অনির্বাণ বসুর গল্প : গৌঃ গাবৌ গাবঃ



নিজস্ব রন্ধনশালা থাকা সত্ত্বেও হররোজ অখ্যাত রেস্তোরাঁর ততোধিক নতুন খাবার চেখে বেড়ায় গুল মহম্মদ। নতুন-নতুন খাবারের সন্ধান করে সে। যে-খাবারের স্বাদ ভালো লাগে, রসুইকরের কাছে গিয়ে তৎক্ষণাৎ জেনে নেয় সেই রন্ধনপ্রক্রিয়ার যাবতীয় খুঁটিনাটি; আর তারপর তার সরাইখানার খাদ্যতালিকায় উঠে যায় সেই পদটির নাম।

জনাব গুল মহম্মদের সরাইখানায় যদি যেতে চান আপনি, খাইবার পাখতুনখোয়া পৌঁছতে হবে প্রথমে। সেখান থেকে বাসে পেশোয়ার। পুলিশ কলোনি ছেড়ে বাস যখন নাসির বাগ সড়ক ধরবে, পেরিয়ে যাবে আস্‌কারি মসজিদ স্টপেজ, তখন কন্ডাকটরকে বলবেন, আপনাকে নাসির বাগ পুলিশ-চৌকিতে নামিয়ে দিতে। থানার উলটো দিকে বাস থেকে নেমে লাগোয়া রাস্তায় ঢুকে পড়বেন। খানিক এগোলে বাঁ হাতে পড়বে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হামিদ গুল পার্ক। পার্কের পাশের রাস্তা ধরে চলে আসবেন দক্ষিণে—পার্কের ঠিক পিছনে, যেখানে খালিদ বিন ওয়ালিদ মসজিদ নজরে পড়বে আপনার। সেখান থেকে সামান্য দক্ষিণ-পূর্বে আবু হুরাইরা মসজিদ। দুই মসজিদের মাঝে বাজার। বাজারে যে কাউকে জিজ্ঞাসা করবেন গুল মহম্মদের হোটেল, বিলক্ষণ দেখিয়ে দেবে।

গুল মহম্মদের হোটেল রমরমিয়ে চলে। তালিকায় রকমারি সুস্বাদু খাবারের নাম। দারুণ সব রান্না যত্ন করে রাঁধায় রাঁধুনিদের দিয়ে, নোটবুক থেকে নির্দেশ দেয় সময়মতো, তারপর ধোঁয়া-ওঠা সেই খাবার পেশ হয় টেবিলে-টেবিলে। পরিবেশনের আগে প্রতিটি পদ নিজে চেখে পরখ করে গুল মহম্মদ; মনোমতো হলে, জিভ আর মন সায় দিলে তবে খরিদ্দারের নসিবে পৌঁছয় সে-খাবার। গুল মহম্মদের হোটেলে রান্না হয় বাটামশলায়। কেনা গুঁড়োমশলার উপর ভক্তি-শ্রদ্ধা নেই তার। সিন্ধ্‌ থেকে আসে হলুদ, গোলমরিচ আর সরষে। ইন্দোনেশিয়ার মালাক্কা দ্বীপ থেকে আসে লবঙ্গ আর জায়ফল। চিনদেশ থেকে আসে দারুচিনি আর জিরা। নেপাল থেকে তেজপাতা। বিশাখাপত্তনম থেকে সবুজ এলাচ। ইরানের খোরাসান থেকে আনা এক কৌটো জাফরান সরিয়ে রেখেছে সে; প্রতিদিন যে-বিরিয়ানি রোগনজোশ ফিরনি মুর্গ্‌পোলাও হয় হোটেলে, তাতে দেওয়া হয় পাক অধিকৃত কাশ্মীরের জাফরান।

