প্রজ্ঞাদীপা হালদারের গল্প : হাসিদের গল্প


অপাই হাসছে।

হাসতে হাসতে ফুলে উঠছে পিঠ। মাসতুতো বোন ডিম্পির কোলের উপর উপুড় হয়ে হাসছে। কাঁধের উপর কেটে বসেছে ব্রা-এর স্ট্র্যাপ। হাসির দমকে খোলা পিঠে মাঘের সকালে বিনবিন করছে ঘাম।
অবশ্য ঠিক সকাল বলে চলে না। বাড়ি সরগরম সেই ভোর থেকে। ডিম্পির আজ বিয়ে। অভ্যুদিকের কাজ শুরু করেছেন পুরোহিত। বিয়েবাড়ির সকালের ম্যান্ডেটরি লুচি-সাদা আলুর তরকারি খাওয়া হয়ে গেছে সকলের । এখন গজল্লা চলছে কনের ঘরে, এইসব মাসতুতো মামাতো পিসতুতো বোন আর বউদিদের।

বাঙাল বাড়িতে যেমন হয়, অপাইদের বাপের বাড়ির যেকোনও অনুষ্ঠানেই ভিড় হয় দেখার মতো, তিন দিন আগে থেকেই। একরকম রিইউনিয়নের লোভে বিবাহিত মেয়েরা চলে আসে উৎসববাড়িতে, এখনও। আত্মীয়ারা নিকটদূর নির্বিশেষে আই বানান, আনন্দনাড়ু বানান। উৎসবের দিন দেখা মেলে ছেলেদেরও,লজ্জা লজ্জা মুখ করে তারাও যোগ দেয় বোনেদের মজলিশে। বড়রা আর ছোটরা নিজেদের পিয়ারগ্রুপে মশগুল।

অপূর্বার খিলখিল খলখল হাসি শুনে একবার মিনতিমাসি উঁকি দিয়ে দেখে গেলেন। বড্ড হাসে অপাই মেয়েটা। বাবা রে, এতো হাসির কী আছে কে জানে, আর কেউ তো এমন হাসছে না।

#
ডিম্পির বিয়ের কার্ড দিতে গিয়েছিলেন রাঙামাসি রাঙামেসোমশাই। শাশুড়ির হাত ধরে বলে গেলেন, অপাইকে কিন্তু পাঠাবেন দিদি, পিঠোপিঠি বোন, না গেলে দুজনেরই কষ্ট। বাংলা নভেলে যেমন লেখে, রাঙামাসি তেমন চোখ মুছে বলেছিলেন, জানেনই তো নদীতে নদীতে দেখা হয় কিন্তু বোনে বোনে...
মাসিকে এবং শাশুড়িকে অপ্রস্তুত করে তখনও হেসে ফেলেছিল অপাই, ওরফে অপূর্বা। মাগো, এমন করে কে বলে? আশাপূর্ণা দেবীর যুগ এখনও চলছে নাকি! মাসি একটু মনঃক্ষুণ্ণ হয়েই চলে গেলেন। এই হাসির পরে আলাপ আর জমে না। অবশ্য শাশুড়ি ভালই জলযোগ করিয়েছেন মাসি-মেসোকে। তোলা পোর্সেলিনের থালা বাটি কাবার্ড থেকে নামিয়ে, সাজিয়ে দিয়েছেন খাবার। মাসি-মেসো চলে গেলে শাশুড়ি কাজের মেয়ে গঙ্গাকে বললেন কার্ডটা বারান্দায় রাখ, আর এই সব বাসনপত্র সাবধানে মেজে তুলবি।

আড়চোখে অপাই দেখে শাশুড়ির ঠোঁটটেপা মুখ অন্ধকার। তার এই হাসির জের যে সহজে মিটবে না, সেটা এতক্ষণে মনে পড়েছে অপাইয়ের। শাশুড়ির ছেলের ফেরার সময় হয়ে গেলো। ভেবে ভয় ভয় করে অপাইএর। ভয় করে, অথচ কিছুতেই না হেসে থাকতে পারে না। এটা স্বভাব। শাশুড়ি বর সক্কলে বলে, খারাপ স্বভাব। আচ্ছা? তাহলে ধরো যে-বর এককালে প্রেমিক ছিল এখন তাকে ভয় পায় অপাই, এটাকে কী বলা যায়? অভ্যাস? সেটা কেমন অভ্যাস? ভালো?

