কাকলি দেবনাথের গল্প : অমৃত ফল



সমগ্র চরাচর জুড়ে যেন অসীম শুন্যতা। এক রাতচরা পাখি করুণ স্বরে ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল। নিস্তব্ধ,নিঝুম চারিদিক। আচ্ছা ,সায়ন্তন কি আগের মত তাকে আর কোনোদিন ভালোবাসবে ? নাকি আস্তে আস্তে দূরে আরও দূরে সরে যাবে।

রিক্তা খুব সাবধানে খাট থেকে নেমে জানলার কাছে এসে দাঁড়াল। আজ পূর্ণিমা। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল , একটা গোল অ্যালুমিনিয়ামের থালার মত চাঁদ গুটি গুটি পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। চাঁদকে তো সব সময় সোনার থালার মতই লাগে । তবে আজ কেন এমন মূল্যহীন লাগছে ? কত কিছু মনে পড়ছে… রিক্তা তখন কিশোরী । ওর মাসি একদিন রিক্তার সমতল বক্ষ প্রান্তর দেখে বলেছিল , “ চড়াই উৎরাই হল নারী শরীরের প্রধান আকর্ষণ । রোজ কিছু ব্যায়াম করবি । দেখবি কত তাড়াতাড়ি সুন্দর ফিগার হয়ে যাবে ।“

কলেজ জীবনের প্রেম পর্বে- সায়ন্তন রিক্তার ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ানোর আগে একদিন নিভৃতে জড়িয়ে ধরেছিল । সায়ন্তনের বুকে নিষ্পেষিত হয়েছিল রিক্তার বুক । রিমঝিম এক ভালোলাগায় থরথর করে কেঁপে উঠেছিল সে ।

নিজের অজান্তেই কখন যেন হাতটা বুকে উঠে এসেছে রিক্তার । কতদিন আগের কথা । এসব কথা তো কবেই ভুলে গেছিল । আজ আবার সব এক এক করে মনে পড়ছে। প্রচন্ড বৃষ্টিপাতের সময় নিস্তরঙ্গ পুকুরে যেমন বুলবুলি ওঠে, ঠিক তেমনি রিক্তার মনের ভেতর আজ বহু পুরোনো স্মৃতি বুদবুদ হয়ে উঠে আসছে । আস্তে আস্তে ড্রেসিং টেবিলটার সামনে এসে দাঁড়াল । লাইট জ্বেলে ভালো করে নিজের বুকের দিকে তাকাল । ভেতর থেকে কেঁপে কেঁপে উঠছে। হাতটা মুখে চাপা দিয়ে কান্নার আওয়াজ আটকাল । ধুপ করে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল আবার। কী এমন অপরাধ করেছে সে? কেন এমন শাস্তি ভগবান তাকে দিল ? এতদিন মনের মধ্যে তাও একটা ক্ষীণ আশা ছিল । আজ সে আশাও শেষ। ডাক্তার জানিয়ে দিয়েছেন, “ যত তাড়াতাড়ি অপারেশন করা যাবে ততই পেশেন্টের জন্য ভালো ।“

সায়ন্তন একবার মৃদুস্বরে বলেছিল,”আচ্ছা ডাক্তারবাবু মেডিসিনে কমানো যায় না ? অপারেশন কি করতেই হবে ?”

ডাক্তার গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন, “মিস্টার সেন,ইউ আর লাকি । আপনার ওয়াইফের ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়েছে। অপারেশন করে ব্রেস্ট বাদ দিয়ে দিলেই উনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবেন । নরম্যাল লাইফ লীড করতে পারবেন ।“ তারপর রিক্তার দিকে তাকিয়ে ,রিক্তার মুখের অবস্থা দেখে একটু নরম গলায় বললেন , “ভয় পাবার কিচ্ছু নেই । আজকাল আকছার এটা হচ্ছে। বহু মহিলাই এখন এই অসুখে ভুগছেন । আপনি একদম সুস্থ হয়ে উঠবেন ।“