বিরিয়ানি বানানোর সময় সতর্ক নজর থাকে গুল মহম্মদের। বিরিয়ানির মশলা তার নিজের হাতে বানানো। এই ব্যাপারে কাউকে ভরসা করে না সে। চেয়ারে বসে গুল মহম্মদ দেখে, গরুর মাংস ধুয়ে ঝরিয়ে নেওয়া হয় জল। আদা-রসুনবাটা, টক দই, মশলা আর সয়াবিনের তেল দিয়ে ভালো করে মেখে আধ ঘণ্টার মতো সময় রেখে দেওয়া হয় সেটা। গরম তেলে ভেজে নেওয়া হয় পেঁয়াজকুচি। পেঁয়াজ লালচে বর্ণ ধারণ করলে মেখে-রাখা মাংস কষানো শুরু হয়। তেল ভেসে উঠলে অল্প গরম জল দিয়ে দেয় রাঁধুনি। ফুটে গেলে আঁচ বাড়িয়ে ঢেকে দেওয়া হয় পাত্র। মাংস সেদ্ধ হওয়ার অপেক্ষা। মাঝে-মধ্যে নেড়ে দেওয়া কয়েকবার। অন্যদিকে, চাল ধুয়ে ঝরিয়ে নেওয়া হয় জল। সয়াবিন তেলে ভেজে নেওয়া হয় দারুচিনি, তেজপাতা, লবঙ্গ আর এলাচ। গন্ধ ছাড়া মাত্র ওতেই ভাজা হয় পেঁয়াজ। এবার আর লাল হয় না, তার আগেই ঢেলে দেওয়া হয় চাল। আদাবাটা আর নুন দিয়ে নেড়ে দেয় পাচক। চাল ঝরঝরে হয়ে গেলে গরম জল ঢেলে দেওয়া হয়। জল ফুটে উঠলে রান্না করে রাখা মাংস ভরে দেওয়া হয় হাঁড়িতে। হাতা দিয়ে নেড়ে আঁট করে ঢেকে দেওয়া হয় হাঁড়ির মুখ। বিরিয়ানি হয়ে গেলে দেওয়া হয় ঘি। আগুন নিভিয়ে দমে রাখা হয় আরও কিছুক্ষণ। তারপর ছোটো একটা প্লেটে কিছুটা বিরিয়ানি তুলে দেওয়া হয় গুল মহম্মদকে। সে নিজে খেয়ে পরখ করে রোজ। খেয়ে এক বোতল জল নিয়ে গিয়ে বসে কাউন্টারে। অবশ্য যেদিন ভালো কোনও খাবারের সন্ধান পায়, তার পরদিন সকালে বিরিয়ানি চেখেই বেরিয়ে পড়ে হোটেল থেকে। ফিরে এসে ইকবালের থেকে বুঝে নেয় দিনের হিসাব।