#
অপাই বরাবর হাসতে ভালবাসে। ফিকফিকিয়ে কুলকুলিয়ে ঝরঝরিয়ে, সব রকম হাসি। শ্যামলা মুখে তার সাদা দাঁতের শোভা ভালই লাগতো। তা ছাড়া ছোট থেকে অপাই পড়েছে, শুনেছে মেয়েদের সেন্স অফ হিউমার নাকি ভালো হয়-টয় না। মেয়েজাতের এই কলঙ্কমোচনের জন্যে একা একাই চেষ্টা করছে অপাই। মাঝে মাঝে খুব সাবধানে অফিসেও একটা দুটো মজার গপ্পো বা টিপ্পনি দেবার চেষ্টা করে, যদিও তাতে কখনও কাউকে হাসতে দেখেনি।

তা বলে হাল ছাড়বার পাত্রী নয় অপাই। ছোটবেলায়, মানে বিয়ের আগে বাপের বাড়িতে, জোরে জোরে বা কথায় কথায় হাসলে কেউ কিছু বলত না। অপাইদের বাড়ির সব মেয়েদেরই বেবাক স্বাধীনতা। একটাই কথা--- হাসো, খেলো, খাও, গাও কিন্তু পড়ো, পড়তে হবে। সেইভাবে বড় হতে হতে অপাই যখন সুবাসিত সুভাষিত টোগো চৌধুরীর প্রেমে পড়েছিল তখন সেটাতেও কারও তেমন অসুবিধে হয়নি।
ওই টোগো নামটা। ওটা শুনেও প্রথম দিন সে কী হেসেছিল অপাই। টোগো মানে কী? হিহি, টোগো কারও ডাকনাম হয়? এ তো বাড়ির পুষ্যির নাম। হেসেই অস্থির অপূর্বা।

সে-হাসিতে বা সে-পরিহাসে টোগো কিছু মনে করেছিল কি না, সেটা বিয়ে করার আগে বুঝতে পারেনি অপাই। বিয়ের পরে দেখল মেয়েমানুষের নাকি হাসির নির্দিষ্ট বয়েস আছে, সে বয়েস ও সীমারেখা দুইই অপাই পেরিয়ে গেছে, তা নিজেও বোঝেনি।

এখন অপাই অনেককিছু বোঝে, কিন্তু হাসি সামলাতে পারে না সবসময়। তার মানে এই নয় যে, সে সবেতেই হাসে। উঁহু, ধরো তার শ্বশুরবাড়ির সকলে যখন হাসে তখনও সবসময় হেসে উঠতে পারে না সে। হাসি ম্যাচ করে না। তখন আবার অন্য সমস্যা। এই হাসির টিউনিংটা দুবছরেও যে ঠিক হলো না সেটা বউ হিসেবে তারই দোষ নির্ঘাত। তবে অপাই পজিটিভ থাকতে চায়, হয়তো একদিন সবার রঙে রঙ মেলানোর মতো শ্বশুরবাড়ির হাসিতে হাসি মেলাতে ঠিকই পারবে সে। হাসার আশায় ভবে আসা--- এখানে ভব মানে শ্বশুরের ঘর, এইরকম ধরে রেখেছে অপাই।

