সাদিক হোসেনের গল্প: ছুন্নতের দিনে মানুষজন ও অন্যান্য


জৈগুন বিবির বদ্দোয়ায় খালেক মিঞার খালাতো ভাই বকরি হয়ে যাবার তেরোমাস তেরোদিনের মাথায় নজি মোল্লার তিন নম্বর ছেলেটার ছুন্নতের দিনে, সকাল সকাল ছেলেটাকে গা ধুইয়ে, হাজাম আসার খানিক আগে রজনীগন্ধার মালা পরিয়ে, উঠোনে দাঁড় করিয়ে নজি মোল্লা নিজে হাতে হটসট ক্যামেরা থেকে ছবি তুলতেছিল। ঠিক সেই সময় ছেলেটার মাথার উপর থেকে ছাই রঙা মেঘ সরে যাওয়ায় সূর্যের রোদ চকাত করে নজি মোল্লার চোখে এসে পড়ে আর তার হাত কেঁপে যায়। এতে নজি মোল্লা খানিক বিরক্ত হয়ে ছেলের গলা থেকে মালাটা খুলে সেটা বউ-এর হাতে দিয়ে, ছেলেটাকে এবার রোওয়াকের উপর রাখা চেয়ারে বসিয়ে নিজে উঠোন থেকে কোমরটা বেঁকিয়ে খানিক নীচু হয়ে পরপর দুটো ছবি তোলে। কিন্তু তিন নম্বর ছবিটা তোলবার সময় নজি মোল্লা যখন ছেলেটাকে চেয়ারের উপর দাঁড় করিয়ে নিজে আরও খানিক দূর থেকে ক্যামেরা তাগ করেছে, ঠিক সেই সুযোগে কালাম মোল্লার খালতো ভাই কোথা থেকে এসে নজি মোল্লার বউ-এর হাতে ধরা রজনীগন্ধার মালাটা খপ করে চিবিয়ে দেয়। এতে চারদিকে হুলুস্থুল কান্ড ঘটে - নজির বউ হেই হেই করতে করতে বকরিটার মুখ থেকে মালাটা টানে, মালা টানতে গেলে তার আঁচল নেবে যায়, আবার আঁচলটা দিয়ে ব্লাউজ ঢাকতে গেলে বকরিটা মালাটা নিয়ে দৌড়ে পালায়। তারিমধ্যে হাফিজুল কোথা থেকে একটা কঞ্চি নিয়ে বকরির পোঁদে মারতে গেলে হোঁচট খায়, তাকে সামলাতে গিয়ে হাসিম আবার ক্যামেরার ভেতর ঢুকে পড়ে। এসব দেখে বাবুলাল ভিড়ের ভেতর থেকে ''গাঁড় মেরেচে'' বলতেই নচি মোল্লা ক্যামেরার বোতাম টেপে। নজির ছেলে কঁদতে শুরু করে। নজির ছেলে কাদতে শুরু করলে আর থামে না। নাক থেকে সিকনি গড়িয়ে ঠোটের উপর এসে জমে। তার মা আঁচল দিয়ে নাক মুছিয়ে সাত বছরের ছেলেটাকে ঘরে নিয়ে চলে গেলে পর নজি মোল্লা চেয়ারে বসে কাঁধ থেকে ক্যামেরাটা নাবিয়ে চারদিকে খানিক তাকায়। তারপর, বাবুলা্ল, বলে ডাক ছাড়ে। বাবুলাল একটু আগেই মুরুব্বিদের সামনে গাল পেড়েছিল, সে তাই ভয়ে ভয়ে একটু এগিয়ে আসে। আমতা আমতা করে। নজি মোল্লা কিন্তু তখনি কিছু বলে না। নিজের ভেতরি নাক মুখ সিটকে চেয়ারে বসে থাকে। তারপর চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে ''বাবুলাল বাঁড়ার বাল'' বলেই সটান সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। এতে বাবুলাল ভ্যাবাচাকা খেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে খানিক। কালাম মোল্লা, অত বুড়োমানুষ, সে কিন্তু ফিক করে হেসে ফেলে। আর তার হাসির সাথে সাথেই উঠোনে দাঁড়ানো বউমেয়েছেলেছোকরাদের কাছ থেকেও হাসির শব্দ শোনা যায়। বাবুলাল কী করবে বুঝতে না পেরে প্রথমে রাগ দেখায়। তারপর সবার হাসি থেমে গেলে সে নিজেই হাসে।

খানিক পর সাদা শার্ট আর চেক-চেক লুঙ্গি পরে, কাঁধে একখানা চামড়ার ব্যাগ নিয়ে হাজাম এলো। হাজামকে দেখেই সকলে কেমন চুপ মেরে যায়। নজির বউ এক হাঁড়ি পানি চুলোতে বসিয়ে চুলোর মুখে হাওয়া করে। ছেলেটা সেই যে কঁদতে শুরু করেছিল এখনও ঘরের এককোণে বসে ফোঁপাচ্ছে। নজি মোল্লা নিজে গিয়ে ছেলের পায়জামা খুলে, ন্যাংটো করে হাজামের কাছে নিয়ে আসে! হাজাম ব্যাগের চেইন খুলতেই ছেলেটা আবার চেঁচিয়ে ওঠে। বাবুলাল এদের কেউ না - মাঝে মধ্যে নজির ফাইফরমাজ খেটে দেয়। এতক্ষণ সে ভাবছিল ওখানে যাব কী যাব না। এরিমধ্যে কালাম মোল্লার পাঁচ বছরের নাতিটা উত্তেজনায় থাকতে না পেরে, কিছু একটা বলতে গিয়ে ''বাবুলাল বাঁড়ার বাল'' বলেই দৌড়ে পালায়।

