হ্যাঁ, রাজন তার দুই হাত ধরলেই, তার বুকে আলতো মাথা রাখলেই নিজেকে রাজকন্যা মনে হতো। বুকের ভিতর সবগুলো অলিন্দ-নিলয় গোলাপের পাঁপড়ি দিয়েই শুধু ভরে যেত তা নয়; তার হৃদয় ভরে উঠত স্বচ্ছতম শিশিরভেজা ঘাসের সাথে লাখ লাখ রক্তসম গোলাপের সতেজ ঘ্রাণে। রোজানার গালগুলোতে গোলাপের রক্তিমাভা ভর করত। তার ফুসফুসে যে অক্সিজেন প্রবেশ করত তা যেন যুগ যুগ ধরে পরিশুদ্ধ আর সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছিল পাহাড়ের ঘন গাছ-গুল্মের ফাঁকে ফাঁকে। পৃথিবীতে এখন সেই একমাত্র ঐশ্বরিক অনুভূতিকে, রাজনের ভালোবাসাকে সে ভয় পায়। জীবন যুদ্ধে ধাক্কা খেতে খেতে সে জেনে গেছে – ভালোবাসার ওমন অনুভূতি জন্মালে জীবনকে কি ভয়াবহ মাশুল দিতে হয়। এখনো যেমন দিচ্ছে। কারো ভালোবাসা আর প্রবল কামনার দুই হাত তাকে আঁকড়ে ধরছে, তাকে ধীরে ধীরে উন্মোচন করছে আর সে কিনা পৃথিবীর সব অন্ধকার আর হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে। ভালোবাসার শিহরন, ভালোলাগার অনুভবের পরিবর্তে তার কোষে কোষে যেন বিষ ঢুকে যাচ্ছে। জগতের সমস্ত অন্ধকারকে সে আকুল করে আপন করতে চাইছে। সে প্রাণপণ স্বাভাবিক থাকার অভিনয়ের চেষ্টা করছে যেন সেই মানুষটা দুঃখ না পায় যে তার এখন একমাত্র আশ্রয়। বাসর ঘরে জীবনের আনন্দঘন এক মুহূর্তে এমন ভিতরকে তছনছ করে দেওয়ার অভিযোজনে অভিযোজিত হওয়ার কসরত একজন নারীকেই করতে হয়। সেই নারী যে কাউকে একবার ভালোবেসে তাকে হারিয়ে ফেলে। এই মুহূর্তকে সামাল দিতে না পারা এবং পারার যন্ত্রণায় সে ভিতর থেকে রাজনের উপর ফুঁসে ওঠে মনে মনে আবার তার কাছেই হৃদয় আশ্রয় খুঁজে ফিরে। সে কি রাজনকে ঘৃণা করে?
প্রশ্নটা মনের মধ্যে উঁকি দিতেই তার চোখের কোণ অশ্রুতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রাণপনে তা লুকাতে লুকাতে সে নিজেকেই তার উত্তর দেয়,
হ্যাঁ, আমি তাকে ঘৃণা করি। সে তো জানে না, কীভাবে কাঁটা হয়ে গোলাপটাকে রক্ষা করতে হয়।
এ কথা নিজেকে বলতেও কষ্ট হলো রোজানার। না, সে কোনোভাবেই রাজনকে ঘৃণা করতে শিখেনি। বরং তার শরীরের প্রতিটা কোষ রোজানার এই ভাবনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চাইছে। এই যে রোজানার বাইরের শক্ত পাপড়ির বিপরীতে নরম, লকলকে, কোরকের ভিতর থেকে চোখ মেলে তাকানো পাপড়িগুলো যা সে সব সময় রাজনের জন্য পৃথিবীর আর সবকিছু থেকে আড়াল করে রাখত তারা এখন দলিত-মথিত হতে হতে অন্য কারো হয়ে যাবে। রাজন কি এখন আনমনা? নির্জন টিলাটায় একা একা বসে বসে দূরের মাঠ-দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে?
রোজানা রাজনের আত্মা-সত্তা থেকে কিছুতেই বিযুক্ত হতে পারছে না! নিজেকে মেহেদির কাছে সমর্পণ করলেও ঘোমটার আড়ালে সে রাজনকে নিয়েই ব্যস্ত। ততক্ষণে ঘোমটার অবগুণ্ঠন তো বটেই তার মোমের মতো গোলাপী আভার শরীর অনেকটাই নগ্ন। জগতের শ্রেষ্ঠ কোনো সৌন্দর্য দেখে উন্মত্ত মেহেদি তখন ভুলে গেছে এই জগতে তার অবস্থান, পৃথিবীর ঘুর্ণন গতিতে মহাবিশ্বের ঠিক কোন সময় অতিক্রম করছে। এই দেশে আসার জন্য মোবাইলে মেহেদিকে ভালোবাসার কথা শুনিয়েও শরীর-মনের কোথাও সেই বিশ্বাসকে স্থাপন না করতে পারার খেসারতের মূল্য এত বেশি! মুখ যাকে এত এত ভালোবাসার কথা শুনিয়েছে তার মনের চোখ এখন দেখছে, তার শরীরটা ক্ষুধার্ত বাঘের মতো কেউ তছনছ করছে। রোজানা দেহ থেকে মনকে আলাদা করেছিল লজ্জার অভিনয় দিয়ে। সমস্যা হলো তখন যখন মেহেদি বলল,
ভালো লাগছে? আনন্দ পাচ্ছ না, বউ!
সে কারো বউ হয়ে গিয়েছে? রাজন আর কোনোদিন মায়াভরে তার হাতটাও ধরতে পারবে না? বাইরে কি চাঁদের আলো -এই শীতের শহরে? এমনি মায়াবী আলোয় রোজানার হাত ধরে রাজন বলেছিল,
তোমাকে ধরলেই মনে হচ্ছে চাঁদের রূপালি আস্তরণে ভাসা এই প্রকৃতিকে জড়িয়ে আছি। পৃথিবীর যা কিছু দেখে আশ্চর্যরকমের ভালো লাগায় পাগল হওয়ার যোগাড় হয় -কেন আমার মনে হয়, তোমার চোখে চোখ রেখে সুন্দর এই হাত দুটো ধরলেই তার সবটুকু পেয়ে যাব। কেন তুমি আমার এত চেনা, এত আপন? অথচ এত অচেনা!
রাজনের চেনা আর খুবই আপন এই জগতটা এখন অন্যের কতটা দখলে -জানলে সে কি কষ্ট পাবে? নাকি রাজনের দয়ালু হৃদয়টা অনেক দূর থেকে যে বেদনায় ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরিয়ে ক্লান্ত, তাই-ই এসে তার সত্তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আকুল করে তুলছে? রাজনের এমনতর পরাজয়ে রোজানার এখন মরে যেতে ইচ্ছা করছে!
শহর ছেড়ে প্রাচীন ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরটাকে ডানে ফেলে এই নির্জন টিলা ছিল তাদের ভালোবাসার সব কথনের সাক্ষী। সামনে ছিল দিগন্ত। ফসলের মাঠে দুই একটা একলা গাছ নিজের ছায়া গায়ে মেখে নিজেদের ডালপালায় বাতাস নিয়ে মেতে থাকত। তারা যেমন মেতে থাকত একে অন্যের চোখের মায়ায়, কথা আর স্বপ্নের খেলায়।
যেদিন রাজনের অজান্তেই মেহেদির সাথে তার বাগদান হয়ে গেল তার পর থেকেই রাজনের পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতির কথা ভেবে নিজেকে সামলাতে পারল না রোজানা। সে জ্ঞান হারিয়েছিল। রাজন তাকে কীভাবে হাসপাতাল পর্যন্ত বয়ে এনেছিল তা কখনো শুনতে চায়নি রোজানা। জানতেও পারে নি কখনো। তার পর থেকেই এই জ্ঞান হারানোর রোগ না স্বভাব -কিছু একটা পেয়ে বসেছে রোজানাকে। ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস তোলা এক পুরুষকণ্ঠ তখন রোজানাকে জিজ্ঞাসা করছে,
মজা পাচ্ছ না, বউ?
এটা কার কণ্ঠ? রাজনের? না, রোজানার মনে পড়ল আজ তার বাসর রাত। মেহেদি নামের একজন পুরুষ টিলাটার সামনের সেই দিগন্তে গাছগুলোর বদলে ছেড়ে দিয়েছে অনেক নেকড়ে। যারা ঘাস নয় মাংস খুঁজে ফিরছে তার বাঁকে বাঁকে। মেহেদির প্রশ্নের কিছু একটা উত্তর দিতে গিয়ে চোখের জল যখনই লুকাতে সে সক্ষম হলো, তখন তার আর কিছু মনে নেই। মাঝে মাঝে রোজানার জ্ঞান হারানো সেই রোগটার কথা স্বামী-প্রবর না জেনে বীরত্ব জেগে ওঠা হাতগুলো থেকে রোজানাকে মুক্ত করল। নিজ শরীরের ঘাম-মাখা প্রিয় নারীর শরীরের ভাঁজগুলোকে স্পষ্ট করতে রোজানার ত্বক যেন জ্বলে জ্বলে উঠছে। তার বিস্রস্ত এলোমেলো চুল, হাতের আঙুল আর ক্লান্তিতে নুয়ে থাকা বাহুদ্বয় এই বাসর বিছানায় এমন এক অবয়ব তৈরি করেছে যেন তা এই নশ্বর মর্ত্যের কোনো নারীর নয় বরং কোনো এক স্বর্গদেবীর। মেহেদি বিশ্ব জয় করার গৌরবে বুকের মাঝে অদ্ভুত এক তৃপ্তি আর আনন্দ বোধ করে। পরম তৃপ্তিতে তার প্রেমিকাকে, এক স্বর্গদেবীকে ঘুমিয়ে দিতে পেরে তার ঘর্মাক্ত পৌরুষ কিছুক্ষণ বিরতির পর আবার জেগে ওঠার প্রত্যাশায় তার দৃষ্টিতে ঘুমন্ত হলেও জ্ঞান হারানো রোজানার নগ্ন শরীরে, চিকচিক করা চুলে আলতো বিনুনি কেটেই চলে।
২.