“কিন্তু ডাক্তারবাবু আমাকে দেখতে …মানে … আমি মা হতে…“

ডাক্তার স্নেহের গলায় বললেন ,”আপনার জীবন আগে, না সৌন্দর্য ? তাছাড়া এখন অনেক আর্টিফিসিয়াল বডি বাজারে পাওয়া যায় । যা ব্যাবহার করলে বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই যে আপনার শরীরে কোনো ডিফেক্ট আছে।“ তারপর একটু আমতা আমতা করে বললেন , “ মা হওয়ার কথা কিছুদিন পরে ভাববেন । আগে আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠুন ।“

ডাক্তারের কথাগুলোই সারাক্ষণ রিক্তার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে ।‘ডিফেক্ট …বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই… মা হওয়ার কথা পরে ভাববেন…

বাইরে থেকে হয়ত বোঝা যাবে না । কিন্তু মনের ভেতর ? সেখানে যে অবিরত যুদ্ধ চলবে অপূর্ণতার । কী দিয়ে সেই অভাব পূরণ করবে রিক্তা ?


(দুই)

“ও বৌদি দরজা খোলো ,ও বৌদি…? “ দুম দুম আওয়াজ দরজায় । ঘুম ভেঙে ধড়ফড় করে উঠতে গেল রিক্তা । পারল না । শরীর অবশ হয়ে আছে। বহু কষ্টে বিছানায় উঠে বসল । এ কেমন ভাবে শুয়ে আছে সে ? তাড়াতাড়ি বুকের উপর হাতটা ক্রস করে রেখে জানলার দিকে তাকাল । না, জানলায় ভারী পর্দা ঝোলানো। মনে পড়ল কাল রাতের কথা । কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল । হাত বাড়িয়ে হাউসকোটটা নিতে গিয়ে দেখল ওটা বিছানার নিচে পরে আছে । খাট থেকে নেমে হাউসকোটটা নিতে যাবে চোখ চলে গেল আয়নার দিকে ।বুকের উপর তখনও হাত দুটো জড়ো করে রাখা । মনের ভেতর একটা দম চাপা কষ্ট । ট্রেনে ,বাসে , রাস্তায় কত সাবধানে চলতে হয় মেয়েদের। মেয়ে একটু বড় হলেই মায়েরা সতর্ক করে দেয় । এই তো কালই ট্রেনে আসার সময় একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখল । কত বয়স হবে মেয়েটার ? খুব বেশি হলে চোদ্দ পনেরো । হট প্যান্ট আর স্লিভ্লেস গেঞ্জি পরে পিঠ ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল । যেই ভিড় বাড়তে থাকল ব্যাগটা ঘুরিয়ে বুকের উপর নিয়ে নিল ।

আবার দরজায় ধাক্কা পড়ল। “কী গো বৌদি ? দরজা খোলো।“

হাউসকোটটা গায়ে চাপিয়ে রিক্তা দরজা খুলল । কাজের মেয়ে টুম্পা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকল। “বৌদি তোমার শরীর ঠিক আছে তো ? দশটা বেজে গেছে। তুমি তো কখনও এত দেরি করো না?”

“হ্যাঁ ঠিক আছি । তোর দাদাবাবু কোথায় ?”

“দাদা তো অনেক ক্ষণ অফিসে চলে গেছে ।“

অফিসে চলে গেছে সায়ন্তন ! আমাকে না জানিয়েই ! এর মধ্যেই ওর কাছে আমার গুরুত্ব কমতে শুরু করেছে । চোখের কোণে জলের রেখা চিকচিক করে উঠল রিক্তার ।

বাথরুমে ঢুকে একেবারে স্নান সেরে নিল রিক্তা । টুম্পা মনের আনন্দে গান করে চলেছে “চোলি কে পিছে ক্যায়া হ্যায় ,চোলি কা পিছে…।“ রিক্তার চোখের সামনে মাধুরীর সেই চানিয়া চোলি পরে নাচ ঘুর পাক খাচ্ছে । টুম্পা একটা ডিপকাট ব্লাউজ পরেছে। পিছনে লটকন দেওয়া । রিক্তা লক্ষ্য করেছে যত ফ্যাশনেবেল ব্লাউজের কাট বের হয়, টুম্পাদের মত মেয়েরা সবার আগে সেগুলো পরে । আজ বড্ড বিরক্ত লাগছে রিক্তার ।গম্ভীর হয়ে বলল, “এবার তোর ওই হেঁড়ে গলায় গান থামা। সকাল সকাল এই সব গান ভালো লাগে না ।“