নজি মোল্লা কিন্তু একলা সাত বছরের ছেলেটাকে ধরে রাখতে পারে না। বাবুলাল ঘরের মেঝেয় একখানি পিঁড়েতে ছেলেটাকে বসিয়ে বলে, নজি ভাই, তুমি বরং পেছন থেকে হাত দুটো ধরো, বলে সে পা-দুটো দু’হাতে ফাঁক করে হাজামকে ইশারা করে। নজির বউ গরম পানির হাঁড়িটা দিয়ে দু'রাকাত নফর নামাজ পড়তে গেছে। হাজাম প্রথমে ব্যাগটা থেকে ক্ষুর বার করে গরম পানিতে চুবিয়ে ন্যাকড়া দিয়ে মোছে। তারপর নুনুর বাড়তি চামড়াটা টেনে ধরে পানি ছিটায়। ছিটোতে ছিটোতে কচলায়। কচলাতে কচলাতে কুচুৎ করে কেটে দেয়। কাটার পরে পট্টি দিয়ে বেঁধে তার উপর ছাই-এর গুঁড়ো মাখিয়ে দেয়। এতে আর রক্ত বেরোয় না। ছেলেটাও এতক্ষণে কান্না থামিয়ে ক্লান্তিতে নেতিয়ে পড়ে। নেতিয়ে গেলে তাকে খাটের উপর শুইয়ে দিলে জৈগুন বিবি গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে জর্দা খাওয়া গাল নেড়ে দোয়া পড়ে, দোয়া পড়তে পড়তে থেমে গিয়ে চোখ থেকে বুক অব্দি ঘাড় নাড়িয়ে ফু মারে। নজি মোল্লার বউ সাদা কাপড়ে কাটা চামড়াটা পায়ের গোড়ালিতে বেঁধে দেয়। একটা পাতলা কাঁথা ছেলেটার গায়ে চাপাতে গিয়ে বলে, অ, বিবি, তুমি বরং আজ দুপুরে এখেনেই খেয়ে যেও। বিবি মাথা নাড়ে।

দুপুরে যে খালি জৈগুন বিবি একলাই খাবে তা না - আশপাশের আরও কজনকে দাওয়াত দিয়ে এসেছিল নজি মোল্লা। তার বড়ো মেয়ে আমিনা ভায়ের নুনুতে হাতপাখা নেড়ে হাওয়া করছে। নজির ছেলেটা ন্যাড়াকাতুরে। এখন বাতাস খেয়ে ফোঁত ফোঁত করে নাক টানে।

কালাম মোল্লার কোন নাতনি নেই। তবু সে নজির ছেলেটাকে নাতজামাই বলে ডাকে। নজির ছেলে কদিন ধরে ফুটবলের জেদ ধরেছিল। কালাম মোল্লা খানিক আগে একটা চামড়ার ফুটবল কিনে দিয়েছে। তবে বলটাতে হাওয়া দেওয়া হয়নি। আমিনা বাবুলালকে আশপাশে ছোঁক ছোঁক করতে দেখে বলে, অ বাবুলাল, যতনের দোকান থেকি বলটায় পাম্প দে' আয় না।

নজি মোল্লা তাকে বাজার থেকে মিষ্টি দই কিনে আনতেও বলেছিল। বাবুলাল একখানা থলি জোগার করে আমিনাকে বলে, দাও।

আমিনা বলে, আব্বার কাছ থেকে টাকা নে' যাস।

নজির কাছে টাকা চাইতে গেলে নজি বলে, খালেক চাচাকে দেখলি?

না তো। বাবুলাল মাথা চুলকায়।
 
বাঁড়াটা জানতুম। নজি মোল্লা ক্যামেরাটা লুঙ্গিতে ঘষতে ঘষতে বলে, জৈগুন বিবি আগে, না খালেক চাচা আগে? খালেক মিঞা হলো মোর বাপের আপন চাস্ত ভাই।'

অর্থাৎ জৈগুন বিবি দুপুরে এখানে খাবে বলে খালেক চাচা সকাল থেকেই এদিকে আসেনি। এখন বাবুলালকে যে করেই হোক খালেক চাচাকে মান ভাঙিয়ে আনতে হবে। কিন্তু খালেকের বড়ো ছেলেটা বড্ড হারামি। বাবুলাল কথা বলার সময় থুতু টানার আওয়াজ করে। খালেকের বড় ছেলেটা তাই বাবুলালকে দেখলেই খ্যাপায়, অ, বাবুলাল, বাবুলাল, সুরো টানবি?

নজি মোল্লা বাবুলালের উপর খেকিয়ে ওঠে, যা না দেইড়ে আছিস কেন?