রোজানার বাবার মৃত্যুর পর গ্রামটা হয়ে উঠল যেন আদিম এক বন্য জগত। যে গ্রামটার মানুষের মাঝে সম্প্রীতি আর বন্ধন নামের কিছু একটার আকড় বলে সে বাবার কাছ থেকে শিখেছিল, দেখেওছিল কিছুটা। এই যেমন তাদের কারো ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলেও শবে-বরাতে তারা ডালা ভরে পিঠাজাতীয় খাবার পাঠাত। সেই গ্রামটাই বাবার মৃত্যুর পর কেমন অচেনা হয়ে উঠল। কি তরুণ, কি বুড়ো সবাই যেন গ্রামের সব পথ ভুলে তার বাড়ির দরজা পেরিয়ে আঙিনার পর যে পুকুর তার শানবাঁধানো ঘাট, বসে থাকার মাচা- এসবেই কোনো এক ঘোরের বশে ঘুরে-ফিরে এসে বসছে, বিচিত্র সব কর্মকাণ্ড করছে। তাদের এইসব উদ্ভট কাণ্ডকীর্তি সরল আর নিষ্পাপ ততদিনই থাকল যতদিন তাদের মনের কোণে লুকানো উদ্দেশ্যটুকু রোজানা ধরতে পারল না এবং তাকিয়ে তাকিয়ে তাদের তাদের হাসি-তামাশা দেখার জন্য মাঝে মাঝে বাড়ির বাইরে এলো। যখন সে বুঝল, তরুণরা তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য উদ্ভটভাবে সময় নষ্ট করছে তখন থেকেই তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপ করাও বন্ধ করে দিল।
এর ফলাফল হলো আরো খারাপ। কস্মিনকালেও দশ গ্রামে এমন সুন্দরী তরুণীকে না দেখা তরুণরা এভাবে সময় কাটাতে অভ্যস্ত হওয়ার সাথে কীভাবে যেন নিজেদের পছন্দমতো সঙ্গীদের নিয়ে দল গঠন করল। বাংলাদেশে যেভাবে ব্যবসায়ীরা সিণ্ডিকেট তৈরি করে, রাজনীতিবীদরা প্রতিটি মানুষের মাঝে দলীয়করণের চেতনা সৃষ্টি করে, ধর্মান্ধ শ্রেণি স্রষ্টার সাথে মানুষের আত্মিক সংযোগ স্থাপনের পরিবর্তে মানুষকে ধর্মের উন্মত্তার সাথে সংযোগ মানসিক সংযোগ করানোটাকেই তাদের বড় সাফল্য মনে করে – সেইভাবে তারা রোজানার সৌন্দর্যকে আর তাদের কেন্দ্রবিন্দু না রেখে নিজেরা দুই দলে ভাগ হয়ে গেল। বয়সিরা দুই দলে বিভাজিত এই তরুণদের পরিণতি কী হয় সেই নাটক দেখে চিত্তবিনোদিত হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করল। যেমন করে তারা ভোটের দিন অপেক্ষা করে কোন একটা দলের উল্লাস এবং অন্যদের হতাশা এবং পরিশেষে গণ্ডগোল দেখার জন্য। যে স্থবির সমাজ নিজেদের পরিবর্তনে প্রগতিশীল নয়, যে সমাজে মানুষ সত্যিগুলোকে নিষ্ঠুরভাবে লুকিয়ে ফেলে এবং সত্য বললেই, সত্যের অনুসন্ধান করলেই যেখানে ক্ষণে ক্ষণে বিপদ অপেক্ষা করে, নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-কৃষ্টির চর্চা, জ্ঞানের অনুসন্ধান বিশাল পাহাড় অতিক্রমের মতো কঠিন বাধা হয়ে দাঁড়ায় –সেই সমাজে স্বয়ংক্রীয়ভাবে চিত্তবিনোদনের উপাদান হিসেবে আধিপত্যবাদের জন্ম মনে হয় এভাবেই হয়!
তরুণ দল নিজেদের সামর্থ্য এবং শক্তিমত্তা জানাতে রোজানার শোবার ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে রাতে টর্চের আলো ফেলতে শুরু করল। জানালার গ্রিলের কাছে মুখ নিয়ে কখনো ফিসফিস, কখনো কর্কশ স্বরে কু-প্রস্তাব দেওয়াই শুধু নয় সেই প্রস্তাবে রাজী না হলে তার ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে সাবধান করল রোজানাকে। কাকতালীয়ভাবে প্রতিপক্ষ অন্য দলটিও একই রাতে একই সাথে টর্চ নিয়ে তার জানালার কাছে এসে উপস্থিত হলো। রোজানার সাথে এমন গর্হিত কাজ করার জন্য তারা একে অন্যকে অকথ্য ভাষায় দোষারোপ এবং তর্কাতর্কিতে থেমে থাকল না। সেখানেই তারা মারামারিতে লিপ্ত হলো। রোজানার সাথে থাকতেন তার দূর সম্পর্কের এক মধ্যবয়সি খালা। তার চিৎকারে গ্রামের আনাচে-কানাচে বিচারের পাল্লা হাতে অপেক্ষা করা মুরব্বিরা সবার আগে ছুটে এলো। তাদের মধ্যে মইদুল, যে ধানের বোঝা কাঁধে নিয়ে গেরস্থের বাড়ি ফেরার পথেও রোজানাকে কল্পনা করত; গায়ে-গতরে বেশ শক্তিশালী। তার হাতের লাঠি সে লাঠিয়ালদের লাঠি খেলার ভঙ্গিতে প্রতিজন তরুণের পিঠে সপাং সপাং লাঠি চালাল,
খানকির পুত! কার বাড়িত ঢুকচিস তোরা, খেয়াল আচে? চাচা মরচে বল্যা কি হামরাও মরচি?
বলাবাহুল্য কথা বলার সময়ও তার চিকন গোছের লাঠিটা সবার পিঠে-পাছায় তাদের কলঙ্কের লম্বা দাগগুলো স্পষ্ট করতেই থাকল। মইদুলের লাঠি তখন তার একার নেই, যে যেমন করে পারে এই তরুণদের বেদম মারধর শুরু করল। অনেকেই লুঙ্গি ফেলে কোনোরকমে নিজদের প্রাণটুকু নিয়ে সেই রাতে শুধু বাড়ি নয়, গ্রামছাড়া হলো। এই ঘটনার পর রোজানার চাচা ঢাকা থেকে ছুটে এলেন দুই দলেরই পরাজয়ের প্রতীক একজন স্বতন্ত্র মানুষ হয়ে। সব শুনে বললেন,
এই গ্রামে আর থাকতে হবে না। সব গোছাও। গ্রামে যা আছে এখন থেকে সব আমি দেখব।
সেদিন থেকে তার চাচাই দায়িত্ব নিয়েছিল রোজানার। শিক্ষা বোর্ড পরিবর্তনের জন্য নবম শ্রেণিতে পুনরায় নতুন করে ভর্তি হতে হলো তাকে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠতে উঠতে গ্রামে ফিরে যাওয়ার পথটা দিন দিন সংকুচিত হয়ে এলো রোজানার। মায়ের মুখটা ভাসা ভাসা মনে পড়লেও বাবার সাথে ছিল তার অসংখ্য স্মৃতি। ছিল চৈত্রের শনশন মাঠ। তাদের পুকুরটার কালো জলে আকাশের ছায়াটা যেভাবে পদ্মের মতো ছবি হয়ে থাকত –সেসব মনে করে কেমন মন খারাপ লাগত তার। এরপর যতবার সে গ্রামে গেল ততবার অনুভব করল তার শিকড় সেখানে জলহীন হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। যদিও রোজানা অনুভব করল, গ্রামের সেইসব তরুণদের লোলুপ দৃষ্টি বদলে গেছে। কিছুটা অচেনা হয়ে ওঠা, উচ্চতায় তাদের অনেকের চেয়ে লম্বা রোজানাকে তাদের এখন গ্রিক ভাস্কর্য অথবা মোনালিসার মতো একজন নারী মনে হয়। যার দিকে সম্ভ্রমের সাথে তাকাতে হয় কিন্তু তাকে পাওয়ার চিন্তাটা অলীক এক স্বপ্ন ছাড়া তাদের কাছে আর কিছুই নয়। বাজার থেকে ফেরা মাতব্বর তাকে দেখে হাতের ভারী ব্যাগ রেখে বলে,
ক্যামকা আচ মা?
রোজানা তাদের এইসব আচরণে নিজেকে এই গ্রামে একজন আগন্তুক ভাবতে বাধ্য হয়। এই মাটির সাথে সে তার বিচ্ছিন্নতা বেশ টের পায়। এখানে এসে রান্না-বাড়া করে খাওয়া, আবর্জনা আর পাতার স্তুপে ভরে যাওয়া বাড়িটা, ঘর-বিছানা পরিষ্কার করিয়ে নেওয়া এগুলোও তাকে আগন্তুক অনুভূতিতে আরো তলিয়ে নেয়। কিন্তু এই স্মৃতিগুলোকে কোথায় সে সংরক্ষণ করবে? ঢাকায় তো নিজের কাছে এসব রাখার মতো আলাদা কিছু নেই!
চাচাত বোন প্রীতির ঘরে তাকে ভাগাভাগি করে বাস করতে হয়। সেখানে তার সারাজীবনের সব স্মৃতিকে নিয়ে বাস করা সম্ভব? বাবা-মা না থাকায় জীবনের সব স্মৃতিগুলোকেও বহনের মতো পরিস্থিতি এই পৃথিবী তার জন্য অবশিষ্ট রাখেনি। সে একজন নারী বলেই কি এমন হলো? বাবার পুত্রসন্তান হলে এই গ্রামকে আঁকড়ে তার জীবন কি আরো বিস্তৃত আরো শিকড়মূলে প্রোথিত হতে পারত না? এই প্রশ্নগুলো তার দীর্ঘশ্বাসকে প্রলম্বিত করে কোনো উত্তর খুঁজে পেতে দেয় না। শুধু বাস্তুচ্যূতির বেদনা আর হাহাকার তাকে আকুল কষ্টের সাগরে ভাসায়। চার বছরের মাথায় সে যখন পুনরায় এবং শেষবার তার চাচাকে নিয়ে গ্রামে এলো সেবার তার প্রিয় ওয়ারড্রবে পড়ে থাকা বাবা-মা আর তার নিজের কয়েকটা কাপড় শেষবারের মতো গুছিয়ে নিল। রোজানাকে ঢাকায় নিজের বাসায় রেখে তার দায়িত্ব নেওয়ার বিনিময়ে তার চাচা গ্রামের স্থাবর-অস্থাবর মিলে মোট সাড়ে সতেরো বিঘা পৈতৃক সম্পদ তাকে লিখে দিতে বললেন,
জমিজমা মেয়েদের নামে থাকা ভালো না, মা। গ্রামেও এখন ভয়াবহ রাজনীতি। সব হায়েনা। তোমার সব সম্পদ বেদখল হয়ে যাবে। আধি-পত্তন থুলেও দেখবা, কেউ তোমাকে টাকা-পয়সা কিছুই দিচ্ছে না। তোমার বাবা যদি সময় পেত তাহলে তোমার দায়িত্ব আমাকে নেওয়ার বিনিময়ে সব লিখে দিত।
রোজানা চাচার কথায় সায় দিল। বেশ আগে থেকেই তার চাচা কাগজপত্র সব প্রস্তুত করছিলেন। একদিন ভূমি অফিসে গিয়ে সে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দলিলগুলোতে শুধু স্বাক্ষর করে দিল। সেই সময়টায় তার আত্মার ভিতর কে যেন তরবারি চালাল। চৈত্রের শনশন মাঠের হাওয়ারা তার বুকের মধ্যে গুমড়ে গুমড়ে শুকনা পাতার শব্দ হয়ে বয়ে চলল। পরের দুই দিন-রাত রোজানার আর ঘুম হলো না। সে একা একাই রাতে বের হলো। মাঠের দিকে মুখ করে বসে থাকল। গাছের বাকলগুলো মায়াভরে ছুঁয়ে দিল। বাড়ির কাছের কদম গাছটাকে জড়িয়ে শরীর তেড়ে-ফুড়ে আসা হাউমাউ কান্নাকে লুকাতে শরীরের বাঁকে বাঁকে ঢেউ তুলল। সবাইকে অবাক করে পরদিন দুপুরে নিজেদের পুকুরে নেমে মেয়েটা অনেকক্ষণ ভেসে ভেসে থাকল। বিকেলে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে উঠে বসল। অষ্টম শ্রেণির দিনলিপির অবশিষ্ট পাতাগুলোর একটায় লিখল-
ক্যামকা আচ মা?
রোজানা তাদের এইসব আচরণে নিজেকে এই গ্রামে একজন আগন্তুক ভাবতে বাধ্য হয়। এই মাটির সাথে সে তার বিচ্ছিন্নতা বেশ টের পায়। এখানে এসে রান্না-বাড়া করে খাওয়া, আবর্জনা আর পাতার স্তুপে ভরে যাওয়া বাড়িটা, ঘর-বিছানা পরিষ্কার করিয়ে নেওয়া এগুলোও তাকে আগন্তুক অনুভূতিতে আরো তলিয়ে নেয়। কিন্তু এই স্মৃতিগুলোকে কোথায় সে সংরক্ষণ করবে? ঢাকায় তো নিজের কাছে এসব রাখার মতো আলাদা কিছু নেই!
