শঙ্খদীপ ভট্টাচার্যের গল্প : আমি যখন সুষমা মণ্ডল


সেদিন অফিসে আমার হঠাৎ হার্ট-অ্যটাক। সত্যি নয়, অভিনয় করেছিলাম। কেন? সেটাই বলি।
 
শুরু করতেই হয় আমার চাকরির জায়গাটি থেকে যা সকল শ্রেণিরমানুষের চোখে বেশ আকর্ষণীয়। ভিতরে যারা কাজ করেন তাদের পোশাক ইস্তিরি করা, কথাবার্তায় পরিশোধিত শিষ্টাচার এবং সবচেয়ে বড় কথা কখন কাকে ঠিক কী বলতে হবে সে সম্পর্কে তাদের জ্ঞাননিখুঁত বললেও বেশি বলা হয় না। পুরো মেঝেটাই কার্পেটে মোড়া। বাথরুমে ফুলদানি। ফুলদানিতে টাটকা গোলাপ, কখনও বাক্যালেন্ডুলা অফিসিনালিস। করিডোরের দুপাশে নামীদামী অয়েল পেইন্টিং। কাজের ক্লান্তিতে মন চা-কফি চাইলে ক্যানটিনে বিনেপয়সায় লেমন টি, গ্রিন টি, এসপ্রেসো, ক্যাফেলাত্তে তো আছেই। আমার ম্যানেজারের নাম মোনালিসা। মোনালিসা নামেই ছোটোবেলার এক বন্ধু ছিল। স্কুলে একসঙ্গেই পড়তাম। একদিন তার টিফিন চুরি করে ডিম-পাউরুটি খেয়েছিলাম। সে বুঝতে পেরেও সেদিন অবশ্য কিছু বলেনি। শোধ তুলেছিল পরের দিন আমার রুটি তরকারি সাবাড় করে। তারপর চোখাচোখি হতেই দুজনের সে কী হাসি!আমার তো পেটে খিল ধরে গিয়েছিল। হাসির দমক থামলে স্কুলের সবচেয়ে পুরোনো আমগাছটার নিচে টিফিন ভাগাভাগি করে খেয়েছিলাম।
 
একদিন হঠাৎই এইসব কথা মনে পড়ায় মোনালিসা মানে আমার ম্যানেজারকেই ছোটোবেলার বন্ধু মনে করে ফেলি। অফিসে মোনালিসাগড়পড়তা অন্যান্য সকলের চেয়ে অনেক বেশি প্রফেশনাল। কাজেছোটোখাটো ভুল হলেও ক্ষমাটমা একদম করে না। কড়া কথাও শুনতেহয় মাঝেমধ্যেই। তবে রাত জেগে কাজ করলে গালভরা প্রশংসা। একদিন হঠাৎই বাড়ীতে কারা থাকে, আমি কী গান শুনতে ভালবাসি, আমার পছন্দের সিনেমা, এইসব জিজ্ঞেস করতে শুরু করল। আগেকখনোই সে এমন অপ্রত্যাশিত কৌতূহল দেখায়নি। আমি খুশিহয়েছিলাম তার এই প্রশ্নে এবং সেদিনই তাকে প্রথমবারের জন্যমানুষ-মানুষ মনে হয়েছিল। মনে পড়ে গিয়েছিল ছোটোবেলারমোনালিসার কথা। পরের দিন তাকে আমি আমার ছোটোবেলার বন্ধু মনে করেই পাল্টা জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বাড়ীতে কারা থাকে, সে কী গান শুনতে ভালোবাসে, প্রিয় সিনেমা, লেখক এইসব। আমার প্রশ্নেসে কেবল সৌজন্য হাসিটুকু হেসে একটা কঠিন কাজ একঘন্টার মধ্যে ডেলিভারি করার হুকুম দিল । হ্যাঁ, হুকুম। সত্যি কথা বলতে সেদিন আমি একটু আহতই হয়েছিলাম কিন্তু মোটেই তা প্রকাশ্যে আনিনি। দাঁতে দাঁত চেপে অভিনয় করেছিলাম যাতে আমাকেও তার মতোইপ্রকৃত প্রফেশনাল দেখায়। সেদিনের ঘটনার মতোই আরও অনেককিছু লাগাতার অফিসে ঘটে যাওয়ার পর থেকেই আমার আশপাশে যারা কাজ করেন তাদেরকে মনখারাপের সময় মানুষ-মানুষ হিসেবে দেখতে প্রচন্ড ইচ্ছে করলেও আনপ্রফেশনাল আদেখলাপনাটা চাগারদেওয়ার আগেই আমূল পিষে দিই। আবেগটাবেগ যা কিছু আছে সবদমিয়ে মুখের ভাব এমনই রাখি যে মোনালিসা বুঝতেই পারে না যেআমার ভিতরটা দাউ দাউ জ্বলছে। যে কোনও মুহূর্তে আমি গ্রেনেডেরমতো ফেটে পড়তে পারি। তখন থেকেই আমি অফিসের সেরাঅভিনেতা।
 