যখন যেখানে শোনে নতুন কোনও ভালো খাবারের কথা, অমনি ভিতরটা আনচান করে ওঠে ওর; কতক্ষণে গিয়ে পৌঁছবে সেখানে, নিজে চেখে দেখবে আর ভালো লাগলে রসুইকরকে হাত করে ঠিক জেনে নেবে সেই জুতসই রান্নার তরকিব। শুধু এই কারণেই উর্দু শিখতে হয়েছে তাকে; নয়তো স্থানীয়দের সঙ্গে তো—যারা তার রোজের খরিদ্দার—পুশ্‌তুতেই বাতচিত চলে। দেশের বিখ্যাত হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো সবই প্রায় লাহোর আর করাচি শহরে : ওসব জায়গায় পুশ্‌তুর চল নেই তেমন। অবশ্য এটাও ঠিক যে, দেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের রাজ্য হওয়ায় পাখতুনখোয়ায় সব কিছুরই দাম তুলনায় কম। গুল মহম্মদের হোটেলে গোশ্‌ত্‌ আসে প্রতিবেশী দেশ থেকে। দাম কম পড়ে। মাঝে, আফগানিস্তানে যুদ্ধের বছরগুলোয়, বন্ধ ছিল বর্ডার; সোজাপথ কিংবা ঘুরপথ—সবেতেই বেয়াড়া কড়াকড়ি হয়েছিল সেই সময়। তখন গোশ্‌ত্‌ আসত বেলুচিস্তান থেকে। ওখান থেকেই মাংস আসে পেশোয়ারে, বরাবর। পেশোয়ারে চামড়ার জুতো যত ভালো, গোশ্‌ত্‌ তত আহামরি নয়। স্থানীয় ব্যাপারীরা ভেড়ার মাংস বেচে। এখনও হঠাৎ-হঠাৎ বোমা-গুলি চললে সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় যাতায়াত, যাবতীয় আমদানি-রপ্তানি। স্থানীয় বাজারে শুধু আসিফের দোকানেই গরুর মাংস পাওয়া যায়। তেওহারের সময় রাওয়ালপিন্ডি থেকে গাড়ি-গাড়ি গরু আসে। বক্‌রি ঈদে সেই গরুর মাংস খেয়ে দেখেছে গুল মহম্মদ; কেমন যেন ছিবড়ের মাফিক সেই গোশ্‌ত্‌। ভালো লাগেনি মোটে। বেলুচিস্তান থেকে-আসা মাংসও যে খুব ভালো ছিল, তা নয়; তবু মুখের ভিতর পড়তেই ছিবড়ে হয়ে-যাওয়া সেই জঘন্য মাংসের তুলনায় ঢের পদের ছিল। এক-এক জায়গার মাংস এক-একরকম হয়, অঞ্চলভেদে স্বাদ বদলে যায় গরুর—যুদ্ধের বাজারে বুঝে গিয়েছিল গুল মহম্মদ। ইসলামাবাদের কাঁচা গোশ্‌ত্‌ থেকে দিল বেচ্যান করা খুশবু পাওয়া যায়, গিলগিটের মাংসের স্বাদ ঈষৎ কষাটে, করাচি শহরের ক্ষীরি মাখনের পুরু আস্তর।

এক বাটি ধোঁয়া-ওঠা আশ-এ-আনার নিয়ে গুল মহম্মদ টেবিলে রাখে, চেয়ার টেনে বসে। মাংসকুচি আর ডালিমদানা চেয়ে থাকে স্যুপের ভিতর। চামচে করে অল্প-অল্প তোলে, ফুঁ দেয়। সময় নিয়ে খায়। রসুইখানা থেকে ভেসে আসে কুবিদেহ্‌ কাবাবের সুগন্ধ : গোশ্‌ত্‌ মাখন টমেটো ফ্রাই আর জাফরানের গন্ধ ঘুরপাক খায় রন্ধনশালা জুড়ে। হাঁক দিয়ে এক খানসামাকে ডাকে গুল মহম্মদ, পাখি-পড়ার মতো করে বলে চলে আগামী সকালের নাশ্‌তার নির্দেশ : সুস্থির হয়ে টার্কির মাংস দিয়ে রাঁধতে হবে হালিম। একদম ঢিমে আঁচে হবে পুরো রান্না। রাঁধা হয়ে গেলে দুধে ছেড়ে দিতে হবে গোশ্‌ত্‌। পরিবেশন করতে হবে গরম-গরম। পেশ করার সময় হালিমের উপর ছড়িয়ে দিতে হবে গলানো মাখন আর সামান্য দারুচিনি। ওতে স্বাদ আরও খোলতাই হয়।