বাবুলাল হাঁটা লাগায়। কিন্তু খালেক মিঞাকে ডাকতে যেতে হবে এই দুশ্চিন্তায় জোরে হাঁটতে পারে না। খানিকটা এগোলে কালাম মোল্লার পুকুরপাড়ে খালেক মিঞার খালাতো ভাইকে দেখে ঢিল ছোঁড়ে। বকরিটা কিন্তু নড়ে না। ঐ জায়গাটা থেকেই বাবুলাল কে দেখে চ্যাচায়। তার গলায় বাঁধা ঝুনঝুনিটা বেজে ওঠে।

ওদিকে সুযোগ বুঝে আমিনা জৈগুন বিবির কাছ ঘেষে বলে, একটা কথা আছে।

জৈগুন বিবি বলে, হুম।

আমিনা বলে, একটা জিনিস। ব'লে সে কামিজটা তুলে পায়জামার গিঁটের ভেতর থেকে একখানা পুরনো সিকি পয়সা বার করে জৈগুন বিবিকে দেখায়। জৈগুন বিবি উল্টিয়ে পাল্টিয়ে সিকি পয়সাটা দেখে। পয়সাটাতে আবার আরবিতে কী সব লেখা রয়েছে। তা দেখে জৈগুন বিবি এক খিলি পান মুখে পুড়ে পড়ার চেষ্টা করে। তারপর যেন সব বুঝে ফেলেছে এমন ভাবে আমিনার দিকে চেয়ে হাসে। আমিনা বলে, কালকে গোসল করতি গে' দেখি পোটে রইচে। দেখেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁক করে উঠলো।

জানলা দিয়ে পুচ করে থুতু ফেলে জৈগুন বিবি। তারপর প্লাস্টিকে মোড়া জর্দার কৌটো থেকে খানিকটা জর্দা মুখের ভেতর চালান করে সব সময় সে গল্পটার ভেতর দিয়ে গিয়ে আসল কথাটা বলে সেই কাহিনিটা শুরু করে –

মোর দাদার দাদার পরদাদা ইব্রাহিম মিঞা পালঙ্কের উপর শুয়ে ছ্যালো তখন। তা উনি বহুৎ জানলেঅলা লোক ছ্যালেন। কোনদিন তার নামাজ ক্বাজা হয়নি। এমনও দিন গেছে উনি এষার অজুতে ফজরের নামাজ পড়েছেন। তো সেই রাত্তিরে উনি খোয়াবে দেখলেন, উজ্জ্বল সদাগরের বউ আয়না বিবি ভাতারের ভিটে ছেড়ে ভাতারের খোঁজে কুরুঞ্জিয়া মাগিদের সাথে নৌকোয় চড়ে নাচগান করতি করতি বেসাতি করতি বেইরেচে। এই দেখেই ঘুমুতি ঘুমুতি ওনার ওজু ভেঙে গেল।

এইটুকু বলে জৈগুন বিবি আমিনার দিকে তাকায়। ঘুমতে ঘুমতে ইব্রাহিম মিঞা নাপাক হয়ে গেল কেন? এর সম্ভাব্য কারণটা বুঝতে পেরে আমিনা শরমে হেসে ফেলে। আমিনাকে থামিয়ে জৈগুন বিবি বলে, তুমি বেটি এখন মাগি হইচো। তোমার লেগি এসব বললি গোনা নেই। তবে আসল কথাটা শোনো।

জৈগুন বিবি নিঃশ্বাস নিয়ে আবার শুরু করে - ঘুম থেকে উঠে ইব্রাহিম দাদা তউবা তউবা করতি থাকেন। তা মোর দাদার আর একটা সত্যিকারের গল্প বলি – একবার ইব্রাহিম দাদা হাজামের কাছে গোঁফ কাটতি গেছ্যালেন। কিন্তু গোঁফ কামাতি কামাতি তিনি খালি ''বিসমিল্লা বিসমিল্লা'' নাম করতে ছ্যালেন। তাতে হাজাম বলেছ্যালো, হুজুর নড়ালি ফ্যারে গোঁফ কাটতি পারতিচিনি যে। তিনি তবু আল্লার নাম করা থামাননি। এতে তার ঠোটও কেটে গেছ্যালো। তা দাদা সে রাতে উঠে বসতিই ঘরের ছাদ যেন কেঁপে উঠল। ছাদের উপর কে যেন পায়চারি করতেছে। তিনি হাঁক ছাড়লেন। উপর থেকে উত্তর এলো, মুই শত্তুর নই গো। উট হেইরে ফেলিছি। তাই খুঁজতে এইচি।

- ছাদের উপর উট খুঁজতোচো? এ কেমন কথা!

উপর থেকে ফের হাসির শব্দ এলো। সে যে কী হাসি! মোর দাদার দাদার পরদাদা সেই হাসি শুনে কুঁকড়ে গেল। তারপর নাপাক শরীলটা ধোবে ব'লে যেই নেবেচে অমনি শোনে, তুমি তো মিঞা ঘরের ভেতর খালি এক জায়গায় বসে বসে আল্লাকে ডাকতোচো। এতে কী আর দ্বিনের খোঁজ পাওয়া যায় গো। তবে যে মুই ছাদের উপর উটের সন্ধান করতিচি

তাতে এ্যাতো আশ্চর্য হও কীসের লেগে?