সেদিন এমনিতে সব ঠিকঠাকই ছিল। ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক, আকাশ অংশত মেঘলা নয় , পাড়াপড়শি বন্ধুবান্ধব চেনাশোনামানুষগুলো সকলেই খোশমেজাজে নিজেদের কাজ এগিয়ে নিয়েযাচ্ছেন। তাদের একে অপরকে বুঝে নেওয়ার ধরনগুলোও মোটামুটিএকইরকম ছিল। আসলে সমস্যাটা ছিল আমার তরফে। কেন জানিনা সেদিন তাদের সবাইকেই মানুষ-মানুষ হিসেবে দেখার আদেখলাপনাটাই আবার ভীষণ রকম জাঁকিয়ে বসেছিল। অফিসেএসে মোনালিসাকে বলেই ফেললাম, 'চলো প্রথমে আমরা হেসেলুটোপুটি খাই আর তারপর ওই আমগাছটার ছায়ায় খুব কাছাকাছিবসে টিফিন ভাগাভগি করে নিই।' একথা শুনে মোনালিসা কিন্তুএকদম হাসেনি। রেগেও যায়নি। মোনালিসার অভিব্যক্তিকে অক্ষরেফেলে বুঝেছিলাম আমাকে তার এলিয়েন গোছের কিছু একটা মনেহয়েছিল, হয়তো বা অ্যান্ড্রোমেডা গ্যালাক্সির বহুমাত্রিক অক্টোপাস।নিদেনপক্ষে একটা আরশোলা যা দেখে মানুষ ভয় পেয়ে ছিটকে যায়অথবা পিষে মারে। তবুও, হ্যাঁ তবুও মোনালিসাকে, অফিস আরঅফিসের বাইরের সবাইকে মানুষ-মানুষ হিসেবে দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় সেদিন আমি হার্ট অ্যাটাকের অভিনয় করেছিলাম। হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়লাম। পলক না ফেলে মরা চোখেতাকিয়ে থাকলাম অফিসের চমৎকার ফলস সিলিং-এর দিকে।আশপাশের অনেকেই ছুটে এল তৎক্ষণাৎ। আমার হাত ধরল। সেইপ্রথম, কোনও অচেনা কলিগ। সকলেই তখন আমার কথাইভাবছিল। শুধু, শুধুই আমার কথা। মোনালিসা চেঁচিয়ে উঠল, 'অ্যাম্বুলেন্স অ্যাম্বুলেন্স।' আমার মুখে অক্সিজেন মাস্ক। মোনালিসাবলছে, 'আর ইউ ওকে?' প্রেসারটা চেক করো কুইক। আমাকে ঘিরে কমকরে হলেও গোটা বিশেক মানুষ গিজগিজ করছে। মুখের খুব কাছে কেউ বলছে, 'কী অসুবিধা হচ্ছে? বুকে ব্যথা করছে? আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? ' সকলেই চাইছিলেন আমি যাতে দুম করে মরে না যাই, নিজের মতো করে আমাকে যথাসম্ভব সাহায্যও করছিলেন। আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেওয়া হল। সঙ্গে গিয়েছিল আমার পাশেরডেস্কে বসা ছেলেটি। নাম জানিনা তবে অ্যাম্বুলেন্সে আমি তার হাতটাধরে ছিলাম। আমার কিছুই হয়নি তবুও। মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরেশ্বাস-প্রশ্বাস আর অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন দুইই খুব স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। কেমন একটা তাড়াহুড়োর মধ্যেই সবকিছু ঘটে গিয়েছিল। আমি তো এটাই চেয়েছিলাম, খুব ভালো লাগছিল কারণ তাদেরসকলকে আর মোনালিসাকেও সত্যিকারের মানুষ মনে হয়েছিল ওই অল্পসময়ের জন্য হলেও। কেবল আমার জন্য চিন্তায় সকলের উদ্বেগ তখন খাঁটি এবং তা একেবারেই অভিনয় ছিল না। আমার এই ফেকহার্ট অ্যাটাকের আগের দীর্ঘ সময়টার ঠিক উল্টো।
 