হোটেল বন্ধ হয়ে গেলে পর ইকবাল হাঁটতে বেরোয়। গুল মহম্মদ জানে, ছেলে আসলে আড়াল চায়। ওই আড়ালটুকু ওর প্রয়োজন। ছেলে ঘরে ফিরলে পর কামিজ থেকে পোড়া তামাকের গন্ধ পায় বাবা। এইরকম সময়ে গুল মহম্মদের মনে পড়ে যায় সগুফ্‌তার কথা। গোলাপগন্ধের আতরের খুশবু ভেসে আসত বিবিজানের শরীর থেকে। সগুফ্‌তার জানাজায় চোখের কোলে জল, হাতে আতরদান, গোলাপের মিঠা বাস পথে ছড়াতে-ছড়াতে গোরস্থানের ফটক পর্যন্ত হেঁটেছিল সে। চেয়ার-টেবিল অন্যত্র সরিয়ে ফাঁকা জায়গা করে মেহ্‌মানদের বসার বন্দোবস্ত করেছিল। গানে আর কবিতায় আর গল্পে স্মরণীয় হয়ে উঠেছিল মৃত বিবির স্মৃতিচারণ : মেহ্‌ফিল-এ-নাৎ। প্রার্থনায় মিশে থেকেছিল সগুফ্‌তার বেহেশ্‌ত্‌ নসিব হওয়ার খোয়াইশ।

সগুফ্‌তার সঙ্গে তার মোহাব্বতের কিস্‌সা তাদের মহল্লা ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিল কাছে-পিঠের অন্যান্য মহল্লায়। ওদের মধ্যে তো রজামন্দি ছিলই, দুই বাড়ির তরফেও এত্‌রাজ ছিল না মোটে। বছর ঘুরতে-না-ঘুরতেই শাদি হয়ে গেল সগুফ্‌তা আর গুল মহম্মদের। নিকাহ্‌র সেই চাঁদনি রাতে, একান্তে, খুব বেশি বাতচিত করেনি ওরা, শুধু হাতে হাত রেখে—চোখে চোখ—পার করে দিয়েছিল ভোরের আলো ফোটার মাঝের ওয়াক্তটুকু। মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে এলে সম্বিৎ ফিরেছিল দু’জনের।

পরদিন রাতে, ঘুমে অচেতন তখন, নিজস্ব খোয়াবের ভিতর গুল মহম্মদ দেখেছিল ফেরেশ্‌তাকে—ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর অন্তত তেমনটাই মনে হয়েছিল তার; সে দেখেছিল, সগুফ্‌তার বেজান শরীরকে বয়ে নিয়ে চলেছে আজনবি ফেরেশ্‌তা। সেই ফেরেশ্‌তা যে কোথা থেকে এসেছে আর কোথায়ই-বা নিয়ে যাচ্ছে তার মেহ্‌বুবাকে, জন্নতে, না দোজখে—তা দেখার আগেই আঁখ খুলে গিয়েছিল ওর। কপালে আর গলায় পসিনা ফুটে উঠেছিল মোতির মাফিক। ভয় পেয়ে পাশ ফিরেছিল, দেখেছিল, পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে তার দিলরুবা। বেগমের মাথায় আলতো হাত রেখেছিল ও, সামান্য কেঁপে উঠেছিল সগুফ্‌তা—আদরে যেমন ঘুমঘোরেও আহ্লাদ হয় নারীর, তেমনই। ফরাসের উপর রাখা গ্লাস থেকে জল নিমেষে চালান করে দিয়েছিল পাকস্থলীতে। তারপর পায়ে-পায়ে এসে দাঁড়িয়েছিল বাড়ির সামনের উঠোনে।

সেই তিস্‌রি তারিফের রাতও ছিল বিলকুল আগের রাতের মতোই জস্‌বাতি। মাথার উপর সিতারার চমক, মৃদুমন্দ বাতাস, আলোয় একাকার হয়ে যাচ্ছিল আশমান আর জমিন। এমন চাঁদনি রাতেই পৃথিবীতে নেমে আসেন পরীরা, বচপনে নানির মুখে শুনেছে সে। তবু এই জাতীয় খয়ালত দূরে সরিয়ে রেখে গুল মহম্মদ দু’ চোখ ভরে দেখছিল কুদরতের এমনতর আয়োজন। সে আসলে ভুলতে চাইছিল খানিক আগের মনখারাপি স্বপ্নের সবটুকু আবেশ আর তখনই তার শ্রুতিতে আছড়ে পড়েছিল সশব্দ পদচারণা; মাশরিফের দিকে চেয়ে দেখেছিল, বুঝি-বা তারই দিকে হেঁটে আসছে তিন মুসাফির।

