু কোনো কাম হয় নাই। এহন লুইচ্চাদের ভয়ে নিজের ঘরে নিজেরে লুকাইয়া থা্কতে হইতাসে।
ফের অপ্রাসঙ্গিক কথা ধামা চাপা দিতেই হয় বিমলকে।
--সেসব কথা পরে হবে, এখন আপনাকে একটু আসতে হবে।
বিমলের কথায় নিমেষে কয়েক পা পিছিয়ে যান ভদ্রমহিলা।
--আমি কনে যামু? কোথাও যামু না। পারলে আমারে গুলী কইরা মাইরা তারপর আমার লাশটাও নিয়া উত্তমরে দ্যান।
ভদ্রমহিলার যে গোলাগুলীর ওপরে বিশেষ উৎসাহ আছে সেটা বুঝতে অসুবিধে হয় না বিমল মাইতির। পাছে দরজা বন্ধ করে দেন তাই একটা পা ভেতরে ঢুকিয়ে এবার হাল্কা গর্জন করতেই হয়, আসবো না বললে তো হবে না। আপনার জমিতে লাশ পাওয়া গিয়েছে সুতরাং আসতেই হবে।
বিমল মাইতির ধারণা ছিল এবার অন্ততঃ হুকুমটা অবহেলা করতে পারবেন না মহিলা, ঘাবড়ে যাবেন। কিন্তু বিমলের ধারণাকে মিথ্যে প্রমাণ করে মহিলা অম্লান মুখে বলে বসলেন, কইলাম তো, যামু না। যা জিগ্যাসা করার এইহানে করেন।
এরকম অসহযোগিতার কারণে মহিলাকে গ্রেপ্তার করাটা বে-আইনি হোত না যদি সঙ্গে মহিলা পুলিশ থাকত। ওদিকে আবার যার জমি তাকে স্পটে না নিয়ে গেলে কেসটা টিঁকবেও না। তাহলে উপায় কী!
বিমলের এসব ভাবনাচিন্তার মাঝখানে পেছন থেকে কেউ একজন বলে ওঠে, পল্টনের লাশ পাওয়া গেছে দিদিমা। দেখবেন না?
বিমলকে অবাক করে এই প্রথম থমকে যান মহিলা। খানিকক্ষণ অসহায় চোখে দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরে ঢুকে যান, তবে দরজা খোলা রেখেই। এই সাময়িক প্রস্থানের কারণ যে তালাচাবি বের করা সেটা বুঝতে পেরে অবাক হন বিমল মাইতি। দু-পা দূরে নিজের জমিতে যেতে এবং সঙ্গে পুলিশ থাকা সত্ত্বেও দরজায় তালা ঝোলাতে হচ্ছে! মহিলা সত্যিই খিটকেলে।
মহিলাকে দেখেই হেলেন ছুটে এসে আছড়ে পড়ে মহিলার পায়ে।
--অ দিদা, আপনের কথাই সত্যি হলো। ওরা মাইরেই ফেল্লো। এখন কী হবে দিদা! বাচ্চাটা যে একেবারে ছোট। কীভাবে মানুষ করব ওকে?
বিমল অবাক হয়ে দেখলেন মহিলার দু চোখ জলে ভরে উঠেছে অথচ পাথরের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো সান্ত্বনা দিচ্ছেন না হেলেনকে।
নতুন ক্লু’র গন্ধ পেয়ে নাক ছুঁচলো হয়ে ওঠে বিমল মাইতির। ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি ভিক্টিমকে ওয়ার্নিং দিয়েছিলেন?
বিমলের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পল্টনের লাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করেন ভদ্রমহিলা, তরে কতবার কইসিলাম, আমার কথা শুনলি না।
অর্থাৎ হেলেন বারুয়ের কথাটা সত্যি। এরপর বিমল মাইতির স্বাভাবিক প্রশ্ন, কিভাবে জেনেছিলেন যে ঘটনাটা ঘটতে পারে?
--কিভাবে আবার, পল্টনই কইসিলো, দিদা অরা আমারে হুমকি দেয়। কয়, তুমার কাছে আসা বন্ধ না করলে আমার কপালে দুঃখু আছে। আমি অরে কইসিলাম, তর কাম নাই আমার কাছে আসার। তর বউ ছাওয়াল আছে অগো কথাডা ভাব। তুই কইতি, তাইলে তো তুমি বাচপা না দিদা! কে তুমার বাজার কইরা দিবে? ওসুখ হইলে কে নিয়া যাবে ডাক্তারের কাছে? কে ওষুদ আইনা দিবে? পাগোল ছাওয়াল, আমি হইলাম যমের অরুচি। স্বামীরে, পোলারে খাইয়াও যহন বাইচা আছি তহন ঠিকই থাকমু। তুই পারলি না। দ্যাখ, তরেও খাইলাম।
--কারা হুমকি দিয়েছিল পল্টনকে?
বিমলের প্রশ্নে ফের স্বমূর্তি ধারণ করেন বৃদ্ধা।
--এক কথা বারেবারে জিগান ক্যান? কইয়াই তো দিছি। মুরাদ থাকে তো যান, দুইডারে পিছমুড়া কইরা বাইন্ধা আনেন।
৪.