“কেন ? গানই তো করছি । ঝগড়া তো আর করছি না ।“ বলেই হি হি করে হেসে উঠল। তারপর মুখটা একটু কালো করে বলল, ”তোমার আজকাল কী যে হয়েছে । কাল বললে ,এবার থেকে বড় গলা ব্লাউজ পরে কাজ করতে আসবি না। আজ বলছ গান করবি না । এমন করলে আমি কিন্তু কাজ করতে পারব না বলে দিলাম। “

এই রে, এখন টুম্পা কাজ ছেড়ে দিলে বিপদে পড়তে হবে । আজকাল কাজের মেয়েদের যা ডিমান্ড । এমনিতেই টুম্পার খুব জিদ । কাউকে পরোয়া করে না। পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে একাই থাকে । রিক্তা এই ফ্ল্যাটে আসার পর থেকে এখানে কাজ করছে । ঘরের খুঁটিনাটি সব ওর জানা । যখন রিক্তা হসপিটালাইজড হবে তখন টুম্পাই একমাত্র ভরসা। রিক্তা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ”শরীরটা ভালো নেই তো, তাই কিছুই ভালো লাগছে না রে …”

“কী হয়েছে গো তোমার বৌদি ? কবে থেকে বলছ শরীর খারাপ । কী হয়েছে, তা তো কখনও বলো না ।“

রিক্তা উত্তর দিতে গিয়ে থমকালো । কী বলবে সে ? সত্যি কথা বললে এক্ষুণি সারা পাড়া করে বেড়াবে । এসব কথা পাঁচকান হতে সময় লাগে না । তখন সবাই দয়ার দৃষ্টিতে তাকাবে তার দিকে । এ যেন তার নারী জন্মের অপমান । না, না। সে কিছুতেই তা সহ্য করতে পারবে না । মুখে জোর করে হাসি টেনে বলল, “জানি না রে । মাথা ঘোরাচ্ছে ,কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না । মাঝে মাঝে বমিও পাচ্ছে । ডাক্তার তো দেখাচ্ছি । অনেক টেস্ট করতে দিয়েছে। রিপোর্ট এলে জানতে পারব। “

টুম্পা চোখ টিপে বলল, “গুড নিউজ নয় তো বৌদি ?” সিনেমা দেখে দেখে টুম্পাও অনেক ইংলিশ শব্দ শিখে গেছে । ওর কথা শুনে রিক্তার হাসির বদলে কান্না এল । তাড়াতাড়ি বলল, “ফালতু কথা রেখে রান্নাটা আগে শেষ কর।“ বলে নিজের ঘরে চলে এল ।

ডাক্তার এক গাদা ওষুধ দিয়েছে । রুটিন মাফিক কবে থেকেই তো ওষুধ খেয়ে যাচ্ছে । কিছুই তো হল না । মুখটা বিকৃতি করে পর পর কয়েকটা ট্যাবলেট জল দিয়ে গিলে জানলার পাশে বসল ।

দরজাটা খোলা আছে । টুম্পার গানের আওয়াজ ভেসে আসছে । “ধক ধক করনে লাগা । “ রিক্তা একবার গলা বাড়িয়ে টুম্পাকে দেখল। সে এখন গানের সঙ্গে সঙ্গে নাচেও মগ্ন । সিনেমার মাধুরীর মত বুকটা উপর নীচ করছে । রিক্তা দরজাটা আস্তে করে আবজে দিল ।