মুসাফিরের দল চলে আসে তার একেবারে নজদিক; আবছা অশরীরীর আদলে সামনে দাঁড়িয়ে এরপর কথা বলেছিল প্রথম মুসাফির : ‘তোমার শাদির প্যায়গম পেয়েছিলাম আমরা। ব্যস্ততার কারণে আসতে পারিনি।’

দ্বিতীয় মুসাফির বলেছিল : ‘আমাদের তরফ থেকে তোমার আগামী জীবনের জন্য সালাম, দোয়া।’

তৃতীয় মুসাফির বলেছিল : ‘তোমার দিলরুবা বেশিদিন আর এ-জগতে নেই।’

চিৎকার করে উঠেছিল গুল মহম্মদ। বলবার এবং বোঝানোর চেষ্টা করেছিল; কিন্তু যেহেতু মুসাফিরদের বোঝানো প্রায় অসম্ভব, তাই শেষপর্যন্ত তার আর্তনাদ এসে মিশেছিল খাদে। প্রথম মুসাফির তখন বলেছিল : ‘প্রেম, বিবাহ আর যৌনতার উপর একমাত্র সত্য শুধু প্রভুর আদেশ। প্রভুর নির্দেশ ব্যতিরেকে কখনওই তা সম্ভব নয়।’

দ্বিতীয় মুসাফির বলেছিল : ‘তোমার মাশুকার সঙ্গে তোমার মোলাকাত, মোহাব্বত, শাদি—তুমি ভাবছ তোমাদের রজামন্দিতে হয়েছে। তা কিন্তু নয়, এই সবকিছুই হয়েছে খোদার মর্জিতে। যা তোমার চিরকালের নয়, ক্ষণকালের, তোমার জিন্দেগিতে যাকে নিয়ে এসেছেন সর্বশক্তিমান, তাঁর অধিকারও আছে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার।’

তৃতীয় মুসাফির বলেছিল : ‘যিনি দিয়েছেন, তিনিই ফিরিয়ে নেবেন। তবে তার আগে সে তোমায় দিয়ে যাবে ব্যক্তিগত ইঁয়াদে। সেই নিয়েই বাকি জীবন কাটবে তোমার। তোমার মেহ্‌বুবার কামিয়াবি জান পাবে তোমার হাতে।’

এই পর্যন্ত বলে, সেই ভোররাতে তৃতীয়ার চাঁদ ক্রমে মিলিয়ে আসছিল যখন, সূর্য উঠতে যখন আর সামান্য অপেক্ষামাত্র, পরিষ্কার হয়ে উঠছিল চারপাশ, তখনকার মতো চলে গিয়েছিল তিন মুসাফির। পুবাকাশ আনারদানার মতো লাল হয়ে উঠছিল, মনের ভিতর এক রাশ বিষণ্ণতা চেপে, নিকাহ্‌র দ্বিতীয় রাতের শেষে, ঘরে ঢুকে গিয়েছিল গুল মহম্মদ। বিস্‌তরের উপর তখনও গাঢ় ঘুমে আলুথালু সগুফ্‌তা। এক ঝলক ঘুমন্ত বিবির দিকে চেয়ে গোসলখানায় ঢুকে পড়েছিল সে। ক্রমাগত জল ঢেলেছিল মাথায়। জল গড়িয়ে নেমেছিল মুখ বেয়ে। সেই মুহূর্তে গোসলখানার ভিতর পানি আর আশু আলাদা করে প্যাহ্‌চানের উপায় ছিল না কোনও।