আমার ইসিজি সুগার প্রেসার সবই নরমাল। ডাক্তার বললেন, অল ওকে, পরে একটা কার্ডিওলজিস্টকে দেখিয়ে নেবে, তারপর একদিন বাড়িতে রেস্ট। মোনালিসা বলেছিল, 'টেক কেয়ার, গেট ওয়েল সুন।'পরের দিন মোনালিসা মেসেজ করল, কবে জয়েন করতে পারবি। জানিস তো এখন ইয়ার এন্ড। প্রচুর প্রেসার। ছোটোবেলায় গরমের ছুটির পর মোনালিসাকে মানে বন্ধু মোনালিসাকে স্কুলে আবার দেখতে পাওয়ার একটা অন্যরকম আনন্দ ছিল। বুঝলাম আমাকে কাজে ফিরতে হবে। কারণ আমি তো বহাল তবিয়তে বেঁচে। তার চেয়েও বড় কথা আমি যাতে মরে না যাই, আবার সুস্থ শরীরে কাজে ফিরতে পারি তার জন্য সকলে প্রচুর চেষ্টাও করেছেন। তারা চেয়েছেন ইয়ার এন্ডেরহাই প্রেসার আর অ্যাবনরমাল ডেডলাইন তাদের সঙ্গে ভাগ করে সামলে নিতে পারি! আরও বড়ো কথা, আমার ইসিজি, সুগার, প্রেসারসবই তো নরমাল।
 
আমি দাবানল নই, গ্রেনেডও না। যতই বলি দাউ দাউ জ্বলছি, জ্বলতেজ্বলতে গ্রেনেড হয়ে একদিন ফেটে পড়ব, এসবই মুখের কথা। কনেসাজানোর অলঙ্কার মাত্র। ভাবছিলাম, অফিসে দিনদুপুরে এমনএকটা হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল, কই কিছুই তো বদলে গেল না। এখন তো কেউ দগদগে উদ্বেগ নিয়ে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে জিজ্ঞেসকরছে না, তুমি ভালো আছ তো ভাই? আমাকে ঘিরে সেই মানুষ-মানুষ হট্টগোলটা গেল কোথায়! মোনালিসা নিজের কেবিনে। সিসিটিভি মাথার ওপরে। আমি যে কম্পিউটারে কাজ করি সেটাতেওএই একই ব্যবস্থা। আমি কতক্ষন কী কাজ করলাম তার সব হিসেব রাখে। এক মিলিসেকেন্ডের ফাঁকি ধরে নিতে ওই সফটওয়্যারটির নাকি এখন দারুণ ইন্টারন্যাশনাল ডিমান্ড। শুধু কি অফিসে, বাইরেও তো।আমি বাজার থেকে কী কিনলাম, কতটা ফ্যাট-ফ্রি খাবার খাচ্ছি, দাউদাউ জ্বলে গ্রেনেডের মতো ফেটে না পড়ে অফিসের সমস্ত কাজ সময়মতো খতম করছি কিনা। আরও কত কী!
 