গল্পের রেশ ধরে জৈগুন বিবি জিগেস করে, বুঝলি?

আমিনা আর কিছু জিগেস করতে যাবে অমনি নজি মোল্লা কোথা থেকে এসে জৈগুন বিবির ছবি তুলে ফেলে। এতে জৈগুন বিবি রাগ দেখিয়ে বলে, তোমাকে মুই ন্যাংটো পোঁদে খেলতে দেকিচি নজি। এখন তুমি বড়ো হইচো। তোমার ছেলেমেয়েরাও লায়েক হইচে। কদিন পর মেয়ের বে' দিতি হবে। আর মোচলমানদের যে ফটো তুলতি নেই, তা জানো না?

নজি মোল্লা গোমরা মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। জৈগুন বিবি জর্দার কৌটোটা প্লাস্টিকে মুড়ে উঠে দাড়ায়। সে আর এক মুহূর্ত ঘরে থাকবে না। নজি মোল্লা কিন্তু জৈগুন বিবিকে অনুরোধ করে না। ক্যামেরাটা এমনভাবে ধরে থাকে, যেন মনে হয়, সে ওটা এখুনি মেঝেয় আছাড় দিয়ে ভাঙবে। সে আমিনাকে রাগ দেখায়, যা না এখেনে কি করতিচিস। মা-র কাছে যা।

আর জৈগুন বিবি প্লাস্টিকে মোড়া জর্দার কৌটোটা দুলিয়ে দুলিয়ে, সবার সামনে দিয়ে দুপুরের খাবার না খেয়েই বেরিয়ে যায়।

এদিকে জৈগুন বিবি গোঁসা করে বেরিয়ে গেছে এই কথাটা চারদিকে চাউর হয়ে যাবার সাথে সাথে জোহরের নামাজ পড়ে খালেক মিঞা মসজিদ থেকে সোজা নজি মোল্লার দাওয়ায় উঠে এসে বলে, হ্যাগা মোর নাতিটা মোচলমান হয়ে গেল! কই সে ব্যাটা কই?

এতক্ষনে নজি মোল্লা, আসেন চাচাজান, ব'লে খালেক মিঞাকে ছেলের ঘরে নিয়ে যায়। খালেক মিঞা পাতলা কাঁথাটা সরিয়ে নজির ছেলের নুনু দেখে বলে, নাহ, আফজল হাজামের হাতের কাজ ভালো।

ইস্টিশান থেকে ফেরার পথে বাবুলাল ইচ্ছে করে খালেক মিঞাকে ডাকতে যায়নি। এখন সে খালেক মিঞাকে দেখে ভয়ে আর এদিকে আসে না। সে ভাবে, নজি তাকে দেখতে পেলেই খেঁকিয়ে উঠবে। নজি মোল্লা কিন্তু বাবুলালকে ঠিক লক্ষ রেখেছে। বাবুলালকে দেখেই সে বলে, বাবুলাল, এদিকে শোন।

বাবুলাল না শোনার ভান করে কেটে পড়তে চায়।

নজি আবার ডাকে, কীরে, কানে কী বাঁড়া ঢুইকে আছিস নাকি? ’

চাচাজানের সামনে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলে, বাবুলাল। এদিকে শোন।

বাবুলাল এলে তাকে ক্যামেরাটা দিয়ে কো্ন্‌ বোতামটা টিপলে ছবি উঠবে তা বুঝিয়ে খালেক মিঞার পাশে পিঠ খাড়া করে বসে থাকে। বাবুলাল বোতাম টিপতে গেলে খালেক মিঞা আবার কাশতে শুরু করে। বাবুলাল আর বোতাম টেপে না। কাশি থামলে নজি মোল্লা পিঠটা টানটান করে আগের মত পোজ নিয়ে বসে। তখন বাবুলাল বোতাম টেপে।

আমিনার হয়েছে এক বিপদ। জৈগুন বিবি রাগ দেখিয়ে চলে যাবার সময় সিকি পয়সাটাও সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। সিকি পয়সাটার লেগে আমিনা আর থির থাকতে পারে না। সে ভাবে, এ তো আর যে-সে সিকি পয়সা না। এই পয়সাটার পেছনের কাহিনিটাকেই বা সে বাদ দেয় কী উপায়ে -

কয়মাস আগে শফি নামের একটা বছর পনেরোর ছেলে নজির দলিজে কাম সেলাই করতে এসেছিল। তবে কদিন পরেই বোঝা গেল শফির মগজে আরও অনেককিছু ঘুরপাক খাচ্ছে। সে রোজ শোবার আগে এক পারা করে কোরা্ন পাঠ করে। সেই কোরান পাঠ শুনলে নজি মোল্লার কেন জানি না দু'চোখের পাতা ভেজা ভেজা ঠেকে। বউ-এর পাশে শুয়ে শুয়ে, বউ-এর গায়ে হাত দিতে দিতে, কখন কোলের ভেতর মাথা গুজে সে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বলে, শফিকেই মুই মোর জামাই করে রাখব গো। তুমি শফির বাপ মাকে খবর পাঠাও।

শফি কিন্তু তার বাপ মায়ের কোন হদিশ দিতে পারে না। একদিন আমিনা শফিকে একলা পেয়ে জিগেস করে, তোমার সাথে আব্বা মোর বে' দেবে বলেচে, জানো?