শাদির দু’ বছর ঘুরতে-না-ঘুরতেই সগুফ্‌তার কোল আলো করে ইকবাল এল। তখন সারা বাড়ি জুড়ে বচপনি মেহ্‌ক। রোজানা কাজের চাপে, ঝগড়া আর ভালোবাসায়, হরেক উলঝনে একটা সময় পর গুল মহম্মদ ভুলে গিয়েছিল মুসাফিরদের ভবিষ্যৎবাণী। খেতে ভালোবাসত সে, আর তার বিবিজান খাওয়াতে ভালোবাসত। সুন্যাহ্‌রি সব রান্না করত সগুফ্‌তা। হোটেলের কাউন্টারে ছোট্ট ইকবালকে কোলে নিয়ে বসে তার মন চলে যেত অন্দরমহলে। অবসরে তারিয়ে-তারিয়ে দেখত সগুফ্‌তার মনোযোগী রান্না।

কড়াইতে তেল গরম হয়ে এলে পেঁয়াজ আর রসুন দিয়ে বেরেশ্‌তা ভেজে নিত সগুফ্‌তা। তারপর জল ঝরানো গোশ্‌ত্‌ ভাজত মোলায়েম করে। তখনই দিয়ে দিত নুন, এলাচ, দারুচিনি, তেজপাতা, আদাবাটা আর সামান্য চিনি। একমনে কষাতে থাকত। কষানো হয়ে গেলে কাশ্মীরি লংকার গুঁড়ো জলে গুলে ঢেলে দিত কড়াইয়ে। জল দিত পরিমাণমতো। অপেক্ষা করত জল ফোটার। গোশ্‌ত্‌ ফুটে গেলে হিং আর এক চিমটে জাফরান ছড়িয়ে দিয়ে কড়াইয়ের মুখ বন্ধ করে দিত সে। কমিয়ে দিত আঁচ। তার খানিক পরে কড়াইয়ের ঢাকনা সরিয়ে, ধোঁয়া-ওঠা রান্নার খুশবু নিতে-নিতেই ডাক দিত তার মিঞাজানকে : ‘জনাব, আপকে পসন্দি কা রোগনজোশ তৈয়ার হ্যায়। আ যাইয়ে, আ কর তস্‌রিফ রাখ্‌খিয়ে।’

সগুফ্‌তা বিহীন বলয়ে, সঙ্গহীন অবসরে, সঙ্গীবিহীন অন্ধকারে এইসবই মনে পড়ে যায় গুল মহম্মদের। জল আসে আঁখিপাতে। হাতের চেটোয় মুছে নেয় চোখ। নোটবুক খুলে বসে। প্রথম দিকের অনেক ক’টা পন্‌নায় সগুফ্‌তার লিখাই। যত রান্নার পদ্ধতি জানা ছিল তার, সব সে লিখে রাখত এই নোটবুকে। গুল মহম্মদ আগে শুধু খেতেই ভালোবাসত, সগুফ্‌তার এন্তেকালের পর থেকে সে খাওয়াতেও ভালোবাসে। সগুফ্‌তার গুণপনা এখন গুল মহম্মদের নিজস্ব কামিয়াবি।

গুল মহম্মদের হোটেল দিব্যি চলে, চলতেই থাকে। আগের রান্নার পাশাপাশি নতুন-নতুন খাবারের নামও যোগ হতে থাকে; দেওয়ালে ঝোলানো সাদা বোর্ডের উপর নীল মার্কারে পুশ্‌তুতে লেখা হয়, প্রয়োজনে মুছে দেওয়া যায় সেদিনের মতো শেষ হয়ে গেলে। সবসময় মোছেও না, কখনও-সখনও ওই নির্দিষ্ট পদটির পাশে ছোটো করে একটা কাটা চিহ্ন এঁকে দেয়। খরিদ্দার বুঝে যায়।