আমি কিন্তু নাছোড়বান্দা। মানুষ খোঁজার আদেখলাপনা সেদিন আবার আমায় পেয়ে বসল। ভাবলাম বুকে হাত দিয়ে একই ভাবেমাটিতে আছড়ে পড়ি। ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসুক। মাথার পেছনেখানিক চোট। কিন্তু এইবার কি সবাই আগের বারের মতো ছুটে আসবে? মানুষ যেহেতু শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান প্রাণী, ছুটে এলেও তাদের মধ্যে নিশ্চই কেউ একজন ভুরু কুঁচকে বলে উঠবে, এক সপ্তাহের মধ্যে দুটোঅ্যাটাক! ভেরি স্ট্রেঞ্জ! মালটা ব্লাফ দিচ্ছে না তো। কেউ নিশ্চয়ইরাখাল বালকের সেই গল্পটা মনে করিয়ে দেবে। সত্যি কথা বলতে স্ট্রেঞ্জতো বটেই, হাস্যকরও দেখাবে। যদিও এ কথা একেবারেই সত্যি যে আমার আদেখলাপনা এতটাই তীব্র যে হাস্যকর হলেও সপ্তাহে দুবার হার্ট অ্যাটাকের অভিনয় করতেও আমি ভীষণ মরিয়া।
 
অগত্যা অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম কাউকে কিছু না জানিয়েই ।বড়ো রাস্তায় উঠলাম। হাঁটলাম মিনিট কুড়ি । পেছনে আমার চোদ্দ তলার অফিস বিন্ডিং ছোটো হয়ে আসছে। কিছু দূর এগোতেই দুপাশেজলাশয়। জলটা মিহি সবুজ। মাটির রাস্তা ধরে হাঁটছি। ছোটো ছোটোবাড়ি দুপাশে। লোকজন এখানে একদমই কম। দু একটা নৌকা রয়েছেপার ঘেঁসে। মাঝে মাঝে স্থানীয় মানুষ সাইকেলে আমাকে পাশ কাটিয়েচলে যাচ্ছে সরু মেঠোপথ ধরে। কয়েকটা সাদা বক উড়ে গেল। একসঙ্গে অনেক পাখি ডাকছে। গাছপালা জল মাটি ছাড়া আরতেমন কিছুই নেই। পেছনে তাকালাম। এখন অফিস বিল্ডিঙটাপুরোপুরি উধাও। গাড়ীর শব্দটব্দও কিছু নেই, শুধুই পাখির ডাক। আরও কিছুটা হাঁটলাম। একটা মনের মতো জলাশয় চোখে পড়ল। জলাশয়ের গা ঘেঁসে একটা পাকা একতলা ঘর। উঠোনের বেঞ্চিতে যেবয়স্ক মানুষটি বসেছিলেন তার গায়ের রঙ কালো, মাথা ভর্তিউসকোখুসকো সাদাচুল। অনেকদিনের না কাটা দাড়ি। সাদা গেঞ্জি পাজামায় ধুসর হলদেটে দাগ। আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। তিনি আমাকে দেখলেন, কিছু বললেন না, জলাশয়ের দিকে চোখ রাখলেন। আমিও চুপ। তিনিও। অনেকক্ষণ আমরা দুজনেই জলাশয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। দুটো কুকুর এল। মনে হয় এখানেই থাকে। আমাকে দেখে কোনও প্রতিবাদ না জানিয়েই বাড়ীর উঠোনেকুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ল। আমি আর মোনালিসা মানে বন্ধু মোনালিসা ছোটোবেলায় যে স্কুলে পড়তাম, ঝোলানো লোহার ডান্ডার ঘা মেরে টং টং শব্দ করে পিরিয়ড, টিফিন আর ছুটির ঘোষনাকরতেন ঘন্টাদাদু। তার কথা মনে পড়ল। আমার পাশে বসামানুষটিও অনেকটা সেই রকম দেখতে। ঘন্টাদাদুর সঙ্গে কথা বলাহয়নি কখনও। এখন কথা বলার অঢেল সুযোগ। বললাম, 'আপনি এখানে থাকেন?'
 