আজকাল টুম্পার সব সময় এই লাস্যময়ী ভঙ্গী বিরক্ত লাগে রিক্তার । সেদিন সায়ন্তন কেমনভাবে যেন টুম্পার বুকের দিকে তাকিয়ে ছিল । এটা কি তার মনের ভুল ? সে কি মিছি মিছিই সায়ন্তনকে সন্দেহ করছে ? আলমারির সামনে এসে দাঁড়াল রিক্তা । আলমারি খুলে হ্যাঙ্গারে টাঙানো একের পর এক শাড়িগুলো টেনে নামাতে থাকল । সারা ঘরে ছুড়ে ছুড়ে শাড়িগুলো ফেলছে। প্রত্যেকটা শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ। বিভিন্ন ডিজাইনের ব্লাউজ । রিক্তা এক একটা ব্লাউজ নামাচ্ছে আর ছিঁড়ছে । কেমন যেন হিস্টিরিয়া রুগীর মত করছে । যে ব্লাউজগুলো ছিঁড়তে পারছে না, দাঁত দিয়ে কাটতে থাকল। দুচোখ দিয়ে নির্গত গরম লাভায় রিক্তার গাল বুক ভেসে যাচ্ছে । খুব ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে । উপায় নেই । একটু আওয়াজ হলেই টুম্পা ছুটে আসবে । এত গুলো ব্লাউজ ছিঁড়ে রিক্তা কেমন যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। কাঁদতে কাঁদতে শাড়িগুলোর উপরেই লুটিয়ে পড়ল।

“ বৌদি, ভাত বাড়ছি । বৌদি ?” বলতে বলতে টুম্পা ঘরে ঢুকে পড়েছে । “একি ! , কী হয়েছে তোমার ?” দৌড়ে এসে টেনে তুলল রিক্তাকে ।

রিক্তা নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, “হঠাৎ মাথাটা একটু ঘুরে গেছিল ।“

“ইস! শাড়িগুলো এভাবে ছড়িয়ে রেখেছ কেন ?”

“আরে একটা ব্লাউজ খুঁজছিলাম । এখন এগুলো থাক । বড্ড খিদে পেয়েছে। চল, আগে খেয়ে আসি ।“

খেতে বসতে যাবে এমন সময় রিক্তার মনে পড়ল , ঠাকুরকে ফুল জল দেওয়া হয়নি । মনে পড়তেই টুম্পাকে বলল, “তুই ভাত বাড় । আমি ঠাকুর ঘর থেকে এক্ষুনি আসছি।“ ঠাকুর ঘরে গিয়ে তাড়াতাড়ি পুজোটা সারতে লাগল । সরস্বতী মন্ত্র উচ্চারন করতে গিয়ে থমকালো । মায়ের মন্ত্রে এসব কী বলা আছে ! “কুচ জুগ শোভিত মুক্তাহারে “ দেবীর রূপ বর্ণনাতেও তার বক্ষ শোভার কথা আছে। নিজেকে বড় নিঃস্ব লাগছে রিক্তার ।

“কী গো বৌদি ,তোমার হল ?”

টুম্পার ডাকে ধীর পায়ে রান্নাঘরে এল রিক্তা ।


(তিন)

কলিং বেল বাজতেই রিক্তা সচকিত হল । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সাড়ে সাতটা বাজে । নিজেকে আর একবার আয়নায় দেখে নিয়ে পর্দার ফাঁক দিয়ে দরজার দিকে তাকাল । খুব সুন্দর করে সেজেছে আজ রিক্তা । ঠিক যেমন সাজ সায়ন্তন পছন্দ করে। কান খাঁড়া করে রইল । না দেখেই রিক্তা বলে দিতে পারে সায়ন্তন এখন কী করছে । বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে সে এখন টিভি খুলে বসবে । টুম্পা চা আর কিছু স্ন্যাক্স দিয়ে যাবে । কিন্তু এই যে রিক্তা এখনও টিভির ঘরে যায়নি , কই সায়ন্তন তো একবারও তার খোঁজ নিল না ।