মাস খানেক আগে বেলুচিস্তান গিয়েছিল গুল মহম্মদ। খোঁজ পেয়েছিল নতুন খাবারের। মুরগির পাতুরি। পাতুরির চল একদমই নেই তাদের অঞ্চলে। ইদানীং বিদেশি সব রেস্তোরাঁ গজিয়ে উঠতে থাকায় খাবারের মধ্যে বৈচিত্র্য এসেছে। তবু, গুল মহম্মদের মনে আশঙ্কা জাগে, এর ফলে তাদের নিজেদের যে-রান্না, দেশোয়ালি খানা, সেসব হারিয়ে যাবে না তো? অবশ্য বেশিক্ষণের জন্য স্থায়ী হয় না সেই ভয়। মশলাদার খাবারের স্বাদ সবসময়ই ভালো; ওই জায়গা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। মুরগির পাতুরি খেয়ে দেখেছে সে। আহামরি লাগেনি তেমন। তাই তার হোটেলের বোর্ডেও ওঠেনি সেই পদের নাম।

বেশ কিছুদিন ধরেই গুল মহম্মদ খেয়াল করে, ভিড় কমছে হোটেলে। কারণ খোঁজে সে, কেন এমন হচ্ছে হঠাৎ—বোঝার চেষ্টা করে। সব ক’টা রান্না বারবার করে চাখে : রান্নায় কোনও গলতি হচ্ছে কিনা, বুঝে নিতে চায়। কোনও খারাবি ধরা পড়ে না রান্নায়। যারা খেতে আসে, খাওয়ার পর টাকা দেওয়ার সময় কথায়-কথায় জেনে নিতে চায়, রান্না ঠিক ছিল কিনা। নঞর্থক কোনও জবাবই পায় না কারও তরফে। মেজাজ খিঁচড়ে ওঠে ভিতর-ভিতর। তবু প্রকাশ্যে সংযত থাকার চেষ্টা করে। কাউন্টারে বসে পেন দিয়ে, অপটু হাতে, আপাদমস্তক ঢাকা তিনজন মানুষের ছবি আঁকে : তিন মুসাফিরের ছবি।

সেই রাতেই মুসাফিরেরা আসে।

প্রথম মুসাফির বলে : ‘মানুষের মনে কৌতূহল অদম্য।’

দ্বিতীয় মুসাফির বলে : ‘কৌতূহলের নিরসন না-হওয়া পর্যন্ত মানুষের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করে, তিষ্ঠোতে দেয় না তাকে।’

তৃতীয় মুসাফির বলে : ‘মানুষ সব কিছু জানতে চায়। অথচ সব জানার পরিণতি ভালো হয় না সর্বদা।’

মুসাফিরের দল যেমন আচমকা আসে, চলেও যায় তেমনই।

বাজারের ভিড় গুল মহম্মদকে জানিয়ে দেয় তার হোটেলে উপর্যুপরি ভিড় কমতে থাকার প্রকৃত কারণ। ফুলবাগিচার পাশে যে-রেস্তোরাঁটা হয়েছে বছর দুয়েক, খরিদ্দার উপচে পড়ছে সেখানে; লাচ্ছা পরাঠা আর ভুনার গল্প ছড়িয়ে পড়ছে লোকের মুখে-মুখে : এত স্বাদু গোশ্‌ত্‌—গরুর—এই এলাকার মানুষ আগে খায়নি কখনও।

হোটেলের কাউন্টারে ইকবালকে বসিয়ে গুল মহম্মদ চলে আসে ফুলবাগিচার কাছের সেই রেস্তোরাঁয়। এলাকার মানুষজন সাধারণত তাকে চেনে; রেস্তোরাঁর মালিকও ‘আইয়ে জনাব, আইয়ে’ বলে তাকে খাতির করে নিয়ে বসায় ভিতরে। লাচ্ছা পরাঠা আর ভুনা গোশ্‌তের ফরমায়েশ জানিয়ে সে এদিক-ওদিক ঘাড় ঘোরায়। দোকানের ভিতর হালফিলের সাজ। পুরোনো দিনের সূক্ষ্ম কাজের জাফ্‌রি হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমে। বিষণ্ণতা গ্রাস করে তাকে। যার চমক বেশি, ঠাঁটে ভরপুর, তার দিকেই মানুষ ছোটে।