শফি বলে হু।

আমিনা বলে, কী হু?

শফি বলে, মোর তো ঘরদোর নাই।

জানি। ব'লে আমিনা শফিকে বারান্দার এক কোণে নিয়ে গিয়ে পাশে বসায়, আব্বা বলতেছ্যালো দলিজের ডান দিকের অংশটা ভেঙে ওখেনে ঘর তুলবে। ঐ ঘরেই মোরা থাকব।

শফি উঠে যেতে গেলে আমিনা আবার বলে, খালেক দাদার সাথে আব্বা কথা কইচে। মুই শুনিচি। ব'লেই সে হেসে ফেলে।

আর একদিন সে বাবুলালকে দিয়ে শফিকে পুকুর পারে ডেকে পাঠায়। শফি এলে আমিনা বলে, তুই সবেতা গাছের নিচে দেঁইড়ে থাক। দেখবি কেউ আসতেচে কী না।

বাবুলাল চলে গেলে আমিনা কানের উপর থেকে চুল সরিয়ে বলে, এই টা।

শফি বলে, কী?

এই টা, এই ঘা-টা। সেই ছোটোবেলা থেকে হইচে। বাড়েও না, কমেও না। খালি পিশপিশ করে। রস বেরোয়। মুই তাই কানে মাকড়ি পড়তি পারিনি। চুল দে' কানটা ঢেকে রাখি। সে আবার চুল ফেলে কানটা ঢেকে নেয়।

শফি বলে, নামাজ পড় না কেন? নামাজ না পড়লি মুসলমানরাও কাফের হয়ে যায়।

নামাজ পড়লি ঘা-টা সেরে যাবে?
 
কাফেরদের নামাজ কবুল হয় না। শফি রাগ দেখিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

তারপর কী কারণে একটা সিকি পয়সা বের করে আমিনাকে দিতে যায়। তখনি বাবুলাল শিস দেওয়ায় আমিনা ভাবে কেউ বুঝি এদিকে আসছে। সে তাড়াতাড়ি ওখান থেকে সরে আসে। কিছুদূর গিয়ে পেছন ফিরলে দ্যাখে, শফি সিকি পয়সাটা পুকুরে ফেলে দিল। বাবুলাল বলে কেউ তো আসেনি।

আমিনা অবাক ভাবে বলে, তালে শিস দিলি কেন?

ও তো এমনি। বাবুলাল সুড়ুৎ করে থুতু টেনে বলে, একলা দেঁইড়েছ্যালুম তো, সিটি দিলুম। মুই সিটি মেরে গান গাইতি পারি।

আমিনা রাগ দেখিয়ে বলে, হইচে। ব'লে সে পা ঠুকে বেরিয়ে যায়।

খালেক মিঞা একদিন নজিকে ডেকে বলে, না, ছেলের সাথে কথা কইলুম। জানটা জুইড়ে গেল। ছেলের বুদ্ধিশুদ্ধি আছে বটে। মুই জিগেস করলুম, তোমার তো বাপ মা নাই। আল্লার কাছে দোয়া কোরো যাতে তোমার ঘরদোর-বউবাচ্চা হয়। নিজের পায়ে দাঁড়াতি পার। তা ছেলে বলে কী না, না দাদাজান, মোর লোভের বাসনা পূর্ণ করবার লেগি আল্লার কাছে কিছু চাইতি মোর শরম লাগে যে। নজি এ ছেলেকে তুমি ঘরে রেখো না। ওয়াজেদ মৌলানার সাথে কথা কয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি কইরে দাও। ও দুনিয়ার লেগে জন্মাইনি গো। ওর নজর যে আখেরাতের দিকে।

নজি মোল্লা আর দেরি করেনি। তখন তার নিজের ছেলের থেকে শফিকে আপন মনে হত। পরের দিনেই শফিকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে হাঁফ ছাড়লো, লাইফে একটা নেক কাম করলুম বটে।

সে শফিকে কাম সেলাই করতে বারণ করে। কিন্তু শফি তা শোনে না। বলে, তুমি মোর আপন আব্বার মত। তবু কোন কাজ না করে মুই এখেনে খেতি পারব না। ও যে হারাম খাওয়া হবে।

নজি আর বাধা দেয় না।

শফি ভোরবেলায় উঠে খানিকটা কাজ সেরে মাদ্রাসায় চলে যায়। ফিরে এসে নজি মোল্লার ঘরে বসে খায়। আমিনা তাকে খাবার দেয়। শফি কিন্তু আমিনার চোখে চোখ রাখে না। আমিনা বাবুলালকে দিয়ে আবার শফিকে পাকড়াও করলে সে আমিনার সামনে কেঁদে ফেলে। সে রাতে আমিনাকে একটা ছোটোমতো কাঠের বাক্স দিয়ে বলে, এটা জৈগুন বিবিকে দেখিও। ব'লেই সে ফিরে যায়।