“বৌদি আসছি “ বলে টুম্পা চলে গেল। তারপর সারা বাড়ি যেন নিঝুম । কী ব্যাপার ! টিভির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না কেন ? রিক্তা পর্দা সরিয়ে দেখল সায়ন্তন একটা ম্যাগাজিন খুব মন দিয়ে পড়ছে । রিক্তা খুব সন্তর্পণে সায়ন্তনের পিছনে এসে দাঁড়াল । ম্যাগাজিনের ছবিগুলো দেখে রিক্তার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল । এসব কী ম্যাগাজিন পড়ছে সে ! ছি ছি, এত অধঃপতন হয়েছে সায়ন্তনের ! এখনও রিক্তা বাড়িতে রয়েছে , তার মধ্যেই… । রিক্তা চিৎকার করে উঠল , “ছিঃ ,তুমি এত নিচে নেমে গেছ । আমি ভাবতে পারছি না।“ হঠাৎ অমন চিৎকারে সায়ন্তন চমকে উঠেছে। রিক্তা এক টানে ম্যাগাজিনটা কেড়ে নিয়ে আছড়ে ফেলল। সায়ন্তন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর চুল খামচে ধরল রিক্তা। প্রথমে খানিকটা হকচকিয়ে গেলেও এবার সায়ন্তন রিক্তাকে জড়িয়ে ধরেছে । রিক্তা পাগলের মত সায়ন্তনে গালে খামচে দিচ্ছে । সায়ন্তন রিক্তার হাত দুটো মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরে বলল, “কী পাগলামো করছ ?”

রিক্তা ফুঁসে উঠল, “ আমি ,আমি পাগলামো করছি ? আর তুমি কী করছিলে ? নির্লজ্জ,দুশ্চরিত্র কোথাকার ।“

সায়ন্তন জোর করে রিক্তাকে সোফায় বসিয়ে দিতে গেল । রিক্তা ওর হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে গিয়ে বইটা তুলে নিয়ে বলল ,”এটা আমি সবাইকে দেখাব । তোমার ভদ্র মানুষের মুখোশটা সবার সামনে টেনে ছিড়ে দেব ।“ বলতে বলতে রিক্তা মেঝেতেই বসে পড়েছে। প্রচন্ড কষ্টে তার শরীর কুঁকড়ে আসছে । সায়ন্তন তাড়াতাড়ি এসে রিক্তাকে আস্তে করে তুলে সোফায় শুইয়ে দিয়ে এক গ্লাস জল এনে দিল । জল খেয়ে একটু ভালো লাগছে রিক্তার । কিন্তু মনটা শান্ত হচ্ছে না। সায়ন্তন রিক্তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল , “ওটা ব্রেস্ট ক্যান্সারের উপর একটা জার্নাল । দেশে,বিদেশে বহু প্রতিষ্ঠিত নায়িকাদেরও এই অসুখ হয়েছে। তারা সবাই সেরেও উঠেছে । আমি সে সবই পড়ছিলাম । “


(চার )

ঘুম আসছে না । মোবাইলে সময় দেখল রিক্তা । দুটো বাজে । স্ক্রিন সেভারে নাড়ু গোপালের ছবি। ছবিটার উপর হাত বোলাল । খাটের ও প্রান্তে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে সায়ন্তন । হাত বাড়িয়ে একবার ছুঁল সায়ন্তনের হাত । ওরা প্ল্যান করেছিল বিয়ের তিন বছর পর বাচ্চা নেবে । কিন্তু দু বছর কাটতে না কাটতেই…

কত পুরনো কথা মনে পড়ছে … দিদির ছেলে বাবুয়া । ওর জন্মের পর দিদির এত দুধ হয়েছিল যে বাবুয়া খেয়ে শেষ করতে পারত না । দুধ বুকে জমে যেত । অসহ্য যন্ত্রণা হত। দিদি যখন বাবুয়াকে দুধ খাওয়াতো দিদির মুখটা তখন কেমন পবিত্র দেখাত। রিক্তা চুপ করে পাশে বসে দিদির মুখের দিকে চেয়ে থাকত । এদিকে রিক্তার এক মাসতুতো বৌদিরও সেইসময় ছেলে হয়েছিল । বাবুয়ার থেকে কয়েক দিনের বড়। সে বেচারা মায়ের দুধ পায়নি । বৌদি অসুস্থ থাকায় দুধ হয়নি। মাসি ওকে দিদির কাছে নিয়ে আসত । দিদি প্রথমে রাজী হয়নি। কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল ওর । ঠাকুমা তখন বলেছিল , “এগুলো তো অমৃত ফল রে খুকি। ভগবান মেয়েদের এই অমৃত ভান্ড দিয়েছেন । তোর কত ভাগ্য যে তুই অমৃত দান করার ক্ষমতা পেয়েছিস ।“

রিক্তার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে । বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে । সে কখনও তার বাচ্চাকে অমৃত ফল খাওয়াতে পারবে না । তার মত অভাগিনী পৃথিবীতে কেউ নেই । হা ভগবান,কেন তার সঙ্গেই এমন হল !