চাচাত বোন প্রীতির ঘরে তাকে ভাগাভাগি করে বাস করতে হয়। সেখানে তার সারাজীবনের সব স্মৃতিকে নিয়ে বাস করা সম্ভব? বাবা-মা না থাকায় জীবনের সব স্মৃতিগুলোকেও বহনের মতো পরিস্থিতি এই পৃথিবী তার জন্য অবশিষ্ট রাখেনি। সে একজন নারী বলেই কি এমন হলো? বাবার পুত্রসন্তান হলে এই গ্রামকে আঁকড়ে তার জীবন কি আরো বিস্তৃত আরো শিকড়মূলে প্রোথিত হতে পারত না? এই প্রশ্নগুলো তার দীর্ঘশ্বাসকে প্রলম্বিত করে কোনো উত্তর খুঁজে পেতে দেয় না। শুধু বাস্তুচ্যূতির বেদনা আর হাহাকার তাকে আকুল কষ্টের সাগরে ভাসায়। চার বছরের মাথায় সে যখন পুনরায় এবং শেষবার তার চাচাকে নিয়ে গ্রামে এলো সেবার তার প্রিয় ওয়ারড্রবে পড়ে থাকা বাবা-মা আর তার নিজের কয়েকটা কাপড় শেষবারের মতো গুছিয়ে নিল। রোজানাকে ঢাকায় নিজের বাসায় রেখে তার দায়িত্ব নেওয়ার বিনিময়ে তার চাচা গ্রামের স্থাবর-অস্থাবর মিলে মোট সাড়ে সতেরো বিঘা পৈতৃক সম্পদ তাকে লিখে দিতে বললেন,
জমিজমা মেয়েদের নামে থাকা ভালো না, মা। গ্রামেও এখন ভয়াবহ রাজনীতি। সব হায়েনা। তোমার সব সম্পদ বেদখল হয়ে যাবে। আধি-পত্তন থুলেও দেখবা, কেউ তোমাকে টাকা-পয়সা কিছুই দিচ্ছে না। তোমার বাবা যদি সময় পেত তাহলে তোমার দায়িত্ব আমাকে নেওয়ার বিনিময়ে সব লিখে দিত।
রোজানা চাচার কথায় সায় দিল। বেশ আগে থেকেই তার চাচা কাগজপত্র সব প্রস্তুত করছিলেন। একদিন ভূমি অফিসে গিয়ে সে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দলিলগুলোতে শুধু স্বাক্ষর করে দিল। সেই সময়টায় তার আত্মার ভিতর কে যেন তরবারি চালাল। চৈত্রের শনশন মাঠের হাওয়ারা তার বুকের মধ্যে গুমড়ে গুমড়ে শুকনা পাতার শব্দ হয়ে বয়ে চলল। পরের দুই দিন-রাত রোজানার আর ঘুম হলো না। সে একা একাই রাতে বের হলো। মাঠের দিকে মুখ করে বসে থাকল। গাছের বাকলগুলো মায়াভরে ছুঁয়ে দিল। বাড়ির কাছের কদম গাছটাকে জড়িয়ে শরীর তেড়ে-ফুড়ে আসা হাউমাউ কান্নাকে লুকাতে শরীরের বাঁকে বাঁকে ঢেউ তুলল। সবাইকে অবাক করে পরদিন দুপুরে নিজেদের পুকুরে নেমে মেয়েটা অনেকক্ষণ ভেসে ভেসে থাকল। বিকেলে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে উঠে বসল। অষ্টম শ্রেণির দিনলিপির অবশিষ্ট পাতাগুলোর একটায় লিখল-
ভালো থেকো পুকুরের জল
ভালো থেকো কুয়াশার ঢল
ভালো থেকো চৈত্রের দিগন্ত
ভালো থেকো বিকেল, পড়ন্ত।
ভালো থেকো জোছনার ঘুম
ভালো থাকুক শিশিরের চুম।
ভালো থেকো কুয়াশার ঢল
ভালো থেকো চৈত্রের দিগন্ত
ভালো থেকো বিকেল, পড়ন্ত।
ভালো থেকো জোছনার ঘুম
ভালো থাকুক শিশিরের চুম।
আকাশ তুমি দীঘির জলে পদ্ম হয়ে থেকো
জোছনা তুমি তারাদের স্বপ্নের কথা বলো-
জোছনা তুমি তারাদের স্বপ্নের কথা বলো-
ভালো থেকো মায়া মায়া ভোর
ভালো থেকো ছায়া ছায়া ঘোর
ভালো থেকো অসীমের নীল
বেঁচে থাকুক আশা অনাবিল।
ভালো থেকো ছায়া ছায়া ঘোর
ভালো থেকো অসীমের নীল
বেঁচে থাকুক আশা অনাবিল।
সন্ধ্যা তুমি ঘোমটার আঁচলে বঁধূ হয়ে যেয়ো
দিগন্ত তুমি গোধূলিকে প্রেম শিখিয়ে দিয়ো-
দিগন্ত তুমি গোধূলিকে প্রেম শিখিয়ে দিয়ো-
শান্তিতে থাকুক মা-বাবার আত্মা
এমনিই থাকে যেন আমার গাঁ।
এমনিই থাকে যেন আমার গাঁ।
৩.
স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর রোজানা চাচার বাসাতেও একজন আগন্তুক হয়ে উঠল। চাচি তাকে আগের মতো আর খেতে ডাকতেন না। চাচাও রোজানার সবকিছুর ব্যাপারে উদাসীন হয়ে গেলেন। পরিস্থিতি এমন হলো যে, রোজানা অনুভব করল সে তাদের কাঁধের উপর একটা বোঝা। চাচাত বোন প্রীতিও বড় হয়েছে। তার নিজস্ব একটা ঘর লাগে বলে চাচি একদিন গলার স্বর চড়িয়ে চাচার সাথে ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলল এবং তা বলল এমনভাবে, যেন রোজানা স্পষ্টই বুঝতে পারে। রোজানা নিজের হাত খরচের জন্য একটা টিউশনি করত। চাচার এই বাড়িতে জমা কিছু স্মৃতি তেমন কিছু নেই, তবু তার নিজেকে আবার উদ্বাস্তু মনে হলো। রোজানা জীবনে এই প্রথম উপলব্ধি করল, বাস্তুভিটা হারালে, পায়ের নিচে নিজের জমি-ভূমি না থাকলে চাচা-চাচি তো বটেই সেই মানুষটাকেও এই আকাশ-মাটি-ভূমি সবাই বাস্তুচ্যূত বলে সাব্যস্ত করে। রোজানার আগাম জীবন নিয়ে ভাবতে গেলে, গ্রামের চৈত্রের মাঠটার মতো অজানা, রহস্যময়তার মতো আনন্দ-কল্পনা অথবা নতুন কোনো স্বপ্ন আর তার কাছে আসে না। চৈত্রের সেই নির্জন, ফাঁকা মাঠের দুপুরের রোদ-মরিচিকা অথবা শনশন হাওয়া অথবা সেই দিগন্ত ভোর রাতের শীত-শীতের হৃদয় হতে উষ্ণতাগুলো আর বয়ে আনে না। আনবে না। সে এখন বেঁচে থাকার নিশ্চিত আশ্রয় চায়। চায় আগামী দিনে তার পায়ের তলায় মাটিকে আঁকড়ে ধরে জীবনের বাকি দিনগুলো পার করে দিতে।
টিউশনি করে পড়ার পাঠ চুকিয়ে রোজানা চাকরির জন্য বেশ কয়েকটা ইন্টারভিউ দিল। কয়েক মাস না যেতেই দুই চাকরি থেকে তাকে ইস্তফাও দিতে হলো। চাচার বাড়িতে থেকে এতদিন পড়ালেখা করেছে সে। চাচার নিজের বাচ্চাগুলোর পড়াশুনা আর জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাচ্ছিল। রোজানা চাচ্ছিল দ্রুত তাদের বোঝা লাঘব করতে। সহজ হলে, সব কিছুকে মেনে নিলে সুন্দরী নারীর জীবন ঢাকায় বড্ড সহজ। একটু পারিবারিক মূল্যবোধ, অতীত স্মৃতির কাছে অথবা আগাম দিনের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাইলে রোজানাদের বড্ড সমস্যা। পুনরায় দ্রুতই সে চাকরি পেল। যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেল তাদের সিইও একদিন রোজানাকে ডেকে বলল,
আপনি তো দারুণ স্মার্ট। বাংলায় যাকে বলে, চরম সুন্দরী। এটা আপনার চাকরি পাওয়ার বড় কারণ, তা তো বুঝতে পেরেছেন? আপনাকে নিয়ে আমার বড় পরিকল্পনা আছে। ও হ্যাঁ, তার আগে আপনি আপনার চিফ এক্সিকিউটিভ সম্পর্কে জেনে নিবেন। আমার চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার হয়ে যাবেন।
লোকটাকে দেখেই রশুনের গন্ধে কেন রোজানার গা গুলিয়ে উঠল তা সে জানে না। সিইও সাহেবের ফুচকে দাড়ির সাথে মেলানো শয়তান টাইপের একটা হাসিতেও সে রশুনের গন্ধ পেল। অথচ মানুষটা প্যারিসের নকল সেন্ট ব্যবহার করেছেন যার গন্ধটা অত্যন্ত কড়া। একটা মানুষের সামনে গেলে এত বাজে অনুভূতি কেন হয় তার রহস্য খুঁজতে খুঁজতেও সে তাকেই, ‘হ্যাঁ স্যার, জি স্যার, জেনে নিবো নিশ্চয়ই …’ বলল। অফিসের আরো একজন ফিমেল এক্সিকিউটিভ সিইও সাহেবের ব্যাপারে এমন করে কথা বলল,
আপনি তো অনেক ভাগ্যবতী। স্যারের একটু সুনজর পাওয়ার জন্য এই মোরাল স্কুলের কত ছাত্রী আর আমরা যারা অফিসার; এত মরিয়া! আর তিনি কিনা জয়েন করতে না করতেই আপনাকে নিয়ে এত পরিকল্পনা করছেন?
রোজানার মনে হলো, মেয়েটা সিইও’র পক্ষে যেন দালালি করছে। নতুন, অচেনা এই জগতটা রোজানার আগ্রহকে উসকে দিচ্ছে। সে প্রশ্ন করল,
কী পরিকল্পনা?
আপনাকে নিয়ে স্যার মালয়েশিয়া যাবেন। আপনি তো অনেক সুন্দর! এমন গায়ের রং কি কোনো মানুষের হয়? শুটিং-এ আপনাকে ব্যবহার করবেন। স্যারের নাম আগে শোনেননি, তিনি তো পাবলিক ফিগার। বিরাট বড় ইউটিউবার। মোটিভেশনাল স্পিকার। রোজানা ঢোক গিলে বলল,
আচ্ছা?