আমিনার আর ঘুম আসে না। সে বাক্সটা নাড়ায়। বাক্সের ভেতর থেকে কী যেন নড়েচড়ে ওঠে। সে কিছু বুঝে উঠতে পারে না। এদিকে শফি বাক্সটা খুলতে বারণ করে দিয়েছে। গোনার ভয়ে সে বাক্সটা খুলতেও পারে না। আবার বাক্সটা না খুলতে পেরে খালি এপাশ ওপাশ করে। শেষে মাঝরাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, সে বাক্সটা নিয়ে বারান্দায় চলে আসে। বারান্দার লাইট জ্বালায়। বাক্সটা নাড়িয়ে কানের কাছে ধরলে বাক্সের ভেতর থেকে চি-চি শব্দ আসে। সে বাক্সটা নিয়ে আর একবার ভাবে। তারপর কী মনে হতে বাক্সর ঢাকনাটা খুলতেই বাক্সের ভেতর থেকে একটা ইঁদুর লাফিয়ে পালায়। ভয়ে আমিনার হাত-পা কেঁপে ওঠে। সে ইদুরটাকে ধরবে বলে এদিক ওদিক তাকায়। কিন্তু ইঁদুরটাকে আর দেখতে পায় না। সে পায়ে পায়ে ফিরে আসে। লাইট নেভাতে ভুলে যায়।

পরের দিন সকালবেলাতেই সে বাক্সটা নিয়ে জৈগুন বিবির কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বলে। জৈগুন বিবি পান চিবোচ্ছিল। জর্দার কৌটোটা তক্তবোসে একবার ঠুকে নিয়ে বলে, ও ছেলে যে তোর ধৈৰ্য্য চেক করতেছ্যালো রে। আর একটু সবুর সইতি পারলিনি!

আমিনা মুখ ভার করে ঘরে ফেরে। শফির সাথে কথা বলতে চায়। কিন্তু কোথাও শফিকে আর দেখতে পায় না। পরে বাপের মুখ থেকে শোনে শফি চার চিল্লার জামাতে বেরিয়েছে। নজি মোল্লা তাতে খুশি। কিন্তু আমিনা বাপের সামনে কাঁদতে পারে না।

আমিনা নামাজ পড়তে শুরু করে দিছিল। দু'দিন আগে সে খোয়াবে দেখে, সে আর শফি পাশাপাশি শুয়ে আছে। শফি হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে আমিনাকে ঠেলা মেরে বলে, এসো, মোরা দু'রাকাত নামাজ পড়ি।

কিন্তু আমিনা উঠতে চাইছিল না। সে জায়নামাজটা বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে বলল, মাটিতে না। আজকে মোরা বাতাসে দেঁইড়ে নামাজ পড়ব।

কী লাভ ওতে? শফি হেসে বলে, ও তো একটা মাছিও করতি পারে।
 
তবে?

শফি বলে, কেরামতি দেক্কে কোন লাভ নাই। এসো আসল কাজটা মোরা আগে করি।

আমিনা ঘুমের মধ্যেই ভিজে যায়।

ভোরবেলা নামাজ পড়বার আগে খিড়কির পুকুরে গোসল করতে এসে পোটের উপর যেই পা দেবে, অমনি একটা তেলাপিয়া মাছ মুখে করে সিকি পয়সাটা তার পায়ের কাছে রেখে চলে যায়।

এখন ভাতের জোগার করতে করতে আমিনা খালি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে - নাহ, জৈগুন বিবির কাছ থেকে সিকি পয়সাটা তাকে ফেরত নিতেই হবে।

ডিসে সকলে খেতে বসেছে। আমিনা চিলিমচিটা এগিয়ে দিলে খালেক মিঞা তাতে হাত ধুয়ে কুল্লি করে। নাজি মোল্লা চারখানা পরোটা ছিঁড়ে ডিসে ছড়িয়ে দেয়। তার থেকে এক টুকরো পরোটা গোশের সুরোতে ডোবাতে ডোবাতে খালেক মিঞা বলে, বুড়া হয়ে গিইচি তো। এখন আর এইসব শরীলটা নিতি পারে না।

নজি মোল্লা বলে, তালে ভাত দিই?

খালেক মিঞা হ্যাঁ-না কিছুই বলে না। আরও দুটো পরোটা খাবার পর ডিস থেকে ভাত টেনে নেয়। বাবুলাল তরকারি দিতে গেলে তরকারি নেয় না। পাশেই বসে ছিল কালাম মোল্লা। বাবুলাল কালাম মোল্লাকে গোশ দিতে গেলে কালাম মোল্লা বলে, চর্বি না, হাড্ডি দেখে দাও। বাবুলাল বালতির ভেতরে হাত ঢুকিয়ে হাড্ডি খোঁজে। খালেক মিঞা ভাতের সাথে দই মাখতে মাখতে বলে, মনটা খালি খচখচ করে।

নজি মোল্লা বুঝতে না পেরে খালেক মিঞার দিকে তাকায়। খালেক মিঞা বলে, কেমন লায়েক হয়ে উঠতেছ্যালো মোর খালাতো ভাইটা। আজ আর তার দিকে তাকাতি পারিনি।

হাসিম চুপচাপ খাচ্ছিল। সে বলে, এইটুকুন গোনার লেগি অতবড় শাস্তি!