'না পাহারা দিই। এই যে মাছের ভেড়ি দেখছ, ও পাহারা দিই।'
 
'এই বাড়িটা কার?'
 
'এ তো মালিকের।'
 
জলাশয়টা বেশ বড়। প্রায় একটা ফুটবল মাঠ। জলাশয়ের উল্টোপ্রান্তে নৌকা দেখা যাচ্ছে। নৌকায় একজন বসে। তিনি হাত নাড়িয়েকাউকে ডাকছেন মনে হয়।
 
'নৌকায় কে? কাউকে ডাকছেন মনে হয়?'
 
'না না। ও তো পাখি তাড়াচ্ছে।'
 
'কী পাখি?'
 
'পানকৌড়ি। মাছ খেয়ে ফেলে। মালিকের অনেকের ক্ষতি হচ্ছে কিনা। তাই ও পাহারা দেয়। পানকৌড়ি দেখলে আওয়াজ করে তাড়ায়।'
 
'পানকৌড়ি! কই দেখতে পাচ্ছি না তো?'
 
'সেতো ও আওয়াজ করছে বলে সব পাখি পালায়। না হলে দেখতে।এক একটা পানকৌড়ি দেড়শ গ্রামের চার পাঁচটা মাছ খেয়ে নেয়। ও না থাকলে বিশ পঁচিশটা পানকৌড়ি এখানে চলে আসত।'
 
'এইটা কি ওনার কাজ?'
 
'হ্যাঁ। সকাল থেকে বিকেল অব্দি।'
 
'মালিক তার জন্য টাকা দেয়?'
 
'হ্যাঁ।'
 
' কত?'
 
'দিনে দুশো কুড়ি টাকা। আমি দুশো পঞ্চাশ পাই।'
 
জলাশয়ের দিকে এগিয়ে গেলাম। নৌকাটা এদিকেই আসছে। কাছে আসতে দেখলাম ডিঙির মতো কিছু একটায় চেক শাড়ী আর মাথায় গামছা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন মাঝবয়েসী এক মহিলা। নৌকা এখন পারে এসে থেমেছে। মানুষটি থামেননি। হাতে একটা ডান্ডা নিয়ে নৌকার গায়ে ঘা দিচ্ছেন আর বলছেন, 'আও আও ও ও ও..।'জিজ্ঞেস করলাম, 'সকাল থেকে নৌকায় ঘা মারছেন?'
 
'হ্যাঁ। পাখি আসে। তাড়াই দি।'
 
'পানকৌড়ি?'
 
'হ্যাঁ।'
 
'পানকৌড়ি তো মাছ খাবেই। না খেলে বাঁচবে কী করে।'
 
'সে তো ঠিক কথা। এত মাছ, দু-চারটা মাছ খেলে কী আর হবে। কিন্তু বাবুর ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে ব্যবসায়। তাই তাড়াতে বলেছে।'
 
'কত টাকা পান আপনি?'
 
'দিনে দুশো কুড়ি টাকা।'
 
'কত বছর কাজ করছেন?'
 
'চল্লিশ বছর।'
 
'চল্লিশ! শুধু নৌকায় ঘা মেরে পাখি তাড়াচ্ছেন চল্লিশ বছর! আরআপনার স্বামী? কী করেন?'
 
'ওর তো এখন কাজ নাই। ঘাসের বান্ডিল বেচে। দশ টাকা বান্ডিল।'
 
ডিঙির মাঝখানটায় জল জমে রয়েছে। খুব কষ্ট করে একজনবড়জোর বসতে পারে।
 
'সকাল থেকে সন্ধ্যে অব্দি কাজ করেন তো খাওয়া দাওয়া করেন কোথায়?'
 
'নৌকাতেই খাই। ওই যে থলে দেখছ, ওতে খাবার আনি। এখানে বসেখেয়েনি। চলে গেলেই সব পাখি চলে আসবে, মাছ খেয়ে নেবে।'
 
'মালিকের নাম কী?'