আচ্ছা, আচ্ছা করছেন মনটা বেজার করে? আরে, খুশি হোন তো। দারুণ সক্ষম পুরুষ। আর একটা প্রস্তাব আছে, আপনি যদি স্যারের কথামতো চলেন, আপনার একাডেমিক রেজাল্ট তো ভালো, স্যার বলেছেন; আপনাকে এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বানিয়ে দিয়ে তিনি অন্য কাজে মনোযোগ দেবেন।
এসব কথায় ভয় পেলেও আরো কয়েকদিন সে সেখানে টিকে থাকার চেষ্টা করল। চাচার বাড়ি ছেড়ে সে হোস্টেলে উঠেছিল এবং সেখানে ফিরে যাওয়ার মতো মানসিক শক্তি অর্জনের চেয়ে এই নোংরা মানের একটা সিইও-কে মোকাবেলার শক্তি তখনো তার ছিল বলে মনে হলো। তবে, কিছুদিনের মধ্যে রোজানা জেনে গেল, প্রতিষ্ঠানটা একটা সাইন-সর্বস্ব অফিস। এর মালিককে খুব একটা দেখা না গেলেও সেই অন্তরালের মানুষ যে একজন ফটকা তাও সে বুঝল। সরকারি ঘুষখোর কর্তা যাদের প্রচুর টাকা কিন্তু ভয়ে ব্যাংকে তা ঢোকাতে পারছে না তাদের লগ্নির টাকাকে নয়-ছয় করার প্রকল্প ব্যতিত প্রতিষ্ঠানটি তেমন কার্যকর নয়।
বাইরের টিচারদের দিয়ে আইএলটিএস –এর ক্লাস নেওয়ানোর নামে চলে বস্তুত মেয়ে শিকার। দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠানোর নামে কোরিয়ান ভাষা শেখানোর কাজে মাত্র পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা বেতনের তাপিত একজন মধ্যস্বত্বভোগী ব্যতিত কিছু নয়। তার শিক্ষাগত যোগ্যতাও তেমন নেই। কিন্তু সিইও পদটাকে ব্যবহার করে গ্রামের হকারদের মতো ইউটিউবে ‘জীবন’, ‘সফলতা’, ‘সুখের সূত্র’ –এসব বিষয় নিয়ে কথা বলে। পার্থক্য একটাই হকারগণ কোনো একটা নকল আইটেম বেচার জন্য মানুষের মাথা ধোলাই করে আর তাপিত ইউটিউবে ফলোয়ার, ভিউইয়ার বাড়ানোর জন্য মানুষের আবেগ নিয়ে ইংরেজিতে শোনা বক্তৃতার ভুলভাল তথ্য দেয়। কার থেকে সে ইংরেজি বক্তৃতার অনুবাদ শোনে, কে জানে!
কয়েক মাসের মাথায় বেটেখাটো মোটিভেশনাল স্পিকার তাপিত দালাল টাইপের সেই মেয়েটার মাধ্যমে রোজানাকে বিছানায় নেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বসল। রোজানা ফুঁসে উঠল না। ভাবল কিছুক্ষণ। এই অফিসে চাকরি করা মেয়েগুলোর জন্য তার দুঃখ হলো। সেই দুঃখ তার চৈত্রের মাঠটাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা, শনশন-একলা দুপুরের সেই দিগন্তে ফেলে আসা সব স্বপ্নগুলোকেও সারাজীবনের হারিয়ে ফেলার দুঃখের চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে হলো। তারপর দৃঢ়ভাবে সে বলল,
আপনারা এভাবে নিজেকে না বিলিয়ে কলগার্ল হলেই পারেন। কাজটা সহজ। প্রতি ঘণ্টায় অনেক টাকা মিলবে। সারাটাদিন গোলামী, বন্দিত্বশেষে আবার নিজের শরীর দিতে হবে তাকে যার শরীর থেকে পূঁজের মতো রশুনের গন্ধ বের হয়। পাঁচ মিনিট সাত ইঞ্চির উচ্চতার সৌন্দর্য নিয়ে আমি না হয় কল গার্লগিরি করব –তাও সম্মানের। কিন্ত চাকরি করতে এসে কয়টা পয়সার লোভে বোরখা পরা এক্সিকিউটিভ সেজে কারো যৌনদাসী হতে পারব না।
রোজানা চলেই যাচ্ছিল। হঠাৎ কী ভেবে ফিরে এসে মেয়েটার মুখের উপর ঠাস ঠাস চড় মারতে না পেরে কট কট বলে বসল,
আমার এক ঘণ্টার পেমেন্ট আপনাদের সিইও’র বেতনের থেকে অনেক বেশি হবে, নিশ্চয়ই।
আপনি তো দারুণ স্মার্ট। বাংলায় যাকে বলে, চরম সুন্দরী। এটা আপনার চাকরি পাওয়ার বড় কারণ, তা তো বুঝতে পেরেছেন? আপনাকে নিয়ে আমার বড় পরিকল্পনা আছে। ও হ্যাঁ, তার আগে আপনি আপনার চিফ এক্সিকিউটিভ সম্পর্কে জেনে নিবেন। আমার চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার হয়ে যাবেন।
লোকটাকে দেখেই রশুনের গন্ধে কেন রোজানার গা গুলিয়ে উঠল তা সে জানে না। সিইও সাহেবের ফুচকে দাড়ির সাথে মেলানো শয়তান টাইপের একটা হাসিতেও সে রশুনের গন্ধ পেল। অথচ মানুষটা প্যারিসের নকল সেন্ট ব্যবহার করেছেন যার গন্ধটা অত্যন্ত কড়া। একটা মানুষের সামনে গেলে এত বাজে অনুভূতি কেন হয় তার রহস্য খুঁজতে খুঁজতেও সে তাকেই, ‘হ্যাঁ স্যার, জি স্যার, জেনে নিবো নিশ্চয়ই …’ বলল। অফিসের আরো একজন ফিমেল এক্সিকিউটিভ সিইও সাহেবের ব্যাপারে এমন করে কথা বলল,
আপনি তো অনেক ভাগ্যবতী। স্যারের একটু সুনজর পাওয়ার জন্য এই মোরাল স্কুলের কত ছাত্রী আর আমরা যারা অফিসার; এত মরিয়া! আর তিনি কিনা জয়েন করতে না করতেই আপনাকে নিয়ে এত পরিকল্পনা করছেন?
রোজানার মনে হলো, মেয়েটা সিইও’র পক্ষে যেন দালালি করছে। নতুন, অচেনা এই জগতটা রোজানার আগ্রহকে উসকে দিচ্ছে। সে প্রশ্ন করল,
কী পরিকল্পনা?
আপনাকে নিয়ে স্যার মালয়েশিয়া যাবেন। আপনি তো অনেক সুন্দর! এমন গায়ের রং কি কোনো মানুষের হয়? শুটিং-এ আপনাকে ব্যবহার করবেন। স্যারের নাম আগে শোনেননি, তিনি তো পাবলিক ফিগার। বিরাট বড় ইউটিউবার। মোটিভেশনাল স্পিকার। রোজানা ঢোক গিলে বলল,
আচ্ছা?
আচ্ছা, আচ্ছা করছেন মনটা বেজার করে? আরে, খুশি হোন তো। দারুণ সক্ষম পুরুষ। আর একটা প্রস্তাব আছে, আপনি যদি স্যারের কথামতো চলেন, আপনার একাডেমিক রেজাল্ট তো ভালো, স্যার বলেছেন; আপনাকে এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বানিয়ে দিয়ে তিনি অন্য কাজে মনোযোগ দেবেন।
এসব কথায় ভয় পেলেও আরো কয়েকদিন সে সেখানে টিকে থাকার চেষ্টা করল। চাচার বাড়ি ছেড়ে সে হোস্টেলে উঠেছিল এবং সেখানে ফিরে যাওয়ার মতো মানসিক শক্তি অর্জনের চেয়ে এই নোংরা মানের একটা সিইও-কে মোকাবেলার শক্তি তখনো তার ছিল বলে মনে হলো। তবে, কিছুদিনের মধ্যে রোজানা জেনে গেল, প্রতিষ্ঠানটা একটা সাইন-সর্বস্ব অফিস। এর মালিককে খুব একটা দেখা না গেলেও সেই অন্তরালের মানুষ যে একজন ফটকা তাও সে বুঝল। সরকারি ঘুষখোর কর্তা যাদের প্রচুর টাকা কিন্তু ভয়ে ব্যাংকে তা ঢোকাতে পারছে না তাদের লগ্নির টাকাকে নয়-ছয় করার প্রকল্প ব্যতিত প্রতিষ্ঠানটি তেমন কার্যকর নয়।
বাইরের টিচারদের দিয়ে আইএলটিএস –এর ক্লাস নেওয়ানোর নামে চলে বস্তুত মেয়ে শিকার। দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠানোর নামে কোরিয়ান ভাষা শেখানোর কাজে মাত্র পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা বেতনের তাপিত একজন মধ্যস্বত্বভোগী ব্যতিত কিছু নয়। তার শিক্ষাগত যোগ্যতাও তেমন নেই। কিন্তু সিইও পদটাকে ব্যবহার করে গ্রামের হকারদের মতো ইউটিউবে ‘জীবন’, ‘সফলতা’, ‘সুখের সূত্র’ –এসব বিষয় নিয়ে কথা বলে। পার্থক্য একটাই হকারগণ কোনো একটা নকল আইটেম বেচার জন্য মানুষের মাথা ধোলাই করে আর তাপিত ইউটিউবে ফলোয়ার, ভিউইয়ার বাড়ানোর জন্য মানুষের আবেগ নিয়ে ইংরেজিতে শোনা বক্তৃতার ভুলভাল তথ্য দেয়। কার থেকে সে ইংরেজি বক্তৃতার অনুবাদ শোনে, কে জানে!
কয়েক মাসের মাথায় বেটেখাটো মোটিভেশনাল স্পিকার তাপিত দালাল টাইপের সেই মেয়েটার মাধ্যমে রোজানাকে বিছানায় নেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বসল। রোজানা ফুঁসে উঠল না। ভাবল কিছুক্ষণ। এই অফিসে চাকরি করা মেয়েগুলোর জন্য তার দুঃখ হলো। সেই দুঃখ তার চৈত্রের মাঠটাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা, শনশন-একলা দুপুরের সেই দিগন্তে ফেলে আসা সব স্বপ্নগুলোকেও সারাজীবনের হারিয়ে ফেলার দুঃখের চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে হলো। তারপর দৃঢ়ভাবে সে বলল,
আপনারা এভাবে নিজেকে না বিলিয়ে কলগার্ল হলেই পারেন। কাজটা সহজ। প্রতি ঘণ্টায় অনেক টাকা মিলবে। সারাটাদিন গোলামী, বন্দিত্বশেষে আবার নিজের শরীর দিতে হবে তাকে যার শরীর থেকে পূঁজের মতো রশুনের গন্ধ বের হয়। পাঁচ মিনিট সাত ইঞ্চির উচ্চতার সৌন্দর্য নিয়ে আমি না হয় কল গার্লগিরি করব –তাও সম্মানের। কিন্ত চাকরি করতে এসে কয়টা পয়সার লোভে বোরখা পরা এক্সিকিউটিভ সেজে কারো যৌনদাসী হতে পারব না।
রোজানা চলেই যাচ্ছিল। হঠাৎ কী ভেবে ফিরে এসে মেয়েটার মুখের উপর ঠাস ঠাস চড় মারতে না পেরে কট কট বলে বসল,
আমার এক ঘণ্টার পেমেন্ট আপনাদের সিইও’র বেতনের থেকে অনেক বেশি হবে, নিশ্চয়ই।
সুতরাং একজন কলগার্লের হাত থেকে নৈতিক শিক্ষার মোরাল স্কুল বেঁচে গেছে এমন রটনা রটিয়ে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলে সেখানে কর্মরত কর্মীরা পুনরায় দিগুন উৎসাহে ইংরেজি-জাপানি-কোরিয়ান ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি তাদের নৈতিক শিক্ষাক্রম চালানোর জন্য ফেসবুক এবং ইউটিইউব পোস্টগুলোকে বুস্ট করতে থাকল।
৪.