হাফিজুল বলে, তবে যাই বলো, মোল্লাজির ত্যাকন তোমাদের ফরে কথা বলা উচিতছ্যালো। মেয়েটাও একরোখা।

কালাম মোল্লা হাড্ডি থেকে গোশ ছিড়তে ছিড়তে বলে, তোমরাও তো শেষে ওর নিকে দিতি রাজি ছ্যালে। কিন্তুন...

পাছে খালেক মিঞার খালাতো ভাই-এর বকরি হয়ে যাবার আসল কারণটা আবার তার মেয়ের সামনে বেরিয়ে পড়ে, তাই নজি বলে ওঠে, থাক থাক।

ওদিকে ঘরের ভেতর থেকে নজির ছেলেটা চেঁচিয়ে উঠল। কী ব্যাপার? না, ছেলেটা শুয়ে শুয়েই ফুটবলটা নিয়ে লোফালুফি খেলছিল। লুফতে লুফতে বলটা ফস্কে গিয়ে তার নুনুতে এসে পড়েছে। নুনুর একটা শিরা ফুলে উঠে ধ্বক ধ্বক করছে। বাবুলাল নেড়েচেড়ে দেখে রক্ত বেরচ্ছে না। কিন্তু বাবুলাল হাত দিতেই ছেলেটা আবার চেঁচিয়ে উঠল। পেছন থেকে নজি এসে বলে, বোকাচোদা হাত না ধুয়েই হাত দিলি কেন?

নজির বউ এসে ছেলের মাথায় হাত বুলোতে যায়। আমিনা আবার বাতাস শুরু করে। কালাম মোল্লা নজির ছেলেকে সাহস জোগায়, মোর য্যাকন মোসলমানি হইছিল মুই তোর থেকিও ছোটো ছ্যালুম। থামি বাঁধতি শিখিনি। একদিন দলিজে শুয়ে ঘুম্মে পড়িচি, হায় আল্লা, একটা মুরগী এসে ঠুকরে যাবে না!

কালাম মোল্লার কথা বলা শেষ হবার আগেই নজির ছেলে হেসে ফলে। আমিনা বাতাস করা থামিয়ে ছিল। সেই সুযোগে একটা মাছি এসে তার ভায়ের নুনুতে বসে। তখন সে আবার হাওয়া করা শুরু করে।

বিকেলের দিকে নজির বউ বাবুলালকে গামছায় বাঁধা এক বাসন খাবার দিয়ে বলে, এটা বিবিকে দিয়ে আয়। আর দেখিস আমিনার আব্বা যেন টের না পায়।

খিড়কির পুকুরের রাস্তা ধরে বিবির কাছে যাচ্ছিল বাবুলাল। আমিনা চোর ধরার মত তাকে পেছন থেকে ডেকে বলে, শোন্‌।

বাবুলাল থেমে যায়।

আমিনা বলে, শোন্‌।

কী?
 
কোথায় যাচ্ছিস?

বাবুলাল চুপ মেরে যায়।

আমিনা বলে, মুই জানি তুই কোথায় যাচ্ছিস। তুই তো বিবির লেগে যাচ্ছিস।

বাবুলাল কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, তোমার আব্বাকে বলবে না। তোমার আব্বা জানলি ফ্যারে মোকে খুব প্যাঁদাবে।

আমিনা বলে, বলব না কেন? এক্ষুনি বলব।

তোমার মা বলল বলেই তো যাচ্ছি।
 
আবার মাকে টানা হচ্ছে?

বাবুলালের মুখ দিয়ে আর কথা বেরোয় না। আমিনা বলে, একটা জিনিস করতি হবে। ঐ জিনিসটা করলি আব্বাকে বলব না।

বাবুলাল বলে, মুই চুরি-ডাকাতি করতি পারব না।

চুরি ডাকাতি না। আমিনা বাবুলালের কাছে এসে জৈগুন বিবিকে কী কী বলতে হবে তা বুঝিয়ে বলে।

বাবুলাল বলে, ও এই কথা।

আমিনা বলে, মুই মগরেব-বাদ ঐ সবেতা গাছটার নিচে এসে দাঁড়াব। বেশীক্ষণ দাঁড়াতি পারব না। তারমধ্যি না এলি আব্বাকে সব বলে দোবো। বেইনে বেইনে আরও অনেক কিছু বলে দোবো।

খানিক পর খালেক মিঞা ঢেঁকুর তুলে বলে, যাই। মোর ছেলেটা আবার শ্বশুরবাড়ি যাবে বলতেছ্যালো।

কালাম মোল্লা বলে, হুম।

ওদিকে হাসিমের দলিজ থেকে ডাক এসেছে। জামাল ওস্তাগারের কাছ থেকে সে হাজার দু'য়েক টাকা ধার করেছিল মাস দুয়েক আগে। দোবো দোবো করে আর দেয়নি। এখন জামাল ওস্তাগারের ছেলে মইদুল দলিজে এসে হাঁকডাক শুরু করেছে। আজ সে টাকা না নিয়ে কিছুতেই যাবে না। হালিমা কী বলতে গিছিল। মইদুল মুখের উপর বলে দিয়েছে, তোমাকে আর ওনার হয়ে ওকালতি করতি হবে না ভাভি। হাসিমের কাজের ফিরিস্তি দিলি তুমি এখেনে দেইড়ে শুনতি পারবে? হালিমা নাকি তা শুনে কেঁদে ফেলেছে।