এরপরের ঘটনা নিতান্তই গতানুগতিক। লাশ গাড়িতে উঠিয়ে ভুতো এবং অন্যান্য সাক্ষীর খোঁজে বাঙালপাড়ায় আসেন বটে বিমল মাইতি কিন্তু আচমকা ওসির ফোন আসায়, সেই ফোনে বিমল মাইতি খুনের তদন্ত করছে নাকি শ্রাদ্ধের ফর্দ, নিমন্থ্রণ তালিকা তৈরি করছে এমত কৌতূহল থাকায় বিমল বাধ্য হন ফিরে আসতে। ফলে প্রতিবেশিদের কাছে মৃত পল্টন বারুই সম্পর্কে খোঁজ খবর করা হয়ে ওঠে না। ভুতো কিংবা তার পরিবারের কারোর দেখা মেলে না। এমন কী পল্টনকে দেয়া হুমকি বিষয়ে খোঁজ খবর করার সময়টুকুও পাওয়া যায় না। তবে ভুতোকে থানায় দেখা করার আদেশ দিয়ে আসতে ভোলেন না বিমল।
এরপরের ঘটনাও যেহেতু নিছকই আইনগত কচকচি সমৃদ্ধ এবং সেই বিষয়ে কারোরই আগ্রহ থাকার কথা নয় তাই এই প্রতিবেদনে সে প্রসঙ্গে আমরা ঢুকব না। তাছাড়া কে না জানে আইন সম্পর্কে সেই তিনটি তথ্য, প্রথম তথ্য– আইনের হাত লম্বা। দ্বিতীয় তথ্য–আইন আইনের পথে চলে। তৃতীয় তথ্য–আইন নিরপেক্ষ। সুতরাং সেই তিনটা তথ্যকে মান্যতা দিয়ে কেসটা এগোতে থাকে। লম্বা হাত দিয়ে আইন ভুতোকে ঠিকই খুঁজে আনে। নিজের পথে চলে হত্যাকারী হিসেবে ভুতোকে এবং হত্যার ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে হেলেন বারুইকে গ্রেপ্তার করে কেস সাজায় এবং নিরপেক্ষতার কারণে উপযুক্ত প্রমাণাভাবে তাদের জামিন দিতেও বাধ্য হয়।
পাশাপাশি এটুকুও জানানো প্রয়োজন যে এই কেসে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি আইনের চোখে ধরা পড়ে সেসবের জন্য দায়ী থাকে একজনই, বিমল মাইতি। যদিও তার যে চেষ্টার কোনো কসুর ছিল না সেই তথ্য সরকারি উকিল বারবার জানানো সত্বেও বিচারকের লাঞ্ছনার হাত থেকে রেহাই তো মেলেই না উপরন্তু তদন্তের দায়িত্ব অন্য কোনো উপযুক্ত অফিসারকে দেয়ার আদেশ হয়। অবশ্য তাতে বিমল মাইতির কিছু যায় আসে না। পুলিশি চাকরিতে এরকমটা আকছারই ঘটে। প্রয়োজনে সাসপেন্ডেডও হোতে হয়। তাই অপমানগুলো গায়ে মাখেন না বিমল মাইতি। তাছাড়া এটাও তো ভুললে চলবে না যে কেস চলাকালীনই লকডাউন উঠে যাওয়ায় কয়েকদিনের জন্য বাড়ি থেকে ঘুরে আসার অনুমতি দিয়েছিলেন ওসি সাহেব। এর বেশি কী বা চাইতে পারে বিমল মাইতি!
কোর্টে হাজিরা এবং সাক্ষ দেয়ার হাত থেকে শুধু বিমল নয়, রেহাই পেয়েছিলেন আরও একজন, সেই ভদ্রমহিলা। এ ব্যাপারে আইন কিংবা বিমল মাইতি কারোরই কোনো অনুগ্রহ কিংবা গাফিলতি ছিল না। করোনার ঢেউ ফিরে যাবার সময় এরকম কতজনকেই তো তুলে নিয়ে গিয়েছে, সে ব্যাপারে কারই বা কী করার থাকতে পারে!
আপাতত করোনার ঢেউ মিটে গেলেও পরবর্তী ঢেউ নাকি ফের মাথা চাড়া দেবে। মিডিয়া প্রতিদিনই দু-চারটে মৃত্যু সংবাদ দিয়ে চলেছে। তবে এবার পূর্ণ লকডাউন হয়ত সহজে ঘোষনা করা হবে না। কারণ শোনা যাচ্ছে এরকম ঢেউ পরপর উঠতেই থাকবে। মরতে মরতেই মানুষ মৃত্যু ঠেকাতে শিখে যাবে। শুধু কয়েকটি সতর্কতা মূলক পদক্ষেপ গ্রহণই যথেষ্ট। জীবন যদি সমুদ্র হয়ে থাকে তাহলে সেটা ঢেউ বিহীন হয় কিভাবে? মৃত্যুভয়ে জীবন থমকে থাকে না। উন্নয়নও নয়। বিমল এখনও কড়া নজর রেখে চলেছেন মোবাইলের খবরে। তদন্তের অজুহাতে থানা এলাকার সব খোঁজখবর রাখছেন। ক্বচিৎ বাঙালপাড়ার দিকটায় এলে যখন দেখেন সেই ভাঙাচোরা বাড়িটাকে হাপিস করে দিয়ে তড়তড়িয়ে চারতলা বাড়ি উঠছে তখন বুকের ভেতরটায় কেমন যেন কষ্ট হয় যা কিনা অর্থহীন। এই অতিমারিতে যখন অজস্র তরতাজা প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তখন একজন মুখরা বৃদ্ধার জন্য কষ্ট অনুভব করাটা নিছকই অর্থহীন।
লেখক পরিচিতি:
অলোক গোস্বামী
কথাসাহিত্যিক
কলকাতায় থাকেন।


0 মন্তব্যসমূহ