দুই মাস যেতে না যেতেই রোজানার জমানো টাকা শেষ হয়ে গেল। ঢাকায় এসে পরিচিত হয়ে ওঠা দু-একজন বন্ধুর কাছ থেকে ধার চাইতে গেলে রাজু তাকে তার চাওয়ার দিগুন টাকা বিকাশে পাঠাল। রাতে ফোন করে রাজু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে বলল,
রোজা, আমাকে বিয়ে করতে রাজী না হও তাহলে আমি সত্যিই মরে যাব। এরপর ছেলেটা কাঁদল কতক্ষণ। জানাল, কী গভীরভাবে সে রোজানার প্রেমে মজেছে। রোজানা সেই রাতে কিছু না বললেও পরেরদিন তার টাকা বিকাশ করে ফেরত পাঠিয়ে দিল। যাকে তার ভাই-ভাই মনে হয় তাকে জীবনসঙ্গী বানানোর মতো বিড়ম্বনাকে সে মানতে চাইল না।
আরো দুই তিনটা জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি না পেয়ে হতাশ রোজানা শেষে একটা ডে-কেয়ার সেন্টার চালানোর দায়িত্বের বিজ্ঞাপন দেখে খুশি হলো। চাকরিদাতা ভদ্রলোক ইন্টারভিউয়ের দিন তাকে সামনে বসতে বলে অবাক হয়ে তাকে দেখল কিছুক্ষণ। ফিসফিস করে বলল, রোজানা! রোজা…
রোজানা ভদ্রলোকের চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। কিন্তু সেই দৃষ্টি তাকে বাজে অনুভূতির বদলে কেন চৈত্রের সেই মাঠের মায়ার মতো মনে হলো –তা জানে না রোজানা। তিনি প্রশ্ন করলেন,
আপনি তো অবিবাহিতা, মা হননি। তাহলে মা-হীনা বাচ্চাদের আপন করবেন কীভাবে? রোজানা উত্তর দিয়েছিল,
আমার অনুভব দিয়ে। কল্পনায় ওদের মা হয়ে।
এই প্রশ্নের উত্তর শুনে কেমন থ মেরে গেলেন ভদ্রলোক। তার চোখের দৃষ্টি গভীর আর নরম হয়ে এলো। সেখানে কি এক আবেগের খেলা দেখল রোজানা। ভদলোকের চোখের কোণ কি চিকচিক করছে? রোজানা চার বছর বয়সে মা’কে হারিয়েছে। সে নবম শ্রেণিতে থাকতেই তার বাবা একটা স্ট্রোক করলেন। ঊনিশ দিন কমায় থাকার সেই দুর্বিষহ দিনগুলোতে সমাজের মানুষগুলোকে কেমন নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল। এমন নিষ্ঠুর সমাজে তার সামনে বসা ভদ্রলোকের মতো আবেগপ্রবণ মানুষ কি আছে? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে রোজা। সে কি মানুষটাকে তার বাবার স্থানে বসিয়ে নিচ্ছে? কিন্তু রোজানা বুঝল, ভদ্রলোক তার চেয়ে মাত্র দশ-বারো বছরের বড় হবেন।
ওকে, রোজানা। আপনি সেন্টারটার দায়িত্ব নিন। আমার বাচ্চাসহ আর মাত্র তিনটা বাচ্চা। আমাদেরই আত্মীয়-স্বজনের। আমি খুব অবাক হয়েছি আপনার নামটা দেখে।
কেন স্যার?
আমার মেয়ের নামটা আপনার নামের মতোই। রোজা। আমি খুব ব্যস্ত থাকি। চাইব, বাচ্চা তিনটাকে আপনি নিজের মতো করে রাখবেন। বাই দ্য বাই, আপনি কোন এলাকায় থাকেন?
মোহাম্মদপুরের এক হোস্টেলে থাকি, স্যার।
আপনার পরিবার?
কেউ নেই আমার।
কথাটা বলেই অচেনা মানুষটার সামনে কেমন গলা ধরে এলো রোজানার। সে অনেক চেষ্টায় নিজেকে লুকাল। কিন্তু তার চেয়েও অধিক চেষ্টায় নিজের আবেগ লুকাতে ভদ্রলোক কি আসন ছেড়ে চলে যাবার সময় চোখ লুকিয়ে বললেন,
আগামীকাল থেকেই যোগদান করুন।
পরেরদিন সকাল আটটায় চাকরির নথিভূক্ত করতে কাজগপত্র নিয়ে এলো রোজানা। কাগজগুলো হাতে নিয়ে ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাকে বললেন,
আমার স্ত্রীর নাম ছিল নীলিমা। তবু, নিজের নামের সাথে নয় – মেয়ের নাম রেখেছিল সে আমার নামের সাথে মিলিয়ে। রাজনের মেয়ে রোজা।
কিন্তু ছিল কেন? রোজানার নিরীহ চোখের ভীত ভাষায় একসাথে অনেক প্রশ্ন জমে তা আরো মায়াময় করে তুলল। সে জিজ্ঞেস করল,
ছিল মানে স্যার, ম্যাডাম নেই…?
আমারও আপনার মতো এই পৃথিবী হঠৎ-ই শূন্য হয়ে গেছে। জগতে আমার আপন আর কেউ নেই, রোজানা। আছে শুধু আমার মেয়েটা। রোজা!
প্রথম দেখাতেই মানুষটার গভীর চোখে লুকানো মায়া রোজানাকে আপন আপন এক ধরনের অনুভূতি দিয়েছিল। এই কথায় কী হলো, টলটল জলে রোজানার চোখ ভরে গেল। মা’কে জন্মের কিছুদিন পরই, আর বাবাকে কৈশোরেই যারা হারায় তাদের মন বুঝি এমন হয়। কারো আপন আপন কথায় ভিতরটা ভিজে যায়। দ্রুত চোখ মুছে সে ঢোক গিলে বলল,
আমি আমার সবটুকু দিয়ে বাচ্চাগুলোকে দেখব, স্যার।
আমার মেয়ে! আপনি রোজানা আর সে আমার রোজা।
এই বাক্যে রোজানার বুকের ভিতর কেমন এক শিরশির অনুভূতি বয়ে গেল যার সাথে তার আগে কোনোদিন পরিচয় ঘটেনি। ঠিক সেই সময় ফুটফুটে এক বাচ্চা ছুটে এলো। থেমে গিয়ে অবাক হয়ে রোজানার দিকে তাকাল। কী আশ্চর্য, বাচ্চাটা যেন রোজানার ছোটবেলার প্রতিবিম্ব! কোনো দুর্ঘটনার কথা কি তার মনে পড়ছে? তার গর্ভে কখনো কি বাচ্চা জন্মেছিল? সে কি নিজে আসলে নীলিমা ছিল? মানুষ মারা গিয়ে অন্য পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কি আবার ফিরে আসে? মাঝখানে থাকে একটা চৈত্রের মাঠ আর বাস্তুচ্যূতির ইতিহাস। কিন্তু রোজানার মনে হয় সময় ছিল না এত কিছু বোঝার, ভাবার। কাউকে তার বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছিল। সে দ্রুত রোজাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। তার গালে গাল ছুঁয়ে বলল,
রোজা!
রোজাও যেন হঠাৎ তার মা’কেই ফিরে পেয়েছে। একটু দ্বিধান্বিত হয়ে সে রোজানার মুখটা ভালো করে দেখল। তারপর শক্ত করে আঁকড়ে ধরল তাকে। দুই মাতৃহীন কন্যা দুজনের মা হয়ে গেল কখন।
৫.
রোজানা তিন মাস তেরো দিন পর রাজনকে লাজুক আর নতমুখে বলল,
আপনি আমাকে তুমি করে বলতে পারেন। রাজন জিজ্ঞাসা করল,
কয়েক ঘণ্টার পর বাচ্চাদের ডে কেয়ার সেন্টারটা তো পড়েই থাকে। তুমি এখানেই থাকো। রোজানা বলল,
আমার বড্ড ভয় করে!
কেন?
আমি মনে হয় আপনাকে ভালোবেসে ফেলছি। আমার বার বার ভুল করে শুধু মনে হয়, রোজাকে আমিই গর্ভে ধরেছিলাম। আমার একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। তারপর ছোট্ট একটা জার্নি। আবার ফিরে এসেছি যেখানে … সেখানে…
সেখানে?
আমি আগন্তুক একজন। অথচ সবই যেন আমার ছিল!
রোজানার কথায় রাজন নিজেকে হারিয়ে ফেলল। বাবা-মা, নীলিমাকে হারিয়ে তার বুকের খা খা এক শূন্য দিগন্তে হঠাৎ যেন স্নিগ্ধ, শীতল হাওয়া বয়ে গেল। সে অনেকটাই তরল হৃদয়ের আবেগটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। নিজেকে তবু লুকিয়ে বলল,
তুমি কাল থেকে এই সেন্টারটার এই ফ্ল্যাটেই থাকবে। রোজা তোমার মেয়ে হয়েই থাকবে। এ কথায় রোজানা চমকে চোখ তুলে তাকাল রাজনের চোখে। রাজন তার কাছে এলো। তার হাত ধরল। সেই স্পর্শে রোজানা ভালোলাগার অতল অনুভূতিতে তলিয়ে গেল। রাজনের নিঃশ্বাসকে তার নিজের নিঃশ্বাস বলে মনে হলো। সে আলতো করে তার বুকে মাথা রাখল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে নিজেকে সামলাতে না পেরে রাজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখের কোণকে ভেজাল। রাজন ফিসফিস করে প্রশ্ন করল,
কিসের ভয় পাও?
ভালোবাসাকে। ছোটবেলা থেকে কারো ভালোবাসা পাইনি তো! কথাটুকু বলতেই শরীরের বাঁকগুলো উপচে উপচে কান্নার বলক নেমে এলো রোজানার। ভেজা আর দয়ার্দ্র হৃদয়ের রাজনের মনেও কেমন তোলপাড় হলো। সে মায়াভরা কণ্ঠে বলল,
ভালোবাসা এত আনন্দের… তার সন্ধান পেলে কি কাঁদতে হয়? পাগল…
যা কিছু অনেক ভালো, যা কিছু অনেক সুন্দর, যা কিছু দয়া আর মায়ার; আমার চৈত্রের একলা মাঠটার মতো – তার সন্ধান পেলেই আমার সহ্য হয় না। আমি আনন্দে কাঁদতে থাকি। তুমি অনেক সুন্দর, বসন্তের মায়ামাখা চাঁদের আলো নিয়ে জেগে থাকা আমার একলা সেই প্রান্তরটার মতো। এতকিছু পাওয়ার ভার আমি কি সহ্য করতে পারি!
আমি কি পারি? পারছি না তো… মনে হচ্ছে তুমি আমার হারিয়ে যাওয়া নীলিমা …
আমি ভেবেছিলাম, দেশ ছেড়ে বাইরে চলে যাব। আমি দ্বিতীয়বার আমার চৈত্রের মাঠটাকে, তার ভিতর মরিচিকার মতো, সূর্যের কড়কড়ে আলোর মতো লুকিয়ে রাখা স্বপ্নকে হারাতে চাই না। হ্যাঁ, আমি তোমার হারিয়ে যাওয়া নীলিমা। তোমাকে আমি ভালোবাসি রাজন। আমাকে কখনো হারাতে দিয়ো না।
তারা দুজন হারাতেই থাকল দুজনের মাঝে। সেই রাতটা রোজানার কাটল চমকে চমকে ওঠার অপার্থিব আনন্দে। মধ্যরাতে অদ্ভুত এক গানের স্বরে সে জানালার গ্রিলে কান রাখল। কী আশ্চর্য, এত অপূর্ব কণ্ঠ রাজনের? পিয়ানোটা সে এত সুন্দর বাজাতে পারে? অথচ সে জানিয়েছিল,
এটা নীলিমার পিয়ানো। ও খুব ভালো গাইত।
ভেসে আসা রাজনের জাদুময় কণ্ঠের সুর রোজানাকে কি এক মোহনীয় মুগ্ধতায় তার স্নায়ুতন্ত্র ঐন্দ্রজালিক অনুভবে শিউরে শিউরে উঠছে।
৪.