নজি মোল্লা বলে, না, না, মইদুলের বড্ড বাড় বেড়েচে। ব'লে সে ছেলের জন্য বড়ি কিনতে ইস্টিশানে চলে গেল।
 
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে কারেন্ট চলে গেল। চারদিকে অন্ধকার। আমিনা পায়ে পায়ে সবেতা গাছের কাছে গিয়ে বাবুলালকে খোঁজে। বাবুলাল নেই। কাছে দূরে খালেক মিঞার খালাতো ভাই, ব্যা-অ্যা, ব্যা-অ্যা করে ডাকছিল। আমিনা হিসহিস করলে বকরিটা তার কাছে এসে ঘাড় নাড়ায়। ঝুনঝুনির শব্দ হয়। আমিনা বকরিটাকে কোলে নিয়ে পশমে মুখ ঘষে। বকরিটা গলা বাড়িয়ে দেয়। আমিনা গলা থেকে ঝুনঝুনিটা খুলে নেয়। পেছন থেকে ভূতের মতো বাবুলাল এসে বলে, আমি বাবুলাল।

আমিনা বলে, গিছিলিস?

বাবুলাল হাসে।

আমিনার আর তর সয় না। বলে, বিবি কী বলল?

বাবুলাল চুপ মেরে যায়। বকরিটা ডাক ছাড়ে।

আমিনা বলে, কী রে?

বাবুলাল আস্তে আস্তে মুঠো খুলে সিকি পয়সাটা আমিনার চোখের সামনে ধরে। আমিনা সিকি পয়সাটা কেড়ে বাবুলালের সামনেই কামিজটা তুলে পায়জামার গিঁটের ভেতর গুঁজে নেয়।

বাবুলাল অন্ধকারে তেমন কিছু দেখতে পায় না।

আমিনা বলে, বিবি কিছু বলেনি?

বাবুলাল মাথা নাড়ে।

আমিনা বলে? কী?

বাবুলাল বলে, বলেচে।

কী বলেচে?

বাবুলাল হাসে।

আমিনা রাগ দেখিয়ে বলে, বল্‌।

বাবুলাল হাসি থামায় না।

আমিনা বলে, বল্‌। বললি ফ্যারে একটা জিনিস দোবো।

বাবুলাল বলে, মোর শরম লাগদেচে।

আমিনা চুপ মেরে যায়। কীসব ভেবে বলে, মোকে বলতি তোর শরম লাগে?

বাবুলাল দাঁত ক্যালায়।

আমিনা বলে, ঠিক আছে। ব'লে সে বকরিটার কান টেনে বলে, তালে এর কানে বল্‌।

বাবুলাল বুঝতে পারে না।

আমিনা বলে, কীরে?

বাবুলাল বলে, এ আবার কী?

কেন? আমিনা ভয় দেখিয়ে বলে, তালে আব্বাকে গে' বলে দিই?

বাবুলাল মাথা চুলকে বলে, ঠিকাচে।

আমিনা বকরিটার মুণ্ডুটা বাবুলালের দিকে এগিয়ে দেয়। বাবুলাল বকরির কানের কাছে মুখ এনে বিবি তাকে যা-যা বলেছিল সেইসব কথা বলে যেতে থাকে।

সব কথা শোনবার পর আমিনার বুকের ভেতরটাও ধ্বক ধ্বক করে কাঁপে। বাবুলালের সামনে তার শরম লাগতে শুরু করে। বাবুলাল কিন্তু ঐ জায়গাটা থেকে নড়ে না। সে পকেটের ভেতর হাত ঢোকায়। আমিনা বলে, যা এবার।

বাবুলাল তবু যায় না। সাহস করে বলে, তবে যে মোকে কী দেবে বলেছ্যালে?

হুঁ। ব'লে আমিনা অন্ধকারের ভেতর ঢুকে যায়।

বাবুলাল তার পিছু নেয়। বকরিটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে আমিনা হাসে।

বাবুলাল বলে, দাও।

আমিনা বলে, মাথাটা নিচু কর্‌।

বাবুলাল দুই পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। বকরিটা ডাক ছাড়ে। আমিনা ঝুনঝুনিটা বাবুলালের সামনে নাড়ায়। বাবুলাল মাথা তুলতে গেলেই সেটা বাবুলালের গলায় পরিয়ে দেয়। বাবুলাল কথা বলতে যাবে - অমনি ঝুনঝুনিটা বেজে ওঠে। সে চেয়ে দেখে আমিনা বকরিটার মুখে মুখ ঘষে তার দিকে চেয়ে পিচপিচ করে হাসছে। বাবুলাল আমিনাকে ধরতে যায়। কিন্তু আমিনা বকরিটাকে কোলে নিয়ে দৌড়ে তার নাগালের বাইরে বেরিয়ে যায়।


লেখক পরিচিতি:
সাদিক হোসেন
কথাসাহিত্যিক
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