গরম-গরম ভুনা আর পরাঠা আসে। পরিবেশকের দিকে চেয়ে মুচকি হেসে গুল মহম্মদ ‘শুক্‌রিয়া’ বলে। বেয়ারা সামনে থেকে সরে গেলে পরাঠার খানিকটা ছিঁড়ে ভুনাতে ডুবিয়ে নেয়। আঙুলে আলতো করে ধরে মুখের সামনে এনে বার কয়েক ফুঁ দেয়। মুখে পুরে দেয় তারপর। প্রথম কামড়টা দেওয়া মাত্র চমকে ওঠে, এত সুস্বাদু গোশ্‌ত্‌ সত্যিই এর আগে কখনও খায়নি সে। পরিতৃপ্তির সঙ্গে পুরোটা খায় গুল মহম্মদ। টাকা দেওয়ার সময় মালিকের কাছে খানসামার হদিশ চায়। ভিতর থেকে পাচককে ডেকে দেওয়া হলে তার সঙ্গে কথা বলে সে জেনে নিতে চায় রান্নার ছোটোখাটো টোটকা। রাঁধুনি যা বলে, তার সবটাই বহু আগে থেকে জানা গুল মহম্মদের। সে বোঝে, রান্নায় নয়, যাবতীয় আস্বাদ ছুপা আছে মাংসের ভিতর।

গুল মহম্মদ এরপর সরাসরি মালিককেই জিজ্ঞাসা করে মাংসের উৎস। মালিকও দরাজ দিলের, অকপটে জানিয়ে দেয়, পড়োশি দেশ থেকে গোশ্‌ত্‌ আসছে। আম্‌রিকি কোম্পানি একটা ওখানে কারোবার খুলেছে, ওরাই এখানে গোশ্‌ত্‌ বরামত করছে।

মাংস সরবরাহকারী সেই কোম্পানির নাম জেনে, আপনমনে বিড়বিড় করতে-করতে, নিজস্ব রন্ধনশালায় ফিরে আসে গুল মহম্মদ। ওখান থেকে গোশ্‌ত্‌ আনানোর নির্দেশ দেয় ইকবালকে।

আম্‌রিকি কোম্পানি গোশ্‌ত্‌ পাঠায় প্যাকেট করে। ঠান্ডা গোশ্‌ত্‌।

নতুন মাংসের বদৌলতে ফের কপাল খুলে যায় গুল মহম্মদের। সাময়িক থমকে-যাওয়া পসার পুনরায় ফিরে আসে।

একদিন ভোররাতের দিকে ঘুম ভেঙে গেলে ঘরের বাইরে, খোলা আশমানের নিচে, এসে দাঁড়ায় গুল মহম্মদ। মাশরিফের দিকে তাকাতেই দেখে, হেঁটে আসছে তিন মুসাফির। ডান হাত তুলে অভিবাদন জানায় সে।

প্রথম মুসাফির বলে : ‘ব্রাজিলের পর হিন্দুস্থানই সবচেয়ে বেশি গরুর মাংস রপ্তানি করে। তোমার দুকানের গোশ্‌ত্‌ আসে হিন্দুস্থান থেকে।’

দ্বিতীয় মুসাফির বলে : ‘গরুর মাংস রাখার জন্য হিন্দুস্থানে পিটিয়ে মারা হচ্ছে যাদের, সেই বদনসিবদের মাংস গরুর মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে রপ্তানি করা চলছে।’

তৃতীয় মুসাফির বলে : ‘মানুষের মাংস সর্বাধিক সুস্বাদু।’

পুবাকাশে আলোর রেখা দেখা দিলে মিলিয়ে যায় তিন মুসাফির।

ভোরবেলা ঘরের বাইরে আসতেই ইকবাল দেখে, গলায় প্রথমে এক আঙুল, তারপর দুই তিন চার হয়ে পাঁচ আঙুল ভরে দিয়ে ওয়াক্‌ তুলে চলেছে তার আব্বাজান।

বমি করার চেষ্টা করে চলে গুল মহম্মদ। চোখ থেকে বেরিয়ে আসে জল, মুখ থেকেও।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