দুই মাস যেতে না যেতেই রোজানার জমানো টাকা শেষ হয়ে গেল। ঢাকায় এসে পরিচিত হয়ে ওঠা দু-একজন বন্ধুর কাছ থেকে ধার চাইতে গেলে রাজু তাকে তার চাওয়ার দিগুন টাকা বিকাশে পাঠাল। রাতে ফোন করে রাজু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে বলল,
রোজা, আমাকে বিয়ে করতে রাজী না হও তাহলে আমি সত্যিই মরে যাব। এরপর ছেলেটা কাঁদল কতক্ষণ। জানাল, কী গভীরভাবে সে রোজানার প্রেমে মজেছে। রোজানা সেই রাতে কিছু না বললেও পরেরদিন তার টাকা বিকাশ করে ফেরত পাঠিয়ে দিল। যাকে তার ভাই-ভাই মনে হয় তাকে জীবনসঙ্গী বানানোর মতো বিড়ম্বনাকে সে মানতে চাইল না।
আরো দুই তিনটা জায়গায় ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি না পেয়ে হতাশ রোজানা শেষে একটা ডে-কেয়ার সেন্টার চালানোর দায়িত্বের বিজ্ঞাপন দেখে খুশি হলো। চাকরিদাতা ভদ্রলোক ইন্টারভিউয়ের দিন তাকে সামনে বসতে বলে অবাক হয়ে তাকে দেখল কিছুক্ষণ। ফিসফিস করে বলল, রোজানা! রোজা…
রোজানা ভদ্রলোকের চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। কিন্তু সেই দৃষ্টি তাকে বাজে অনুভূতির বদলে কেন চৈত্রের সেই মাঠের মায়ার মতো মনে হলো –তা জানে না রোজানা। তিনি প্রশ্ন করলেন,
আপনি তো অবিবাহিতা, মা হননি। তাহলে মা-হীনা বাচ্চাদের আপন করবেন কীভাবে? রোজানা উত্তর দিয়েছিল,
আমার অনুভব দিয়ে। কল্পনায় ওদের মা হয়ে।
এই প্রশ্নের উত্তর শুনে কেমন থ মেরে গেলেন ভদ্রলোক। তার চোখের দৃষ্টি গভীর আর নরম হয়ে এলো। সেখানে কি এক আবেগের খেলা দেখল রোজানা। ভদলোকের চোখের কোণ কি চিকচিক করছে? রোজানা চার বছর বয়সে মা’কে হারিয়েছে। সে নবম শ্রেণিতে থাকতেই তার বাবা একটা স্ট্রোক করলেন। ঊনিশ দিন কমায় থাকার সেই দুর্বিষহ দিনগুলোতে সমাজের মানুষগুলোকে কেমন নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল। এমন নিষ্ঠুর সমাজে তার সামনে বসা ভদ্রলোকের মতো আবেগপ্রবণ মানুষ কি আছে? নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে রোজা। সে কি মানুষটাকে তার বাবার স্থানে বসিয়ে নিচ্ছে? কিন্তু রোজানা বুঝল, ভদ্রলোক তার চেয়ে মাত্র দশ-বারো বছরের বড় হবেন।
ওকে, রোজানা। আপনি সেন্টারটার দায়িত্ব নিন। আমার বাচ্চাসহ আর মাত্র তিনটা বাচ্চা। আমাদেরই আত্মীয়-স্বজনের। আমি খুব অবাক হয়েছি আপনার নামটা দেখে।
কেন স্যার?
আমার মেয়ের নামটা আপনার নামের মতোই। রোজা। আমি খুব ব্যস্ত থাকি। চাইব, বাচ্চা তিনটাকে আপনি নিজের মতো করে রাখবেন। বাই দ্য বাই, আপনি কোন এলাকায় থাকেন?
মোহাম্মদপুরের এক হোস্টেলে থাকি, স্যার।
আপনার পরিবার?
কেউ নেই আমার।
কথাটা বলেই অচেনা মানুষটার সামনে কেমন গলা ধরে এলো রোজানার। সে অনেক চেষ্টায় নিজেকে লুকাল। কিন্তু তার চেয়েও অধিক চেষ্টায় নিজের আবেগ লুকাতে ভদ্রলোক কি আসন ছেড়ে চলে যাবার সময় চোখ লুকিয়ে বললেন,
আগামীকাল থেকেই যোগদান করুন।
পরেরদিন সকাল আটটায় চাকরির নথিভূক্ত করতে কাজগপত্র নিয়ে এলো রোজানা। কাগজগুলো হাতে নিয়ে ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাকে বললেন,
আমার স্ত্রীর নাম ছিল নীলিমা। তবু, নিজের নামের সাথে নয় – মেয়ের নাম রেখেছিল সে আমার নামের সাথে মিলিয়ে। রাজনের মেয়ে রোজা।
কিন্তু ছিল কেন? রোজানার নিরীহ চোখের ভীত ভাষায় একসাথে অনেক প্রশ্ন জমে তা আরো মায়াময় করে তুলল। সে জিজ্ঞেস করল,
ছিল মানে স্যার, ম্যাডাম নেই…?
আমারও আপনার মতো এই পৃথিবী হঠৎ-ই শূন্য হয়ে গেছে। জগতে আমার আপন আর কেউ নেই, রোজানা। আছে শুধু আমার মেয়েটা। রোজা!
প্রথম দেখাতেই মানুষটার গভীর চোখে লুকানো মায়া রোজানাকে আপন আপন এক ধরনের অনুভূতি দিয়েছিল। এই কথায় কী হলো, টলটল জলে রোজানার চোখ ভরে গেল। মা’কে জন্মের কিছুদিন পরই, আর বাবাকে কৈশোরেই যারা হারায় তাদের মন বুঝি এমন হয়। কারো আপন আপন কথায় ভিতরটা ভিজে যায়। দ্রুত চোখ মুছে সে ঢোক গিলে বলল,
আমি আমার সবটুকু দিয়ে বাচ্চাগুলোকে দেখব, স্যার।
আমার মেয়ে! আপনি রোজানা আর সে আমার রোজা।
এই বাক্যে রোজানার বুকের ভিতর কেমন এক শিরশির অনুভূতি বয়ে গেল যার সাথে তার আগে কোনোদিন পরিচয় ঘটেনি। ঠিক সেই সময় ফুটফুটে এক বাচ্চা ছুটে এলো। থেমে গিয়ে অবাক হয়ে রোজানার দিকে তাকাল। কী আশ্চর্য, বাচ্চাটা যেন রোজানার ছোটবেলার প্রতিবিম্ব! কোনো দুর্ঘটনার কথা কি তার মনে পড়ছে? তার গর্ভে কখনো কি বাচ্চা জন্মেছিল? সে কি নিজে আসলে নীলিমা ছিল? মানুষ মারা গিয়ে অন্য পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কি আবার ফিরে আসে? মাঝখানে থাকে একটা চৈত্রের মাঠ আর বাস্তুচ্যূতির ইতিহাস। কিন্তু রোজানার মনে হয় সময় ছিল না এত কিছু বোঝার, ভাবার। কাউকে তার বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছিল। সে দ্রুত রোজাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। তার গালে গাল ছুঁয়ে বলল,
রোজা!
রোজাও যেন হঠাৎ তার মা’কেই ফিরে পেয়েছে। একটু দ্বিধান্বিত হয়ে সে রোজানার মুখটা ভালো করে দেখল। তারপর শক্ত করে আঁকড়ে ধরল তাকে। দুই মাতৃহীন কন্যা দুজনের মা হয়ে গেল কখন।
৫.
রোজানা তিন মাস তেরো দিন পর রাজনকে লাজুক আর নতমুখে বলল,
আপনি আমাকে তুমি করে বলতে পারেন। রাজন জিজ্ঞাসা করল,
কয়েক ঘণ্টার পর বাচ্চাদের ডে কেয়ার সেন্টারটা তো পড়েই থাকে। তুমি এখানেই থাকো। রোজানা বলল,
আমার বড্ড ভয় করে!
কেন?
আমি মনে হয় আপনাকে ভালোবেসে ফেলছি। আমার বার বার ভুল করে শুধু মনে হয়, রোজাকে আমিই গর্ভে ধরেছিলাম। আমার একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। তারপর ছোট্ট একটা জার্নি। আবার ফিরে এসেছি যেখানে … সেখানে…
সেখানে?
আমি আগন্তুক একজন। অথচ সবই যেন আমার ছিল!
রোজানার কথায় রাজন নিজেকে হারিয়ে ফেলল। বাবা-মা, নীলিমাকে হারিয়ে তার বুকের খা খা এক শূন্য দিগন্তে হঠাৎ যেন স্নিগ্ধ, শীতল হাওয়া বয়ে গেল। সে অনেকটাই তরল হৃদয়ের আবেগটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। নিজেকে তবু লুকিয়ে বলল,
তুমি কাল থেকে এই সেন্টারটার এই ফ্ল্যাটেই থাকবে। রোজা তোমার মেয়ে হয়েই থাকবে। এ কথায় রোজানা চমকে চোখ তুলে তাকাল রাজনের চোখে। রাজন তার কাছে এলো। তার হাত ধরল। সেই স্পর্শে রোজানা ভালোলাগার অতল অনুভূতিতে তলিয়ে গেল। রাজনের নিঃশ্বাসকে তার নিজের নিঃশ্বাস বলে মনে হলো। সে আলতো করে তার বুকে মাথা রাখল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে নিজেকে সামলাতে না পেরে রাজনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখের কোণকে ভেজাল। রাজন ফিসফিস করে প্রশ্ন করল,
কিসের ভয় পাও?
ভালোবাসাকে। ছোটবেলা থেকে কারো ভালোবাসা পাইনি তো! কথাটুকু বলতেই শরীরের বাঁকগুলো উপচে উপচে কান্নার বলক নেমে এলো রোজানার। ভেজা আর দয়ার্দ্র হৃদয়ের রাজনের মনেও কেমন তোলপাড় হলো। সে মায়াভরা কণ্ঠে বলল,
ভালোবাসা এত আনন্দের… তার সন্ধান পেলে কি কাঁদতে হয়? পাগল…
যা কিছু অনেক ভালো, যা কিছু অনেক সুন্দর, যা কিছু দয়া আর মায়ার; আমার চৈত্রের একলা মাঠটার মতো – তার সন্ধান পেলেই আমার সহ্য হয় না। আমি আনন্দে কাঁদতে থাকি। তুমি অনেক সুন্দর, বসন্তের মায়ামাখা চাঁদের আলো নিয়ে জেগে থাকা আমার একলা সেই প্রান্তরটার মতো। এতকিছু পাওয়ার ভার আমি কি সহ্য করতে পারি!
আমি কি পারি? পারছি না তো… মনে হচ্ছে তুমি আমার হারিয়ে যাওয়া নীলিমা …
আমি ভেবেছিলাম, দেশ ছেড়ে বাইরে চলে যাব। আমি দ্বিতীয়বার আমার চৈত্রের মাঠটাকে, তার ভিতর মরিচিকার মতো, সূর্যের কড়কড়ে আলোর মতো লুকিয়ে রাখা স্বপ্নকে হারাতে চাই না। হ্যাঁ, আমি তোমার হারিয়ে যাওয়া নীলিমা। তোমাকে আমি ভালোবাসি রাজন। আমাকে কখনো হারাতে দিয়ো না।
তারা দুজন হারাতেই থাকল দুজনের মাঝে। সেই রাতটা রোজানার কাটল চমকে চমকে ওঠার অপার্থিব আনন্দে। মধ্যরাতে অদ্ভুত এক গানের স্বরে সে জানালার গ্রিলে কান রাখল। কী আশ্চর্য, এত অপূর্ব কণ্ঠ রাজনের? পিয়ানোটা সে এত সুন্দর বাজাতে পারে? অথচ সে জানিয়েছিল,
এটা নীলিমার পিয়ানো। ও খুব ভালো গাইত।
ভেসে আসা রাজনের জাদুময় কণ্ঠের সুর রোজানাকে কি এক মোহনীয় মুগ্ধতায় তার স্নায়ুতন্ত্র ঐন্দ্রজালিক অনুভবে শিউরে শিউরে উঠছে।
এই বাসর প্রদীপ ম্লান হলো যে, তোমার ঐ রূপের কাছে
ওই কপোল দেখে লাজে গোলাপ নীরব হয়ে যেন আছে।
রেশমি চুলে দুষ্টু হাওয়া লুকোচুরি যেন খেলে
কাজল আঁখির পদ্মকলি পাপড়ি হয়ে যেন দোলে
চপল অধর গোপন তৃষায় কারে যাচে!