 'ক্ষীতিশ মণ্ডল।'
 
'মালিক এসে দেখে না আপনি কাজ করছেন কিনা?'
 
'আমি তো কাজ করি। মালিক জানে। যারা কাজ করে না তাদের বসিয়ে রেখেছে। বাইক নিয়ে আসে ওই পারে। ওখান থেকে দেখে।'
 
'টাকা কখন দেয়।'

 'সকালে, কখনও বিকেলে।'
 
'পানকৌড়িগুলিকে পারলে একটু আধটু মাছ খেতে দেবেন। না খেলে ওরা তো মরে যাবে? মাছ পোকা খায়। পানকৌড়ি মাছ খায়। আমরা মাছ। এটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। তাই না?'
 
'সেতো বুঝিগো বাবু। কিন্তু পানকৌড়ি মাছ খেয়ে নিলে আমি কী খাব। কাজ চলে যাবে আমার। মালিক তাড়িয়ে দেবে।'
 
একথা বলেই তিনি হেসে উঠলেন। নৌকায় ঘা মারলেন জোরে।
 
'আর ওই যে বাড়িতে যিনি বসে আছেন ওনাকে চেনেন?'
 
'হ্যাঁ, ও তো ভেড়ি পাহারা দেয়। আমাদের বাড়ির কাছেই থাকে।'
 
'কী নাম ওনার?'
 
'গোপালচন্দ।'
 
'আর আপনার?'
 
'আমার?'
 
'হ্যাঁ আপনার নাম?'
 
'সুষমা মন্ডল।'
 
বাঁজখাই শব্দে একটা প্লেন উড়ে গেল। আকাশে ভেড়ির অন্য প্রান্ত থেকে আমার অফিসের দিকে। অফিস, অফিসে মোনালিসা, অজস্র কলিগ আর বাথরুমের পাশে রাখা ফুলদানির কোলাজ দপ করে জ্বলে উঠল। সুষমা মণ্ডল কিন্তু ঘা মেরেই চলেছেন। চেঁচিয়ে বলছেন, 'আও আও......ও ও ও। ' ঘন্টাদাদুমানে গোপালচন্দ্র এখনও অতন্দ্র প্রহরায় তাকিয়ে রয়েছেন জলাশয়ের দিকে।
 
ঘন্টা দেড়েক পর অফিসে ফিরলাম। আমার নিজস্ব ডেস্ক। ডেস্কেরপাশের জায়গাটাকে অকুস্থল মনে হয়। চক দিয়ে মানুষের একটা শরীর আঁকা রয়েছে। ফেক হার্ট অ্যাটাকের পর আমি ঠিক যেভাবেশুয়েছিলাম হাত পা থেবড়ে। কলিগদের কাজে এই সময়টায় মনোযোগঅনেক বেশি। আমেরিকায় অফিস খুলল বলে। এসেই আমাদের সারাদিনের কাজের হিসেব নেবে। শুক্রবার বিকেল হলেও কোনওছাড়াছাড়ি নেই। আমার ক্লায়েন্ট নেব্রাস্কায় থাকে। ওখানেই অফিস। নাম ক্রিস লুকাস। আমি জানি লুকাসের কাছে অফিস পালিয়ে ওইভেড়িতে কাটানো দেড় ঘন্টা লুকিয়ে রাখা খুব কঠিন। নিজেকে বাঁচাতেএবার ইংরেজিতে অভিনয় করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। আমেরিকান কায়দায় বলব যে ফাংশানাল ডকুমেন্টটা আরও এলাবোরেট করতে হবে। তাই টেকনিকাল স্পেসিফিকেশনগুলোকেক্লাসিফাই করছিলাম প্রায়োরিটি অনুযায়ী। এগুলো আমার বা হাতেরখেল। দিনে দিনে আয়ত্ত করা এইসব কৌশলে নিজেকে যতই চৌকশমনে করি না কেন আদেখলাপনা কিন্তু এখনও আমার ষোলোআনা। কথায় কথায় কোনওদিন যদি লুকাস জিজ্ঞেস করে বসে, নেক্সটউইকেন্ডে কী প্ল্যান? আমি প্ল্যান-ট্যানের কথা কিছুই বলব না, লুকাসকে মাছের ভেড়ি, গোপালচন্দ্র, পানকৌড়ি আর সুষমা মন্ডলের কথা বলব। বলতে বলতে লুকাসের প্রতিটি প্রতিক্রিয়ায় তাকে মানুষ-মানুষ হিসেবে খুঁটিয়ে খুঁজব ঠিক যেভাবে পানকৌড়ি খোঁজে মাছআর সুষমা পানকৌড়ি।
 