#
রাতে খাবার টেবিলে টোগোকে তার মা বললেন, শোনো তোমার মাসিশাশুড়ি এসেছিলেন, মেয়ের বিয়ের নেমন্তন্নো করতে।

টোগো সপ্রশ্ন তাকায়। জেঠু, মানে অপূর্বার জাঠশ্বশুর মুর্গি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলেন, সগুষ্টি মাথা মোড়াবার সময় তো হবে না আমাদের। কিছু একটা পাঠিয়ে দিও। পরিস্থিতিটা সিরিয়াস, একটা জবরদস্তি অবিচারের দিকেই যাচ্ছে--- কিন্তু মাথা মোড়াবার কথাটা শুনে জাঠশ্বশুরের ন্যাড়ামুন্ডি চোখে ভেসে ওঠা রোধ করতে পারে না বধূ। ফিক করে হেসে ফেলে। স্বার্থরক্ষা করতে ইমোশনকে, মনোভাবকে কী করে দমন করতে হয় ও জানে না। বাকিরাও জানে এমন নয়। তাদের অবিশ্যি প্রয়োজনই নেই দমন করার। চাপা গলায় শাশুড়ি বলেন, ছেনাল মেয়ে, শ্বশুরদের সামনে হাসছে দেখো! বাড়ির কোনও শিক্ষা আছে ওর?
কিন্তু ডিম্পির বিয়ের এক সপ্তাহ আগে অপাই ধরে পড়লো টোগোকে।
রাতের বেলায় মাঝে মাঝে টোগোর মেজাজ এক একদিন ভাল থাকে। সেইরকম একদিন অপাই বলল, এই শুনছো, আমি নাইয়র যাবো প্লীজ।

নাইয়র কী টোগো চৌধুরীর জানার কথা নয়। বুঝিয়ে বলে অপাই, বলে আব্বাসউদ্দিনের গানের কথা। পূর্ববাংলার মেয়েরা কেমন নাইয়র যেতো, নৌকো চড়ে। আব্বাসউদ্দিন চেনে না টোগো, কিন্তু অন্তত শচীনকত্তার গানও কি...। কে যাস রে ভাটিগান বাইয়া, আমার ভাই-ধনরে কইয়ো নাইয়র নিতো...। না, তাও না। তবু অপাই খুব করে বোঝায় টোগোকে, হেসে হেসেই বোঝায়, এই তো শোনো না, ব্যারাকপুর থেকে দমদম কতোটা আর পথ। আমি স্কুল থেকে ফেরবার পথে চলে যাবো। দুদিন নাহয় বাড়ি থেকেই স্কুলে যাবো। সকলে আসবে দেখো ঠিক। অনু-পুপুল, রঞ্জিতাদিরা, টোটো-ঋজু, বাদলদারা। ইশ, আমার বুঝি ইচ্ছে করে না?

বর চুপ আছে দেখে একটু যেন আশা বেড়ে যায়। প্লীজ, প্লীজ, মা-মাসিরা সেই আইবুড়োভাতের আগের দিন আনন্দনাড়ু বানাবে, আমি দেখবো না যেন? আইবুড়োভাতেই তো বেশি মজা। এই যেতে দাও না গো। তুমি আসবে বিয়েবাড়িতে? জানো আমাদের জামাইবরণ হয় যে-কোনো কাজের বাড়িতে। আমি বেনারসী পরবো ঠিক, বিয়ের শাড়িটা তো পরিনি দু বছরে। চলো না প্লীজ যাই।

টোগো কেন কে জানে মত দিয়ে ফেলে অপাইয়ের এহেন মাসির-বাড়ির আবদারে। সারারাত আনন্দে ঘুমই আসবে না আজ অপাইয়ের। বাড়ি যাবে সে, বাড়ি, বাড়ি, বাড়ি যাবে। মায়ের কাছে রাতে থাকবে। মায়ের কাছে, মায়ের কাছে, উফ। কী যে আনন্দ, কী যে হাসি।