(পাঁচ)

আগামীকাল রিক্তাকে হসপিটালে অ্যাডমিট হতে হবে । আত্মীয় স্বজন অনেকেই ফোন করে মনে সাহস দিচ্ছে । কেউবা বাড়িতেও এসে সহানুভুতি জানিয়ে যাচ্ছে । তবে এরা সবাই মহিলা । পুরুষরা কেউই রিক্তাকে এসে কিছু বলছে না । কেমন যেন একটা রাখঢাক ব্যাপার । রিক্তারও কেমন লজ্জা লজ্জা করেছে কোনো পুরুষ বন্ধুর সামনে দাঁড়াতে । চুপচাপ নিজের ঘরে জানলার পাশে সর্বহারার মত বসে আছে । বারবার মনে হচ্ছে তাকে যেন আর ফিরে আসতে না হয় । মায়ের মুখটা খুব মনে পড়ছে । মাও মারা গিয়েছিল এই সর্বনাশা রোগে । কিন্তু সে তো রিক্তার বিয়ের পরে । তিনটে সুস্থ সবল সন্তানের জন্ম দিয়েছিল মা। আর সে তো…

“বৌদি,আজ রাতের জন্য কী বানাব ?” বলতে বলতে টুম্পা ঘরে ঢুকল । রিক্তাকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে থমকাল ।

রিক্তা তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে বলল, “চল যাচ্ছি ।“

খুব নরম গলায় টুম্পা বলল,’কী হয়েছে গো তোমার ?“

রিক্তা মনে মনে বলে উঠল, ন্যাকা ,এমন ভাব করছে যেন জানে না কিছু । মুখে বলল, “তুই জানিস না ?”

মাথা নিচু করে টুম্পা বলল, “তুমি তো কিছু বলোনি । কিন্তু আন্দাজ করেছি ।“

“তাহলে আবার কী ? বুঝতে তো পেরেছিস সব ।“

টুম্পা মুচকি হেসে দরজার দিকে এগিয়ে গেল । হাসি দেখে রাগে রিক্তার পায়ের তালু থেকে মাথার চুল অবধি জ্বলছে। কিন্তু একি, টুম্পা দরজা লক করে তার দিকে ওভাবে এগিয়ে আসছে কেন ? রিক্তার কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক টানে নিজের বুকের কাপড় সরিয়ে ব্লাউজটা খুলে ফেলল টুম্পা।

এ কী দেখছে সে ! রিক্তা নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না ।

টুম্পা হো হো করে হেসে বলল , “বৌদি গো তোমরা যাকে অমৃত ফল বলো, সেটা আসলে বাইরের আবরণ । আসল অমৃত তো মনের ভেতর থাকে । সেটা যত খুশি বিলিয়ে যাও ।“

রিক্তা অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, “ কিন্তু তোর মেয়ে হল কী করে ?”

প্রশ্নটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে টুম্পার মুখে চেহারা পালটে গেছে । গম্ভীর হয়ে বলল , “ও শুধুই আমার মেয়ে । কেন আমাদের মত মানুষেরা মা হতে পারে না ? মা হতে গেলে শুধুই কি নিজের শরীর থেকেই সন্তানের জন্ম দিতে হয় ?” বলেই তাড়াতাড়ি শাড়ি ব্লাউজ পরে রান্না ঘরে চলে গেল ।

অনেকক্ষন একভাবে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল রিক্তা । তার সারাজীবনের ধ্যান ধারণাকে উলটে পালটে দিল মেয়েটা । আস্তে আস্তে ছাদে এসে দাঁড়াল । দূর আকাশে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে । সারা আকাশ জুড়ে লাল আলোর ছটা দেখে রিক্তার মনে হল, সূর্যাস্ত নয় ,সে যেন সূর্যোদয় দেখছে। ডুবন্ত সূর্যের নরম আলোয় রিক্তার মনের কোণে জমে থাকা সমস্ত অন্ধকার একটু একটু করে মুছে গিয়ে বর্ণময় হয়ে উঠছে ।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