উইকেন্ড মানে শনি রবিবার আমাদের ছুটি। উইকেন্ডে আমি এটাসেটাকরি। সুব্রতর বাড়ি যাই। সুব্রত নেতাদের এন্তার গালি দেয়,জিওপলিটিকাল ইস্যু নিয়ে ভারী ভারী কথা বলে, আমি চা খেতেখেতে সবই শুনি। সন্ধ্যেবেলায় বাজার থেকে দেশি ট্যাংরামাছ কিনি।মা ধনেপাতা দিয়ে দারুণ রান্না করে খাওয়ায়। জন্মদিনে, বিবাহবার্ষিকীতে ক্রিম সন্দেশও খাওয়ায় কেউ কেউ। উইকেন্ড আমার এইভাবেই কাটে। তারপর দাঁত বার করে সোমবার আসে। সোমবার মানে মোনালিসা। মোনালিসা মানে আমার ম্যানেজার।
 
আজ সেই সোমবার। আমার পা ভারী হয়ে আসে। বুকের ভিতরটাহালকা। ভাবি অফিসে ফোন করে বলে দিই, আমি একটু আগেই ট্রেনে কাটা পড়েছি। ধড় থেকে মুন্ডু আলাদা। মুন্ডুটা জুড়তে সময় লাগবে, তারপরেই অফিসে জয়েন করব। এসব তো আর বলা যায় না তাইভাবলাম সকাল সকাল একটু খেলা করে আসি ছোটবেলায় যেভাবে কানামাছি, সাতচাঁড়া, গোল্লাছুট খেলতাম। আমি পানকৌড়ি সেজে মাছ খাব আর সুষমা মন্ডল ঘা মেরে আমাকে তাড়াবে। গোপালচন্দ্রহবেন জাজ। এই হল খেলা। খেলাধুলা করে ঘাম ঝরিয়ে তারপরেইঅফিস যাব। যা হয় হোক।
 
জলাশয়ের ওপর কতগুলো বাঁশ পোতা। বাঁশের ওপর একটা পানকৌড়ি ডানা মেলে রোদ পোহাচ্ছে। সকাল সকাল সূর্যের কচি আলোয় কালো ডানাগুলো চকচক করছে। তাকিয়ে থাকলামসেদিকেই যতক্ষণ না পানকৌড়িটা দক্ষিণের দিকে উড়ে যায়। আমি এগিয়ে গেলাম। যথারীতি অনেক পাখি ডাকছে। এদিক ওদিক উড়েযাচ্ছে কত বক শালিক কাক। ফুটবল মাঠের মতো জলাশয়টার পারেনৌকাটা বাঁধা। সুষমা মন্ডলকে দেখতে পাচ্ছি না।
 
বাড়ীর উঠোনে কুকুর দুটো কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে। গোপালচন্দ্র বেঞ্চিতেবসে। জলাশয়ের দিকে তাকিয়ে। বাড়ির পরিবেশ শুক্রবার বিকেলেরজেরক্স কপি।
 
'ভালো আছেন?'
 
'হ্যাঁ।'
 
'যিনি আগের দিন পানকৌড়ি তাড়াচ্ছিলেন, আজ তাকে দেখছি নাতো। আসেননি?'
 