কতদিন হয়ে গেল যেন? কী যেন গাইতেন মা, জল ফুরাইলে নিবেরে নাইয়র বাঁশের পালঙ লইয়্যা রে। না না, টোগোরা যেন কিছু মনে না করে, অপাই মাকে বলবে তাকে নিয়ে যাবার জন্যে কাউকে পাঠাতে, সবদিক বিচার করেই যেন পাঠায়, অনু বা বাদলদা কি ছোটমামা--- যারা নিতে এলে টোগোদের বাড়ির মান থাকবে, যার সঙ্গে নির্দ্বিধায় পাঠানো যাবে বাড়ির বউ। এ-বাড়ির একটা প্রেস্টিজ আছে, হ্যাঁ, যার তার সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষি করে বাড়ির বউ...

এইটা ভেবে অপাইএর আবার কুলকুলিয়ে হাসি পায়। সে যেন কী, রোজ দুবেলা লেডিস স্পেশ্যালে চড়ে চাকরি করতে যাচ্ছে, অথচ বাপের বাড়ি যেতে পারবে না। হিহি। বালিশে মুখ গুঁজে হাসি আটকায় অপাই। জগৎ জোড়া হাসি নানাবিধ। ফুল সে হাসিতে হাসিতে ঝরে, জোছনা হাসিয়া মিলায়ে যায়, ইত্যাদি।

#
আজ সেই ডিম্পির বিয়ে। আজ অপূর্বা প্রচুর হাসছে, সকলেই হাসছে যদিও। পরের বার কার ল্যাজ কাটা যাবে সেই নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে এখন। ফুলমামি ডাকতে এলেন। হলুদ বাটতে হবে, এই এয়ো মেয়েরা আয় দেখি, শিল ছুঁয়ে বসবি তোরা। পুপুল টুটুল রঞ্জিতা অপাই আয় দেখি তোরা।

বড়লোকের বাড়ির বউ বলে, ডাক্তারের বউ বলে অপাইয়ের বেশ আদর এদিকে। তার নতুন হলুদ ঢাকাই জামদানী শাড়ি আর অকারণ সোনার গহনায় সেই বৈবাহিকের প্রতি আদর ঝকঝক করে। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়া সেই আদরেরই ভ্যালিডেশন, অপাই জানে না কিন্তু হাসিটাও অপাইএর অভ্যাস হয়ে গেছে। ও নিজে টের পায় না, পোষাক এবং জীবনযাপনের চমকের নীচে অন্যরাও পায় না । টোগোও খেয়াল করছে না কিছুই, আজকাল অপাইয়ের হাসিতে ডুশেন মার্কার নেই। ডুশেন মার্কার, মানে মেডিক্যালি বুঝে নাও হাসি কতটা আসল। শাড়ি অঙ্গরাগ অলঙ্কারে অপাই নরম নির্মল, খালি ঠোঁট আর নাকের দুপাশে সেই হাসি আটকে আছে। টোগো ডাক্তার, তার না বোঝার কারণ কিছু ছিল না যদিও ।
এখন হাসতে হাসতে মা-মাসি-মামি বলেন, ওরে নিজেরাই হাসছিস, আমাদেরও সঙ্গে নে। ততক্ষণে হলুদ খেলা শুরু হয়ে গেছে। রং মাখাচ্ছে যে যাকে পারছে। নানা রকম হাসির আওয়াজ, উৎসারিত ঝরণার মতো উছলে ওঠে। এর ফাঁকে মেয়েদের আলতা পরা, বিচিত্রচিত্র বেণি বাঁধার তাম্বুলকরঙ্কবাহিনীরা বন্যার জলের মতো ভেসে আসে। বরের বাড়ির তত্ত্ব-আনা ছেলেদের কিঞ্চিৎ নাস্তানাবুদ করা হয়। অপাইয়ের মা কানে কানে এসে বলেন, ও মানিক, আজ দুপুরে চল তোকে খাইয়ে দি। কতদিন কাছে আসিস না, কেমন রোগা হয়ে গেছিস মা তুই। অপাই ফের উজ্জ্বল দাঁতে হাসে, রোগা? হিহি। কী যে বলো মা, কত কষ্টে ওয়েট কন্ট্রো...