তোমার পায়ের কৃষ্ণচূড়া আলতা হয়ে যেন হাসে
বৃষ্টিভেজা অঙ্গে তোমার আকাশ যেন গেছে মিশে
ওই কপোল দেখে লাজে গোলাপ নীরব হয়ে যেন আছে।
রেশমি চুলে দুষ্টু হাওয়া লুকোচুরি যেন খেলে
কাজল আঁখির পদ্মকলি পাপড়ি হয়ে যেন দোলে
চপল অধর গোপন তৃষায় কারে যাচে!
তোমার পায়ের কৃষ্ণচূড়া আলতা হয়ে যেন হাসে
বৃষ্টিভেজা অঙ্গে তোমার আকাশ যেন গেছে মিশে
সোনার কাকন তোমার হাতে হার মেনেছে…
৬.
এক বছর কেমন স্বপ্ন আর প্রেম-প্রেম স্বপ্নের ঘোরে কাটল তাদের। ছোট্ট রোজা ততদিনে রোজানাকে মা জ্ঞান করতে জেনেছে। মাঝখানে একবার রাজন করোনায় আক্রান্ত হলে সব বাধা-নিষেধ পায়ের তলায় রেখে, রাত-দিন সমান করে রোজানা তার সেবা করল। যেন রাজনকে আগলে রাখতে মেয়েটা নিজের জীবনকেই তুচ্ছজ্ঞান করল। এরপর রাজন-রোজানার প্রেম নিয়ে দূরের বন্ধু-কিছু স্বজন আর সমাজে কানাঘোষা শুরু হলে রাজন রোজানাকে সম্মান জানিয়ে তাকে স্ত্রী করে ঘরে তুলে নিতে চাইল। সেই প্রস্তাব পেয়ে রোজানা এত লাজুক হয়ে উঠল যে, সে রাজনের সামনে যাওয়াই বন্ধ করে দিল। একদিন রাজনই তাকে না জানিয়ে ডে-কেয়ার সেন্টারে রোজানার ফ্লাটে গেল। ছোট্ট রোজাই লক খুলল,
বাবা, মা ওয়াশরুমে।
আর ঠিক তখন শরীরে তোয়ালে জড়ানো রোজানা বাথরুম থেকে উঁকি দিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
কে এসেছে, মা? রোজা…
তাকে এক নজর দেখল রাজন। জলের ফোঁটা ফোঁটা বিন্দু রোজানার ত্বকে বিদ্যুতের আলো নয় তার ত্বকের আলো নিয়ে, তার বৃষ্টিভেজা, শরীরে লেপ্টে থাকা মেঘচুল দেখে রাজনের ঘোর আর সারারাত কাটল না। তার নীলিমা কীভাবে রোজানা হয়ে এসেছে –মর্ত্যে? তাকে এক নজর দেখেই দ্রুত দরজা বন্ধ করল অর্ধ-নগ্ন রোজানা। তার বুকের কাঁপন অস্থির করে তুলল তাকে। সে তোয়ালে ফেলে জলের ধারার মাঝে আবার সঁপে দিল নিজেকে। সেই সন্ধ্যায় রাজন ঘরে ফিরল বটে, কিন্তু সময় যেন কিছুতেই কাটল না। দেয়ালে ঝুলানো নীলিমার বাঁধানো ছবির সামনে দাঁড়িয়ে তার উদ্দেশ্যে বলল,
তুমিই নিজে এলে? নাকি মেয়েটাকে স্বর্গ থেকে তুমি পাঠালে? কেন এমন হয়, নীলিমা? আমি তো তোমার আমার মাঝে কাউকে চাইনি? কী আশ্চর্য, তোমার চেহারার সাথে শুধু নয়, তোমারই উচ্চতা, তোমার হাসি আর অশ্রুভেজা চোখের সাথেও শুধু নয়, রোজানার আবেগটুকু তোমার মতোই। তোমার মতো গানের সুরে মেয়েটা কেমন তলিয়ে যায় …
নীলিমার হাসি হাসি মুখের ছবিটা কোনো কথা বলল না। রাজন থামল। হঠাৎ তার নীলিমার সাথে রোজানার এই রহস্যময় মিলের সূত্র খুঁজতে ইচ্ছা হলো। রোজানাকে আরো জানতে ইচ্ছা করল। তার কাছে সংরক্ষিত সিভির হার্ড কপিটা নিয়ে আবার তাতে চোখ বুলাল। চাকরির অভিজ্ঞতায় সে মোরাল স্কুল নামের একটা প্রতিষ্ঠানে মাত্র আড়াই মাস চাকরির কথা লিখেছে। নেট ঘেটে মোরাল স্কুলের একজনকে ফোনে পেল। অপর প্রান্ত থেকে একজন তার নাম বলল, তাপিত হাসান। তাকে রোজানার ডিটেইলস জানিয়ে তার ব্যাপারে জানতে চাইলে লোকটা ক্রুরকণ্ঠে আর চিপে চিপে বাক্যগুলো বলল,
হা, হা… ভাই। আপনার আর খ্যায়াদ্যায়া কাম নাই? সন্ধ্যা বেলাত ফোন করছেন একটা মাগির তথ্য জানতে! কেন ভাই, ঘণ্টার রেট কি বেশি চাইতেছে? ও তো হাইক্লাশ কলগার্ল। আমার অফিসে সবাই তাকে কলগার্ল রোজা বলে জানে।
কলগার্ল রোজা – এই শব্দ দুটো তার বুকটা যেন করাত দিয়ে কেটে ফেলল। নিজের মেয়ে নীলিমার মতো চোখ আর হাসি নিয়ে বড় হয়ে উঠছে। মেয়ের নিরীহ মুখটা ভেসে উঠে কেমন অদ্ভুত এক অনুভূতিতে তাকে অবসন্ন, লজ্জিত করে তুলল। পায়ের নিচের সব মাটি যেন সরে গেল। সেদিন থেকে কথা বলতে ভুলে গেল রাজন। রোজানাকে কোনোভাবেই আর ধরা দিতে চাইল না সে। কেউ কিছু বললে ফ্যালফ্যাল করে তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে তাদের কোনো কথা না শোনাই তার অভ্যাস হয়ে দাঁড়াল। রাজনের এই নীরবতা সহ্য করা মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াল রোজানার। সে কী অপরাধ করেছে অনেক ভেবেও তার কূল-কিনারা করতে পারল না। শুধু মনে পড়ল, বছর দুয়েক আগে ধানমণ্ডি লেকের পাশে অনেক মানুষের ভিড়ের ভিতর একরাশ হতাশা নিয়ে হাঁটার সময় মেহেদি নামের একটা ছেলের সাথে পরিচয় হয়েছিল। বার বার তার পাশে এসে যুবকটা কিছু একটা বলতে চাইছিল। একসময় সে তার সাথে কথা বলে। মেহেদি জানায়,
আপনাকে আমি মাঝে মাঝেই ঠিক এই সন্ধ্যাবেলাতেই এই লেকটার পাশে হাঁটতে দেখি। আপনাকে দুই মাস ধরে ফলো করছি।
কেন বলুন তো?
আমি কয়েকদিন পর দেশ থেকে চলে যাব। কিন্তু কেন যেন আপনাকে আর দেখব না ভেবে বুকটা ভারী হয়ে উঠছে।
বাপরে! বেশ কথা জানেন। কোথায় যাচ্ছেন?
থাকি জার্মানিতে। দুই মাসের ছুটিতে এসেছিলাম। না, কথা আসলে জানি না। আমার জাপানি গার্লফ্রেন্ড আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। সেজন্য এখানে এসে একা একা মন খারাপ করে বসে থাকতাম। আপনাকে প্রথম যেদিন দেখলাম সেদিনই চমকে উঠলাম।
ভেরি ইন্টারেস্টিং!
আপনি চাইলে আপনাকে আমি পাশে চাইব… আপনাকে জার্মানিতে নিয়ে যাওয়া এবং পড়াশুনা করানোর দায়িত্ব আমার। আপনাকে যিনি পাবেন তার কয়েক জনম ধন্য হওয়ার কথা। বিশ্বাস করুন, সারা ইউরোপ কেন, আপনার মতো বুকে জ্বালা ধরানো এমন সৌন্দর্যের নারী বিশ্বে আর কোথাও আছে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।
তারপর ফোনে বেশ কয়েকবার মেহেদির সাথে রোজানার কথা হয়েছিল। হোয়াটসঅ্যাপে তার সাথে অনেক চ্যাটও এখনো রয়ে গেছে। দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা সে করেছিল। সব এলোমেলো হয়ে গেলো রাজনকে পেয়ে। রোজার মা না হয়েও নিজেকে রোজার মা ভাবার বাইরে জগতটাকে শূন্য মনে হওয়ার দিন থেকে। রাজন-রোজার বাইরে রোজানা জানে তার জীবনটা একেবারেই শূন্য।
রোজানা ধরেই নিল, রাজন কোনোভাবে রোজানার এই ছোট্ট অতীতটুকু মোবাইলে দেখে ফেলেছে। কয়েকদিনের গুমোট পরিস্থিতি পার করে একদিন সে রোজাকে অনেক আদর করল। নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিতে নিতে ছলছল চোখে আনমনে বলল,
সাগরে ভাসতে থাকা একটা মেয়ের খড়কুটো আঁকড়ে ধরার সময়ে আমার ছোট্ট অতীতকে তুমি মানতে পারলে না, রাজ। অথচ আমি তোমার হারিয়ে যাওয়া নীলিমা হতে চেয়েছিলাম। হতে চেয়েছিলাম তোমার অবারিত আকাশের এক টুকরো নীল!
৭.
তুমি আসবে রাজন? আগামীকাল দুপুরে আমার ফ্লাইট। আমাদের একটা বিদায়বেলা থাকুক। যে বিদায়বেলা তোমার চোখের ভাষা হয়ে থাকবে।
এই প্রশ্নে ভাষা হারিয়ে চুপ হয়ে যায় রাজন। তাপিত নামের লোকটাকে ফোন করার পর অপরূপ নীরবতার একদিন রোজানা তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল,
আমি যদি কখনো পালিয়ে যাই? তোমার কাছ থেকে দূরে, অনেক দূরে? এ দেশ ছেড়ে? এই পৃথিবী ছেড়ে?
প্রশ্ন করার পর রোজানা অবাক হয়ে দেখল রাজনের চোখে-মুখে কোনো ভাবান্তর তো নেই-ই, বরং সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে তার মনে-অভিব্যক্তিতে বেদনা ফুটে উঠলেও ঠোঁটে দ্বিধা, চোখে বিরক্তি অথচ চোখের মণিতে লম্বা আর দীর্ঘ এক দীর্ঘশ্বাসের কান্না, এক প্রশ্ন উঁকি দিয়ে আছে। রোজানা সব দ্বিধা ভেঙে, এখানে-সেখানে বসা অন্য দুই জুটি আর একজন নিঃসঙ্গ প্রৌঢ়ের উপস্থিতে ভুলে গিয়ে রাজনের শরীরলগ্না হয়ে, জীবনে প্রথম উদ্ভিন্ন আর আবেগে কাঁপতে থাকা বুকের স্পর্শ দিয়ে রাজনকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,
বলেছি না, ছোটবেলা থেকে মায়ের আদর পাইনি, বাবাকে হারিয়েছি … তুমি শুধু আমাকে কষ্ট দেবে না। জগতের আর কোনো কিছুকে আমি পরোয়া করি না, কারো আচরণ আর কষ্ট আমাকে দুঃখ দেয় না। শুধু তোমার একটু অবহেলা আমাকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই রাজন!