'না, ও তো মরে গেল।'
 
অফিস থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে সকালটাকে হ্যাংলার মতোগিলে নিচ্ছিলাম। গোপালচন্দ্রের নিরুত্তাপ উত্তর আমার এইপ্রক্রিয়াটাকে মুহূর্তে ওলট-পালট করে দিল।
 
'মরে গেছে মানে! কীভাবে?'
 
'ওর তো রোগ ছিল। শীত বর্ষায় সারাদিন জলে থাকত। বৃষ্টিতে ভিজত। ফুসফুসে জল জমে গেছিল। মাঝেমাঝেই বুকে ব্যথা করত।'
 
'ডাক্তার দেখাননি?'
 
'দেখিয়েছিল কিন্তু ও রোগ সারতে অনেক খরচা। বুকে ব্যথা করলে রাতের বেলা মুব মলম আছে না, ও লাগিয়ে শুয়ে পড়ত।'
 
'মালিক জানত এসব?'
 
'মালিক সবই জানত। জেনে কী করবে? ও তো লেবার ছিল। দুশো টাকা বাড়িয়ে দুশো কুড়ি টাকা করে দিয়েছিল ছমাস আগে। কাজ যেননা ছাড়ে। ভালো পাহাড়া দিত কিনা।' গোপালচন্দ্রআবার জলাশয়ের দিকে চোখ ফেরালেন। দিনে দুশো পঞ্চাশ টাকারকাজ।
 
নৌকোটার দিকে এগিয়ে গেলাম। নৌকার ভিতরে জলের পরিমাণ বেড়েছে। পারে ঘাস আর কাদা লেপ্টে। ঘাস কাদা মাড়িয়ে আমি নৌকায় উঠলাম। নৌকা চালানো খুব সহজ কাজ নয়। বাঁধন খুলে বাঁশটা জলে দেড়মানুষ ডুবিয়ে চাপ দিয়ে নৌকাটা আরও গভীরে নিয়ে গেলাম। একটা এরোপ্লেন আমার পেছন থেকে আমাকে টপকে অফিসের দিকে উড়ে গেল। আমার ব্যাগে লাঞ্চ আছে। ব্যাগটা নৌকার অন্য প্রান্তে রাখলাম। গোপালচন্দ্র এদিকেই তাকিয়ে। পানকৌড়ি আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে। মুখ ডুবিয়ে মাছ তুলে উড়ে যাচ্ছে। সুষমা মন্ডল ঠিক এখানেই বসতেন। বসে ঘা মারতেন লাগাতার।শুঁকে দেখলাম সারা নৌকা জুড়েই মানুষ-মানুষ গন্ধ। প্রাণ ভরে দীর্ঘনিঃশ্বাসে ঘ্রাণ নিলাম। জলাশয়ের ওপারে একটা বাইক ফুটে উঠল।বাইকে বসে ক্ষিতীশ মন্ডল। সুষমার মালিক। আমি দেখছি, সে আজএকা নয়। মোনালিসা মানে আমার মালিক আর মোনালিসারমালিক লুকাসও আছে। আমি চাই পানকৌড়ি আজ প্রাণভরে মাছ খাক। দেড়শ গ্রামের চার পাঁচটা মাছ গোগ্রাসে গিলে নিক। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। ক্ষিতীশ মন্ডল, মোনালিসা ব্যানার্জী, ক্রিস লুকাসসবাই এদিকেই এগিয়ে আসছে। হ্যাঁ, এদিকেই। নৌকায় একটা লালন্যাকড়া। সুষমা ঠিক যেভাবে গামছাটা মাথায় বাঁধতেন ন্যাকড়াটাসেইভাবেই মাথায় শক্ত করে বাঁধলাম। তুলে নিলাম ডান্ডাটা। শক্তহাতে ধরে ওদের সবকটাকে তাড়াতে নৌকায় প্রচণ্ড এক ঘা দিয়ে চিৎকার করে বললাম, 'আও আও......ও ও ও .........।'
 

লেখক পরিচিতি
শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য
কথাসাহিত্যিক।
কলকাতায় থাকেন। 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