ভাতের নীচে বড় রুই মাছের পেটি লুকিয়ে চুপিচুপি মা খাইয়ে দেন তার অপাইকে । খেতে খেতে অপাই ফিসফিসিয়ে বলে মাকে ওকে একটু আসতে বলো না। এত লোক আসছে, ও না এলে হয়?

সুতরাং অপাইএর মা ফোন করেন ডাক্তার টোগো চৌধুরীকে। বাবা তুমি কখন আসবে? সেকী না এলে কি হয়? মেয়ে এমন একা-একা, সব্বার মেয়ে-জামাই এসেছে বাবা, লোকে আমাকেই বা কী বলে অপাইকে কী বা বলে। ওপাশে টোগো চৌধুরী চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, আপনার মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি ফিরে আসতে বলুন, মেয়ে জামাই তবেই একসঙ্গে যাবে। আসতে বলুন, আসুক সে ,তারপর ভেবে দেখছি।

হতাশ মুখে অপাই তাকায় ,তার যে সারা করে বেনারসী পরা হয়ে গেছে। দুপুরের খাওয়া হলেই সাজ শুরু হবে। ডিম্পি ওকে বলেছে ও যেন সবসময় ডিম্পির সঙ্গে সঙ্গে থাকে। কিন্তু এখন দমদম যেতে গেলে আর তো সাজ হবে না, সংসারের সায়ংকৃত সেরে বিয়েবাড়ি কী আর যাওয়া হবে। সুতরাং ফোনেই এক চোট মানভঞ্জনের চেষ্টা করে ক্ষান্তি দেয় অপূর্বা। তারপর মন দিয়ে মস্তবড় খোঁপা বাঁধে নেলিমাসির কাছে। ফুল জড়ায়, সোনাদানার গহনা পরে। কাজল পরা চোখ থেকে কিছু অকারুণিক দৃষ্ট্যাস্ত্র।

#
ফুল-সাজানো গাড়িতে টোপরধারী বর এসে গেলে খুব একচোট টাগ অফ ওয়্যার খেলার পর ডিম্পির পাশে দাঁড়িয়ে অভ্যাগতদের য়াসুন বসুন করতে শুরু করলো অপাই। ওই তো মন্দিরতলার মেজদাদুরা। দাদু এই দিকে, অপাই ডাকে। ডিম্পির কলেজের অফিসের বন্ধুরা সব। কলেজের বন্ধুরা বলে অ্যাদ্দিন ধরে যে অপাই নামটা রেখেছিস, কীসের জন্যে অপাইদি। কী পাসনি, কী পাওয়ার ইচ্ছে, অ্যাঁ। অপাই স্বভাব মতো হেসে গড়িয়ে পড়ে। বলে যেদিন পেয়ে যাবো আমায় পাই-দি বলেই ডাকিস। আবার একপ্রস্থ হাহা হিহি। সামান্য কথা, তুচ্ছ রসিকতা, কিন্তু টিউনিং মিলছে। দু’পক্ষই তাই কুটিপাটি। এই যৌবনের ধর্ম এটাই, হাসি, অকারণ হাসি, অকারণে চঞ্চল। শ্বশুরবাড়িতে এত হাসা যায়? আজ সব বকেয়া চুকিয়ে নিয়ে হাসছে অপাই। কুলকুল করে ভসভস করে, উঠছে হাসি সোডার মতো পেট থেকে। এই হাসির মাঝামাঝি অপাই দেখতে পেলো টোগোর গাড়িটা ঢুকছে।