রোজানার কথায় আবেগাপ্লুত অথবা দয়ালু হয়ে ওঠার পরিবর্তে যে মানুষটার এত বড় উদার আর দয়ালু হৃদয়টার জন্য রোজানা তাকে গভীর মগ্নতা আর ধ্যান-জ্ঞান দিয়ে ভালোবাসে সেই মানুষটাই নিষ্ঠুর হয়ে বলল,
মিথ্যা বলা আর ছলনা করা নারীদেরই মানায় বটে। তুমি তো আমাকে শুধু একটা মই হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছ।
রোজানা হতভম্ব হয়ে, সব ভাষা হারিয়ে রাজনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। গত মাসের চেয়ে চারদিন আগে হঠাৎই সেদিন তার পিরিয়ড শুরু হয়েছিল। পিরিয়ডের রক্তের বাজে ঘ্রাণটা তার নাকে জগতের যে কোনো গন্ধের চেয়ে আজকাল বড্ড বেশি অস্তিত্বময় বলে মনে হয়। যেদিন থেকে ডে কেয়ার সেন্টারে রোজাকে মায়ের মতো আদর করতে সে শুরু করেছে সেদিন থেকেই মাসিকের রক্তের এই গন্ধটা তার কাছে অদ্ভুত এক ঘ্রাণ হয়ে গিয়েছে। এক ফোঁটা তরলও তার নাসারন্ধ্রে কেমন তোলপাড় এক অনুভূতি এনে দেয় যেমন অনুভূতিতে সে কৈশোরে আক্রান্ত হতো চৈত্রের শনশন হাওয়া বয়ে বেড়ানো তাদের গ্রামের ধূ ধূ মাঠটা দেখে। শিমুলের তুলা উড়ে চলার মতো তার মনটাও উড়ে বেড়াতো। কোথায় তা যেতে চাইতো, কোথায় গিয়ে মিলতে চাইতো তা সে জানে না। শুধু জানে, তুলাকে উড়িয়ে দেবার জন্য শিমুলের বুক ফেটে যায়। সে শিমুল ফুলের ঘ্রাণকে ঝরে যাওয়া অযুত-নিযুত, কোটি-কোটি মরা পাতার ঘ্রাণের সাথে মিশিয়ে ফেলতো। সেই চৈত্রের ঘ্রাণের মতো তার কিশোরী বেলার স্বপ্নগুলো ভেসে বেড়াতো। চৈত্রের সময়ের এই ঘ্রাণ কখন, কীভাবে তার স্বপ্নঘ্রাণ হয়ে আছে! আর স্বপ্ন পূরণ হলো এভাবে? বড় হয়ে রাজন নামের একজন পুরুষের অপার, উদারতা, দয়ার্দ্র হৃদয়কে ভালোবেসে? তার কাছে স্বপ্নগুলোকে নোঙর করিয়ে?
হ্যাঁ, রাজনের কন্যাকে যেদিন থেকে সে নিজেরই মেয়ে ভাবতে শুরু করল সেদিন থেকেই তার এই নারীময় সময়টা কেমন অদ্ভুত লাজুকতা আর কী যেন পাওয়ার আশায় উন্মুখ হতো বলেই এই ঘ্রাণটাকে সে সেই চৈত্রের শনশন দিনের স্বপ্নের সাথে মিশিয়ে গুলিয়ে ফেলতো। রোজা তাকে মা বললেই সে রোজাকে শক্ত করে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরতো। চৈত্রের শনশন বাতাস বয়ে চলা আত্মায় রোজার মা ডাক, তার নারীত্বের ঘ্রাণময়তা একসাথে জেগে উঠে তাকে এলোমেলো করে দিয়ে অবারিত করে দেয়, করে দেয় নদীর মতো। ঢেউ টলমল যে নদীর প্রাণ সাগরে মিলিত হওয়ার জন্য তোলপাড় হতে চায়। রাজন কি সেই সাগর? প্রকৃতির মতো নারীত্বের এই ঘ্রাণ কি সে টের পায়? যেভাবে সে চৈত্রের শনশন বাতাসে টের পেত তার স্বপ্নাভূতির উন্মীলনকে। হ্যাঁ, এই ঘ্রাণ তাকে মনে করিয়ে দেয়, সে একজন নারী যার জরায়ু আরো একজন রোজাকে তার ভ্রুণাবস্থা থেকে গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুত। এই অনুভূতির কারণেই মনে হয় তার আজকাল প্রবল রক্তক্ষরণ হয়।
কফি খেতে বসে সেদিনও তার আগাম সংকেত সে পেয়েছিল। তার নাসারন্ধ্র সচেতন হয়ে উঠেছিল। সে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। রাজন জিজ্ঞাসা করল,
কী হলো?
ওয়াশ রুমে যেতে হবে। তুমি অপেক্ষা করো, প্লিজ।
ওয়াশরুমের দিকে দ্রুত হাঁটতে থাকা রোজানার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে রাজন। নীলিমা ছাড়া জগতে আর কেউ এত সুন্দরী হতে পারে –তা সে বিশ্বাস করতো না। অথচ কোত্থেকে হঠাৎ একদিন রোজানাকে দেখে চমকে উঠল সে। রোজানা কি নীলিমার রূপ ধরে অনেক আগেই কোথাও জন্ম নিয়েছিল? কী আশ্চর্য! মেয়েটার মা নেই, বাবা নেই… নেই ভাই-বোন –ভাবতেই বুকের মধ্যে কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে রাজনের। অথচ, তার অন্ধকার এক জগতের কারণে রাজন মেয়েটাকে গ্রহণ করতেও পারছে না।
স্মৃতিলোক থেকে বেরিয়ে আসে রাজন। রোজানা চলে যাচ্ছে? যাক! তাতে তার কী? তবু, রোজানাকে বিদায়বেলায় এত দেখতে ইচ্ছা করছে কেন? এত ভালোবাসা ঘৃণা হয়ে যাওয়ার পরও কেন মনে হচ্ছে রোজানার এই ডাকে সাড়া দিতে ইচ্ছা করছে। রাজন বলল,
ঠিক আছে। আমি আসব, রোজানা।
কাছে পেয়ে রোজানা তার চোখের দিকে তাকিয়ে ঝর ঝর বৃষ্টির মতো কেঁদেই যাচ্ছিল,
কেন আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে রাজন? তোমাকে ছেড়ে যেতে কেন এত কষ্ট… কেন আমার জগতটা ঝাঁপসা আর অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে? বুকের ভিতর কেউ যেন করাত দিয়ে চিড়েই চলছে।
রোজানার এই আকুতির কাছে রাজন নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তাকে জড়িয়ে ধরতেই সাগরের ঢেউয়ের তীব্র ঢেউ হয়ে রোজানার শরীরের বাঁকগুলো উপচে উপচে পরতেই থাকল। রাজন বলল,
তুমি যেয়ো না। আমরা আবার আগের মতো…
সে সময় পেরিয়ে গেছে… আমি এখন অন্য কারো বাগদত্তা রাজন। বেঁচে থাকার জন্য এ ছাড়া আমার কোনো পথ ছিল না। তুমি আমার ছোট্ট অতীতকে মানতে পারোনি, পারবেও না হয়তো…
তারপর রাজন যেন মূর্তি হয়ে গেল। যে ধারায় এতক্ষণ অশ্রু গড়াচ্ছিল রোজানার চোখ বেয়ে, শব্দহীন, কাঁপনহীন রাজনের মূর্তি তেমন অশ্রুধারায় ভিজিয়ে ফেলছিল নিজের গণ্ডদেশ। মানুষ পর পর দুটি সত্তাকে এক করে পেয়ে তাকেই হারালে বুঝি ওমন মূর্তি হয়ে যায়।
৮.
রোজানার সব অস্তিত্বের স্বাদ নিতে মরিয়া মেহেদি পুনরায় ঠোঁট রাখল রোজানার ঠোঁটে। তার উন্মুক্ত শরীরে চষে ফিরল আগামী দিনের শস্য।
রোজানার মনের অবগুণ্ঠন তবু ভাঙলো না। সে চৈত্র মাঠটার একলা কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে মূর্তিমান রাজনের বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠা শরীরের কান্না লুকাল। বাতাসে তখনো ভাসছে রাজনের মধুর কণ্ঠ-
ঠিক আছে। আমি আসব, রোজানা।
কাছে পেয়ে রোজানা তার চোখের দিকে তাকিয়ে ঝর ঝর বৃষ্টির মতো কেঁদেই যাচ্ছিল,
কেন আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে রাজন? তোমাকে ছেড়ে যেতে কেন এত কষ্ট… কেন আমার জগতটা ঝাঁপসা আর অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে? বুকের ভিতর কেউ যেন করাত দিয়ে চিড়েই চলছে।
রোজানার এই আকুতির কাছে রাজন নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তাকে জড়িয়ে ধরতেই সাগরের ঢেউয়ের তীব্র ঢেউ হয়ে রোজানার শরীরের বাঁকগুলো উপচে উপচে পরতেই থাকল। রাজন বলল,
তুমি যেয়ো না। আমরা আবার আগের মতো…
সে সময় পেরিয়ে গেছে… আমি এখন অন্য কারো বাগদত্তা রাজন। বেঁচে থাকার জন্য এ ছাড়া আমার কোনো পথ ছিল না। তুমি আমার ছোট্ট অতীতকে মানতে পারোনি, পারবেও না হয়তো…
তারপর রাজন যেন মূর্তি হয়ে গেল। যে ধারায় এতক্ষণ অশ্রু গড়াচ্ছিল রোজানার চোখ বেয়ে, শব্দহীন, কাঁপনহীন রাজনের মূর্তি তেমন অশ্রুধারায় ভিজিয়ে ফেলছিল নিজের গণ্ডদেশ। মানুষ পর পর দুটি সত্তাকে এক করে পেয়ে তাকেই হারালে বুঝি ওমন মূর্তি হয়ে যায়।
৮.
রোজানার সব অস্তিত্বের স্বাদ নিতে মরিয়া মেহেদি পুনরায় ঠোঁট রাখল রোজানার ঠোঁটে। তার উন্মুক্ত শরীরে চষে ফিরল আগামী দিনের শস্য।
রোজানার মনের অবগুণ্ঠন তবু ভাঙলো না। সে চৈত্র মাঠটার একলা কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে মূর্তিমান রাজনের বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁপে কেঁপে ওঠা শরীরের কান্না লুকাল। বাতাসে তখনো ভাসছে রাজনের মধুর কণ্ঠ-
এই বাসর প্রদীপ ম্লান হলো যে, তোমার ঐ রূপের কাছে
ওই কপোল দেখে লাজে গোলাপ নীরব হয়ে যেন আছে।
ওই কপোল দেখে লাজে গোলাপ নীরব হয়ে যেন আছে।
লেখক পরিচিতি:
কাজী রাফি – কথাশিল্পী। জন্ম - ২২ নভেম্বর, ১৯৭৫, বগুড়ায়। আফ্রিকার পটভূমিতে লেখা ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’ তাঁর প্রথম উপন্যাস। এই উপন্যাসেই কালি ও কলম পুরস্কার লাভ করেন এবং পাঠক এবং বোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ১১ টি উপন্যাস এবং ৬ টি ছোট গল্পগ্রথ। চাকরির প্রয়োজনে আফ্রিকায় বাস করেছেন দুই বছরের অধিক সময় এবং আফ্রিকার প্রকৃতি-সংস্কৃতি, তাদের প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনকে দেখেছেন কাছ থেকে। মানুষ ও তাদের যাপিত জীবন এবং প্রকৃতি দেখার প্রয়োজনে ঘুরেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তর।
পুরস্কারসমূহ:
এইচএসবিসি কালি ও কলম পুরস্কার -২০১০
এমএস ক্রিয়েশন সম্মাননা -২০১০
নির্ণয় স্বর্ণপদক-২০১৩
এসএম রাহী পদক ২০১৯


0 মন্তব্যসমূহ