টোগোও গম্ভীর, টোগোর গাড়িও গম্ভীর। তবু আনন্দ হয় অপাইয়ের, ঝরঝরিয়ে হাসতে হাসতে সে এগোয়। ইশ, কতদিন বাদে দুজনের নিমন্ত্রণ, দুজনেই যেখানে খুবই আকাঙ্ক্ষিত। টোগো এসেছে, কী যে খুশি অপাইএর। কিন্তু টোগো খুশি নয় কেন? অপাই হাত ধরে টানে, চল চল বউ দেখবে। মুখে একটা ৫ ওয়াট এলিডি আলো জ্বেলে টোগো সকলের সঙ্গে পরিচিত হয়। টোগোর হাসিতেও ডুশেন মার্কার নেই। তবে কী দুজন দুজনের কাছে হাসি শিখছে? সাইকোপ্যাথের স্মাইল।

বন্ধুদের দঙ্গলে সে আরও এক ঝামেলা। আধুনিক পৃথিবী ছেলে মেয়েরা যে ভাবে মেশে, তেমনই তাঁরা অভ্যর্থনা জানালো টোগোকে। হাহাহোহোহিহি। এক্সট্রা খাতির তত নয়, গম্ভীর সমীহের বদলে হুল্লোড়ে সম্ভাষণ কিন্তু আন্তরিক। আইয়ে বৈঠিয়ে জনাব, এক এক হো যায়েঁ? খর চোখে যখন এই প্রগলভ জমায়েতটি মাপছে টোগো, একটা অল্প বয়সী ছেলের হাত ধরে দুদ্দাড় করে অপাই এলো টোগোর কাছে। বলল, এই শোনো শোনো, সেই যে তোমায় বলি না, আমার নীলুভাই, এই যে এই দেখ আমার নীলু। কত বড়োটি হয় গ্যাছে। আমাদের বিয়েতে একগাদা ছবি তুলল, মনে আছে তোমার?
টোগোর মাথা সাত-আট ডিগ্রি হেলল, কলার-পরা স্পন্ডিলোসিস-রুগির মতো। অপাই বলল, এই তুমি একটু আলাপ করো না গো সকলের সঙ্গে। সবাই তোমার সঙ্গে কথা বলার জন্যে ওয়েট করছে। তুমি একটু কথা বলো, কেমন, আমি এক মিনিট আসছি। এই নীলু, চল ডিম্পিদিদি একা বসে আছে না, চল যাই।

#
সৃজনী খবর আনলো জিজু তোমায় ডাকছে অপাইদি। লনে। কী নাকি জরুরি দরকার।
লুক। ঠিক মিনিট দশেক পরে আমরা খেয়ে বেরিয়ে যাবো।

অপাই এই কথাতেও হাসে। তাই হয়? কী বলো! ইশ, কুসুমডিঙা দেখবো না? অন্ততঃ শুভদৃষ্টিটুকু...
না! না মানে না। ছেনাল মেয়ে, নষ্ট চরিত্র। মা তখনই বলেছিল যে মেয়েকে বিয়ে করবি, সে মেয়ে যেন প্রেমটেম না করে, তা নয় এখানে নবনারীকুঞ্জর খুলে বসেছে। এক মুহূর্ত এখানে থেকে আর নিজের রঙ দেখাতে হবে না, নোংরা মেয়েছেলে। চল বাড়ী চল।

অপাইয়ের ঠোঁটে তখনও আগের হাসিটার রেশ। অত চটপট গালের পেশি গুটিয়ে নিতে পারেনি, ওই অবস্থাতেই জল চলে এল গড়িয়ে। ভাইবোনেরা শুনতে পেল, সব? নষ্ট, নোংরা, সব কিছু? মাসিরা শুনল, মামিরা, দাদুরা? ডিম্পির বন্ধুগুলো?

হাসতে হাসতেই অপাই গিয়ে দাঁড়ায় ডিম্পির কাছে, ডিম্পিরে পেটে বড় ব্যথা বেড়েছে, সারাদিন হুল্লোড় কি আর সয়। আমি এখন চললাম, রেস্ট নিয়ে কাল সকাল সকাল বাসিবিয়ের আগে চলে আসবো। রুই মাছের মাথাটা তো আমিই ভাজবো। আজ চলি রে।

মেজোমাইমা বলেন, সে কী কিছুই তো খেলি না, এমন পেটব্যথা! দাঁড়া খাবার প্যাকেট করে দিই। আরে না না, প্যাকেট কী হবে বলে আরও অনেকটা হাসি খরচ করতে গেল অপাই, কিন্তু মেজমাইমাকে নিরস্ত করা কি মুখের কথা! হাসি বৃথা গেল।

#
প্রথম থাপ্পড়টা খেলো অপাই গাড়ীতে উঠেই।
ঠাস করে বাম গালে চড়, নথ পরেছিল, খানিকটা ছিলে গেলো চামড়া। ভিখিরির মেয়ে, খেতে পাস না তুই, বাপের বাড়ির খাবার বেঁধে নিয়ে যেতে হয় তোকে? ভিখিরির বাচ্চা।

দীর্ঘ রাস্তায় আর কোনও কথা হয় না। বাড়ির পোর্চে আলো জ্বেলে দাঁড়িয়েছিলেন শাশুড়ি, ছেলেকে দেখেই ফোড়ন দিলেন। কী, দেখে এলে তোমার বউয়ের কীর্তিকলাপ, আমি বললে তো বিশ্বাস হয় না। এখন নিজে দেখো। বলতে বলতে ওদের দুজনকে এগিয়ে দিলেন ওদের শোবার ঘরের দরজা অবধি। ঘরে ঢুকে টোগো বউয়ের বাম হাতটা মুচড়ে দিয়ে, অন্তহীন মোচড়াতে মোচড়াতেই বলল, কী রে খানকি মাগি, সবাই তোর ভাই, তাই না রে? শালি লুচ্চামির জায়গা পাসনি।

বাম হাতে অসম্ভব লাগছিল, অসহ্য ব্যথা লাগছিল অপাইএর। ভয়ে বুক শুকিয়ে আসছিল। ভয় পেলে কেঁদে ফেলাই ঠিক। গত দু’বছর তো এদের ভয় পেয়েই বেঁচে আছে অপাই। তবু হি হি হি হি হাসির শব্দে অপাইয়ের দিকে চমকে তাকায় টোগো আর তার মা। অপার্থিব হাসছে অপাই, উপুড় হয়ে ফুলে ফুলে। ভয় পাওয়ানো হাসি। হাতটা ভেঙে গ্যাছে এমন লটপট করছে। তবু হেসেই চলেছে। আশ্চর্য, ওর তো কাঁদা উচিত ছিল, প্রাণভিক্ষা চেয়ে। টোগো সাবধানে পা টিপে পাশের ঘরে সরে যায়, বংশে পাগলামি ছিল নাকি শালা? আচ্ছা, গুড হেভেনস, ওই গ্রাউন্ডে ডিভোর্স পাওয়া যাবে না?

ওই সময় কেউ যদি দেখত অপাইয়ের হাসিমুখটা, দেখত ফিরে এসেছে ডুশেন মার্কার। পাগলামির হাসি নয়, কপট অভিনয় নয়। একেবারে আগমার্কা দিলখোলা হাসি। না হেসে করবেই বা কী অপাই--- এই প্রথম সে আবিষ্কার করল, ডাঃ সুবর্ণ চৌধুরীকে বউ পেটাবার সময় যে পুরো স্টেশনমোড়ের কাঞ্চনপাগলের মতো লাগে। সেই চোখে পিঁচুটি, ঠোঁটের কোণে থুতু, শ্বদন্ত দেখা যায়... অবিকল।

সুতরাং অপাই হাসে, হাসতেই থাকে। হাসিতে হাসিতে আলোক সাগরে, আকাশের তারা, ইত্যাদি। দুনিয়ায় হাসির অভাব নেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